মুহাম্মাদ আলাউদ্দীন চকোরী - চন্দ্রঘোনা ইউনুসিয়া মাদরাসা রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম

প্রশ্ন

 

আমাদের প্রিয় মাসিক আলকাউসারে গত সংখ্যায় (রবিউল আওয়াল ৩২ মোতাবেক ফেব্রুয়ারি ১১) নবীর মর্যাদা ও মর্যাদার নবী শীর্ষক আয়োজনটি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে এবং আলহামদুলিল্লাহ অনেক সন্দেহ-সংশয়ের অবসান হয়েছে। এই চমৎকার সময়োপযোগী আয়োজনের জন্য আলকাউসার কর্তৃপক্ষকে অশেষ ধন্যবাদ। লেখাগুলি পড়ে এ বিষয়ে আরো পড়াশোনার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কোন কিতাব পড়ব, কিভাবে পড়ব? জানা নেই। আপনার কাছে এ বিষয়ে সঠিক নির্দেশনা ও এ সংক্রান্ত কোনো রিসালা থাকলে তার নাম জানতে চাই।


 

উত্তর

 

কুরআন মজীদের অনেক আয়াতে আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম, বিশেষত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনা এবং ঈমানের দাবিগুলো পূরণ করার আদেশ করা হয়েছে। তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করা এবং কথায় বা আচরণে সব ধরনের গোসতাখি থেকে বেঁচে থাকার জন্য কঠিন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবীর অবমাননাকারীর ভয়াবহ পরিণতির কথাও কুরআন মজীদের অনেক আয়াত এবং অনেক সহীহ হাদীসে বিদ্যমান রয়েছে। 

সুতরাং একটু মেহনত করলে নবীর হক, নবীর ভালবাসা, নবীর মাহাত্ম্য ও মর্যাদা প্রভৃতি বিষয়ের আয়াত ও হাদীস আপনি নিজেও বের করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। 

সীরাতুন্নবী ও আকযিয়াতুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তদ্রূপ সীরাতুস সাহাবা ওআকযিয়াতুস সাহাবার উপর যেসব কিতাব লেখা হয়েছে তাতেও এ বিষয় সম্পর্কে প্রচুর তথ্য রয়েছে। তাছাড়া ফিকহ ও ফাতাওয়ার কিতাবসমূহে, কোনোটাতে আলাদা শিরোনামে, আবার কোনোটায় কিতাবুল হুদূদ  ওয়াত তাযীরাতে বা কিতাবুল জিহাদের বাবুর রিদ্দায় এ সংক্রান্ত মাসআলা-মাসাইল বিস্তারিতভাবে রয়েছে।

এরপরও শুধু রাসূল-অবমাননার শাস্তি ও ভয়াবহতার উপর আলাদা আলাদা কিতাব লেখা হয়েছে। কয়েকটি কিতাবের নাম উল্লেখ করা হল :

১. আমাদের জানা মতে, সর্বপ্রথম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন সাহনুন কায়রাওয়ানী মালেকী (২০২-২৬৫ হি .) রাহ. এ বিষয়ে কিতাব লিখেছেন। তাঁর রচনাবলির তালিকায়

رسالة من سب النبي صلى الله عليه وسلم

নামক একটি রিসালা আছে। (দেখুন : আদদিবাজুল মুযহাব পৃ. ৩৩৪)

২. কাযী ঈয়ায মালেকী রাহ. (৪৭৬-৫৪৪ হি.) তার আশ-শিফা বিতাআরীফি হুকুকিল মুসতাফানামক চার অংশে বিভক্ত কিতাবটির চতুর্থ অংশের শিরোনাম এই-

القسم الرابع في تصرف وجوه الأحكام فيمن تنقصه أو سبه عليه الصلاة والسلام

এ অংশটি তিনটি অধ্যায়ের অধীনে পঁচিশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। এখানে উপরোক্ত বিষয়ে এত বিস্তারিত আলোচনা আছে যে, তা আলাদা কিতাবের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

ইবনে ফরহুন মালেকী রাহ.-এর    অভিমত হল-

وقد استوعب القاضي عياض رحمه الله الكلام في هذا وما أشبهه ولم يترك لغيره مقالا.

৩. হাফেয আবুল আববাস আহমদ ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী রাহ. (৬৬১-৭২৮ হি.)। তাঁর অনবদ্য ও ঐতিহাসিক গ্রন্থটির নাম হল-

الصارم المسلول على شاتم الرسول

কিতাবটি বেশ কয়েকটি মাকতাবা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এটি একটি উত্তম গ্রন্থ।

৪. আল্লামা তাকী উদ্দীন আস সুবকী শাফেয়ী রাহ. (৬৮৩-৭৫৬ হি.)। তার কিতাবের নাম

السيف المسلول على من سب الرسول

বেশ কিছু বিষয়ে এই কিতাবটি ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর কিতাব থেকেও অগ্রগণ্য। দারুল ফাতহ আম্মান জর্ডান থেকে ইয়াদ আহমদ আলগাওজ-এর তাহকীক-সম্পাদনায় ভালো কাগজ ও দৃষ্টিনন্দন সজ্জায় প্রকাশিত হয়েছে। সম্পাদকের টীকা-টিপ্পনীগুলোও ভালো ও উপকারী।

৫. শায়খ মুহিউদ্দীন মুহাম্মদ বিন কাসিম (আখাওয়াইন) হানাফী রাহ. (৯০৪ হি.)। তার কিতাবের নাম

السيف المشهور على الزنديق وساب الرسول

৬. হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহ. (৯১১ হি.)। তার কিতাবের নাম

تنزيه الأنبياء عن تسفيه الأغبياء

কিতাবটি তাঁর ফাতাওয়াসমগ্র আলহাবী লিল ফাতাবী (১/২৩২-২৪৩) তে সংযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

৭. আল্লামা ইবনে কামাল পাশা হানাফী রাহ. (৯৪০ হি.)-এরও একটি রিসালা

 السيف المسلول في سب الرسول

নামে রয়েছে। যার মাখতূত বা হস্তলিখিত পান্ডুলিপি ইস্তাম্বুলের খিযানা সুলাইমানিয়ায় সংরক্ষিত আছে। পান্ডুলিপিটির একটি ফটোকপি জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারায় রয়েছে।

৮. মুহাদ্দিস ইবনে তুলুন হানাফী রাহ. (৯৫৩ হি.) তার কিতাবের নাম

رشق السهام في أضلاع من سب النبي صلى الله عليه وسلم

৯. ফকীহ ইবনে আবেদীন শামী হানাফী রাহ. (১২৫২ হি.)। তার রিসালার নাম

تنبيه الولاة والحكام على أحكام شاتم خير الأنام أو أحد أصحابه الكرام عليه وعليهم الصلاة والسلام

 মাজমুআতু রাসায়েলে ইবনে আবেদীন-এ (১/৩১৩-৩৭১) অন্যান্য রিসালার সাথে এটিও আছে।

১০. আল্লামা মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ ইবনে সিদ্দীক গুমারী রাহ. (১৪১৩ হি.)-এর রিসালার নাম

السيف البتار لمن سب النبي المختار

এখানে দশজন মনীষীর দশটি কিতাবের নাম লেখা হল। ইবনে তাইমিয়া ও তাকী উদ্দীন সুবকী ও ইবনে আবেদীন শামীর কিতাবের মধ্যে যেকোনোটি দিয়ে আপনি মুতালাআ শুরু করতে পারেন। তবে ভালো হয়, কোনো সহজ কিতাব আগে পড়ে নেওয়া। এজন্য উর্দু ভাষায় এইচ সাজেদ আওয়ান রচিত

 تحفظ ناموس رسالت اور گستاخ رسول كى سزا

নামক কিতাবটি সংগ্রহ করতে পারেন। প্রায় সাড়ে সাত শত পৃষ্ঠার এই কিতাবটি সংকলকের রুচি ও পরিশ্রমের সাক্ষর বহন করে।

তাছাড়া উর্দু ভাষায় আরো কিছু কিতাব আছে। যেমন-ইহানাতে রাসূল আওর আযাদীয়ে ইযহার। পাকিস্তানের ইসলামী নযরীয়াতি কাউন্সিল থেকেও এ বিষয়ে আলাদা রিসালা প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের বাংলা ভাষার দুর্ভাগ্য যে, এই নিয়ে নাস্তিক ও বিধর্মীদের প্রপাগান্ডা সম্বলিত প্রচুর বইপত্র থাকা সত্ত্বেও আমার জানা মতে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে হক্কানী আলিম-লেখকদের কোনো প্রামাণ্য গ্রন্থ বের হয়নি। আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো বান্দাকে এই খেদমতের জন্য কবুল করুন। আমীন।

 

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ মাসউদুর রহমান - মাদানী নগর, ঢাকা

প্রশ্ন

দরসে নিযামীর সকল কিতাবের মুছান্নিফদের জীবনী এবং প্রসিদ্ধ মুফাসসিরীন, মুহাদ্দিসীন ও মুফতিয়ানে কেরামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সম্পর্কে একটি কিতাবের নাম জানতে চাই। এমন কোনো কিতাব থাকলে অনুগ্রহপূর্বক জানাবেন।

 


উত্তর

আপনি একটি কিতাবের নাম জানতে চেয়েছেন। সে হিসেবে খাইরুদ্দীন যিরিকলীর আট খন্ডেরআলআলাম কিংবা এর মুখতাসার আবদুল লতীফ আবদুল ওয়াহহাব বাসসাম এর মুজামুল আলামসংগ্রহ করা যায়।

তবে দরসে নিযামীর সমস্ত কিতাবের মুসান্নিফদের জীবনী এখানে পাওয়া যাবে না। সেজন্য আপনি উর্দু ভাষায় রচিত মাওলানা আখতার রাহীর তাযকারায়ে মুসান্নিফীনে দরসে নিযামী এবং হযরত মাওলানা মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী দা.বা.-এর মাশাহিরে মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কেরামনামক পুস্তিকা দুটিও সংগ্রহ করতে পারেন। 

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ ওমর ফারূক - ফরিদাবাদ মাদরাসা, ঢাকা

প্রশ্ন

ড. আহমদ আমীন তার দুহাল ইসলাম-এ বলেন, মাহদী আ.-এর আগমনের বিশ্বাস নাকি শীয়াদের মাহদীবাদ থেকে গৃহীত। সহীহাইনে নাকি এ সংক্রান্ত কোনো হাদীস নেই। আর হাদীসের অন্যান্য কিতাবে এ সংক্রান্ত যেসব হাদীস আছে সেগুলোর সনদও আপত্তিমুক্ত নয়। অথচ আমরাও তো মাহদী আ.-এর আগমনে বিশ্বাস করি। প্রকৃত বিষয়টি কী এবং এ বিষয়ে কোনো কিতাব আছে কি না জানালে কৃতজ্ঞ হব।

.

উত্তর

ইমাম মাহদী রা.-এর আবির্ভাবের বিষয়টি অনেক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং উম্মতেরতালাক্কী বিল কবুল দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। সাহাবা-তাবেয়ীন থেকে শুরু করে আহলে সুন্নত ওয়ালজামাতের প্রায় সকল আলিম এ বিষয়ে একমত।*

কিয়ামতের পূর্বে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আহলে বাইতের মধ্য হতে এমন একজন ব্যক্তির আগমন হবে যার নাম ও পিতার নাম হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম ও পিতার নামের অনুরূপ। অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ। যার উপাধি হবে মাহদী

ইমাম আবুল হুসসাইন মুহাম্মাদ বিন হুসাইন আল আবুরী রাহ. (৩৬৩ হি.) বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে তাওয়াতুর পরিমাণের প্রচুর হাদীসে মাহদীর আলোচনা এসেছে। একথাগুলিও খুবই বিশ্বস্তভাবে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি আহলে বাইত থেকে হবেন। তিনি সাত বছর পৃথিবীর বুকে হুকুমত করবেন, অন্যায়-অবিচারে নিমজ্জিত পুরো ভূখন্ডে ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। আসমান থেকে হযরত ঈসা আ.-এর অবতরণের পর তিনিও ইমাম মাহদীকে দাজ্জালের সাথে যুদ্ধে সহযোগিতা করবেন। তিনি উম্মতের ইমামতি করবেন এবং হযরত ঈসা আ.ও তাঁর পিছনে নামায আদায় করবেন। (আলমানারুল মুনীফ ১৪২)

এ বিষয়ে সহীহ-হাসান ও নির্ভরযোগ্য পর্যায়ের এত প্রচুর হাদীস রয়েছে যে, অনেক আলিম একেমুতাওয়াতির বলেছেন। ইমাম মাহদী ও তাঁর আগমন সংক্রান্ত বহু মৌলিক এবং বহু খুটিনাটি বিষয়ও এইসব হাদীসে রয়েছে। কোনো হাদীসে তাঁর শাসনামলের কথা, কোনো হাদীসে ঈসা আ.-এর সাথে তাঁর মোলাকাত ও ইমামতির কথা, কোনো হাদীসে তাঁর নাম ও বংশ পরিচয়, কোনো হাদীসে তাঁর গুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। এভাবে হাদীসের প্রায় সব ধরনের কিতাবেই এই হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সহীহাইনও ব্যতিক্রম নয়। নাম উল্লেখ ছাড়াই ঈসা আ.কে নিয়ে তাঁর ইমামত সংক্রান্ত একাধিক হাদীস সহীহাইনেও বর্ণিত হয়েছে। (দেখুন : সহীহ বুখারী হাদীস : ৩৪৪৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৫৫, ১৫৬, ২৯১৯, ২৯১৪)

এসব হাদীসে আমীরুহুমইমামুকুম ও খলীফা ইত্যাদি শব্দের দ্বারা উদ্দেশ্য ইমাম মাহদী। এই হাদীসগুলোরই নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতে আমীরুহুম আলমাহদী শব্দ উল্লেখিত হয়েছে। (দেখুন : আলমানারুল মুনীফ ১৪৭-১৭৮) তাছাড়া অন্যান্য সহীহ হাদীসে তো এই ব্যাখ্যা একেবারেই সুস্পষ্ট।

ইমামাতুল মাহদী নিয়ে হাদীসের প্রায় সকল কিতাবে স্বতন্ত্র অধ্যায় থাকার পরও শুধু সহীহাইনের হাদীসগুলোর কথা বিশেষভাবে বলার কারণ এই যে, হাদীসের এই দুটি কিতাব সাধারণ মানুষের মাঝেও প্রসিদ্ধ এবং অবশ্যই সহীহ হাদীসের সংকলন হিসেবে এই কিতাব দুটির যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কোনো বিষয় প্রমাণিত হওয়ার জন্য সহীহাইন কিংবা বিশেষ কোনো কিতাবে থাকা অপরিহার্য। বরং এ ধরনের চিন্তা অহেতুক হঠকারিতা ছাড়া আর কিছু নয়। ইমাম বুখারী রাহ. ও ইমাম মুসলিম রাহ.-এর কেউই এমন দাবী করেননি যে, সকল সহীহ হাদীস তাঁরা তাঁদের কিতাবে একত্র করেছেন বা একত্র করার ইচ্ছা করেছেন; বরং ইমাম বুখারী রাহ, নিজেই বলেন,

 لم أخرج في هذا الكتاب إلا صحيحا وما تركت من الصحاح أكثر

আমি এই কিতাবে শুধু সহীহ হাদীস সংকলন করেছি। এর বাইরেও অনেক সহীহ হাদীস আছে। (তারীখে বাগদাদ ২/৯)

তেমনি একথাও সহীহ সনদে প্রমাণিত যে, ইমাম মুসলিম রাহ.-এর কিতাব তাঁরই উস্তাদ ইমাম আবু যুরআ রাযী এবং ইবনে ওয়ারা রাহ.-এর হাতে পৌঁছলে তাঁরা বলেছিলেন, তুমি সহীহ নামে কিতাব লিখে বিদআতীদের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। যখন তাদের সামনে কোনো সহীহ হাদীস পেশ করা হবে তখন তারা এই বলে প্রত্যাখ্যান করবে যে, এটি তো সহীহ মুসলিমে নেই।

ইমাম মুসলিম তখন আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন যে, আমি তো শুধু আমার ও আমার নিকট যারা হাদীস শিখতে আসবে তাদের স্মরণ রাখার সুবিধার্থে কিছু হাদীস সংকলন করেছি। আমি বলিনি যে, এই সংকলনের বাইরের সকল হাদীস দুর্বল; বরং আমি শুধু এটুকু বলি যে, এই সংকলনের হাদীসগুলো সহীহ। (তারীখে বাগদাদ ৪/২৭৪)

অতএব কোনো বিষয় সহীহাইনে নেই তাই প্রমাণিত নয়-এমন বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল ও অযৌক্তিক। যাহোক, সহীহাইনের বাইরেও সহীহ ও নির্ভরযোগ্যতার মানদন্ডে উত্তীর্ণ অনেক হাদীস রয়েছে, যেখানে ইমাম মাহদীর নাম, বংশ-পরিচয় এবং তার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে। এমনকি খোদ ইমাম বুখারীর বিখ্যাত শাগরিদ ইমাম তিরমিযী রাহ. এই ধরনের একাধিক হাদীস সম্পর্কে হাসান-সহীহ বলেছেন। (দেখুন : জামে তিরমিযী, হাদীস : ২২৩০-২২৩২)

সংক্ষিপ্ত পরিসরে সব হাদীস উল্লেখ করা এবং সেগুলোর সনদগত মান আলোচনা করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে আলাদা কিতাব লেখা হয়েছে এবং এখনও লেখা হচ্ছে। এখানে প্রকাশিত কয়েকটি কিতাবের নাম লিখা হল।

১. আলবায়ান ফী আখবারি ছাহিবিয যামান, আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইউফুফ (মৃত্যু : ৬৫৮ হি.)

২. ইকদুর দুরার মিন আখবারিল মাহদিয়্যিল মুনতাযার, শায়খ ইউসুফ ইবনে ইয়াহইয়া আসসুলামী

৩. আলআরফুল ওয়ারদী ফী আখবারিল মাহদী, জালালুদ্দীন সুয়ূতী (৯১১ হি,)

৪. তালখীসুল বায়ান ফী আলামাতি মাহদিয়্যি আখিরিয যমান, প্রাগুক্ত

৫. আলকাওলুল মুখতাছার ফী আলামাতিল মাহদিয়্যিল মুনতাযার, ইবনে হাজার হাইতামী (৯৭৪ হি.)

৬. আলবুরহান ফী আলামাতি মাহদিয়্যি আখিরিয যামান, শায়খ আলী আলমুত্তাকী আলহিন্দী (৯৭৫ হি.)

৭. ইবরাযুল ওয়াহমিল মাকনূন মিন কালামি ইবনি খালদূন, শায়খ আহমদ আলগুমারী (১৩২০-১৩৮০ হি.)

৮. আলমাহদিয়্যিউল মুনতাযার, শায়খ আবদুল্লাহ আলগুমারী

৯. আলআহাদীসুল ওয়ারিদাহ ফিল মাহদী ফী মিযানিল জারহি ওয়াত তাদীল, ড. আবদুল আলীম আলবাসতাবী আলহিন্দী

১০. আকীদাতু আহলিল আছার ফিল মাহদিয়্যিল মুনতাযার, শায়খ আবদুল মুহসিন ইবনে হামদ আলআববাদ

১১. আলইহতিজাজু বিলআছার আলা মান আনকারাল মাহদিয়্যাল মুনতাযার, শায়খ হামূদ ইবনে আবদুল্লাহ তুয়াইজারী

১২. আকীদায়ে যুহুরে মাহদী আহাদিস কি রৌশনি মে, ড. মাওলানা নিযামুদ্দীন শামযী রাহ.।

তবে একথাও সত্য যে, সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদীসের বাইরে এ বিষয়টিতে জাল, অতি দুর্বল, ও অনির্ভরযোগ্য বর্ণনার সংখ্যাও কম নয়, কিন্তু এই কারণে সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত বিষয়ে কোনো প্রভাব পড়তে পারে না। সহীহ হাদীসে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো এতই সুস্পষ্ট যে, সময়ে সময়ে গোলাম আহমদ কাদিয়ানির মত কিছু বিকৃত চিন্তার মানুষের মাহদী হওয়ার মিথ্যা দাবিতেও কিছু যায় আসে না।

সাথে সাথে একথাও সুস্পষ্ট যে, অসংখ্য সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত ও সুস্পষ্ট আলামত সম্বলিত ইমাম মাহদী রা.-এর সাথে শিয়া-রাফেযীদের কথিত মাহদীবাদের দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই। তাদের মতবিশ্বাসটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বরং ইবনুল কাইয়িমের ভাষায়, পুরো মানবজাতির জন্য লজ্জাকর ও সকল বুদ্ধিমানের কাছে হাস্যকর শিয়া-রাফেযীদের এই মাহদীবাদ বিশ্বাসের মূল কথা হল, প্রায় বার শত বছর পূর্বে তাদের বিশ্বাস মতে-নবীদের মতো নিষ্পাপ বারজন ইমামের সর্বশেষ জন জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, যার নাম মুহাম্মাদ বিন হাসান আসকারী। কিশোর বয়সে তিনি ইরাকের সামরো বা সুররা মান রাআ শহরে পানির গভীরে জলজ কুঠিরে আত্মগোপন করে গেছেন। লোকচক্ষুর আড়ালে গেলেও বারশত বছর পরও তিনি পানিতে জীবিত! তারা প্রতিদিন তার জন্য অপেক্ষা করে কথিত জলজ কুঠিরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে!! সারাদিন চিৎকার করে তাকে আহবান করতে থাকে!!!

এবার আপনিই বলুন, ইমাম মাহদী সংক্রান্ত প্রশ্নের শুরুতে উল্লেখিত ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত কোন কথাটির সাথে শীয়াদের এই অলীক কল্পনার মিল আছে??

শীয়াদের এই আকীদা সম্পর্কে হাফেয যাহাবী রাহ. বলেছেন, বিবেকহীনতা থেকে আল্লাহর পানাহ! পূর্ব যুগে এমন কিছু ঘটেছিল বলে যদি ক্ষণিকের জন্য মেনেও নেয়া হয়, তখন প্রশ্ন হল, এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কে? এতদিন পরও তিনি জীবিত আছেন-এরই বা সূত্র কি? এ কথাই বা কে বলেছে যে, তিনি নিষ্পাপ ও সর্বজ্ঞানীও। এসব অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের দ্বারা যদি চিন্তাশক্তিকে আচ্ছন্ন করে রাখা হয়, তাহলে তো বাস্তব-অবাস্তবের পার্থক্যই হারিয়ে যাবে এবং সকল অসম্ভবকে সম্ভব মনে করার পথ খুলে যাবে!!

মিথ্যা ও অবাস্তব; বরং অসম্ভব বিষয়কে দলীল মনে করা এবং এর দ্বারা ন্যায় ও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা থেকে আল্লাহ আমাদের সকলকে রক্ষা করুন, যা ইমামিয়া ফের্কার বৈশিষ্ট্য।(সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৩/১২১-১২২)

অতএব ইমাম মাহদীর আগমনের সহীহ আকীদা এবং শীয়াদের ঐ অলীক বিশ্বাসকে এক মনে করা অজ্ঞতা ও জাহালত ছাড়া আর কিছু নয়।

এখানে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি কথা আরজ করলাম। বিস্তারিত জানার জন্য এই বিষয়ের কিতাবাদি মুতআলাআ করা যেতে পারে।

তবে এখানে যে কথাটি বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন, তা হল, মিসরের ড. আহমদ আমীন সমকালীন আরবী ভাষা ও সাহিত্যের পন্ডিত ছিলেন বটে, কিন্তু হাদীস ও ইসলামের ইতিহাসসহ অন্যান্য ইসলামী উলূমে তার ধারণা ছিল খুবই সামান্য ও ভাসাভাসা। আর এই ধারণার অধিকাংশই তিনি গ্রহণ করেছিলেন অনির্ভরযোগ্য কিছু মাসাদির ও খ্রিস্টান প্রাচ্যবিদদের রচনাবলি থেকে। ফলে তিনি ছিলেন ঐ সব চিন্তাবিদদের অন্যতম, যাদের ধ্যান-ধারণা পশ্চিমা-প্রভাবিত এবং যাদের চিন্ত-চেতনা প্রাচ্যবাদিতায় আক্রান্ত। এই কারণে তার রচনাবলিতে এত প্রচুর পরিমাণ এমন স্খলন রয়েছে যে, শুধু এর তালিকা করলেও একটি আলাদা রিসালা তৈরি হয়ে যাবে। ইসলামের ইতিহাস নিয়ে তার সিরিজ রচনা-ফজরুল ইসলাম, জুহরুল ইসলাম ও দুহাল ইসলামের পাতায় পাতায় যার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইমাম মাহদী রাহ. সম্পর্কেও তার বক্তব্য ঐসব সুস্পষ্ট স্খলনের     অন্তর্ভুক্ত।

তার এসব স্খলন ও বিচ্যুতি নিয়ে ড.   মুস্তফা সিবায়ী আসসুন্নাতু ওয়ামাকানাতুহা ফিত তাশরীয়িল ইসলামী নামে একটি ঐতিহাসিক ও চমৎকার গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা সকলের পড়ার মতো।

এখানে এই কথাও মনে রাখা জরুরি যে, একজন তালিবে ইলম বরং একজন সাধারণ মানুষের জন্যও যে কোনো ধরনের লেখা কিংবা যে কোনো লেখকের বইপত্র পড়তে যাওয়া উচিত নয়। কী পড়বে, কী পড়বে না- এ বিষয়ে তালীমী মুরববী বা কোনো অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য। ষ

টীকা : * আল্লামা সাফফারিনী রাহ. (১১১৪ হি.-১১৮৮ হি.) তাঁর আকীদা বিষয়ক কিতাবলাওয়ামেউল আনওয়ার আলবাহিয়্যাহ যা শরহে আকীদাতিত সাফফারিনী নামে প্রসিদ্ধ। এই কিতাবে (২/৮৪) তিনি লিখেন-

وقد كثرت بخروجه الروايات حتى بلغت حد التواتر المعنوي وشاع ذلك بين علماء السنة حتى عد من معتقداتهم وقد روي عمن ذكر من الصحابة وغير من ذكر منهم رضي الله عنهم بروايات متعددة وعن التابعين من بعدهم ما يفيد مجموعه العلم القطعي فالإيمان بخروج المهدي واجب كما هو مقرر عند أهل العلم ومدون في عقائد أهل السنة والجماعة

শেয়ার লিংক
advertisement
advertisement