রবিউল আখির ১৪৪৪ || নভেম্বর ২০২২

মাওলানা আবদুর রহমান - সিলেট

৫৯৯৩. প্রশ্ন

তালিবানে ইলমের আমলী তারাক্কী ও আমলের প্রতি অভ্যস্ত করার জন্য আমরা মাদরাসায় এমন নেযাম করতে চাচ্ছিলাম যে, প্রতি জুমাবার রাতের শেষাংশে সবাইকে জাগ্রত হতে হবে এবং ইনফেরাদীভাবে তাহাজ্জুদ আদায় করতে হবে। তাহাজ্জুদের পর সম্মিলিত যিকির ও দুআর আমল হবে।

 

উল্লেখ্য, শুধু জুমার রাতকে খাছ করার কারণ হল, যেহেতু সপ্তাহের অন্যান্য দিন দরস-তাদরীসের বিষয় থাকে, এজন্য অনেকের কষ্ট হতে পারে। সপ্তাহের অন্যান্য রাতেও ইনফেরাদীভাবে আমল করার প্রতি তারগীব দেয়া হয়। তবে সে দিনগুলোতে কেউ জাগিয়ে দেয় না এবং ইজতেমায়ীভাবে যিকির ও দুআর আমলও হয় না। এখন আমাদের জানার বিষয় হল-

১. এভাবে নফল ইবাদতের জন্য সবাইকে জাগিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে?

২. এভাবে সপ্তাহে এক দিন নির্ধারণ করে আমল করা কি ঠিক হবে?

৩. নফল ইবাদতের জন্য এভাবে নেযাম করে আমল করতে বাধ্য করা কি জায়েয হবে?

বিষয়গুলোর দলীলসহ শরয়ী সমাধান প্রদান করতে আপনার সুমর্জি কামনা করছি।

উত্তর

মুস্তাহাব বা নফল ইবাদত পালনের জন্য শরীয়ত তারগীব ও উৎসাহ প্রদান করেছে। তবে এ পর্যায়ের আমল পালনের জন্য ফরয ওয়াজিবের মত চাপ প্রয়োগ করেনি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, মুস্তাহাব ও সুন্নতে গায়রে মুআক্কাদার মত নফল ইবাদতগুলো শরীয়তে একদম মুবাহ আমলের মত; বরং হাদীস-আসার থেকে প্রমাণিত হয় যে, একজন মুসলিম ফরয-ওয়াজিবের সাথে মুস্তাহাব, নফল আমলও গুরুত্বের সাথে পালন করবে এবং নিজ পরিবার-পরিজন ও অধীনস্থকে তা পালনেও উৎসাহিত করবে। নিজ সন্তানাদিকে সেভাবে তরবিয়তও করবে। এমনকি আমলে অভ্যস্ত করার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে নিজ পরিমণ্ডলে অধীনস্থদের কিছুটা চাপও প্রয়োগ করতে পারবে। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে এতে অসুবিধা নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের জন্য আলী রা. ও ফাতেমা রা.-কে জাগ্রত করেছেন- তা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন, হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

إِنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ طَرَقَهُ وَفَاطِمَةَ بِنْتَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، فَقَالَ لَهُمْ: أَلاَ تُصَلّونَ؟، فَقَالَ عَلِيّ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنّمَا أَنْفُسُنَا بِيَدِ اللهِ، فَإِذَا شَاءَ أَنْ يَبْعَثَنَا بَعَثَنَا، فَانْصَرَفَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ حِينَ قَالَ لَهُ ذَلِكَ، وَلَمْ يَرْجِعْ إِلَيْهِ شَيْئًا، ثُمّ سَمِعَهُ وَهُوَ مُدْبِرٌ، يَضْرِبُ فَخِذَهُ وَهُوَ يَقُولُ: وَكَانَ الإِنْسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا.

একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর (অর্থাৎ হযরত আলী রা.) ও রাসূল-কন্যা ফাতিমার কাছে রাতে এলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা নামায (তাহাজ্জুদ) আদায় করছ না?

আলী বলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জীবন তো আল্লাহর হাতে। তিনি যখন আমাদেরকে ঘুম থেকে জাগাতে চান জাগিয়ে দেন। আমি এ কথা বলার পর, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে গেলেন। কথার কোনো উত্তর দিলেন না। যাওয়ার সময় তাঁকে উরুর ওপর আঘাত করে বলতে শুনেছি-

وَ كَانَ الْاِنْسَانُ اَكْثَرَ شَیْءٍ جَدَلًا.

[মানুষ অধিকাংশ বিষয়েই বিতর্কপ্রিয়।] -সূরা কাহ্ফ (১৮) : ৫৪]। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৩৪৭)

মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে, আলী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে একবার ডেকে জাগিয়ে তুলেছেন। এরপর তিনি গৃহে ফিরে নামাযে দাঁড়িয়েছেন। যখন তিনি আমাদের সাড়াশব্দ পেলেন না, তখন পুনরায় এসে জাগ্রত করলেন এবং বললেন, তোমরা উভয়ে ওঠ এবং নামায আদায় কর...। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭০৫)

যায়েদ বিন আসলাম রাহ. তার পিতা আসলাম রাহ. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-

أَنّ عُمَرَ بْنَ الْخَطّابِ كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللّيْلِ مَا شَاءَ اللهُ، حَتّى إِذَا كَانَ مِنْ آخِرِ اللّيْلِ،أَيْقَظَ أَهْلَهُ لِلصّلَاةِ. يَقُولُ لَهُمُ: الصّلَاةَ الصّلَاةَ، ثُمّ يَتْلُو هَذِهِ الْآيَةَ وَ اْمُرْ اَهْلَكَ بِالصَّلٰوةِ وَ اصْطَبِرْ عَلَیْهَا ؕ لَا نَسْـَٔلُكَ رِزْقًا ؕ نَحْنُ نَرْزُقُكَ ؕ وَ الْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوٰی

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. রাতে বেশকিছু সময় নামায আদায় করতেন। রাত্রের শেষভাগে নিজ পরিবারকে নামায আদায়ের জন্যে জাগিয়ে তুলতেন। তিনি তাদের বলতেন, নামায আদায় কর, নামায আদায় কর। তারপর এ আয়াত পাঠ করতেন-

وَ اْمُرْ اَهْلَكَ بِالصَّلٰوةِ وَ اصْطَبِرْ عَلَیْهَا ؕ لَا نَسْـَٔلُكَ رِزْقًا ؕ نَحْنُ نَرْزُقُكَ ؕ وَ الْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوٰی

[অর্থাৎ আপনার পরিবারের লোকজনকে নামাযের আদেশ করতে থাকুন। নিজেও (এ কষ্টের) জন্য ধৈর্য ধারণ করতে থাকুন। আমি আপনার নিকট রিযিক চাই না। রিযিক তো আমিই আপনাকে দান করি। আখিরাতের সফলতা তো মুত্তাকী লোকদের জন্য।] -সূরা ত-হা (২০) : ১৩২] (মুআত্তা মালেক, হাদীস ৫)

উপরোক্ত বর্ণনাতে যেমনিভাবে পরিবারের লোকদের নফলে উৎসাহিত করার বিষয়টি সামনে আসে, তেমনি তাদের উপর বেশি চাপ না দেওয়ার বিষয়টিও বুঝে আসে। কারণ, উমর রা. নিজে বেশি আগে উঠে নামায শুরু করলেও পরিবারের লোকদের রাতের শেষভাগে ওঠাতেন। মুসনাদে আহমাদে আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত অপর একটি হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

رَحِمَ اللهُ رَجُلًا قَامَ مِنَ اللّيْلِ، فَصَلّى،وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ، فَصَلّتْ، فَإِنْ أَبَتْ نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ، وَرَحِمَ اللهُ امْرَأَةً قَامَتْ مِنَ اللّيْلِ، فَصَلّتْ، وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا، فَصَلّى، فَإِنْ أَبَى، نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاءَ.

আল্লাহ রহম করুন ঐ ব্যক্তির ওপর যে রাতে ঘুম হতে জেগে নামায আদায় করে এবং স্ত্রীকেও জাগিয়ে দেয়, অতঃপর সেও নামায আদায় করে। স্ত্রী যদি জাগতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে যেন তার মুখম-লে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ রহম করুন ঐ স্ত্রীলোকের ওপর যে রাতে ঘুম হতে জাগ্রত হয় ও নামায আদায় করে এবং স্বামীকেও জাগিয়ে দেয়। স্বামী যদি জাগতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে যেন তার মুখম-লে পানি ছিটিয়ে দেয়। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭৪১০, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩৩৪

অপর এক হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. ও আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إِذَاأَيْقَظَالرّجُلُأَهْلَهُ مِنَ اللّيْلِ فَصَلّيَا، أَوْ صَلّى رَكْعَتَيْنِ جَمِيعًا، كُتِبَا فِي الذّاكِرِينَ وَالذّاكِرَاتِ.

কোনো ব্যক্তি যখন রাতের বেলায় নিজ স্ত্রীকে জাগ্রত করে উভয়ে দুই দুই রাকাত নামায আদায় করে তবে তাদেরকে যাকেরীন তথা আল্লাহর স্মরণকারী ও স্মরণকারিণীর তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩০৯)

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী কারী রাহ. বলেন-

(إذاأيقظالرجلأهله) أي: امرأته أو نساءه وأولاده وأقاربه وعبيده وإماءه.

ব্যক্তি তার পরিবারকে জাগানোর অর্থ হল, তার স্ত্রী, সন্তান, নিকটাত্মীয়, দাস-দাসীদের জাগিয়ে দেয়া। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৩/২৮২)

অর্থাৎ তাঁর মতে অধীনস্থ লোকগণও أهل -এর অন্তর্ভুক্ত।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহ. উক্ত হাদীসের উপর ভিত্তি করে বলেন-

وفيه حث عظيم على قيام الليل، حتى إن من لم يقم اختيارا يقام بالإزعاج.

এ হাদীসে তাহাজ্জুদের জন্য বিপুল উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এমনকি বলা হয়েছে, যে স্বেচ্ছায় উঠতে পারে না, তাকে ডেকে উঠিয়ে দেওয়া হবে। (শরহু সুনানি আবী দাউদ, আইনী ৫/২১৫)

ইবনুল মালাক রাহ. বলেন-

وهذا يدل على أن إكراهَ أحد على خير يجوزُ، بل يستحب.

এ হাদীস প্রমাণ বহন করে যে, কাউকে (অধীনস্থদের) সৎকর্ম পালনে  কিছুটা চাপ প্রয়োগ করা কেবল জায়েযই নয়; বরং (ক্ষেত্র বিশেষে) তা উত্তম কাজ। (শরহুল মাসাবীহ, ইবনুল মালাক ২/১৬৮)

আরও দ্রষ্টব্য : মিরকাতুল মাফাতীহ ৩/২৭৮

সুতরাং তালিবুল ইলমদের আমলী তারাক্কী ও অভ্যাসের জন্য তাহাজ্জুদ, যিকির-আযকার ও দুআর জন্য সুবহে সাদিকের কিছু আগে জাগিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত জায়েয। শরীয়তের দৃষ্টিতে তা আপত্তিকর নয়।

যে বিশেষ কারণে জুমার রাতে নফল ইবাদতে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে তাতেও অসুবিধার কিছু নেই। যে হাদীসে জুমার রাতকে কিয়ামুল লাইলের জন্য খাস করতে নিষেধ করা হয়েছে হাদীসব্যাখ্যাকারদের ভাষ্য অনুযায়ী তা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কারণ-

এক. কারো কারো মতে হাদীসে কিয়ামুল লাইল দ্বারা উদ্দেশ্য হল, পুরো রাত্রি জাগরণ। যার ফলে অনিদ্রা ও ক্লান্তির কারণে জুমার দিনের বিশেষ হুকুম জুমার নামায আদায়ে আলস্য ও উদাসীনতা ভর করে।

দুই. এ নিষেধাজ্ঞা ঐ ক্ষেত্রে যখন কেউ জুমার রাত্রি জাগরণকে আবশ্যক মনে করে করবে। কিন্তু প্রশ্নোল্লিখিত কারণে যদি জুমার রাতকে কিয়ামুল লাইলের জন্য নির্ধারণ করা হয় তবে সেক্ষেত্রে তা হাদীসের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না।

মোটকথা, জুমার রাতে জাগ্রত হওয়া, যিকির আযকার, দুআ মোনাজাত করা জুমার রাতের বিশেষ আমল বা অতিরিক্ত ফযীলত মনে করে যে করা যাবে না- এ বিষয়টি সবার নিকট স্পষ্ট থাকতে হবে; বরং জুমার রাতে মাদরাসার উক্ত আয়োজন ও পদক্ষেপটি ইন্তেযামী মাসলাহাতের কারণেই করা হচ্ছে তাও স্পষ্ট থাকা দরকার।

আরো উল্লেখ্য, তাহাজ্জুদের জন্য জাগ্রত করার ক্ষেত্রে কোমলতা ও নম্রতা অবলম্বন করা কর্তব্য। এক্ষেত্রে অসুস্থ বা শারীরিকভাবে দুর্বলদের ছাড় দিতে হবে। আর ঘুম থেকে জাগানোর ক্ষেত্রে প্রহার বা শাস্তির পথ অবলম্বন করা যাবে না; বরং তারগীবের মাধ্যমে তালিবে ইলমদের নফল ইবাদতে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করতে হবে।

এই সংখ্যার অন্যান্য প্রশ্ন-উত্তর পড়ুন