মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম - নগরকান্দা, ফরিদপুর

৫১৬৮. প্রশ্ন

মুহতারাম, আমাদের গ্রামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন যাবৎ খৌরকার্যে অক্ষম অবস্থায় অসুস্থ। এখন তার কোনো স্ত্রীও বেঁচে নেই, যে তার এই খেদমতটুকু করে দেবে। আর সে নিজেও সম্পাদনা করতে অক্ষম। এখন মুফতী সাহেবের নিকট জানার বিষয় হল। এই খেদমতটুকু অন্য কেউ করে দিতে পারবে কি না। দলীলসহ জানালে উপকৃত হতাম।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার গ্রামের সেই অসুস্থ ব্যক্তি নিজের ক্ষৌরকার্যের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কোনো লোমনাশক ক্রীম ব্যবহার করতে পারেন। এভাবে পরিষ্কার করতে পারলে অন্যকে দিয়ে এ কাজ করানো জায়েয হবে না। কেননা নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কারো সামনে সতর খোলা বৈধ নয়। আর যদি এভাবেও পরিষ্কার করতে না পারেন কিংবা পরিষ্কার করতে পারলেও লোমনাশক ক্রীম ব্যবহার করা তার জন্য ক্ষতিকারক হয় তাহলে কোনো পুরুষের মাধ্যমে তিনি এ কাজটি করাবেন। এক্ষেত্রে সাহায্যকারী নিজ হাতে গ্লাভস বা কোনো কাপড় পেঁচিয়ে নেবেন।

-কিতাবুল আছল ২/২৩৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৩২; আলইখতিয়ার ৪/১০৯; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ৩/২১; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৮/৯৮; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৭১

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ কামরুজ্জামান - রাজার হাট, মোল্লাপাড়া যশোর

৫১৬৭. প্রশ্ন

আমাদের এলাকায় কারও জন্মবার্ষিকী এবং মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার প্রচলন খুবই কম। কিছুদিন আগে ঢাকার একজন আলেম বয়ানের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ সকল মানুষের মৃত্যুবার্ষিকী ও জন্মবার্ষিকী পালন করা জায়েয বলে ফতোয়া দেন। এতে আমাদের এলাকায় সকলে একটা দ্বিধা-দ্বেদ্ব পড়ে যায়। সুতরাং উক্ত সমস্যার সমাধানকল্পে শরীয়াতের দলীল উল্লেখ করে আমাদেরকে উপকৃত করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত আলেমের কথা ঠিক নয়। জন্মবার্ষিকী-মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা এবং একে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ইসলামের শিক্ষা নয়। এগুলো বিজাতীয় সংস্কৃতি। এসকল অহেতুক কাজ থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা আবশ্যক। শরীয়তে জন্ম দিবস বা মৃত্যু দিবসের আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষভাবে এই দিনে কোনো ধরনের আমল বা ইবাদতের বিধান নেই।

আর মৃতব্যক্তিদের জন্য ঈসালে সাওয়াব করা শরীয়ত স্বীকৃত। তবে এর জন্য কোনো দিনক্ষণ নির্দিষ্ট নেই। বরং যে কোনো সময় বা দিনে নফল নামায, দান-সদকা, দুআ ইত্যাদির মাধ্যমে ঈসালে  সাওয়াব করা যেতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে করলে বিশেষ সাওয়াব পাওয়া যাবে- এমন নয়। সালাফে সালেহীন তথা স্বর্ণযুগেও নির্দিষ্ট দিনে মৃতের জন্য এ ধরনের ঈসালে সাওয়াবের আয়োজন করার কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং জন্মদিবস, মৃত্যুদিবস পালন বা এ সংক্রান্ত কোনো অনুষ্ঠান শরীয়তসম্মত নয়।

তেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মদিবস ও ওয়াফাতদিবস পালন করাটাও শরীয়তের কোনো দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়। এটা যদি জায়েয হত তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরে সাহাবায়ে কেরামই সর্বাগ্রে করতেন। কারণ নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁদের মহব্বত পরবর্তীদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি ছিল। কিন্তু এই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের পদ্ধতি যেহেতু তাদের ভালোভাবে জানা ছিল তাই তারা এর জন্য ঐসকল পন্থাই অবলম্বন করেছেন, যেগুলো সুন্নাহ-নির্দেশিত। কোনো একজন সাহাবী থেকেও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য জন্মদিবস ও ওফাতদিবস পালন করার কথা প্রমাণিত নেই। তদ্রূপ তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনের যুগেও এর কোনো চর্চা ছিল না।

প্রকাশ থাকে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় রহমত ও সাআদাত। তাঁকে স্মরণ করে তাঁর জন্য দুআ করা এবং দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা একদিকে যেমন ইবাদত অপরদিকে আমাদের জীবনে বরকতেরও কারণ। এবং তাঁর জীবনাদর্শ আলোচনা করে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করা তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তা হতে হবে সে পদ্ধতিতে, যা সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। আর কোনোক্রমেই এ আমলগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট মাস বা দিনের সাথে সম্পৃক্ত করে নেয়া যাবে না; বরং তা হবে মুমিনের জীবনের অংশ। সে প্রতিদিনই নামাযের বাইরেও সাধ্যানুযায়ী আল্লাহর রাসূলের উপর দরূদ শরীফ পড়বে। এবং নিজ জীবনকে তাঁর আদর্শ ও এবং সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত করবে। এতেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি তার মহব্বতের প্রমাণ মিলবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন-

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِیْ یُحْبِبْكُمُ اللهُ وَ یَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ  وَ اللهُ غَفُوْرٌ رَّحِیْم.

আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ  তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা আলে ইমরান (৩) : ৩১)]

-সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৯৭; শরহে মুসলিম, নববী ১২/১৬; আলমাদখাল, ইবনুল হাজ ২/২, ৩/২৭৯; আলইতিসাম, শাতিবী ১/৫০; ফিকহুন নাওয়াযিল ২/১১০; ইমদাদুল মুফতীন, পৃ. ১৫১

শেয়ার লিংক

হানীফ - সিলেট

৫১৬৬. প্রশ্ন

আমি পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করি। টিউশনি থেকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে প্রয়োজন পূর্ণ করার পর অবশিষ্ট টাকা ব্যাংকে জমা রাখি। এভাবে ৫৫ হাজার টাকা জমা হয়েছে। তিন মাস আগে এক বন্ধুর একটি বিপদে এই টাকাগুলো তাকে ঋণ দিয়েছি। বর্তমানে আমার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো সম্পদ নেই।

জানার বিষয় হল, এ অবস্থায় আমার উপর কি কুরবানী ওয়াজিব? কুরবানী করতে হলে আমাকে ঋণ নিয়ে কুরবানী করতে হবে। এখন আমার করণীয় কী? মাসআলাটির সমাধান জানালে কৃতজ্ঞ হব।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার কর্তব্য, আপনার বন্ধুর কাছ থেকে এ পরিমাণ টাকা ফেরত চাওয়া, যা দিয়ে আপনি কুরবানী করতে পারেন। যদি তিনি তা দেন তাহলে তা দিয়ে কুরবানী করা ওয়াজিব হবে। আর যদি  তিনি তা না দেন আর আপনার কাছে কোনো জায়গা থেকে কুরবানীর সমপরিমাণ টাকা হস্তগতও না হয় তাহলে কুরবানীর শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। শেষ পর্যন্ত যদি কুরবানী দেওয়ার মত কোনো সম্পদ আপনার হাতে না থাকে তাহলে আপনাকে ঋণ নিয়ে কুরবানী করতে হবে না।

-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬; ফাতাওয়া বাযযাযিয়াহ ৬/২৮৬; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

শেয়ার লিংক

আব্দুল্লাহ আবরার - জামালপুর

৫১৬৫. প্রশ্ন

একজন আমার মাধ্যমে কবর যিয়ারত করিয়েছে এবং আমার মাধ্যমে কুরআন খতম করে সওয়াবরেসানী করেছে। পরবর্তীতে সে আমাকে বলল, আপনি অনেক কষ্ট করেছেন- এ বলে কিছু টাকা দিল। এখন আমার জন্য তা নেওয়া বৈধ হবে কি? আরেকজন উক্ত কাজ করিয়ে সে বলল, কিছু হাদিয়া দিতে চাই। আমি বললাম, তা জায়েয নেই। আমার জানার বিষয় হল, আমার কষ্টের বিনিময়ে আমাকে একজন কিছু খাওয়াল বা হাদিয়া দিল তা জায়েয না হওয়ার কারণ কী?

উত্তর

মৃত ব্যক্তির সওয়াবরেসানীর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত কষ্ট বা পরিশ্রম হলেও এর বিনিময়ে কোনো কিছু গ্রহণ করা জায়েয নেই। কারণ এটি এমন কাজ, যা বিনিময়যোগ্য নয়। এক্ষেত্রে কষ্টের বিনিময়ে সওয়াব ও প্রতিদান পাওয়া যাবে। দুনিয়াতে এর বিনিময় নেওয়া যাবে না। হাদীস শরীফে কুরআন তিলাওয়াত করে বিনিময় গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-

اقْرَءُوا الْقُرْآنَ، وَلَا تَأْكُلُوا بِهِ...

তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর। তবে এর বিনিময় গ্রহণ কোরো না। ...। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৫৩৫)

-বাদায়েউস সানায়ে ৪/৪৬; তানকীহুল ফাতাওয়াল হামিদিয়্যা ২/১৩৮; আলফাতাওয়াল খাইরিয়্যা ২/৩৪১; মাজমূআতু রাসাইলি ইবনি আবিদীন, পৃ. ১/১৬৯

শেয়ার লিংক

কেফায়াতুল্লাহ - বংশাল, ঢাকা

৫১৬৪. প্রশ্ন

জনাব মুফতী সাহেব! আমার জানার বিষয় হচ্ছে, সরকার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর আওতায় বিভিন্ন সময় চারাগাছ ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করে থাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবচেকম রেটে যারা চারাগাছ দিতে পারবে জানিয়ে দরপত্র দাখিল করে- সরকার তাদেরকেই প্রাধান্য দেয়। এক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকম হয় যে, বিভিন্ন নার্সারি থেকে কাক্সিক্ষত পরিমাণ বৃক্ষচারা যদি দশ টাকা করে সংগ্রহ করার সুযোগ থাকে তাহলে লাভ হিসেবে তার সঙ্গে -ধরা যাক- আরো দুই টাকা যোগ করে প্রতিটি চারাগাছের মূল্য ১২ টাকা নির্ধারণপূর্বক আবেদনপত্র পেশ করা হয়। কিন্তু সরকারের তরফে আবেদন মঞ্জুর হওয়ার জন্য এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাথে আরো দুই টাকা সংযুক্ত করে দরপত্রে বৃক্ষমূল্য ১৪ টাকা উল্লেখের কথা বলে। ফলে সরকার বৃক্ষ প্রতি ঠিকই ১৪ টাকা দাম পরিশোধে চুক্তিবদ্ধ থাকে। কিন্তু আমার হাতে আসে ১২ টাকা। বাকি দুই টাকা কর্মকর্তারা আনুষঙ্গিক কাজের জন্য কমিশন ফি হিসেবে কেটে রাখে। ক্ষেত্রবিশেষ দেখা যায়, অন্য যারা দরপত্র দাখিল করেছে তাদের মধ্যে আমার দেয়া ১৪ টাকাই সর্বনিম্ন রেট। বাকিদেরটা হয়ত ১৫ টাকা বা তারও ওপরে। এমতাবস্থায় প্রকৃত দামের বাইরে বৃক্ষপ্রতি ঐ দুই টাকা দিতে রাজী হলে কর্মকার্তারা আমার আবেদনকে অগ্রাধিকার দেয়ার আগ্রহ দেখায়। তো আমার জন্য কি এই শর্ত মেনে টেন্ডার গ্রহণের অবকাশ আছে? বিশেষ করে অন্যদের চেয়ে আমার রেট যখন তুলনামূলক কম। তাছাড়া আমি এই টেন্ডার না নিলেও অন্যদেরকে অনুরূপ কমিশন প্রদানের শর্তেই তো দেবে?!

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লোকদের কমিশন দেওয়ার শর্তটি নাজায়েয, যা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। আর ঘুষ দেওয়া-নেওয়া নাজায়েয। সবাই এভাবেই নেয়, বা নিজে না নিলেও অন্যরা এভাবেই নেবে- এসব অজুহাতে ঘুষ দিয়ে দরপত্র দাখিল করা জায়েয হবে না। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য উক্ত দুই টাকা করে নেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয। এটা কুরআনুল কারীমে নিষিদ্ধ الأكل بالباطل তথা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণেরই একটি পন্থা। কেননা, যাবতীয় দাপ্তরিক কাজ আঞ্জাম দেয়া- এসকল কর্মকর্তাদের সাধারণ দায়িত্ব। এর জন্য তো তারা বেতন-ভাতা পেয়েই থাকে। এ বাবদ বাড়তি টাকা প্রদানের শর্ত করার অর্থ, ঘুষ দাবি করা। আর হাদীস শরীফে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ الرّاشِيَ وَالمُرْتَشِيَ.

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়কেই লানত করেছেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৩৩৭

অতএব এধরনের কারবারে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকাই কর্তব্য।

উল্লেখ্য, এসব ক্ষেত্রে আসল করণীয় হচ্ছে, অন্য যে যাই করুক নিজে কমিশন দেওয়া থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থাকা। কমিশন না দিয়ে কীভাবে দরপত্র পাওয়া যায়- সে পন্থা অবলম্বন করা। এভাবে সবাই ব্যক্তি পর্যায়ে এটা করতে থাকলে ধীরে ধীরে গণসচেতনতা তৈরি হবে। টেন্ডার বাণিজ্যসহ এ ধরনের সবরকম অন্যায় লেনদেনের বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট গড়ে তুলতে পারলে একসময় পরিবর্তন আসবেই ইনশাআল্লাহ।

-আলজামে লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবী ২/২২৫; ফাতহুল কাদীর ৬/৩৭১; রদ্দুল মুহতার ৫/৩৬২; শরহুল মাজাল্লা, আতাসী ৬/৪১

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ আবুল কাসেম - পাঁচকাহনীয়া, কিশোরগঞ্জ

৫১৬৩. প্রশ্ন

মুহতারাম, বিনীত নিবেদন এই যে, আমাদের এলাকায় খাস বা সরকারি অনেক নদী-নালা, খাল-বিল আছে। এর চারপাশে মালিকানাধীন ফসলী জমি। বর্ষাকালে বর্ষার পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। নদী-নালা, খাল-বিলগুলো দুই পদ্ধতিতে ভোগ করা হয় :

১. কিছু নদী-নালা, খাল-বিল সরকার থেকে নিয়ম মুআফেক লিজ নেওয়া হয়।

২. কিছু এলাকার গণ্যমান্য সরকারি স্থানীয় প্রতিনিধি উপজেলা চেয়াম্যান-এর সম্মতিতে মসজিদ-মাদরাসার নামে লিজ দেওয়া হয়। আমার জানামতে যা সরকারি আইন পরিপন্থী। এর থেকে যে টাকা অর্জিত হয় তা মসজিদ-মাদরাসার উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। লিজ দেওয়া ও নেওয়ার কারণে গরীব-গোরাবা ও সাধারণ মানুষ বর্ষার পানির মুক্ত মাছ ধরা থেকে বঞ্চিত হয়।

উল্লেখ্য, নদী-নালা, খাল-বিলে মাছ আসা এবং থাকার জন্য ইজারাদারগণ বাঁশ, গাছের ডাল এবং খাবার ইত্যাদি দিয়ে থাকেন।

এখন জানার বিষয় হল :

১। লিজ দেওয়া-নেওয়া শরীয়তসম্মত কি না? থাকলে এর পদ্ধতি কী?

২। বিবরণে উল্লিখিত উভয় পদ্ধতিতে লিজ দেওয়া-নেওয়া  বৈধ হচ্ছে কি না?

৩। উক্ত লিজের টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, ইমাম, মুআযযিন, খাদেম, শিক্ষকগণের বেতন ও প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো কাজে ব্যয় করা বৈধ হবে কি না? না হলে এর বৈধতার উপায় কী?

৪। লিজের মাধ্যমে অর্জিত মসজিদের টাকা কেউ যদি মসজিদ কমিটি থেকে এই বলে নিয়ে যায় যে, মসজিদের নামে খাল-বিলের  লিজের কাগজ-পত্র সরকার থেকে ব্যবস্থা করে দেবে। অতঃপর  সে নিজেই তা আত্মসাৎ করে, তবে এর জন্য দায়ী কে- মসজিদ কমিটি, না গ্রহিতা?

৫। মুক্ত পানির মাছ ধরতে ইজারাদাগরণ সাধারণ মানুষকে বাধা দেওয়ার অধিকার রাখে কি না?

৬। মালিকানাধীন জমি ইজারাদারগণ ব্যবহারের অধিকার রাখে কি না? রাখলে এর সীমা কতটুকু?

৭। সরকার থেকে সল্পমূল্যে লিজে এনে  বেশি মূল্যে সাধারণ মানুষের নিকট লিজে দেওয়া শরীয়তসম্মত কি না? থাকলে এর শর্ত কী?

৮। এলাকার কিছু প্রভাবশালী লোক দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে হাওড়ের অপরের মালিকানাধীন কিছু জমি বর্ষাকালে মুক্ত মাছ ধরার জন্য লিজ দিয়ে ভোগ করে আসছে। শরীয়তে এর বৈধতা আছে কি না? থাকলে এর পদ্ধতি কী?

অতএব, মুফতী সাহেবের নিকট আকুল আবেদন এই যে, উল্লিখিত প্রশ্নাবলীর উত্তর প্রদান করে কৃতজ্ঞ করবেন।

উত্তর

১. লিজ বা ইজারা শরীয়ত স্বীকৃত বৈধ একটি কারবার। এর বিধি-বিধান সুবিস্তৃত। ব্যক্তি নিজ মালিকানাধীন জায়গা এবং সরকার রাষ্ট্রের মালিকানাধীন ভমি লিজ দিতে পারে। -আলমাবসূত, সারাখসী ১৫/৭৪; আলইখতিয়ার ২/১২১

২. ও ৫. নদী থেকে উপকার গ্রহণের অধিকার সকলের। তাই ইসলামে নদী লিজ দেওয়ার বিধান নেই। আর সরকারী আইনেও নদী লিজ দেওয়া নিষিদ্ধ।

আর ব্যক্তি মালিকানাহীন সরকারি বিলও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখাই উচিত। বিশেষত যেসব খাল-বিলের সঙ্গে সাধারণ জনগণের স্বার্থ জড়িত, সেগুলো কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দিয়ে দেওয়ার অবকাশ ইসলামে নেই। অবশ্য যদি কোনো খাল-বিল ছোটখাটো হয় এবং তা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লিজ দিলে বড় জনগোষ্ঠীর কষ্টে পড়ার আশংকা না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে সরকার, দেশ ও জনগণের কল্যাণে এগুলো লিজ দেওয়ার অধিকার রাখে। এভাবে বিধি মোতাবেক লিজ নেওয়ার পর সেখানে মাছ চাষ করার জন্য ইজারাদাররা ব্যবস্থা নিলে অন্যদের জন্য ওই জায়গা থেকে মাছ ধরা বৈধ হবে না।

আর সরকার কিংবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া যেহেতু অন্য কেউ এসব খাস খাল-বিল লিজ দেওয়ার অধিকার রাখে না, তাই প্রশ্নের বর্ণনা মতে এলাকার সেসব লোক থেকে সেগুলো লিজ বা ভাড়া নেওয়া বৈধ হবে না। নিলে অন্যায়ভাবে সরকারি সম্পদ ভোগ করা হবে। মসজিদ-মাদরাসার লিজ নেওয়ার প্রয়োজন হলে বৈধ পন্থায় সরকার থেকে লিজ নেবে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩০৮২; কিতাবুল আছল ৮/১৫২; আলমাবসূত, সারাখসী ২৩/১৬৩; আননুতাফ ফিল ফাতাওয়া পৃ. ৩৮২; আলমুহীতুল বুরহানী ৮/১২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩৭০, ৩৯০

৩. ও ৪. প্রশ্নকারীর মৌখিক বর্ণনা অনুযায়ী মসজিদ কর্তৃপক্ষ প্রথমত এলাকার সেসব লোকের (অননুমোদিত ব্যক্তিবর্গ) অনুমতি নিয়ে এসব খাস খাল-বিলের অংশবিশেষ দখল করে। এরপর তা অন্যের কাছে ইজারা দেয়। এমনটি হয়ে থাকলে এ ভাড়ার টাকা সম্পূর্ণ হারাম। এ টাকা মসজিদ-মাদরাসায় ব্যয় করা যাবে না। এগুলো গরীবদের সদকা করে দিতে হবে। অতএব প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে মসজিদের এ টাকাগুলো যদি লিজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কেউ আত্মসাত করে থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হল তা উদ্ধার করে এর দায় থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৬. ইজারাদাররা যতটুকু জমি যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে বৈধ পন্থায় ভাড়া নিয়েছে/নেবে ততটুকু জমি ব্যবহার করতে পারবে। অন্যের মালিকানাধীন জমি ব্যবহার করার অধিকার তাদের নেই।

৭. এ ধরনের লিজ সাধারণত হস্তান্তর নিষিদ্ধ থাকে। তাই নিজে গ্রহণের পর তা অন্য কাউকে দেওয়ার অবকাশ নেই।

৮. না, শরীয়তে এই জবরদখলের বৈধতা নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَنْ أَخَذَ شَيْئًا مِنَ الأَرْضِ بِغَيْرِ حَقِّهِ خُسِفَ بِهِ يَوْمَ القِيَامَةِ إِلَى سَبْعِ أَرَضِينَ.

যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো সামান্য জমিও দখল করবে, কেয়ামতের দিন তাকে (শাস্তিস্বরূপ) সাত জমিন পর্যন্ত ধ্বসিয়ে দেওয়া হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩১৯৬)

শেয়ার লিংক

রেজওয়ান সিদ্দীক টিপু - ক্যান্টনমেন্ট, কুমিল্লা

৫১৬২. প্রশ্ন

কিছুদিন আগে আমি ওয়ালটনের একটি ফ্রিজ ক্রয় করি। তখন ওয়ালটনের একটি ছাড় চলছিল। (এখনও চলছে) এর নাম হল ক্যাশভাউচার। ফ্রিজ ক্রয়ের পর নিয়ম অনুযায়ী আমি দোকানে লাগানো ওয়ালটনের বারকোডের উপর মোবাইল ফোন স্ক্যান করে নাম দেওয়ার পর আমার ফোনে সাতশত টাকা চলে আসে। টিভি, ফ্রিজ, এসিসহ নির্দিষ্ট কিছু পন্যে ওয়ালটন ক্রেতাদের এ সুবিধা দিচ্ছে। তাদের লিফলেট অনুযায়ী এবং দোকানীদের কথা অনুযায়ী ৩০০ টাকা থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ক্রেতারা এ সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে এ টাকা ঐসব দোকান থেকে নগদ ওঠানো যায় না। বরং ওয়ালটনেরই অন্য কোনো পণ্য কিনলে ঐ পরিমাণ টাকা কম নেওয়া হয়। তাই আমিও ঐ সাতশত টাকার সাথে আরো কিছু টাকা দিয়ে একটি আয়রন ক্রয় করে ফেলি।

মুহতারামের কাছে জানতে চাই, ক্রেতাদের জন্য ওয়ালটন ক্যাশভাউচারের নামে যা দিচ্ছে তা নেওয়া জায়েয হবে কি না? আর আমি যে ঐ টাকা দিয়ে আয়রণ ক্রয় করেছি তা জায়েয হবে কি না? দয়া করে সঠিক উত্তর জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে উক্ত কোম্পানী ক্যাশভাউচার স্বরূপ যে টাকা দিচ্ছে তা নেওয়া এবং এর বিনিময়ে আয়রণ মেশিন ক্রয় করা দুই শর্তে বৈধ হবে :

১. অফারের কারণে পণ্যের দাম বাড়ানো যাবে না।

২. শুধু পুরস্কার পাওয়ার আশায় পণ্য ক্রয় না করা। অর্থাৎ পণ্য উদ্দেশ্য না হয়ে বরং পুরস্কার মূল উদ্দেশ্য- এমন না হওয়া।

উল্লেখ্য, ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ইসলামী বাণিজ্যনীতি হল, পণ্যের দাম সুনির্ধারিত থাকা এবং মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করা। তা না করে মূল্যের কিছু অংশ পুরস্কার নামের লটারীর সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা, লাখ টাকা/কোটি টাকার লোভ দেখিয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা ইসলামী বাণিজ্যনীতি পরিপন্থী। পুঁজিবাদের আবিষ্কৃত এসব নীতি বাজারকে অসাধু পন্থায় প্রভাবিত করে থাকে। মুসলমানদের উচিত এহেন কাজ থেকে বিরত থাকা।

-মাআলিমুস সুনান ৩/৪০০; ফিকহুন নাওয়াযিল ৩/১১৬; বুহুস ফী কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুআসিরাহ ২/১৫৮

শেয়ার লিংক

হুমায়ন সিকদার - গোপালগঞ্জ

৫১৬১. প্রশ্ন

আমি এক বাড়িতে পাহারাদারির কাজ করি। প্রতিদিন সকালে গেটের সামনে ঝাড় দিই। পাশের বিল্ডিংটি ছোট হওয়ায় সে বাড়ির মালিক কোনো পাহারাদার রাখেনি। তার বাড়ির সামনে নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে ময়লা থাকে। একদিন তিনি আমাকে এ প্রস্তাব দিলেন, ‘তুমি যখন তোমাদের বাড়ির সামনে ঝাড় দেবে তখন আমারটাও দেবে। আমি তোমাকে প্রতি মাসে ৪০০ টাকা দিব।মালিককে না জানিয়ে আমি তার এই প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রতিদিন তার বাড়ির সামনে ঝাড় দিচ্ছি। এতে কোনো অসুবিধা আছে কি?

উত্তর

মালিককে না জানিয়ে উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা ঠিক হয়নি। এটি খেয়ানতের শামিল। তাই আপনার কর্তব্য হল, বিষয়টি মালিককে জানিয়ে তার অনুমতি হলে কাজটি করা। যদি অনুমতি না পাওয়া যায়, তাহলে কাজটি ছেড়ে দেবেন।

-তাবয়ীনুল হাকায়েক ৬/১৪৩; আননুতাফ ফিল ফাতাওয়া পৃ. ৩৪০; দুরারুল হুক্কাম ফী শরহি গুরারিল আহকাম ২/২৩৬; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/৩৮; শরহুল মাজাল্লা, আতাসী ২/৪৮২

শেয়ার লিংক

মুনীরুল আমীন আল-মুশতাক - নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

৫১৬০. প্রশ্ন

আমাদের এলাকায় মসজিদে জুমার দিন বয়ানের পর দ্বিতীয় আযানের পূর্বমুহূর্তে মসজিদের মিম্বার থেকে মসজিদের দানকৃত পণ্যসমূহের নিলাম বিক্রি করা হয়। এভাবে মসজিদের ভেতর ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ কি না? জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

উত্তর

মসজিদ আল্লাহ তাআলার ঘর। এটি ইবাদত-বন্দেগী, নামায, ইতিকাফ, কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির-আযকারের স্থান; ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থান নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন এবং মসজিদের ভেতর ক্রয়-বিক্রয়কারীর জন্য বদদুআ করেছেন। এছাড়া জুমার আযানের পর ক্রয়-বিক্রয় স¤পর্কে পৃথকভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। অনেক ফকীহের মতে এ নিষেধাজ্ঞা প্রথম আযানের পর থেকেই শুরু হয়ে যায়। তাই মসজিদের ভেতর এমন নিলাম করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

মসজিদের জন্য নিলামের প্রয়োজন হলে তা নামাযের পর মসজিদের বাইরে গিয়ে করা যেতে পারে। প্রয়োজনে এ নিলামের ঘোষণা নামাযের পর মসজিদেও দেয়া যাবে।

-মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬৬৭৬; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ২৩৩৯; আলমুহীতুল বুরহানী ২/৯৩; আলবাহরুর রায়েক ২/১৬৮

শেয়ার লিংক

আশরাফ আলী - হাজারীবাগ, ঢাকা

৫১৫৯. প্রশ্ন

এক ব্যক্তির ছেলে-মেয়ে উভয়ে সামর্থ্যবান। সকলের বিবাহ হয়ে গেছে। তাদের মা-বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেলে ছেলে মা-বাবার খরচ বহন করে। তবে ছেলে বলতে চায় যে, বোনেরও তো টাকা-পয়সা আছে। সেও যেন আমার সঙ্গে সমানভাবে মা-বাবার খরচ বহন করে।

জানতে চাই, বিবাহিতা মেয়ের উপর কি বাবা-মায়ের খরচ বহন করা জরুরি?

উত্তর

মেয়ের যদি নিজস্ব মালিকানাধীন (স্বামীর নয়) সম্পদ থাকে এবং প্রয়োজনীয় খরচাদির পর মাতা-পিতার জন্য খরচ করার সামর্থ্য থাকে, তাহলে সে বিবাহিতা হোক কিংবা অবিবাহিতা- ভাইয়ের সঙ্গে তারও পিতা-মাতার খরচ বহন করা জরুরি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنّ أَوْلَادَكُمْ هِبَةُ اللهِ لَكُمْ، يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا، وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذّكُورَ، فَهُمْ وَأَمْوَالُهُمْ لَكُمْ إِذَا احْتَجْتُمْ إِلَيْهَا.

তোমাদের সন্তান তোমাদের প্রতি আল্লাহর দান। তিনি যাকে চান কন্যা দান করেন আর যাকে চান তাকে দান করেন পুত্র। তারা এবং তাদের সম্পদ দুই-ই তোমাদের, যখন তোমাদের প্রয়োজন পড়ে। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৩১৭৭)

উক্ত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজনের সময় পিতা-মাতাকে সন্তানের সম্পদ ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছেন। তাই সন্তানের- চাই সে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে- কর্বত্য হল, যথাসাধ্য তাদের খরচ বহন করা।

প্রকাশ থাকে যে, মেয়ে যদি বিবাহিতা হয় এবং তার স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করে, অপরদিকে ছেলে যদি বাবা-মার বাড়িতে অবস্থান করে এবং তাদের স্থায়ী সহায়-সম্পদ (ঘর-বাড়ি, পুকুর, কৃষি জমি ইত্যাদি) এককভাবে ভোগ করে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের খরচের বড় অংশ ছেলেদেরই দেওয়া উচিত। তবে আগেই বলা হয়েছে, সামর্থ্যবান মেয়েদেরও (যদিও সে শ্বশুর বাড়িতে থাকে) বাবা-মায়ের দেখা শোনা ও তাদের খরচাদি বহনে যথাসাধ্য অংশ গ্রহণ করা দায়িত্ব।

-কিতাবুল আছল ১০/৩৪০; আলমাবসূত, সারাখসী ৫/২২২; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৪৪৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৪/৩৫০; ফাতহুল কাদীর ৪/২২৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫৬৪

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ শাহীন - গোপালগঞ্জ

৫১৫৮. প্রশ্ন

হযরত আমাদের এলাকায় আজীমুদ্দিন তালুকদার নামে এক লোক আছে। সে দুটি বিবাহ করেছে। প্রথম বিবির নাম আমিরুন নেসা। তার ছেলের নাম ইসমাঈল তালুকদার। এই ইসমাঈলের বড় ছেলের নাম আব্দুল কুদ্দুস তালুকদার। তার একজন মেয়ে আছে মুক্তানামে।

আর এই আজিমুদ্দিনের অপর স্ত্রী আছে তার নাম মারিয়ম। তার ছেলের নাম ইবরাহীম তালুকদার। এই ইবরাহীম তালুকদারে সাথে ঐ মুক্তা বেগমের বিবাহ হয়েছে। এখন কথা হল, যার সাথে মুক্তার বিবাহ হয়েছে সে হল তার সৎ দাদা। অর্থাৎ মুক্তার আপন দাদা হল ইসমাঈল। আর ইসমাঈল ও ইবরাহীম হল সৎ ভাই। মা ভিন্ন বাপ একএখন সেই সৎ দাদা স্বীয় নাতনীকে বিবাহ করেছে। এখন প্রশ্ন হল, তাদের মধ্যকার বিবাহ বন্ধনের বিধান কী? জানালে উপকৃত হতাম।

উত্তর

প্রশ্নের বর্ণনা মতে ইবরাহীম তালুকদার মুক্তা বেগমের দাদার বাপ শরীক ভাই। অর্থাৎ বাপ শরীক দাদা। সুতরাং তারা পরস্পর  মাহরাম।

তাই তার সঙ্গে ইবরাহীম তালুকদারের বিবাহ সহীহ হয়নি। আপন দাদা যেমনিভাবে মাহরাম। অনুরূপভাবে সৎ দাদাও মাহরাম। তাদের পরস্পর বিবাহ হারাম। অতএব তাদের বিবাহ সহীহ হয়নি। তাদের এখনই আলাদা হয়ে যাওয়া এবং নিজেদের কৃতকর্মের জন্য খাঁটি দিলে তওবা করা জরুরি।

-তাফসীরে মাযহারী ২/২৬৫; ফাতহুল কাদীর ৩/১১৭; মাজমাউল আনহুর ১/৪৭১; তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/৪৬০; মাজমাউল বাহরাইন, পৃ. ৫১২; আলবাহরুর রায়েক ৩/৯৩

শেয়ার লিংক

মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ - রূপনগর, মিরপুর, ঢাকা

৫১৫৭. প্রশ্ন

আমি পবিত্র হজ্ব পালন করেছি। ইহরাম অবস্থায় সতরের সতর্কতার জন্য জাঙ্গিয়া (আন্ডারপ্যান্ট/আন্ডারওয়্যার) পরি। তামাত্তু হজ্বের উমরা ও হজ্ব উভয়টি আদায়কালে আমি এটি পরিধান করে ছিলাম। পরবর্তীতে আলেমদের কাছে শুনেছি যে, ইহরাম অবস্থায় এগুলো পরা নিষেধএখন আমার কি করণীয়? জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

হাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য শরীরের অঙ্গের আকৃতি অনুযায়ী তৈরিকৃত বা সেলাইকৃত পোশাক পরা নিষেধ। সে হিসাবে জাঙ্গিয়াও পরা নিষেধ। কেউ একসাথে ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় এ ধরনের পোশাক পরে থাকলে তার উপর জরিমানা হিসাবে দমদেওয়া ওয়াজিব হবে। আপনি যেহেতু উমরা এবং হজ্ব উভয়টি আদায়ের সময় তা পরেছিলেন। তাই আপনার উপর দুটি জরিমানা দমওয়াজিব হয়েছে।

উল্লেখ্য, উমরা বা হজ্বের দমহেরেমের এলাকায় আদায় করা জরুরি। তাই আপনার এ দমদুটি হেরেমের এলাকার মধ্যে যবেহ করতে হবে। তবে এজন্য নিজের উপস্থিতি জরুরি নয়; বরং সেখানে কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমেও আদায় করানো যেতে পারে। আর এ দমের গোশত গরীব-মিসকীনের হক। ধনী ব্যক্তিকে দেওয়া বা নিজে খাওয়া যাবে না।

তবে হাঁ, বাস্তবেই যদি আপনার জন্য এমন কাপড় পরা ছাড়া সতর হেফাজত করা কঠিন হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে ওজরের কারণে আপনি চাইলে প্রতি জরিমানা দমের পরিবর্তে তিন দিন রোযা রাখতে পারেন বা ছয়জন মিসকীনের প্রত্যেককে একটি সদকা ফিতর পরিমাণ দান করতে পারেন। আর এ সদকা হেরেমের এলাকার ফকিরদের দেওয়া উত্তম, আবশ্যক নয়। অন্য জায়গার ফকিরদের দিলেও আদায় হয়ে যাবে।

-আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৪২৮-৪২৯; আলবাহরুর রায়েক ৩/১৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২৪৪; মানাসিক, মোল্লা আলী আলকারী, পৃ. ৩০০; রদ্দুল মুহতার ২/৫৪৭, ৫৪৩

শেয়ার লিংক

আফিফা মারজানা - সিলেট

৫১৫৬. প্রশ্ন

হজ্বের মৌসুমে দেখা যায়, কয়েকজন বোরকা পরিহিতা মহিলা কেচি নিয়ে দাড়িয়ে থাকে। কারো চুল  ছোট করার (কছর করা) প্রয়োজন হলে তারা অল্প কিছু চুল কেটে দেয়। মুহতারামের নিকট জিজ্ঞাসা হল, চুল কাটার সর্বনিম্ন পরিমাণ কতটুকু? পুরো মাথা থেকে কাটতে হবে, নাকি অল্প কিছু চুল কাটলেও চলবে? এক্ষেত্রে নারী পুরুষ উভয়ের জন্য উত্তম তরিকা কী? বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানালে উপকৃত হতাম।

উত্তর

ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার জন্য মাথার এক চতুর্থাংশ পরিমান চুলের অগ্রভাগ থেকে আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ চুল ছোট করা ওয়াজিব। এটাই চুল ছোট করার সর্বনিম্ন পরিমাণ। তবে পুরুষদের জন্য সর্বাবস্থায় মাথা মুণ্ডানো উত্তম। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা মুণ্ডিয়েছেন এবং মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য বিশেষভাবে দুআ করেছেন।

হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ حَلَقَ رَأْسَهُ فِي حَجّةِ الوَدَاعِ.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্বের দিন মাথা মুণ্ডন করেছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪১০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩০৪)

عَنْ يَحْيَى بْنِ الْحُصَيْنِ، عَنْ جَدّتِهِ، أَنّهَا سَمِعَتِ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فِي حَجّةِ الْوَدَاعِ دَعَا لِلْمُحَلِّقِينَ ثَلَاثًا، وَلِلْمُقَصِّرِينَ مَرّةً.

ইয়াহইয়া ইবনে হুসাইন তার দাদীর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বিদায় হজ্বের দিন দেখেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য দুআ করেছেন তিনবার। আর চুল ছোটকারীদের জন্য একবার। (সহীহ মুসিলম, হাদীস ১৩০৩)

আর  মহিলাদের জন্য পুরো মাথা থেকে এক কর পরিমাণ চুল ছোট করা উত্তম। তবে চার ভাগের এক ভাগ থেকে এক কর পরিমাণ চুল কাটলেও ইহরাম-মুক্ত হয়ে যাবে।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

تَجْمَعُ الْمُحْرِمَةُ شَعْرَهَا ، ثُمّ تَأْخُذُ مِنْهُ قَدْرَ أُنْمُلَةٍ.

ইহরামকারী নারী তার চুলকে একত্রিত করে সেখান থেকে এক কর পরিমাণ কাটবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ১৩০৬৫)

তবে কেউ যদি কেবলমাত্র মাথার এক চতুর্থাংশ পরিমাণ থেকে চুল ছোট করে, তাহলে সেক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম এক করের চেয়ে কিছুটা বেশি ধরে কাটতে বলেছেন। যাতে ঐ অংশের যে চুলগুলো তুলনামূলক ছোট, সেটাও এক কর পরিমাণ কাটা হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, প্রশ্নে উল্লেখিত মহিলাদের থেকে চুল কাটা উচিত হবে না। কেননা এতে চেহারা ও চুলের পর্দা লঙ্ঘন হতে পারে। বরং চুল নিজ হোটেলে এসে কাটবে। আর মেয়েরা ঘরে এসে নিজের চুল নিজেই কেটে নিতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই।

-আলমাবসূত, সারাখসী ৪/৭০; বাদায়েউস সানায়ে ২/৩৩০; আলবাহরুল আমীক ৩/১৭৯৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩৫; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫১৫; মানাসিক, মোল্লা আলী আলকারী, পৃ. ২২৯

শেয়ার লিংক

মাসুম বিল্লাহ - খুলনা

৫১৫৫. প্রশ্ন

আমার জানার বিষয় হল, আমাদের মাদরাসায় লিল্লাহ বোডিং আছে। আমাদের ছাত্রদের থেকে মৌখিক স্বীকৃতি নেওয়া আছে যে, তারা তাদের পক্ষ হতে উস্তাযদেরকে যাকাত গ্রহণ করার জন্য প্রতিনিধি সাব্যস্ত করেছে। এমতাবস্থায় উস্তাদগণ তাদের পক্ষ হতে উকিল সাব্যস্ত হয়ে যাকাত গ্রহণ করতঃ টাকা হস্তগত করলে মালিকদের পক্ষ হতে যাকাত আদায় হবে কি না?

অতঃপর উক্ত টাকা ছাত্রদেরকে মালিক বানানো ছাড়াই সেখান থেকে উসূলকারীগণ আমেল হিসাবে ২০% গ্রহণ করতে পারবে কি না? এব্যাপারে শরীয়তের সঠিক নির্দেশনা জানতে চাই।

পাশাপাশি শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে আমেল হওয়ার সঠিক সূরাত  বর্তমান সময়ে কী হতে পারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

 

উত্তর

বর্তমান প্রচলন (العرف) অনুযায়ী যেসব মাদরাসায় গোরাবা ফান্ড রয়েছে সেসব মাদরাসার মুহতামিম/কর্তৃপক্ষ গরীব ছাত্রদের পক্ষ হতে যাকাত গ্রহণের উকিল তথা প্রতিনিধি। তাই মাদরাসার প্রতিনিধির হাতে যাকাতের টাকা অর্পণ করার দ্বারাই যাকাতদাতার যাকাত আদায় হয়ে যাবে এবং এ টাকার মালিক সম্পূর্ণভাবে গরীব ছাত্ররাই হবে।

আর বর্তমানে যাকাত উসূলকারীগণ শরয়ী আমেলনন। বরং তারা প্রতিনিধি মাত্র। তাই আমেল হিসাবে সেখান থেকে তারা বেতন/ভাতা নিতে পারবে না। তবে এক্ষেত্রে প্রতিনিধিদেরকে মাদরাসার জেনারেল ফান্ড থেকে নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে।

প্রকাশ থাকে যে, আমেল হল ইসলামী হুকুমতের পক্ষ হতে যাকাত উসূলের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তাদের বেতন-ভাতাদী উসূলকৃত যাকাতের টাকা থেকে দেওয়া যায়। আর বর্তমান যাকাত উসূলকারীগণ তাদের মত নয়।

উল্লেখ্য, উসূলকৃত যাকাতের টাকা এর প্রাপককে (গরীব ছাত্রগণ) বুঝিয়ে দেওয়ার পর মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাদের থেকে মাদরাসার নির্ধারিত ফি তথা মাদরাসা কর্তৃক অর্পিত তাদের খরচাদি নিতে পারবে। ছাত্ররা যদি যাকাত-সদকা বাবদ প্রাপ্ত টাকা থেকে তা পরিশোধ করে, তাতেও দোষ নেই। এরপর মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সে টাকা দিয়ে চাইলে যাকাত উসূলকারীদেরকে পারিশ্রমিক দিতে পারবে।

-আলমুহীতুল বুরহানী ৩/২১৪; ইমদাদুল মুফতীন পৃ. ৮৯৫; আহাম ফেকহী ফায়সালে পৃ. ৫৪; আলমাবসূতসারাখসী ৩/৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/১৫১

শেয়ার লিংক

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান - নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

৫১৫৪. প্রশ্ন

সম্প্রতি এক যৌনকর্মীর মৃত্যুর পর পুরোপুরি ইসলামী প্রথা মেনে জানাযা পড়িয়ে দাফন করা হয়েছে। জনৈক পুলিশ কর্মকর্তার অনুরোধে স্থানীয় মসজিদের ইমাম প্রায় দুশ উপস্থিত মুসল্লিদের নিয়ে তার জানাযা নামায পড়ান। এলাকার বাসিন্দাদের মতে এই যৌনপল্লিতে এটি ব্যতিক্রম ঘটনা। সাধারণত মৃত যৌনকর্মীদের গোপনে কবর দেওয়া হয় অথবা মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সংবাদটি প্রচার হলে মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।  আমার জানার বিষয় হল, যৌনকর্মীদের জানাযা পড়ার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে? জানিয়ে উপকৃত করবেন।

উত্তর

ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া কবীরা গুনাহ। তাও যদি হয় প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে এবং পেশা বানিয়ে তাহলে তার ভয়াবহতা যে কত বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এমন কাজে জড়িত ব্যক্তি যদি কোনো মুসলমান হয় তাহলে তার পেশাটি ভয়াবহ কবীরা গুনাহ হলেও মৃত্যুর পর তাকে কাফন পরিয়ে জানাযা দিতে হবে এবং অন্যান্য মুসলমানদের মতো তাকে দাফন করতে হবে। অবশ্য কোনো বড় আলেম এবং সমাজের শীর্ষ অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গের তার জানাযায় অংশগ্রহণ না করা উচিত। বরং সাধারণ লোকজন দিয়ে তার জানাযা ও কাফন-দাফনের কাজ স¤পন্ন করাই শরীয়তের নির্দেশ। যেন অন্যরা তা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং এধরনের কাজ থেকে বিরত থাকে।

-সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬৯৬; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৪২৯; কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মাদ, বর্ণনা ১৪৮; ফাতহুল বারী ১২/১৩১; বাযলুল মাজহুদ ১০/৪৬৮; শরহুল মুনয়া পৃ. ৫৯১; রদ্দুল মুহতার ২/২১০

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান - কচুক্ষেত, ঢাকা ক্যান্ট.

৫১৫৩. প্রশ্ন

আমাদের একটি পারিবারিক গোরস্থান আছে। সেখানে আমাদের অনেককে দাফনও করা হয়েছে। গোরস্থানটি বর্তমানেও চলমান। তাতে মৃতদের দাফন করা হচ্ছে। আমরা চাচ্ছি যে, গোরস্থানকে স্ব-স্থানে রেখে উপর থেকে মসজিদ বানাতে। যেহেতু আমাদের অন্য কোনো জায়গা নেই যে, মসজিদের জন্য আলাদা জায়গার ব্যাবস্থা করে মসজিদ করি। এমতাবস্থায় উক্ত স্থানে মসজিদ করা যাবে কি না? কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে সঠিক ও বিস্তারিত সমাধান দিলে উপকৃত হব।

 

উত্তর

উক্ত কবরস্থানের উপর মসজিদ নির্মাণ করা যাবে না। কারণ, (ক) জায়গাটি কবরস্থানের জন্য ওয়াকফকৃত। আর ওয়াকফকৃত স্থান যে জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে সেখানে তাই করতে হবে। অন্য কিছু করা জায়েয হবে না(খ) কবরকে অক্ষত রেখে এর উপর মসজিদ বানানো বা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ করাও নাজায়েয। হাদীস শরীফে কবরের উপর কোনো কিছু নির্মাণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। হযরত জাবের রা. বলেন-

نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَنْ يُجَصّصَ الْقَبْرُ، وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ، وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ.

রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর চুনকর্ম করতে, তার উপর বসতে ও তার উপর (কোনো কিছু) নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৭০)

সুতরাং কবরস্থানের উপর মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণ করা যাবে না। মসজিদের জন্য আলাদা কোনো জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।

-আলমুহীতুল বুরহানী ৯/১৪৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২/৪৯০, ৪৭০; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৮/১৮৯; ফাতাওয়া খানিয়া ১/১৯৪; রদ্দুল মুহতার ২/২৩৭; হালবাতুল মুজাল্লী ২/৬২৬

শেয়ার লিংক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক - নগরকান্দা, ফরিদপুর

৫১৫২. প্রশ্ন

মুহতারামের নিকট আমার জানার বিষয় হল, মাগরিবের আযানের পরে ফরয নামাযের আগে নফল নামায পড়ার হুকুম কী? এবিষয়ে কোনো এক আলেমকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, পড়া যাবে। কেননা বিভিন্ন সাহাবীরা পড়েছেন।

অন্য একজনকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, মাকরূহে তানযিহী-এর সাথে হবে; কেননা খুলাফায়ে আরবাআসহ উল্লেখযোগ্য কোনো সাহাবী পড়েননি।

এ বিষয়ে শরয়ী সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

মাগরিবের আযান ও ইকামতের মাঝে সুন্নত বা মুস্তাহাব পর্যায়ের কোনো নামায নেই। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো নামায পড়েছেন- এরকম স্পষ্ট কোনো সহীহ বর্ণনা নেই। সহীহ বর্ণনা অনুযায়ী খোলাফায়ে রাশেদীনও এ সময় কোনো নামায পড়তেন না। অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামও সাধারণত এ সময় নামায পড়তেন না।

সুনানে আবু দাউদে এক বর্ণনায় এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে মাগরিবের ফরযের পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-

مَا رَأَيْتُ أَحَدًا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يُصَلِّيهِمَا.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে কাউকে উক্ত নামায পড়তে  দেখিনি। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১২৮৭

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহ.-এর এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন-

كَانَ الْمُهَاجِرُونَ لَا يَرْكَعُونَ الرّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الْمَغْرِبِ، وَكَانَتِ الْأَنْصَارُ تَرْكَعُ بِهِمَا.

মুহাজির সাহাবীগণ মাগরিবের আগে দুই রাকাত নামায পড়তেন না। আর আনসার সাহাবীগণ তা পড়তেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ৩৯৮৪

আরেক বর্ণনায় এসেছে, সাইদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহ. বলেন-

مَا رَأَيْت فَقِيهًا يُصَلِّي قَبْلَ الْمَغْرِبِ إِلاَّ سَعْدَ بْنَ أَبِي وَقّاصٍ.

আমি সাদ ইবনে আবি ওয়াককাস রা. ছাড়া আর কোনো ফকীহকে মাগরিবের আগে নামায পড়তে দেখিনি। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, বর্ণনা ৭৪৬৪

ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন-

لَمْ يُصَلِّ أَبُو بَكْرٍ وَلَا عُمَرُ وَلَا عُثْمَانُ الرّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الْمَغْرِبِ.

আবু বকর, উমর ও উসমান রা. মাগরিবের পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়তেন না। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ৩৯৮৫

হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান রাহ. বলেন-

سَأَلْتُ إِبْرَاهِيمَ عَنِ الصّلَاةِ قَبْلَ الْمَغْرِبِ فَنَهَانِي عَنْهَا، وَقَالَ: إِنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا لَمْ يُصَلّوهَا.

আমি ইবরাহীম নাখায়ী রাহ.-কে মাগরিবের পূর্বে নফল নামায পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে তা পড়তে নিষেধ করলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লাম, আবু বকর, উমর রা. এই নামায পড়তেন না। -কিতাবুল আছার ১/১৬৩

সুফিয়ান ছাওরী রাহ. বলেন-

نَأْخُذُ بِقَوْلِ إِبْرَاهِيمَ.

আমার মতও ইবরাহীম নাখায়ীর মতই। -সুনানে বায়হাকী ২/৪৭৬

সুতরাং খোলাফায়ে রাশেদীনসহ সাহাবা এবং তাবেয়ীদের অনেকেই যেহেতু এ সময় নফল পড়তেন না এবং এ সময় নফল নামাযের বিশেষ কোনো ফযিলতও হাদীসে বর্ণিত নেই। অন্যদিকে আযানের পর বিলম্ব না করে দ্রুত মাগরিব পড়ার কথা অন্যান্য হাদীসে এসেছে, তাই এসব বিষয়ের উপর ভিত্তি করে হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ উক্ত দুই রাকাত নফল নামাযকে সুন্নত বা মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল হিসেবে গণ্য করেননি। হানাফী মাযহাবের পূর্ববর্তী ফকীহগণের মতে এ সময় নামায পড়া মাকরূহে তানযিহী তথা অনুত্তম। মালেকী মাযহাবের ফকীহগণও এ সময় নামায পড়াকে মাকরূহ বলেছেন। হাম্বলী মাযহাবের কোনো কোনো ফকীহ থেকেও এমনটি বর্ণিত আছে।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি শাখাগত মাসআলা। এতে ভিন্ন মতও রয়েছে। কোনো কোনো সাহাবী এ সময় নামায পড়েছেন- এটিও প্রমাণিত আছে। তাই অন্য মাযহাবের কাউকে এ সময় নামায পড়তে দেখলে আপত্তি করা ঠিক নয়।

-আলমাবসূত, সারাখসী ১/১৫৭, ১৭৫; তুহফাতুল মুলূক পৃ. ৫৯; আলইখতিয়ার ১/৪১; তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৮৭; আশশারহুল কাবীর, দরদের ১/১৮৭হাশিয়াতুশ শিলবী ১/১৮১; হাশিয়াতুস সাবী আলাশ শারহিস সাগীর ১/৯০; আলইনসাফ, মারদাবী ১/৪২২; এলাউস সুনান ২/৬৮

শেয়ার লিংক