মুঈনুল ইসলাম - সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
৬৮৫৫. প্রশ্ন
সিজদার সময় পুরুষের পা কীভাবে থাকবে? কেউ কেউ উভয় পায়ের গোড়ালি মিলিয়ে রাখেন। কেউ কেউ দাঁড়ানোর সময়ের মতো উভয় পায়ের মাঝে ফাঁকা রাখেন। এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি কোন্টি? জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন।
উত্তর
সিজদার সময় পুরুষদের উভয় পায়ের গোড়ালি পৃথক রাখাই সুন্নাহসম্মত ও সঠিক নিয়ম।
হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদার সময় উভয় পা পৃথক রাখতেন এবং পায়ের আঙুলগুলো কিবলামুখী করে রাখতেন।
বারা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–
كَانَ النَبِيُّ ﷺ إذَا رَكَعَ بَسَطَ ظَهْرَه، وَإِذَا سَجَدَ وَجَّهَ أصَابِعَه قِبَلَ القِبْلَةِ فَتَفَاجَّ.
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রুকুতে যেতেন, পিঠ বিছিয়ে দিতেন। যখন সিজদায় যেতেন, আঙুলগুলো কিবলামুখী করে উভয় পা পৃথক করে রাখতেন। (সুনানে কুবরা, বায়হাকী ২/১১৩)
আল্লামা ইবনে হাজার রাহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন–
فَتَفَاجَّ: يعني: وسع بين رجليه.
অর্থাৎ এই হাদীসে বর্ণিত فتَفاجَّ শব্দের অর্থ হল, তিনি তার উভয় পায়ের মাঝে ফাঁকা রাখতেন। (আততালখীসুল হাবীর ২/৬১৮)
হানাফী মাযহাব ও অন্যান্য মাযহাবের ফকীহগণও সিজদার সময় উভয় পা পৃথক রাখার কথা বলেছেন।
ইমাম তাহাবী রাহ. বলেন–
فرأينا السنة جاءت عن النبي ﷺ بالتجافي في الركوع والسجود، وأجمع المسلمون على ذلك، فكان ذلك من تفريق الأعضاء.
অর্থাৎ আমরা দেখি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত হচ্ছে রুকু এবং সিজদায় (অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাঝে) দূরত্ব রাখা। এ বিষয়ে সবার ঐকমত্যও রয়েছে। অতএব এর দ্বারা নামাযে অঙ্গসমূহকে পৃথক রাখার বিষয় সাব্যস্ত হয়। (শরহু মাআনিল আছার, ১/১৬৬)
ইমদাদুল আহকামে ইমাম তাহাবী রহ.-এর এ বক্তব্য উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে–
وكلام الطحاوي في معاني الآثار يفيد أن الإلصاق ليس مشروعا في شيء من الأعضاء في الركوع ولا في السجود للرجال، بل المشروع عكسه أي التجافي بينهما.
অর্থাৎ ইমাম তাহাবীর কথা থেকে বোঝা যায় যে, পুরুষের জন্য রুকু কিংবা সিজদায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো পরস্পর মিলিয়ে রাখা নিয়মসম্মত নয়; বরং নিয়মসম্মত পদ্ধতি হচ্ছে এর বিপরীত। অর্থাৎ উভয় অঙ্গের মাঝে দূরত্ব রাখা। (ইমদাদুল আহকাম ১/৪৭৮)
ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেন–
وهكذا أحب للساجد أن يكون متخويا، والتخوية أن يرفع صدره عن فخذيه، وأن يجافي مرفقيه وذراعيه عن جنبيه، ولا يلصق إحدى ركبتيه بالأخرى، ويجافي رجليه.
অর্থাৎ আমার নিকট পছন্দনীয় হল, সিজদাকারী তার বুক ঊরু থেকে উঠিয়ে আলাদা রাখবে। উভয় কনুই ও বাহু পার্শ্বদেশ থেকে দূরে রাখবে। এক হাঁটু আরেক হাঁটুর সাথে মিলিয়ে রাখবে না এবং উভয় পা পৃথক রাখবে। (কিতাবুল উম্ম ১/১৩৭)
ইবনে কুদামা রাহ. বলেন–
ويستحب أن يفرق بين ركبتيه ورجليه.
অর্থাৎ (সিজদাকারীর জন্য) উভয় হাঁটু এবং উভয় পায়ের মাঝে ফাঁকা রাখা মুস্তাহাব। (আলমুগনী ২/২০২)
উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে একটি বর্ণনায় উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রাখার কথাও এসেছে।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–
فَقَدْتُ رَسُوْلَ الله ﷺ وَكَانَ مَعِيْ عَلَى فِرَاشِيْ، فَوَجَدْتُهُ سَاجِدًا رَاصًّا عَقِبَيْهِ مُسْتَقْبِلًا بِأَطْرَافِ أَصَابِعِهِ الْقِبْلَةَ.
অর্থাৎ একবার আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিছানায় পেলাম না, অথচ তিনি আমার সঙ্গেই বিছানায় ছিলেন। (তখন আমি তাকে তালাশ করলাম) এরপর তাকে পেলাম সিজদারত অবস্থায়, তিনি উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রেখেছেন এবং আঙুলসমূহের অগ্রভাগ কিবলামুখী করে রেখেছেন। (সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ৬৫৪)
তবে এ হাদীসটি অন্য আরও সহীহসূত্রে বর্ণিত হয়েছে। সেই বর্ণনাগুলোতে رَاصًّا عَقِبَيْهِ (উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রেখেছেন) এ অংশটুকু নেই। (দ্রষ্টব্য : সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৮৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৮৭৫; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ৬৫৫)
হাকেম রাহ. এ হাদীস উল্লেখ করে বলেন–
لا أعلم أحدا ذكر ضم العقبين في السجود غير ما في هذا الحديث.
অর্থাৎ এই বর্ণনা ছাড়া অন্য কোথাও সিজদার সময় উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রাখার কথা কেউ উল্লেখ করেছেন বলে আমার জানা নেই। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ৯২৮)
হাকেম রাহ. হয়তো এ কথা দ্বারা এই হাদীসের উক্ত বর্ণনায় উভয় গোড়ালি মিলিয়ে রাখার অতিরিক্ত এ অংশটি শায (তথা বিচ্ছিন্ন) হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
তাছাড়া পায়ের গোড়ালি উভয়টি পুরোপুরি মিলিয়ে রাখলে সিজদার সময় পায়ের সকল আঙুল কিবলামুখী করে রাখা সম্ভব হয় না। অথচ একাধিক সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় উভয় পায়ের আঙুল কিবলামুখী করে রাখতেন। (দ্রষ্টব্য : সহীহ বুখারী, হাদীস ৮২৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৭৩২)
সেসব হাদীসের ভিত্তিতেও পায়ের গোড়ালি মিলিয়ে রাখার এই বর্ণনা অনুযায়ী আমল করা কঠিন।
অতএব এক্ষেত্রে এটিই নির্ভরযোগ্য বক্তব্য যে, সিজদায় উভয় পায়ের গোড়ালি পৃথক রেখে পায়ের আঙুলগুলো কিবলামুখী করে রাখবে।
–আলমাজমূ, নববী ৩/৪০৭; আসসিআয়া ২/১৮০-১৮১; বাকিয়াতে ফাতাওয়া রশীদিয়া, পৃ. ১৭১