আমানুল্লাহ - বনানী, ঢাকা
৬৯১৯. প্রশ্ন
ফরয নামাযের আগে-পরে যে সুন্নত নামাযগুলো আছে, সেগুলো কি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত? রেফারেন্স-সহ জানাবেন।
এই উত্তরের ওপর একটি সফটওয়্যার কোম্পানির অনেক ইঞ্জিনিয়ারের সুন্নত পড়া না পড়ার বিষয়টি নির্ভর করছে। তাই একটু দ্রুত জানানোর অনুরোধ রইল।
উত্তর
ফজরের ফরয নামাযের আগে দুই রাকাত, যোহরের ফরযের আগে চার রাকাত ও পরে দুই রাকাত, মাগরিবের ফরযের পর দুই রাকাত এবং এশার ফরযের পর দুই রাকাত– এই বারো রাকাত নামায সুন্নতে মুআক্কাদা। বহু সহীহ হাদীসে এ নামাযগুলোর গুরুত্ব ও ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। কিছু হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হল।
উম্মুল মুমিনীন উম্মে হাবীবা রা. বর্ণনা করেন–
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ صَلّٰى اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، بُنِيَ لَه بِهِنَّ بَيْتٌ فِي الْجَنَّةِ.
قَالَتْ أُمُّ حَبِيبَةَ: فَمَا تَرَكْتُهُنَّ مُنْذُ سَمِعْتُهُنَّ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
وَقَالَ عَنْبَسَةُ: فَمَا تَرَكْتُهُنَّ مُنْذُ سَمِعْتُهُنَّ مِنْ أُمِّ حَبِيبَةَ.
وَقَالَ عَمْرُو بْنُ أَوْسٍ: مَا تَرَكْتُهُنَّ مُنْذُ سَمِعْتُهُنَّ مِنْ عَنْبَسَةَ.
وَقَالَ النُّعْمَانُ بْنُ سَالِمٍ: مَا تَرَكْتُهُنَّ مُنْذُ سَمِعْتُهُنَّ مِنْ عَمْرِو بْنِ أَوْسٍ.
যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে বারো রাকাত (সুন্নত) নামায পড়বে, এর প্রতিদানে জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হবে।
উম্মে হাবীবা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এই নামায সম্পর্কে শোনার পর থেকে আর কখনও তা পরিত্যাগ করিনি।
আমবাসা ইবনে আবু সুফিয়ান রাহ. বলেছেন, আমি উম্মে হাবীবা রা.-এর কাছে এই নামায সম্পর্কে শোনার পর থেকে আর ওই নামাযগুলো কখনও পরিত্যাগ করিনি।
আমর ইবনে আওস রাহ. বলেছেন, আমি আমবাসা ইবনে সুফিয়ানের কাছে এই নামায সম্পর্কে শোনার পর থেকে আর কখনও তা পরিত্যাগ করিনি।
নু‘মান ইবনে সালেম রাহ. বলেছেন, আমি আমর ইবনে আওসের কাছ থেকে এ হাদীসটি শোনার পর আর কখনও তা পরিত্যাগ করিনি। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২৮)
আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–
مَنْ صَلّٰى فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً بُنِيَ لَه بَيْتٌ فِي الجَنَّةِ: أَرْبَعًا قَبْلَ الظُّهْرِ، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَهَا، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْمَغْرِبِ، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ العِشَاءِ، وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ صَلَاةِ الْفَجْرِ صَلَاةِ الْغَدَاةِ.
দিন ও রাতে যে ব্যক্তি বারো রাকাত (সুন্নত) নামায পড়বে, জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হবে। (সেগুলো হল,) যোহরের আগে চার রাকাত, যোহরের পরে দুই রাকাত, মাগরিবের পরে দুই রাকাত, এশার পরে দুই রাকাত এবং ফজরের আগে দুই রাকাত। (জামে তিরমিযী, হাদীস ৪১৫)
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
مَنْ ثَابَرَ عَلَى ثِنْتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً مِنَ السُّنَّةِ بَنَى اللهُ لَه بَيْتًا فِي الجَنَّةِ، أَرْبَعِ رَكَعَاتٍ قَبْلَ الظُّهْرِ، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَهَا، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْمَغْرِبِ، وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ العِشَاءِ، وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ الفَجْرِ.
যে ব্যক্তি বারো রাকাত সুন্নত নামায নিয়মিত আদায় করবে, জান্নাতে তার জন্য আল্লাহ তাআলা একটি ঘর নির্মাণ করবেন। (তা হল) যোহরের আগে চার রাকাত, যোহরের পরে দুই রাকাত, মাগরিবের পরে দুই রাকাত, এশার পরে দুই রাকাত এবং ফজরের আগে দুই রাকাত। (জামে তিরমিযী, হাদীস ৪১৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১১৪০)
আয়েশা রা. বর্ণনা করেন–
لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلى شَيْءٍ مِنَ النَّوَافِلِ أَشَدَّ مِنْهُ تَعَاهُدًا عَلى رَكْعَتَيِ الفَجْرِ.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য সকল নফল নামাযের চেয়ে ফজরের দুই রাকাত সুন্নতের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন এবং তা নিয়মিত আদায় করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৬৯)
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–
لَا تَدَعُوهُمَا، وَإِنْ طَرَدَتْكُمُ الْخَيْلُ.
তোমরা (ফজরের) দুই রাকাত (সুন্নত নামায) ছাড়বে না। যদিও তোমাদের পেছনে ঘোড়া (অশ্বারোহী) ধাওয়া করে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৯২৫৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১২৫২)
আয়েশা রা. বর্ণনা করেন–
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ لاَ يَدَعُ أَرْبَعًا قَبْلَ الظُّهْرِ، وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ الغَدَاةِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের আগে চার রাকাত নামায ও ফজরের আগে দুই রাকাত নামায (কখনও) ছাড়তেন না। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৮২)
আলী রা. বর্ণনা করেন–
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي قَبْلَ الظُّهْرِ أَرْبَعًا وَبَعْدَهَا رَكْعَتَيْنِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের আগে চার রাকাত ও যোহরের পরে দুই রাকাত নামায পড়তেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস ৪২৪)
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا فَاتَتْهُ الْأَرْبَعُ قَبْلَ الظُّهْرِ، صَلَّاهَا بَعْدَ الرَّكْعَتَيْنِ بَعْدَ الظُّهْرِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও যোহরের আগের চার রাকাত সুন্নত না পড়তে পারলে তা ফরয ও দুই রাকাত সুন্নত আদায়ের পর পড়ে নিতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১১৫৮; জামে তিরমিযী, হাদীস ৪২৬)
এছাড়া জুমার ফরয নামাযের আগে চার রাকাত ও পরে চার রাকাত– এই আট রাকাত নামাযও সুন্নতে মুআক্কাদা।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–
مَنِ اغْتَسَلَ ثُمَّ أَتَى الْجُمُعَةَ، فَصَلّٰى مَا قُدِّرَ لَه، ثُمَّ أَنْصَتَ حَتّٰى يَفْرُغَ مِنْ خُطْبَتِه، ثُمَّ يُصَلِّي مَعَهُ، غُفِرَ لَه مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ الْأُخْرَى، وَفَضْلُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ.
যে গোসল করে জুমায় আসে, এরপর তাওফীক মতো নামায পড়ে, এরপর ইমাম খুতবা শেষ করা পর্যন্ত চুপ থাকে এবং তার সাথে নামায পড়ে। তার পরবর্তী জুমা পর্যন্ত ও আরও অতিরিক্ত তিন দিনের (গোনাহ) মাফ করে দেওয়া হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৫৭)
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
إِذَا صَلّٰى أَحَدُكُمُ الْجُمُعَةَ فَلْيُصَلِّ بَعْدَهَا أَرْبَعًا.
যে জুমা পড়ল, সে যেন জুমার পর চার রাকাত নামায পড়ে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৮১)
তাবেয়ী আবু আবদুর রহমান আসসুলামী রাহ. বর্ণনা করেন–
كَانَ عَبْدُ اللهِ يَأْمُرُنَا أَنْ نُصَلِّيَ قَبْلَ الْجُمُعَةِ أَرْبَعًا، وَبَعْدَهَا أَرْبَعًا، حَتّٰى جَاءَنَا عَلِيٌّ فَأَمَرَنَا أَنْ نُصَلِّيَ بَعْدَهَا رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ أَرْبَعًا.
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আমাদেরকে জুমার আগে চার রাকাত এবং জুমার পরে চার রাকাত নামায পড়ার আদেশ করতেন। পরে যখন আলী রা. আগমন করলেন, তখন তিনি আমাদেরকে জুমার পরে প্রথমে দুই রাকাত এরপর চার রাকাত নামায পড়ার আদেশ করেন। (মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ৫৫২৫)
কাতাদা রাহ. বর্ণনা করেন–
أَنَّ ابْنَ مَسْعُودٍ كَانَ يُصَلِّيْ قَبْلَ الْجُمُعَةِ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ، وَبَعْدَهَا أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ.
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. জুমার আগে চার রাকাত নামায পড়তেন। জুমার পরেও চার রাকাত নামায পড়তেন। (মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ৫৫২৪)
এই সুন্নত নামাযগুলো সুন্নতে মুআক্কাদা। নিয়মিত এগুলো আদায় করতে হবে। বিনা ওজরে ছাড়া যাবে না।
নামাযের আগে-পরে এই সুন্নতে মুআক্কাদাগুলো ছাড়া আরও কিছু সুন্নত-নফল নামাযের কথা হাদীস-আছারে এসেছে। যেমন, যোহরের পরের দুই রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদার পর দুই রাকাত নফল নামায। (দ্রষ্টব্য : জামে তিরমিযী, হাদীস ৪২৮)
আসরের ফরয নামাযের আগে চার রাকাত সুন্নত। (দ্রষ্টব্য : মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৫৯৮০; জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৩০)
মাগরিবের পরের দুই রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদার পর দুই রাকাত নফল। (দ্রষ্টব্য : মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ৪৭২৮)
এশার ফরযের আগে চার রাকাত সুন্নত ও এশার পর দুই রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা ছাড়া আরও দুই রাকাত নফল। (দ্রষ্টব্য : সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১২৯৭; কিয়ামুল লাইল, মারওয়াযী, পৃ. ৫৮; আদদিরায়া, ইবনে হাজার ১/১৯৮)
জুমা পরবর্তী চার রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদার আগে দুই রাকাত সুন্নত। (দ্রষ্টব্য : সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৮২; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১১২৩; মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ৫৫২৫)
সুন্নতে মুআক্কাদার পাশাপাশি এই সুন্নত-নফলগুলো আদায় করাও অনেক সওয়াবের কাজ।
–কিতাবুল আছল ১/১৩১; আলমাবসূত, সারাখসী ১/১৫৬-১৫৭; বাদায়েউস সানায়ে ১/৬৩৬-৬৩৯; আলহাবিল কুদসী ১/১৯৮; হালবাতুল মুজাল্লী ২/৩৩৩-৩৩৮; আলবাহরুর রায়েক ২/৪৭-৫০; আদ্দুররুল মুখতার ২/১২-১৪; ই‘লাউস সুনান ৭/৩-২০