মহররম ১৪২৯   ||   জানুয়ারী ২০০৯

বাইতুল্লাহর মুসাফির-১৭

মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

হজ্বের দুতিন দিন পর হযরতের ইরাক সফরের প্রস্ত্ততি শুরু হলো। দায়িত্ব ছিলো মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছাহেবের উপর। তিনি আমার প্রতি যথেষ্ট স্নেহশীল ছিলেন। জেদ্দাস্থ ইরাকী দূতাবাসে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। সেখানে অত্যন্ত কর্মব্যস্ততা ছিলো।  অভ্যর্থনায় গিয়ে ঢাকাস্থ ইরাকী রাষ্ট্রদূতের পত্র হস্তান্তর করার পর আমাদের উপস্থিতি বেশ গুরুত্ব লাভ করলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা মাননীয় রাষ্ট্রদূতের কক্ষে প্রবেশ করলাম। তিনি আন্তরিক উষ্ণতার সঙ্গে করমর্দন করলেন এবং কোমল পানীয় দ্বারা আপ্যায়ন করলেন। আমরা ইরান সফর করেছি কি না জানতে চাইলেন। উত্তর শুনে মনে হলো, কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন। কিন্তু তিনি যে একজন পেশাদার কূটনীতিক সেটা প্রকাশ পেলো তার বিস্ময়পরবর্তী সংযম থেকে। তিনি শুধু বললেন, আপনাদের ইরাক সফর সুখময় হোক। বাগদাদের পানি ও বাতাস আপনাদের ভালো লাগুক। বারুদের গন্ধ যেন আপনাদের কষ্টের কারণ না হয়।

মাননীয় রাষ্ট্রদূতের কথা আমার খুব ভালো লাগলো। মানুষের হাসিমুখ এবং মুখের কোমল-সুন্দর কথা সারা জীবন মনে থাকে। মানুষের কথায় মানুষ যখন খুশি হয় নিজের অজান্তেই তার প্রতি অন্তর থেকে শুভ কামনা উৎসারিত হয়। একটি হাসি এবং একটি কোমল কথার জন্য কিন্তু কোন কিছু ব্যয় করতে হয় না! অনেক মানুষের মুখের   স্নিগ্ধ হাসি এবং মিষ্টি কথা আমার মনে দাগ কেটে আছে। তাদের সাথে হয়ত জীবনে আর দেখা হবে না, কিন্তু হৃদয়ে তাদের স্মৃতি জাগরূক থাকবে। অন্য রকম কিছু মানুষের কথাও মনে আছে।  তাদের কোন ক্ষতি হতো না, যদি একটি হাসির ফুল তারা আমাকে উপহার দিতো, দেয়নি, বরং তাদের মুখের অপ্রসন্নতা আমার অন্তরে কাঁটা হয়ে বিঁধেছে। সেই সব স্মৃতি এখনো ভুলতে পারি না।

ঢাকায় সউদী রাষ্ট্রদূত যথেষ্ট সৌজন্যমূলক আচরণ করেছিলেন এবং সময়সংকটের মুখে খুব দ্রুত আমার ভিসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তবে স্নিগ্ধ একটি হাসি উপহার পেয়েছিলাম জেদ্দায় ইরাকী রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে। সেই হাসিটুকু এখনো আমার বুকে স্নিগ্ধতার পরশ বুলিয়ে দেয়।

প্রিয় পাঠক, হজ্বের সফরনামা হয়ত হাসির ফযিলত বয়ান করার উপযুক্ত ক্ষেত্র নয়। কিন্তু তোমার সঙ্গে অন্যত্র আর দেখা হবে কি না তা তো জানি না। তাই এখানেই তোমাকে বলে রাখলাম, মানুষের প্রয়োজন পুরা করতে পারো বা না পারো, তার সাথে হাসি মুখে কথা বলার চেষ্টা করো। যদ্দুর মনে পড়ে, হাদীছ শরীফে এটাকে ছাদাকা বলা হয়েছে।

আচ্ছা, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি, কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিসাসংক্রান্ত যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে গেলো। এ সময়টুকু আমরা সেখানেই অপেক্ষা করলাম।

আমার সামনে টেবিলের অপর প্রান্তে যে মানুষটি বসা তিনি একটি সম্পদশালী ও সমৃদ্ধ আরব দেশের প্রতিনিধি। তার পোশাকে আরবপরিচয়ের কোন ছাপ নেই, কিন্তু মুখের ভাষা বিশুদ্ধ, যাকে বলে একেবারে কোরআনের আরবী! আচরণেও রয়েছে আরবীয় আভিজাত্যের স্ফূরণ। ঢাকায় ইরাকী রাষ্ট্রদূতকে যেমন দেখেছি, এখানেও দেখলাম, সাবলীল ওঠা-বসা, গতিশীল চলা-ফেরা এবং সৈনিকসূলভ উদ্যম। পক্ষান্তরে সৌদী দূতাবাসে দেখেছি রাজকীয় হালচাল। সবকিছু যেন চলে হেলে দুলে, আয়েশী আন্দাযে। এ পার্থক্যটা আমার চোখে স্পষ্টই ধরা পড়েছে। কোন আয়েশী জাতি কখনো কোন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকবেলা করতে পারে না। আবুধাবিতে দুএকজন আরব শায়খ দেখেছি, সউদী আরবেও দেখেছি; দেখে হতাশ হয়েছি। উদ্যম-উদ্দীপনা নেই, সতেজ-সবল অভিব্যক্তি নেই। মেদবহুল শরীরে কেমন যেন জমাট বাঁধা আলস্য। বাংলাদেশে আমরা একটা কথা বলে থাকি, ভাতের একটা দানা টিপলেই পুরো হাঁড়ির খবর জানা যায়। এটা যদি সত্য হয় তাহলে বলতে পারি, আরব শায়খদের অবস্থা আমার জানা হয়ে গেছে এবং জানা হয়ে গেছে ইরাকী আরবদের অবস্থাও। আরব শায়খরা হয়ত ধার্মিক, তবে ভীষণ অলস। অলস ধার্মিক, কিংবা ধার্মিক অলস। ইরাকীরা -সরকারী পর্যায়ে- ধর্ম থেকে হয়ত অনেক দূরে, তবে সতেজ-সবল, উদ্যমী ও কর্মতৎপর।

ঢাকায় ইরানী রাষ্ট্রদূত, আয়াতুল্লাহ জান্নাতী ও অন্যদের দেখে যদ্দুর বুঝেছি, জাতি হিসাবে ওরা দক্ষ ও পরিশ্রমী এবং নিজেদের ধর্মীয় মতবাদের ভিত্তিতে যথেষ্ট ধার্মিক। তাই ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলছে সেয়ানে সেয়ানে, আর শায়খশাসিত আববদেশগুলো,  মতের ও পথের দুস্তর ব্যবধান সত্ত্বেও, শুধু ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ইরাককে সাহায্য করে চলেছে অকাতরে। ইরাকের যুদ্ধব্যয়ের সিংহভাগই বহন করছে কুয়েত, সউদী আরব এবং আরব আমিরাত। কিন্তু এরা সম্মিলিতভাবে সম্ভবত দশ দিনও টিকে থাকতে পারবে না ইরানের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধে।

আফসোস, তুলনাটা আমাকে করতে হলো মুসলিম দেশগুলোর মাঝে। কারণ অভিশপ্ত ইহুদিরাষ্ট্র ইসরাইল মনে হয় এখন আমাদের কারো শত্রু নয়। এখন আমরা নিজেরাই নিজেদের শত্রু। আরো আশ্চর্য, আমেরিকা এখন ইরাক ও অন্যান্য আরবদেশের খুব কাছের বন্ধু; অর্থ ও অস্ত্রের যোগান যদিও যায় তেল আবিবে!

ইরাক এবং ইরান, দুটি মুসলিম দেশই যখন নিজেদের মাঝে হানাহানি ও রক্তক্ষয় করে দুর্বল ও পর্যুদস্ত হয়ে পড়বে তখন! তখন হয়ত শুরু হবে আসল খেলা! তারপরো যদি হুঁশ ফিরে আলখেল্লাওয়ালাদের!

এই সব কথা ভাবছিলাম মাননীয় রাষ্ট্রদূতের কক্ষে ভিসার কাগজপত্র তৈরী হওয়ার অপেক্ষায় বসে থেকে। চিন্তার জগতে আমি অনেক দূর চলে গিয়েছিলাম, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছাহেব আমাকে জাগালেন, চলুন মেছবাহ, আমাদের কাজ হয়ে গেছে।

মাননীয় রাষ্ট্রদূত উঠে দাঁড়িয়ে উষ্ণ করমর্দন করে বললেন, আমার একান্ত আকঙ্ক্ষা, শায়খ ও তাঁর সফরসঙ্গীদের আমার বাসায় দাওয়াত করি এবং সবার সঙ্গে পরিচিত হই।

খান ছাহেব বললেন, আপনার আকাঙ্ক্ষার কথা শায়খকে আমি জানাবো। আশা করি, তিনিও আপনার সঙ্গে মিলিত হয়ে খুশী হবেন।

এই শেষ কথাটুকু খান ছাহেব না বললেই ভালো করতেন। কারণ হযরতের সফরসঙ্গীদের দ্বিমতের কারণে ইরাকী রাষ্ট্রদূতের দাওয়াত শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি আমাকে যথেষ্ট পীড়া দিয়েছে। আমরা যে দেশ সফর করতে যাচ্ছি সে দেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত আমাদের হযরতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে দাওয়াত দিয়েছেন, সে দাওয়াত গ্রহণ করা আমার মনে হয় সৌজন্যের ন্যূনতম দাবী ছিলো। সেটা আমরা কেন করলাম না, করলে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পথে সেটা কিসের বাঁধা হতো তা আমার বুঝে আসেনি। তবে এ বিষয়ে আগে বেড়ে কিছু বলা আমার কাছে সমীচীন মনে হয়নি, তাই কিছু বলিনি। শুধু ভেবেছি, আমাদের বড় হওয়ার এখনো অনেক দেরি; এখনো আমাদের শেখার অনেক বাকি।

আমার ইরাক সফর নিয়ে অপ্রত্যাশিত এক বিপত্তি দেখা দিলো। হযরত আমাকে একান্তে ডেকে বললেন, তুমি ইরাকে না গেলেই ভালো হয়। আমি হতভম্ব হলাম। বুঝলাম না, কিভাবে কী হলো! কিন্তু সেটা মুহূর্তের জন্য। আমি পূর্ণ ইতমিনানের সাথে আরয করলাম, হযরত! আমি তো বাংলাদেশে ইরাকী ছাফীরকে তখনই বলে এসেছি যে, আমার হযরত অনুমতি দিলে যাবো, নইলে নয়। আজকেও তো আপনার অনুমতিক্রমে আমি জেদ্দা গিয়েছি। আমার যা কিছু আগ্রহ তা হলো আপনার ছোহবত। এছাড়া আমি তো ইরাক সফরের চেয়ে আল্লাহর ঘরে আরো কিছু দিন থাকতে পারাকে অনেক বেশী কিসমতের মনে করি।

হযরত খুশী হলেন এবং জাযাকাল্লাহু বললেন। বলতে বাধা নেই, মনে মনে আমি উৎফুল্লই হয়েছিলাম যে, যাক, আরো কিছু দিন আল্লাহর ঘরে থাকার সৌভাগ্য হবে। কিন্তু মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছাহেব জানতে পেরে বেশ ক্ষুব্ধ হলেন। সম্ভবত বিষয়টিকে তিনি অন্যভাবে নিয়েছিলেন। তিনি কাকে কী বললেন, কিভাবে বললেন, আমার জানা নেই। আমি শুধু ফলাফলটা জানলাম। অর্থাৎ আমার ইরাক সফর যাদের পছন্দ ছিলো না, এখন সেটা তাদের পছন্দ হলো এবং পরের দিন হযরত আমাকে ডেকে বললেন, তুমিও আমার সঙ্গে যাবে। আমি বললাম, জ্বি আচ্ছা, আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো।

বলতে ভুলে গেছি। ইরাকী দূতাবাস থেকে বের হওয়ার পর একটি কুতুবখানায় গিয়েছিলাম। আমার অনুরোধে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছাহেব জেদ্দা শহরের এক বিরাট কুতুবখানায় নিয়ে গিয়েছিলেন।  দোতালা বাণিজ্যিক কুতুবখানা। এত বিশাল হতে পারে কোন কুতুব খানা এবং সেখানে এতো মানুষের সমাগম হতে পারে আমার কল্পনায়ও ছিলো না। আমার ধারণা ছিলো, সউদীরা এখন কিছুই পড়ে না, না ভালো না মন্দ। এখানে এসে সেই ধারণায় কিছু পরিবর্তন করতে হলো।

শিশুসাহিত্য যেহেতু আমার তখনকার প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিলো সেহেতু প্রথমেই আমি রোকনু আদাবিল আতফাল- (শিশুসাহিত্য কর্নার) -এ গেলাম। সেখানে আবার শিশু-কিশোর পত্রিকার আলাদা শাখা। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম আশ্চর্য এক জগত। ইতিপূর্বে আমি শুধু মাজিদ পত্রিকাটির সাথে পরিচিত ছিলাম। এটি শিশু-কিশোরদের সাপ্তাহিক পত্রিকা। এখানে দেখি বিভিন্ন আরবদেশ থেকে প্রকাশিত অসংখ্য আরবী পত্রিকা এবং সবই শিশু-কিশোরদের জন্য। একটি মাসিক পত্রিকা দেখলাম বাসিম নামে। একটি ইরাকী পত্রিকার নাম আল-মিযমার। সিরিয়া থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকা হলো আত্তিফলুল আরাবী (আরবশিশু)। সবকটি পত্রিকার ভাষা আরবী, কিন্তু বিষয়বস্ত্ত! না আরবী, না ইসলামী! আগাগোড়া পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ। মাত্র বিশ পঁচিশ গজের সংক্ষিপ্ত একটি কোণায় দাঁড়িয়েই আমি যেন দিব্য চোখে দেখতে পেলাম, আজকের আরবশিশু কোন পরিবেশে, কোন সংস্কৃতিতে এবং কী মনমানসিকতায় গড়ে উঠছে!  সুতরাং আরবদেশগুলোর আগামী নেতৃত্ব কাদের হাতে যাবে!

একটি পত্রিকায় প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা আছে। বিজয়ী দশজনকে পুরস্কারস্বরূপ আমেরিকার ডিজনি ওয়ার্লড ঘুরিয়ে আনা হবে, এবং পত্রিকাটি সউদী আরব থেকে প্রকাশিত। তবেই বুঝুন! দুঃখের বিষয়, পত্রিকাটির নাম এখন মনে নেই।

একটি পত্রিকা শুধু পেলাম কুয়েত থেকে প্রকাশিত। নাম আত্তিফলুল মুসলিমআরব শিশুমুসলিম শিশু-এর মাঝে কী বিরাট পার্থক্য! চাকচিক্যে ও জৌলুসে, প্রাচুর্যে ও সৌকর্যে এবং প্রচারে ও প্রসারে। আরব শিশু যেন পর্বতচূড়ায়, আর মুসলিম শিশু পাদদেশে!

এখানেই আমি প্রথম দেখতে পাই লেডিবার্ডের শিশু-কিশোর আরবী গ্রন্থ সিরিজ। প্রধানত ইংরেজি থেকে আরবী অনুবাদ এবং আদর্শ অনুবাদ। সকল বিচারেই বইগুলো শিশুদের জন্য। শিশুদের রুচি ও মনমানস অনুযায়ী শিশুদের ভাষায় লেখা। পক্ষান্তরে ইসলামী শিশুসাহিত্যের নমুনাও দেখলাম। লেখা হয়েছে ছোটদের জন্য, তবে বড়দের ভাষায় এবং সবকিছুতেই দৈন্যের ছাপ বড় প্রকট।

একটা বিষয় বাংলাদেশে যা দেখে আসছি এখানেও তাই দেখলাম। যারা ধর্মবিরোধী, কিংবা নিদেনপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ, কলম তাদেরই হাতে এবং সাহিত্য তাদেরই দখলে।

পক্ষান্তরে ইসলামপ্রিয় যারা কলম তাদের দুর্বল এবং সাহিত্যে তারা বে-দখল।

উদাহরণস্বরূপ, রুশসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনুবাদ রয়েছে বাংলায়, তার মধ্যে শিশুসাহিত্যও রয়েছে। ভাষা ঝরঝরে, ছাপা ঝকঝকে! চোখ যেমন জুড়িয়ে দেবে, তেমনি মন-মগজ কেড়ে নেবে।

অনুবাদ ছাড়া মৌলিক শিশুসাহিত্যও তাদের হাতে রচিত হয়েছে প্রচুর। সেগুলোর ভাষা যেমন উন্নত তেমনি বাংলাদেশের বৈষয়িক সামর্থ্যের বিচারে ছাপাও সুন্দর।

পক্ষান্তরে ইসলামী শিশুসাহিত্য সামান্য যা আছে সেগুলোর তুলনায় কোন সাহিত্যই নয়।

এখানে আরবদেশেও একই অবস্থা। উদাহরণস্বরূপ, পাশ্চাত্যের প্রকাশনা সংস্থা শুধু এক লেডিবার্ড আরবী ভাষায় যে শিশু-কিশোর সাহিত্যসম্ভার তৈরী করেছে তার তুলনায় ইসলামী শিশুসাহিত্য কোন হিসাবেই আসতে পারে না। আসলে ওরা জানে শিশু-কিশোরদের মনমানস ও চিন্তা-চেতনা কিভাবে দখল করতে হয়। ওরা জানে, আমরা জানি না। তাই নিরন্তর ওরা এগিয়ে চলেছে, আমরা অলস বসে আছি। ওদের কাছে সাহিত্য হলো সাধনার বিষয়, আমাদের কাছে নিছক লেখার বিষয়।

আমার ভাবি, কিছু একটা লিখলেই সাহিত্য হয়ে যায়, বাতিল সাহিত্যের মোকাবেলায় অতটুকুই যথেষ্ট। আসলেই কি তাই! বিষয়টি কি এত সহজ, এত সরল!

আমার হাতে যদি পয়সা থাকতো তাহলে এখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বই সংগ্রহ করতাম, কিন্তু সাধ ও সাধ্যের সেই চিরকালীন পার্থক্য এখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ালো। অনেক চিন্তাভাবনা করে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছাহেবকে বললাম, তিনি সানন্দে লেডিবার্ডের তিনচারটি বই কিনে দিলেন। আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম। এখন (এই সফরনামা লেখার সময়) আমার কাছে আরবী শিশুসাহিত্যের উপর লেডিবার্ডের শতাধিক বই আছে। কিন্তু এর প্রথম সংগ্রহে ছিলো খান ছাহেবের অবদান, যা আমি ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারবো না। (আরেকটি কথা এখানেই বলে রাখি, আরবী শেখার নামে এসকল ধর্মহীন সাহিত্য কোমলমতি তালিবে ইলমদের হাতে সরাসরি তুলে দেয়া আমি খুবই ক্ষতিকর মনে করি, আমার মতে এগুলো শুধু গবেষকদের ব্যবহারযোগ্য, যারা এ দেশে শিশুকিশোর আরবী সাহিত্যের ময়দানে কাজ করবে।)

পুরো কুতুবখানা ঘুরে ঘুরে দেখার জন্য প্রয়োজন ছিলো পূর্ণ একটি দিন, কিংবা আরো বেশী, কিন্তু কোথায় সে সময়! সুতরাং অতৃপ্ত মন নিয়েই বেরিয়ে আসতে হলো কুতুবখানা থেকে। তবু খান ছাহেবের অনুগ্রহে যা দেখলাম এবং যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম তা আমার কার্যক্ষেত্র-এর জন্য ছিলো অনেক মূল্যবান।

একটি মুবারক সফরে খান ছাহেবের সঙ্গে গড়ে ওঠা এ সম্পর্ক দেশে আসার পর আমারই ব্যর্থতায় রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তিনি অবশ্য তাঁর এক ছেলের শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব আমার যিম্মায় সোপর্দ করেছিলেন। নূরিয়া মাদরাসায় কিছু দিন সে আমার কাছে ছিলো, কিন্তু আমার দ্বারা তার তেমন কোন উপকার হয়নি। তবু এই সফরে যে স্নেহ ও অনুগ্রহ তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি সে জন্য সবসময় আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। কামনা করি, তাঁর জীবনের সায়াহ্নকাল সুখের হোক।

অন্য একটি প্রসঙ্গও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। মিনার দুর্ঘটনায় আমার চশমা হারিয়ে যাওয়ার পর ভীষণ কষ্টে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন হযরতের সফরসঙ্গী মাওলানা ফযলুল হক আমীনী ছাহেব বড় উপকার করেছিলেন। তাঁর কাছে অতিরিক্ত চশমা ছিলো এবং সেটির কাঁচশক্তি মোটামুটি আমার উপযোগী ছিলো। তিনি তাঁর অতিরিক্ত চশমাটি আমাকে দিয়েছিলেন ব্যবহার করার জন্য। যদিও চশমার ফ্রেমটি ছিলো তাঁরই মত, আমার মত নয়, তবু  বড় উপকার হয়েছিলো।  জেদ্দা ও মক্কার কুতুবখানায় যেমন তা  কাজে এসেছে তেমনি কাজে এসেছে ইরাক সফরেও। সবচে বড় কথা, যে কয়দিন আল্লাহর ঘরে ছিলাম এই চশমার সাহায্যেই আল্লাহর ঘর দেখতে পেয়েছিলাম। প্রথম দুদিন চশমা ছাড়া হারাম শরীফে বসে থাকতাম; আল্লাহর ঘর শুধু ঝাপসা দেখা যেতো, তখন আমার শুধু কান্না পেতো, অসহায় মানুষের কান্না। তবে ঐ সামান্য কান্নাও আল্লাহর কাছে পৌঁছেছিলো। বান্দার কোন কষ্টই আল্লাহর অগোচরে থাকে না এবং কোন প্রার্থনাই আল্লাহর সমীপে বৃথা যায় না। বান্দার সব প্রার্থনাই আল্লাহ শোনেন। বান্দার ক্ষুদ্র-বৃহৎ সমস্ত চাহিদাই আল্লাহ পূর্ণ করেন। তাই তো বলা হয়েছে, তোমার সব প্রয়োজন আল্লাহর কাছে চাও, এমনকি জুতার ফিতাও যদি হারিয়ে যায়, সেটা আল্লাহর কাছে চাও।

আমি আমার চশমা হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট আল্লাহর কাছে বলেছিলাম। এ সমস্যার সমাধানের দৃশ্যত কোন উপায় ছিলো না। কিন্তু আল্লাহ যখন সাহায্য করতে চান তখন উপায়ের অভাব হয় না। কিন্তু আমাদের দোষ ঐ একটাই। আমরা আল্লাহর কাছে চাই না, যদিও বা চাই, বড় তাড়াহুড়া করি এবং অল্পতেই বে-ছবর হয়ে পড়ি। আল্লাহর কাছে সবকিছুর জন্য রয়েছে নির্ধারিত সময় এবং সে জন্য অপেক্ষা করতে হয় ছবরের সাথে। সেই ছবর ও ধৈর্যের জন্যও রয়েছে আলাদা আজর, আলাদা পুরস্কার! সুবহানাল্লাহ, মাওলা আমাদের কত মেহেরবান!

 তো দুদিন পর মাওলানা  আমীনী ছাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার চশমা কোথায়? আমি বললাম, দশ-এগার তারিখে কংকর মেরেছি হযরতের সঙ্গে। বার তারিখে গিয়েছিলাম একা, তো শয়তান একা পেয়ে আমার চশমাটা রেখে দিয়েছে।

তিনি মৃদু হাসলেন, কিছু বললেন না। পরের ওয়াক্তে অতিরিক্ত চশমাটি আমাকে দিয়ে বললেন, দেখো তো এটা দিয়ে কাজ চলে কি না? আমি তখন উম্মেহানিতে বসে তাকিয়ে আছি আল্লাহর ঘরের দিকে, কিন্তু কিছুই দেখতে পাই না কালো গিলাফের আবছা ছায়া ছাড়া। চশমাটি পরে ধীরে ধীরে তাকালাম আল্লাহর ঘরের দিকে এবং দেখতে পেলাম আমার আল্লাহর ঘরকে স্পষ্টভাবে, যেমন দেখতে পেতাম এর আগে।

প্রিয় পাঠক! আমার হৃদয়ের সেই মুহূর্তের আনন্দ-উচ্ছ্বাস না তুমি কল্পনা করতে পারবে, না আমি তোমাকে শব্দ দিয়ে বোঝাতে পারবো! শুধু শোনো, সাতরাজার গুপ্তধন পাওয়ার আনন্দ এর সামনে তুচ্ছ! মনে হলো আমি যেন হারানো জীবন ফিরে পেলাম। আল্লাহর ঘরকে আমি যেন আবার প্রথম দেখলাম। সেদিন যদি আমার চশমা না হারাতো তাহলে কিভাবে হতো এত কিছু! আমার হৃদয়-আকাশে এত মেঘ-রোদের খেলা! এই হাসি-কান্না! আল্লাহ যা কিছু করেন বান্দার ভালোর জন্যই করেন। নির্বোধ বান্দা কখনো ভুলে যায় শোকর, কখনো ভুলে যায় ছবর, ফলে যা ছিলো ভালো তা হয়ে যায় মন্দ!

মাওলানা আমীনী ছাহেবকে জাযাকাল্লাহ্ বলে অন্তরের

অন্তস্তল থেকে কৃতজ্ঞতা জানালাম!

মিনায় অবস্থানকালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এখন মনে পড়লো। তাই এখানেই তা উল্লেখ করছি। হযরত খবর পেলেন, হাকীমুল উম্মত থানবী (রহ)-এর খাছ খলীফা হযরত মাওলানা মছীহুল্লাহ ছাহেব হজ্বে তাশরীফ এনেছেন এবং মিনায় কাছাকাছি এক তাঁবুতে অবস্থান করছেন। খবর শুনে হযরত ব্যাকুল হয়ে পড়লেন দেখা করার জন্য। বারবার বলতে লাগলেন, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে চলো।

শুধু একটি ঘটনা যে হতে পারে কত বড় শিক্ষক, নিকট থেকে শুধু একটি ঘটনার অবলোকন যে হতে পারে জীবনের জন্য কত বড় শিক্ষা তা সেই রাত্রে মিনার আলোঝলমল এক তাঁবুতে নতুন করে উপলব্ধি করলাম। আমাদের হযরতের উছিলায় সামান্য সময়ের জন্য আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো সেই জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বকে একঝলক দেখার! সেটাই জীবনের প্রথম দেখা এবং জীবনের শেষ দেখা। তাঁকে আর দ্বিতীয়বার দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমাদের হযরত পরবর্তীতে আমাদেরকে বারংবার তাকীদ করেছিলেন জালালাবাদে হযরতের ছোহবতে যাওয়ার জন্য। যারা গিয়েছেন, ফিরে এসে তারা অনেক প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। আমাদের হযরতের ইনতিকালের পর বারবার মনে পড়েছে তাঁর আদেশের কথা এবং ইচ্ছেও জেগেছে, ভিতর থেকে তাগিদও এসেছে, কিন্তু উপায় হয়ে উঠেনি। জীবনটা আমার এভাবেই পার হয়ে চলেছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে কিছু না কিছু অর্জন করার আমাকে সুযোগ দান করা হয়েছে। অনেক সময় বুঝতে পারিনি, অনেক সময় বুঝেও গ্রহণ করতে পারিনি, আবার গ্রহণ করেও ধরে রাখতে পারিনি। কবির ভাষায়-

বাগানে ফুল তো ফুটেছিলো অজস্র/ বকুলতলায় অনেক ঝরেছে বকুল/ তোমার আঁচল  ছিলো অনেক ছোট/ কপাল ছিলো মন্দ তাই করোনি কবুল!

হযরত আমাদের সবাইকে নিয়ে  সেই তাঁবুতে গেলেন জালালাবাদী হযরতের সঙ্গে দেখা করতে এবং আমাদেরকে দেখা করাতে। সেখানে হাকীমুল উম্মত থানবী (রহ)-এর সর্বকনিষ্ঠ খলিফা মাওলানা আবরারুল হক ছাহেবও ছিলেন। তাঁকে অবশ্য বাংলাদেশে আমাদের হযরতের দরবারে আগেও দেখেছি। হযরতই মূলত তাঁকে বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিতি দান করেছিলেন।

করাচীর হাকীম আখতার ছাহেবও ছিলেন।

উভয় হযরতের মাঝে এমন

আন্তরিকতাপূর্ণ, এমন মুহাববাতপূর্ণ এবং এমন উষ্ণতাপূর্ণ মুছাফাহা ও মুআনাকা হলো যে, সে পবিত্র দৃশ্য আমি সারা জীবনের জন্য অন্তরে গেঁথে রাখার চেষ্টা করলাম।

আমাদের হযরতকে তিনি খুব কাছে বসালেন এবং অতি

অন্তরঙ্গভাবে কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। হযরত একে একে আমাদের সবাইকে মুছাফাহার সুযোগ করে দিলেন। এতটুকু সৌভাগ্যকেই আজ মনে হচ্ছে অনেক বড়। কারণ এমন দুটো কোমল পবিত্র হাত, এখন আর কোথায় পাবো?!

নাহ! কথাটা ঠিক নয়। সময়  কখনো শূন্য হয় না আলো থেকে! সমাজ কখনো বঞ্চিত হয় না আলোকিত মানুষ থেকে!

মানুষ শুধু পড়ে থাকে নফসের ধোকায়। আর নফসের ধোকাও বড় অদ্ভুত! যা হারিয়ে গেছে তা নিয়ে তো আফসোস করায়, কিন্তু যা এখনো আছে দৃষ্টির সীমায় এবং স্পর্শের সীমানায় সে সম্পর্কে করে রাখে গাফেল-উদাসীন।

এ মজলিসেও আলোচনা উঠলো ইরান সফরের। মাওলানা আযীযুল হক ছাহেব দীর্ঘ সময় ধরে যা বললেন তার সিংহভাগ জুড়ে ছিলো, রাষ্ট্রীয় আপ্যায়ন এবং উষ্ণ আতিথেয়তার কথা।  শেষে মাওলানা মছীহুল্লাহ খান ছাহেব কিছুটা বিরক্তির স্বরে বললেন-

এতে কি আসে যায়, আসল কথা হলো, তাদের আকীদা সম্পর্কে কী জেনেছেন?

আমাদের হযরত এখানেও একই কথা বললেন, আমার উদ্দেশ্য ছিলো যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে চেষ্টা চালানো। সুতরাং আমি আমার মনোযোগ সেদিকেই ফিরিয়ে রেখেছিলাম। বাকি শিয়া ফেরকা সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের যা ফায়ছালা আমারও সেই ফায়ছালা।

আমি ভাবলাম, এখনই এ প্রশ্নের এত বাড়ন্ত অবস্থা, তাহলে দেশে যাওয়ার পর?! এমন না হয় যে, মূল কাজ ছেড়ে এই এক প্রশ্নেই হযরতকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তে হলো! কিন্তু হযরতের সফরসঙ্গীদের একথাটা কে বোঝাবে? না কি যা বলার বুঝে শুনেই বলা হচ্ছে!

এরপর আলোচনা শুরু হলো রাজনৈতিক অঙ্গনে হযরতের পদার্পণ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ সম্পর্কে। এ বিষয়ে হযরত অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিজের পদক্ষেপের যৌক্তিকতা এবং তাওবার রাজনীতির তাৎপর্য তুলে ধরলেন।

পুরো বক্তব্য হযরত মাওলানা মাছীহুল্লাহ খান ছাহেব পূর্ণ মনোযোগসহকারে শ্রবণ করলেন, আর মাওলানা আবরারুল হক ছাহেব এবং হাকীম আখতার ছাহেব ... থাক, হজ্বের সফরনামায় অপ্রিয় প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম।

হযরতের বক্তব্যের পর জালালাবাদী হযরত যা বললেন তার খোলাছা হলো-

আমলী সিয়াসাতে (সক্রিয় রাজনীতিতে) হিস্সা নেয়া হাকীমুল উম্মতের পছন্দ ছিলো না। তাছাড়া আপনি এখন বয়স ও স্বাস্থ্যের যে হালাতে আছেন তাতে এ গুরু দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়া কীভাবে সম্ভব হবে?!

 মনে হলো, আমাদের হযরত যেন ভাবলেন, যেহেতু এ বিষয়ে তাঁর শারহে ছদর রয়েছে সেহেতু তিনি তো আপন অবস্থানে অবিচল থাকবেন। সুতরাং আদবের সাথে এ আলোচনা থেকে সরে আসাই উত্তম। তাই তিনি বললেন, জিহাদের ময়দানে এখন তো নেমে পড়েছি, এখন তো পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই।

এরপর যা ঘটলো তা আজকের পৃথিবীতে শুধু আমাদের হযরতের পক্ষেই সম্ভব ছিলো। হযরত তাঁর মুরীদান সকলের সামনে এই বলে বাইআতের আবেদন পেশ করলেন, আপনার হাতে আমি হযরত হাকীমুল উম্মতের বাইআতের তাজদীদ করতে চাই।

আমরা মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম, আর শিক্ষা গ্রহণ করলাম, কিভাবে নিজের আনাকে ফানা করতে হয়! আমাদের হযরত হাত বাড়িয়ে জালালাবাদী হযরতের হাত ধরলেন এবং বাইআত হলেন। হযরতের এ বাইআতের প্রয়োজন ছিলো কি না, আমি জানি না, তবে আত্মবিলোপের এমন মহিয়ান দৃশ্য আবলোকন করার আমাদের প্রয়োজন ছিলো, খুব বেশী প্রয়োজন ছিলো। মনস্তত্ত্বের জগতে যারা গবেষণা করেন তারা অবশ্যই বুঝতে পারবেন, এঘটনার মূল্য কত এবং এর শিক্ষা কত সুদূর প্রসারী?!

আমার অন্তরে সুপ্ত একটি আকাঙ্ক্ষা ছিলো তায়েফে যাওয়া। কারণ তায়েফে বনু সাদের বস্তিতে বিবি হালিমার ঘরে কেটেছে আমাদের পেয়ারা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শৈশব। এই তায়েফের মাটিতেই জড়িয়ে আছে তাঁর নবুয়তি জীবনের অনেক বেদনাদায়ক স্মৃতি। তায়েফের পথে পথে দুষ্কৃতি- কারীদের পাথরের আঘাতে ঝরেছে তাঁর পবিত্র রক্ত। শৈশবে ছোটদের সীরাতগ্রন্থে যখন পড়েছিলাম নবীজীর তায়েফ গমনের ঘটনা তখন আমার শিশুহৃদয়েও অনেক বেদনা জেগেছিলো এবং আমার অবুঝ চোখদুটি থেকে অনেক অশ্রু ঝরেছিলো।

মক্কার লোকেরা যখন আল্লাহর নবীর ডাকে সাড়া দিলো না তখন অনেক আশা নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন তায়েফে, দুধমা বিবি হালিমার দেশে। এ আশায় যে, হয়ত তায়েফ তাঁকে সাদরে গ্রহণ করবে, হয়ত তায়েফবাসী তাঁর দাওয়াত খুশিমনে কবুল করবে। কিন্তু তায়েফ বড় নির্দয়তার পরিচয় দিলো এবং তায়েফীদের নিষ্ঠুরতা মক্কার কোরায়শকেও ছাড়িয়ে গেলো। নবীর দাওয়াত কবুল করা দূরের কথা, আরবদের মেহমানদারির যে সাধারণ ঐতিহ্য সেটাও তারা ভুলে গেলো, এমনকি ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধের পরিচয়ও তারা দিতে পারেনি। নবীজীর পিছনে তারা দুষ্কৃতিকারীদের লেলিয়ে দিয়েছিলো। আর ঐ হতভাগারা পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে নবীজীর দেহ রক্তাক্ত করে  ফেলেছিলো।

বড় বেদনার স্মৃতি জড়িয়ে আছে তায়েফে আমার নবীজীর, আবার তাঁর শৈশবেরও দীর্ঘ চার বছরের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে তায়েফের পল্লীতে বনুসাদ গোত্রের মরুনিবাসে।

বিভিন্ন যুগে হজ্বের সফরে যারা তায়েফ গমন করেছেন এবং তাদের সফরনামায় তায়েফের বিভিন্ন স্থান যিয়ারাতের বিবরণ লিখেছেন সেগুলো পড়ে পড়ে আমার হৃদয় বড় আপ্লুত হতো। কল্পনায় আমিও যেন তাদের সঙ্গী হতাম; আমি যেন দেখতে পেতাম তায়েফের সেই সব অলিগলি যেখানে আমাদের প্রিয় নবী তাঁর বিশ্বস্ত সেবক হযরত যায়দ বিন ছাবিত (রা)কে সঙ্গে নিয়ে অসহায়ভাবে হেঁটেছেন, দুষ্টরা পাথর ছুঁড়ে মেরেছে। হযরত যায়দ প্রাণপ্রিয় নবীকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন নিজে বুক পেতে। তবু নবীজী আহত হয়েছেন, মাটিতে পড়ে গিয়েছেন। রক্তে ভেসে গেছে তাঁর সারা শরীর।

কল্পনার চোখে আমি যেন দেখতে পেতাম সেই আঙ্গুর বাগান যেখানে এসে ক্ষতবিক্ষত দেহে আশ্রয় নিয়েছিলেন পেয়ারা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আর এক দয়াবতী নারী তাঁর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেছিলেন। আঙ্গুর দিয়ে তাঁকে আপ্যায়ন করেছিলেন।

কল্পনার চোখে আমি যেন দেখতে পেতাম তায়েফের সেই মরুপল্লী যেখানে মা হালিমার আদরস্নেহে এবং হালিমার শিশুকন্যা শায়মার মমতার কোলে আমার পেয়ারা নবীর বড় সুখের শৈশব।

কিন্তু তায়েফ যিয়ারাতের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপায় কী? আল্লাহর ইচ্ছায় উপায় হলো একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে। আমার শৈশবের প্রিয় বন্ধু আবুল কালাম কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো সময়ের টানে। লালবাগ মাদরাসার হেফযখানায় আমরা একসঙ্গে পড়েছি। আমাদের দুজনের মাঝে এমন

পবিত্র একটি অন্তরঙ্গতা ছিলো যে, আমরা একজনকে ছাড়া অপরজনের জীবন কল্পনা করতে পারতাম না। কিন্তু শৈশবে যা কল্পনা করতে পারিনি, পরবর্তী- কালে খুব সহজেই তা পেরেছি। অপরজনকে ছাড়া আমাদের উভয়ের জীবন স্বচ্ছন্দে কেটে গেছে। অন্তত আমার তো মনেই পড়েনি যে, শৈশবে আবুল কালাম নামে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অঙ্গ ছিলো এবং সে আমার অতি অন্তরঙ্গ ছিলো।

 হযরত হাফেজ্জী হুযূরের সঙ্গে দেখা করতে এলেন এক ভদ্রলোক। তায়েফে চাকুরি করেন। সেখানেই আছেন দশবছর ধরে সপরিবারে। নাম, প্রিয় পাঠক, তুমি ধরতে পেরেছো নিশ্চয়, ভদ্রলোকের নাম আবুল কালাম!

চমকে উঠলাম! হঠাৎ যেন বিদ্যুৎতরঙ্গ বয়ে গেলো আমার দেহে আবুল কালাম নামটি শুনে! আশ্চর্য! কত রহস্যময় আমাদের  মনোজগত! আবুল কালাম নামটি তাহলে আমি যেমন ভেবেছিলাম, হারিয়ে যায়নি আমার জীবন থেকে! শুধু লুকিয়ে ছিলো মনের অজ্ঞাত কোন অংশে! একটি নাম উচ্চারিত হলো, আর দুটি মৃত শৈশব যেন একসঙ্গে আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠলো! জীবন্ত হলো, কিন্তু শৈশবের মত আপন যেন হলো না। তবু এগিয়ে গিয়ে মুছাফাহা করলাম এবং জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি লালবাগের হিফযখানায় পড়েছেন? আমার আন্দাযের তীর লক্ষ্য ভেদ করলো। তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে! কিছু হয়ত খুঁজলেন আমার মুখাবয়বে, সুদূর শৈশবের কোন কিছু। মনে হলো, অতীতের গহবরে নেমে যাওয়ার একটি সিঁড়ি যেন তিনি পেয়ে গেলেন এবং ঠিক ঠিক পৌঁছে গেলেন হারিয়ে যাওয়া শৈশবে। আবেগকম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি.. তুমি আবু তাহের!? আমি ছিলাম আপনি-এর স্তরে, তিনি নেমে গেলেন আরো গভীরে, তুমি-এর তলদেশে! এর পর আলিঙ্গন, দুই যুবকের শৈশবের আলিঙ্গন।

আমি বলবো বলবো করছি, কিন্তু কুণ্ঠা কাটিয়ে উঠতে পারছি না। এখানেও তিনি এগিয়ে থাকলেন, বললেন, আল্লাহর শোকর, এমন পবিত্র স্থানে তোমার সঙ্গে দেখা হলো। চলো তোমাকে আমি তায়েফ নিয়ে যাবো; পুরো তায়েফ শহর ঘুরিয়ে দেখাবো।

বান্দার পক্ষ হতে সর্বোত্তম শোকর এই যে, বান্দা অন্তর থেকে স্বীকার করে নেবে যে, হে আল্লাহ! তোমার ছোট-বড় কোন নেয়ামতের শোকর আদায় করতে আমি অক্ষম। কীভাবে শোকর আদায় করবে বান্দা! কোন্ কোন্ নেয়ামতের শোকর আদায় করবে! অন্তরে একটি সুপ্ত আকঙ্ক্ষা, যা মুখে উচ্চারণ করিনি, তাও তিনি পূর্ণ করে দিলেন এবং এমন মনোরমভাবে!

হযরতের অনুমতি পাওয়া গেলো সহজেই। হযরত অতীতের স্মৃতিচারণ করে বললেন, কয়েক সফরে তিনি তায়েফ গিয়েছেন। তিনি আরো বললেন, মসজিদে ইবনে আববাসে নামায পড়তে আমার বড় সুকূন ও সাকীনাহ হাছিল হয়েছিলো এবং প্রথমবার তায়েফ গিয়েছিলাম উটের পিঠে সওয়ার হয়ে।

আমার শৈশবের আবুল কালাম আমাকে নিয়ে রওয়ানা হলো তার পঙ্খিরাজে সওয়ার হয়ে। গাড়ীচালনায় তার দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করলো। আমি নিজে তো সাইকেল চালাতেও জানি না। তাই খানিকটা ঈর্ষা হলো। আমি তো এখন হুযূর। আর আমাদের দেশে কোন হুযূর গাড়ী ড্রাইভ করবে, এমন খতরনাক বিদআতের কথা কল্পনাও করা যায় না। একজন হুযূর বড় জোর নদীতে নেমে গোসল করতে পারে, কিন্তু সাঁতার কাটা! তওবা!

আমরা নাকি মুজাহিদ নবীর ওয়ারিছ! অথচ মেদভুঁড়ি এখন আমাদের প্রধান সমস্যা!

গাড়ী চলছে ঝড়ের বেগে। আমরা পরস্পরের ব্যক্তিগত জীবনের খোঁজ-খবর নিলাম। আবুল কালাম এখানেও এগিয়ে। বিয়ে করেছে বেশ কবছর হলো। বরিশালের মেয়ে, শশুর বরিশালের কোন এক আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক। সে নিজেও নাকি আলিয়া পাশ। চেহারা-সুরতে অবশ্য তা বোঝা যায় না। দুই ছেলে এক মেয়ে।

তার জিজ্ঞাসার জবাবে আমি বললাম, আমার ভাই গরিবানা হালত। বিয়ে করেছি দুবছর হয় কি হয় না! একটি মেয়ে আল্লাহ দান করেছেন রামাযানের আগে। আর আমার মনে হয়, এ লক্ষী মেয়ের বরকতেই আমি আজ আল্লাহর ঘরে।

আবুল কালাম বললো, আসলেই মা-বাবার জীবনে মেয়েরা লক্ষী হয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং তাদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে। তারপরো কেন যে সব মা-বাবা ছেলে, ছেলে করে মাথা খোঁড়ে! আমাকেই দেখো, চাঁদের টুকরো মেয়ে আমার যেদিন মায়ের কোল আলো করলো সেদিন থেকে আমার সৌভাগ্যের শুরু। খুব কষ্টে ছিলাম। মেয়েটি জন্মগ্রহণ করার কয়েকদিন পরেই বর্তমান চাকুরিটা পেলাম একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে কোন রকম তদবীর ছাড়া। আগের তুলনায় এখানে বেতনও কয়েকগুণ বেশী।

আমি কথা বলছিলাম, কিন্তু আমার দৃষ্টি ছিলো বাইরে মরুভূমিতে। সেই একই দৃশ্য;বালুর সাগর এবং কালো পাথরের পাহাড়, পাহাড়ের অনিঃশেষ শ্রেণী। কিন্তু যতই দেখি, মনে হয়, নতুন করে দেখছি! ক্লান্তিহীন দৃষ্টি যেন

অন্তহীন পিপাসা নিয়ে শুধু দেখেই যেতে চায় হিজাযের দৃশ্য। কারণ হিজাযের সঙ্গে যে আমাদের প্রাণের সম্পর্ক এবং আত্মার বন্ধন! জন্ম আমার সবুজ শ্যামল জলভরা বাংলাদেশে, কিন্তু মন আমার বিভোর হিজাযের স্বপ্নে! আমি ভালোবাসি জলবৃক্ষহীন বালুর মরুভূমি! আমি ভালোবাসি উটের কাফেলা এবং হুদির সুর! আমি ভালোবাসি দিগন্ত আড়াল করে রাখা পর্বতশ্রেণী, ভালোবাসি সেই পর্বতশিখরে সূর্যের উদিত হওয়া এবং অস্ত যাওয়া!

একসময় চেকপয়েন্ট এসে গেলো।  আবুল কালাম আমার পাসপোর্ট নিয়ে নেমে গেলেন এবং অল্পক্ষণ পরই ফিরে এলেন। কোন সমস্যা হয়নি। আমরা নির্বিঘ্নে সামনে অগ্রসর হলাম। মক্কা-তায়েফ পুরোনো যে রাস্তা সেটা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ পথ। বর্তমানে তা পরিত্যক্ত। এটি মক্কা-তায়েফ নতুন সড়ক। দূরত্ব অপেক্ষাকৃত কম এবং বেশ ঝকঝকে মসৃণ ও আরামদায়ক। বর্তমান সউদী আরবের সড়কপথই এখন এরকম আয়নার মত স্বচ্ছ। যখন রোদের আলো পড়ে তখন চলন্ত গাড়ীর ছবি দেখা যায় সড়কের আয়নায়। গাড়ী চলছে তীব্র গতিতে। কিছুক্ষণ পরই সবুজের দেখা পেতে শুরু করলাম। দুপাশে বিভিন্ন সবজীর বিস্তীর্ণ বাগান। বাংলাদেশী এবং ভারতীয়রাই এখানে বেশীর ভাগ কাজ করে। আরো কিছু দূর গিয়ে দেখতে পেলাম আঙ্গুর ও অন্যান্য ফলের বাগান। সে এক মনোরম দৃশ্য! মক্কা-মদীনার সবজী ও ফলফলাদির বেশীর ভাগ চাহিদার যোগান যায় এখান থেকেই। সম্প্রতি সউদী আরবের অন্যান্য স্থানেও নাকি ব্যাপক কৃষি-চাষের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রচুর গম উৎপন্ন হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার দৃঢ় ইচ্ছা সউদী সরকারের। শুভ ইচ্ছা। খাদ্যে পরনির্ভরশীল দেশকে জিম্মী থাকতে হয় আন্তর্জাতিক মর্জির কাছে। বাঁচতে হলে গম চাই; তেলকে বলা হয় তরল সোনা, ঠিক আছে, কিন্তু তেল খেয়ে তো বাঁচা সম্ভব নয়। আসলে আগামী পৃথিবীতে যে যুদ্ধটা হবে সেটা হবে পানি ও খাদ্যের। সুতরাং গোটা মুসলিমবিশ্বকেই পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে যথাসম্ভব দ্রুত খাদ্যে ও পানিসম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। আরেকটা কথা বলে তো আর লাভ নেই; এ যুগে কেনা অস্ত্রে যারা যুদ্ধ জয় করতে চায় তারা আসলেই বোকার স্বর্গে বাস করে।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 

advertisement