মোঃ মোস্তফা কামাল - জামেয়া ওসমানিয়া চাটখিল, নোয়াখালী

প্রশ্ন

মুহতারাম,আমি শরহে বেকায়া জামাতের ছাত্র। নূরুল আনওয়ারের কিছু বিষয় আমার বোধগম্য হচ্ছে না। সেগুলোকে হযরতের সমীপে পেশ করলাম। সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

১. কিতাবের মুকাদ্দিমাতেই আছে যে, সিরাতে মুস্তাকীম-এর মিসদাক তিনটি হতে পারে। (ক) শরীয়তে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (খ) আক্বায়েদে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (গ) ত্বরীকে সুলূক

মনে হচ্ছে যে এ তিনটি বিষয় পরস্পর সম্পৃক্ত; এর একটি ছাড়াও সিরাতে মুসতাকীম-এর ওপর থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু কিতাবের বর্ণনামতে তিনটির যে কোনো একটিই হল সীরাতে মুসতাকীম। আসলে বিষয়টা কী?

২. অন্যত্র আছে কিতাবুল্লাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল পাঁচশত আয়াত, আর সুন্নাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল তিন হাজার হাদীস, এই নির্দিষ্টতা কীভাবে সম্ভব?


উত্তর

১. নূরুল আনওয়ার কিতাবের মুকাদ্দিমার আলোচ্য স্থানে প্রথমে সীরাতে মুস্তাকীমের হাকীকত ও স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-

 هو الصراط الذي يكون على الشارع العام، ويسلكه كل واحد من غير أن يكون فيه التفات إلى شعب اليمين والشمال وهو الذي يكون معتدلا بين الإفراط والتفريط.

 এরপর সীরাতে মুস্তাকীমের উক্ত হাকীকত কোথায় প্রতিফলিত হয়েছে সে কথা বলা হয়েছে এভাবে-

وهذا صادق على شريعة محمد... وعلى عقائد أهل السنة والجماعة... وعلى طريق سلوك جامع بين المحبة والعقول...

একটু খেয়াল করে পড়লে বুঝতে পারবেন উপরোক্ত ইবারতের মতলব কখনো কোনোক্রমে এমন হতে পারে না যে,উল্লেখিত তিনটি বিষয়ের মধ্যে কেবল একটিই সীরাতে মুস্তাকীমের মিসদাক। কারণ এখানে তো হরফে আতফ ব্যবহার করা হয়েছেযা পূর্বোক্ত হুকুমের ক্ষেত্রে মাতূফ ও মাতূফ আলাইহি একইসঙ্গে শরীক হওয়া বুঝায়। সুতরাং উপরোক্ত ইবারতের সহীহ মতলব এটাই যেউল্লেখিত তিনটি বিষয় একইসঙ্গে সীরাতে মুস্তাকীমের মিসদাক।

২. আহকাম সংক্রান্ত আয়াত সংখ্যা পাঁচশত- একথা ইমাম গাযালী রাহ. (মৃত্যু ৫০৫ হি.) আল-মুস্তাসফাগ্রন্থে এবং মালিকী মাযহাবের ফকীহ ইমাম আবু বকর ইবনুল আরাবী রাহ. (মৃত্যু ৫৪৩ হি.) উসূলে ফিকহ বিষয়ে রচিত আল-মাহসূল নামক কিতাবে বলেছেন। তাঁদের একথার উদ্দেশ্য আক্ষরিক অর্থে উপরোক্ত সংখ্যার মাঝে তাহদীদ ও সীমাবদ্ধকরণ নয়। এর দ্বারা সম্ভবত তাঁদের উদ্দেশ্য হল আহকাম সংক্রান্ত এমন সব সরীহ আয়াতের সংখ্যা বয়ান করাযেগুলোর ইবারাতুন নস থেকে কোনো হুকুম সুস্পষ্টভাবে বুঝে আসে। অধিকন্তু এটি হচ্ছে তাঁদের নিজ অনুসন্ধান। তাঁদের উক্ত কথার এমন ব্যাখ্যাই কোনো কোনো আহলে ইলম পেশ করেছেন। অন্যথায় ইশারাতুন নাস,দালালাতুন নাসইকতিযাউন নাস এবং দালালাতুল কালামের অন্যান্য পদ্ধতিতে যেসব আয়াত থেকে আহকাম আহরণ করা হয় এমন আয়াতের সংখ্যা উপরোক্ত সংখ্যার কয়েকগুণ। এছাড়া আহলে ফিকহ ও আহলে ইখতেসাস উলামায়ে কেরাম তো কাসাস ও আমছাল সংক্রান্ত আয়াতের ইশারা থেকেও কোনো কোনো বিধান আহরণ করে থাকেন। দ্রষ্টব্য : ইরশাদুল ফুহূলশাওকানী ২/২৯৭-২৯৮

আর আহকাম সংক্রান্ত হাদীসের সংখ্যা তিন হাজার- একথা আবু বকর ইবনুল আরাবী রাহ.আল মাহসূল-এ বলেছেন। কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী অনেক আইম্মায়ে হাদীস ও আইম্মায়ে ফিকহ থেকে আরো কম সংখ্যাও বর্ণিত হয়েছে। যেমনআব্দুর রহমান ইবনু মাহদী ও ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল কাত্তান রাহ. থেকে বর্ণিত- আটশত। ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহ. থেকে বর্ণিত- নয়শত। ইমাম কাযী আবু ইউসুফ রাহ. থেকে বর্ণিত- এগারশত।

উল্লেখ্যএ সংখ্যাগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য হল আহকাম সংক্রান্ত সরীহ ও সুস্পষ্ট কওলী হাদীসের মতনের সংখ্যা। ইবনুল আরাবী রাহ. সম্ভবত কওলী ও ফেয়েলী উভয় ধরনের হাদীসকে হিসেব করে বলেছেন। আর এ সংখ্যাগুলো তাঁরা বলেছেন নিজ নিজ অনুসন্ধান ও জানাশুনার ভিত্তিতেযে কারণে তাদের সংখ্যার গণনায় তারতম্য হয়েছে। দ্রষ্টব্য: রিসালাতুল ইমাম আবী দাউদ ইলা আহলি মক্কাহ- শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর টীকাসহ ৩৫-৩৭;ইবনে মাজাহ আওর ইলমে হাদীসমাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নুমানী রাহ. ১৬৪

এখানে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবেউপরোক্ত সংখ্যাগুলো মূলত আহকাম সংক্রান্ত সরীহ ও মারফ হাদীসের মতনের সংখ্যা। সুতরাং গায়রে সরীহ মারফু হাদীসহাদীসে মওকফ ও আছারে সাহাবা এবং একই হাদীসের বিভিন্ন সনদ ও রেওয়ায়েতকেও যদি হিসেব করা হয় তবে সেই সংখ্যা অনেকগুণ বেড়ে যাবে। একারণে হাসান ইবনু যিয়াদ রাহ. বলেছেন-

كتبت عن ابن جريح اثني عشر ألف حديث كلها يحتاج إليها الفقهاء.

(দ্রষ্টব্য: সিয়ারু আলামিন নুবালা ৯/৫৪৪)

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সামিয়া রাহ. বলেছেন-

إن أبا حنيفة رحمه الله ذكر نيفا وسبعين ألف حديث وانتخب الآثار من أربعين ألف حديث.

মানাকিবুল ইমাম আবী হানীফাহমোল্লা আলী কারী- আছারুল হাদীসিশ শরীফ পৃ. ১৭৪

শেয়ার লিংক

ইবনে আব্দুল কুদ্দুস বাহুবলী - দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজরী, চট্টগ্রাম

প্রশ্ন

মুহতারাম হযরত! আমি নিম্নোক্ত প্রশ্ন দুটির উত্তর জানতে আগ্রহী। আশা করি জানাবেন।

(ক) হেদায়া ১ম খণ্ডের ৩৫নং পৃষ্ঠায় আলমাউল জারী-এর বিষয়ে ২৩ নং হাশিয়ায় যে হাউযুল হাম্মাম-এর কথা বলা হয়েছে, এর দ্বারা কি আমাদের দেশে প্রচলিত পানির ট্যাংক যা ছাদের উপর বসানো হয় তা উদ্দেশ্য?

(খ) অনেক মাসআলায় আইম্মায়ে আহনাফের মুখতালিফ ক্বওল থাকে। তন্মধ্যে একটি হয় মুফতাবিহী। এখন প্রশ্ন হল, মুফতাবিহী ক্বওল ছাড়া অন্য ক্বওলের উপর কি আমল করা যাবে না?


উত্তর

(ক) হেদায়ার হাশিয়ায় যে হাউযুল হাম্মাম-এর কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলআগের যামানার হাম্মামের হাউজ বা চৌবাচ্চা। বিস্তারিত জানার জন্য মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ.-এর রিসালা খয়রুল কালাম ফী হাওযিল হাম্মাম দেখা যেতে পারে।

(খ) যে মতটি গায়রে মুফতাবিহী সেটি যদি সকল আসহাবুত তারজীহ এবং মুহাক্কিক ফকীহগণের নিকট যাল্লাত ও শায তথা ভুল ও পদস্খলনের শামিল হয়তবে তা কোনোক্রমেই আমলযোগ্য নয়।

ইমাম কাসেম ইবনে কুতলুবুগা রাহ. বলেছেন-

"إن الحكم و الفتيا بما هو مرجوح خلاف الإجماع، و إن المرجوح في مقابلات الراجح بمنـزلة العدم، والترجيح بغير مرجح في المتقابلات ممنوع، وإن من يكتفي بأن يكون فتواه أو عمله موافقا لقول أو وجه في المسألة، ويعمل بما شاء من الأقوال والوجوه من غير نظر في الترجيح فقد جهل وخرق الإجماع" انتهى.

তবে কোনো মারজূহ মত যদি যাল্লাত ও পদস্খলন পর্যায়ের না হয় তাহলে বিশেষ কিছু ওজরের অবস্থায় শর্ত সাপেক্ষে আমল করা যেতে পারে-এ কথা কেউ কেউ বলেছেন। বিস্তারিত জানার জন্য আল্লামা ইবনে আবেদীন রাহ.-এর শরহু উকদি রসমিল মুফতী এবং মুফতী তকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম-এর উসূলুল ইফতা ওয়া আদাবুহু দেখা যেতে পারে। 

শেয়ার লিংক
advertisement
advertisement