কুকুরের লালা কাপড়ে লাগলে তা কতবার ধৌত করলে পাক হবে?
কুকুরের লালা কাপড়ে লাগলে তা কতবার ধৌত করলে পাক হবে?
কুকুরের লালা নাপাক। তা কাপড়ে লাগলে ভালোভাবে তিনবার ধুয়ে নেবে। এতে কাপড় পাক হয়ে যাবে।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
إِذَا وَلَغَ الْكَلْبُ فِيْ الْإِنَاءِ فَأهْرِقْهُ، ثُمَّ اغْسِلْهُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ.
অর্থাৎ কুকুর যদি কোনো পাত্রে মুখ দেয়, তাহলে সেই পাত্রের জিনিস ফেলে দিয়ে তিনবার ধুয়ে নাও। (সুনানে দারাকুতনী, হাদীস ১৯৬; আলইমাম, ইবনু দাকীকিল-ঈদ ১/২৬৪)
মানসূর রাহ. থেকে বর্ণিত—
عَنْ إبْرَاهِيمَ؛ فِي الْكَلْبِ يَلَغُ فِي الإِنَاءِ، قَالَ: اغْسِلْهُ حَتَّى تُنْقِيَهُ.
ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেছেন, কোনো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে পাত্রটি এ পরিমাণ ধুয়ে নেবে, যাতে তা পরিপূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১৮৪৩)
অবশ্য বিভিন্ন হাদীসে এক্ষেত্রে সাতবার ধোয়ার কথাও এসেছে। তাই সাতবার ধুয়ে নিলে উত্তম হবে।
আর এক্ষেত্রে সম্ভব হলে সাথে সাবান বা ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা আর পাত্র হলে তাতে মাটি ব্যবহার করাও উত্তম হবে।
শেয়ার লিংক* >شرح مختصر الكرخي< للقدوري ১/১৯৫: قال أصحابنا: إن تطهير الإناء من ولوغ الكلب لا يختص بعدد، وإنما يعتبر غالب الظن في طهارته.
—শরহু মুখতাসারিত তাহাবী, ইসবীজাবী ১/৯৮; গায়াতুল বায়ান ১/৪১৫; শরহুল মুনইয়া, পৃ. ১৯৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৪
আমার নানা দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ। মলদ্বারে সমস্যা থাকার কারণে ডায়াপার পরানো হয়। হাঁটুর হাড় ক্ষয় হয়ে যাওয়ার কারণে উঠে দাঁড়াতে পারেন না।
জানার বিষয় হল, তিনি কি তায়াম্মুম করে নামায আদায় করতে পারবেন? বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, তার এমন কোনো রোগ নেই, যা পানি ব্যবহার করলে বেড়ে যাবে। আবার তিনি নিজে নিজে ওযু-গোসল করতেও সক্ষম নন। পেশাব-পায়খানা গুরুত্ব সহকারে পরিষ্কার করা হলেও ওযু করিয়ে দেওয়ার মতো লোক পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় তিনি কীভাবে নামায পড়বেন?
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী আপনার নানার যেহেতু পানি ব্যবহারের কারণে শারীরিক কোনো ক্ষতি হয় না, তাই এক্ষেত্রে যখন সহজে তাকে ওযু করিয়ে দেওয়ার মতো লোক থাকবে, তখন তিনি ওযু করেই নামায আদায় করবেন। আর যখন তাকে ওযু করিয়ে দেওয়ার মতো লোক থাকবে না, তখন তিনি তায়াম্মুম করতে পারবেন।
শেয়ার লিংক* >المبسوط< للسرخسي ১/১১২: فإن كان لا يستضر بالماء، ولكنه للمرض عاجز عن التحرك للوضوء، فظاهر المذهب أنه إن وجد من يستعين به في الوضوء لا يجوز له التيمم، وإن لم يجد من يعينه في الوضوء فحينئذ يتيمم؛ لتحقق عجزه عن الوضوء.
—আলফাতাওয়া মিন আকাবীলিল মাশায়েখ, পৃ. ৪৫; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ১/৩০৬; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/৩৮; হালবাতুল মুজাল্লী ১/২০৭
আসর নামাযের পর থেকে মাগরিবের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যে সময় থাকে, ওই সময় কি কোনো নামায পড়া যাবে?
আসর নামায আদায়ের পর থেকে মাগরিবের ওয়াক্ত আসা পর্যন্ত সব ধরনের নফল নামায পড়া নিষেধ। তবে আসর নামাযের পর সূর্য হলুদ বর্ণ ধারণ করার আগ (সূর্যাস্তের ১০-১২ মিনিট পূর্ব) পর্যন্ত ফরয ও ওয়াজিব নামাযের কাযা, তিলাওয়াতের সিজদা, জানাযার নামায পড়া জায়েয আছে। আর সূর্য হলুদ বর্ণ ধারণ করার পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত ওই দিনের আসর নামায ছাড়া অন্য কোনো নামায পড়া জায়েয নয়।
হাদীস শরীফে এসেছে, উকবা ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
ثَلَاثُ سَاعَاتٍ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَانَا أَنْ نُصَلِّيَ فِيْهِنَّ، أَوْ أَنْ نَقْبُرَ فِيْهِنَّ مَوْتَانَا: حِيْنَ تَطْلُعُ الشَّمْسُ بَازِغَةً حَتّٰى تَرْتَفِعَ، وَحِيْنَ يَقُوْمُ قَائِمُ الظَّهِيْرَةِ حَتّٰى تَمِيْلَ الشَّمْسُ، وَحِيْنَ تَضَيَّفُ الشَّمْسُ لِلْغُرُوْبِ حَتّٰى تَغْرُبَ.
তিন সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নামায পড়তে ও মৃত ব্যক্তির জানাযা আদায় করতে নিষেধ করেছেন—
১. সূর্য উদিত হওয়ার সময়; যতক্ষণ না ওপরে উঠে যায়।
২. মধ্য দুপুরে; যতক্ষণ না সূর্য মধ্যাকাশ থেকে ঢলে পড়ে।
৩. সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হওয়ার সময়; যতক্ষণ না পূর্ণ অস্ত যায়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৩১)
শেয়ার লিংক* >المبسوط< للسرخسي ১/১৫০: واعلم بأن الأوقات التي تكره فيها الصلاة خمسة، ثلاثة منها لا يصلى فيها جنس الصلوات: عند طلوع الشمس إلى أن تبيض، وعند غروبها إلا عصر يومه، فإنه يؤديها عند الغروب.
—কিতাবুল আছল ১/১২৫; তুহফাতুল ফুকাহা ১/১০৫; আলমুহীতুর রাযাবী ১/১৯৯; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৭৪; আলগায়া, সারুজী ২/১৮২; শরহুল মুনইয়া, পৃ. ২৩৫; আদ্দুররুল মুখতার ১/৩৮০
একদিন আমার মসজিদে যেতে একটু বিলম্ব হয়ে যায়, ফলে আমি জামাত ধরার জন্য দ্রুত মসজিদে ছুটে যাই। মসজিদে গিয়ে দেখি, ভুলে টুপি আনা হয়নি। এদিকে জামাতও শেষ হয়ে যাচ্ছিল, তাই টুপি ছাড়াই জামাতে শরীক হয়ে যাই।
জানার বিষয় হল, এভাবে টুপি ছাড়া নামায পড়ায় আমার নামাযে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না?
আপনার নামায আদায় হয়ে গেছে। তবে মাথা ঢেকে নামায পড়া মুস্তাহাব। নামাযে বিনা ওজরে মাথা খোলা রাখা অনুত্তম।
শেয়ার লিংক—ফাতাওয়া সুগদী, পৃ. ৪৬; আলমুলতাকাত ফিল ফাতাওয়া, পৃ. ৬৩; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ১/৫২৯; হালবাতুল মুজাল্লী ২/২৪৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১০২
আমাদের মসজিদের দুটি টাইলসের মধ্যে নকশার কারণে মানুষের মাথার আকৃতি-বিশেষ মনে হচ্ছে। দূর থেকে আরও ভালো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এটা সরাসরি মানুষের মাথার আকৃতি নয়। টাইলসের ডিজাইনের কারণে এ রকম মনে হচ্ছে।
এখন আমাদের করণীয় কী? আমাদের নামায কি সহীহ হবে?
প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী টাইলসের উক্ত নকশা বা ডিজাইনটি মূলত মাথার কোনো আকৃতিই নয়। এটি শরীয়ত নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই তাতে নামায পড়তে কোনো অসুবিধা নেই। এটি সাধারণত দৃষ্টিভ্রমের কারণে হয়ে থাকে। তাই এ নিয়ে সংশয় করা ঠিক নয়।
শেয়ার লিংক* >فتاوى قاضيخان< ১/১১৯ : ويكره أن يصلي وبين يديه أو فوق رأسه الصورة كبيرة تبدو للناظر من غير تكلف، فإن كانت صغيرة أو ممحوة الرأس لا بأس به.
—ফাতহুল কাদীর ১/৩৬৩; আননাহরুল ফায়েক ১/২৮৪; আদ্দুররুল মুখতার ১/৬৪৮
একজন হাফেয সাহেব তারাবীর নামাযে সিজদার আয়াতের আগের আয়াত পড়ে সিজদা করেছেন। এরপর সিজদার আয়াত পড়ে সঙ্গে সঙ্গে রুকু-সিজদা করে স্বাভাবিকভাবে নামায শেষ করেছেন।
জানার বিষয় হল, ওই নামায কি সহীহ হয়েছে?
প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করার আগেই সিজদায়ে তিলাওয়াত করা নিয়ম পরিপন্থি হয়েছে এবং এর কারণে সাহু সিজদা আবশ্যক হয়েছিল। তাই এক্ষেত্রে নামায শেষে সাহু সিজদা না করে থাকলে তা ঠিক হয়নি। ভবিষ্যতে এমন ভুল হয়ে গেলে সাহু সিজদা করে নেবে।
আর এক্ষেত্রে ইমাম সিজদার আয়াতটি পড়ার পরই যেহেতু রুকুতে চলে গেছেন (এরপর দুই আয়াতের বেশি তিলাওয়াত করেননি), তাই ওই রাকাতের সিজদার মাধ্যমেই ইমাম-মুক্তাদী সকলের উক্ত সিজদায়ে তিলাওয়াত আদায় হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, নামাযে এভাবে সিজদায়ে তিলাওয়াত আদায় হয়ে গেলেও উত্তম ও যথার্থ পন্থা হচ্ছে, সিজদার আয়াত পড়ার পর পৃথক সিজদার মাধ্যমে তা আদায় করা।
শেয়ার লিংক—কিতাবুল আছল ১/২১১; আলমাবসূত, সারাখসী ২/৮; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/১৮৬; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/৪০৩; মাজমাউল আনহুর ১/২৩৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/১১২
আমার এক নাতি মাদরাসায় পড়ে। তার ভর্তির জন্য আমি কি তাকে যাকাতের টাকা দিতে পারব? এতে কি আমার যাকাত আদায় হবে? অবশ্য তাদেরকে যাকাতের টাকার কথা জানানো হয় না। জানতে পারলে আমার মেয়ে হয়তো কষ্ট পাবে।
নিজ সন্তানের সন্তান (নাতি, নাতনি)-কে যাকাত দেওয়া যায় না। তাই নাতিকে যাকাতের অর্থ দিলে আপনার যাকাত আদায় হবে না। অতীতে এভাবে কোনো টাকা দিয়ে যাকাতের নিয়ত করে থাকলে সে পরিমাণ টাকা যাকাত হিসাবে উপযুক্ত ব্যক্তিদের আদায় করে দিতে হবে।
আপনি তার ভর্তির টাকা দিতে চাইলে যাকাত থেকে না দিয়ে সাধারণ দান হিসেবে দেবেন। এতে আপনি দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী হবেন।
সালমান বিন আমের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
اَلصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِيْنِ صَدَقَةٌ، وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ.
দরিদ্রকে সদকা করলে তা কেবল সদকাই হয়। আর আত্মীয়কে দিলে তাতে রয়েছে দুটি সওয়াব, একটি হল সদকা এবং আরেকটি আত্মীয়তা রক্ষা। (জামে তিরমিযী, হাদীস ৬৫৮)
শেয়ার লিংক—আলজামিউস সগীর, পৃ. ১২২; আলমাবসূত, সারাখসী ৩/১১; বাদায়েউস সানায়ে ২/১৬২; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/২১২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৮৮; রদ্দুল মুহতার ২/২৫৮
আমার ভাই আমার থেকে ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে ব্যাবসা ও বাড়ি নির্মাণ বাবত টাকা নেয়। ২০২৬ সালে এসে সে এখন চাকরি করে। সংসার খরচ চালাতে পারে। কিন্তু তেমন কোনো পুঁজি নেই। তার নেসাব পরিমাণ সম্পদও নেই। সে আমার দেওয়া ঋণের টাকা দিচ্ছে না এবং নিকট ভবিষ্যতে পরিশোধ করার সম্ভাবনাও দেখছি না। কারণ ঋণের পরিমাণ ১০ লক্ষেরও অধিক।
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি তাকে যাকাত দিতে পারব? এবং তাকে যদি যাকাত দিই, নগদ অর্থ তার হাতে দেওয়ার পর তাকে কোনো জোর বা শর্ত না দিয়ে বিনয়ের সাথে বলতে পারি কি না যে, যদি তুমি চাও এটা থেকে আমার ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে পারো?
আপনার ভাই যদি বাস্তবেই যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হয়, তাহলে আপনি তাকে যাকাত দিতে পারবেন। তবে ঋণ পরিশোধের শর্তে যাকাত দেওয়া যাবে না; বরং যাকাত দিতে হবে বিনা শর্তে; স্বাভাবিক নিয়মে। এভাবে বিনা শর্তে তাকে যাকাতের টাকা দিলে তা পরিপূর্ণভাবে বুঝে পাওয়ার পর সে ওই টাকার মালিক হয়ে যাবে এবং এর দ্বারা আপনার যাকাত আদায় হয়ে যাবে।
এরপর আপনি চাইলে তাকে আপনার পাওনা পরিশোধের কথা বলতে পারেন। তখন সে যদি ওই টাকা দিয়ে আপনার পাওনা পরিশোধ করে দেয়, তাহলে আপনি তা গ্রহণ করতে পারবেন।
শেয়ার লিংক* >الملتقط في الفتاوى< ص ৭৮ : ولو دفع الزكاة إلى مطلوبه المعسر، ثم دفعه إلى الطالب قضاء ما عليه، يباح ذلك إن كان بغير شرط، وإن كان بشرط لا يباح.
—ফাতাওয়া সিরাজিয়া, পৃ. ২৬; আলগায়া, সারুজী ৭/৮০, ১২৪; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/১৯৬, ২০৬; রদ্দুল মুহতার ২/২৭১, ৩৪৬
আমার জানা আছে, হজ্বের জন্য টাকা জমা রাখলে সেই টাকারও যাকাত দিতে হয়। প্রশ্ন হল, যে টাকা এজেন্সিকে হজ্ব বাবদ আদায় করে দেওয়া হয়, সেই টাকারও কি যাকাত আদায় করতে হবে?
হজ্ব এজেন্সিকে হজ্বের খরচ ও ফি বাবদ যে টাকা পরিশোধ করে দেওয়া হয়ে গেছে, সেই টাকার যাকাত হজ্বযাত্রী আদায় করবে না। সে তা পরিশোধ করে দেওয়ার পর ওই টাকার মালিক এজেন্সি হয়ে যায়। অতএব এরপর ওই টাকা জমাকারীর মালিকানায় না থাকায় এর যাকাত তার ওপর আসবে না।
তবে কেউ যদি ভবিষ্যতে হজ্বে যাওয়ার নিয়তে নিজের কাছেই টাকা জমা রাখে এবং তা নেসাব পরিমাণ হয় এবং বছরও পুরা হয়ে যায়, তাহলে তাকে সেক্ষেত্রে ওই টাকার যাকাত আদায় করতে হবে।
শেয়ার লিংক—আলজামিউল কাবীর, পৃ. ২৫; খিযানাতুল আকমাল ১/২৬৩; শরহুল জামিইল কাবীর, আত্তাবী ১/৩৪৬-৩৪৮; আলবাহরুর রায়েক ২/২০৩; রদ্দুল মুহতার ২/২৬২
আমার এক আত্মীয় তামাত্তু হজ্বের নিয়ত করে হজ্বে গিয়েছেন। তারপর সেখানে উমরা করে হালাল হয়ে যাওয়ার পর জেদ্দায় গিয়েছেন। জেদ্দা থেকে মক্কায় ফেরার সময় নতুন কোনো উমরা বা হজ্বের নিয়ত করেননি এবং নতুন করে ইহরামও করেননি। তার কি এমন করা ঠিক হয়েছে? জেদ্দা কি হেরেমের সীমানার ভেতরে, যার ফলে জেদ্দা থেকে আসতে হলে আর নতুন করে ইহরাম করতে হয় না? যদি তার ওপর নতুন করে ইহরাম করা আবশ্যক হয়, তাহলে তা না করার কারণে এখন কি দম দিতে হবে?
জেদ্দা হেরেমের সীমানার ভেতরে নয়, তবে তা মীকাতের ভেতর ‘হিল’ এলাকার অন্তর্ভুক্ত। আর হিলের কোনো এলাকা থেকে হেরেমের ভেতর হজ্ব-উমরার নিয়ত ছাড়া এমনিই আসতে চাইলে ইহরাম ছাড়া আসার সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে ইহরাম না করলে কোনো জরিমানা ওয়াজিব হয় না। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার ওই আত্মীয় ইহরাম ছাড়া জেদ্দা থেকে মক্কায় আসার কারণে কোনো দম বা জরিমানা কিছুই আবশ্যক হয়নি।
শেয়ার লিংক* >المبسوط< للسرخسي ৪/ ১৭০: والمكي إذا خرج من مكة لحاجة له فلم يجاوز الوقت، فله أن يدخل مكة بغير إحرام، وإن جاوز لم يكن له أن يدخل مكة إلا بإحرام، لما بينا أن من قصد إلى موضع فحاله في حكم الإحرام كحال أهل ذلك الموضع.
* >النهاية في شرح الهداية< للسغناقي ৩/২৬৬ : أنه إذا فرغ من العمرة صار مكيا حكما في حق الميقات.
—আলমাবসূত, সারাখসী ৪/১৬৮; আলমুহীতুর রাযাবী ২/১৬৫; আলবাহরুল আমীক ১/৬১৪; রদ্দুল মুহতার ২/৪৭৭; গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ৫৫
আমি আমার স্ত্রীকে আমার শালির বাসায় যেতে নিষেধ করেছি। কারণ আমার শালির স্বামীর চরিত্র খারাপ। তাদের বাসায় না যাওয়ার জন্য আমি তাকে শাসন করতে গিয়ে বলেছি, ‘তুমি যদি আমার অনুমতি ছাড়া তাদের বাসায় যাও, তাহলে বিনা তালাকে তুমি তালাক’। এভাবে দুইবার বলেছি। আমার স্ত্রী এখন পর্যন্ত তাদের বাসায় যায়নি। এখন সে তাদের বাসায় যেতে চাচ্ছে। তাই জানতে চাচ্ছি, এখন করণীয় কী?
আপনি যেহেতু তালাকের বিষয়টিকে বিনা অনুমতিতে যাওয়ার সাথে শর্তযুক্ত করেছেন, তাই আপনার অনুমতি না নিয়ে আপনার স্ত্রী তার বোনের বাসায় গেলে তালাক পতিত হবে। অবশ্য আপনার অনুমতি নিয়ে সেখানে গেলে তালাক পতিত হবে না।
এজন্য আপনি চাইলে ভবিষ্যতের জন্য তাকে এভাবে ব্যাপক অনুমতি দিয়ে দিতে পারেন যে, তোমাকে সব সময়ের জন্য সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে রাখলাম। এভাবে ব্যাপক অনুমতি দিয়ে দেওয়ার পর ওই বাসায় প্রত্যেকবার আপনার অনুমিত না নিয়ে গেলেও ওই কথার কারণে তার ওপর আর কোনো তালাক পতিত হবে না।
প্রকাশ থাকে যে, তালাক হচ্ছে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্নকারী চূড়ান্ত পদক্ষেপ। দাম্পত্য জীবনের সমস্যা একেবারে জটিল হয়ে পড়লে এবং সমস্যা নিরসনের কোনো উপায় না থাকলে তা থেকে নিষ্কৃতির সর্বশেষ পথ। তাই কোনো বিষয় বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে তালাক দেওয়া বা তালাকের শর্ত জুড়ে দেওয়া অন্যায় ও গোনাহের কাজ। মুসলমানদের এহেন কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
শেয়ার লিংক* كتاب >الأصل< للشيباني ৯/৪৭৮: قلت: أرأيت إن قال لها: إن دخلت دار أبيك إلا بإذني، فأذن لها، فدخلت، ثم دخلت مرة بغير إذنه، أيحنث؟ قال: نعم. قلت: فكيف الوجه في ذلك حتى تدخل الدار كلما شاءت، ولا تستأمر ولا يحنث؟ قال: يقول لها الزوج: قد أذنت لك في دخول هذه الدار كلما شئت، فتدخل كلما شاءت، ولا يحنث الزوج.
—তুহফাতুল ফুকাহা ২/৩০৭; বাদায়েউস সানায়ে ৩/৭০; আলমুহীতুল বুরহানী ৫/১০৩; আসসিরাজুল ওয়াহ্হাজ ১২/১৩৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৪৩৯
আমাদের এক সাথি প্রবাসে থাকে। সে অনেকদিন আগে বাড়িতে থাকা অবস্থায় তার স্ত্রীকে মৌখিক এক তালাক দিয়েছিল। পাঁচ-ছয়দিন পর আবার একসাথে থাকে। এর প্রায় দুই বছর পর মৌখিক আরও এক তালাক দেয়। কিছুদিন পর আবার একসাথে থাকে। বর্তমানে সে প্রবাসে আছে। কোনো বিষয়ে মনোমালিন্যের কারণে এখন আবার তার স্ত্রীকে মেসেজে তালাক লিখে পাঠায়, মৌখিক এখন পর্যন্ত কিছু বলেনি। এখন তাদের দাম্পত্য জীবন ঠিক থাকবে, নাকি তালাক পতিত হয়ে যাবে? হলে সর্বমোট কত তালাক পতিত হবে। জানিয়ে বাধিত করবেন।
উল্লেখ্য, সে কারও থেকে শুনেছে, দীর্ঘদিন পরপর একটি করে তালাক দিলে পূর্বের তালাক বাতিল হয়ে যায়। এ কথার কোনো বাস্তবতা আছে কি না?
আজকে সে যে তালাকটা লিখেছে তার কপিটা নিম্নরূপ—
তোমাকে আমি সজ্ঞানে তালাক দিলাম। আমার সাথে যোগাযোগ করবা না।
প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তির পূর্বের প্রদত্ত দুই তালাকের পর মোবাইল মেসেজে দেওয়া তৃতীয় তালাকটি কার্যকর হয়ে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তারা একে অপরের জন্য পরিপূর্ণ হারাম হয়ে গেছে।
অতএব, এ অবস্থায় তাদের আর ঘর-সংসার করার কোনোই সুযোগ নেই। এমনকি নতুন করে পুনরায় বিবাহ পড়িয়ে নিলেও তারা একে অন্যের জন্য হালাল হবে না।
তৃতীয় তালাকের দিন থেকে মহিলাটি ঋতুমতী হলে পূর্ণ তিনটি ঋতুস্রাব আর অন্তঃসত্ত্বা হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। ইদ্দত চলাকালীন তার ভরণ-পোষণ তালাকদাতার জিম্মায় থাকবে। মহর অনাদায়ি থাকলে তাও তাকে আদায় করে দিতে হবে।
ইদ্দত শেষ হওয়ার পর ওই মহিলা চাইলে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। কিন্তু তিন তালাক হয়ে যাওয়ার কারণে ইদ্দতের ভেতর কিংবা ইদ্দতের পরও তালাকদাতা স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্য ইদ্দত শেষ হওয়ার পর মহিলাটির যদি অন্যত্র বিবাহ হয় এবং সেখানে দাম্পত্য সম্পর্ক (স্বামী-স্ত্রী মিলন) হয় এরপর কখনও যদি ওই স্বামী মৃত্যুবরণ করে বা সে তাকে তালাক দিয়ে দেয়, তবে ওই স্বামীর মৃত্যু বা তালাকের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তারা উভয়ে চাইলে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।
উল্লেখ্য, তালাক হচ্ছে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্নকারী চূড়ান্ত পদক্ষেপ। দাম্পত্য জীবনের সমস্যা একেবারে জটিল হয়ে গেলে এবং সমস্যা নিরসনের আর কোনো উপায় না থাকলে তা থেকে নিষ্কৃতির সর্বশেষ পথমাত্র। তাই তালাকের ব্যাপারে অত্যন্ত ভেবে-চিন্তে, বিজ্ঞ আলেমের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। বিনা কারণে অথবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তালাক দেওয়া কিংবা একসাথে তিন তালাক দেওয়া— সবই অন্যায় ও গোনাহের কাজ। ক্ষেত্রবিশেষে তা স্ত্রী সন্তানদের ওপর জুলুমও বটে। তাই মুসলমানদের এসব থেকে বিরত থাকা উচিত।
আরও উল্লেখ্য, তালাক যতদিন আগেই দেওয়া হোক, কম দিনের ব্যবধানে দেওয়া হোক বা বেশি দিনের; উভয় ক্ষেত্রেই তা জমা থাকে। তালাক দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হওয়ার কারণে তা বাতিল হয়ে যায় না। তাই দীর্ঘদিন পরপর একটি করে তালাক দিলে পূর্বের তালাক বাতিল হয়ে যায়— এ কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুল কথা।
শেয়ার লিংক—সূরা বাকারা (০২) : ২২৮, ২৩০; সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৬১; কিতাবুল আছল ৪/৩৯২, ৪০৩, ৫১৬; বাদায়েউস সানায়ে ৩/২৮২, ২৯৫; আলমুহীতুল বুরহানী ৪/৪৮৪; আলবাহরুর রায়েক ৩/২৩৫
আমি একটি কাজ না করার বিষয়ে কসম করি। কিন্তু সে কসম ভঙ্গ করি। এরপর আবার সে বিষয়ে কসম করে সেটাও ভঙ্গ করি। এভাবে কয়েকবার একই বিষয়ে কসম করি এবং প্রত্যেকবার তা ভঙ্গ করি।
আমার জানার বিষয় হল, প্রত্যেকটি কাজের জন্য কি আলাদা আলাদা কাফফারা দিতে হবে?
হাঁ, এক্ষেত্রে প্রতিটি কসম ভঙ্গের জন্য আপনাকে আলাদা আলাদা কাফফারা আদায় করতে হবে; সবগুলো কসমের জন্য একটি কাফফারা যথেষ্ট হবে না। কেননা প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে একই বিষয়ে কসম করা হলেও যেহেতু প্রতিবার কসম করে ভেঙে ফেলা হয়েছে, তাই এক্ষেত্রে প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র কসম হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা কাফফারা দেওয়া আবশ্যক।
শেয়ার লিংক—ফাতাওয়া সিরাজিয়া, পৃ. ৫৮; আলবাহরুর রায়েক ৪/২৯১; রদ্দুল মুহতার ৩/৭১৪
আমাদের এলাকার ওয়াকফকৃত কবরস্থান ফান্ডে কয়েক লক্ষ টাকা আছে। অপরদিকে এলাকার মসজিদের ফান্ড টাকা-শূন্য। মসজিদের এখন কিছু টাকার দরকার। তাই মসজিদ কমিটি কবরস্থানের ফান্ড থেকে কিছু টাকা মসজিদ ফান্ডে নিয়ে আসতে চাচ্ছে।
জানার বিষয় হল, কবরস্থানের টাকা কোনোভাবে মসজিদ ফান্ডে আনা যাবে কি না?
না, কবরস্থান ফান্ডের টাকা মসজিদ ফান্ডে আনা এবং তা মসজিদের কাজে ব্যবহার করা জায়েয হবে না। মসজিদের জরুরি খরচাদি মুসল্লীগণ সম্মিলিত অনুদান ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে আঞ্জাম দেবেন। আর কবরস্থানের টাকা বিদ্যমান কবরস্থান উন্নয়ন এবং প্রয়োজনে তা সম্প্রসারণ বা (যদি এখানে বাড়ানোর জায়গা না থাকে) ভিন্ন জায়গায় আরও কিছু কবরের জায়গা খরিদ করা— এ ধরনের কাজে লাগাতে হবে।
বর্তমানে অনেক এলাকাতেই কবরের জায়গার অভাব পরিলক্ষিত হয়। মানুষের আবাদির তুলনায় কবরস্থানের জায়গা নিতান্তই কম। তাই কবরস্থানের ওয়াকফিয়া সম্পদ অন্য খাতে ব্যয় করা যাবে না।
শেয়ার লিংক* >المحيط البرهاني< ৯/১৫১: سئل شمس الأئمة الحلواني رحمه الله تعالى عن مسجد أو حوض خرب، ولا يحتاج إليه لتفرق الناس، هل للقاضي أن يصرف أوقافه إلى مسجد آخر، أو حوض آخر؟ قال: نعم، ولو لم يتفرق الناس، ولكن استغنى الحوض عن العمارة، وهناك مسجد محتاج إلى العمارة، أو على العكس، هل يجوز للقاضي صرف وقف ما استغنى عن العمارة إلى عمارة ما هو محتاج إلى العمارة؟ قال: لا.
—আহকামুল আওকাফ, খাস্সাফ, পৃ. ১৯৯; আলহাবিল কুদসী ১/৫৪৯; আলবাহরুর রায়েক ৫/২৫১; গমযু উয়ূনিল বাসায়ের ১/৪২৬; রদ্দুল মুহতার ৪/৩৫৮, ৩৬০
কাউকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে করযে হাসানা দিলে তার খরচ কে বহন করবে? যেমন ধরুন, আমার কাছে কেউ দশ হাজার টাকা চাইল এবং তা বিকাশের মাধ্যমে পাঠাতে বলল। আমি দশ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে সেন্ড মানি করলাম। এ টাকা ক্যাশ আউট করলে সে পাবে ৯৮২০ টাকার মতো। এখন সে আমাকে কত টাকা পাঠাবে? যদি বরাবর দশ হাজার টাকাও পাঠায়, তাহলেও আমি ৯৮২০ টাকা পাচ্ছি। দয়া করে সমাধান দেবেন।
কোনো ব্যক্তি যদি কারও কাছে করযে হাসানা চায় এবং তা নিজে সরাসরি বা কারও মাধ্যমে অথবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে না নিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠানোর অনুরোধ করে, তাহলে যে পরিমাণ অর্থ করযদাতা প্রেরণ করেছে তত টাকাই ফেরত পাবে। এক্ষেত্রে করয গ্রহীতা কর্তৃক উক্ত টাকা ক্যাশ আউট করতে যদি কোনো খরচ হয়, তাহলে ওই খরচ করয গ্রহীতা নিজেই বহন করবে।
উল্লেখ্য, করযের টাকা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে করয গ্রহীতার দায়িত্ব হল, করযদাতাকে তার প্রেরিত পুরো অর্থ এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া বা প্রেরণ করা, যেন সে তার পুরো পাওনা বুঝে পায়। তাই যদি কোনো করয গ্রহীতা নিজ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা প্রেরণ করতে চায়, কিন্তু করযদাতা সেভাবে নিতে না চায়, তাহলে সেক্ষেত্রে অবশ্যই ক্যাশ আউট চার্জ প্রেরণকারী বহন করবে। কিন্তু যদি করয গ্রহীতা এ টাকা সরাসরি পরিশোধ করতে চায় আর করযদাতা তাকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পাঠাতে বলে, তাহলে সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি তাকে যত টাকা পাঠিয়েছিল, তত টাকা ফেরত পাঠালেই চলবে। কোনো ক্যাশ আউট চার্জ প্রদান করা লাগবে না।
শেয়ার লিংক* >الكافي شرح الوافي< للنسفي ৮/২০৬: والأصل: أن مونة الرد على من وقع القبض له.
—আলমুহীতুল বুরহানী ১১/৩১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৪/৩৭২; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়া, পৃ. ২৪৯; আলমাআয়িরুশ শরইয়্যা, পৃ. ৫২৩
আমার বাবা সোনালী ব্যাংকে চাকরি করেছেন। পাশাপাশি তিনি ব্যাবসাও করতেন। চাকরি এবং ব্যাবসার টাকার সাথে আরও কিছু টাকা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে তিনি একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। তবে বাড়িটির নির্মাণ ব্যয়ে চাকরির টাকাই বেশি পরিমাণে খরচ হয়েছে। লোন এবং ব্যাবসার টাকা ছিল অনেক কম। আর ব্যাংক লোনের টাকা তিনি পরবর্তী পেনশনের টাকা দিয়ে পরিশোধ করেছেন।
হুজুরের কাছে জানতে চাচ্ছি, এই বাড়ি থেকে যে ভাড়া আসে, তা কি আমার জন্য হালাল হবে?
ওই বাড়িটির নির্মাণ ব্যয়ের সিংহভাগ টাকাই যেহেতু আপনার বাবার ব্যাংকের বেতন-ভাতা ও ব্যাংক লোনের টাকার। আর অল্পকিছু টাকা ব্যাবসার আয়ের। তাই ওই বাড়িটি বৈধ সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। বৈধভাবে উক্ত বাড়ি ব্যবহার এবং এর ভাড়া ভোগ করতে চাইলে যে পরিমাণ হারাম টাকা (অর্থাৎ ব্যাংকের বেতন-ভাতা, পেনশন) তাতে ব্যয় করা হয়েছে, ওই পরিমাণ টাকা হালাল উপার্জন থেকে সদকা করে দিতে হবে। এরপর তার ব্যবহার ও আয় ভোগ করা বৈধ হবে। এক্ষেত্রে পুরো টাকা একসাথে সদকা করতে না পারলে সাধ্যানুযায়ী যা সম্ভব সদকা করতে থাকবে।
শেয়ার লিংক—সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮; আলমাবসূত, সারাখসী ১২/১৭২; শরহুল জামিইস সগীর, সদরুশ শহীদ, পৃ. ৫৩৫; আলমুলতাকাত ফিল ফাতাওয়া, পৃ. ২৬৮; তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম ১/৬১৯
আমার এক আত্মীয় সরকারি আয়কর বিভাগে কর্মরত আছেন। তার কাজের ধরনের কারণে বিভিন্ন কোম্পানি যখন তাদের ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেয়, তখন সেগুলোর ওপর তার কর্তৃত্ব থাকে। ফলে এই কোম্পানিগুলো তাকে বিভিন্ন ধরনের উপহার প্রদান করে। যেমন থার্মাস ফ্লাস্ক, পাওয়ার ব্যাংক ইত্যাদি। যেহেতু এই কোম্পানিগুলোর সাথে তার সুসম্পর্ক রয়েছে, তাই তিনি এই কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপরও ছাড় পান। উদাহরণস্বরূপ, তিনি যখন তার পরিবারের জন্য বিমানের টিকিট বুক করেন, তখন তাদের ভিআইপি যাত্রী হিসেবে গণ্য করা হয় এবং টিকিটের মূল্যে ছাড় দেওয়া হয়।
তার আত্মীয় হিসেবে আমি যদি তার মাধ্যমে কোনো হোটেল বুক করি, (কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কিছু হোটেল বা কোম্পানি) তবে আমি সাধারণ ভোক্তাদের তুলনায় বেশি ছাড় পাই। আমি যদি নির্দিষ্ট কিছু শপিং মলে যাই এবং তার মেম্বারশিপ নম্বর ব্যবহার করে পণ্য ক্রয় করি, (তিনি আমাকে তার নম্বর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন) তবে আমি অতিরিক্ত ছাড় পাই।
জানার বিষয় হল, আমার জন্য কি এই কোম্পানিগুলোর পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ছাড়গুলো গ্রহণ করা হালাল হবে?
প্রশ্নে কর কর্মকর্তাদেরকে বিভিন্ন কোম্পানি কর্তৃক যে সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে, তা উৎকোচের অন্তর্ভুক্ত। কোম্পানিগুলো কর কর্মকর্তাদেরকে এ ধরনের উপহার সামগ্রী ও মূল্যছাড় দিয়ে থাকে, তাদের থেকে এসবের মাধ্যমে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি ও নানাবিধ অবৈধ সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে। এতে যেমন উৎকোচ গ্রহণের বিষয় রয়েছে, তেমনি এর সাথে অন্যায় কাজে সহযোগিতার দিকও রয়েছে। তাই কর্মকর্তাদের জন্য এ ধরনের উপহার ও মূল্যছাড় গ্রহণ করা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। সুতরাং আপনার ওই আত্মীয়ের জন্যই যেহেতু এ সুবিধাগুলো ভোগ করা বৈধ নয়, সে সুবিধা আপনার জন্য ব্যবহার করা কীভাবে জায়েয হবে! মুসলমানদের এহেন কাজ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
শেয়ার লিংক* >المحيط البرهاني< ১২/১৯১ : لا يجوز أخذ المال على إقامة الواجب.
—সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৯৫৯; শরহুস সিয়ারিল কাবীর, সারাখসী ৪/৭৭; ফাতহুল বারী ১৩/১৭৯; আলমুগনী, ইবনে কুদামা ১৪/৫৮; ইলাউস সুনান ১৫/৬৬
এক নও মুসলিমের পক্ষ থেকে প্রশ্ন। সেলুনে কাজ করে যে পারিশ্রমিক পায়, তা তার জন্য হালাল, নাকি হারাম?
প্রচলিত সেলুনগুলোর বহু কাজ এমন রয়েছে, যা শরীয়তসম্মত নয় এবং কিছু কাজ সুস্পষ্ট গোনাহের। যেমন দাড়ি শেভ করা, দাড়ি কেটে এক মুষ্টি থেকে ছোট করে দেওয়া, বিজাতীয় ফ্যাশনে চুল কাটা ইত্যাদি। এসব কাজ অবৈধ এবং এসব কাজের উপার্জনও অবৈধ। অবশ্য শরীয়তসম্মত নিয়মে চুল কাটা, মোচ ছোট করে দেওয়া বৈধ কাজ এবং এর পারিশ্রমিকও বৈধ। তাই দাড়ি শেভ করা এবং দাড়ি কেটে এক মুষ্টি থেকে ছোট করা এবং অন্যান্য নাজায়েয কাজ থেকে বিরত থেকে সেলুনে কাজ করলে জায়েয হবে এবং এর উপার্জনও হালাল হবে। কিন্তু যদি তাকে বৈধ-অবৈধ সব ধরনের কাজই করতে হয়, তাহলে সেখানে চাকরি করা বৈধ হবে না। ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোনো হালাল পেশা গ্রহণ করার চেষ্টা করবে।
শেয়ার লিংক* >بدائع الصنائع< ৪/৩৯ : وعلى هذا يخرج الاستئجار على المعاصي أنه لا يصح؛ لأنه استئجار على منفعة غير مقدورة الاستيفاء شرعا كاستئجار الإنسان للعب واللهو.
—খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৩/১১৬, আয্যাখীরাতুল বুরহানিয়া ১১/৫২৭; তাবয়ীনুল হাকায়েক ৬/১১৮; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/২৯; রদ্দুল মুহতার ৬/৫৫
আমরা দেখি, বর্তমানে অনেক দোকানদার বলে যে, এটাতে ১০০ টাকা বা এর কাছাকাছি লাভ হয়েছে। অথচ তার লাভ আরও অনেক বেশি হয়েছে। কিন্তু সে মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে।
জানার বিষয় হল, এভাবে বললে কি তার বিক্রয় জায়েয হবে?
বাস্তব লাভের চেয়ে ক্রেতাকে কম লাভ নেওয়ার কথা বলা একই সঙ্গে মিথ্যা ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত। যা ভয়াবহ কবীরা গোনাহ। এ থেকে বিরত থাকা জরুরি। হাদীস শরীফে এ বিষয়ে কঠিন হুঁশিয়ারি এসেছে।
হাকীম ইবনে হিযাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
فَإِنْ صَدَقَا وَبَيَّنَا بُوْرِكَ لَهُمَا فِيْ بَيْعِهِمَا، وَإِنْ كَتَمَا وَكَذَبَا مُحِقَتْ بَرَكَةُ بَيْعِهِمَا.
যদি ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে সত্য কথা বলে এবং (পণ্যের দোষ-ত্রুটি) যথাযথ বর্ণনা করে, তবে তাদের কেনাবেচায় বরকত হবে। আর যদি তারা মিথ্যা বলে ও (পণ্যের দোষ-ত্রুটি) গোপন করে, তবে তাদের কেনাবেচার বরকত নষ্ট হয়ে যাবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২১১০)
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রিফাআ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
إِنَّ التُّجَّارَ يُبْعَثُوْنَ يَوْمَ القِيَامَةِ فُجَّارًا، إِلاَّ مَنْ اتَّقَى اللهَ وَبَرَّ وَصَدَقَ.
ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত হবে ফাসেক-ফাজের তথা বদকার রূপে। অবশ্য যেসব ব্যবসায়ী আল্লাহকে ভয় করে, সততার সাথে ব্যবসা করে এবং সত্য কথা বলে— তারা ছাড়া। (জামে তিরমিযী, হাদীস ১২১০)
অতএব ক্রয়-বিক্রয়েও মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া মারাত্মক গোনাহ। এ থেকে বিরত থাকা জরুরি। বিক্রেতা এভাবে মিথ্যা না বলেও সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারে। কত টাকা লাভ হল, সেটা ক্রেতার কাছে উল্লেখ না করে বিক্রি করা যায়। অবশ্য এভাবে পণ্যের মূল্য বর্ণনার ক্ষেত্রে মিথ্যা কথা বললে কাজটি মারাত্মক গোনাহের হলেও বাহ্যিক হিসাবে মূল ক্রয়-বিক্রয়টি নাজায়েয হয়ে যাবে না।
শেয়ার লিংক—আহকামুল কুরআন, জাস্সাস ৩/২৪১; শরহু মুখতাসারিল কুদূরী, আলআকতা‘, ৩/৫১৯; খুলাসাতুদ দালায়িল ২/৬৮; গায়াতুল বায়ান ১০/১৬৯; আলবাহরুর রায়েক ৬/৯৯
আমার এক আত্মীয়ের পিতা আজ থেকে বিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন। তারা চার ভাই, দুই বোন। তাদের পিতার একটি জায়গা ইতোমধ্যে বিক্রি করা হয়েছে। বোনদের দাবি হচ্ছে, এই জায়গার নগদ অর্থ তাদেরকে আদায় করতে হবে। কিন্তু ভাইদের মত হচ্ছে, পিতার এই জায়গার মূল্য দিয়ে যদি একটা ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়, তাহলে বোনেরা এই ফ্ল্যাটের ভাড়ার তিন ভাগের এক ভাগ পাবে। আর তারা পাবে দুই ভাগ। কিন্তু বোনেরা এতে রাজি নয়। তাদের মত হচ্ছে, এই জায়গার নগদ অর্থ তাদেরকে দিয়ে দিতে হবে। কিন্তু ভাইয়েরা এই টাকা তাদেরকে না দিয়ে জোরপূর্বক ফ্ল্যাট বানাতে চাচ্ছে। তারা বলছে যে, নগদ অর্থ দিলে যেভাবে তোমাদের পাওনা আদায় হবে, ফ্ল্যাটের ভাড়া থেকেও তোমাদের পাওনা সেভাবে আদায় হবে; বরং তোমাদের পাওনা থেকে আরও বেশি পাবে। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যায়, উভয় বোনের ভাগে ফ্ল্যাটের ভাড়া প্রতিমাসে দুই হাজার করে আসে। তারা বলছে, প্রতি মাসে ফ্ল্যাটের ভাড়া দুই হাজার করে পাওয়ার চেয়ে একসাথে আমাদের ভাগের পুরো টাকাটা পেলে আমাদের অনেক প্রয়োজন পূরণ হয়।
মুফতী সাহেবের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, জোরপূর্বক ভাইদের এমন করা কি ঠিক হবে, যদিও এতে দুই বোনের পাওনা পরিশোধ হবে। কিন্তু অনেক বিলম্বে হবে, নাকি উভয় বোনের টাকা নগদ দিতে হবে?
প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ওই পৈতৃক জমির বিক্রয়মূল্য থেকে বোনেরা যেহেতু নিজের অংশের টাকা নগদেই নিয়ে নিতে চাচ্ছে; ফ্ল্যাট নির্মাণে তাদের অংশের টাকা ব্যয় করতে সম্মত নয়, তাই এক্ষেত্রে ভাইদের জন্য বোনদের টাকা জোরপূর্বক ফ্ল্যাট তৈরির কাজে ব্যয় করা বৈধ হবে না। এটি তাদের জন্য সম্পূর্ণ নাজায়েয ও গোনাহের কাজ হবে। এটি অন্যের সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপের শামিল। তাই ভাইদের ওপর জরুরি হল, বোনদের টাকা এক্ষুনি তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া।
মনে রাখা দরকার, মিরাসি সম্পদে প্রত্যেক ওয়ারিশ তার প্রাপ্য অংশে সমান অধিকার ও পূর্ণ এখতিয়ার রাখে। নিজের অংশ কোন্ খাতে এবং কীভাবে ব্যয় করা হবে— এই এখতিয়ার প্রত্যেকের নিজের। অপর কোনো শরীকের তাকে তার সিদ্ধান্তের বিপরীত কিছু করতে বাধ্য করার অধিকার নেই।
শেয়ার লিংক* >الحاوي القدسي< ২/১৫৭ : فشركة الأملاك: العقار، أو العين، يرثان الرجلان، أو يشتريان، فلا يجوز لأحدهما التصرف في نصيب الآخر إلا بإذنه، وكل واحد منهما في نصيب صاحبه كالأجنبي.
—আলমাবসূত, সারাখসী ১১/১৫১; ফাতহুল কাদীর ৫/৩৭৮; আলবাহরুর রায়েক ৫/১৬৭; আদ্দুররুল মুখতার ৪/৩০০; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়া, মাদ্দাহ ১০৭৫
ওয়াসার পানি (সরকারি পানি) আমরা ব্যবহার করি। এই পানির বিল যদি না দেওয়া হয়, তাহলে কি কোনো গোনাহ হবে। আমাদের বাসায় যে লোক বিলের কাগজ দিতে আসে আমরা তাকে কিছু টাকা দিয়ে বিলটা কমিয়ে দিতে বলি। সে ১০০০ টাকার বিল ২০০ টাকা করে দেয়। এটা আসলে একটা ঘুষ দেওয়ার মতো। এটা কি জায়েয হবে? বিদ্যুৎ বিলসহ এগুলো না দিলে কি কোনো গোনাহ হয়?
বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসার পানি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এসকল রাষ্ট্রীয় সম্পদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদন নিয়ে যেমন ব্যবহার করা জরুরি। তেমনি ব্যবহারের পর এর নির্ধারিত পূর্ণ বিল পরিশোধ করাও জরুরি। এসব সুবিধা গ্রহণের পর যে বিল গ্রাহকের ওপর আরোপিত হয়, তা না দেওয়া বা কিছু দেওয়া আর কিছু না দেওয়া, অন্যের সম্পদ আত্মসাতের শামিল। এটি কবীরা গোনাহ। এটি কারও ব্যক্তিগত সম্পদ আত্মসাতের মতোই ভয়াবহ।
আর এ কাজ করতে গিয়ে ঘুষ প্রদান করা আরেকটি স্বতন্ত্র কবীরা গোনাহ। তাই অতীতে এমন কিছু করে থাকলে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাওনা বিল পরিশোধ করে দিতে হবে এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে তওবা-ইস্তেগফার করতে হবে।
শেয়ার লিংক—সহীহ বুখারী, হাদীস ৩১১৮; কিতাবুল আমওয়াল, আবু উবায়েদ, বর্ণনা ৬৬৫; ফাতহুল বারী ৬/২৫৩; আদ্দুররুল মুখতার ৪/২৮৩