মো: আবদুল্লাহ - গফরগাঁও, মোমেনশাহী

প্রশ্ন

মুহতারাম, গত (জানুয়ারী ২০১৭) শিক্ষার্থীদের পাতায় একটি প্রশ্নের উত্তরে লিখেছিলেন, ইতিহাস অনেক প্রকার। তার মধ্যে একটা ছিল ইসলামী ইতিহাস। এই ইসলামী ইতিহাসেরও অনেকগুলো শাখা বর্ণনা করেছিলেন। ঐগুলোর মধ্যে সালতানাতের ইতিহাস নামক একটি শাখা ছিল। আমি এই ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চায়। দয়া করে এই বিষয়ের গ্রহণযোগ্য কিছু গ্রন্থের নাম বলে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব।

আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন- আমিন।

বি. দ্র. গ্রন্থগুলোর নাম বাংলা ও উর্দূর মধ্যে হলে আমার অনেক ফায়দা হতো।

উত্তর

মুসলিম সালতানাতের ইতিহাস সম্পর্কে আরবী ভাষায় বহু মৌলিক গ্রন্থ রয়েছে। উর্র্দূ ভাষায়ও বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এখানে আপানার জন্য কয়েকটি নির্বাচিত গ্রন্থের নাম উল্লেখ করছি-

১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, হাফেজ ইবনু কাছীর রাহ.। এটি মূলত আরবীতে, তবে এর বাংলা অনুবাদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। এতে নবী-রাসূল, আকাবির-আউলিয়া ও মুসলিম মনীষীদের জীবনী এবং সাধারণ ইতিহাসের পাশপাশি মুসলিম খলীফা ও সুলতানদের জীবনী ও বিভিন্ন ঘটনাও রয়েছে।

২. তারীখুল খুলাফা, হাফেয সুয়ূতী রাহ.। মূল আরবী। এর উর্দূ অনুবাদ হয়েছে।

ভারত থেকে প্রকাশিত, ইতিহাস বিষয়ক কিছু গ্রন্থ যেমন-

৩. তারীখে ইসলাম, শাহ মুঈনুদ্দীন আহমাদ নদভী।

৪. তারীখে সিকিল্লিয়া, সায়্যেদ রিয়াসত আলী নদবী।

৫. দাওলাতে উছমানীয়াহ, ড. মুহাম্মদ আযীয।

৬. হিন্দুস্তান কে আহদে উসতা কী এক এক ঝলক, সায়্যেদ সবাহুদ্দীন আব্দুর রহমান।

৭. হিন্দুস্তান কে আহদে মাযী মে মুসলমান হুকুমরানো কী মাযহাবী রওয়াদারী, সায়্যেদ সবাহুদ্দীন আব্দুর রহমান।

৮. তারীখে ইসলাম, আকবর শাহ খান নাজীরাবাদী। মূল উর্দূ। এর বাংলা অনুবাদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।

৯. মুখতাসার তারীখে ইসলাম, মাওলানা গোলাম রাসূল মেহের।

১০. তারীখে হিন্দ, মুফতী মুহাম্মদ ছাহেব পালনপুরী।

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ নাঈমুদ্দীন - মালহাতা জামিয়া ইউনুছিয়া বি.বাড়িয়া

প্রশ্ন

সালাম বাদ, হুযুরের কাছে সবিনয় অনুরোধ হল, নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানালে উপকৃত হতাম।

১. অনেকদিন যাবৎ একটা বিষয়ে অস্থিরতায় ভুগছি। তা হল, ছবকে মন বসে না। অনেক চেষ্টা করেও অন্তর হাজির রাখতে পারি না। হুযুরের দিকনির্দেশনার খুবই মুহতাজ।

২. আরব বিশ্বের সবচে’ সুসংগঠিত ইসলামি আন্দোলন ইখওয়ানুল মুসলিমিন ও তার প্রতিষ্ঠাতা শহীদ হাসানুল বান্না সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ কীভাবে জানতে পারব?

৩. ইমাম খামেনি ও ইরানের ইসলামি বিপ্লব সম্পর্কে জানতে চাই। হে প্রভু! হুযুরের সময়ের মধ্যে পরিপূর্ণ বরকত দান করুন।

উত্তর

মন কেন বসে না? নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কিন্তু আপনি সেই কারণটি বিস্তারিত উল্লেখ করেননি। যদি অমনোযোগিতার কারণ হয় অন্য কোনো ব্যস্ততা তাহলে অবশ্যই তা পরিত্যাগ করতে হবে। ইলমের জন্য একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতা অপরিহার্য। সুতরাং সকল অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকে দূরে থাকুন এবং যথাসম্ভব নিজেকে ইলম ছাড়া অন্য সকল ঝামেলা ও ব্যস্ততা থেকে মুক্ত রাখুন, ইনশাআল্লাহ মন বসতে থাকবে।

আর যদি বিক্ষিপ্ত চিন্তা-ভাবনা বা দুশ্চিন্তার কারণে সবকে মনোনিবেশ করতে না পারেন তাহলে তার রূহানী চিকিৎসা এই যে, ‘মন বসে না’-এই ওয়াসওয়াসাই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। মন বসালেই বসবে। এজন্য জোর করে মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু করুন। নিজেকে ও নিজের সকল বিষয়কে আল্লাহ তাআলার উপর ন্যাস্ত করে ভারমুক্ত হোন এবং পড়াশোনায় মগ্ন থাকুন।

জামাতের মুত্তাকী ও মেহনতী সাথীদের সংশ্রব গ্রহণ করুন। একাগ্রতার সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয়- গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার এবং তাওবা-ইস্তিগফারের পাবন্দী করার চেষ্টা করুন। সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষিপ্ত চিন্তা এবং দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য সকাল-সন্ধ্যা নিয়মিত নি¤েœাক্ত দুআগুলো পাঠ করুন।

رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُونِ.

اللّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَسَاوِسِ الصَّدْرِ، وَشَتَاتِ الْأَمْرِ.

اللّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ، وَقَهْرِ الرِّجَالِ.

وَ اُفَوِّضُ اَمْرِیْۤ اِلَی اللهِ   اِنَّ اللهَ بَصِیْرٌۢ بِالْعِبَادِ .

حَسْبِیَ اللهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ   عَلَیْهِ تَوَكَّلْتُ وَ هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِیْمِ .

(খ) ইখওয়ানুল মুসলিমীন এবং শায়েখ হাসানুল বান্না রাহ. সম্পর্কে জানতে নিম্নোক্ত রিসালাসমূহ মুতালাআ করতে পারেন :

১. শায়েখ আহমদ আনাস হাজ্জাজী রচিত

روح وريحان من حياة داع ودعوة

২. খায়রুদ্দীন যিরিকলী-এর ‘আল-আ‘লাম’ গ্রন্থে ২/১৮৩-১৮৪-এ শায়েখের জীবনী।

৩. ‘হাসানুল বান্না’, আনওয়ার আলজুনদী, দারুল কলম, দিমাশক্ থেকে প্রকাশিত।

৪. মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রাহ.-এর কয়েকটি রিসালা। যেমন, مذكرة سائح في الشرق العربي

বা এর উর্দূ

شرق اوسط كى ڈائرى

پرانے چراغ  ৩/১৩-২২

 ১/৩৬৩-৩৮২كاروان زندگى

دو متضاد تصويريں

এবং

مسلم ممالك ميں اسلاميت اور مغربيت كى كشمكش  পুস্তিকা থেকে আরব বিশ্বের আলোচনা।

৫.  تحريك اخوان المسلمين ماضى وحال মূল : মুহাম্মদ শওকী যকী, অনুবাদ : রিযওয়ান আলী নদবী, ভূমিকা : আবুল হাসান আলী নদভী।

(গ) শীয়াদের ইমাম খোমেনী এবং ইরানী ইনকিলাব সম্পর্কে জানার জন্য প্রাথমিকভাবে মাওলানা মানযূর নোমানী রাহ.-এর রিসালা ايرانى انقلاب- امام خمينی اور شيعيت মুতালাআ করতে পারেন। আতীকুর রহমান সমভলীর انقلاب إيران اور اس كى اسلاميت؟ ايك سفرخيال كى سرگزشت রিসালাটিও দেখতে পারেন।

শেয়ার লিংক

আবু মুহাম্মদ - ধুলেরচর, সদর, টাঙ্গাইল

প্রশ্ন

আল্লাহ তাআলা সিহহাত ও আফিয়াতের সাথে নেক হায়াত দারায করুন এবং হুযুরের খেদমতকে কবুল করুন- আমীন!

হুযুরের কাছে আমার জানার বিষয় হল : أخلص دينك يكفك العمل القليل এই হাদীসে يكفك শব্দের ‘ফা’ এবং ‘কাফ’ এর মাঝে ‘ইয়া’ হরফযোগে يكفيك পড়তে হবে? নাকি ‘ইয়া’ বাদ দিয়ে يكفك পড়তে হবে? কোন্টি সঠিক এবং এর কারণ কী? তাহকীক ও কাওয়ায়েদসহ জানালে কৃতজ্ঞ হব।

কেননা বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদীন যাবৎ আমাদের কছিু সাথীদের মাঝে দ্বিমুখী বক্তব্য চলে আসছে। সাথে হাদীসটির হাওয়ালা ও মান উল্লেখ করলে উপকৃত হব।

হুযুরের নিকট আমার ইলমী-আমলী তারাক্কীর জন্য দুআর দরখাস্ত। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

উত্তর

يكفك শব্দটি মূলত يكفيك ছিল কিন্তু এটি أخلص আমরের সীগার জওয়াব হওয়ার কারণে ‘ইয়া’ হরফটি হযফ হয়েছে। কারণ ‘ইয়া’ হরফটি হরফে ইল্লত, আর নাহবের প্রসিদ্ধ কায়েদা হল, হরফে ইল্লতের ইরাব জযম হলে সেটি হযফ হয়ে থাকে। ইমাম মুনাবী রাহ. ফয়যুল কাদীর গ্রন্থে (১/২৮০) উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন-

(يكفك) بالجزم جواب الأمر، و في نسخ يكفيك بياء بعد الفاء، ولا أصل لها في خطه.

হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইবনু আবীদ দুনিয়া ‘কিতাবুল ইখলাস’-এ, ইমাম হাকেম ‘আল-মুস্তাদরাক’ গ্রন্থে (৪/৩০৬) এবং ইমাম বায়হাকী ‘শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থে (৫/৩৪২, ৬৮৫৯)।

শেয়ার লিংক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক - ঢাকা

প্রশ্ন

 ...

 

উত্তর

আমি আপনার দীর্ঘ চিঠিটি পড়েছি। কিন্তু আপনার চিঠির জবাব দেয়ার মত আমি কিছু খুঁজে পাইনি। আমি দুআ করি, আল্লাহ তাআলা যেন আপনার সকল পেরেশানী দূর করেন, দ্বীন ও ইলমের পথে ইস্তেকামাত দান করেন এবং কামিয়াব করেন। আমীন।

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ আল-আমীন হুসাইন - জামিয়া ইসলামিয়া শামছুল উলূম চাঁদখালী মাদরাসা

প্রশ্ন

ক. আমি কাফিয়া জামাতের ছাত্র। আমি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে আমার সমস্যার কথা জানাচ্ছি। আমার অনেক আশা, আমি পরিপূর্ণ মনোযোগ নিয়ে দরসে বসব এবং প্রতিটি বিষয়ের আলোচনা মন দিয়ে শুনবো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল যখন আমি দরসে বসি তখন আমার মন দরসে থাকে না।

খ. আমি কাফিয়া জামাতে পড়ি অথচ আমি সহীহভাবে দ্রুত ইবারত পড়তে পারি না।

গ. বাক্য যদি খুব বড় হয় তাহলে আমি তারকিব করতে পারি না।

ঘ. আমার উস্তাযগণের খেদমত করতে মন চাই না। অনেক সময় তাঁদের সাথে বেয়াদবীমূলক আচরণ করে ফেলি।

ঙ. যখন আমি নিজে নিজে উপরোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি, যে আমি কাফিয়া জামাতে পড়ি অথচ এখনও দরসে মন বসাতে পারি না। ইবারত পড়তে পারি না, তারকিব করতে পারি না, উস্তাযগণের খেদমত করি না- তাহলে আমার মাদরাসায় পড়ে কী লাভ? মাদরাসায় পড়ে আর কী হবে, তারচে’ অন্য কাজে লাগি।

অতএব হুযুরের কাছে আমার আকুল আবেদন হল, যেহেতু আমার ভেতর অনেক রোগ আছে, সুতরাং আমাকে এমন কিছু আমল বলে দিবেন, যার উপর আমল করে আমি একজন দ্বীনদার ইস্তিদাদওয়ালা আলেম হতে পারি।

 

উত্তর

আপনার প্রশ্নের জবাব আপনারই চিঠির শেষে রয়েছে। আপনি যখন নিজেই নিজের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছেন তাহলে এখন করণীয় হল হিম্মত ও নিয়তকে প্রয়োগ করা। মাদরাসায় না-পড়ার কথা কখনো অন্তরে বা মুখে আনবেন না। কারণ মাদরাসায় এমনি পড়ে থাকলেও ফায়দা। আপনি আপনার কোনো মুশফিক ও অভিজ্ঞ উস্তাযের তত্ত্বাবধানে মেহনত করতে থাকুন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কামিয়াব করুন।

শেয়ার লিংক

নূর আহমদ বিন সালেহ - ডেমরা, ঢাকা

প্রশ্ন

ক. ছোটবেলা বাংলা বইয়ে পড়েছি, ‘উদ্দেশ্যহীন জীবন মাঝীবিহীন নৌকার মত’ উস্তাযগণের বয়ানের মাধ্যমে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়েছে, তবে উদ্দেশ্য নির্বাচনে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি। অর্থাৎ তালীমী জীবনে কোন্ ফনের উপর বিশেষ করে মেহনত করব। কখনো একটি ফনকে নির্ধারণ করি কিন্তু কিছুদিন পর আবার মন ঘুরে যায়, তাই হুযুরের কাছে জানতে চাই, লক্ষ্য কীভাবে নির্ধারণ করব? এবং লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে কী পন্থা অবলম্বন করব?

খ. আমি চাচ্ছি জালালাইন জামাত থেকে দারুল উলূম দেওবন্দে পড়ব, তবে আমাদের উস্তাযগণ বলে থাকেন এখান থেকে দারুল হাদীস পড়ে যেতেÑ এর কারণ কী? এ ব্যাপারে হুযুরের মতামত কী? এমতাবস্থায় আমার করণীয় কী হতে পারে?

আল্লাহ তাআলা হুযুরকে নেক হায়াত দান করুন এবং মিল্লাতের অপূর্ণ কাজগুলো পূর্ণ করার তওফীক দান করুন এবং আমাদেরকে কিয়ামতের দিন তালিবে ইলমের কাতারে শামিল করুনÑ আমীন।

উত্তর

ক. আপনি এত পেরেশান কেন?! ঠিক এখনই বিশেষ কোনো ফনকে নির্ধারণ করার কী প্রয়োজন? দাওরায়ে হাদীস বা মেশকাত পর্যন্ত মাদরাসায় যে নির্ধারিত নেসাব ও নেযাম রয়েছে সে অনুসারেই আপনার চলা উচিত। এখন সময় হল মৌলিক ইসতি‘দাদ তৈরি করার। বিশেষ কোনো ফন চর্চা তো আরো পরের বিষয়। এখন আপনার কর্তব্য হল, মাদরাসার নেযাম মেনে চলা, উসতাযগণের তালীম ও তারবিয়াতের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলা এবং মৌলিক যোগ্যতাকে পাকাপোক্ত করা। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কামিয়াব করুন।

খ. এ বিষয়ে উস্তাযদের পরামর্শ মেনে চলাই কর্তব্য। এর পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ কীÑ তা জানার সময় এখন নয়।

শেয়ার লিংক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক - ঢাকা

প্রশ্ন

উস্তাযে মুহতারাম! আমি মাওলানা হারুন ছাহেবের রচিত ‘আলফাতহুর রব্বানী’ কিতাবটি পড়ছিলাম। এর শুরুতে আপনার একটি তাকরীয রয়েছে। কিন্তু কিতাবটির ২৯৮-২৯৯ পৃষ্ঠায় একটি কথা দেখে খুব বিস্মিত হলাম। কারণ এতে আলফুতুহাতুল মাক্কীয়াকে ত্রুটিমুক্ত কিতাব বলা হয়েছে। আমার প্রশ্ন হল, এমন একটি কিতাবকে কীভাবে ত্রুটিমুক্ত বলা হল?! জানি না, কিতবারের ব্যাপারে এই মন্তব্য তাকরীয লেখার আগে আপনার নযরে এসেছি কি না । সুতরাং হযরতের কাছে আমার আবেদন, কিতাবটি সম্পর্কে আপনার সুচিন্তিত মতামত ও তাহকীক কীÑ জানালে খুবই উপকৃত হব। আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

উত্তর

বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করার জন্য আপনাকে শুকরিয়া। জাযাকাল্লাহু খায়রান। আলফাতহুর রব্বানী নামে যে হাশিয়াটির কথা আপনি উল্লেখ করেছেন তার  শুরুতে আমার যে লেখাটি রয়েছে তার শিরোনাম হল ‘কালিমাতুশ শুক্র’। তাকরীয নয়। পারিভাষিক তাকরীয এবং কালিমাতুশ শুক্র নামে আমি যা লিখেছি এ দুয়ের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কিতাবটির আদ্যপ্রান্ত সব কথা আমি পড়িনি। সুতরাং আপনি যে কথার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তা ইতোপূর্বে আমার নযরে আসেনি। আপনি বলার পর আমি তা দেখেছি।

লক্ষণীয়, উপরোক্ত স্থানে টীকাকার আসলে আল-ফুতুহাতুল মাক্কীয়াকে ত্রুটিমুক্ত কিতাব বলে কোনো রায় প্রদান করেননি বা এ বিষয়ে তাঁর কোনো তাহকীক ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও পেশ করেননি এবং সম্ভবত এমনটা তার উদ্দেশ্যও ছিল না। এখানে মূলত তিনি প্রসঙ্গক্রমে এ ব্যাপারে কেবল  লতীফা ও চুটকি হিসেবে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যা থেকে আলফুতুহাতুল মাক্কীয়া কিতাবটি ত্রুটিমুক্ত হওয়া প্রমাণীত হয় না এবং লেখক তা প্রমাণ করতে চানওনি। খাব এবং কাশফ ও কারামত সম্পর্কে আমাদের কিতাব ‘তাসাউফ : তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ’-এ যে আলোচনা রয়েছে তা সামনে থাকলে কোনো ভুল ধারণা সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল না। তারপরও কারো ক্ষেত্রে ভুল ধারণার সৃষ্টি করতে পারে, তাই এ ধরনের ঘটনা উল্লেখ না করাই উচিত। আমি যদি ছাপার আগে দেখতাম তবে  এ বিষয়টি বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিতাম।

ফুতুহাতে মাক্কীয়া সম্পর্কে আপনি আমার রায় ও তাহকীক জানতে চেয়েছেন, দেখুন, কোনো কিতাব সম্পর্কে রায় প্রদান করতে হলে সেই কিতাবটি আদ্যপ্রান্ত ভালভাবে পড়া দরকার, কিন্তু আমি এ কিতাবটি পড়িনি এবং তা পড়ার প্রয়োজনও বোধ করি না। সুতরাং নিজ থেকে এ কিতাবের ব্যাপারে কোনো রায় প্রদান করার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবে যদি কিছু বলতেই হয় তাহলে আমি এ ব্যাপারে আকাবিরদের কথাই তো শুনিয়ে দিতে পারি। তো এখানে আমি মুজ্জাদ্দিদে আলফেসানী আহমদ সেরহিন্দী রাহ. (১০৩৪ হি.)-এর মাকতুবাত থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি পেশ করছিÑ

১. كلام محمد عربى عليہ وعلى آلہ الصلواة والسلام دركار است نہ كلام محي الدين عربى وصدر الدين قونوى وعبد الرزاق كاشى، مارا بانص كار است نہ بفص، فتوحات مدنيہ از فتوحات مكيہ مستغنى ساختہ است. (مكتوبات، حصۂ  دوم، ص ১১১، مكتوب ১০০)

২. از نص بفص نميگرانيد، و از فتوحات مدنيہ بفتوحات مكيہ التفات نمى كند. (مكتوبات مجدد، حصۂ سوم ص১২، مكتوب ১৩১، مسلسل ৩০৪)

৩. "وعمل صوفيہ در حل وحرمت سند نيست، ہميں بس نيست كہ ما ايشاں را معذور داريم وملامت نہ كنيم؟ وامر ايشاں را بحق سبحانہ وتعالى مفوض داريم؟

اينجا قول امام ابي حنيفہ وامام ابي يوسف وامام محمد معتبر است، نہ عمل ابي بكر شبلی   وابى حسن نوری، ... " (مكتوبات مجدد، دفتر اول ، حصۂ چہارم ص১৭، ج، مسلسل ৬২৬)

আল্লাহ করুন, আপনি মুজাদ্দিদ রাহ.-এর উপরোক্ত কথাগুলো বুঝবেন এবং সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করবেন।

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ জহিরুল ইসলাম - শর্শদি ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদরাসা

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম। আল্লাহ আপনাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। হুযুর! আমি জামাতে কাফিয়ায় পড়ি। আমার প্রশ্ন হল :

ক. আরবী পড়তে আমার খুব ভালো লাগে, কিন্তু আমি এবারত পড়ে যথাসম্ভব অর্থ তুলতে পারি না।

খ. আরবী পত্রিকা পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ভালো করে বুঝি না। বিশেষ করে যে লেখাগুলো বিদেশী পত্রিকা থেকে দেওয়া হয়।

গ. লিখতেও চেষ্টা করি, কিন্তু সুন্দরভাবে লিখতে পারি না। একই শব্দ বারবার ব্যবহার করতে হয়। নতুন শব্দ ব্যবহারে প্রায় অক্ষম। যদিও ব্যবহার করি, কিন্তু বেশিদিন মনে রাখতে পারি না। এখন হযরতের কাছে জানার বিষয় হল, কীভাবে আমি এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পেতে পারি? আশা করি জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

ক. ‘অর্থ তুলতে পারি না’ এটা কেমন কথা! আপনি অর্থ তুলতে যাবেন কেন? অর্থ আপনি বুঝবেন এবং উপলদ্ধি করবেন। কাফিয়া জামাত পর্যন্ত যেসব আরবী কিতাব পড়া হয়েছে তা থেকে তো এই যোগ্যতা অর্জন হওয়ার কথা যে, যে কোনো আরবী কিতাব আপনি বুঝে বুঝে পড়বেন, যেভাবে কোনো বাংলা বই আপনি বুঝে বুঝে পড়েন।

যাইহোক, ‘অর্থ তুলতে পারি না’Ñ একথার উদ্দেশ্য যদি হয় সঠিক অর্থ ও মর্ম বুঝতে না পারা, তবে মনে রাখতে হবে, নাহু, সরফ এবং লুগাতের মাবাদিয়াত সম্পর্কে পাঠ গ্রহণ করার পরও কিতাবের ইবারত পড়ে যথাযথ অর্থ বুঝতে না পারার নানা কারণ রয়েছে। এক. নাহবী তারকীব যথাযথ বুঝতে না পারা। যেমন, কোনটি ফায়েল এবং কোনটি মাফউল, কোনটি মুবতাদা এবং কোনটি খবর, কোন যমীরের মারজে কী, ইসমে ইশরার মুশারুন ইলাই কীÑ এসব বিষয় সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে না পারা।

দুই. কোনো শব্দের মূল অর্থ জানা, ব্যবহারিক অর্থ না জানা। এজন্য লুগত থেকে এবং ইবারতের পূর্বাপর থেকে শব্দের উদ্দিষ্ট ব্যবহারিক অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

তিন. কিতাবটি যে ফনের সে ফনের পরিভাষা এবং বুনিয়াদী বিষয়াবলী সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না থাকা।

তো কী কারণে আপনি যথাযথ অর্থ ও মর্ম উদ্ধার করতে পারেন না তা আগে আপনাকে নির্ণয় করতে হবে এবং তা করতে হবে কোনো উস্তাযের কাছ থেকে নিজের অবস্থা যাচাই করে। অতপর সেই কারণটি দূর করার মেহনত করতে হবে উস্তাযের নেগরানীতে।

আর যদি আপনার কথার উদ্দেশ্য হয় অর্থ বুঝতে পারা সত্ত্বেও মুখে প্রকাশ করতে না পারা, তবে তো এর জন্য কথা প্রকাশের অনুশীলন প্রয়োজন। আর এ কাজটি আপনি নিয়মিত তাকরারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে করতে পারেন।

খ-গ. দেখুন, আরবী পত্র-পত্রিকা পড়া এবং আরবীতে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখার অনুশীলন এসব ইযাফী কাজ। আপনার মূল কাজ হল নেসাবের নির্ধারিত কিতাবসমূহের মুতালাআ, দরস, তামরীন এবং তাকরার। তো এসব কাজ ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন করার পরেই কেবল ইযাফী কাজ করতে পারেন উস্তাযের অনুমতিক্রমে এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে। সুতরাং আপনি কি এ বিষয়ে আপনার উস্তাযের অনুমতি এবং পরামর্শ গ্রহণ করেছেন? যদি তা করে থাকেন তবে তো আপনার উস্তায আপনাকে এ বিষয়ে আপনার উপযোগী নির্দেশনা দান করবেন। আর সে অনুসারেই আপনাকে অগ্রসর হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাওফীক দান করুনÑ আমীন।

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ জাবের হুসাইন - খেড়িহর মাদরাসা

প্রশ্ন

প্রথমে হুযুরের সিহহত ও আফিয়াত কামনা করছি। অতপর জানাচ্ছি যে, আমি পূর্বেও নি¤েœাক্ত প্রশ্ন পাঠিয়েছি। পৌঁছেনি ধারণা করে আবার বিষয়টি জানার জন্য লিখছি। তা হল, আমরা অনেককে বলতে শুনেছি যে, হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর বিবাহের মহর ছিল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দরূদ পড়া। আর এ বিষয়টিকে আল্লামা আবদুল হাই লখনবী রাহ. শরহে বেকায়া ছানী-এর বাবুল মহর-এর এক নং হাশিয়ায় ইবনুল জাওযী রাহ. রচিত كتاب صلوة الأحزان-এর হাওয়ালায় উল্লেখ করেছেন। তো এখন হুযুরের কাছে এ বিষয়ের তাহকীক জানতে আগ্রহী। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

উত্তর

দরূদ পাঠের ফযীলত বয়ান করতে গিয়ে অনেকে উপরোক্ত কথাটি বলে থাকেন। কিন্তু কথাটির কোনো সনদ ও সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।  আবদুল হাই লাখনবী রাহ. শরহে বেকায়ার হাশিয়ার উপরোক্ত কথাটি ইবনুল জাওযী রাহ.-এর যে কিতাবের হাওয়ালায় উল্লেখ করেছেন তার সঠিক নাম হল, سَلْوَةُ الأَحْزَان এবং পূর্ণাঙ্গ নাম হল, سَلْوَةُ الأَحْزَان بما رُوِيَ عن ذَوِي الْعِرْفَان এটি সনদবিশিষ্ট কোনো হাদীসের কিতাব নয়; বরং এতে মুসান্নিফ বিভিন্ন মনীষী ও আউলিয়া কেরামের যুহ্দ ও তাকওয়া সংক্রান্ত কিছু ঘটনা ও বাণী সংকলন করেছেন। কিন্তু তিনি এতে কোনো বাণীর সনদ বা হাওয়ালা উল্লেখ করেননি।

দশম শতকের বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেয শামসুদ্দীন সাখাবী রাহ. উপরোক্ত ঘটনাটি সম্পর্কে বলেছেনÑ

و ذكر ابن الجوزي في كتابه "سلوة الأحزان" قصة طويلة لم أقف عليها مسندة في تزويج أبينا آدم عليه الصلاة والسلام بحواء..."

অনেক তালাশ করে আমরাও এর কোনো সনদ খুঁজে পাইনি। আর আহলে ইলমের সর্বজন স্বীকৃত নীতি হল, সনদ ছাড়া এ ধরনের কথা গ্রহণযোগ্য নয়।

উপরোক্ত রেওয়ায়েতটির ব্যাপারে মারকাযুদ দাওয়াহ থেকে প্রকাশিত ‘এসব হাদীস নয়’ বইয়ের ২য় খ-ের ৭৭ নম্বর পৃষ্ঠায় আলোচনা করা হয়েছে। আপনি তা দেখতে পারেন।

শেয়ার লিংক

আশরাফ উদ্দীন - লালখান বাজার, চট্টগ্রাম

প্রশ্ন

আল্লাহ হুযুরকে সিহহাত ও অফিয়াতের সাথে সুদীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং হুযুরের ইলমের ভা-ার থেকে আমাদের বেশি বেশি উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন।

আমাদের এক উস্তাযে মুহতারাম বলেছেন- ماضي قريب منفي -এ ما শব্দটি قد-এর পূর্বে আসবে। কিন্তু আমাদের সামনে علم الصرف-এর যে সমস্ত কিতাবাদি আছে তাতে ما শব্দটি  قد-এর পরে দেওয়া আছে। পরবর্তীতে আমি قد শব্দটির ব্যবহার খুঁজতে গিয়ে ماضي قريب-এর অর্থে قد শব্দটির ব্যবহার দেখিনি। হুযুরের কাছে আমার জানার বিষয় হল-

(ক) قد শব্দটি ماضي قريب অর্থে কুরআন-সুন্নাহ্য় ব্যবহার হয়েছে কি না...?

এবং আরবের স্বীকৃত ভাষা একাডেমীগুলো ماضي قريب অর্থে قد শব্দটির ব্যবহার করেছে কি না...?

(খ) যদি قد শব্দটি ماضي قريب-এর ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে তাহলে ما শব্দটি ماضي قريب منفي-এর ক্ষেত্রে قد -এর আগে আসবে না পরে।

উত্তর

قد এই হরফটির বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। নাহব শাস্ত্রের ইমাম ইবনু হিশাম রাহ. (মৃত্যু : ৭৬১ হি.) ‘মুগনিল লাবীব’ কিতাবে قد শব্দের প্রায় সাতটি অর্থ বয়ান করেছেন। এই হরফটি যখন ফেয়েলে মাযীর শুরুতে আসে তখন সেখানে তিনটি অর্থের সম্ভাবনা থাকে। এক. তাহকীক ও তাকীদ অর্থাৎ ক্রিয়াটি বাস্তবে ঘটেছে একথা নিশ্চিত করা। দুই. তাওয়াক্কু‘ অর্থাৎ ক্রিয়াটি মুখাতাব ও শ্রোতার প্রত্যাশিত বা প্রতীক্ষিত বিষয় তা নির্দেশ করা। তিন. تقريب الماضي من الحال অর্থাৎ ক্রিয়াটি হাল ও বর্তমানের নিকটবর্তী সময়ে ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে এমন অর্থ প্রকাশ করা। এজন্য এই হরফটিকে حرف التحقيق বলা হয়। حرف التوقع বলা হয় এবং حرف التقريب নামেও অভিহিত করা হয়। তবে উপরোক্ত অর্থগুলো কোথাও একসঙ্গে তিনটিই উদ্দেশ্য হয়। কোথাও প্রথম দুটি অর্থ উদ্দেশ্য হয় এবং কোথাও কেবল ফেয়েলের সংঘটনকে তাকীদযুক্ত করা উদ্দেশ্য হয়।

ইমাম রযী আস্তারাবাযী (মৃত্যু : আনুমানিক ৬৮৬ হি.) কাফিয়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বলেন-

هذا الحرف إذا دخلت على الماضي أو المضارع فلا بد فيها من معنى التحقيق، ثم إنه ينضاف في بعض المواضع إلى هذا المعنى، في الماضي : التقريب من الحال مع التوقع، أي يكون مصدره متوقعاً لمن تخاطبه واقعاً عن قريب كما تقول لمن يتوقع ركوب الأمير : قد ركب أي حصل عن قريب ما كنت تتوقعه، ومنه قول المؤذن قد قامت الصلاة، ففيه إذن ثلاثة معان مجتمعة : التحقيق، والتوقع والتقريب.

وقد يكون مع التحقيق : التقريب فقط، ويجوز أن تقول : "قد ركب" لمن لم يكن يتوقع ركوبه، ولا تدخل على الماضي غير المنصرف، كنعم، وبئس و عسى و ليس، لأنها ليست بمعنى الماضي حتى تقرب معناها من الحال. وتدخل أيضاً، على المضارع المجرَّد من ناصب وجازم وحرف تنفيس، نحو : إن الكذوب قد تصدق، أي بالحقيقة يصدر منه الصدق، وإن كان قليلا، وقد تستعمل للتحقيق مجرداً عن معنى التقليل نحو : قد نرى تقلب وجهك في السماء، وتستعمل أيضاً للتكثير في موضع التمدح...) كذا في شرح الرضي৩৮৭-৩৮৮

উপরোক্ত ইবারত থেকে বোঝা গেল, قد শব্দের প্রধান অর্থ হল, তাহকীক ও তাকীদ। অর্থাৎ ক্রিয়াটি বাস্তবে সংঘটিত হয়েছে সেকথা জোরালোভাবে পেশ করা। তবে ফেয়েলে মাযীর শুরুতে যখন তা দাখিল হয় তখন ক্রিয়াকে তাকীদযুক্ত করার পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সদ্যঅতীতকালে ক্রিয়া সংঘটিত হওয়া বোঝায়।

قد হরফটি মাযী করীব নির্দেশ করা প্রসঙ্গে ইবনু হিশাম রাহ. বলেন-

والثاني : تقريب الماضي من الحال، تقول : قام زيد، فيحتمل الماضي القريب، والماضي البعيد، فإن قلت "قد قام" اختص بالقريب، وانبنى على إفادتها ذلك أحكام.

قد হরফের উপরোক্ত অর্থ ইবনু হিশাম রাহ.-এর পূর্বে ও পরে লুগাত ও নাহবের আরো অনেক ইমাম উল্লেখ করেছেন। নাহব শাস্ত্রের অনেক মাসআলার তালীল ও বিশ্লেষণ قد শব্দের উপরোক্ত অর্থের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এ ধরনের কিছু নাহবী মাসআলা ইবনু হিশাম রাহ. উপরোক্ত আলোচনার শেষ দিকে একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।

আমার জানামতে আধুনিককালের আরবী ভাষাবিদ ও ব্যকরণবিদগণও মাযী করীব অর্থে قد যুক্ত ফেয়েলে মাযীর ব্যবহারকে স্বীকার করেন। আধুনিককালে শায়েখ আব্বাস হাসান রচিত নাহবের বিশদ এবং ব্যবহারিক গ্রন্থ النحو الوافي, যাতে বিভিন্ন নাহবী মাসআলায় আরবী ভাষা একাডেমীগুলোর সিদ্ধান্তাবলী উল্লেখিত হয়েছে। এতে মাযী করীব অর্থে    قد হরফের ব্যবহার দেখানো হয়েছে। ফেয়লে মাযীর সীগার বিভিন্ন ব্যবহারিক অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-

فالماضي له أربع حالات من ناحية الزمن تتعين كل واحدة منها عند عدم قرينة تعارضها.

الأولى : (وهي الأصل الغالب) بأن يتعين معناه في زمن فات وانقضى أي قبل الكلام سواءً أكان قريباً من وقت الكلام أم بعيداً وهذا هو الماضي لفظاً ومعنى ولكن إذا سبقته : "قد"- وهي لا تسبقه في الأغلب إلا في الكلام المثبت- دلت على أن انقضاء زمنه قريب من الحال؛ فمثل : "خرج الصاحبان" يحتمل الماضي القريب والبعيد، بخلاف "قد خرج الصاحبان"؛ فإن ذلك الاحتمال يمتنع، ويصير زمن الماضي قريباً من الحال؛ بسبب وجود " قد". كذا في النحو الوافي ১/৫১-৫৩

শায়েখ মুস্তফা গালায়িনী (মৃত্যু: ১৩৬৪ হি.) যিনি গত শতকে বায়রূতের বিশিষ্ট কবি, লেখক, আরবী ভাষার অধ্যাপক এবং কাযী ও বিচারক ছিলেন তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘জামিউদ দুরূসিল আরাবিয়্যাহ’-এ মাযী করীব অর্থে قد হরফের ব্যবহার উল্লেখ করেছেন। নাহবের প্রসিদ্ধ নযম ‘আল-উজরূমিয়্যাহ’-এর আধুনিক শরাহ ও হাশিয়াতে আরবের সমসাময়িক আলেমগণও قريب من الحال অর্থে قد হরফের ব্যবহার উল্লেখ করেছেন। জর্ডান আরবী ভাষা একাডেমীর মাজাল্লায় এক আরবী ভাষাবিদ الزمن الماضي في اللغة العربية নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। তাতে তিনি মাযী করীব অর্থে قد فعل ওযনের ব্যবহার উল্লেখ করেছেন।

তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, বিভিন্ন অর্থবিশিষ্ট শব্দের ক্ষেত্রে কোন্ অর্থটি কোথায় প্রযোজ্য তা বিচক্ষণ পাঠক ও শ্রোতাকে নির্ণয় করতে হয় বাক্যের পূর্বাপর আলামত থেকে বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে। সুতরাং قد শব্দটি কোথায় নিকট অতীত অর্থে ব্যবহার হয় তা বাক্যের পূর্বাপর বিভিন্ন আলামত ও অনুষঙ্গ থেকে বুঝতে হবে। এধরনের কিছু ব্যবহারক্ষেত্র উদাহরণসহ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে-

১. যখন কোনো প্রত্যাশিত বা প্রতীক্ষিত বিষয় সংঘটিত হওয়ার সংবাদ قد যুক্ত ফেয়েলে মাযী দ্বারা দেয়া হয় তখন সেই قد সদ্যঅতীতকালে ক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার ভাব প্রকাশ করে। ইমাম জামালুদ্দীন ইবনু মালিক আন্দালুসী (ওফাত ৬৭২ হি.) হরফে قد-এর তিনটি অর্থ বয়ান করেছেন, যার প্রথমটি সম্পর্কে তিনি বলেন-

أن تكون حرف تقريب، فتدخل على فعل ماضٍ متصرف متوقع، أي منتظر لتقريبه من الحال. كذا في "شرح التسهيل" لابن مالك ৪/১০৮

কুরআন কারীমের আয়াত থেকে এর দুটি উদাহরণ লক্ষ করুন-

قَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا - قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ.

এই আয়াত দুটির তাফসীর কাশ্শাফ, তাফসীরে আবীসসাঊদ, নযমুদ-দুরার এবং তাফসীরে মাযহারী  থেকে দেখা যেতে পারে ।

২. لمّا হরফ দ্বারা যে ক্রিয়াকে নফী করা যায় বা নফী করা হয় তার মোকাবেলায় ইছবাতের জন্য قد হরফযুক্ত যে ফেয়েলে মাযী ব্যবহৃত হয় তা সদ্যঅতীতকালের ক্রিয়া বোঝায়। ইমাম সিবাওয়াইহ বলেন-

وأما قد فجواب لقوله : لما يفعل، فتقول : قد فعل وزعم الخليل أن هذا الكلام لقوم ينتظرون الخبر.

-কিতাবু সিবাওয়াইহ ৪/২২৩, আলমুফাস্সাল ফী সিনআতিল ই‘রাব, যমখশারী; পৃ. ৩৭৭

এর উদাহরণ হিসেবে কবি নাবেগার এই কবিতাটি পেশ করা যায়-

أفد الترحل غير أن ركابنا ... لما تزل برحالنا وكأن قد

এই কবিতায় كأن قد শব্দের পর ফেয়েলে মাযী ঊহ্য রয়েছে। এতে قد হরফটি সদ্যঅতীতের ভাব প্রকাশ করছে। (দ্রষ্টব্য : লিসানুল আরব قد মাদ্দা)

৩. কোনো ক্রিয়া এখনো সংঘটিত হয়নি তবে তা কিছুক্ষণের মধ্যেই সংঘটিত হতে যাচ্ছে এমন ক্ষেত্রে قد فعل মাযীর এই সীগাটি হালের নিকটতম সময় নির্দেশ করে। যেমন নামায শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে ইকামতের এই বাক্য- قد قامت الصلاة

 ইমাম ইবনু জিন্নী আল মাওসিলী (মৃত্যু : ৩৯২) বলেন-

إن " قد" تقرب الماضي من الحال حتى تلحقه بحكمه أو تكاد، ألا تراهم يقولون : قد قامت الصلاة قبل حال قيامها، وإنما جاز ذلك لمكان "قد" وعلى قول الشاعر : أمَّ صبي له قد صبا أو دارج.

كذا في "سر صناعة الإعراب" لابن الجني ২/২৮৫ وكذا قاله ابن سيده في المحكم ৭/৩১৯ وابن منظور في "لسان العرب" في مادة (درج)

এ থেকে বোঝা যায়, قد হরফটি ফেয়েলে মাযীর শুরুতে দাখিল হলে কখনো সদ্যঅতীত নির্দেশ করে এবং কখনো আসন্ন ভবিষ্যত বা অব্যবহিত ভবিষ্যৎকালকে নির্দেশ করে। এজন্য আন-নাহবুল ওয়াফী গ্রন্থে কোনো এক প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-

لأن "قد" تقرب ـ أحيانا ـ الماضي من الحال، كما تقرب المستقبل من الحال أيضاً.كذا في ১/৬৬১ منه

এই ব্যবহারক্ষেত্রের আরেকটি উদাহরণ সূর্যাস্তের পূর্বমুহূর্তে قد غابت الشمس বলা এবং দরসে উস্তায উপস্থিত হওয়ার পূর্বমুহূর্তে ঘোষণা করা- قد جاء الأستاذ দেখুন : জামিউদ দুরুসিল আরাবিয়্যাহ, পৃ. ২৬৬ আততুহফাতুস সানিয়্যাহ, মুহাম্মাদ মুহিউদ্দীন আব্দুল হামিদ, পৃ. ১১

৪. قد যুক্ত ফেয়েলে মাযী যখন নাহবী তারকীব অনুসারে حال হয় তখন তা সদ্যঅতীতকালে ফেয়েল সংঘটিত হওয়া এবং সেই ফেয়েলের নতীজা ও ফল বর্তমান পর্যন্ত বিদ্যমান থাকার ভাব নির্দেশ করে।

এই ব্যবহারক্ষেত্রটি قد হরফ সদ্যঅতীতকাল নির্দেশের বড় ক্ষেত্র। এর বহু উদাহরণ রয়েছে। কুরআন কারীমের যেসব আয়াতের ফেয়েলে মাযীকে নাহবী তারকীব অনুসারে حال ধরা হয় সেগুলোর নাহবী তারকীবের আলোচনা তাফসীরের কিতাবসমূহে মুতালাআ করা হলে قد শব্দের আলোচ্য অর্থটির উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন সূরা মায়েদার ৬১ নং আয়াত-

وَإِذَا جَاءُوكُمْ قَالُوا آمَنَّا وَقَدْ دَخَلُوا بِالْكُفْرِ وَهُمْ قَدْ خَرَجُوا بِهِ.

এই আয়াতের তাফসীরে আল্লামা জারুল্লাহ যমখশারী বলেন-

قوله : (بالكفر) و (به) حالان أي دخلوا كافرين و خرجوا كافرين وتقديره ملتبسين بالكفر وكذلك قوله : (وقد دخلوا) (وهم قد خرجوا) وكذلك دخلت (قد) تقريبا للماضي من الحال، ولمعنى آخر: وهو أن أمارات النفاق كانت لائحة عليهم وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم متوقعا لإظهار الله ما كتموه فدخل حرف التوقع، و هو متعلق بقوله : (قالوا آمنا) أي قالوا ... وهذه حالهم.

৫. إذا এই হরফটি যখন مفاجأة বা আকস্মিকতার অর্থ প্রকাশ করে তখন এর পরে ফেয়েলে মাযী ব্যবহার হলে তার শুরুতে قد যুক্ত করা জরুরি হয় এবং সেই قد হরফটি الماضي القريب من الحال নির্দেশ করে। যেমন ‘আন্নাহবুল ওয়াফী’ গ্রন্থ ২/২৮০-এ বলা হয়েছে-

وقد تكون (إذا) للمفاجأة،- والأحسن في هذه الحالة اعتبارها حرفا-؛ فتدخل وجوباً إما على الجمل الإسمية نحو : اشتدت الريح، فاذا البحر هائج، وإما على الجمل الفعلية المقرونة بقد؛ لأن "قد" تقرب زمن الفعل من الحال- : نحو : اشتدت الريح، فاذا قد لجأت السفن إلى المواني- يضطرب البحر، فاذا قد يتألم  ركاب البواخر).

আশা করি এতক্ষণের আলোচনা থেকে আপনি বুঝতে পেরেছেন قد শব্দটি কোন কোন ক্ষেত্রে মাযী করীব অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, قد হরফটি অনেক সময় মাযীর শুরুতে কেবল তাকীদের জন্যই ব্যবহৃত হয় এবং এই অর্থটিই এর প্রধান অর্থ এবং বহুল ব্যবহৃত অর্থ। সর্বোপরি মাযী করীব বোঝানোর জন্য قد فعل বা قد যুক্ত মাযীর ব্যবহার জরুরি বা একমাত্র পদ্ধতি নয়। বরং মাযী করীব বোঝানোর ভিন্ন পদ্ধতিও রয়েছে। যেমন ফেয়লে মাযীর সাথে عن قريب ـ الآن ـ أمس ـ البارحة ـ آنفاً ـ قبل قليل ـ اليوم ইত্যাদি নিকটবর্তী সময়নির্দেশক শব্দ ব্যবহার করা। যেমন কুরআনে কারীমের নি¤েœাক্ত আয়াতগুলো লক্ষ করুন-

الآن جئت بالحق (البقرة : ৭১)، الآن حصحص الحق (يوسف : ৫১)، اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعمتي ورضيت لكم الاسلام دينا (المائدة : ৩)

এমনিভাবে أفعال المقاربة-এর মাধ্যমে মাযী করীব বোঝানো যায়। এছাড়া মাযী মুতলাকের সীগাও قرينة حالية-এর কারণে কখনো কখনো মাযী করীবের অর্থ প্রকাশ করে; শুরুতে قد যুক্ত না করা সত্ত্বেও। এ ধরনের ব্যবহার প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু মালিক حال-এর আলোচনায় বলেন-

دلالتها (أي قد) على التقريب مستغنى عنها بدلالة سياق الكلام على الحالية كما أغنى عن تقدير السين و سوف سياق الكلام في مثل قوله تعالى "وكذلك يجتبيك ربك ويعلمك من تأويل الأحاديث" بل كما استغنى عن تقدير "قد" مع الماضي القريب الوقوع إذا وقع نعتا أو خبراً. كذا في شرح التسهيل لابن مالك.২/৩৭৩

সাধারণ কথাবার্তা থেকে এর একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যেমন কেউ ট্রেন ধরার জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে ষ্টেশনে ছুটে আসল। কিন্তু সে পৌঁছার আগেই ট্রেন ছেড়ে চলে যায়। তখন আপনি ঐ ব্যক্তিকে লক্ষ করে বললেন- غادر القطار  এখানে আপনি চাইলে قبل قليل শব্দ যুক্ত করতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি  قبل قليل এই শব্দ বা শুরুতে قد হরফ কিছুই যোগ না করেন, বরং শুধু বলেন- غادر القطار তারপরও তাৎক্ষণিক অবস্থা থেকে বোঝা যাবে, ট্রেন এইমাত্র ছেড়ে চলে গেল।

(খ) আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল মাযী করীব মানফী সম্পর্কে। তো এ প্রসঙ্গে প্রথম কথা হল, قد হরফটি সাধারণত ফেয়েলে মুছবাতের শুরুতে আসে; ফেয়েলে মানফীর শুরুতে আসে না। এ কথাটি একটু আগে ‘আন্নাহবুল ওয়াফী’ কিতাবের হাওয়ালায় উল্লিখিত ইবারত- وهي لا تسبقه في الأغلب إلا في الكلام المثبت -এ বর্ণিত হয়েছে। المضارع المنفي بالحرف "لا"-এর শুরুতে قد  ব্যবহারের কিছু سماعي উদাহরণ পাওয়া যায়। কিন্তু মাযী মানফীর শুরুতে قد ব্যবহারের নির্ভরযোগ্য কোনো শাহেদ আছে কি না তা আমার জানা নেই। বরং ‘মুগনীল লাবীব’ কিতাবে قد হরফ সম্পর্কে বলা হয়েছে-

"قد" الحرفية مختصة بالفعل المنصرف، الخبري، المثبت، المجرد، من ناصب و جازم، وحرف تنفيس، وهي مع الفعل كالجزء. فلا تفصل منه بفاصل، اللهم إلا بالقسم...) انتهى.

অধিকন্তু মাযী করীব মানফী বোঝানোর জন্য হরফে নফীর সাথে قد ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ শুধু ما হরফে নফী মাযী মুতলাকের শুরুতে দাখিল হলে সাধারণত মাযী করীবের অর্থ প্রকাশ করে। এজন্য ফেয়েলে মাযীর আলোচনায় ‘আননাহবুল ওয়াফী’ কিতাবে বলা হয়েছে-

وإذا وجدت قبله ما النافية كان معناه منفيا، وكان زمنه قريبا من الحال؛ كأن يقول قائل : قد سافر عليّ، فتجيب : ما سافر علي، فكلمة "قد" أفادته في الجملة الأولى المثبتة قربا من الزمن الحالي، وجاءت كلمة : "ما" النافية فنفت المعنى، وأفادته القرب من الزمن الحالي أيضاً، ولا سيما مع القرينة الحالية السابقة.

শেয়ার লিংক

গোলাম রাব্বানী - মতিহার, রাজশাহী

প্রশ্ন

মুহতারাম, আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। আশা করি ভাল আছেন। আমার জানার বিষয় হল, মাযী মুতলাকের সীগা এবং মাযী কারীবের সীগা-এর তরজমা বিভিন্ন আলেম বিভিন্নভাবে করে থাকেন। তো সঠিক তরজমা কী হবে- দলীল-প্রমাণসহ বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

আপনার এ প্রশ্নটি সম্ভবত দুই-তিন বছর আগে এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু এর জবাব লিখতে বিলম্ব করা হয়েছে। কারণ প্রশ্নটির সার্বিক দিক নিয়ে চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন ছিল। এমনিভাবে বাংলাভাষা ও অনুবাদ সম্পর্কে ভালো জানাশোনা রয়েছে এমন আহলে ইলমের সঙ্গে এ বিষয়ে মশওয়ারা করারও প্রয়োজন ছিল।

মাযী মুতলাক ও মাযী করীবের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু মৌলিক বিষয় আলকাউসারের গত রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হি./ডিসেম্বর ২০১৭ সংখ্যায় শিক্ষার্থীদের পাতার শিক্ষাপরামর্শে আলোচনা করা হয়েছে। এখন কেবল অনুবাদ সংক্রান্ত কিছু কথা আরয করছি।

আমার জানামতে সাধারণভাবে এ কথাই প্রচলিত যে, فعل ‘ফেয়েলে মাযী মুতলাকের’ সীগার বাংলা অনুবাদ হল,  ‘সে করল’ বা ‘তিনি করলেন’। আর قد فعل ‘মাযী কারীবের’ সীগার অনুবাদ হল, ‘সে করেছে’ বা ‘তিনি করেছেন’। কিন্তু বাংলা ব্যাকরণ এবং ভাষার বাস্তব প্রয়োগ থেকে বোঝা যায় যে, ‘করল, করেছে এবং হল, হয়েছে’-উভয় ক্রিয়ারূপ দ্বারাই মাযী মুতলাক এবং মাযী করীব উভয়ের অনুবাদ করা যেতে পারে। তবে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সবটা সব জায়গায় খাটে না। উভয়ের মধ্যে কাঠামোগত ও ব্যবহারগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। কারণ, যেকোনো সীগা ও ক্রিয়ারূপের দু’ধরনের অর্থ হয়। এক. শব্দের সরফী বা কাঠামোগত অর্থ। দুই. শব্দটি বাক্যে প্রযুক্ত হওয়ার পর তার নাহবী এবং বালাগাতী অর্থ ও মর্ম, যা বাক্যের পূর্বাপর এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে বোঝা যায়। তো মাযী মুতলাকের সীগা মূলগতভাবে ক্রিয়ার কাজটি শুধু সম্পন্ন হয়েছে বোঝায়, তার বেশি কিছু নয়। কাজ কতটা আগে শেষ হয়েছে? এক্ষুণি। নিকট অতীতে নাকি দূর অতীতে তা মূল অর্থের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে কখনো কখনো বাক্যের পূর্বাপর অবস্থা থেকে এমন কিছু আলামত ও অনুষঙ্গ পাওয়া যায়, যা বাক্যস্থ ক্রিয়াটি নির্দিষ্টভাবে নিকট অতীতে বা দূর অতীতে সম্পন্ন হওয়া প্রমাণ বহন করে। এমনকি বালাগাতী মাকসাদে মাযীর সীগা বর্তমান বা ভবিষ্যত ক্রিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়।

এমনিভাবে বাংলাভাষার ক্রিয়াপদ সম্পর্কে একটি মৌলিক কথা মনে রাখতে হবে- বাংলায় ক্রিয়াপদের কাল রূপ-নির্ভর, অর্থ-নির্ভর নয়। “কারণ ক্রিয়ার কাল একটা ব্যাকরণিক ধারণা। তা সাধারণ সময়ের ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। ব্যাকরণে কালের চিহ্ন আর অর্থ প্রায়ই পৃথক হয়। যেমন আমরা যখন বলি, ‘সে আগামীকাল কানাডা যাচ্ছে, আর ফিরছে না।’ তখন আমরা ভবিষ্যত কালের কথা বলি। কিন্তু ‘যাচ্ছে’ ক্রিয়াপদ থেকে বোঝা যায় যে, আমরা ক্রিয়ার বর্তমান কালের রূপ ব্যবহার করেছি। এমনিভাবে ‘তিনি গতকাল হাটে যাননি’। এখানে বাক্যটি গতকাল সম্পাদিত ক্রিয়ার কথা বলছে। সুতরাং এটি অতীত কালের উদাহরণ হওয়া উচিত। কিন্তু বাক্যের ক্রিয়াপদ ‘যাননি’ বর্তমান কালের রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। (যেমন, ‘আপনি আজ হাটে যাননি’)। তাই, এখানে ক্রিয়াপদের কাল বর্তমান হিসেবে ধরা হয়। এধরনের আরো বহু উদাহরণ রয়েছে। এ ধরনের উদাহরণকে ব্যাকরণে কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ হিসেবে গণ্য করা হয়”। -‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ’ অবলম্বনে, দ্রষ্টব্য : পৃ. ২৩৩-২৩৫

ঘটে যাওয়া ঘটনা বা অতীত ঘটনা বোঝাতে বাংলা ভাষায় সাধারণত যেসব ক্রিয়ারূপ ব্যবহৃত হয় সেগুলোর মূল কাঠামোগত অর্থ এবং বাক্যে সেগুলোর বিশিষ্ট প্রয়োগ ও আলংকারিক ব্যবহার সম্পর্কে কিছু উদ্ধৃতি ব্যাকরণের নির্ভরযোগ্য বইপত্র থেকে এখানে পেশ করছি।

 

সাধারণ অতীত কাল

ভাষাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাধারণ অতীত কালের ক্রিয়াপদের পরিচয় এভাবে দিয়েছেন- ‘আমি ফল খাইলাম’। এখানে খাওয়া কাজটি  সাধারণভাবে অতীত বা শেষ হইয়াছে। এইজন্য খাইলাম ক্রিয়ার কাল সাধারণ অতীত।

যে ক্রিয়া সাধারণভাবে অতীত সময়ে হইয়াছে, তাহার কালকে সাধারণ অতীত কাল বলে। -বাঙ্গালা ব্যাকরণ, পৃ. ৮৪

একসময়ের বাংলা একাডেমীর পরিচালক ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক সাহেব লিখেছেন- “বর্তমান কালের পূর্বে যে ক্রিয়া সম্পন্ন হইয়া গিয়াছে, তাহার সময়ই সাধারণ অতীতকাল বুঝায়; যথা-‘আমি নিদ্রিত হইলাম’। ‘সে সেদিন একাকীই কাঁদিল’।” -মুহাম্মদ এনামুল হক রচনাবলী (ব্যাকরণ মঞ্জরী) ২/৪৩০

প্রখ্যাত বাংলা ভাষাবিদ ও ব্যাকরণবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আরো বিশদভাবে সাধারণ অতীতের পরিচয় তুলে ধরেছেন- “সাধারণ বা নিত্য অতীত-যে

ঘটনা কোনো অনির্দিষ্ট অতীত কালে হইয়াছে তাহার জন্য এই ‘ইল’ প্রত্যয়-যুক্ত সাধারণ অতীত প্রযুক্ত হয়। এই অতীতের একটা পুরাতন নাম ‘অদ্যতনী’। উদাহরণ, যথা-...‘আলেক্সান্দর পারস্য-সম্রাট দারয়হুঘ্কে যুদ্ধে পরাজিত করিলেন।’ কোনও ঘটনার সাঙ্গ বা সম্পূর্ণ হইয়া যাওয়ার কথা এই অতীত প্রকাশ করে বলিয়া ইংরেজীর Historical past -এর অনুকরণে, বাঙ্গালাতে ইহাকে ‘ঐতিহাসিক অতীত’-ও বলা হয়। কখনও-কখনও নিত্য-অতীত ক্রিয়া ‘এইমাত্র ঘটিল’ এই ভাব প্রকাশ করে। -ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, পৃ. ৩২১

সাধারণ অতীতের বিশিষ্ট প্রয়োগ

(ক) একটু আগেই কাজ শেষ হয়েছে এমন ভাব প্রকাশের জন্য। যেমন সে এইমাত্র চলে গেল। শুনলাম, পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে। -মুহাম্মাদ এনামুল হক রচনাবলী (ব্যাকরণ মঞ্জরী) ২/৪৩০

(খ) বর্তমান নির্দেশ : ওকে তোমার কাছে রেখে গেলাম (যাচ্ছি)।

(গ) আসন্ন ভবিষ্যত সময় বোঝাতে : কাপড়গুলো ঘরে তোল, বৃষ্টি এল বলে। -বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ, পৃ. ২৩৭

বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ গ্রন্থে ক্রিয়ার সাধারণ অতীত রূপের মূল কাঠামোগত অর্থ এবং বাক্যে প্রযুক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিবেশ অনুযায়ী অর্থের যেসব সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কে বলা হয়েছে- “সাধারণ অতীত- ঘটে যাওয়া ঘটনা বা অতীত ঘটনা যেমন বোঝায়, তেমনই আবার কোনো কোনো ক্রিয়ার ক্ষেত্রে সদ্য অতীত বোঝায়-‘এই এলাম’। অনুমতির ক্ষেত্রে কখনও কখনও আশু ভবিষ্যৎও বোঝায়-‘এলাম তাহলে!’, ‘চলি তাহলে!’, ‘চললাম তাহলে’ প্রায় সমার্থক। কোনো কোনো প্রতিবেশে অব্যবহিত ভবিষ্যতও বোঝায়-ধর ধর! গেল গেল!’

সাধারণ অতীত আখ্যান বর্ণনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত কালরূপ।” - প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (১/২৬৬)

 

পুরাঘটিত অতীত

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লেখেন- “ইহার প্রচলিত নাম ‘পরোক্ষ’ অর্থাৎ যে কার্য্য বক্তার চোখের বাহিরে ঘটিয়াছে। এই অতীত কাল দ্বারা ইহা সূচিত হয় যে, ক্রিয়ার ব্যাপার বহু পূর্বে অথবা বর্ণিত অন্য (অতীত) ঘটনার পূর্বে হইয়া গিয়াছে এবং তাহার ফল বিদ্যমান থাকিতেও পারে, না-ও থাকিতে পারে; যথা- ‘অতি শিশুকালে আমি একবার খাট হইতে পড়িয়া গিয়াছিলাম;...।” -ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, পৃ. ৩২২

 

পুরাঘটিত অতীতের বিশিষ্ট ব্যবহার

অতীতকালের কোনো ক্রিয়ার আগে আরও একটি ক্রিয়া ঘটিয়া গিয়াছিল এমন ভাব বুঝাইতেও পূর্ববর্তী ক্রিয়ায় পুরাঘটিত অতীত কাল ব্যবহৃত হয়; যথা- ‘সভায় আমি পৌঁছিবার আগেই তিনি আসিয়াছিলেন’। ‘এখানে আসিবার আগেই সে পত্র দিয়াছিল’। -মুহাম্মদ এনামুল হক রচনাবলী (ব্যাকরণ মঞ্জরী) ২/৪৩০-৪৩১

‘প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ গ্রন্থে পুরাঘটিত অতীত ক্রিয়াপদের  প্রয়োগ সম্পর্কে আরেকটু বিশদভাবে বলা হয়েছে- “অতীতে এই প্রকার- চলে গিয়েছিল, ভেঙ্গে পড়েছিল, আমাকে দেখে হেসেছিল- এই পুরাঘটিত অতীত সাধারণভাবে আর-একটি অতীত ক্রিয়াপদের সঙ্গে প্রকাশ্য বা অনুমিত তুলনায় প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন এই প্রয়োগগুলিতে : আমি যখন ওখানে যাই তখন অফিস ছুটি হয়ে গিয়েছিল। তুমি ভেবেছিলে কী?- না পড়েই পাশ করে যাবে?

প্রথম বাক্যের ‘যাই’ এবং দ্বিতীয় বাক্যের ‘পাশ করে যাওয়া’ দুটিই অতীত কালে  ঘটেছে, তার আগে ঘটে যাওয়া ক্রিয়াদুটিতে সম্পন্ন অতীত কালের প্রয়োগ ঘটেছে। কোনো ঘটনা কেউ ভুলে গেছে, (‘তুমি কি আমাকে বাজার থেকে গন্ধলেবু আনতে বলেছিলে?’), কিংবা অন্য একটি অতীত ক্রিয়া এসে তাকে আরও অতীত করে দিয়েছে, (আমি তো ঠিকই করেছিলাম বলব, তার আগেই তুমি কথাটা বলে ফেললে?)- এই রকম নানা প্রতিবেশে পুরাঘটিত অতীতের ব্যবহার হয়। বলার সময় থেকে  এই অতীতের দূরত্ব কতটা, তার হিসাব সরল নয় : ‘ও তো একটু অগেই এসেছিল, কোথায় গেল সে ছেলেটা?’ -প্রাগুক্ত ১/২৬৭-২৬৮

 

সাধারণ বর্তমান বা নিত্য বর্তমান

ক্রিয়ার যে কালরূপ নিয়মিত বা সাধারণত ঘটে- সাধারণ বর্তমান কাল এমন অবস্থা বোঝায়। যেমন : করে, বলে, হাসে, যায়, ওঠে ইত্যাদি। এ হল মূল কাঠামোগত অর্থ। কিন্তু বাংলা ভাষায় প্রায়ই এই ক্রিয়ারূপটি অতীত ঘটনার জন্য ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লেখেন- “বাঙ্গালায় বহুশঃ কোন অতীত ঘটনা অথবা ঐতিহাসিক ঘটনা জানাইবার জন্য অতীত কালের ক্রিয়ার পরিবর্তে নিত্য বর্তমান ব্যবহৃত হয়। যেমন- আকবর বাদশাহ ১৫৫৪ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট হয়েন; ...”। তিনি পুরাঘটিত অতীতের আলোচনায় আরো বলেন- “ঐতিহাসিক ঘটনা-বর্ণনায় এই পুরাঘটিত অতীতের স্থানে, অতীতার্থে বর্তমানের প্রয়োগ বাঙ্গালায় খুবই হইয়া থাকে।” -ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, পৃ. ৩২০, ৩২২

সাধারণ বর্তমানের আরো কিছু বিশেষ প্রয়োগ রয়েছে। যদি, যখন, যতক্ষণ, যেবার, পাছে ইত্যাদি শব্দ থাকলে কিংবা অতীত কালের উল্লেখ থাকলে সাধারণ বর্তমানের ক্রিয়া অতীত কালের দ্যোতক হয়। যেমন : যখন জলোচ্ছ্বাস হয় আমি তখন স্কুল ছেড়েছি,...। প্রাচীন লেখকের উদ্ধৃতি দিতেও বর্তমানের কালরূপ ব্যবহৃত হয়। যেমন- তিনি বলেন,...। এমনিভাবে  সাধারণ বর্তমান ক্রিয়ারূপের শেষে নাই, ‘নি’ ইত্যাদি নিষেধার্থক অব্যয় যোগ করে অতীত কাল নির্দেশ করা হয়। যেমন- ‘তিনি গতকাল হাটে যাননি’। -বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ অবলম্বনে পৃ. ২৩৪-২৩৫

 

পুরাঘটিত বর্তমান কাল

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় লেখেন- “যে কার্য্য সম্পন্ন হইয়াছে কিন্তু যাহার ফল এখনও বিদ্যমান, অথবা যাহার জের বা প্রভাব এখনও চলিতেছে, তাহা পুরাঘটিত বর্তমান। যথা- আমি কালই তাহাকে দেখিয়াছি; কলিকাতায় আসিয়াছি চারি বৎসর হইল; বৃষ্টির দরুন রাস্তায় কাদা হইয়াছে।’ এই কালের চলিত নাম ‘হ্যস্তনী’-‘হ্যঃ’ অর্থাৎ গতকল্য যাহা ঘটিয়াছে; কিন্তু এই কাল দ্বারা এইভাবে গত-কল্যের সময়-নির্দেশ ঠিক নয়। -ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, পৃ. ৩২২

ড. এনামুল হক সাহেব আরো স্পষ্ট ভাষায় লেখেন- কিঞ্চিৎপূর্বে অথবা বহুপূর্বে ক্রিয়া শেষ হইয়া গিয়াছে। অথচ সেই ক্রিয়ার ফল এখনও বর্তমান, এমন ক্ষেত্রে পুরাঘটিত বর্তমান কাল ব্যবহৃত হয়। যথা- গেল বারে আমি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছি। আজই তাহাকে পত্র দিয়াছি। ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ-রাজত্ব এদেশ হইতে বিদায় নিয়াছে। -মুহাম্মদ এনামুল হক রচনাবলী (ব্যাকরণ মঞ্জরী) ২/৪২৯, আরো দেখুন : বাঙ্গালা ব্যাকরণ; ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পৃ. ৮৫

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্রিয়াপদের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বলেন- “বাংলায় থাকার কথাটা যখন জানাই তখন বলি- আছি বা আছে, ছিলে, ছিল বা ছিলুম। আছিল শব্দেরই সংক্ষেপ ‘ছিল’। কিন্তু ভবিষ্যতের বেলায় হয় ‘থাকব’। বাংলায় ক্রিয়াপদের রূপ প্রধানত এই থাকার ভাবকে আশ্রয় করে। করেছে, করছে, করেছিল, করছিল- এই শব্দগুলো আছি ক্রিয়াপদকে ভিত্তি করে স্থিতির অর্থকেই মুখ্য করেছে। সংস্কৃত ভাষায় এটা নেই, গৌড়ীয় ভাষায় আছে। হিন্দিতে বলে ‘চলা থা’, চলেছিল। কাজটা যদিও ‘চলা’ তবু ‘থা’ শব্দে বলা হচ্ছে, চলার অবস্থাতে স্থিতি করেছিল। গতিটা যেন স্থিতির উপরেই প্রতিষ্ঠিত।” (দ্রষ্টব্য : বাংলা ভাষার পরিচয় পৃ. ৫৫; রবীন্দ্র-রচনাবলী, খ- ২৬, পৃ. ৪৪২)

‘প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ (১/২৬৭) গ্রন্থে পুরাঘটিত বর্তমান ক্রিয়াপদের প্রয়োগ সম্পর্কে একটু ভিন্ন আন্দাযে বলা হয়েছে- “বর্তমান কালের এই প্রকারে ক্রিয়ার কাজ শুধু  সম্পন্ন হয়েছে বোঝায়, তার বেশি কিছু নয়- ‘আমি বলেছি, তিনি খেয়েছেন, লোকটা চলে গেছে।’ কতটা আগে শেষ হয়েছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।”

যাহোক বোঝা গেল, বাংলা ভাষায়  পুরাঘটিত বর্তমানের ক্রিয়ারূপ কাঠামোগতভাবে পূর্বেই শেষ হয়ে যাওয়া কোনো ক্রিয়ার ফল বা প্রভাব বর্তমানে বিদ্যমান থাকা বোঝায় কিংবা ক্রিয়ার কাজ শুধু  সম্পন্ন হয়েছে বোঝায়, তার বেশি কিছু নয়। ক্রিয়া কতটা আগে শেষ হয়েছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ক্রিয়ার ফল বলতে এখানে ক্রিয়ার কার্যকারিতা উপস্থিত থাকা বোঝনো হয়েছে। যেমন ধরুন- কেউ বলল, ‘আমি খেয়েছি’। তার মানে আমার এখন খাওয়ার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমার খাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। ‘তিনি বসেছেন’ অর্থাৎ তার বসার কাজটি সম্পন্ন হয়েছে এবং তার বসার অবস্থা ও কার্যকারিতা এখনো বিদ্যমান।

আমরা যেসব ভাষার সাথে পরিচিত তার মধ্যে উর্দূ ভাষার ব্যাকরণে যাকে মাযী করীবের সীগা বলা হয় তার অর্থও খুবসম্ভব বাংলা ভাষার পুরাঘটিত বর্তমানের ক্রিয়াপদের অনুরূপ। এজন্য উর্দূ ব্যাকরণের আধুনিক অনেক লেখক মাযী করীবের পরিবর্তে ‘হালে তামাম’ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। উর্দূ ভাষার এক আধুনিক গবেষক উর্দূ ক্রিয়াপদ সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন। সেই কিতাব থেকে কিছু উদ্ধৃতি পেশ করছি-

حال تمام كا صيغہ  اصل فعل كى حاليہ تمام اور فعل "ہونا" كے  حال كے مفرد صيغوں سے بنايا جاتا ہے، جيسے" لڑكا آيا  ہے"-

حال تمام كا استعمال يہ ديكھ كر بتايا جاسكتا ہے كہ گزرے ہوۓ كام كا بولنے كے وقت سے كيا تعلق ہے- اس لحاظ سے حال تمام كى استعمال كے حسب ذيل تين اوقات ہیں  :

- كام بولنے كے وقت سے ذرا پہلے  يا بہت پہلے ہوا ہےليكن اسكا نتيجہ بولنے کے وقت ظاہر ہونا  ضرورى ہے-

حال تمام كا صيغہ  يہ نہيں ظاہر كرتاہے كہ كام كو ہوۓ كم وقت گزراہے، وقت كی قلت كا اظہار جملے ميں مناسب الفاظ كے  ذريعہ ہو جاتا ہے-

قواعد كى كتابوں ميں حال تمام كو ماضی قريب كے نام سے ياد كيا جاتا ہے، يہ ٹھيک نہيں معلوم ہوتاہے  كيونكہ جملوں كا جائزه ليتے ہوۓ يہ بات چهپی نہيں ره سكتی كہ  ان صورتوں ميں ماضی قريب كے معنى خود صيغے سے نہيں بلكہ جملے کے اورالفاظ سے نكلتے ہيں، جيسے " ابهی" " تهوڑی دير ہوئی "وغيره- ۓ

- حال تمام سے يہ بهى ظاہر ہوتا ہے كہ كام بولنے كے وقت سے پہلے وكسى وقت ہوچکاہے  اور کہنے والا  اسے حال سے ملا كر جملے ميں" اب تك" يا  "آج تك"  كا مفہوم پوشيده كرديتا ہے-

- حال تمام ماضی كو حال بنا كر پيش كرتا ہے (يعنی حال حکائی)-(اردو افعال : ترقی اردو بيورد نئى دہلى ص ১৭৭-১৯১، اور ديكھئے : قواعد اردو مولفہ پروفيسر فدا على خان، خدا بخش اورينٹل پبلك لائبريری، پٹنہ ص ২২৯)

 

পুরাঘটিত বর্তমানের বিশেষ প্রয়োগ

(ক) অতীত সময় বোঝাতে : দশ বছর হল তার বাবা মারা গেছেন। গত মাসে তাকে ঢাকায় দেখেছি

(খ) ভবিষ্যত সময় বোঝাতে : সেও এসেছে আর তোমারও যাওয়া হয়েছে। সে আগামীকাল কানাডা যাচ্ছে, আর ফিরছে না। -বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ পৃ. ২৩৬

উপরের উদ্ধৃতিগুলোতে আমরা লক্ষ করেছি, দেখিয়াছি, আসিয়াছি, হইয়াছে, দিয়াছি, খাইয়াছি’- এ ধরনের ক্রিয়াপদকে বাংলা ব্যাকরণে ‘পুরাঘটিত বর্তমান’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। পুরাঘটিত শব্দের অর্থ হল : ‘আগে ঘটেছে এমন’। এ ধরনের বাংলা ক্রিয়ারূপকেই অনেকে আরবীর قد فعل এই ওজনের ‘মাযী কারীবের’ সীগার সমার্থক মনে করে থাকেন। কিন্তু তা পুরোপুরি ঠিক মনে হয় না। কারণ বাংলার ‘পুরাঘটিত বর্তমান’ মূলগতভাবে সরাসরি নিকট অতীত বোঝায় না, যা আমরা একটু আগে ব্যাকরণের উদ্ধৃতিতে বিশদভাবে আলোচনা করেছি। বরং বাংলা ভাষার ব্যাকরণে যাকে সাধারণ অতীতকালের ক্রিয়াপদ বলা হয়, অর্থাৎ করল-করলেন-গেলেন-বললেন- এধরনের ক্রিয়ারূপ নিকটতম অতীতের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত। এ ধরনের ব্যবহারকে যদিও বাংলা ব্যাকরণের বইয়ে সাধারণত বিশিষ্ট প্রয়োগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এধরনের ক্রিয়াপদকে সরাসরি ‘সদ্য-অতীত কালের ক্রিয়াপদ’ নামেই অভিহিত করেছেন। দ্রষ্টব্য : বাংলা ভাষার পরিচয় পৃ. ৩৩, ৪৬; রবীন্দ্র-রচনাবলী, খ- ২৬, পৃ. ৪১২, ৪৩০

এমনিভাবে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছেন- “আমি এইমাত্র পড়িলাম। ‘পড়িলাম’ ক্রিয়াপদ দ্বারা বুঝাইতেছে যে, কার্যটি এইমাত্র শেষ হইল। ইহাকে সাধারণ (বা অদ্যতন) অতীত বলে”। -বাঙ্গালা ব্যাকরণ পৃ. ৮৫

লক্ষ করব ক্রিয়াপদের এই বিশেষ রূপটি আমরা প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকি। একটু আগে আমরা উল্লেখ করেছি- ‘সাধারণ অতীত আখ্যান বর্ণনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত কালরূপ।’ কারণ ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কাল রূপটাই বাংলা কথাসাহিত্যে লেখকদের হাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ তারা এই কালরূপটিকেই গল্প ও কাহিনী বর্ণনায় মূল কাঠামো হিসেবে নির্বাচন করেছেন এবং এর সঙ্গে মিলিয়েই প্রয়োজনের মুহূর্তে অন্যতর কালরূপ ব্যবহার করেছেন।

বাংলা কথাসাহিত্যে এই সাধারণ অতীত কালরূপটি ব্যবহারের একটা আলাদা আবেদন ও তাৎপর্য রয়েছে। ক্রিয়াপদের এই রূপটির কাজই হচ্ছে, কাজের কথাটি সরাসরি হাজির করা; এবং এই রূপটির রেখে যাওয়া ঢেও হচ্ছে, ঐ যা ঘটে গেল তার রেশ এখনো রয়েছে, এখনো সেটা ফুরিয়ে যায়নি। যেমন, একটি লেখার অংশ- “সে ঘরের ভেতর এলো। দেখলো ঘরে কেউ নেই। বারান্দায় গেলো, সেখানেও কেউ নেই। তার মনটা ভারী খারাপ হয়ে গেলো। সে চুপ করে বিছানার ওপর বসে রইলো, যেন কারো জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো”।

সাধারণ অতীত কালরূপ ব্যবহার করে লেখা এই অংশটি পড়ে আমরা বুঝতে পারি, লেখক চান ‘সে’ চরিত্রের সঙ্গে  সঙ্গে আমরা ঘরে ঢুকি, ঢুকে চরিত্রটির  সঙ্গেই আবিষ্কার করি যে, ঘর শূন্য। তারই পাশাপাশি হেঁটে আমরা বারান্দায় যাই এবং ফিরে এসে তারই মতো কারো জন্য অপেক্ষা করি। অর্থাৎ ঘটনাটি আমাদের খুব কাছে এবং চোখের ওপরই ঘটছে এবং এক্ষুণি, এইমাত্র তা ঘটে গেল।

বাকি থাকল অনুবাদ প্রসঙ্গ। তো এতক্ষণ ব্যাকরণের উদ্ধৃতিতে যে আলোচনা পেশ করা হল তার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি- মাযী মুতলাক এবং মাযী করীবের সরফী বা কাঠামোগত তরজমা ‘করল বা করেছে’ উভয় রকম হতে পারে। তবে কোনো আরবী নস ও ইবারতের অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘মাযী মুতলাকের’ সীগার বাংলা অনুবাদ বাক্যের পূর্বাপর আলামত ও অবস্থা অনুসারে ‘করল-করেছে-করে-করেছিল’- এই ক্রিয়ারূপগুলোর যে-কোনোটি ব্যবহার করা যায়। আর মাযী করীবের বাংলা অনুবাদে ‘করল-বলল-দেখল-শুনল-এল-গেল’-এর মতো  সাধারণ অতীত কালরূপ ব্যবহার করাই অধিক মানানসই। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ‘করেছে-বলেছে-দেখেছে- শুনেছে-এসেছে- গিয়েছে’-এর মতো পুরাঘটিত বর্তমানের কালরূপ ব্যবহার করাও ঠিক আছে। এছাড়া মূল ক্রিয়ার সাথে ‘এখন, এইমাত্র, এক্ষুণি, এতক্ষণ’ এজাতীয় সহায়ক শব্দ ব্যবহার করে মাযী করীব আরো স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা যায়। এমনিভাবে সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার সমন্বয়ে গঠিত যৌগিক ক্রিয়ার মাধ্যমেও উপরোক্ত ভাব প্রকাশ করা যায়। যেমন, করে ফেলল, বলে ফেলল, উঠে পড়ল ইত্যাদি। মোটকথা বক্তব্যের ভাব, ভঙ্গি, সুর ও ছন্দ এবং দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতি  রেখে কোনো একটি কালরূপ নির্বাচন করতে হবে। আর তা সম্ভব হবে ব্যাকরণ-সচেতনতা এবং সাহিত্যরুচির মাধ্যমে।

(উত্তর প্রদানে : মাওলানা আবদুল মাজীদ)

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ আবদুর রহীম - জালালাইন, নাজিরপুর মাদরাসা, নোয়াখালী

প্রশ্ন

আমি একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। ফলে জরুরি ভিত্তিতে আমাকে ইলমুল আকায়েদের প্রাথমিক মুতালাআ করতে হচ্ছে। এই মুতালাআর পদ্ধতি কী হবে, কী কী কিতাবের সাহায্যে হলে ভাল হবে?! জানালে খুবই উপকার হবে। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন।

উত্তর

আপনি সমস্যাটির কথা স্পষ্ট করে বলেননি। বললে পরামর্শ দেয়া সহজ হত। আপনি প্রথমত এ ব্যাপারে আলকাউসারে প্রকাশিত প্রবন্ধটি পড়ে নিতে পারেন, যা মার্চ ২০০৫ঈ. সংখ্যায় ‘আকীদা বিশুদ্ধ করা সর্বপ্রথম ফরয’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। এখন এটি মারকাযুদ দাওয়াহ্র প্রকাশনা বিভাগ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ। এতে আপনি এ সম্পর্কে জরুরি কিছু নির্দেশনা পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।

মনে রাখতে হবে, আকীদা সম্পর্কে অধ্যয়নের বিভিন্ন স্তর ও পর্যায় এবং বিভিন্ন দিক রয়েছে।

তালিবে ইলমগণ এব্যাপারে উস্তাযের নেগরানীতে পর্যায়ক্রমে মুতালাআ জারি রাখতে পারেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর ‘তালীমুদ্দীন’ ও বেহেশতী জেওর (আকায়েদ অধ্যায়) দ্বারা মুতালাআ শুরু করতে পারেন। তারপর আরেকটু বিস্তারিত জানার জন্য মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী রাহ.-এর ‘আকাইদুল ইসলাম’ এবং আবদুল হক হক্কানী রাহ.-এর ‘আকায়েদে ইসলাম’ মুতালাআ করতে পারেন। আর তাওহীদ ও শিরক সম্পর্কে মাওলানা মনযূর নুমানী রাহ.-এর চারটি কিতাব-

১. কালিমায়ে তায়্যেবাহ কী হাকীকত ২. ইসলাম কিয়া হ্যায়? ৩. কুরআন আপছে কিয়া কাহতা হ্যায়? ৪. দ্বীন ও শরীয়ত। মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রাহ.-এর দুস্তুরে হায়াত অত্যন্ত সারগর্ভ ও মৌলিক আলোচনা সমৃদ্ধ। মারকাযুদ দাওয়াহ্র রচনা বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘তাসাওউফ : তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ’ কিতাবটিতেও এ বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী কিছু আলোচনা রয়েছে।

এরপর ঈমান ও আকীদা সংক্রান্ত বিভিন্ন আয়াতের তাফসীর ফাওয়ায়েদে উছমানী, মুফতী শফী রাহ.-এর মাআরিফুল কুরআন এবং মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী রাহ.-এর মাআরিফুল কুরআন থেকে মুতালাআ করতে পারেন। আর আকীদা সংক্রান্ত হাদীসসমূহের সহজ-সরল ব্যাখ্যা জানার জন্য মাওলানা বদরে আলম মিরাঠী রাহ.-এর তরজমানুস সুন্নাহ (৪ খ-) এবং মাওলানা মনযূর নুমানী রাহ.-এর মাআরিফুল হাদীস (ঈমান অধ্যায় এবং অন্যান্য অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা) খুবই উপকারী।

এতো হল উর্দূ ভাষায় রচিত আকীদার সহজ ও মৌলিক কিছু গ্রন্থ ও পুস্তিকা, যা আপনি সহজেই সংগ্রহ করতে পারেন। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, তালেবে ইলম ও আহলে ইলমের পাঠ্যতালিকায় আরবী ভাষায় পূর্ববর্তী ইমামগণের রচিত তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ এবং মৌলিক গ্রন্থাদি থাকা উচিত। যেগুলো পর্যায়ক্রমে সুযোগমত মুতালাআ করতে হবে। এ ব্যাপারে এখন আর কিছু লিখছি না। পরবর্তী সময়ে মশওয়ারার মাধ্যমে জেনে নিতে পারেন। তবে আপাতত আকায়েদের নতুন ও সহজ (কিন্তু প্রামাণ্য) কিছু আরবী কিতাব সংগ্রহ করতে পারেন। যেমন সমকালীন মুহাক্কিক আলেম ড. মুস্তফা সাঈদ আলখন্ন-এর ‘আলআকীদাতুল ইসলামিয়া, শায়েখ আবূ বকর জাবির আলজাযায়িরীর ‘আকীদাতুল মুমিন’ এবং শায়েখ মাজ্দ মাক্কী-এর ‘আলবয়ান ফী আরকানিল ঈমান’ ইত্যাদি।

শেয়ার লিংক

আব্দুল্লাহ - ঢাকা

প্রশ্ন

অনেক সময়ই এই হাদীসটি  বলতে শোনা যায় যে, কিয়ামত সংঘটিত হবে আশুরার দিন এবং সেই দিনটি হবে জুমার দিন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, এমনটা কীভাবে ঘটতে পারে?! কেননা আমরা জানি, সারা পৃথিবীতে চন্দ্র ও সূর্যের উদয়স্থল এক নয়। অর্থাৎ সব স্থানে একই সময় চন্দ্র বা সূর্য উদিত হয় না। বরং সময়ের বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। এমনকি পৃথিবীর এক স্থানে যদি দিন হয় তবে অন্যস্থানে হয় রাত। তাই পৃথিবীর সব দেশে একই দিনে আশুরার দিন হয় না। সুতরাং আশুরার দিনেই সারা পৃথিবীতে একইসঙ্গে কিয়ামত সংঘটিত হবে কীভাবে? আশা করি প্রশ্নটির সঠিক উত্তর জানাবেন।

উত্তর

‘আশুরার দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে’- এই কথাটি প্রমাণিত নয়। এটি একটি জাল ও বানোয়াট বর্ণনা। এ সম্পর্কে মারকাযুদ দাওয়াহ থেকে প্রকাশিত ‘এসব হাদীস নয়’ বইয়ের ২য় খণ্ডে আলোচনা রয়েছে। আপনি তা দেখতে পারেন। তবে ‘জুমার দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে’- এ কথাটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (দ্রষ্টব্য : সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৫৪)

কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো একদিনে একইসঙ্গে সারা পৃথিবীতে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে আপনার প্রশ্নে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা ঠিক নয়। কেননা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার জন্য তো পূর্ণ এক দিনের ২৪ ঘণ্টার প্রয়োজন নেই; বরং এক মুহূর্তেও ঘটতে পারে।  কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-

وَمَا أَمْرُ السّاعَةِ إِلاّ كَلَمْحِ الْبَصَرِ أَوْ هُوَ أَقْرَبُ إِنّ اللهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.

কিয়ামতের বিষয়টি কেবল চোখের পলকতুল্য; বরং তার চেয়েও দ্রুত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। -সূরা নাহল (১৬) : ৭৭

তাছাড়া দিন-রাতের ভিন্ন কোনো হিসেব অনুসারেও তো ঘটতে পারে। কেননা এখন পৃথিবীতে যে সৌরজাগতিক নিয়মে রাত ও দিন হয় তা এখনকার পৃথিবীর জন্য আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি তাকবীনী ব্যবস্থা। কিন্তু এই সৌরজাগতিক দিন ও রাতের হিসেব ছাড়াও উর্ধ্বজগতে আল্লাহ তাআলার কাছে দিনের ভিন্ন গণনাও রয়েছে। এই বিশ্ব জগত সৃষ্টির আগে যেমন সৌরজাগতিক নিয়ম ছিল না তেমনি কিয়ামত নামক মহাপ্রলয় সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে জগৎ ধ্বংস হওয়ার পরও বর্তমানের সৌরজাগতিক নিয়ম আর বাকি থাকবে না।

কুরআনে কারীমে একাধিক স্থানে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ তাআলা আসমান যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। আর এক সহীহ হাদীসে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে- আল্লাহ তাআলা এই জগতের কোন্ জিনিস কোন্ দিন সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াত ও হাদীসে দিন দ্বারা উদ্দেশ্য কী? বলার অপেক্ষা রাখে না, চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টির আগে তো আর বর্তমানের সৌরজাগতিক দিন ও রাতের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এমনিভাবে এই জগৎ ধ্বংসের পর আখেরাতের জগতে এখনকার সৌরজাগতিক ব্যবস্থা ও হিসেব বাকি থাকবে না। হাশরের ময়দান সম্পর্কে কুরআনের এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

تَعْرُجُ الْمَلائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ.

-সূরা মাআরিজ (৭০) : ৪

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

وَإِنَّ يَوْمًا عِندَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ.

-সূরা হজ্ব (২২) : ৪৭

যা হোক বোঝা গেল, বর্তমান পৃথিবীর সৌরজাগতিক দিন-রাত ছাড়াও ঊর্ধ্বজগতে ভিন্ন গণনার দিন থাকা সম্ভব এবং আছে। আর সেই ঊর্ধ্বজাগতিক হিসেব অনুসারেও তো জুমার দিন কিয়ামত ঘটতে পারে- والله أعلم (আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত) এমনটা অসম্ভব কিছু নয়। কিয়ামতের আগে তো কত অস্বাভাবিক ও অলৌকিক ঘটনাই ঘটবে। এমনকি এই সূর্য একদিন পূর্ব দিক থেকে উদিত না হয়ে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে।

শেয়ার লিংক

আহমদ সিদ্দীকী - জামিয়া ইসলামিয়া, টেকনাফ

প্রশ্ন

সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করলে দেখা যায় যে, তাতে সিহহাত ও আফিয়াতের বা সুস্বাস্থ্যের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। তাই যদি হযরত আমাদেরকে সে ব্যাপারে কোনো কিতাবের বা উপায়-উপাত্তের সন্ধান দেন তাহলে খুব ভালো হবে। জাযাকুমুল্লাহু আহসানাল জাযা।

উত্তর

সিহহাত ও আফিয়াতের গুরুত্ব এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে কয়েক বছর আগে মাসিক আলকাউসারে একটি প্রবন্ধ লেখা হয়েছিল, যা এখন ‘তালিবানে ইলম : পথ ও পাথেয়’ বইটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রবন্ধটির শিরোনাম হল, ‘সিহহাত ও আফিয়াত তালিবে ইলমের মূলধন’। আপনি সেই প্রবন্ধটিতে এ সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। আর স্বাস্থ্য বিষয়ক কোনো বই তো আপনি নিজেই খোঁজ-খবর নিয়ে কোনো লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করতে পারেন।

শেয়ার লিংক

মাহমুদ বিন সাইফুদ্দীন - ঢাকা

প্রশ্ন

আমি শরহে বেকায়া জামাতে পড়ছি। এ বছর আমাদের নেসাবে ‘তরজমাতুল কুরআন’ রয়েছে।

মুহতারামের নিকট জানতে চাচ্ছি, কুরআনের তরজমা অনুধাবনের জন্য  কোন্ কোন্ অনুবাদ দেখা যেতে পারে, আর একজন ‘মুবতাদী’ তালিবে ইলম হিসেবে কী কী তাফসীর থেকে ‘ইসতিফাদাহ’ করতে পারি।

আল্লাহ তাআল হুযূরকে জাযায়ে খায়ের দান করুন এবং সিহহাত ও আফিয়াতের সাথে রাখুন- আমীন।

উত্তর

প্রথমত তরজমার ক্ষেত্রে নিজের আরাবিয়াতের জ্ঞানকে ইস্তেমাল করতে হবে এবং দরসে উস্তাযের কাছ থেকে তরজমা বুঝে নিতে হবে। এরপর দরসের বাইরে নির্ভরযোগ্য কোনো একটি ‘কুরআন তরজমা’ মুতালাআয় রাখতে হবে। যেমন তরজমায়ে শায়খুল হিন্দ বা বায়ানুল কুরআনের তরজমা। এ দুটি তরজমায় যে সূক্ষ্মতা রয়েছে তা অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য আপনি হযরত মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ দামাত বারাকাতুহুম রচিত আততরীকু ইলাল কুরআন-এর ৩য় খ- ও চতুর্থ খণ্ডে ‘অনুবাদ পর্যালোচনা’ অংশটি বিশেষভাবে দেখতে পারেন। খুব মনে রাখতে হবে, কোনোরূপ চিন্তা-ভাবনা ছাড়া ‘আলটপকা’ অনুবাদ করা যাবে না; বরং প্রতিটি শব্দের অর্থ আরবী লুগাত অনুসারে বুঝতে হবে এবং প্রতিটি বাক্যের অর্থ ও তরজমা নাহবী তারকীব ও আরবী বালাগাত অনুসারে করতে হবে। এরপর আয়াতের পূর্বাপর চিন্তা করে এবং প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত কোনো তাফসীরের সহযোগিতায় প্রতিটি আয়াতের মাফহুম ও মতলব স্পষ্টভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য তালিবে ইলমগণ মাওলানা শাব্বীর আহমাদ উছমানী রাহ.-এর ফাওয়ায়েদে উছমানী বিশেষভাবে মুতালাআয় রাখতে পারেন। সদ্য প্রকাশিত ‘আসান তরজমায়ে কুরআনে’র টীকাসমূহে বিভিন্ন আয়াতের মাফহুম সংক্ষেপে স্পষ্ট করা হয়েছে। সুতরাং এটিও আপনার মুতালাআয় রাখতে পারেন। আয়াতের অর্থ ও মাফহুম বোঝার ক্ষেত্রে তালিবে ইলমদের যেসব বিষয় লক্ষ রাখা জরুরি সেসব বিষয়ে  গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনা আলকাউসারের কুরআনুল কারীম সংখ্যায় আপনি পাবেন। এতে মাওলানা আবদুল মতীন ছাহেবের প্রবন্ধ ‘কুরআন অনুধাবন : কিছু করণীয়’ বিশেষভাবে দেখতে পারেন।

শেয়ার লিংক

রহমতুল্লাহ - চাঁদপুর

প্রশ্ন

আমি তাখাসসুসের একজন তালেবে ইলম। দরসে নেযামীতেই আমার পড়াশোনা। আমার জানার বিষয় হল, দরসে নেযামীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, আবদান, উদ্দেশ্য, মৌলিক নীতিমালা সম্পর্কে জানতে আমি কী কী কিতাব মুতালাআ করতে পারি বা অন্য কোন্ কোন্ মাধ্যম অবলম্বন করতে পারি?

আল্লাহ হুযূরকে দুনিয়া ও আখেরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

উত্তর

দরসে নেযামী মূলত মোল্লা নিযামুদ্দীন লখনবী রাহ. (মৃত্যু ১১৬১ হি.)-এর দিকে সম্বন্ধিত। তিনি তাঁর শাগরিদদেরকে দরসদানের জন্য যে নিসাব নির্ধারণ করেছিলেন তাকেই মূলত ‘দরসে নেযামী’ বলা হয়। সুতরাং দরসে নেযামীর সূচনা সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমেই মোল্লা নিযামুদ্দীন রাহ.-এর জীবনী পড়তে হবে। এর জন্য আপনি আবদুল হাই হাসানী-এর নুযহাতুল খাওয়াতির বা আলই‘লাম বিমান ফিল হিন্দি মিনাল আ‘লাম থেকে তাঁর জীবনী পড়তে পারেন। এমনিভাবে তাঁর সম্পর্কে এবং তাঁর প্রবর্তিত নেসাব সম্পর্কে আল্লামা শিবলী নুমানী রাহ.-এর সেই মাযমুন দুটি মুতালাআ করতে পারেন, যা এখন ‘মাকালাতে শিবলী’র ৩য় খণ্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে।

তাঁর প্রবর্তিত নেসাবে যেসব কিতাব অন্তর্র্র্র্ভুক্ত ছিল তার বিবরণ এবং এই নেসাবের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পর্যালোচনা এবং এই নেসাবের পূর্বে হিন্দুস্তানে আরো যেসব নেসাবে তালীম প্রচলিত ছিল  তার ইতিহাস সম্পর্কে মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস হল মাওলানা আবদুল হাই হাসানী রাহ.-এর কিতাব ‘ইসলামী উলূম ও ফুনূন হিন্দুস্তান মে’ এবং বিশষেত এতে উল্লিখিত ‘হিন্দুস্তান কা কাদীম নেসাবে তা‘লীম’ শিরোনামের লেখাটি।

সাধারণভাবে হিন্দুস্তানের কদীম নেসাবে তালীমের বিশেষভাবে দরসে নেযামীর এবং এর পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ তথা দারুল উলূম দেওবন্দের অনুসৃত নেসাবে তালীমের ইতিহাস এবং এর নানা গুণ  ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল মাওলানা সায়্যিদ মানাযির আহসান গিলানীর কিতাব ‘হিন্দুস্তান মে মুসলমানূ কা নেযামে তা‘লীম-তারবিয়াত’। আর দারুল উলূম দেওবন্দের ও মাযাহিরে উলূম সাহারানপুরের প্রতিষ্ঠাতা আকাবির উলামায়ে কেরাম এবং এই দুই প্রতিষ্ঠানের প্রথম সারির উস্তাযগণ যেহেতু দরসে নেযামীর ফারেগ, তাই তাদের জীবনীতে উল্লেখিত তলবে ইলম এবং দরস ও তাদরীসের ইতিহাস দরসে নেযামী সম্পর্কে জানার এক উত্তম মাধ্যম। সুতরাং এর জন্য তাদের জীবনীগ্রন্থ পড়া উচিত।

আর এই দুই প্রতিষ্ঠানের নেসাবে তালীমে  যেহেতু দরসে নেযামীকেই কিছুটা পরিবর্তিত ও পরিমার্জিতরূপে গ্রহণ করা হয়েছে তাই দরসে নেযামীর ক্রমবিকাশের ইতিহাস এবং বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কে জানার জন্য এই দুই প্রতিষ্ঠানের নেসাবে তালীম ও নেযামে তালীম এবং এর  লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কেও জানা জরুরি।

শেয়ার লিংক

আবদুল আলীম - ঢাকা

প্রশ্ন

(ক) প্রশ্ন : আমরা তাফসীরে জালালাইনের হাশিয়া মুতালাআর সময় প্রায়ই দেখি السمين নামক কিতাবের হাওয়ালা দেয়া হয়। এ সামীন কিতাবটির মুসান্নিফ কে এবং কিতাবটি কোন্ স্তরের- আমরা জানি না। আমাদেরকে বিষয়টি জানিয়ে বাধিত করবেন। ওয়াসসালামু আলাইকুম।

উত্তর

السمين মূলত কিতাবের নাম নয়, বরং মুসান্নিফের নাম। শিহাবুদ্দীন আহমদ ইবনু ইউসুফ আলহালাবী (ওফাত : ৭৫৬ হি.) তিনি  السمين الحلبي নামে মশহুর। তিনি ইলমে নাহ্ব এবং ইলমে কিরাআতের মাহির আলিম ছিলেন। নাহব শাস্ত্রের ইমাম আবু হাইয়ান আন্দালুসী রাহ.-এর শাগরিদ। ‘ইরাবুল কুরআন’ সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হল, الدر المصون في علوم الكتاب المكنون । এছাড়াও তিনি তাফসীর, আহকামুল কুরআন এবং ইলমে কেরাআত সম্পর্কে কিতাব লিখেছেন। (দ্রষ্টব্য : আদদুরারুল কামিনাহ ফী আইয়ানিল মিয়াতিছ ছামিনাহ ১/৪০২-৪০৩)  তাফসীরে জালালাইনের প্রসিদ্ধ হাশিয়া ‘হাশিয়াতুল জামাল’ এবং এর খোলাসা ‘হাশিয়াতুস সাবী’-এ আসসামীন আলহালাবী-এর উপরোক্ত কিতাব থেকে ইরাবুল কুরআন সংক্রান্ত বিভিন্ন কথা নকল করা হয়েছে। সুতরাং হাশিয়াতুল জামাল, হাশিয়াতুস সাবী এবং তাফসীরে জালালাইনের হিন্দুস্তানী নুসখার সাথে যে হাশিয়া রয়েছে তাতে السمين দ্বারা উদ্দেশ্য হল তাঁর রচিত-

الدر المصون في علوم الكتاب المكنون

শেয়ার লিংক

ইবনু আব্দিল খালিক - ঢাকা

প্রশ্ন

প্রশ্ন :  فقه اللغة কিতাবটি থেকে ইস্তেফাদা করার পদ্ধতি কী? এবং এ কিতাব থেকে শব্দসমূহ আয়ত্ত করার উপায় কী? আশা করি জানিয়ে উপকৃত করবেন। জাযাকাল্লাহু খাইরান!

উত্তর

‘ফিকহুল লুগাহ’ বলতে আপনি সম্ভবত ইমাম ছা‘লাবী রাহ.-এর  فقه اللغة

وأسرار العربية বুঝিয়েছেন। কিতাবটি প্রধান দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথমভাগে ত্রিশটি বিষয়ভিত্তিক অধ্যায় রয়েছে। এতে তিনি আরবী শব্দসম্ভার হতে বিভিন্ন বিষয়ে (الأشباه والنظائر) তথা সমার্থক শব্দ বা কাছাকাছি অর্থ বিশিষ্ট শব্দ একত্রে সংকলন করেছেন। তবে এটি নিছক একটি সমার্থক শব্দকোষ নয়; বরং সাধারণ দৃষ্টিতে ‘মুরাদিফ’ ও ‘মুতাকারিব’ হিসেবে পরিগণিত শব্দসমূহের মধ্যে যে সূক্ষ্ম অর্থগত বা ব্যবহারগত পার্থক্য (الفروق) রয়েছে তাও ইহতেমামের সাথে এতে উল্লেখিত হয়েছে। তদ্রƒপ এতে কোনো বিষয়ের বা কোনো ভাব ও মর্মের যে বিভিন্ন অবস্থা ও বিভিন্ন স্তর ও পর্যায় রয়েছে তা ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রত্যেক অবস্থা ও প্রত্যেক পর্যায়ের জন্য খাস খাস উপযোগী শব্দ নির্দেশ করা হয়েছে। এসব ‘ফিকহুল লুগাহ’-এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আপনি প্রথম পর্যায়ে কিতাবটি আগাগোড়া এক-দু’বার বুঝে বুঝে পড়–ন এবং এর মাকসাদ ও উসলূবের সাথে পরিচিত হোন। দ্বিতীয় পর্যায়ে  পূর্বোক্ত বিষয়াবলির প্রতি লক্ষ্য রেখে বিষয়ভিত্তিক শব্দসম্ভার হিফজ করার চেষ্টা করুন। সবক’টি অধ্যায় হিফজ করতে পারলে ভালো। আর তা সম্ভব না হলে কোনো কোনো অধ্যায় তো পুরোটাই হিফজ করা দরকার, যেমন প্রথম অধ্যায় باب الكليات আর যে অধ্যায় পুরোটা হিফজ করা সম্ভব হবে না, তার নির্বাচিত অংশ হিফজ করুন। তারপর পঠিত ও হিফজকৃত শব্দসমূহ আরবী বলা ও লেখায় অনুশীলন করতে থাকুন। তাছাড়া কিতাবটি যদি দীর্ঘদিন মুতালাআয় রাখা হয়; বুঝে বুঝে বার বার মুতালাআ করা হয় এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে যেমন কোনো আরবী মাযমূন লেখার সময় এর মুরাজাআত করা হয় তাহলেও এটি আরবী ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় খুবই মুফীদ হবে, ইনশাআল্লাহ।

কিতাবের দ্বিতীয় ভাগ হল أسرار العربية সম্পর্কে অর্থাৎ আরবী শব্দ ও বাক্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এবং বিভিন্ন ধরনের আরবী বাকরীতি সম্পর্কে উসূলী আলোচনা, যার বেশিরভাগই মূলত ইমামুল লুগাহ আহমদ ইবনু ফারিস (ওফাত : ৩৯৫ হি.)-এর  الصاحبي في فقه اللغة العربية ومسائلها وسنن العرب في كلامها থেকে নকল। এই অংশটি আপনি বার বার মুতালাআর মাধ্যমে আত্মস্থ করার চেষ্টা করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাওফীক দান করুন- আমীন।

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ তানভীর হাসান জাকারিয়া - মুহাম্মাদপুর, ঢাকা

প্রশ্ন

এ বছর শরহে জামী জামাতে আমরা  نفحة العرب কিতাব পড়ছি। তরজমা তোলা ছাড়া আরবী ইবারত আমরা পড়ে পড়েই বুঝতে পারি। সুতরাং এ কিতাব থেকে আমাদের কী ইস্তে‘দাদ হাসিল করতে হবে? এবং এ কিতাবটি কীভাবে পড়লে উক্ত উদ্দেশ্য হাসিল হবে?

উত্তর

এই কিতাবের উদেশ্য হল, হালকা ও সহজ-সরল আরবী গদ্য অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আরবী সাহিত্যের সাথে তালিবে ইলমদের সম্পর্ক গড়ে তোলা। সুতরাং এই কিতাবের নিছক তরজমা পড়াই যথেষ্ট নয়; বরং নি¤েœাক্ত বিষয়গুলোর ইহতেমাম করা দরকার।

১. নতুন শব্দাবলীর আভিধানিক ও ব্যবহারিক অর্থ জানা। ফেয়েল হলে তার বাবের পরিচয় এবং ইসম হলে তার মুফরাদ ও জমার পরিচয় এবং এসবের ব্যবহার সম্পর্কে জানা।

২. নতুন আন্দাযের বাক্যসমূহের নাহবী তারকীব করা।

৩. সরফ ও নাহুর উসূল ও কাওয়ায়েদের ইজরা বা প্রায়েগিক অনুশীলন।

৪. নিত্য-নতুন শব্দ ও বাকরীতি মুখস্থ করা এবং তা বিভিন্ন আরবী বাক্যে ব্যবহারের অনুশীলন।

৫. আরবী আদবের যে কোনো কিতাব অধ্যয়নের মাধ্যমে তালিবে ইলমের এই ইস্তে‘দাদ অর্জন করা দরকার যে, কথাবার্তায় সে অনায়াসে আরবী শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করতে পারবে এবং তার আরবী বলার সংকোচ ও জড়তা দূর হবে।

শেয়ার লিংক

আহমাদ যোবায়ের - ঢাকা

প্রশ্ন

সাইয়েদ কুতুব শহীদ রাহ.-এর তাফসীর ‘তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন’-এর ব্যাপারে হযরতের অভিমত কী? সংক্ষিপ্তাকারে হলেও মুহতারামের মূল্যবান মূল্যায়ন জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

এই গ্রন্থটির একটি বৈশিষ্ট্য হল, এর ভাষা ও উপস্থাপনা সমকালীন রুচি ও সাহিত্যগুণসম্পন্ন। কিন্তু সমস্যা হল, এর কিছু উসূলী ও মৌলিক বিষয় এমন রয়েছে, যা আমাদের হিন্দুস্তানের জনৈক লেখক কর্তৃক রচিত ‘তাফহীমুল কুরআনের’ অনুরূপ। তাই এ বিষয়ে সতর্কতা একান্ত জরুরি। এ গ্রন্থটি সম্পর্কে মাওলানা ইউসুফ বিন্নুরী রাহ.-এর মন্তব্য ও সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা লক্ষ্যণীয়, যা তিনি  يتيمة البيان في شيء من علوم القرآن পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন। এমনিভাবে  তার কিছু ফিকরী শুযূয ও উসূলী আগলাত সম্পর্কে বিশ্বজনীন দাঈয়ে ইসলাম মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রাহ. সতর্ক করেছেন। দ্রষ্টব্য : আসরে হাজের মে দ্বীন কী তাফহীম ও তাশরীহ’ বা এর আরবী অনুবাদ ‘আত-তাফসীরুস সিয়াসী লিল ইসলাম’। এই পুস্তিকাটির বাংলা অনুবাদও হয়েছে। এমনিভাবে তার আরেকটি কিতাব ‘পুরানে চেরাগ’ ৩/২৩-২৮ দ্রষ্টব্য।

এছাড়াও আরবীতে শায়খ আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ আদ-দরবেশ রচিত  المورد الزلال على أخطاء تفسير الظلال এবং শায়খ রবী ইবনু হাদী আল মাদখালী এর  مطاعن سيد قطب في أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم দেখা যেতে পারে।

শেয়ার লিংক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক - ঢাকা

প্রশ্ন

আরবী ভাষার কামুসগুলোর মধ্যে কোন্ কামুসের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? কোন্ কামুসের কী বৈশিষ্ট্য, কোন্ নুসখাগুলো ভালো? বিস্তারিতভাবে জানালে উপকৃত হব।র

উত্তর

আরবী ভাষার মৌলিক ও নির্ভরযোগ্য অভিধানসমূহের নাম ও পরিচয় এবং সেসবের মারাতিব জানার জন্য নিম্নোক্ত কিতাবসমূহ দেখতে পারেন।

-১مقدمة تهذيب اللغة، للأزهري مع مقدمة التحقيق لعبد السلام هارون.

-২ مقدمة مقاييس اللغة، لابن فارس مع مقدمة التحقيق لعبد السلام هارون.

-৩ مقدمة لسان العرب، لابن منظور.

-৪ مقدمة تاج العروس، للزبيدي.

-৫ المزهر في علوم اللغة وأنواعها، للسيوطي (النوع الأول: معرفة الصحيح، النوع الرابع والأربعون: معرفة الطبقات والثقات والضعفاء)

-৬ مقدمة النهاية في غريب الحديث، لابن الأثير.

-৭ مقدمة الباحث أحمد عبد الغفور عطار، للصحاح، للجوهري.

-৮ تاريخ الأدب العربي، لأحمد حسن الزيات ص ৩৭৫-৩৭০

আরবী লুগাতের মৌলিক ও প্রামাণ্য উৎসগ্রন্থ কেবল সেগুলোই, যেগুলো মুতাকাদ্দিমীন আইম্মায়ে লুগাহ কর্তৃক রচিত, যা আপনি উপরোক্ত কিতাবসমূহ পড়লে বুঝতে পারবেন। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ের আরবী অভিধান হল সেগুলো, যা পরবর্তী উলামায়ে লুগাহ কর্তৃক রচিত, যেমন  العباب- تكملة العباب- القاموس- لسان العرب এসব কোনো মৌলিক অভিধান নয়; বরং এতে পূর্ববর্তী উৎস-গ্রন্থসমূহকে নতুন আঙ্গিকে একত্রে সংকলন করা হয়েছে কিংবা কোনো কোনোটা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের নতুন তারতীব ও বিন্যাস বা খোলাসা ও সারসংক্ষেপ।

তৃতীয় পর্যায়ের আরবী অভিধান হল আধুনিক যুগে রচিত অভিধানসমূহ। যেমন- محيط المحيط- أقرب الموارد- المنجد- المعجم  الوسيط  ইত্যাদি। আধুনিক অভিধানগুলোর মধ্যে المعجم الوسيط  বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এটি মিসরের আরবী ভাষা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে সমসাময়িক কয়েকজন আরবী ভাষার বিশেষজ্ঞ আলেম কর্তৃক রচিত এবং এতে কুরআন ও হাদীসের নুসূস থেকে শব্দের ব্যবহার দেখানো হয়েছে।

তবে মনে রাখতে হবে, কোনো আরবী শব্দের কোনো অর্থ প্রমাণের ক্ষেত্রে কেবল মুতাকাদ্দিমীন ‘আইম্মায়ে লুগাহ’-এর বক্তব্য হুজ্জত; পরবর্তী কারো বক্তব্য স্বতন্ত্র কোনো হুজ্জত নয়।

এ বিষয়ে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা মনে পড়ছে। হাফেজ ইবনু হাজার রাহ. ‘ফাতহুল বারী’তে এক স্থানে ‘আলকামূসের’ উদ্ধৃতিতে কোনো একটি শব্দের তাহকীক নকল করেন। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহ. ‘উমদাতুল কারী’  (৩/৯১) গ্রন্থে তাঁর সেই তাহকীকের নক্দ করেন এভাবে-

قلت: هذا يحتاج إلى نسبته إلى أحد من أئمة اللغة المعتمد عليهم.

শায়েখ আব্দুল হাই আলকাত্তানী রাহ. ‘ফিহরিসুল ফাহারিস’ গ্রন্থে বদরুদ্দীন আইনীর উক্ত মন্তব্য উল্লেখ করার পর বলেন-

فطبقه على حال من يحتج اليوم بكلام "المنجد " و "أقرب الموارد" كأنه وحي يوحى، مع أن قرب الفيروزآبادي من العيني كقرب هؤلاء منا أو أكثر، فانا لله من ضعف العلم و قلة المتمكنين فيه. انتهى من فهرس الفهارس ৯১০-৯০৯/২

শেয়ার লিংক

শামিম বিন হায়দার আলী - বরিশাল

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

হযরত, আমি কিছুদিন আগে একটি বই হাতে পাই। বইটির নাম ‘শরীয়তের মানদ-ে ওলীগণের হালত’।

প্রকাশনায় : দারুত তাহকীক, জামেয়া ইসলামিয়া  রশিদিয়া হোসাইনাবাদ, (ধুমঘাট) শ্যামনগর, সাতক্ষীরা।

লেখকের নামের সঙ্গে লেখা আছে : মুতাখাসসিস ফিল হাদীস, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া বাংলাদেশ।

বইটির উপরে লেখা আছে, ‘তাসাওউফ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ষোলটি প্রশ্নের শরয়ী  সমাধান।’ আমি খুব কৌতুহলী হয়ে বইটি পড়া শুরু করি। কিন্তু পড়ার পর আমি খুবই মর্মাহত হই। কারণ, এতে বহু আপত্তিকর কথাবার্তা আমার নযরে পড়ে। আমি আশ্চর্য হই, এতে তাসাওউফের মৌলিক কোনো বিষয় অর্থাৎ তাযকিয়া ও ইসলাহে আখলাক সম্পর্কে তেমন কোনো আলোচনা নেই। বরং এতে কিছু প্রশ্নের আজগুবি জবাব দেয়া হয়েছে। এসব দেখে আমার মনে সংশয় জাগে, আসলে কি এ বইটি মারকাযুদ দাওয়াহর কোনো মুতাখাসসিস-এর লেখা?! বইটি সম্পর্কে কি আপনারা অবহিত? বইটির একটি কপি আপনার কাছে পাঠালাম। আশা করি বইটি দেখে এর সম্পর্কে ও এর লেখক সম্পর্কে আপনাদের মতামত অবশ্যই জানাবেন। যাতে বইটি পড়ে কারো মধ্যে ভুল ধারণা বা ভুল আকীদা সৃষ্টি না হয়। আল্লাহ সবাইকে হেফাযত করুন।

উত্তর

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। বইটি ইতিপূর্বে দেখার সুযোগ হয়নি। এই প্রথম দেখছি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! আসলেই বইটি খুবই বিভ্রান্তিকর। এতে শুধু বিদআতীদের জন্যই নয়; বরং কাদিয়ানীদের জন্যও নিজ নিজ বাতিল মতবাদের তরফদারির বিভিন্ন উপাদান জমা করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তিকর ও আপত্তিকর বিষয় রয়েছে, যেমন :

তাহরীফ অর্থাৎ এক জায়গার কথা অন্য জায়গায় ব্যবহার করা, ‘কথা সত্য মতলব খারাপ’-এর বিভিন্ন নমুনা, শায ও মুনকার কথাবার্তা এবং পূর্ববর্তী কতক আলেমের বর্জনীয় যাল্লাত ও তাসামূহাতের অনুসরণ। আল্লাহ তাআলা বইটির লেখককে খালেস অন্তরে তওবা করার তাওফীক দান করুন এবং এসব কিছু থেকে নিজের বারাআত ও সম্পর্কহীনতা ঘোষণার তাওফীক দান করুন- আমীন।

‘মুতাখাসসিস’ শব্দটি থেকেই আপনি অনুমান করতে পারেন, মারকাযুদ দাওয়াহ-এর সাথে লেখক বেচারার সম্পর্ক  কোন্ প্রকারের। মারকাযুদ দাওয়াহ্য় কেউ দাখেল হলে চেষ্টা করা হয়, সে যেন কমপক্ষে ইলমের বিস্তৃতি ও গভীরতা অনুধাবনের চেষ্টা করে। এবং এর মধ্য দিয়ে নিজের ক্ষুদ্রতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে। সে যেন কোনো শব্দ বা উপাধি অনুচিত স্থানে ব্যবহার না করে। এবং অতি ব্যবহৃত শব্দ ও উপাধিসমূহের নির্বিচার ব্যবহারের মাধ্যমে সেগুলোকে আরো বেশি গতানুগতিক ও গুরুত্বহীন বানানো থেকে বিরত থাকে।

পুরাতন কাগজপত্রে তার পরীক্ষার ফলাফল দেখা হয়েছে। সে সময় উলূমিল হাদীস বিভাগের লাযেমী নেসাব ছিল দু’বছরের। প্রথম বর্ষের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফলাফলে শুধু ‘আলমাদখাল ইলা উলূমিল হাদীসিশ শারীফ’ কিতাবের নাম্বার পাওয়া গেল। এটি একটি প্রাথমিক কিতাব, এতে তার প্রাপ্ত নাম্বার মাত্র ৪৯  (মোট নাম্বার ১০০), বাকি বিষয়গুলোতে তার কোনো নাম্বার নেই। নোটে লেখা আছে, অসুস্থ।

দ্বিতীয় ফাতরার (সেমিস্টারের) পরীক্ষার ফলাফলের অবস্থা হল, ‘মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ’ কিতাবের পরীক্ষায় ‘রাসিব’ (ফেল)। তৃতীয় ফাতরার (সেমিস্টারের) পরীক্ষায় সে অংশগ্রহণই করেনি। নোটে লেখা আছে, সে অসুস্থ। আর দ্বিতীয় বর্ষের কোনো ফাতরার  (সেমিস্টারের) পরীক্ষায়ই তার নাম উল্লেখ নেই!! প্রথম ফাতরার পর থেকে মারকাযে অবস্থানের সুযোগ পাওয়া মূলত তার ওজর ও অনুরোধের বিবেচনায় হয়েছিল। কিন্তু এর কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তো যেখানে বিভাগের সাধারণ কারিকুলাম পূর্ণ করার কাছে ধারেও যে পৌঁছাতে পারেনি সে তাখাসসুসের দাবি করে কীভাবে? তাখাসসুস তো কারিকুলাম পুরা করার চেয়েও অনেক দীর্ঘ ও গভীর বিষয়। আর এখানে তো দাবি শুধু ‘তাখাসসুসের’ নয়; বরং ‘মুতাখাসসিস’ শব্দের নিঃসঙ্কোচ ব্যবহার।

উলূমুল হাদীস বিভাগের যিম্মাদারি এই অধমকে সোপর্দ করা হয়েছে। সম্ভবত এই দুঃখজনক অবস্থা আমারই আমলের মন্দ পরিণতি। আল্লাহ তাআলা এই অধমকে মাফ করুন এবং তার অনিষ্ট থেকে সকল ব্যক্তিকে ও সকল বস্তুকে হেফাযত করুন- আমীন।

উক্ত বইটিতে উদ্ভট ও আপত্তিকর কথাবার্তা এবং তাহরীফ ও বিকৃতির তো কোনো শেষ নেই। তবে বইটির ১০৫ নং পৃষ্ঠায় এই জঘন্য কুফুরী কথারও উল্লেখ রয়েছে যে, বান্দা কখনো নাকি এমন হালতে পৌঁছে যায়, যখন সে শরয়ী বিধি-বিধানের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। নাউযু বিল্লাহি মিন যালিক।

 

বইটির ৬নং পৃষ্ঠায় এক বুযুর্গের ‘তাকরীয’ও ছাপা হয়েছে। এটি খুবই দুঃখজনক ও কষ্টদায়ক। তবে স্পষ্ট যে, ঐ বুযুর্গের সরলতার সুযোগ নিয়েই হয়তো তার থেকে তাকরীয নেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই বইয়ের অনিষ্ট থেকে মানুষকে হেফাযত করুন। বইয়ের লেখককে তাওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসার তাওফীক দান করুন। যে ব্যক্তির তরফদারির জন্য এই বেচারা নিজের দু চার হরফ লাফযী ইলমকে বরবাদ করেছে সেই ব্যক্তি যদি এই বইয়ের কথাবার্তার সাথে একমত হন তবে শুধু এটাই তারও গোমরাহ হওয়ার দলীল। আল্লাহ তাআলা তাকেও হেদায়েত নসীব করুন- আমীন।

শেয়ার লিংক

মাহফুজুর রহমান - জামিয়াতুল মাআরিফ আলইসলামিয়া ৮৮/৯ উত্তর যাত্রাবাড়ি, ঢাকা

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ

হযরতের সুস্বাস্থ্য ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে বরকত কামনা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর হযরতের ছায়াকে সুদীর্ঘ করুন। হযরতের নিকট একটি বিষয়ে সমাধান কামনা করছি।

দরসে নেযামীর বিভিন্ন কিতাবে আমরা ফেয়েলে মুযারেকে নছব দানকারী হরফ لن -এর অর্থ ‘কিছুতেই না’, ‘কখনো না’ পড়েছি।

এসো আরবী শিখিতেও অর্থ দেয়া আছে ‘কিছুতেই না’। কোনো কোনো তাফসীর গ্রন্থেও تأبيد- تأكيد  -এর অর্থ পাওয়া যায়। কিন্তু ইবনে হিশাম রাহ.-এর কিতাবসমূহ যেমনÑ

مغني اللبيب، قطر الندى، أوضح المسالك

এবং নাহবের আরো কিছু কিতাব যেমনÑ

النحو القرآني، موسوعة النحو والصرف والإعراب، المعجم الوسيط في الإعراب

ইত্যাদি গ্রন্থে تأكيد  ও تأبيد -এর অর্থ আমরা পাই না। আরবী অভিধান যেমন, مقاييس اللغة، القاموس المحيط، المنجد، المعجم الوسيط এগুলোতেও আমরা تأكيدتأبيد -এর অর্থ পাইনি। কিছু কিছু জায়গায় আল্লামা যামাখশারী রাহ.-এর কওল (تأكيدتأبيد -এর ফায়দা দেয়া) রদও করা হয়েছে। এখন হযরতের নিকট জানার বিষয় হল, لن -এর মাঝে কি تأكيدتأبيد -এর অর্থ আছে, নাকি لن শুধুই ‘নাফয়ে মুস্তাকবাল’-এর ফায়দা দেয়? হযরতের নিকট দরখাস্ত, উক্ত বিষয়ে সমাধান দিয়ে আমাদের সন্দেহ-সংশয় দূর করে উপকৃত করবেন।

উত্তর

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আপনি প্রশ্নোক্ত বিষয়ে বেশ কিছু কিতাবের মুরাজাআত করেছেন। আল্লাহ তাআলা আপনার মেহনতকে কবুল করুন এবং ইলম ও আমলে বরকত দান করুন। দেখুন, لن হরফটি ‘ফেয়েলে মুযারে’-এর শুরুতে এসে শেষে নসব দান করে এবং ভবিষ্যতের ফেয়েলকে নাকচ করে। এজন্য একে حرفُ نفي ونصب واستقبال বলা হয়। لن হরফটি যে  لا-এর মতো ভবিষ্যতের ফেয়েলকে নাকচ করে সে বিষয়ে কারো কোনো ইখতিলাফ নেই, কিন্তু এটি ভবিষ্যতের না-বাচক ফেয়েলকে مؤكد বা দৃঢ় করে কি না এবং مؤبد বা চিরস্থায়ী করে কি না অর্থাৎ ফেয়েলটি ভবিষ্যতে কিছুতেই ঘটবে না এবং কখনই ঘটবে নাÑ এমন অর্থ প্রকাশ করে কি না এবং এটি ‘নাফী’র ক্ষেত্রে لا -এর তুলনায় অধিক জোরদার কি নাÑ সে বিষয়ে নাহবীদের মধ্যে কিছুটা ইখতিলাফ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে নাহ্ব ও লুগাতের অনেক মুহাক্কিক ও বিশেষজ্ঞ আলেমের মতেই রাজেহ ও অগ্রগণ্য অভিমত হল, لن হরফটি ভবিষ্যতের ফেয়েলকে مؤكد দৃঢ় ও জোরদার করে, কিন্তু مؤبد বা চিরস্থয়ী করে না; বরং ‘নাফীর’ সময়সীমা কখনো মাহদুদ ও মুকায়্যাদ হয় এবং কখনো মুতলাক ও গায়রে মাহদুদ হয়। 

মোটকথা ভবিষ্যতের ফেয়লকে চিরস্থায়ীভাবে নাকচ করাÑ এটি لن হরফের অর্থ নয়। তবে কখনো কখনো প্রসঙ্গের বিচারে এবং পূর্বাপর অবস্থা অনুসারে এমন অর্থ বুঝে আসে। নি¤েœর উদ্ধৃতিগুলো লক্ষ্য করুনÑ

আল্লামা রযীউদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আস্তারাবাযী রাহ. (ওফাত : আনুমানিক ৬৮৬হি.) কাফিয়ার ভাষ্যগ্রন্থে বলেনÑ

قوله: (ولن معناها نفي المستقبل)، هي تنفي المستقبل نفيا مؤكدا وليس للدوام والتأبيد كما قال بعضهم.

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহ. جمع الجوامع গ্রন্থে বলেনÑ

لن- بسيطة، وقال الخليل: من (لا أن)، والفراء لا النافية أبدلت نونا وإنما تنصب مستقبلا وتفيد نفيه وكذا التأكيد لا التأبيد على المختار.

তারপর তিনি ‘জামউল জাওয়ামে’-এর  ব্যাখ্যাগ্রন্থ همع الهوامع -এ বলেনÑ

وتنصب (لن) المستقبل أي أنها تخلص المضارع إلى الاستقبال وتفيد نفيه ثم مذهب سيبويه والجمهور أنها تنفيه من غير أن يشترط أن يكون النفي بها آكد من النفي بلا، وذهب الزمخشري في مفصله إلى أن (لن) لتأكيد ما تعطيه (لا) من نفي المستقبل، قال : تقول : لا أبرح اليوم مكاني، فإذا أكدت وشددت قلت : لن أبرح اليوم، قال تعالى: لَاۤ اَبْرَحُ حَتّٰۤی اَبْلُغَ مَجْمَعَ الْبَحْرَیْنِ،  وقال: فَلَنْ اَبْرَحَ الْاَرْضَ حَتّٰی یَاْذَنَ لِیْۤ اَبِیْۤ، وذهب الزمخشري في أنموذجه إلى أنها تفيد تأبيد النفي، قال : فقولك لن أفعله كقولك لا أفعله أبدا، ومنه قوله تعالى: لَنْ يَّخْلُقُوْا ذُباباً  (ثم نقل رد ابن مالك على الزمخشري، إلى أن قال:) ووافقه على إفادة التأكيد جماعة منهم ابن الخباز بل قال بعضهم، إن منعه مكابرة، فلذا اخترته دون التأبيد. انتهى من همع الهوامع২৮৭-২৮৬/২

(قال الراقم : لايوجد في "الأنموذج" المطبوع كل ماعزي إليه هنا، فالظاهر أن النقل عنه هنا دخله الإدراج والرواية على المعنى، بل التصحيف أيضا، وسيأتي الكلام على ذلك إن شاء الله تعالى.)

আল্লামা সুয়ূতীর উপরোক্ত ইবারত থেকে এবং ইবনু মালিক, ইবনু হিশাম প্রমুখ মুতাআখখিরীন উলামায়ে নাহ্ব-এর বক্তব্য থেকে মনে হয় আল্লামা জারুল্লাহ যামাখশারীই (জন্ম : ৪৬৭ হি. ওফাত : ৫৩৮ হি.) সর্বপ্রথম لن হরফের تأكيد النفي এবং تأبيد النفي -এর অর্থ আবিষ্কার করেছেন; তাঁর পূর্বে অন্য কেউ এমন অর্থ বর্ণনা করেননি। এমনকি অনেকের দাবি হল, আল্লামা যামাখশারী যেহেতু আকীদা ও ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে মুতাযিলা মতালম্বী তাই তিনি নিজ মাযহাবের সমর্থনের জন্য উপরোক্ত অর্থ অবিষ্কার করেছেন, অন্যথায় এই অর্থের পক্ষে শক্তিশালী কোনো শাহেদ ও দলীল নেই!! কিন্তু এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমরা আমাদের সামান্য অনুসন্ধানে দেখতে পাই, আল্লামা যামাখশারীর পূর্বেও কোনো কোনো ইমামে লুগাহ স্পষ্ট ভাষায় এবং কেউ কেউ ইঙ্গিতে তাকীদের অর্থ উল্লেখ করেছেন এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী অনেক আলেমই ‘তাকীদ’-এর অর্থকে সাব্যস্ত করেছেন।

নাহব শাস্ত্রের ইমাম আবু হাইয়ান আন্দালুসী রাহ.  ارتشاف الضرب গ্রন্থে এবং تفسير البحر المحيط গ্রন্থের একাধিক স্থানে لن হরফের تأبيد النفي-এর অর্থকে নাকচ করেছেন এবং এ ব্যাপারে যামাখশারীর বক্তব্যকে দৃঢ়তার সাথে রদ করেছেন কিন্তু  تأكيد-এর অর্থকে সরাসরি অস্বীকার করেননি। তিনি যদিও যামাখশারীর রদ করতে গিয়ে এক জায়গায় বলেছেনÑ

وأما قوله : إلا أن في لن تأكيداً وتشديداً ليس في لا ، فيحتاج ذلك إلى نقل عن مستقري اللسان.

কিন্তু  لن  হরফটি যে تأكيد النفي  -এর ভাব প্রকাশ করে তা তিনি تفسير البحر المحيط -এর একাধিক স্থানে সমর্থন করেছেন। এমন দুটি স্থানের হাওয়ালা নি¤েœ উল্লেখ করা হলÑ

كان الأقرب من هذه الأقوال قول الزمخشري أولاً، من أن فيها توكيداً وتشديداً، لأنها تنفي ما هو مستقبل بالأداة ، بخلاف لا، فإنها تنفي المراد به الاستقبال مما لا، أداة فيه تخلصه له، ولأن لا قد ينفى بها الحال قليلاً، فلن أخص بالاستقبال وأخص بالمضارع، ولأن “ولن تفعلوا” أخصر من “ولا تفعلون”، فلهذا كله ترجيح النفي بـ "لن" على النفي بـ "لا". انتهى من "البحر المحيط"১০৭/১

লক্ষণীয়, উপরোক্ত ইবারতে আবু হাইয়ান রাহ. لن হরফটি কেন  أوكد في نفي المستقبل সে কথার একাধিক ‘নাহবী ইল্লত’ উল্লেখ করেছেন। তিনি অন্যত্র বলেনÑ

قوله: (لَنْ تَتَّبِعُونَا) : وأتى بصيغة لن، وهي للمبالغة في النفي،... انتهى من "البحر المحيط" ৯৪/৮

আমাদের বর্তমান অনুসন্ধান অনুসারে لن হরফের ‘তাকীদ’-এর অর্থ সর্বপ্রথম যিনি বর্ণনা করেছেন তিনি হলেন ইমামুল লুগাহ ওয়ান নাহব খলীল ইবনু আহমদ রাহ. (ওফাত : ১৭০ হি.) তিনি তাঁর ‘কিতাবুল আইন’ গ্রন্থে বলেনÑ

وأمّا (لن) فهي: لا أنْ، وصلت لكثرتها في الكلام، ألا ترى أنّها تُشْبِهُ في المعنى (لا)، ولكنّها [أوكد]. تقول: لن يُكْرِمَك زيدٌ، معناه: كأنّه يَطْمَعُ في إكرامِهِ، فنفيتَ عنه، ووكّدتّ النّفي بلن، فكانت أوكد من (لا). انتهى من كتاب العين (৮/ ৩৫০)

ইমাম খলীল ইবনু আহমাদ لن হরফের যে বুৎপত্তি ও গঠন উল্লেখ করেছেন তা পরবর্তীতে কেউ গ্রহণ করেেেছন এবং কেউ গ্রহণ করেননি। কিন্তু আমাদের জানামতে মুতাকাদ্দিমীন ইমামদের মধ্যে কোনো ইমামে লুগাহ বা ইমামে নাহব ইমাম খলীল ইবনু আহমাদের বর্ণিত উপরোক্ত অর্থকে রদ করেননি। বরং তাঁর উপরোক্ত বক্তব্য তাঁর শাগরিদ লাইছের সূত্রে ইমাম আবু মানসূর আযহারী (ওফাত : ৩৭০ হি.) তাঁর ‘তাহযীবুল লুগাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং ইমাম আযহারীর বরাতে আল্লামা ইবনু মানযুর ইফরীকী ‘লিসানুল আরব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। দ্রষ্টব্য : তাহযীবুল লুগাহ ১৫/২৩৯; লিসানুল আরব ১৩/৩৯২

এছাড়াও মুতাকাদ্দিমীন আইম্মায়ে নাহব ও আইম্মায়ে লুগাহদের মধ্যে ইমাম সীবাওয়াইহ, ইমাম মুবাররিদ, ইমাম ইবনু ফারিস প্রমুখের  বক্তব্যে এ কথার ইঙ্গিত রয়েছে যে, لا يفعل এবং لن يفعل এই দুই সীগা নাফীর ক্ষেত্রে বরাবর নয়; বরং ভবিষ্যতের ফেয়েলকে নাকচ করার ব্যাপারে لا-এর তুলনায় لن -এর নাফী অধিকতর জোরদার ও শক্তিশালী। যেমন ইমাম সীবাওয়াইহ তাঁর কিতাবে বলেনÑ

>وإذا قال: سوف يفعل فإن نفيه لن يفعل<. انتهى من الكتاب لسيبويه (৩/ ১১৭)

ইমাম মুবাররিদ বলেনÑ

>ومن هَذِه الْحُرُوف لن، وَهِي نفي قَوْلك سيفعل، تَقول: لن يقوم زيد وَلنْ يذهب عبد الله، وَلَا تتصل بالقسم كما لم يتصل به سيفعل<. انتهى من المقتضب (২/ ৬)

ইমাম আহমাদ ইবনু ফারিস (ওফাত : ৩৯৫হি.)  لن হরফের অর্থ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এভাবেÑ

"لن" تكون جوابا للمثبت أمرا في الاستقبال، يقول: "سيقوم زيد" فتقول أنت: "لن يقوم". وحكي عن الخليل أن معناها: "لا أن" بمعنى "ما هذا وقت أن يكون كذا". انتهى من الصاحبي في فقه اللغة العربية ومسائلها، وسنن العرب في كلامها (ص: ১২০)

এখানে লক্ষণীয়, سيفعل  এবং سوف يفعل বিশেষভাবে ভবিষ্যতের হাঁ-বাচক ফেয়েলকে সাব্যস্ত করে, আর এর বিপরীতরূপে لن يفعل উল্লেখ করা হয়েছে, لا يفعل উল্লেখ করা হয়নি। কেননা لا يفعل কখনো কখনো বর্তমানের ফেয়েলকে নাকচ করার জন্যও ব্যবহৃত হয় আর ভবিষ্যতের ফেয়েলকে নাকচ করলেও তা سيفعل  এবং سوف يفعل -এর পূর্ণ বিপরীত নয়। এ বিষয়টিকেই ইমাম আবু হাইয়ান আন্দালুসীসহ অনেকেই لن أوكد في نفي المستقبل এই কথার একটি ইল্লত ও কারণরূপে উল্লেখ করেছেন। ইমাম আবু হাইয়ান আন্দালুসীর ইবারত আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। সামনে আরো কয়েকজন শাস্ত্রজ্ঞের বক্তব্য উল্লেখ করছিÑ

আল্লামাতুন-নাহব ইয়ায়িশ ইবনু আলী ইবনু ইয়ায়িশ (ওফাত : ৬৪৩ হি.) বলেনÑ

>اعلم أن >لن< معناها النفي، وهي موضوعة لنفي المستقبل، وهي أبلغ في نفيه من >لا<، لأن >لا< تنفي يفعل إذا أريد به المستقبل، ولن تنفي فعلا مستقبلا قد دخل عليه السين وسوف، وتقع جوابا لقول القائل: سيقوم زيد وسوف يقوم زيد،...<. انتهى من شرح المفصل لابن يعيش ১১২-১১১/৮

 

জামালুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনু আলী আলইয়ামানী আলমাওযায়ী (ওফাত : ৮২৫ হি.) বলেনÑ

وزعم في المفصل والكشاف أنها تفيد تأكيد النفي، وبه قال ابن الخباز، وما ادعاه من التأكيد حسن قريب، وربما أعطاه كلام سيبويه، حيث قال: لا نفي لقولك: يفعل، ولن نفي لقولك: سيفعل، فكما أفادت السين التنفيس في الاستقبال، كذلك يفيد نقيضها تأكيدا في النفي، والله أعلم. انتهى من مصابيح المغاني في حروف المعاني ص ৪২৬

আর মুতাআখখিরীন লুগাবী ও নাহবীদের মধ্যেও যামাখশারীর পূর্বে কেউ কেউ তাকীদের অর্থ উল্লেখ করেছেন। যেমন ইমাম আব্দুল কাহির ইবনু আব্দির রহমান আল-জুরজানী (ওফাত: ৪৭৪ হি.)।

দ্রষ্টব্য : আল-আওয়ামিলুল মিয়াহ, পৃ. ৫৩, তাহকীক : আনওয়ার দাগিস্তানী, দারুল মিনহাজ; শরহুল জুমাল, পৃ. ১৩৯-১৪০, তাহকীক : খাদীজাহ পাকিস্তানী, জামিয়াতু উম্মিল কুরা; তারশীহুল ইলাল ফী শারহিল জুমাল, সাদরুল আফাযিল, পৃ. ১৭৭-১৭৮, তাহকীক : আদিল মুহসিন, জামিআতু উম্মিল কুরা।

আর যামাখশারীর পরবর্তী লুগাত ও নাহবের যেসব আলিম لن হরফের ‘তাকীদ’-এর অর্থকে সমর্থন করেন তাদের কয়েকজনের উদ্ধৃতি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। নি¤েœ আরো কয়েকজনের নাম কিতাবের হাওয়ালাসহ উল্লেখ করা হলÑ

১. সাদরুল আফাযিল আলকাসিম ইবনুল হুসাইন আলখুয়ারাযমী (ওফাত : ৬১৭)। দ্রষ্টব্য : তারশীহুল ইলাল ফী শারহিল জুমাল, পৃ. ১৭৭-১৭৮, তাহকীক : আদিল মুহসিন, জামিআতু উম্মিল কুরা; আততাখমীর ফী শরহিল মুফাস্সাল, ৪/৮৯-৯০

২. আহমাদ ইবনুল হুসাইন, যিনি ইবনুল খাববায নামে পরিচিত (ওফাত : ৬৩৯ হি.)। তার কিতাবের নামÑ

الغرة المخفية في شرح الدرة الألفية،(ص১৬০)

৩. আলমুনতাজাব ইবনু আবিল ইয আলহামাযানী (ওফাত : ৬৪৩ হি.)। তার কিতাবের নাম-

الفريد في إعراب القرآن المجيد (২৪৯/১)

৪. জামালুদ্দীন আবু আমর ইবনুল হাজিব [কাফিয়ার গ্রন্থকার (ওফাত : ৬৪৬ হি.)]। দ্রষ্টব্য : আলঈযাহ ফী শারহিল মুফাসসাল ২/২১৫, ২১৯

৫. মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ আলআস্ফারায়িনী (ওফাত : ৬৮৪ হি.)। তারকিতাবের নামÑ

لباب الإعراب (ص ৪৪৭)

৬. আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (ওফাত : ৭৯৪ হি.)। আলবুরহান ফী উলূমিল কুরআন ৪/৪৮৯; মা‘না লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পৃ. ১৫৬-১৫৭

৭. মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ আবুসসাঊদ (ওফাত : ৯৮২)। তাফসীরু আবীস সাঊদ ১/৬৭ (সূরা বাকারার ২৪ নং আয়াতের তাফসীর)।

৮. আল্লামা আবূ ইয়াকুব ইউসুফ আসসাক্কাকী (ওফাত : ৬২৬)। মিফতাহুল উলূম, পৃ. ১০৮

৯. মুহাম্মাদ ইবনু আলী আসসব্বান (ওফাত : ১২০৬)। হাশিয়াতুস সব্বান আলাল-উশমূনী ৩/৪০৭

১০. আধুনিক কালের আরবী ভাষা বিশেষজ্ঞ ড. ফাযিল সালিহ আসসামিররায়ী। দ্রষ্টব্য : ‘মাআনীন নাহ্ব’ ৩/৩৬০-৩৬৬

তাছাড়া কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন নস এবং সাধারণ ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও لن  হরফটিকে তাকীদের স্থলে অর্থাৎ ভবিষ্যতের না-বাচক ফেয়লকে জোরালো ও তাকীদযুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যেমন সাধারণ ক্ষেত্রে বলা হয়Ñ لا أكلمك কিন্তু কথাটিকে আরো জোরালো করার জন্য এবং নাফীর মুবালাগা ও অতিশয়তা প্রকাশের জন্য বলা হয়Ñ لن أكلمك

কুরআনের কয়েকটি আয়াত লক্ষ করুনÑ

فَاِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا وَ لَنْ تَفْعَلُوْا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیْ وَ قُوْدُهَا النَّاسُ وَ الْحِجَارَةُ،  اُعِدَّتْ لِلْكٰفِرِیْنَ. (سورة البقرة : ২৪)

وَ اِذْ قُلْتُمْ یٰمُوْسٰی لَنْ نُّؤْمِنَ لَكَ حَتّٰی نَرَی اللهَ جَهْرَةً فَاَخَذَتْكُمُ الصّٰعِقَةُ وَ اَنْتُمْ تَنْظُرُوْنَ.  (سورة البقرة : ৫৫)

اِنِّیْ نَذَرْتُ لِلرَّحْمٰنِ صَوْمًا فَلَنْ اُكَلِّمَ الْیَوْمَ اِنْسِیًّا.  (سورة مريم : ২৬)

فَلَنْ اَكُوْنَ ظَهِیْرًا لِّلْمُجْرِمِیْنَ. (سورة القصص : ১৭)

قَالُوْا یٰلُوْطُ اِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ یَّصِلُوْۤا اِلَیْكَ فَاَسْرِ بِاَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِّنَ الَّیْلِ.  (سورة الهود : ৮১)

এজন্যই لن হরফের তাকীদের অর্থ অস্বীকার করাকে কেউ কেউ ‘মুকাবারা’ আখ্যায়িত করেছেন। যেমন ইমাম সা‘দুদ্দীন তাফতাযানী রাহ. ‘শরহুল মাকাসিদ’ গ্রন্থে ‘রুইয়াতে বারী তাআলা’ সম্পর্কে মুতাযিলাদের মত খ-ন করতে গিয়ে বলেনÑ

والجواب أن كون كلمة لن للتأبيد لم يثبت ممن يوثق به من أئمة اللغة، وكونها للتأكيد وإن ثبت بحيث لا يمنع إلا مكابرة، لكن لا نسلم دلالة الكلام على عموم الأوقات لا نصا ولا ظاهرا، ولو سلم الظهور فلا عبرة به في العلميات، سيما مع ظهور قرينة الخلاف، وهو وقوعه جوابا لسؤال الرؤية في الدنيا، على أنه لو صرح بالعموم وجب الحمل على الرؤية في الدنيا توفيقا بين الأدلة.

 

‘তাবীদুন নাফী’ বা চিরস্থায়ীভাবে নাকচ করার অর্থ

‘তাবীদুন নাফী’-এর অর্থকে যামাখশারীর দিকে নিসবত করা হয় এবং তাকেই এই অর্থের প্রথম আবিষ্কারক মনে করা হয়। কিন্তু আমরা দেখি আল্লামা যামাখশারী এই অর্থটি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আলমুফাসসাল ফীল ই‘রাব’-এ উল্লেখ করেননি, বরং সেখানে তিনি কেবল তাকীদের অর্থকে উল্লেখ করেছেন। আলমুফাসসাল-এর খোলাসা ‘আলউনমূযাজ’, যা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন তাতেও শুধু তাকীদের অর্থেরই উল্লেখ পাওয়া যায়। আলউনমূযাজ-এর ইবারত হলÑ

ولن نظيرة لا في نفي المستقبل، ولكن على التأكيد.

তবে পুরাতন কোনো কোনো নুসখায় এখানে التأكيد -এর স্থলে  التأبيد আছে। তবে তা লিপিকারের ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা এ কিতাবের মূল ‘আলমুফাসসাল’ আর তাতে তাবীদের অর্থের প্রতি কোনো ইঙ্গিত নেই। এমনকি তার বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ ‘আলকাশশাফে’ও তিনি لن হরফের  تأبيد النفي -এর অর্থ স্পষ্টভাবে কোথাও উল্লেখ করেননি। এসব কারণে কোনো কোনো মুহাক্কিক আলেম মনে করেন, এই অর্থের নিসবত আল্লামা যামাখশারীর দিকে করা ভুল। তবে আল্লামা যামাখশারী কাশশাফের বিভিন্ন স্থানে لن হরফের তাকীদের অর্থ এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা থেকে কোথাও কোথাও তাবীদের অর্থের আভাস পাওয়া যায়। (দ্রষ্টব্য : দিরাসাতুন লি উসলূবিল কুরআনিল কারীম, মুহাম্মাদ আব্দুল খালিক উযায়মাহ ২/৬৩৫-৬৩৭) কিন্তু আল্লামা যামাখশারীকে ‘তাবীদুন নাফী’ অর্থের প্রথম আবিষ্কারক মনে করা ঠিক নয়। কেননা তার  জন্মের বহু পূর্বে মুতাযিলা মতালম্বী কোনো কোনো আলেম যেমন,  কাযী আব্দুল জাব্বার (ওফাত : ৪১৫ হি.), মুহাম্মাদ আলখতীব আলইসকাফী (ওফাত : ৪২০ হি.), শরীফ মুরতাযা (ওফাত : ৪৩৬) لن হরফের ‘তাবীদুন নাফী’-এর অর্থ দাবি করেছেন এবং সে ভিত্তিতে কুরআনেরÑ لَنْ تَرَانِيْ এই বাক্য দ্বারা তারা ‘নাফয়ে রুইয়াহ’-এর ব্যাপারে গলত ইস্তেদলাল করেছেন এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আলিমগণ তাদের সেই গলত ইস্তেদলালকে খ-ন করেছেন। যেমন ইমামুল হারামাইন (ওফাত : ৪৭৮ হি.) তিনি তার ‘আশশামিল ফী উসূলিদ দ্বীন’ গ্রন্থে তাদের সেই ইস্তেদলাল উল্লেখ করেছেন এবং খ-ন করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে, لن হরফের ‘তাবীদুন নাফী’র অর্থ মেনে নেয়া হলেও তা দ্বারা মুতাযিলা মাযহাব প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কারণ, তাবীদ যেমন মুতলাক হতে পারে তেমনি মুকায়্যাদও হতে পারে, যা পূর্বাপর আলামাত দ্বারা নির্ধারিত হবে। আল্লামাতুন নাহ্ব ইয়ায়িশ ইবনু আলী ইবনু ইয়ায়িশ (মৃত্যু : ৬৪৩ হি.) যামাখশারীর আলমুফাসসাল-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে لن হরফের তাবীদুন নাফীর অর্থ উল্লেখ করার পর বলেনÑ

ومنه قوله تعالى: (لَنْ تَرَانِيْ) ولم يلزم منه عدم الرؤية في الآخرة لأن المراد: إنك لن تراني في الدنيا، لأن السؤال وقع في الدنيا، والنفي على حسب الإثبات.

মুফাসসির আল্লামা ইবনু আতিয়্যাহ বাহ্যত তাবীদুন নাফীর অর্থকে গ্রহণ করা সত্ত্বেও তিনি তার তাফসীর গ্রন্থে বলেনÑ

وقوله عز وجل: لَنْ تَرَانِيْ نص من الله تعالى على منعه الرؤية في الدنيا، ولَنْ تنفي الفعل المستقبل، ولو بقينا مع هذا النفي بمجرده لقضينا أنه لا يراه موسى أبدا، ولا في الآخرة، لكن ورد من جهة أخرى بالحديث المتواتر أن أهل الإيمان يرون الله تعالى يوم القيامة، فموسى عليه السلام أحرى برؤيته.

যাইহোক, لَنْ হরফের ব্যবহার সম্পর্কে খোলাসায়ে কালাম হল, যা শায়েখ মুস্তফা আলগালায়িনী (ওফাত : ১৩৬৪ হি.) তাঁরجامع الدروس العربية  গ্রন্থে বলেছেনÑ

لنْ، وهي حرفُ نفيٍ ونصبٍ واستقبال، فهي في نفي المستقبل كالسين وسوفَ في إثباته، وهي تفيدُ تأكيدَ النفي لا تأبيدَهُ، وأما قولهُ تعالى لَنْ يَّخْلُقُوْا ذُبَابا، فمفهوم التأبيدِ ليس من "لن"، وإنما هو من دلالة خارجيّة، لأنّ الخلقَ خاص بالله وحدَهُ

শেয়ার লিংক
advertisement
advertisement