জুনায়েদ সাইফুল্লাহ - টঙ্গী, গাজীপুর

৬৯৪৫. প্রশ্ন

এক ব্যক্তির ক্ষতস্থানে ডাক্তার একটা ব্যান্ডেজ করে দেয়। অতঃপর এই ব্যান্ডেজের ওপর পৃথক আরেকটা পট্টি লাগিয়ে দেয়। কিছুদিন পরের ঘটনা। একদিন সে ওযু করে এবং পট্টির ওপর মাসেহ করে। অতঃপর ওযু থাকা অবস্থায় ওই পট্টিটা সে খুলে ফেলে।

প্রশ্ন হল, তার তো ওযু আছে। কিন্তু ওযুতে সে যেই পট্টির ওপর মাসেহ করেছে, তা খুলে ফেলেছে। এমতাবস্থায় কি তার পূর্বের মাসেহ বহাল থাকবে, নাকি নিচের ব্যান্ডেজের ওপর নতুন করে মাসেহ করতে হবে?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ওপরের পট্টিটির ওপর মাসেহ করার পর সেটি খুলে ফেললেও এর দ্বারা মাসেহ ভঙ্গ হয়ে যায়নি এবং ওযুর কোনো ক্ষতি হয়নি। তাই এক্ষেত্রে নিচের ব্যান্ডেজের ওপর পুনরায় মাসেহ করা জরুরি নয়। অবশ্য সম্ভব হলে ওই ব্যান্ডেজের ওপর কিংবা নতুন পট্টি লাগালে এর ওপর পুনরায় মাসেহ করে নেওয়া উত্তম।

আলমুজতাবা, যাহেদী ১/১১৯; মি‘রাজুদ দিরায়া ১/৩৫৮; আলবাহরুর রায়েক ১/১৮৭; আননাহরুল ফায়েক ১/১২৭; ইমদাদুল ফাত্তাহ, পৃ. ১৪২; আদ্দুররুল মুখতার ১/২৮০

শেয়ার লিংক

আলী আশরাফ - জয়পুরহাট

৬৯৪৬. প্রশ্ন

এক জায়গায় ইফতারের দাওয়াত ছিল। ইফতার শেষ হতে কিছুটা দেরি হয়ে যায়। মসজিদ দূরে হওয়ায় মসজিদে গিয়ে মাগরিবের নামাযের জামাত পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তাই আমরা ঘরেই নামায পড়ার সিদ্ধান্ত নিই।

ঘরের মেঝেতে তোশক বিছানো ছিল। তোশকটি কিছুটা নরম ছিল। তখন একজন বলল, নরম তোশকের ওপর নামায পড়লে নামায হয় না; বরং সিজদা সহীহ হওয়ার জন্য সিজদার স্থান শক্ত হওয়া জরুরি। ফলে আমরা তোশক উঠিয়ে নামায আদায় করি।

মুফতী সাহেবের কাছে প্রশ্ন হল, ওই ব্যক্তির কথা কি ঠিক? নরম তোশকের ওপর নামায পড়লে কি আসলেই নামায হয় না? তাছাড়া ফোম, ম্যাট্রেস, জাজিমের ওপর নামায পড়ারই-বা কী হুকুম?

উত্তর

না, মাসআলাটি ঠিক এরকম নয়; বরং তোশক নরম হলেও তাতে নামায আদায় করা সহীহ আছে। এক্ষেত্রে মাসআলা হল, সিজদার জায়গাটি যদি এমন হয় যে, তাতে মাথা রাখলে মাথা স্থিরই হয় না; বরং মাথা নিচের দিকে যেতেই থাকে, তাহলে তাতে সিজদা আদায় হবে না এবং নামাযও সহীহ হবে না।

কিন্তু সিজদার জায়গা যদি এপর্যায়ের নরম না হয়; বরং কিছু নরম হলেও এবং তাতে মাথা শক্তভাবে রাখলে কিছুটা নিচে চলে গেলেও এরপর তাতে মাথা স্থির হয়ে যায়, তাহলে ওই বিছানায়ও সিজদা করা সহীহ হবে।

অতএব আমাদের দেশে সাধারণভাবে ব্যবহৃত তোশক, জাজিম ও ম্যাট্রেস নরম হলেও তাতে যেহেতু একটা পর্যায়ে মাথা স্থির হয়ে যায়, তাই এগুলোর ওপর নামায আদায় করতে সমস্যা নেই। আর ফোম যদি অনেক বেশি নরম এবং অনেক বেশি মোটা হয়, যাতে শক্তভাবে সিজদা করলে এর ভেতর চেহারা অদৃশ্য হয়ে যায় এবং এর পরও মাথা স্থির হয় না, তাহলে তাতে সিজদা করা সহীহ হবে না। কিন্তু যদি এ পর্যায়ের মোটা ও নরম না হয়, তাহলে তাতেও সিজদা সহীহ হবে।

* >المحيط الرضوي< /২৪৫ : ولو سجد على الحشيش أو القطن، إن وجد حجمه وتمكن منه جاز، وإلا فلا. ولو سجد على الثلج، إن لبده جاز؛ لأنه بمعنى الأرض؛ لأن الجبهة تجد قرارا عليه، وإن لم يلبده ولا يجد حجمه لا يجوز؛ لأنه بمنزلة السجود في الهواء. ولو سجد على الأرز والذرة والجاورس لا يجوز؛ لأن الجبهة لا تجد قرارا عليه، ولو سجد على الحنطة والشعير جاز؛ لأن الجبهة تجد قرارا عليهما.

কিতাবুল আছল ১/১৭৯; আলফাতাওয়া মিন আকাবীলিল মাশায়িখ, পৃ. ৭৪; আলমুহীতুল বুরহানী ২/১২৩; আলগায়াহ শরহুল হিদায়াহ, সারুজী ৩/১৭৯; শরহুল মুনইয়াহ, পৃ. ২৮৯; আলবাহরুর রায়েক ১/৩১৯; রদ্দুল মুহতার ১/৪৫৪

শেয়ার লিংক

আবরার - কুমিল্লা

৬৯৪৭. প্রশ্ন

আমি একজন ব্যবসায়ী। ব্যাবসার প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে আমাকে বিভিন্ন এলাকা সফর করতে হয়। এ সময় ফরয নামায কসর পড়লেও সুন্নত নামাযগুলো আমি গুরুত্বের সাথেই আদায় করে থাকি। কিন্তু সেদিন এক ভাই বললেন, সফর অবস্থায় নাকি সুন্নত নামায পড়া যায় না। এতে আমার মনে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

তাই জানার বিষয় হল, উক্ত ব্যক্তির কথা কি সঠিক? সফর অবস্থায় সুন্নত নামায পড়া কি গুনাহ?

উত্তর

না, ওই লোকটির কথা ঠিক নয়। সফর অবস্থায় সুন্নত নামায পড়া যাবে না এ ধারণা সম্পূর্ণই ভুল। সফর অবস্থায় তাড়াহুড়ো বা ক্লান্তি ইত্যাদির কারণে সুন্নতে মুআক্কাদা না পড়ার সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে সুন্নত না পড়লে সুন্নতে মুআক্কাদা তরকের গুনাহ হবে না। কিন্তু মুসাফিরের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় সুন্নতে মুআক্কাদা পড়াই উত্তম।

ইবনে জুরাইজ রাহ. বলেন

عَنْ عَطَاءٍ، قُلْتُ: إِذَا سَافَرْتُ، فَقَصَرْتُ الصَّلَاةَ، أُصَلِّي قَبْلَهَا إِنْ شِئْتُ أَوْ بَعْدَهَا؟ قَالَ: نَعَمْ، آخُذُ بِالرُّخْصَةِ وَالسُّنَّةِ فَأَقْصُرُ، ثُمَّ أُحِبُّ زِيَادَةَ الْخَيْرِ فَأَتَطَوَّعُ.

আমি আতা রাহ.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি যখন সফরে থাকি এবং নামায কসর করে পড়ি, তখন কি ফরযের পূর্ববর্তী কিংবা পরবর্তী সুন্নত নামাযগুলো পড়তে পারব?

তিনি বললেন, হাঁ (পারবে)। আমি তো রুখসত (ছাড়) ও সুন্নতের অনুসরণে কসর পড়ে থাকি। আর অধিক কল্যাণ লাভের আশায় সুন্নত নামাযগুলোও পড়ে থাকি। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৪৪৫২)

জামে তিরমিযী ১/৫৫৩; আলমাবসূত, সারাখসী ১/২৪৮; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ২/১৭০; মাজমাউল আনহুর ১/২৩৯; শরহুল মুনইয়া, পৃ. ৫৪৫; রদ্দুল মুহতার ২/১৩১

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ নূরে আলম - ওয়েস্ট কাফরুল, তালতলা, ঢাকা

৬৯৪৮. প্রশ্ন

আমি কয়েকটি বাণিজ্যিক ফ্লোর ভাড়া দিয়ে থাকি এবং এর বিপরীতে ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে জামানত গ্রহণ করি। জামানত হিসেবে জমাকৃত টাকার একটা অংশ ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে কর্তন হয়। আর বাকি অংশ চুক্তির মেয়াদান্তে ভাড়াটিয়াকে ফেরত দিতে হয়। যেমন, তিন বছর মেয়াদে ভাড়া-চুক্তি করা হয়েছে। মাসিক ভাড়া ধার্য করা হয়েছে ৩০ হাজার টাকা এবং ভাড়া গ্রহণের সময় ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে জামানত নেওয়া হয়েছে ২০ লক্ষ টাকা।

চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এভাবে যে, ভাড়াটিয়া প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করবে। আর জামানতের টাকা থেকে প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ ২০ হাজার টাকা কর্তন হবে। এভাবে জামানতের টাকা থেকে তিন বছরে মোট ৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা কর্তন হয়ে চুক্তির মেয়াদান্তে ভাড়াটিয়াকে ফেরত দেওয়া হবে ১২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা।

এখন আমার জিজ্ঞাসা হল

১. জামানতের এই ২০ লক্ষ টাকা কি আমি আমার ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে পারব? জামানতের এই টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান কী?

২. জামানত হিসাবে নেওয়া ২০ লক্ষ টাকার যাকাত আমাকে দিতে হবে, নাকি ভাড়াটিয়া দেবে? দয়া করে জানাবেন।

উত্তর

প্রশ্নের বিবরণমতে ভাড়া গ্রহীতা থেকে জামানতের নামে আপনি এককালীন যে ২০ লক্ষ টাকা নিয়েছেন, সেখানে দুই ধরনের টাকা রয়েছে।

১. অ্যাডভান্স বা অগ্রিম ভাড়া।

২. জামানত বা সিকিউরিটি মানি।

সুতরাং এ থেকে চুক্তি অনুযায়ী যেহেতু ২০ হাজার টাকা করে তিন বছরে মাসিক ভাড়া বাবদ কর্তন ধরা হবে, তাই ৩৬দ্ধ২০,০০০=৭,২০,০০০ টাকা অগ্রিম ভাড়া হিসেবে ধর্তব্য হবে। প্রথম দিন থেকেই আপনি অগ্রিম ভাড়া বাবদ গৃহীত ওই টাকার মালিক হয়ে যাবেন। ওই টাকা আপনি নিজের মালিকানাধীন সম্পদ হিসাবে বৈধ যে-কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারবেন এবং এর যাকাতও আপনাকে আদায় করতে হবে।

কিন্তু বাকি ১২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা জামানত বা সিকিউরিটি মানি হিসেবে আপনার কাছে জমা থাকবে, যা চুক্তি অনুযায়ী ভাড়ার মেয়াদ শেষে ভাড়া গ্রহীতাকে ফেরত দিতে হবে। এ টাকার মালিক ভাড়া গ্রহীতা; আপনি নন। আপনার কাছে এই টাকা বন্ধক হিসেবে থাকবে। তা ব্যবহার করা আপনার জন্য জায়েয হবে না। কেননা বন্ধক গ্রহীতার জন্য বন্ধকি বস্তু ব্যবহার করে উপকার গ্রহণ করা জায়েয নয়।

আপনার কর্তব্য হল, এই টাকা হেফাজত করে রাখা। আর আপনি যেহেতু এই টাকার মালিক নন, তাই এই টাকার যাকাতও আপনাকে দিতে হবে না।

মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ১৫০৬৯; কিতাবুল আছল ৩/১৭৩; আলজামিউল কাবীর, পৃ. ২৫; আলমাবসূত, সারাখসী ২১/১০৬, ১২২; বাদায়েউস সানায়ে ৪/৬১; আলমুহীতুর রাযাবী ১/৫১৯; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/২৪৮; ফাতাওয়া বায্যাযিয়া ৪/৮৩; রদ্দুল মুহতার ৬/৪৮২

শেয়ার লিংক

হুমায়রা কবীর ফিদা - ওয়ারী, ঢাকা

৬৯৪৯. প্রশ্ন

নানির ভাই কি মাহরামের অন্তর্ভুক্ত? তার সাথে কি পর্দা করা জরুরি?

উত্তর

হাঁ, নানির (আপন, বৈপিত্রেয় ও বৈমাত্রেয়) সকল ভাই মাহরামের অন্তর্ভুক্ত।

কুরআন কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ.

(আর তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে) ভাইয়ের মেয়েদেরকে এবং বোনের মেয়েদেরকে। সূরা নিসা (০৪) : ২৩

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম আবু বকর জাস্সাস রাহ. বলেন

قد عقل من قوله تعالى >وبنات الأخ وبنات الأخت< من سفل منهن.

উক্ত আয়াতে ভাইবোনের মেয়েদের অধস্তন মেয়েরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। (আহকামুল কুরআন, জাস্সাস ২/১২৩)

সুতরাং নানির ভাইয়ের জন্য তার বোনের মেয়ে, মেয়ের মেয়ে এভাবে অধস্তন সকল মেয়ে মাহরাম।

কিতাবুল আছল ৪/৩৫৮; আলহাবীল কুদসী ১/৩৬৯; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৩৬০; আলজাওহারাতুন নায়্যিরা ২/৩; ফাতহুল কাদীর ৩/১১৮; মাজমাউল আনহুর ১/৪৭৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৭৩

শেয়ার লিংক

নাম-ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক -

৬৯৫০. প্রশ্ন

গত কয়েক বছর আগে এক মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। সে ভার্সিটিতে পড়ছে। আমাদের সম্পর্কের কয়েক মাস পর আমি বিদেশে চলে যাই। বিদেশে যাওয়ার পরও আমাদের সম্পর্ক চলতে থাকে। ৭/৮ মাস পর একদিন সে ফোনে কান্নাকাটি করে বলে, তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। পাত্র আমেরিকা থাকে।

আমি দেশে আসার দুই মাস আগে তাকে জানাই যে, আমি আসছি। তুমি বাসায় জানাও।

কয়েকদিন পর ওর মামা নম্বর জোগাড় করে আমাকে কল দিয়ে বলে, ওর বিয়ে হয়ে গেছে। ওর সাথে আর যোগাযোগ করবে না। তিনি বিয়ের কয়েকটা ছবিও পাঠান।

এরপর আমরা বাড়ি থেকে পালানোর পরিকল্পনা করি। আমি যেদিন দেশে ফিরি, এর পরদিন তাকে নিয়ে কাজি দিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলি। পরের দিন ওর মামারা আমাদের খুঁজে পায়। কিন্তু মেয়ে আমাদের পক্ষে থাকায় তারা তাকে নিতে পারে না।

পরবর্তীতে আমার পরিবার বিয়ের কথা শুনতে পেরে তাকে তার মামাদের ধরা উকিলের কাছে নিয়ে আসে। তখন উকিল কাজি ডেকে আমাদের তালাক করায়।

আমাদের যখন বিয়ে হয়, তখন তার আগের স্বামী থেকে তালাক নেওয়া হয়নি। আগের স্বামী থেকে তালাক না নিয়েই তার সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায়।

আমাদের বিয়ে হয়েছিল ৫ জানুয়ারি ২০২৫ ঈ. আর তালাক হয় ৯ জানুয়ারি ২০২৫ ঈ.। তার আগের বিয়ে হয় ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ ঈ.।

মূল প্রশ্ন, আমি যে মেয়েকে বিয়ে করেছিলাম, তার আগেও একটা বিয়ে হয়েছে এবং তালাক না হয়েই আমার সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের চার দিন পর আবার আমার সাথে তার তালাক হয়।

এই ঘটনার সাত মাস পর আমি আবার সেই মেয়েকে আনতে চাই। সে-ও আগের স্বামীকে তালাক করে আমাকে বিয়ে করতে চায়। এখন আমাদের করণীয় কী?

উত্তর

প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী ওই মেয়েটি যেহেতু অন্যের স্ত্রী এবং সে অন্যের বিবাহের অধীনে থাকা অবস্থায়ই আপনি তাকে বিবাহ করেছেন, তাই আপনাদের ওই বিবাহ সংঘটিতই হয়নি; বরং তা সম্পূর্ণ বাতিল ও হারাম কাজ হয়েছে। যে কয়দিন আপনারা একত্রে থেকেছেন, তাও পরিষ্কার হারাম কাজ হয়েছে। এখনও তার স্বামীর সাথেই তার বিবাহ বহাল রয়েছে।

এমনিতেই পরনারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা জঘন্য গুনাহ। উপরন্তু একটি মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও তার সাথে সম্পর্ক রাখা, তাকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিবাহ করা, তার সাথে একত্রে থাকা সবই ভয়াবহ গুনাহ ও হারাম কাজ হয়েছে। এর জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে কায়মনোবাক্যে তওবা-ইস্তেগফার করতে হবে।

সাথে সাথে আপনার জন্য জরুরি হল, আল্লাহকে ভয় করে ওই মেয়ের চিন্তা সম্পূর্ণ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া এবং তার সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং অন্য কোনো মেয়েকে বিবাহ করে নেওয়া।

কিন্তু ওই মেয়েকে তার স্বামী থেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করা আপনার জন্য কিছুতেই জায়েয হবে না। এর থেকে আপনার সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরি।

 

মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১৭১৬২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৫৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ২১৬৫; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ৩২৪৪; মারাতিবুল ইজমা, পৃ. ১১৯; আলমাবসূত, সারাখসী ৩০/২৮৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/৫৪৮; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৩৬৬; মাজমাউল আনহুর ৪/২০২; রদ্দুল মুহতার ৩/৫১৬, ৬/৩৬৮

শেয়ার লিংক

মিসবাহ বিন শফি - রাজশাহী

৬৯৫১. প্রশ্ন

স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। কিন্তু স্বামীসহ কেউ এটাকে পাত্তা দিচ্ছে না। ছয় মাস যাবৎ একসাথে আছে এবং মেলামেশাও হচ্ছে।

স্ত্রী জানত যে, এটা হারাম হচ্ছে। কিন্তু স্বামী তাকে হালালই মনে করে। এখন স্ত্রী চাচ্ছে, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যা হুকুম, তাই করবে।

জানার বিষয় হল, এখন কি নতুন করে ইদ্দত পালন করতে হবে, না এই মুহূর্তেই কাউকে বিয়ে করতে পারবে?

উত্তর

তিন তালাক হয়ে যাওয়ার পর তালাকদাতা স্বামীর সাথে থাকা হারাম জানার পরও মহিলাটির তার সাথে থাকা, মেলামেশা করা ভয়াবহ গুনাহের কাজ হয়েছে। তার স্বামীর মাসআলাটি বাস্তবেই জানা না থাকলে, তার করণীয় ছিল বিষয়টি তাকে জানানো। প্রয়োজনে কোনো মুফতী বা ফতোয়া বিভাগের শরণাপন্ন হওয়া। এর কোনোটিই না করে নিজে জানার পরও উল্টো তার সাথে এতদিন থাকার কারণে মারাত্মক গুনাহ হয়েছে। তার ওপর জরুরি, এক্ষুনি তার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া এবং কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে তওবা-ইস্তেগফার করা।

আর এতদিনে তার তালাকের ইদ্দত শেষ হয়ে গেলেও তার স্বামী যেহেতু মাসআলা না জেনে হালাল মনে করেই তার সাথে থেকেছে, তাই এক্ষেত্রে তার থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার পর মহিলাটির আরেকটি ইদ্দত (অর্থাৎ ঋতুমতী হলে পূর্ণ তিনটি ঋতুস্রাব আর অন্তঃসত্ত্বা হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত সময়) অতিবাহিত হওয়া জরুরি। এই ইদ্দত শেষ হওয়ার পর মহিলাটি চাইলে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এর আগে তার জন্য অন্য কারও সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে না।

আলমুহীতুল বুরহানী ৫/২৩৩; আলইয়ানাবী‘ ২/১৬৮; আলমুজতাবা, যাহেদী ৪/২৫২; আলগায়া, সারুজী ১৩/২৯৪; আলবাহরুর রায়েক ৪/১৪৬; আদ্দুররুল মুখতার ৩/৫২২

শেয়ার লিংক

মাওলানা খাইরুল আলম - কালিয়াকৈর, গাজীপুর

৬৯৫২. প্রশ্ন

একটা গাড়ি ঠাকুরগাঁও থেকে ছেড়ে এসেছে। শেষ গন্তব্য গাবতলী। গাড়িটা যেহেতু কোম্পানিভুক্ত। তাই সিট আগে থেকে বুকিং হয়ে যায়। গাবতলী আসা পর্যন্ত নানা জায়গায় যাত্রীরা নেমে যান। তাতে অনেকগুলো সিট খালি হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, চন্দ্রা থেকে গাবতলী যাওয়ার জন্য সেই ফাঁকা সিটগুলোতে হেলপাররা যাত্রী ওঠায়। তাদের কাছ থেকে এক শ টাকা করে ভাড়া নেয়। এই টাকাগুলো সুপারভাইজার, হেলপার ও ড্রাইভারের পকেটে যায়। আমি অনেকবার সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি। তারাও নিশ্চিত করেছেন যে, এটা নিজেদের খরচ হিসেবে রাখেন।

এখন আমার জানার বিষয় হল, নিশ্চিতভাবে একথা জানার পরও যে, উক্ত ভাড়াগুলো সুপারভাইজার নিয়ে নেবে; কোম্পানির ফান্ডে যাবে না। এক্ষেত্রে কি আমরা দায়িত্বমুক্ত হব?

এছাড়া অনেক সময় গাড়িতে সিট খালি থাকে না। তা সত্ত্বেও হেলপাররা যাত্রী উঠিয়ে গাড়ির এখানে-ওখানে নানা জায়গায় বসিয়ে গন্তব্যে নিয়ে যান। তাদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে নিজেদের পকেটে রাখেন। সেক্ষেত্রেও কি যাত্রীরা দায়িত্বমুক্ত হবে?

উক্ত মাসআলাটি জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

যেসব পরিবহণে মালিকপক্ষ থেকে লোকাল যাত্রী বা টিকিটবিহীন যাত্রী ওঠানো নিষেধ, সেসব পরিবহণের গাড়িতে হেলপার, সুপারভাইজার, চালক কারও জন্যই লোকাল বা টিকিটবিহীন যাত্রী ওঠানো জায়েয নয়। নিয়ম অমান্য করে কখনও লোকাল যাত্রী ওঠালেও তাদের থেকে প্রাপ্ত ভাড়া নিজেদের ভোগ করা বৈধ হবে না। কেননা এ টাকার মালিক তারা নয়; বরং এ টাকার মালিক গাড়ির মালিকপক্ষ। তাই এ টাকা তাদেরকে ফেরত দেওয়া জরুরি। স্বল্প দূরত্বের জন্যও লোকাল যাত্রী ওঠানো এবং ওই ভাড়া নিজেরা নিতে চাইলে মালিকপক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অনুমতি নিতে হবে।

সুতরাং যেসব পরিবহণের ক্ষেত্রে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানা থাকবে, কোনো লোকাল যাত্রীর জন্য জেনেশুনে তাতে বিনা টিকিটে আরোহণ করা বৈধ হবে না। কেননা এতে সে গুনাহের কাজে চালক ও হেলপারকে সরাসরি সহযোগিতা করছে। শুধু তাই নয়, বিরতিহীন গাড়িতে এভাবে লোকাল যাত্রী ওঠানোর কারণে বেশি ভাড়া দিয়ে চলাচল করা দূর গন্তব্যের যাত্রীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবশ্য কোনো যাত্রীর যদি বিষয়টি জানা না থাকে, তবে সেক্ষেত্রে তার অন্যায় হবে না।

ফাতাওয়া খানিয়া ২/৩০২; আলমুহীতুল বুরহানী ১১/২৭৬; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৫/৩০; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়া, মাদ্দাহ ৪২২, ৫৯৬; দুরারুল হুক্কাম ২/২৩৬

শেয়ার লিংক

সাইফুল ইসলাম - শনির আখড়া, ঢাকা

৬৯৫৩. প্রশ্ন

ঢাকা শহরের অনেক এলাকায় এভাবে বাসা ভাড়া চুক্তি করা হয় যে, বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেয়। যা বাবদ বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার নির্দিষ্ট কয়েক বছরের ভাড়া মওকুফ করে দেয়। শুধু সার্ভিস চার্জ দেওয়া বাধ্যতামূলক থাকে। যেমন, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিল ইত্যাদি। বাড়িওয়ালা এই টাকা ব্যবসায় খাটায় এবং চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদ পার হওয়ার পর টাকা ফেরত দিলে বাসা ভাড়া প্রযোজ্য হয়।

এখন আমার প্রশ্ন হল, এভাবে বাসা ভাড়া চুক্তি করা জায়েয আছে কি না? দয়া করে জানালে উপকৃত হতাম।

উত্তর

বাসা ভাড়ার উক্ত পদ্ধতিটি বৈধ নয়। এটি মূলত বাসা ভাড়া নয়; বরং সুদি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। কেননা এ টাকাগুলো যেহেতু নির্ধারিত মেয়াদের পর পুরো টাকাই প্রদানকারীকে ফেরত দেবে, তাই এটি বাসার ভাড়া নয়; ঋণের অন্তর্ভুক্ত। তাই এক্ষেত্রে টাকা প্রদানকারী ঋণদাতা আর বাসার মালিক ঋণগ্রহীতা। এই ঋণের বিনিময়ে বাসার মালিক ঋণদাতাকে তার বাসায় বিনা ভাড়ায় থাকতে দিচ্ছে। সুতরাং এটি ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান। যা সুদের অন্তর্ভুক্ত।

মনে রাখা দরকার, ঋণের বিনিময়ে সুদ অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের মাধ্যমেও হতে পারে, আবার অতিরিক্ত না দিয়ে এভাবে অতিরিক্ত সার্ভিস প্রদানের মাধ্যমেও হতে পারে। সবই সুদের অন্তর্ভুক্ত ও হারাম।

মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহ. বর্ণনা করেন

 ذُكِرَ لاِبْنِ مَسْعُودٍ أن رَجُلاً أَقْرَضَ رَجُلاً دَرَاهِم، وَاشْتَرَطَ ظَهْرَ فَرَسِهِ، قَالَ: مَا أَصَابَ مِنْ ظَهْرِ فَرَسِهِ، فَهُوَ رِبًا.

এক লোক একজনকে ঋণ দিয়ে এ শর্ত আরোপ করে যে, সে ঋণগ্রহীতার ঘোড়ায় আরোহণ করবে। এ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এর জবাবে বলেন, ঋণের বিনিময়ে সে যে ঋণগ্রহীতার ঘোড়ায় আরোহণ করেছে, তা সুদ হয়েছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২১০৬৮)

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, হাকাম রাহ. বর্ণনা করেন, ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেছেন

كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً فَهُوَ رِبًا.

ঋণ দিয়ে এর বিনিময়ে ঋণগ্রহীতা থেকে কোনো সুবিধা গ্রহণ করাই সুদ। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২১০৭৮)

সুতরাং প্রশ্নোক্ত পদ্ধতি থেকে বিরত থাকা জরুরি।

উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা যদি ভাড়াটিয়া থেকে এক মুঠে মোটা অঙ্কের অর্থ বৈধ পন্থায় নিতে চায়, তাহলে এ পন্থা অবলম্বন করতে পারে যে, বাড়িওয়ালা তার বাসা বা ফ্ল্যাট দীর্ঘ মেয়াদের জন্য যেমন ৫/১০ বছরের জন্য ভাড়া দেবে এবং পূর্ণ মেয়াদের অগ্রিম ভাড়া ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম এককালীন নিয়ে নেবে। এক্ষেত্রে পরবর্তীতে কোনো কারণে যদি মধ্য মেয়াদে এ চুক্তি বাতিল হয়ে যায়, তাহলে বাকি মেয়াদের অগ্রিম ভাড়ার টাকা ভাড়াটিয়াকে ফেরত দিয়ে দেবে।

কিতাবুল আছল ৩/২৫; বাদায়েউস সানায়ে ৬/৫১৮; আলমুহীতুল বুরহানী ২৩/২১০; আদ্দুররুল মুখতার ৫/১৬৬; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, মাদ্দাহ ৪৬৮

শেয়ার লিংক

তাসরীফ আকন্দ - জামালপুর সদর

৬৯৫৪. প্রশ্ন

বর্তমানে আমি একটা কোম্পানিতে Network Engineer (NOC) হিসেবে কর্মরত আছি এবং পড়াশোনা করছি কম্পিউটার সাইন্স ডিপার্টমেন্টে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, পড়াশোনা শেষ হলে আমি Cybersecurity Engineer হিসেবে জব করতে চাই। Cybersecurity sector -এ জবের ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যাংক, ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানিতে বেশি নিয়োগ দিয়ে থাকে। এখন যদি আমি ব্যাংকে Cybersecurity (Soc) Engineer হিসেবে জব করি এটা কি হালাল হবে? এই কাজের সাথে তো সুদি লেনদেনের কোনো সম্পর্ক নেই; বরং কাজ হল শুধু টেকনিক্যাল সিস্টেম দেখাশুনা করা।

আশা করি, সঠিক সমাধান জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন।

উত্তর

সাইবার সিকিউরিটির মূল কাজ বৈধ হলেও সাইবার সিকিউরিটির ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ব্যাংকে চাকরি করা জায়েয হবে না। কেননা আপনার ওই সেক্টরের সাথে ব্যাংকের সুদি লেনদেনের সম্পৃক্ততা না থাকলেও আপনার বেতন-ভাতা ব্যাংকের উপার্জন থেকেই আসবে। আর ব্যাংকের উপার্জন ও আয় সুদের ওপর নির্ভরশীল।

কোনো চাকরি বা কাজ বৈধ হওয়ার জন্য কেবল মূল কাজটি বৈধ হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং কাজের পারিশ্রমিকও হালাল খাত থেকে আসা জরুরি। তাই সুদী লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ততা নেই, এমন চাকরিও ব্যাংকের অধীনে করা জায়েয নয়।

উয়ূনুল মাসায়িল, পৃ. ২২০; আলমুলতাকাত, পৃ. ২৬৮; আয্যাখীরাতুল বুরহানিয়া ৭/৩৩০; গমযু উয়ূনিল বাসায়ির ১/৩৪৫; রদ্দুল মুহতার ৫/৯৮; তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম ১/৬১৯

শেয়ার লিংক

এম এ লতিফ - হালিশহর, চট্টগ্রাম

৬৯৫৫. প্রশ্ন

আমি একটি অয়েল ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে চাকরি করি। কোম্পানির প্রধান ব্যবসা হল, লুব অয়েল, এলপিজি পেট্রোলিয়াম অয়েল (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ইত্যাদি) বিক্রয়। কোম্পানির লাভ তেল বিক্রয়, সুদ-ভিত্তিক ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (FDR)-এর সুদ এবং অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে আসে।

প্রতি বছর কোম্পানিটি বার্ষিক করপূর্ব মুনাফা থেকে প্রত্যেক কর্মচারীকে ওয়ার্কার প্রফিট পার্টিসিপেশন (WPPF) হিসেবে ৫% প্রফিট বোনাস দেয়। প্রত্যেক কর্মচারী নিয়মিত বেতন-ভাতা ছাড়াই একই পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকে। বাৎসরিক প্রফিট বোনাস দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও শ্রমিক ৫%-এ বাৎসরিক কত টাকা পাবে, তা নির্ধারিত নয়; বরং কোম্পানির নিট প্রফিট হলেই প্রফিট বোনাস পাবে। কিন্তু লোকসান হলে কিছু পাবে না।

জানার বিষয় হল, এরকম মিশ্র মুনাফার ক্ষেত্রে একজন কর্মচারীর জন্য ৫% প্রফিট বোনাস গ্রহণের কী হুকুম? পুরো ৫% বোনাস কি হালাল আয় হিসেবে গণ্য হবে, নাকি সুদের আয় থেকে আসা বোনাসের অংশ হারাম হিসেবে বিবেচিত হবে? দয়া করে জানাবেন।

উত্তর

প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী কোম্পানিটির প্রফিটে যেহেতু নিশ্চিতভাবে ব্যাংকের স্থায়ী আমানত তথা FDR এর সুদের টাকাও অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাই উক্ত প্রফিট থেকে কোম্পানি কর্মচারীদের ‘ওয়ারকার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড’ (WPPF) নামে যে ৫% প্রফিট বোনাস দেয়, তাতে সুদের একটি অংশ থাকা নিশ্চিত বিষয়। তাই প্রফিট বোনাস হিসেবে প্রাপ্ত ৫% এর পুরোটা কর্মচারীদের জন্য বৈধ গণ্য হবে না; বরং উক্ত টাকা থেকে সুদের অংশ পরিমাণ দরিদ্রদের সদকা করে দিতে হবে। আর কর্মচারীর নিজের অংশে FDR থেকে কত টাকা সুদ এল, তা নির্ধারণের জন্য কোম্পানির ব্যালেন্স শিটের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে অনুমান করে একটি অংশ সদকা করবে।

ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৪০০; আয্যাখীরাতুল বুরহানিয়া ৭/৩২৯; তাবয়ীনুল হাকায়েক ৭/৬০; আলআশবাহ ওয়ান নাযায়ের, পৃ. ৩৪৪; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩৮৫; রদ্দুল মুহতার ৫/৯৮, ৬/৩৮৫

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ আরিফুল ইসলাম - সাউথ আফ্রিকা

৬৯৫৬. প্রশ্ন

যদি কোনো ক্রেতা দরদাম করে পণ্য কেনার পর বিক্রেতাকে বলে ভাউচার বা রশিদ বইয়ে ওই পণ্যের মূল্য ক্রয়কৃত মূল্যের চেয়ে বাড়িয়ে লিখতে এবং বিক্রেতাও সে অনুযায়ী রশিদ করে, তবে উক্ত ক্রয়-বিক্রয় কি হালাল হবে এবং এখান থেকে বিক্রেতার যে আয় হল, তা কি হালাল হবে?

উল্লেখ্য, এখানে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা বিদ্যমান। সুতরাং কোনো বিক্রেতাই তার ক্রেতা হারাতে চান না।

উত্তর

এভাবে বাস্তব মূল্য থেকে বাড়িয়ে ভাউচার করা সুস্পষ্ট মিথ্যা। এ মিথ্যার জন্য ক্রেতা ও দোকানদার উভয়ে গুনাহগার হবে। এছাড়া এ কাজ সাধারণত করে থাকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্রয়প্রতিনিধিরা। তারা এভাবে মিথ্যা ভাউচার দেখিয়ে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে (ভাউচারে উল্লিখিত মূল্য এবং প্রকৃত মূল্যের) মাঝের অর্থটা ভোগ করে থাকে। যা সুস্পষ্ট হারাম ও কবীরা গুনাহ; অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার শামিল।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوْا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ.

হে ঈমানদারগণ, তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। সূরা নিসা (০৪) : ২৯

আর বিক্রেতার জন্য ক্রেতাকে এ ধরনের মিথ্যা ভাউচার তৈরি করে দেওয়া মানে ওই হারাম কাজে সরাসরি সহযোগিতা।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوٰى وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ.

তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা কর। গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে একে অন্যের সহযোগিতা করো না। সূরা মায়িদা (০৫) : ০২

তাই প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কথা বলে এ ধরনের মিথ্যা ভাউচার তৈরি করে দেওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। এ ধরনের আবদার রক্ষা করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রকৃত মূল্যই মেমোতে লিখতে হবে।

উল্লেখ্য, বেচাকেনার শরীয়ত নির্দেশিত যাবতীয় শর্ত পাওয়া গেলে বিক্রীত পণ্যের মূল্য হালাল হয়ে যাবে।

তাফসীরে তাবারী ৬/৫১০; আহকামুল কুরআন, জাস্সাস ৩/১৬০, ২৪১; তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/৭; আলহিদায়া ৩/৬৭; যাদুল ফুকাহা ১/৩৫৫; আলজাওহারাতুন নায়্যিরা ১/২৬৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৪২৭

শেয়ার লিংক

মাকসুদ - নোয়াখালী

৬৯৫৭. প্রশ্ন

আমার কিছু হাঁস ছিল। এর মধ্য থেকে একটি হাঁস শিয়াল ধরে নিয়ে যায়। আনুমানিক তিন ঘণ্টা পর এক বাগানে গিয়ে দেখি, শিয়াল হাঁসের মাথাসহ গলা পর্যন্ত খেয়ে বাকি অংশ ফেলে গেছে। এরপর আমি সেটা জবাই না করে বাসায় এনে রান্না করে খেয়ে ফেলি।

আমার জানার বিষয় হল, হাঁসটি খাওয়া কি আমার জন্য ঠিক হয়েছে?

উত্তর

না, ওই হাঁসটি খাওয়া আপনাদের জন্য হালাল হয়নি। কেননা পশু-পাখির গোশত হালাল হওয়ার জন্য জীবিত থাকা অবস্থায় ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে তা জবাই করা শর্ত। এভাবে অন্য কোনো প্রাণী কোনো পশু-পাখির গলা কেটে ফেললে তা হালাল হয়ে যায় না; বরং তাও হারাম।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيْرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهٖ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوْذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ.

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশত, সেই জন্তু, যার ওপর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নাম উচ্চারণ করা হয়েছে এবং (হারাম করা হয়েছে) শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, ওপর থেকে পতনে মৃত জন্তু, অন্য পশুর শিংয়ের আঘাতে মৃত জন্তু, হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তু। তবে যা তোমরা (মরার আগে) জবাই করতে পেরেছ (তা হারাম নয়)। সূরা মায়িদা (০৫) : ০৩

>تفسير القرآن الكريم< لابن كثير /২২ : وقوله: {وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ} أي: ما عدا عليها أسد أو فهد، أو نمر أو ذئب أو كلب، فأكل بعضها فماتت بذلك، فهي حرام وإن كان قد سال منها الدماء، ولو من مذبحها، فلا تحل بالإجماع.

আহকামুল কুরআন, জাস্সাস ৩/৩০৫; কিতাবুল আছল ৫/৪০৩; শরহু মুখতাসারিল কারখী, কুদূরী ৬/২৭৯; বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৫৭; আদ্দুররুল মুখতার ৬/২৯৪

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ লতিফুর রহমান - দাউদকান্দি, কুমিল্লা

৬৯৫৮. প্রশ্ন

আমি একটি সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের সময় আমি সরকার থেকে বেশ ভালো পরিমাণ টাকা পেয়েছি।

আমি চাচ্ছি, এ টাকাগুলো আমার জীবদ্দশায়ই সন্তানদের মাঝে বণ্টন করে দেব। যেন তারা নিজ নিজ প্রয়োজনে এ টাকা কাজে লাগাতে পারে। তবে আমার স্থাবর-অস্থাবর অন্যান্য সম্পত্তি যেগুলো আছে, সেগুলো আমার মৃত্যুর পর মিরাস অনুযায়ীই বণ্টণ হবে। আমার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে আছে।

জানার বিষয় হল

ক. আমি এ টাকাগুলো সন্তানদের মাঝে কীভাবে বণ্টন করব? মিরাস অনুযায়ী মেয়েকে কি ছেলের অর্ধেক দিতে হবে?

খ. আমার পাঁচ ছেলেমেয়ের চারজনই আল্লাহর রহমতে সচ্ছল, তবে ছোট ছেলে এখনও পড়াশোনা করছে। অন্যদের তুলনায় তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নেই বললেই চলে। তাই আমি চাচ্ছি, তাকে অন্যদের তুলনায় কিছু বেশি দেব। এক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় তাকে বেশি দেওয়ার সুযোগ আছে কি না? এতে কি আমি গুনাহগার হব?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ওই টাকাগুলোর আপনিই মালিক। এখন যদি আপনি সন্তানদের দিয়ে দিতে চান, তাহলে ইচ্ছা করলে তাদেরকে সমানভাবেও বণ্টন করে দিতে পারেন। আবার বিশেষ কারণে তাদের মাঝে কম-বেশিও করতে পারেন। যেমন আপনি প্রশ্নে বলেছেন, অন্যদের তুলনায় আপনার ছোট ছেলে অসচ্ছল; এখনও পড়াশোনা করছে। সেক্ষেত্রে তাকে কিছু সম্পদ বাড়িয়েও দিতে পারেন। এতে শরয়ী কোনো সমস্যা নেই।

ফাতাওয়া খানিয়া ৩/২৭৯; আয্যাখীরাতুল বুরহানিয়া ৯/১৩৩; বাদায়েউস সানায়ে ৫/১৮২; ফাতহুল বারী ৫/২৫৩; আলবাহরুর রায়েক ৭/২৮৮; আদ্দুররুল মুখতার ৫/৬৯৬

শেয়ার লিংক

এইচ. এম. হাসান আহমাদ - আলালপুর, নবাবগঞ্জ, ঢাকা

৬৯৫৯. প্রশ্ন

আমার একটি প্রিন্টিং প্রেসের দোকান আছে। অনেক সময় বিভিন্নজন মানুষ বা জীবজন্তুর ছবিসহ মগ, পোস্টার, ভিজিটিং কার্ড, ফেস্টুন ও টি-শার্ট বানাতে আসে। অনুরূপভাবে ছবিসহ নির্বাচনের পোস্টার ছাপাতে আসে।

জানার বিষয় হল, এ ব্যাপারে শরীয়তের বিধান কী? আমি কি তা বানিয়ে দিতে পারি?

উত্তর

প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা, ছাপানো, প্রিন্ট করা বৈধ নয়। হাদীস শরীফে ছবি অঙ্কনকারীর ওপর কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন

إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللهِ يَوْمَ القِيَامَةِ المُصَوِّرُونَ.

কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে তাদের, যারা (প্রাণীর) ছবি তৈরি করে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৫০)

অপর এক হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন

إِنَّ الَّذِيْنَ يَصْنَعُوْنَ هٰذِهِ الصُّوَرَ يُعَذَّبُوْنَ يَوْمَ القِيَامَةِ، يُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوْا مَا خَلَقْتُمْ.

যারা এজাতীয় (প্রাণীর) ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যা বানিয়েছিলে, তাতে জীবন দাও। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৫১)

কোনো কিছুতে মানুষ ও জীবজন্তর ছবি ছাপানো ও প্রিন্ট করাও এই নিষিদ্ধ ‘তাসবীর’ (ছবি)-এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং মগ, পোস্টার, ফেস্টুন, ভিজিটিং কার্ড, টি-শার্ট বা অন্য কিছুতে জীবজন্তুর ছবি প্রিন্ট করে দেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয। তাই আপনার জন্য এ ধরনের অর্ডার নেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। তবে জীবজন্তুর ছবিমুক্ত অর্ডার নিতে এবং তা প্রস্তুত করে দিতে অসুবিধা নেই।

উল্লেখ্য, আইনগত প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে যেমন, আইডি কার্ড, পাসপোর্ট এবং এজাতীয় একান্ত প্রয়োজনীয় ছবি তোলা জায়েয আছে।

আলমাবসূত, সারাখসী ১/২১০, ১৬/৩৭; শরহু সহীহ মুসলিম, নববী ১৪/৮১; বাদায়েউস সানায়ে ১/৩০৪, ৪/৩৯; শরহুস সিয়ারিল কাবীর ৪/২১৮; আলবাহরুর রায়েক ২/২৭; মিরকাতুল মাফাতিহ ৮/৩২৩

শেয়ার লিংক