আসলাম হুসাইন - ইন্দ্রা, বাঘারপাড়া, যশোর
৬৯২৬. প্রশ্ন
জায়েদ আমরের কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা ঋণ নিতে চায়। কিন্তু আমর এক লক্ষ টাকায় দশ হাজার টাকা লাভ গ্রহণ ছাড়া ঋণ দিতে নারাজ। আবার উভয়ের ইচ্ছা হল, সুদ থেকে বেঁচে থেকে এই লেনদেন সম্পন্ন করা। তাই তারা নিম্নোক্ত পন্থায় হীলা গ্রহণ করল–
জায়েদ নিজের চাচাতো ভাই খালেদকে উপস্থিত করে বলল, তুমি তোমার মোটরসাইকেলটি আমরের কাছে এক লক্ষ টাকায় বিক্রি করে দাও। খালেদ তার মোটরসাইকেল আমরের কাছে এক লক্ষ টাকায় বিক্রি করে দিল। আমর খালেদকে এক লক্ষ টাকা দিয়ে গাড়িটি হস্তগত করে নিল। অতঃপর আমর কিস্তির চুক্তিতে উক্ত গাড়িটি জায়েদের কাছে এক লক্ষ দশ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিল। জায়েদ গাড়িটি আয়ত্ত করে পূর্বের মালিক খালিদের নিকট এক লক্ষ টাকায় বিক্রি করল এবং নগদ এক লক্ষ টাকা নিয়ে নিল। যা খালিদ মোটরসাইকেলের বিক্রয়মূল্য হিসেবে আমরের কাছ থেকে পেয়েছিল।
ফল দাঁড়াল এই, গাড়িওয়ালা তার গাড়ি পেয়ে গেল। ঋণ গ্রহীতাও তার ঋণ পেয়ে গেল। আর ঋণদাতা পেয়ে গেল তার লাভের দশ হাজার টাকা।
উল্লেখ্য, এখানে গাড়িটি বিক্রয় করা বা ক্রয় করার ইচ্ছা প্রকৃতভাবে কারও ছিল না, শুধুমাত্র হীলারূপে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে।
এখন আমার জানার বিষয় হল, এভাবে হীলা গ্রহণ করা এবং আমরের জন্য উক্ত হীলার মাধ্যমে দশ হাজার টাকা লাভ গ্রহণ করা কি শরীয়তসম্মত হবে? শরয়ী দলীলের ভিত্তিতে হানাফী মাযহাবের সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর
প্রশ্নোক্ত লেনদেনটি জায়েয নয়। এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় করা অর্থাৎ যিনি পণ্যের মূল মালিক, কয়েক হাত বদল হলেও পণ্য তার কাছেই থেকে যাবে– এটি শরীয়তনিষিদ্ধ ‘বাইয়ে ঈনা’-র কাছাকাছি একটি লেনদেন। এতে বাহ্যত পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় উদ্দেশ্য থাকে না। যেমনটি প্রশ্নে বলা হয়েছে। এমনকি মাঝে আসা সাজানো ক্রেতারা পণ্য হস্তগত করলেও শেষ পর্যন্ত যেহেতু সেই পণ্য মূল মালিকের কাছেই থেকে যায়, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে বাস্তবে এটি ক্রয়-বিক্রয় নয়; বরং পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের বাহানা করে এটি মূলত ঋণ দিয়ে অতিরিক্ত গ্রহণ করার একটা অপকৌশল। হাদীস-আছারে ‘ঈনা’ (عينة) ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–
سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ: إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِيْنَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَرَضِيْتُمْ بِالزَّرْعِ، وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ، سَلَّطَ اللهُ عَلَيْكُمْ ذُلاًّ لَا يَنْزِعُه حَتّٰى تَرْجِعُوْا إِلى دِيْنِكُمْ.
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা ‘ঈনা’ পদ্ধতির ক্রয়-বিক্রয়ে লিপ্ত হয়ে যাবে, ষাড়ের লেজ ধরে থাকবে এবং কৃষি কাজে লিপ্ত থাকার কারণে জিহাদ পরিত্যাগ করবে, তখন আল্লাহ তোমাদের ওপর এমন লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবেন যে, যতক্ষণ না তোমরা দ্বীনের ওপর পূর্ণরূপে প্রত্যাবর্তন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে এই লাঞ্ছনা দূর করবেন না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৪৫৬)
মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহ.-এর কাছে ‘ঈনা’-র কথা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন–
نُبِّئْتُ أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ كَانَ يَقُولُ: دِرْهَمٌ بِدِرْهَمٍ وَبَيْنَهُمَا حَرِيْرَةٌ.
আমার নিকট খবর পৌঁছেছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ‘ঈনা’-র ব্যাখ্যায় বলতেন, মাঝখানে একটি কাপড়কে মাধ্যম বানিয়ে এটি মূলত টাকার বিনিময়ে টাকার চুক্তি। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২০৫২৭)
অতএব প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আমরের জন্য উক্ত হীলা পদ্ধতি অবলম্বন করে অতিরিক্ত দশ হাজার টাকা গ্রহণ করা জায়েয হবে না। এ থেকে বিরত থাকা জরুরি।
* >المحيط البرهاني< ১০/৩৬৯ : وقال بعضهم: تفسيرها أن يدخلا بينهما ثالثا، فيبيع المقرض ثوبه من المستقرض باثنتي عشرة درهما، ويسلمه إليه، ثم يبيع المستقرض من الثالث الذي أدخلاه بينهما بعشرة، ويسلم الثوب إليه، ثم إن الثالث يبيع الثوب من صاحب الثوب، وهو المقرض بعشرة، ويسلم الثوب إليه ويأخذ منه العشرة، ويدفعها إلى طالب القرض، فيحصل لطالب القرض عشرة دراهم، ويحصل لصاحب الثوب عليه اثنى عشر درهما، وهذا حيلة من حيل الربا.
–মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২০৫২৮; আলমাবসূত, সারাখসী ১৪/৩৬; ফাতাওয়া খানিয়া ২/২৭৯; ফাতহুল কাদীর ৬/৩২৪; আননাহরুল ফায়েক ৩/৫৭৫; রদ্দুল মুহতার ৫/৩২৫