সফর ১৪৪১ || অক্টোবর ২০১৯

আতিকুল ইসলাম - মিরপুর, ঢাকা

৪৮৮৮. প্রশ্ন

আমি একজন মাজুর ব্যক্তি। বয়স আশির ঊর্ধ্বে। ৫০ বছরের উপর ডায়াবেটিস রোগসহ বহুমুখী রোগে আক্রান্ত। যেমম, কোমর ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, পায়ের তলা ব্যথা ও বোধহীন অবস্থা। ডাক্তার দেখালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে, কোমরের হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে। হাঁটুর ক্যালসিয়াম শুকিয়ে গেছে ইত্যাদি। ডাক্তারের নির্দেশ হল, হাঁটু ভাজ করা যাবে না। সিঁড়ি বাওয়া যাবে না। উপুর হওয়া যাবে না। ভারি কোনো জিনিস বহন করা যাবে না। চেয়ারে বসে নামায পড়তে হবে। হাই কমোড ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি। হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। কোমর ধরে ব্যথা শুরু হয়ে যায়।

বর্তমানে চেয়ারে বসে নামায পড়ি। কিন্তু চেয়ারে নামায পড়ার কারণে কপাল মাটিতে লাগে না বিধায় মনে খুব কষ্ট যে, আল্লাহ তাআলাকে সিজদা করতে পারছি না। নিয়মিত জামাতে নামায আদায় করতে পারছি না- হাঁটা-চলার কষ্টে। কখনো কখনো রাস্তা-ঘাটে বা বাসায় হাই কমোড না পাওয়ার কারণে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে হয়। এ ব্যাপারে শরীয়ত কী বলে? বয়সের কারণে নামাযের মধ্যে ভুল হয়ে যায়। এজন্য কী হুকুম? বেশির ভাগ ঘরেই নামায আদায় করি। সিজদা করার জন্য সিজদার জায়গায় একটি টেবিল বা উঁচু কাঠের কিছু যদি বানিয়ে নিই। এ ব্যাপারে কী হুকুম?

আর আশির ঊর্ধ্বে বয়সের কারণে ও ডায়াবেটিস থাকায় যৌন শক্তি না থাকলে তার জন্য পর্দার হুকুম কী? কুরআন-হাদীস মোতাবেক এর ফয়সালা চাই।

উত্তর

প্রশ্নে কয়েকটি  বিষয় জানতে চাওয়া হয়েছে।

ক. চেয়ারে বসে নামায আদায় করা এবং সামনে টেবিল বা কোনো কিছু রেখে তাতে সিজদা করা।

খ. অসুস্থতার কারণে মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ না করা।

গ. নামাযে ভুল হওয়া।

ঘ. দাঁড়িয়ে পেশাব করা।

ঙ. বয়স্ক ব্যক্তির জন্য পর্দার বিধান।

উত্তর (ক) :  প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী শারীরিক দুর্বলতা, হাঁটু-কোমরের ব্যথার কারণে আপনি যদি দাঁড়ানো থেকে স্বাভাবিক নিয়মে রুকু করতে এবং সমতলে সিজদা করতে সক্ষম না হন অথবা তা করা বেশ কষ্টসাধ্য হয় আর আপনার অসুস্থতাও এমন পর্যায়ের হয় যে, শুরু থেকে সমতলে বসেও নামায আদায় করা কষ্টকর হয় তাহলে এ অবস্থায় আপনার জন্য চেয়ারে বসে ইশারায় রুকু সিজদা করে নামায আদায় করা ঠিক আছে।

এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হল, আপনি যদি দাঁড়িয়ে নামায শুরু করতে সক্ষম হন এবং নামায অবস্থায় দাঁড়ানো থেকে রুকু-সিজদার জন্য চেয়ারে বসতে অসুবিধা না হয় তাহলে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী নামাযের কিয়াম আপনাকে দাঁড়িয়েই আদায় করতে হবে। অতপর রুকু-সিজদা এবং বৈঠক চেয়ারে বসে আদায় করবেন।

ইশারায় সিজদা আদায় করার ক্ষেত্রে সামনে টেবিল, কাঠ ইত্যাদি উঁচু বস্তু রাখবে না। কেননা সিজদার জন্য সামনে টেবিল বা উঁচু বস্তু রাখা দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়; বরং কোনো কোনো সাহাবী-তাবেয়ী এমনটি করতে নিষেধ করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২৮২৮-২৮৪১)

আর অসুস্থতার কারণে জমিনে সিজদা না করতে পারার যে আক্ষেপের কথা আপনি উল্লেখ করেছেন, একজন মুমিনের এ আক্ষেপ থাকাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলার জন্য সিজদায় মাটিতে লুটিয়ে পড়া একজন মুমিনের পরম পাওয়া ও সৌভাগ্যের বিষয়।

তবে এটাও ঠিক যে, সুস্থতা অসুস্থতা আল্লাহ তাআলারই দান। অসুস্থ অবস্থার ইবাদত-বন্দেগী, রুকু-সিজদা আল্লাহ তাআলার নিকট সুস্থ অবস্থার মতই গ্রহণযোগ্য ও প্রিয়।

হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إِذَا مَرِضَ العَبْدُ أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا.

বান্দা যখন অসুস্থ হয় বা সফরে বের হয় তখন মুকীম ও সুস্থ অবস্থায় সে যা আমল করত ঐ সাওয়াবই তার জন্য লিখা হয়। (সহীহ বুখারী, হাদীস  ২৯৯৬)

প্রকাশ থাকে যে, বর্তমানে সামান্য অসুস্থতা, দুর্বলতা, হালকা ব্যথা-বেদনার অযুহাতে চেয়ারে বসে নামায আদায়ের প্রবণতা অনেকের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। দিন দিন এ প্রবণতা বেড়েই চলছে। ফলে মসজিদে মসজিদে চেয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ চেয়ারে বসে নামায আদায়কারীদের মধ্যে এমন লোকও থাকে, যার জন্য সামান্য ঐ অসুস্থতা বা দুর্বলতা নিয়ে ফরয-ওয়াজিব নামায চেয়ারে বসে আদায় করা জায়েযই নয়। এবং এক্ষেত্রে চেয়ারে বসে ইশারায় রুকু সিজদা করে নামায আদায় করার কারণে তার নামাযই শুদ্ধ হয় না। এমন অনেক ব্যক্তিও থাকেন, যারা হাঁটা-চলা, উঠাবসা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবেই করে যাচ্ছেন। কিন্তু নামাযের সময় তারা মাযুর হয়ে চেয়ার নিয়ে বসে পড়েন। এটি খুবই দুঃখজনক।

এজন্য চেয়ারে বসে নামায আদায়ের জায়েয-নাজায়েয দিকগুলো কোনো নির্ভরযোগ্য আলেম থেকে জেনে নেওয়া দরকার।

উত্তর (খ) : পুরুষের জন্য ফরয নামায মসজিদে জামাতের সাথে আদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করা যদি কষ্টকর না হয় এবং হাঁটা-চলার কারণে রোগ-ব্যাধি বেড়ে না যায় তাহলে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামায আদায় করার চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু যদি মসজিদে যাতায়াতের কারণে ব্যথা-বেদনা বেড়ে যায় তাহলে মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ না করলে গুনাহ হবে না।

উত্তর (গ) : আপনি নামাযে ভুল হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কী ধরনের ভুল হয় তা উল্লেখ করেননি। তাই ভুলের দিকগুলো নির্দিষ্ট করে প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ।

উত্তর (ঘ) : প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে লো কমোডে বা সমতলে পেশাব করা যেহেতু আপনার জন্য কষ্টকর তাই হাই কমোডের ব্যবস্থা না থাকলে দাঁড়িয়ে পেশাব করা যাবে। এতে অসুবিধা নেই। তবে সম্ভব হলে হাই কমোডের ব্যবস্থা করে নেওয়া ভালো।

উত্তর (ঙ) : বৃদ্ধ পুরুষের জন্যও বেগানা নারীর সাথে পর্দা করা ফরয। আশি বা তদোর্ধ্ব বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের থেকে পর্দার বিধান রহিত হয়ে যায় না। তাই এ বয়সেও পরনারীর সাথে পর্দা রক্ষা করে চলতে হবে। পরনারীর সাথে নির্জনবাস, ঘনিষ্ঠতা, তার থেকে শারীরিক খেদমত নেওয়া বা দেখা-সাক্ষাৎ জায়েয হবে না।

হাঁ, কোনো মহিলা যদি আপনার শারীরিক অসুস্থতা বা কোনো বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে আসে তাহলে তার সাথে কুশলাদি বিনিময় করা দূষণীয় হবে না। এমনিভাবে পর্দার আড়ালে থেকে কেউ আপনার খাবার-দাবার ও ঔষধ-পত্রও দিতে পারবে।

-উমদাতুল কারী ৩/১৩৫; তুহফাতুল ফুকাহা ৩/৩৩৩; বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৮৪; ফাতহুল কাদীর ২/৪৫৭; আলবাহরুর রায়েক ১/২৪৩; মারাকিল ফালাহ পৃ. ৩০; ইলাউস সুনান ৭/২০১

এই সংখ্যার অন্যান্য প্রশ্ন-উত্তর পড়ুন

advertisement
advertisement