মুহাম্মাদ যাকারিয়া সিরাজী - মাদরাসা আলী ইবনে আবী তালিব রা., কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

প্রশ্ন

ছরফের একটি প্রসিদ্ধ নিয়ম হল, মাফতূহ আলামাতুল মুযারে ও কাসরার মধ্যবর্তী ‘ওয়াও’ কে নিঃশর্তে হযফ করা আবশ্যক। যেমন-

                  ইত্যাদি। আর মাফতূহ আলামাতুল মুযারে ও ফাতহার মধ্যবর্তী ‘ওয়াও’ শর্তসাপেক্ষে হযফ করা আবশ্যক। শর্তটি হল আইন-কালিমায় কিংবা লাম-কালিমায় হরফে হালকী তথা ইযহারের ছয় হরফের কোনো এক হরফ থাকা।

সুতরাং থাকলে হযফ করতে হবে। যেমন-

 

 

 

ইত্যাদি। আর না থাকলে হযফ করতে হবে না। যেমন-

তবে ছরফবিদ ও অভিধানবিদ ওলামায়ে কেরাম          শব্দটিকে ব্যতিক্রম বলেছেন। অন্য কোনো শব্দকে ব্যতিক্রম বলেননি। বিশেষত হরফে হালকী থাকলে। কিন্তু ‘আর-রাইদ’, ‘আলমু’জামুল ওয়াসীত’ ও ‘আল-মুনজিদ’ অভিধানগুলোতে বাবে সামিআ থেকে ব্যবহৃত 

 

 

 

 

 

 

 

 এই শব্দগুলোতে এবং বাবে ফাতাহা থেকে ব্যবহৃত

এই শব্দগুলোতে ওয়াও কে বহাল রাখা হয়েছে, হযফ করা হয়নি।

আরো আশ্চর্যজনক বিষয় হল, ‘আলমু’জামুল ওয়াসীত ও আর-রাইদ এ     

         এর ওয়াও কে বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু আলমুনজিদ-এ বহাল রাখা হয়নি; বরং হযফ করা হয়েছে।

অতএব আমার প্রশ্ন হল, এসব অমিলের কারণ কী? এখানে যদি কোনো অসঙ্গতি থেকে থাকে তাহলে তা অভিধানের অসঙ্গতি না অন্য কিছু? আর যদি উল্লেখিত শব্দগুলোকে ব্যতিক্রমই বলা হয়, তাহলে এত বেশি ব্যতিক্রমের পর মূল কায়েদা অবশিষ্ট থাকে কীভাবে? বিষয়টি একটু বিস্তারিত জানালে খুশি হব। 

উত্তর

মাশাআল্লাহ আপনি বেশ মেহনত করেছেন। মেহনতের এই ধারা অব্যাহত রাখা উচিত। আমার মনে হয়, আরেকটু মেহনত করলে এর উত্তরও আপনি নিজেই পেয়ে যেতেন। যাই হোক, মূল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে আপনার দৃষ্টিতে আকর্ষণ করছি।

১. আমাদের দরসে নিযামীতে ছরফের যে কয়েকটি কিতাব রয়েছে তার প্রায় সবগুলোই ফার্সী ভাষায়, যা ছরফের মৌলিক ও বিস্তৃত কিতাবগুলোর আলোকে হিজরী দশম শতাব্দী ও তৎপরবর্তী সময়ে আমাদের এই উপমহাদেশে রচিত হয়েছে। অতএব ছরফের কোনো কায়েদা-কানুনের মৌলিক জ্ঞান ও উৎস জানা এবং ছরফের ইমামদের মতামত জানার জন্য এই কয়েকটি কিতাব যথেষ্ট নয়; বরং এর জন্য পূর্ববর্তী যুগে আরবী ভাষায় রচিত ছরফের মৌলিক মাসাদিরের সহায়তা নিতে হবে। এছাড়া ইলমে নাহুর প্রাচীন মাসাদিরও মুরাজাআ করা যেতে পারে। কারণ আরবী ব্যাকরণ সংকলনের প্রথম যুগে ইলমে নাহুর মধ্যে ইলমে ছরফও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে দুটিকে আলাদা আলাদা ফনের রূপ দান করা হয়।

২. অভিধান বা ইলমুল লুগাতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ‘আল-মুজামুল ওসীত’ ও ‘আল-মুনজিদ’ জাতীয় লুগাত থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো তালিবে ইলম উপকৃত হতে পারে। কিন্তু তাফসীলি ইলম অর্জন কিংবা কোনো দলীল-প্রমাণ পেশ করার প্রয়োজন হলে লুগাতের প্রাচীন ও মুফাসসাল মাসাদিরের সহায়তা নিতে হবে।

৩. ছরফী বা লুগাবী বলতে ফনের ইমামগণকেই বোঝায়। ফনের ইমাম সাধারণত ঐ সকল মনীষী, যারা ফন সংকলন করেছেন এবং ফনের তানকীহ ও তাহযীবের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের লিখিত গ্রন্থগুলোই হচ্ছে ফনের মৌলিক গ্রন্থ। পরবর্তীতে রচিত সংক্ষিপ্ত কোনো রিসালা বা পুস্তিকার সকল মাসআলাকেই ফনের ইমামদের মতামত মনে করা ঠিক নয়। তাঁদের মতামত নিশ্চিতভাবে জানার জন্যও মাসাদির পর্যায়ের কিতাবের সহায়তা নিতে হবে।

৪. ছরফ ও নাহুর অধিকাংশ কায়েদা ‘আগলবী’ বা ‘ইসতিকরায়ী’ পর্যায়ের, কুল্লিয়া নয়। অর্থাৎ আরবী ভাষা-ব্যবহারের বিভিন্ন প্রয়োগ দেখে দেখে তাঁরা কায়েদাগুলো নির্ধারণ করেছেন। তাদের এই ‘ইস্তিকরা’ কৃত কায়েদাগুলো দ্বারা ভাষা শিখার ক্ষেত্রে উপকৃত হওয়া যায়, কিন্তু এই কায়েদাগুলো আরবদের ভাষার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে না। আর তাই সদা চলমান ও সদা পরিবর্তনশীল ভাষায় তাফসীলিভাবে তালাশ করলে এসব কায়েদার ব্যতিক্রমও অনেক পাওয়া যাবে। হয়তো দেখা যাবে যে, কোনো জায়গায় কায়েদাটির সাথে একেবারেই ‘তাতবীক’ নেই, অথবা দেখা যাবে কায়েদাটি ছিল ‘ওজুবী’ পর্যায়ের, কোনো কোনো স্থানে ‘ওজুব’ বাকি নেই; বরং সেখানে উভয় ধরনের ব্যবহার হচ্ছে। এই ধরনের ব্যতিক্রম দশ বিশ জায়গায় পাওয়া গেলে এই মিছালগুলোর দ্বারা সাধারণ ‘ইস্তিকরা’ দ্বারা নির্ধারিত মূল কায়েদায় কোনো প্রভাব পড়বে না। প্রায় এর কাছাকাছি কথা আমি আবদুল কাছেম আয-যাজ্জাজী রাহ. (৩৩৭ হি.) লিখিত অনবদ্য গ্রন্থ ‘আলইযাহ ফী ইলালিন নাহব’ কিতাবে পড়েছি। এটি সব ভাষার ব্যাপারেই সত্য।

এবার আপনার মূল প্রশ্নের উত্তর আরয করব। আপনি প্রশ্নে যে কায়েদাটি উল্লেখ করেছেন তা ঠিক ওভাবেই দরসে নিযামীভুক্ত ‘ইলমুস সীগাহ’ কিতাবে রয়েছে, যা লিখেছেন হিন্দুস্তানের মুফতী ইনায়াত আহমদ কাকোরী রাহ. (১২২৮ হি.-১২৭৯ হি.)। পরবর্তী কোনো কোনো মুসান্নিফও তার অনুসরণ করে কায়েদাটি এভাবে লিখেছেন। কিন্তু এখানে দেখার বিষয় হল, উল্লেখিত কায়েদাটির দুটি অংশ রয়েছে। উপস্থাপনার সামান্য তারতম্য বাদ দিলে কায়েদাটির প্রথম অংশ অর্থাৎ ‘মাকসূরুল আইন’ সংক্রান্ত কথাটি সঠিক। আর আলোচ্য মূল কায়েদাও এতটুকুই। প্রাচীন ও মৌলিক কিতাব থেকে শুরু করে ছরফের প্রায় সকল কিতাবেই যা উল্লেখিত হয়েছে।

তবে হ্যাঁ, সাথে তাঁরা এই কথাও বলেছেন যে,

 

 

 

সহ এই জাতীয় বেশ কিছু শব্দ উপরোক্ত নিয়ম বহির্ভুত হওয়ার পরও এখানেও ওয়াও কে হযফ করে দেওয়া হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

(ইবনে উসফুর আলইশবিলী (৫৯৭ হি.-৬৬৯ হি.) আলমুমতিউল কাবীর ২৮০; ইযযুদ্দীন আবদুল ওয়াহহাব ইবনে ইবরাহীম (৬৫৫ হি.) তাসরীফুল ইযযী ৭৬-৭৮) আরো দেখুন : আলমুনসিফ ১/১৮৪; আশশাফিয়া ১/৯৫-৯৬; ইবনে মালিক, ইযাহুত তারীফ ফী ইলমিত তাসরীফ; মুহাম্মাদ মুহিউদ্দীন আবদুল হামিদ, দুরুসুত তাসরীফ ১৫৮

মূল কায়েদা এতটুকুই। দরসে নিযামীভুক্ত ‘পাঞ্জেগাঞ্জ’ ও ‘ফুসূলে আকবরী’তেও কায়েদাটি এভাবেই বলা হয়েছে। কিন্তু ইলমুস সীগার মুসান্নিফ নিয়ম বহির্ভুত

ইত্যাদি শব্দগুলোকেও কায়েদার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কায়েদাটির সাথে আরেকটি অংশ জুড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ ফেলে মুযারে মাফতুহুল আইন হলে সেখানেও ওয়াও কে হযফ করে দেওয়া হবে। তবে শর্ত হল, আইন বা লাম-কালিমায় হরফে হালকীর কোনো একটি থাকতে হবে।

সম্ভবত তাঁর পূর্বে কোনো ছরফবিদ এই কথা বলেননি। তিনিও কায়েদাটিকে অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম করে বর্ণনা করে নিজেই বলেছেন, ‘এখানে আসল কায়েদাটিকে ইয়ার ক্ষেত্রে বলে ‘ফেলে মুযারের অন্যান্য সীগাগুলোকে তার ‘তাবে’ বানানো একটি অপ্রয়োজনীয় প্রলম্বিতকরণ। তেমনি           ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রে এভাবে বলা যে, এগুলো আসলে মাকসুরুল আইন ছিল। হরফে হালকীর ‘রেয়ায়েত’ করে তাকে ফাতহ দেওয়া হয়েছে-এই সব কথা অনর্থক ‘তাকাল্লুফ’। কায়েদার সঠিক বিবরণ সেভাবেই হবে যেভাবে আমি বলে এসেছি। ‘মানযুমে নেক’ নামক কিতাব প্রণেতাও এভাবে লিখেছেন।’ (ইলমুস সীগা ৪৭)

‘মানযুমে নেক’ কিতাবটি দেখার সুযোগ আমার হয়নি। তবে তার অনুকরণে ইলমুস সীগার মুসান্নিফ যে দুটি ‘তাসাররুফ’ করেছেন তন্মধ্যে প্রথমটি হয়তো কোনোভাবে সহনীয়, কিন্তু আমার ধারণা, দ্বিতীয় ‘তাসাররুফ’টিতে তাঁর ‘তাসামুহ’ হয়েছে। সেই হিসেবে প্রশ্নে উল্লেখিত বাবে সামিআ-এর এই জাতীয় শব্দাবলি দ্বারা তাঁর উপর বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াই স্বাভাবিক।

অথচ ছরফীরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, এই কায়েদাটি ‘ছুলাছী মুজাররাদের কেবলমাত্র ঐ সকল বাবেই প্রযোজ্য হবে, যার মুযারের সীগা                 বা

 

 

হবে।

 

 

 

 

 

 

(তাসরীফুল ইযযী ৭৬-৭৮; আলমুমতিউল কাবীর ২৮৩, ২৮৫; আসসরফুল কাফী ২৮০)

‘ইলমুস সীগা’র মুসান্নিফের এই তাসামুহ হওয়ার কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, তিনি এই কিতাব লিখেছেন আন্দামান দ্বীপে বন্দী অবস্থায়। তিনি বলেছেন যে, ‘সেখানে তার কাছে কোনো কিতাব ছিল না।’ অন্যান্য কিতাব মুরাজাআ করার সুযোগ পেলে তিনি কায়েদাটিকে হয়তো অন্যভাবে লিখতেন। 

শেয়ার লিংক

সাইফুল্লাহ ইবনে যাহেদুল্লাহ - জামেয়া মাদানিয়া ফেনী

প্রশ্ন

কয়েকদিন আগে আলকাউসার ২০০৮ সালের ভলিউমটি উল্টাচ্ছিলাম। এপ্রিল ’০৮ সংখ্যার শিক্ষাপরামর্শ বিভাগে ‘খাসিয়াতে আবওয়াব’ সম্পর্কিত উত্তরটি খুব ভালো লেগেছে। তবে একটি বিষয়ে আমার একটু খটকা আছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়ার  মুহতামিম মাওলানা আবদুল হালীম বুখারী ছাহেব মুদ্দাজিল্লুহুমও এই বিষয়ে একটি রিসালা ‘আসান খাসিয়াতে আবওয়াব’ নামে লিপিবদ্ধ করেছেন।’ অথচ জামাতে শাশুমে আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিসের নেসাবভুক্ত যে কিতাবটি আমরা পড়েছি, তা তাঁর লিখিত নয়; এটি লিখেছেন মাওলানা সাআদ মুশতাক আল হাসিরী। আসলে বিষয়টি কী? কিতাব কি দুটি না একটি? আর ঐ কিতাবের মান কেমন? সবিনয়ে জানতে আগ্রহী।

উত্তর

হ্যাঁ, আপনার কথা সঠিক। আলকাউসারে এটিকে ভুলবশত হযরত মাওলানা বুখারী ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের তাসনীফ বলা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। সেখানে আমি বলেছিলাম যে, কিতাবটি দেখার সুযোগ আমার হয়নি। পরে রিসালাটি পেয়েছি। এটি দারুল উলূম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস হযরত সাঈদ আহমদ পালনপুরী দামাত বারাকাতুহুম-এর তত্ত্বাবধানে রচিত। রচনা করেছেন দারুল উলূমের উস্তায মাওলানা সাআদ মুশতাক মুদ্দাযিল্লুহুম।

রিসালাটি খাসিয়াতের জন্য সুন্দর ও প্রাঞ্জল একটি কিতাব। একত্রিশ সবকে সুবিন্যস্ত রিসালাটির মধ্যে দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নজরে পড়ল। প্রথমত খাসিয়াতে আবওয়াব বর্ণনার আগেই রিসালার প্রথম সাত সবকে উদাহরণ সহকারে আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থগুলোর মাধ্যমে খাসিয়াতের বিস্তারিত পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে পরবর্তী খাসিয়াতে আবওয়াব বোঝা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত প্রত্যেক সবকের শেষে মশক ও তামরীনও দেওয়া হয়েছে। ফলে এটিকে খাসিয়াতের তামরীনী কিতাবও বলা যায়। মাদরাসার যিম্মাদারগণ কিতাবটিকে নেসাবভুক্ত করা যায় কি না- ভেবে দেখতে পারেন। 

শেয়ার লিংক
advertisement
advertisement