মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান - বীরগঞ্জ, দিনাজপুর

৫১৮৪. প্রশ্ন

আমাদের মসজিদ-মাদরাসা কমপ্লেক্সটি দশ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন। ভবনটি নির্মাণের পূর্বেই মুতাওয়াল্লী সাহেবসহ মসজিদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ভবনটির দ্বিতীয় তলা স্থায়ীভাবে মসজিদ হবে এবং প্রয়োজনের সময় তাতে মাদরাসার কার্যক্রমও পরিচালিত হবে। যেমন, এখানে মাদরাসার পরীক্ষা ও বিভিন্ন জলসা অনুষ্ঠিত হওয়া ইত্যাদি। আমার জানার বিষয় হচ্ছে, এ মসজিদে ইতিকাফ করা যাবে কি না?

উল্লেখ্য, এ তলাটিতে বর্তমানে জুমার নামাযসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া হচ্ছে এবং তাতে সর্বসাধারণের উন্মুক্ত অংশগ্রহণও রয়েছে।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত বর্ণনামতে ভবনটির দ্বিতীয় তলা স্থায়ীভাবে মসজিদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। তাই এটি শরয়ী মসজিদ হিসাবে গণ্য হবে এবং তাতে ইতিকাফ করাও সহীহ হবে। যদিও নিয়ম হচ্ছে, একটি ভবনের উপর-নীচ পুরোটাই মসজিদ বানানো। তথাপি জায়গা সংকটের কারণে ভবনের এক-দুই তলা মসজিদের জন্য স্থায়ীভাবে বরাদ্দ করলে তাও শরয়ী মসজিদ হয়ে যায় এবং তাতে মসজিদের যাবতীয় বিধি-বিধানও প্রযোজ্য হয়।

উল্লেখ্য, দ্বিতীয় তলাটি যেহেতু মসজিদ, তাই এখানে মসজিদের পূর্ণ আদব বজায় রাখতে হবে। মসজিদের আদব ক্ষুণœ হয় এমন সকল কার্যক্রম থেকে বিরত থকতে হবে। প্রয়োজনে মাদরাসার সাময়িক কার্যক্রম যেমন, পরীক্ষা ইত্যাদি তাতে পরিচালনা করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সকলে মসজিদের আদব রক্ষা করে চলবে।

-ফাতাহুল কাদীর ৪/৪৪৫; আলমুহীতুল বুরহানী ৯/১২৬; আলইসআফ, পৃ. ১২৬

শেয়ার লিংক

হুমায়ুন কবীর - মানিকনগর, ঢাকা

৫১৮৩. প্রশ্ন

আমি এক মাদরাসায় তাদরীসের পাশাপাশি ছোট একটা ব্যবসাও করি। পরিবারের প্রয়োজনে খরচ করার পর বছরের শেষে স্বাধারণত আমার কাছে ১০-১৫ হাজার টাকা বেঁচে থাকে। এ ছাড়া আমার আর কোনো সম্পদ নেই। তবে আমার সংগ্রহে আরবী, উর্দূ ও বাংলা মিলিয়ে বেশকিছু কিতাব আছে। যার ক্রয়মূল্য প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা।

আমার জানার বিষয় হল, উক্ত কিতাবগুলোর কারণে কি আমার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে?

উত্তর

আপনার উপর যাকাত ফরয নয়। আর আপনার সংগ্রহে যে কিতাবাদি আছে তা যেহেতু আপনার পড়াশোনার জন্য; ব্যবসার জন্য নয়, তাই এর উপরও যাকাত ফরয নয়।

-আলফাতাওয়া মিন আকাবীলিল মাশায়িখ, সামারকান্দি, পৃ. ১০৯; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৪০; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ২/৩৩৫; ফাতাওয়া সিরাজিয়া, পৃ. ১৫৫; রদ্দুল মুহতার ২/২৬৫

শেয়ার লিংক

সরওয়ার হোসাইন - মহাখালী, ঢাকা

৫১৮২. প্রশ্ন

আলহামদু লিল্লাহ! আল্লাহ তাআলা আমাকে বেশ কিছু সম্পদ দান করেছেন। আমি প্রতি বছর রমযানের শুরুতে এই সম্পদের যাকাত আদায় করি। আমার একজন দ্বীনদার ব্যবসায়ী বন্ধু প্রায় ৩ বছর আগে আমার কাছ থেকে ৩ বছর মেয়াদে ৫ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ৩ বছর পর এই রমযানের মাস খানেক আগে তিনি সেই টাকা পরিশোধ করেছেন।

মুফতী সাহেবের কাছে আমার জানার বিষয় হল, এই পাঁচ লক্ষ টাকা তো গত তিন বছর আমার কাছে ছিল না, এখন এই বছর কি আমাকে অন্যান্য সম্পদের সাথে এই টাকারও যাকাত আদায় করতে হবে?

উত্তর

হাঁ, আপনাকে এই বছর অন্যান্য সম্পদের সাথে এই পাঁচ লক্ষ টাকারও যাকাত আদায় করতে হবে। কেননা, তা আপনার হাতে না থাকলেও আপনি এ টাকার মালিক ছিলেন। এবং তা পাওয়ার আশাও ছিল, তাই আপনাকে বিগত বছরগুলোসহ চলতি বছরের যাকাতও দিতে হবে।

-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১০৩৪৬, ১০৩৫৬; কিতাবুল আছল ২/৯৭; আলমাবসূত, সারাখসী ২/১৯৫; বাদায়েউস সানায়ে ২/৯০; ফাতহুল কাদীর ২/১২৩; আলবাহরুর রায়েক ২/৩৬৩

শেয়ার লিংক

কাসীর বিন খলীল - মালিবাগ, ঢাকা

৫১৮১. প্রশ্ন

গত রমযানে সকালে জরুরি এক কাজে দেশের বাড়ি পাবনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। দুপুর ১টার দিকে যখন গাড়ি সিরাজগঞ্জে হোটেলে বিরতি দিল। তখন মাথায় চিন্তা আসল যে, আমি তো এখন মুসাফির। আর সফর অবস্থায় তো  রোযা না রাখারও অনুমতি রয়েছে। কিছুটা ক্লান্তিও লাগছিল। তাই বিষয়টি চিন্তা করে রোযা ভেঙে ফেললাম। পাবনায় পৌঁছার পর যখন আমার মামাকে উক্ত ঘটনা শোনালাম। তখন তিনি বললেন, রোযা রাখার পর তা ভেঙে ফেলা জায়েয নেই। এখন তোমাকে উক্ত রোযার কাযা-কাফফারা উভয়টিই আদায় করতে হবে। তার এই কথা শোনার পর থেকে আমি বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত। তাই এখন হুজুরের কাছে জানতে চাচ্ছি যে, আসলে সেই রোযার জরিমানাস্বরূপ এখন আমার করণীয় কী?

উত্তর

সফর অবস্থায় রোযা না রেখে পরে তা কাযা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু রোযা রেখে দিলে শুধু সফরের ওজরের কারণে তা ভেঙে ফেলা জায়েয হয়ে যায় না। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার জন্য উক্ত রোযা ভেঙে ফেলা ঠিক হয়নি। এখন উক্ত রোযার কাযা করে নিতে হবে। কাফফারা লাগবে না। এক্ষেত্রে কাফফারা লাগার কথা ঠিক নয়।

-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ৭৭৬৬; আলমাবসূত, সারাখসী ৩/৬৮; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৫৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৫৮; ফাতহুল কাদীর ২/২৮৪; রদ্দুল মুহতার ২/৪৩১

শেয়ার লিংক

হাবীবুর রাহমান - জকিগঞ্জ, সিলেট

৫১৮০. প্রশ্ন

আমাদের বাসায় স্বাভাবিকভাবে রমযানে সকলেই মসজিদের আযানের পরই ইফতার করি। কিন্তু আমার দাদা সাধারণত আযানের অপেক্ষা  করেন না। ঘড়িতে ইফতারের নির্ধারিত সময় হলেই ইফতার শুরু করে দেন। গত রমযানে একদিন বরাবরের মতই তিনি ঘড়িতে ইফতারের সময় হয়ে যাওয়ায় ইফতার করে নেন। কিন্তু পরে জানা যায় যে সেদিন দুর্ঘটনাক্রমে ঘড়ি প্রায় ১২ মিনিট ফাস্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে ভুলে তিনি ইফতারের সময় হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগেই ইফতার করে নিয়েছেন।

এখন মুহতারামের কাছে জানার বিষয় হল, দাদার সেই রোযা কি ভেঙে গিয়েছিল? ভেঙে গিয়ে থাকলে এখন তার করণীয় কী?

উত্তর

সময়ের আগে খেয়ে নেওয়ার কারণে আপনার দাদার উক্ত রোযা ভেঙে গেছে। অবশ্য ইফতারের সময় হয়ে গেছে ভেবে ভুলে খেয়ে ফেলেছেন বিধায় তাকে ঐ রোযার শুধু কাযা করে নিতে হবে, কাফফারা লাগবে না।

عَنْ عَلِيِّ بْنِ حَنْظَلَةَ عَنْ أَبِيهِ، قَالَ : شَهِدْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطّابِ فِي رَمَضَانَ، وَقُرِّبَ إلَيْهِ شَرَابٌ ، فَشَرِبَ بَعْضُ الْقَوْمِ وَهُمْ يَرَوْنَ أَنّ الشّمْسَ قَدْ غَرَبَتْ، ثُمّ ارْتَقَى الْمُؤَذِّنُ، فَقَالَ : يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، وَاللهِ لَلشّمْسُ طَالِعَةٌ لَمْ تَغْرُبْ، فَقَالَ عُمَرُ : مَنَعَنَا اللهُ مِنْ شَرِّكَ مَرّتَيْنِ، أَوْ ثَلاَثَةً، يَا هَؤُلاَءِ، مَنْ كَانَ أَفْطَرَ فَلْيَصُمْ يَوْمًا مَكَانَ يَوْمٍ، وَمَنْ لَمْ يَكُنْ أَفْطَرَ فَلْيُتِمّ حَتّى تَغْرُبَ الشّمْسُ.

আলী ইবনে হানযালা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রোযার মাসে ওমর রা.-এর নিকট ছিলেন। তার নিকট পানীয় পেশ করা হল। উপস্থিতদের কেউ কেউ সূর্য ডুবে গেছে ভেবে তা পান করে ফেলল। এরপর ময়াযযিন আওয়াজ দিল, হে আমীরুল মুমিনীন! সূর্য এখনো ডোবেনি। তখন ওমর রা. বললেন, ...‘যারা ইফতারি করে ফেলেছে তারা একটি রোযা কাযা করবে। আর যারা ইফতারি করেনি তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৯১৩৮)

-কিতাবুল আছল ২/১৪৫; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৫৬; আলহাবিল কুদসী ১/৩১৫; ফাতাওয়া বায্যাযিয়া ৪/১০০; আলবাহরুর রায়েক ২/২৯১

শেয়ার লিংক

জাবের মাহমুদ - ভোলা

৫১৭৯. প্রশ্ন

কয়েকদিন আগে আমাদের এলাকার চেয়ারম্যান মৃত্যুবরণ করেন। একটি হাইস্কুল মাঠে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। দূরাগত অনেক লোক যারা অযু করে আসেনি। অযুর অপেক্ষায় হাইস্কুলের টিউবওয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। জামাত শুরু হওয়ার পূর্বমুহূর্তে দেখলাম, তাদের অনেকেই তায়াম্মুম করে দ্রæত কাতারে দাঁড়িয়ে গেল।

জানার বিষয় হল, তাদের তায়াম্মুম করা কি ঠিক হয়েছে? পানি থাকতে তায়াম্মুম করলে কি নামায হয়?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে তাদের জন্য তায়াম্মুম করে জানাযায় শরীক হওয়া ঠিক হয়েছে। কারণ, অযু করতে গেলে যদি জানাযার জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে তায়াম্মুম করে জামাতে শরীক হওয়া জায়েয আছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন-

إذَا خِفْتَ أَنْ تَفُوتَكَ الْجنَازَةُ وَأَنْتَ عَلَى غَيْرِ وُضُوءٍ فَتَيَمّمْ وَصَلِّ.

তোমার যদি অযু না থাকে এবং অযু করতে গেলে জানাযা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা হয় তাহলে তায়াম্মুম করে জানাযা নামায পড়ে নিবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১১৫৮৭)

-কিতাবুল আছার, ইমাম আবু ইউসুফ, বর্ণনা ৩৯৫; খিযানাতুল আকমাল ১/৪০; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৪২; আলবাহরুর রায়েক ১/১৫৭; ফাতাওয়াল ওয়ালওয়ালিজিয়া ১/৬৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৩১

শেয়ার লিংক

মুস্তাফিজুর রহমান - বুয়েট, ঢাকা

৫১৭৮. প্রশ্ন

কিছুদিন আগে আমাদের সুযোগ হয়েছিল দশ দিনের জন্য তাবলীগের সফরে বের হওয়ার। আমাদের রোখ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানায় ছিল। সেখানে গিয়ে আমরা একাকী নামায পড়লে কসর করতাম এবং নামাযের আগে পরের সুন্নাতগুলোও গুরুত্বের সাথে আদায় করছিলাম। আমাদের জামাতের আমীর সাহেব ফরয নামায কসর পড়লেও নামাযের আগে-পরের সুন্নতগুলো পড়তেন না এবং অন্যদেরকেও পড়তে নিষেধ করতেন। বলতেন যে, সফরে সুন্নাত পড়তে হয় না। আমরা যারা আগে থেকেই এই ধরনের সফরে সুন্নাত পড়ে আসছি, তার এই কথা শুনে বেশ সংশয়ে পড়ে যাই। এবং আমাদের অনেক সাথিই সুন্নাত পড়া বন্ধ করে দেয়।

এখন মুফতী সাহেবের কাছে আমি বিষয়টির সঠিক সমাধান জানতে চাচ্ছি যে, সফরে নামাযের আগে-পরের সুন্নাত আদায়ের বিধান কী?

উত্তর

সফরের যাত্রাপথে যখন গন্তব্যে পৌঁছার ব্যস্ততা ও তাড়াহুড়া থাকে তখন সুন্নাত ছেড়ে দেয়াই উত্তম। এ সময় সুন্নাতের ইহতেমাম নিজের বা সফর সঙ্গীদের পেরেশানীর কারণ হয়। আর গন্তব্যে পৌঁছার পর মসজিদে অবস্থানের সময় বা কাছাকাছি স্থানে এক মসজিদ থেকে অন্য মসজিদে যাতায়াতের সময় কোনো তাড়াহুড়া বা কষ্ট-ক্লেশ না থাকলে যথাসম্ভব নামাযের আগে-পরের সুন্নাত আদায় করে নেয়া উত্তম।

উল্লেখ্য, ফজরের পূর্বের সুন্নাতের গুরুত্ব অন্যান্য সুন্নাতের চেয়ে বেশি। তাই সর্বাবস্থায় তা আদায়ের চেষ্টা করা উচিত।

-জামে তিরমিযী, হাদীস ৫৫০; বাদায়েউস সানায়ে ১/২৬০; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ২/১৭০; শরহুল মুনয়া, পৃ. ৫৪৫; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ১/৩৭৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৩৯

শেয়ার লিংক

মিসবাহ - জয়পুরহাট

৫১৭৭. প্রশ্ন

গত রমযানে একদিন আমি তারাবীহের ইমামতি করার সময় ভুলে ২য় রাকাতের পর না বসে দাঁড়িয়ে যাই। যাথারীতি কেরাত পড়ে যখন আমি সিজদায় গেলাম তখন আমার স্মরণ হল যে, আমি তো তিন রাকাত পড়ে ফেলেছি। উপায়ান্তর না দেখে আমি আরেক রাকাত মিলিয়ে চার রাকাত পুরা করে সাহুসিজদার সাথে নামায শেষ করি। সালামের পর আমাদের ইমাম বললেন, নামায হয়নি। এই চার রাকাত আবার পড়তে হবে। তার কথামত এই চার রাকাত আবার পড়া হয়। কিন্তু পরে আরেকজন আলেমকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, নামায তো হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বার পড়ার প্রয়োজন ছিল না।

তাই আমি এখন হুজুরের কাছে জানতে চাচ্ছি যে, এখানে আসলে সঠিক বিষয়  কোন্টি? এক্ষেত্রে নামায আদায়ের সঠিক পদ্ধতি কী?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে শেষ দুই রাকাত তারাবীহ হিসেবে গণ্য হয়েছে। আর প্রথম দুই রাকাতের পর বৈঠক না করার কারণে উক্ত দুই রাকাত সহীহ হয়নি। সুতরাং প্রথম দুই রাকাত তারাবীহ পুনরায় আদায় করা যথাযথ হয়েছে। তবে পরের দুই রাকাত যেহেতু সহীহ হয়েছে তাই তা পুনরায় আদায় করা ঠিক হয়নি। তা নফল হিসেবে আদায় হয়েছে।

উল্লেখ্য, তারাবীহের নামাযে দুই রাকাতের পর না বসে ভুলে দাঁড়িয়ে গেলে করণীয় হল তৃতীয় রাকাতের সিজদার আগে মনে হলে বৈঠকে ফিরে আসবে এবং সাহু সিজদার সাথে নামায শেষ করবে।

-আলফাতাওয়া মিন আকাবীলিল মাশায়িখ, সামারকান্দি পৃ. ৬৫; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/৬৫; বাদায়েউস সানায়ে ১/৬৪৬; আলমুহীতুল বুরহানী ২/২৫৭; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ২/১১৬; শরহুল মুনয়া, পৃ. ৪০৮; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৫

শেয়ার লিংক

আমাতুল্লাহ উমামা - খুলনা

৫১৭৬. প্রশ্ন

আমি কুরআন মাজীদ হিফজ করেছি। দুপুর ও সন্ধ্যায় নিয়মিত তিলাওয়াত করি। কোনো কোনো সময় তিলওয়াত করা অবস্থায় আযান শুরু হয়। শুনেছি এসময় আযানের জবাব দিতে হয় না।

মুফতী সাহেবের কাছে জানার বিষয় হল, তিলাওয়াতকালে আযান শুরু হলে কি করা উচিত? তিলাওয়াত চালিয়ে যাওয়া, নাকি আযানের জবাব দেওয়া?

উত্তর

কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা অবস্থায় আযান শুরু হলে তিলাওয়াত বন্ধ রেখে আযানের জবাব দেওয়া উচিত। আযান শেষে দুআ পড়ে আবার তিলাওয়াত শুরু করবে। অবশ্য এ অবস্থায় তিলাওয়াত অব্যাহত রাখাও জায়েয।

-আলমুহীতুল বুরহানী ২/১০২; বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৮৩; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/৫০; আলবাহরুর রায়েক ১/২৫৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫৭; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাল মারাকী, পৃ. ১০৯

শেয়ার লিংক

আহসান হাবিব - আবদুল্লাহপুর

৫১৭৫. প্রশ্ন

আমাদের মসজিদ কমপ্লেক্সে একটি নূরানী মকতব আছে। মাঝে মাঝে মুয়াযযিন সাহেব না থাকলে মকতবের ছেলেরা আযান দেয়। যাদের বয়স আট থেকে দশ বছর। এসকল নাবালেগ ছেলেরা আযান দিলে কোনো অসুবিধা আছে কি না- জানানোর অনুরোধ রইল।

উত্তর

মুত্তাকী বালেগ ব্যক্তির আযান দেওয়াই উত্তম। তবে নাবালেগ বুঝমান ছেলে আযান দিলে তা আদায় হয়ে যাবে।

-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২৩৬৯; কিতাবুল আছল ১/১১৫; আলবাহরুর রায়েক ১/২৬৪; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/১৪৫; রদ্দুল মুহতার ১/৩৯১

শেয়ার লিংক

আবদুস সালাম - পঞ্চগড়

৫১৭৪. প্রশ্ন

আমাদের উত্তরবঙ্গে মিশনারীদের তৎপরতা অত্যধিক বেশি। খ্রিষ্টান মিশনারীরা নানা কৌশলে মানুষকে প্ররোচিত করছে। তারা সরলমনা মুসলমানদেরকে প্রভাবিত করতে প্রথমে তাদেরকে কুরআন পড়ে শোনায় এবং কিছু কিছু আয়াতের অনুবাদ করে তারা কুরআন থেকেই যীশুখ্রীস্টের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে।

তাদের কৌশল ও কার্যক্রম জানতে আমরা মাঝে মাঝে তাদের কথা শুনি। জানার বিষয় হল, এসব অমুসলিমদের থেকে সিজদার আয়াত শুনলে আমাদের উপর সিজদা ওয়াজিব হবে কি না?

উত্তর

অমুসলিম থেকে সিজদার আয়াত শুনলেও সিজদা ওয়াজিব হয়। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে তাদের থেকে সিজদার আয়াত শুনলে আপনাদের উপর সিজদা তিলাওয়াত ওয়াজিব হবে।

-কিতাবুল আছল ১/২৭২; আলমাবসূত, সারাখসী ২/৫; বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৯; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/১৮৪; ফাতাওয়া ওয়ালওয়ালিজিয়া ১/১৩৮; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ১/৩৬৩; আদ্দুররুল মুখতার ২/১০৭

শেয়ার লিংক

ফারিহা রহমান - খুলনা

৫১৭৩. প্রশ্ন

আমার আট মাসের বাচ্চাকে খাটের উপর ঘুমন্ত রেখে আমি খাটের পাশে আসরের নামায পড়তে দাঁড়াই। ইতিমধ্যে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বাচ্চা কাঁদতে শুরু করে এবং গড়াগড়ি করে খাটের পাশে চলে যায়। এ অবস্থা দেখে নিচে পড়ে যাওয়ার ভয়ে আমি নামায ছেড়ে দিয়ে বাচ্চাকে কোলে নিই।

জানার বিষয় হল, আমার উক্ত নামায ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হয়েছে?

উত্তর

নামায অবস্থায় কাউকে কঠিন বিপদে পড়তে দেখলে এর থেকে তাকে বাঁচাতে নামায ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি আছে। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে শিশুকে এ থেকে হেফাযতের জন্য আপনার  নামায ছেড়ে দেওয়া ঠিক হয়েছে। পরবর্তীতে ঐ নামায আবার পড়ে নিতে হবে।

-আলফাতাওয়া মিন আকাবীলিল মাশায়িখ, সামারকান্দী পৃ. ৬৯; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ১/৫২৩; ফাতাওয়া ওয়ালওয়ালিজিয়া ১/৭৭; ইমদাদুল ফাত্তাহ পৃ. ৪০৬; আদ্দুররুল মুখতার ১/৬৫৪

শেয়ার লিংক

শরীফ - কুমিল্লা

৫১৭২. প্রশ্ন

একদিন যোহরের নামাযে ইমাম সাহেব মসজিদে আসেননি। মুসল্লিদের থেকে একজন নামায পড়ালেন। তিনি ভুলক্রমে প্রথম বৈঠক না করেই তৃতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। পেছন থেকে লোকমা দিলেও তিনি বসলেন না এবং শেষে সাহু-সিজদা করে নামায শেষ করেন।

হুজুরের নিকট জানার বিষয় হল, আমাদের উক্ত নামায সহীহ হয়েছে কি না? এছাড়া ভুলক্রমে প্রথম বৈঠক না করলে করণীয় কী?

উত্তর

নামাযে প্রথম বৈঠক করা ওয়াজিব। ভুলবশত এটি না করলে সাহু-সিজদা ওয়াজিব হয়। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে সাহু-সিজদা দেওয়া ঠিক হয়েছে এবং আপনাদের নামায সহীহভাবে আদায় হয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুহায়না রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

إِنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قَامَ مِنَ اثْنَتَيْنِ مِنَ الظّهْرِ لَمْ يَجْلِسْ بَيْنَهُمَا، فَلَمّا قَضَى صَلاَتَهُ سَجَدَ سَجْدَتَيْنِ، ثُمّ سَلّمَ بَعْدَ ذَلِكَ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন যোহরের নামাযে দ্বিতীয় রাকাতে না বসে (ভুলক্রমে) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং নামায পূর্ণ করে সেজদা-সাহু করলেন, অতঃপর সালাম ফেরালেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১২২৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৭০)

-কিতাবুল আছল ১/১৯৩; বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৯৯; আলইখতিয়ার ১/২৫০; আলবাহরুর রায়েক ২/১০০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১২৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/৮৩

শেয়ার লিংক

মুনিবুর রহমান - সাতক্ষীরা

৫১৭১. প্রশ্ন

একদিন এশার নামাযে দ্বিতীয় রাকাতে বসার সময় ইমাম সাহেব কিছুটা দীর্ঘ করে তাকবীর বলেন। একারণে আমরা কয়েকজন মুক্তাদি দাঁিড়য়ে যাই। এরপর অন্যদের  দেখে আবার বসে পড়ি এবং শেষে ইমামের সাথেই সালাম ফিরাই।

জানার বিষয় হল, আমাদের উক্ত নামায হয়েছে কি না। আমাদের কি সাহু সিজদা করতে হবে?

উত্তর

আপনাদের উক্ত নামায সহীহ হয়েছে। জামাতের সাথে নামায পড়া অবস্থায় মুক্তাদির নিজস্ব ভুলের কারণে ইমাম-মুক্তাদি কারো উপরই সাহু-সিজদা ওয়াজিব হয় না। তাই ভুলে দাঁড়িয়ে গেলেও আপনাদের উপর সাহু-সিজদা ওয়াজিব হয়নি। সুতরাং ইমামের সাথে সালাম ফিরানো ঠিক হয়েছে। ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন-

إِذَا سَهَوْتَ خَلْفَ الْإمَامِ، وَحَفِظَ الْإِمَامُ، فَلَيْسَ عَلَيْكَ سَهْوٌ، وَإِنْ سَهَا وَحَفِظْتَ فَعَلَيْكَ السّهْوُ.

তুমি যদি ইমামের পেছনে ভুল কর, কিন্তু ইমাম কোন ভুল না করে তাহলে তোমার উপর সাহু সিজদা নেই। আর ইমাম ভুল করলে তোমার ভুল না হলেও (ইমামের সাথে) তোমাকে সাহু সিজদা করতে হবে। (কিতাবুল আছার, ইমাম আবু ইউসুফ, বর্ণনা ১৮৭)

-কিতাবুল আছল ১/৯৭; বাদায়েউস সানায়ে ১/৪২০; ফাতহুল কাদীর ১/৪৪৩; শরহুল মুনয়া, পৃ. ৪৬৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৪৭৮; রদ্দুল মুহতার ২/৮২

শেয়ার লিংক

মুকাররমা - মানিকগঞ্জ

৫১৭০. প্রশ্ন

আমি একটি মহিলা মাদরাসায় হিফজ বিভাগের শিক্ষিকা। মাসিক ¯্রাবের সময়ও আমাকে ছাত্রীদের তিলাওয়াত শুনতে হয়। জানার বিষয় হল, এ সময় তারা সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করলে আমার উপর সিজদা ওয়াজিব হবে কি না?

উত্তর

মাসিক ¯্রাবের সময় সিজদার আয়াত শুনলে সিজদা ওয়াজিব হয় না। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনাকে তিলাওয়াতের সিজদা আদায় করতে হবে না। হযরত ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

عَنْ إبْرَاهِيمَ أَنّهُ كَانَ يَقُولُ فِي الْحَائِضِ تَسْمَعُ السّجْدَةَ، قَالَ: لاَ تَسْجُدُ، هِيَ تَدَعُ مَا هُوَ أَعْظَمُ مِنَ السّجْدَةِ، الصّلاَة الْمَكْتُوبَةَ.

অর্থাৎ হায়েয অবস্থায় সিজদার আয়াত শুনলে সিজদা করবে না। তার তো এর চেয়ে বড় বিধান ফরয নামাযই পড়তে হয় না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৪৩৪৭)

-আলমাবসূত, সারাখসী ২/৪; বাদায়েউস সানায়ে ১/৪৩৯; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/৪৬৬; ফাতাওয়া ওয়ালওয়ালিজিয়া ১/১৩৮; রদ্দুল মুহতার ২/১০৭

শেয়ার লিংক

রিফাত - সাভার

৫১৬৯. প্রশ্ন

শীতের মৌসুমে কয়েকদিন আমি তীব্র জ¦রে আক্রান্ত ছিলাম। তায়াম্মুম করে নামায পড়তাম। একজন অত্মীয় আমাকে দেখতে এসে বললেন, ‘একবার তায়াম্মুম করে বারবার নামায পড়া যায় না। প্রতি ওয়াক্তে তায়াম্মুম করে নিও।’

জানার বিষয় হল, একবার তায়াম্মুম করে কত ওয়াক্ত নামায পড়া যায়? ইতিপূর্বে আমি এক তায়াম্মুমে (পবিত্রতা থাকা পর্যন্ত) একাধিক নামায পড়েছি। সেগুলোর কী হুকুম?

উত্তর

এক তায়াম্মুম দিয়ে কয়েক ওয়াক্ত নামায পড়াও জায়েয। সুতরাং আপনার উক্ত নামাযগুলো সহীহ হয়েছে। ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন-

إِذَا تَيَمّمَ الرّجُلُ، فَهُوَ عَلَى تَيَمّمِهِ، مَا لَمْ يَجِدِ الْمَاءَ أَوْ يُحْدِثْ.

তায়াম্মুম করার পর পানি পাওয়ার আগ পর্যন্ত (পানি না থাকার কারেণ তায়াম্মুম করে থাকলে) অথবা অযু ভঙ্গের কোনো কারণ পাওয়া যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে তায়াম্মুম অবস্থাতেই থাকবে। (কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মাদ ১/৬৬)

-আলমাবসূত, সারাখসী ১/১১৩; শরহু মুখতাসারিত তাহাবী ১/৪২৪; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ১/২১৭; আলবাহরুর রায়েক ১/১৫৬; শরহুল মুনয়া, পৃ. ৮৪

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম - নগরকান্দা, ফরিদপুর

৫১৬৮. প্রশ্ন

মুহতারাম, আমাদের গ্রামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন যাবৎ খৌরকার্যে অক্ষম অবস্থায় অসুস্থ। এখন তার কোনো স্ত্রীও বেঁচে নেই, যে তার এই খেদমতটুকু করে দেবে। আর সে নিজেও সম্পাদনা করতে অক্ষম। এখন মুফতী সাহেবের নিকট জানার বিষয় হল। এই খেদমতটুকু অন্য কেউ করে দিতে পারবে কি না। দলীলসহ জানালে উপকৃত হতাম।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার গ্রামের সেই অসুস্থ ব্যক্তি নিজের ক্ষৌরকার্যের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কোনো লোমনাশক ক্রীম ব্যবহার করতে পারেন। এভাবে পরিষ্কার করতে পারলে অন্যকে দিয়ে এ কাজ করানো জায়েয হবে না। কেননা নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কারো সামনে সতর খোলা বৈধ নয়। আর যদি এভাবেও পরিষ্কার করতে না পারেন কিংবা পরিষ্কার করতে পারলেও লোমনাশক ক্রীম ব্যবহার করা তার জন্য ক্ষতিকারক হয় তাহলে কোনো পুরুষের মাধ্যমে তিনি এ কাজটি করাবেন। এক্ষেত্রে সাহায্যকারী নিজ হাতে গ্লাভস বা কোনো কাপড় পেঁচিয়ে নেবেন।

-কিতাবুল আছল ২/২৩৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৩২; আলইখতিয়ার ৪/১০৯; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ৩/২১; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৮/৯৮; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৭১

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ কামরুজ্জামান - রাজার হাট, মোল্লাপাড়া যশোর

৫১৬৭. প্রশ্ন

আমাদের এলাকায় কারও জন্মবার্ষিকী এবং মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার প্রচলন খুবই কম। কিছুদিন আগে ঢাকার একজন আলেম বয়ানের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ সকল মানুষের মৃত্যুবার্ষিকী ও জন্মবার্ষিকী পালন করা জায়েয বলে ফতোয়া দেন। এতে আমাদের এলাকায় সকলে একটা দ্বিধা-দ্বেদ্ব পড়ে যায়। সুতরাং উক্ত সমস্যার সমাধানকল্পে শরীয়াতের দলীল উল্লেখ করে আমাদেরকে উপকৃত করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত আলেমের কথা ঠিক নয়। জন্মবার্ষিকী-মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা এবং একে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ইসলামের শিক্ষা নয়। এগুলো বিজাতীয় সংস্কৃতি। এসকল অহেতুক কাজ থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা আবশ্যক। শরীয়তে জন্ম দিবস বা মৃত্যু দিবসের আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষভাবে এই দিনে কোনো ধরনের আমল বা ইবাদতের বিধান নেই।

আর মৃতব্যক্তিদের জন্য ঈসালে সাওয়াব করা শরীয়ত স্বীকৃত। তবে এর জন্য কোনো দিনক্ষণ নির্দিষ্ট নেই। বরং যে কোনো সময় বা দিনে নফল নামায, দান-সদকা, দুআ ইত্যাদির মাধ্যমে ঈসালে  সাওয়াব করা যেতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে করলে বিশেষ সাওয়াব পাওয়া যাবে- এমন নয়। সালাফে সালেহীন তথা স্বর্ণযুগেও নির্দিষ্ট দিনে মৃতের জন্য এ ধরনের ঈসালে সাওয়াবের আয়োজন করার কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং জন্মদিবস, মৃত্যুদিবস পালন বা এ সংক্রান্ত কোনো অনুষ্ঠান শরীয়তসম্মত নয়।

তেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মদিবস ও ওয়াফাতদিবস পালন করাটাও শরীয়তের কোনো দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়। এটা যদি জায়েয হত তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরে সাহাবায়ে কেরামই সর্বাগ্রে করতেন। কারণ নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁদের মহব্বত পরবর্তীদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি ছিল। কিন্তু এই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের পদ্ধতি যেহেতু তাদের ভালোভাবে জানা ছিল তাই তারা এর জন্য ঐসকল পন্থাই অবলম্বন করেছেন, যেগুলো সুন্নাহ-নির্দেশিত। কোনো একজন সাহাবী থেকেও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য জন্মদিবস ও ওফাতদিবস পালন করার কথা প্রমাণিত নেই। তদ্রূপ তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনের যুগেও এর কোনো চর্চা ছিল না।

প্রকাশ থাকে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় রহমত ও সাআদাত। তাঁকে স্মরণ করে তাঁর জন্য দুআ করা এবং দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা একদিকে যেমন ইবাদত অপরদিকে আমাদের জীবনে বরকতেরও কারণ। এবং তাঁর জীবনাদর্শ আলোচনা করে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করা তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তা হতে হবে সে পদ্ধতিতে, যা সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। আর কোনোক্রমেই এ আমলগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট মাস বা দিনের সাথে সম্পৃক্ত করে নেয়া যাবে না; বরং তা হবে মুমিনের জীবনের অংশ। সে প্রতিদিনই নামাযের বাইরেও সাধ্যানুযায়ী আল্লাহর রাসূলের উপর দরূদ শরীফ পড়বে। এবং নিজ জীবনকে তাঁর আদর্শ ও এবং সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত করবে। এতেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি তার মহব্বতের প্রমাণ মিলবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন-

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِیْ یُحْبِبْكُمُ اللهُ وَ یَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ  وَ اللهُ غَفُوْرٌ رَّحِیْم.

আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ  তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা আলে ইমরান (৩) : ৩১)]

-সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৯৭; শরহে মুসলিম, নববী ১২/১৬; আলমাদখাল, ইবনুল হাজ ২/২, ৩/২৭৯; আলইতিসাম, শাতিবী ১/৫০; ফিকহুন নাওয়াযিল ২/১১০; ইমদাদুল মুফতীন, পৃ. ১৫১

শেয়ার লিংক

হানীফ - সিলেট

৫১৬৬. প্রশ্ন

আমি পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করি। টিউশনি থেকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে প্রয়োজন পূর্ণ করার পর অবশিষ্ট টাকা ব্যাংকে জমা রাখি। এভাবে ৫৫ হাজার টাকা জমা হয়েছে। তিন মাস আগে এক বন্ধুর একটি বিপদে এই টাকাগুলো তাকে ঋণ দিয়েছি। বর্তমানে আমার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো সম্পদ নেই।

জানার বিষয় হল, এ অবস্থায় আমার উপর কি কুরবানী ওয়াজিব? কুরবানী করতে হলে আমাকে ঋণ নিয়ে কুরবানী করতে হবে। এখন আমার করণীয় কী? মাসআলাটির সমাধান জানালে কৃতজ্ঞ হব।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার কর্তব্য, আপনার বন্ধুর কাছ থেকে এ পরিমাণ টাকা ফেরত চাওয়া, যা দিয়ে আপনি কুরবানী করতে পারেন। যদি তিনি তা দেন তাহলে তা দিয়ে কুরবানী করা ওয়াজিব হবে। আর যদি  তিনি তা না দেন আর আপনার কাছে কোনো জায়গা থেকে কুরবানীর সমপরিমাণ টাকা হস্তগতও না হয় তাহলে কুরবানীর শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। শেষ পর্যন্ত যদি কুরবানী দেওয়ার মত কোনো সম্পদ আপনার হাতে না থাকে তাহলে আপনাকে ঋণ নিয়ে কুরবানী করতে হবে না।

-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬; ফাতাওয়া বাযযাযিয়াহ ৬/২৮৬; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

শেয়ার লিংক

আব্দুল্লাহ আবরার - জামালপুর

৫১৬৫. প্রশ্ন

একজন আমার মাধ্যমে কবর যিয়ারত করিয়েছে এবং আমার মাধ্যমে কুরআন খতম করে সওয়াবরেসানী করেছে। পরবর্তীতে সে আমাকে বলল, আপনি অনেক কষ্ট করেছেন- এ বলে কিছু টাকা দিল। এখন আমার জন্য তা নেওয়া বৈধ হবে কি? আরেকজন উক্ত কাজ করিয়ে সে বলল, কিছু হাদিয়া দিতে চাই। আমি বললাম, তা জায়েয নেই। আমার জানার বিষয় হল, আমার কষ্টের বিনিময়ে আমাকে একজন কিছু খাওয়াল বা হাদিয়া দিল তা জায়েয না হওয়ার কারণ কী?

উত্তর

মৃত ব্যক্তির সওয়াবরেসানীর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত কষ্ট বা পরিশ্রম হলেও এর বিনিময়ে কোনো কিছু গ্রহণ করা জায়েয নেই। কারণ এটি এমন কাজ, যা বিনিময়যোগ্য নয়। এক্ষেত্রে কষ্টের বিনিময়ে সওয়াব ও প্রতিদান পাওয়া যাবে। দুনিয়াতে এর বিনিময় নেওয়া যাবে না। হাদীস শরীফে কুরআন তিলাওয়াত করে বিনিময় গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-

اقْرَءُوا الْقُرْآنَ، وَلَا تَأْكُلُوا بِهِ...

তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর। তবে এর বিনিময় গ্রহণ কোরো না। ...। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৫৩৫)

-বাদায়েউস সানায়ে ৪/৪৬; তানকীহুল ফাতাওয়াল হামিদিয়্যা ২/১৩৮; আলফাতাওয়াল খাইরিয়্যা ২/৩৪১; মাজমূআতু রাসাইলি ইবনি আবিদীন, পৃ. ১/১৬৯

শেয়ার লিংক

কেফায়াতুল্লাহ - বংশাল, ঢাকা

৫১৬৪. প্রশ্ন

জনাব মুফতী সাহেব! আমার জানার বিষয় হচ্ছে, সরকার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর আওতায় বিভিন্ন সময় চারাগাছ ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করে থাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবচেকম রেটে যারা চারাগাছ দিতে পারবে জানিয়ে দরপত্র দাখিল করে- সরকার তাদেরকেই প্রাধান্য দেয়। এক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকম হয় যে, বিভিন্ন নার্সারি থেকে কাক্সিক্ষত পরিমাণ বৃক্ষচারা যদি দশ টাকা করে সংগ্রহ করার সুযোগ থাকে তাহলে লাভ হিসেবে তার সঙ্গে -ধরা যাক- আরো দুই টাকা যোগ করে প্রতিটি চারাগাছের মূল্য ১২ টাকা নির্ধারণপূর্বক আবেদনপত্র পেশ করা হয়। কিন্তু সরকারের তরফে আবেদন মঞ্জুর হওয়ার জন্য এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাথে আরো দুই টাকা সংযুক্ত করে দরপত্রে বৃক্ষমূল্য ১৪ টাকা উল্লেখের কথা বলে। ফলে সরকার বৃক্ষ প্রতি ঠিকই ১৪ টাকা দাম পরিশোধে চুক্তিবদ্ধ থাকে। কিন্তু আমার হাতে আসে ১২ টাকা। বাকি দুই টাকা কর্মকর্তারা আনুষঙ্গিক কাজের জন্য কমিশন ফি হিসেবে কেটে রাখে। ক্ষেত্রবিশেষ দেখা যায়, অন্য যারা দরপত্র দাখিল করেছে তাদের মধ্যে আমার দেয়া ১৪ টাকাই সর্বনিম্ন রেট। বাকিদেরটা হয়ত ১৫ টাকা বা তারও ওপরে। এমতাবস্থায় প্রকৃত দামের বাইরে বৃক্ষপ্রতি ঐ দুই টাকা দিতে রাজী হলে কর্মকার্তারা আমার আবেদনকে অগ্রাধিকার দেয়ার আগ্রহ দেখায়। তো আমার জন্য কি এই শর্ত মেনে টেন্ডার গ্রহণের অবকাশ আছে? বিশেষ করে অন্যদের চেয়ে আমার রেট যখন তুলনামূলক কম। তাছাড়া আমি এই টেন্ডার না নিলেও অন্যদেরকে অনুরূপ কমিশন প্রদানের শর্তেই তো দেবে?!

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লোকদের কমিশন দেওয়ার শর্তটি নাজায়েয, যা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। আর ঘুষ দেওয়া-নেওয়া নাজায়েয। সবাই এভাবেই নেয়, বা নিজে না নিলেও অন্যরা এভাবেই নেবে- এসব অজুহাতে ঘুষ দিয়ে দরপত্র দাখিল করা জায়েয হবে না। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য উক্ত দুই টাকা করে নেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয। এটা কুরআনুল কারীমে নিষিদ্ধ الأكل بالباطل তথা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণেরই একটি পন্থা। কেননা, যাবতীয় দাপ্তরিক কাজ আঞ্জাম দেয়া- এসকল কর্মকর্তাদের সাধারণ দায়িত্ব। এর জন্য তো তারা বেতন-ভাতা পেয়েই থাকে। এ বাবদ বাড়তি টাকা প্রদানের শর্ত করার অর্থ, ঘুষ দাবি করা। আর হাদীস শরীফে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ الرّاشِيَ وَالمُرْتَشِيَ.

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়কেই লানত করেছেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৩৩৭

অতএব এধরনের কারবারে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকাই কর্তব্য।

উল্লেখ্য, এসব ক্ষেত্রে আসল করণীয় হচ্ছে, অন্য যে যাই করুক নিজে কমিশন দেওয়া থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থাকা। কমিশন না দিয়ে কীভাবে দরপত্র পাওয়া যায়- সে পন্থা অবলম্বন করা। এভাবে সবাই ব্যক্তি পর্যায়ে এটা করতে থাকলে ধীরে ধীরে গণসচেতনতা তৈরি হবে। টেন্ডার বাণিজ্যসহ এ ধরনের সবরকম অন্যায় লেনদেনের বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট গড়ে তুলতে পারলে একসময় পরিবর্তন আসবেই ইনশাআল্লাহ।

-আলজামে লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবী ২/২২৫; ফাতহুল কাদীর ৬/৩৭১; রদ্দুল মুহতার ৫/৩৬২; শরহুল মাজাল্লা, আতাসী ৬/৪১

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ আবুল কাসেম - পাঁচকাহনীয়া, কিশোরগঞ্জ

৫১৬৩. প্রশ্ন

মুহতারাম, বিনীত নিবেদন এই যে, আমাদের এলাকায় খাস বা সরকারি অনেক নদী-নালা, খাল-বিল আছে। এর চারপাশে মালিকানাধীন ফসলী জমি। বর্ষাকালে বর্ষার পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। নদী-নালা, খাল-বিলগুলো দুই পদ্ধতিতে ভোগ করা হয় :

১. কিছু নদী-নালা, খাল-বিল সরকার থেকে নিয়ম মুআফেক লিজ নেওয়া হয়।

২. কিছু এলাকার গণ্যমান্য সরকারি স্থানীয় প্রতিনিধি উপজেলা চেয়াম্যান-এর সম্মতিতে মসজিদ-মাদরাসার নামে লিজ দেওয়া হয়। আমার জানামতে যা সরকারি আইন পরিপন্থী। এর থেকে যে টাকা অর্জিত হয় তা মসজিদ-মাদরাসার উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। লিজ দেওয়া ও নেওয়ার কারণে গরীব-গোরাবা ও সাধারণ মানুষ বর্ষার পানির মুক্ত মাছ ধরা থেকে বঞ্চিত হয়।

উল্লেখ্য, নদী-নালা, খাল-বিলে মাছ আসা এবং থাকার জন্য ইজারাদারগণ বাঁশ, গাছের ডাল এবং খাবার ইত্যাদি দিয়ে থাকেন।

এখন জানার বিষয় হল :

১। লিজ দেওয়া-নেওয়া শরীয়তসম্মত কি না? থাকলে এর পদ্ধতি কী?

২। বিবরণে উল্লিখিত উভয় পদ্ধতিতে লিজ দেওয়া-নেওয়া  বৈধ হচ্ছে কি না?

৩। উক্ত লিজের টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, ইমাম, মুআযযিন, খাদেম, শিক্ষকগণের বেতন ও প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো কাজে ব্যয় করা বৈধ হবে কি না? না হলে এর বৈধতার উপায় কী?

৪। লিজের মাধ্যমে অর্জিত মসজিদের টাকা কেউ যদি মসজিদ কমিটি থেকে এই বলে নিয়ে যায় যে, মসজিদের নামে খাল-বিলের  লিজের কাগজ-পত্র সরকার থেকে ব্যবস্থা করে দেবে। অতঃপর  সে নিজেই তা আত্মসাৎ করে, তবে এর জন্য দায়ী কে- মসজিদ কমিটি, না গ্রহিতা?

৫। মুক্ত পানির মাছ ধরতে ইজারাদাগরণ সাধারণ মানুষকে বাধা দেওয়ার অধিকার রাখে কি না?

৬। মালিকানাধীন জমি ইজারাদারগণ ব্যবহারের অধিকার রাখে কি না? রাখলে এর সীমা কতটুকু?

৭। সরকার থেকে সল্পমূল্যে লিজে এনে  বেশি মূল্যে সাধারণ মানুষের নিকট লিজে দেওয়া শরীয়তসম্মত কি না? থাকলে এর শর্ত কী?

৮। এলাকার কিছু প্রভাবশালী লোক দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে হাওড়ের অপরের মালিকানাধীন কিছু জমি বর্ষাকালে মুক্ত মাছ ধরার জন্য লিজ দিয়ে ভোগ করে আসছে। শরীয়তে এর বৈধতা আছে কি না? থাকলে এর পদ্ধতি কী?

অতএব, মুফতী সাহেবের নিকট আকুল আবেদন এই যে, উল্লিখিত প্রশ্নাবলীর উত্তর প্রদান করে কৃতজ্ঞ করবেন।

উত্তর

১. লিজ বা ইজারা শরীয়ত স্বীকৃত বৈধ একটি কারবার। এর বিধি-বিধান সুবিস্তৃত। ব্যক্তি নিজ মালিকানাধীন জায়গা এবং সরকার রাষ্ট্রের মালিকানাধীন ভমি লিজ দিতে পারে। -আলমাবসূত, সারাখসী ১৫/৭৪; আলইখতিয়ার ২/১২১

২. ও ৫. নদী থেকে উপকার গ্রহণের অধিকার সকলের। তাই ইসলামে নদী লিজ দেওয়ার বিধান নেই। আর সরকারী আইনেও নদী লিজ দেওয়া নিষিদ্ধ।

আর ব্যক্তি মালিকানাহীন সরকারি বিলও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখাই উচিত। বিশেষত যেসব খাল-বিলের সঙ্গে সাধারণ জনগণের স্বার্থ জড়িত, সেগুলো কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দিয়ে দেওয়ার অবকাশ ইসলামে নেই। অবশ্য যদি কোনো খাল-বিল ছোটখাটো হয় এবং তা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লিজ দিলে বড় জনগোষ্ঠীর কষ্টে পড়ার আশংকা না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে সরকার, দেশ ও জনগণের কল্যাণে এগুলো লিজ দেওয়ার অধিকার রাখে। এভাবে বিধি মোতাবেক লিজ নেওয়ার পর সেখানে মাছ চাষ করার জন্য ইজারাদাররা ব্যবস্থা নিলে অন্যদের জন্য ওই জায়গা থেকে মাছ ধরা বৈধ হবে না।

আর সরকার কিংবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া যেহেতু অন্য কেউ এসব খাস খাল-বিল লিজ দেওয়ার অধিকার রাখে না, তাই প্রশ্নের বর্ণনা মতে এলাকার সেসব লোক থেকে সেগুলো লিজ বা ভাড়া নেওয়া বৈধ হবে না। নিলে অন্যায়ভাবে সরকারি সম্পদ ভোগ করা হবে। মসজিদ-মাদরাসার লিজ নেওয়ার প্রয়োজন হলে বৈধ পন্থায় সরকার থেকে লিজ নেবে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩০৮২; কিতাবুল আছল ৮/১৫২; আলমাবসূত, সারাখসী ২৩/১৬৩; আননুতাফ ফিল ফাতাওয়া পৃ. ৩৮২; আলমুহীতুল বুরহানী ৮/১২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩৭০, ৩৯০

৩. ও ৪. প্রশ্নকারীর মৌখিক বর্ণনা অনুযায়ী মসজিদ কর্তৃপক্ষ প্রথমত এলাকার সেসব লোকের (অননুমোদিত ব্যক্তিবর্গ) অনুমতি নিয়ে এসব খাস খাল-বিলের অংশবিশেষ দখল করে। এরপর তা অন্যের কাছে ইজারা দেয়। এমনটি হয়ে থাকলে এ ভাড়ার টাকা সম্পূর্ণ হারাম। এ টাকা মসজিদ-মাদরাসায় ব্যয় করা যাবে না। এগুলো গরীবদের সদকা করে দিতে হবে। অতএব প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে মসজিদের এ টাকাগুলো যদি লিজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কেউ আত্মসাত করে থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হল তা উদ্ধার করে এর দায় থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৬. ইজারাদাররা যতটুকু জমি যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে বৈধ পন্থায় ভাড়া নিয়েছে/নেবে ততটুকু জমি ব্যবহার করতে পারবে। অন্যের মালিকানাধীন জমি ব্যবহার করার অধিকার তাদের নেই।

৭. এ ধরনের লিজ সাধারণত হস্তান্তর নিষিদ্ধ থাকে। তাই নিজে গ্রহণের পর তা অন্য কাউকে দেওয়ার অবকাশ নেই।

৮. না, শরীয়তে এই জবরদখলের বৈধতা নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَنْ أَخَذَ شَيْئًا مِنَ الأَرْضِ بِغَيْرِ حَقِّهِ خُسِفَ بِهِ يَوْمَ القِيَامَةِ إِلَى سَبْعِ أَرَضِينَ.

যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো সামান্য জমিও দখল করবে, কেয়ামতের দিন তাকে (শাস্তিস্বরূপ) সাত জমিন পর্যন্ত ধ্বসিয়ে দেওয়া হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩১৯৬)

শেয়ার লিংক

রেজওয়ান সিদ্দীক টিপু - ক্যান্টনমেন্ট, কুমিল্লা

৫১৬২. প্রশ্ন

কিছুদিন আগে আমি ওয়ালটনের একটি ফ্রিজ ক্রয় করি। তখন ওয়ালটনের একটি ছাড় চলছিল। (এখনও চলছে) এর নাম হল ক্যাশভাউচার। ফ্রিজ ক্রয়ের পর নিয়ম অনুযায়ী আমি দোকানে লাগানো ওয়ালটনের বারকোডের উপর মোবাইল ফোন স্ক্যান করে নাম দেওয়ার পর আমার ফোনে সাতশত টাকা চলে আসে। টিভি, ফ্রিজ, এসিসহ নির্দিষ্ট কিছু পন্যে ওয়ালটন ক্রেতাদের এ সুবিধা দিচ্ছে। তাদের লিফলেট অনুযায়ী এবং দোকানীদের কথা অনুযায়ী ৩০০ টাকা থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ক্রেতারা এ সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে এ টাকা ঐসব দোকান থেকে নগদ ওঠানো যায় না। বরং ওয়ালটনেরই অন্য কোনো পণ্য কিনলে ঐ পরিমাণ টাকা কম নেওয়া হয়। তাই আমিও ঐ সাতশত টাকার সাথে আরো কিছু টাকা দিয়ে একটি আয়রন ক্রয় করে ফেলি।

মুহতারামের কাছে জানতে চাই, ক্রেতাদের জন্য ওয়ালটন ক্যাশভাউচারের নামে যা দিচ্ছে তা নেওয়া জায়েয হবে কি না? আর আমি যে ঐ টাকা দিয়ে আয়রণ ক্রয় করেছি তা জায়েয হবে কি না? দয়া করে সঠিক উত্তর জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে উক্ত কোম্পানী ক্যাশভাউচার স্বরূপ যে টাকা দিচ্ছে তা নেওয়া এবং এর বিনিময়ে আয়রণ মেশিন ক্রয় করা দুই শর্তে বৈধ হবে :

১. অফারের কারণে পণ্যের দাম বাড়ানো যাবে না।

২. শুধু পুরস্কার পাওয়ার আশায় পণ্য ক্রয় না করা। অর্থাৎ পণ্য উদ্দেশ্য না হয়ে বরং পুরস্কার মূল উদ্দেশ্য- এমন না হওয়া।

উল্লেখ্য, ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ইসলামী বাণিজ্যনীতি হল, পণ্যের দাম সুনির্ধারিত থাকা এবং মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করা। তা না করে মূল্যের কিছু অংশ পুরস্কার নামের লটারীর সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা, লাখ টাকা/কোটি টাকার লোভ দেখিয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা ইসলামী বাণিজ্যনীতি পরিপন্থী। পুঁজিবাদের আবিষ্কৃত এসব নীতি বাজারকে অসাধু পন্থায় প্রভাবিত করে থাকে। মুসলমানদের উচিত এহেন কাজ থেকে বিরত থাকা।

-মাআলিমুস সুনান ৩/৪০০; ফিকহুন নাওয়াযিল ৩/১১৬; বুহুস ফী কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুআসিরাহ ২/১৫৮

শেয়ার লিংক

হুমায়ন সিকদার - গোপালগঞ্জ

৫১৬১. প্রশ্ন

আমি এক বাড়িতে পাহারাদারির কাজ করি। প্রতিদিন সকালে গেটের সামনে ঝাড় দিই। পাশের বিল্ডিংটি ছোট হওয়ায় সে বাড়ির মালিক কোনো পাহারাদার রাখেনি। তার বাড়ির সামনে নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে ময়লা থাকে। একদিন তিনি আমাকে এ প্রস্তাব দিলেন, ‘তুমি যখন তোমাদের বাড়ির সামনে ঝাড় দেবে তখন আমারটাও দেবে। আমি তোমাকে প্রতি মাসে ৪০০ টাকা দিব।মালিককে না জানিয়ে আমি তার এই প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রতিদিন তার বাড়ির সামনে ঝাড় দিচ্ছি। এতে কোনো অসুবিধা আছে কি?

উত্তর

মালিককে না জানিয়ে উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা ঠিক হয়নি। এটি খেয়ানতের শামিল। তাই আপনার কর্তব্য হল, বিষয়টি মালিককে জানিয়ে তার অনুমতি হলে কাজটি করা। যদি অনুমতি না পাওয়া যায়, তাহলে কাজটি ছেড়ে দেবেন।

-তাবয়ীনুল হাকায়েক ৬/১৪৩; আননুতাফ ফিল ফাতাওয়া পৃ. ৩৪০; দুরারুল হুক্কাম ফী শরহি গুরারিল আহকাম ২/২৩৬; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/৩৮; শরহুল মাজাল্লা, আতাসী ২/৪৮২

শেয়ার লিংক

মুনীরুল আমীন আল-মুশতাক - নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

৫১৬০. প্রশ্ন

আমাদের এলাকায় মসজিদে জুমার দিন বয়ানের পর দ্বিতীয় আযানের পূর্বমুহূর্তে মসজিদের মিম্বার থেকে মসজিদের দানকৃত পণ্যসমূহের নিলাম বিক্রি করা হয়। এভাবে মসজিদের ভেতর ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ কি না? জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

উত্তর

মসজিদ আল্লাহ তাআলার ঘর। এটি ইবাদত-বন্দেগী, নামায, ইতিকাফ, কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির-আযকারের স্থান; ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থান নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন এবং মসজিদের ভেতর ক্রয়-বিক্রয়কারীর জন্য বদদুআ করেছেন। এছাড়া জুমার আযানের পর ক্রয়-বিক্রয় স¤পর্কে পৃথকভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। অনেক ফকীহের মতে এ নিষেধাজ্ঞা প্রথম আযানের পর থেকেই শুরু হয়ে যায়। তাই মসজিদের ভেতর এমন নিলাম করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

মসজিদের জন্য নিলামের প্রয়োজন হলে তা নামাযের পর মসজিদের বাইরে গিয়ে করা যেতে পারে। প্রয়োজনে এ নিলামের ঘোষণা নামাযের পর মসজিদেও দেয়া যাবে।

-মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬৬৭৬; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ২৩৩৯; আলমুহীতুল বুরহানী ২/৯৩; আলবাহরুর রায়েক ২/১৬৮

শেয়ার লিংক

আশরাফ আলী - হাজারীবাগ, ঢাকা

৫১৫৯. প্রশ্ন

এক ব্যক্তির ছেলে-মেয়ে উভয়ে সামর্থ্যবান। সকলের বিবাহ হয়ে গেছে। তাদের মা-বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেলে ছেলে মা-বাবার খরচ বহন করে। তবে ছেলে বলতে চায় যে, বোনেরও তো টাকা-পয়সা আছে। সেও যেন আমার সঙ্গে সমানভাবে মা-বাবার খরচ বহন করে।

জানতে চাই, বিবাহিতা মেয়ের উপর কি বাবা-মায়ের খরচ বহন করা জরুরি?

উত্তর

মেয়ের যদি নিজস্ব মালিকানাধীন (স্বামীর নয়) সম্পদ থাকে এবং প্রয়োজনীয় খরচাদির পর মাতা-পিতার জন্য খরচ করার সামর্থ্য থাকে, তাহলে সে বিবাহিতা হোক কিংবা অবিবাহিতা- ভাইয়ের সঙ্গে তারও পিতা-মাতার খরচ বহন করা জরুরি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنّ أَوْلَادَكُمْ هِبَةُ اللهِ لَكُمْ، يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا، وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذّكُورَ، فَهُمْ وَأَمْوَالُهُمْ لَكُمْ إِذَا احْتَجْتُمْ إِلَيْهَا.

তোমাদের সন্তান তোমাদের প্রতি আল্লাহর দান। তিনি যাকে চান কন্যা দান করেন আর যাকে চান তাকে দান করেন পুত্র। তারা এবং তাদের সম্পদ দুই-ই তোমাদের, যখন তোমাদের প্রয়োজন পড়ে। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৩১৭৭)

উক্ত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজনের সময় পিতা-মাতাকে সন্তানের সম্পদ ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছেন। তাই সন্তানের- চাই সে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে- কর্বত্য হল, যথাসাধ্য তাদের খরচ বহন করা।

প্রকাশ থাকে যে, মেয়ে যদি বিবাহিতা হয় এবং তার স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করে, অপরদিকে ছেলে যদি বাবা-মার বাড়িতে অবস্থান করে এবং তাদের স্থায়ী সহায়-সম্পদ (ঘর-বাড়ি, পুকুর, কৃষি জমি ইত্যাদি) এককভাবে ভোগ করে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের খরচের বড় অংশ ছেলেদেরই দেওয়া উচিত। তবে আগেই বলা হয়েছে, সামর্থ্যবান মেয়েদেরও (যদিও সে শ্বশুর বাড়িতে থাকে) বাবা-মায়ের দেখা শোনা ও তাদের খরচাদি বহনে যথাসাধ্য অংশ গ্রহণ করা দায়িত্ব।

-কিতাবুল আছল ১০/৩৪০; আলমাবসূত, সারাখসী ৫/২২২; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৪৪৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৪/৩৫০; ফাতহুল কাদীর ৪/২২৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫৬৪

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ শাহীন - গোপালগঞ্জ

৫১৫৮. প্রশ্ন

হযরত আমাদের এলাকায় আজীমুদ্দিন তালুকদার নামে এক লোক আছে। সে দুটি বিবাহ করেছে। প্রথম বিবির নাম আমিরুন নেসা। তার ছেলের নাম ইসমাঈল তালুকদার। এই ইসমাঈলের বড় ছেলের নাম আব্দুল কুদ্দুস তালুকদার। তার একজন মেয়ে আছে মুক্তানামে।

আর এই আজিমুদ্দিনের অপর স্ত্রী আছে তার নাম মারিয়ম। তার ছেলের নাম ইবরাহীম তালুকদার। এই ইবরাহীম তালুকদারে সাথে ঐ মুক্তা বেগমের বিবাহ হয়েছে। এখন কথা হল, যার সাথে মুক্তার বিবাহ হয়েছে সে হল তার সৎ দাদা। অর্থাৎ মুক্তার আপন দাদা হল ইসমাঈল। আর ইসমাঈল ও ইবরাহীম হল সৎ ভাই। মা ভিন্ন বাপ একএখন সেই সৎ দাদা স্বীয় নাতনীকে বিবাহ করেছে। এখন প্রশ্ন হল, তাদের মধ্যকার বিবাহ বন্ধনের বিধান কী? জানালে উপকৃত হতাম।

উত্তর

প্রশ্নের বর্ণনা মতে ইবরাহীম তালুকদার মুক্তা বেগমের দাদার বাপ শরীক ভাই। অর্থাৎ বাপ শরীক দাদা। সুতরাং তারা পরস্পর  মাহরাম।

তাই তার সঙ্গে ইবরাহীম তালুকদারের বিবাহ সহীহ হয়নি। আপন দাদা যেমনিভাবে মাহরাম। অনুরূপভাবে সৎ দাদাও মাহরাম। তাদের পরস্পর বিবাহ হারাম। অতএব তাদের বিবাহ সহীহ হয়নি। তাদের এখনই আলাদা হয়ে যাওয়া এবং নিজেদের কৃতকর্মের জন্য খাঁটি দিলে তওবা করা জরুরি।

-তাফসীরে মাযহারী ২/২৬৫; ফাতহুল কাদীর ৩/১১৭; মাজমাউল আনহুর ১/৪৭১; তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/৪৬০; মাজমাউল বাহরাইন, পৃ. ৫১২; আলবাহরুর রায়েক ৩/৯৩

শেয়ার লিংক

মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ - রূপনগর, মিরপুর, ঢাকা

৫১৫৭. প্রশ্ন

আমি পবিত্র হজ্ব পালন করেছি। ইহরাম অবস্থায় সতরের সতর্কতার জন্য জাঙ্গিয়া (আন্ডারপ্যান্ট/আন্ডারওয়্যার) পরি। তামাত্তু হজ্বের উমরা ও হজ্ব উভয়টি আদায়কালে আমি এটি পরিধান করে ছিলাম। পরবর্তীতে আলেমদের কাছে শুনেছি যে, ইহরাম অবস্থায় এগুলো পরা নিষেধএখন আমার কি করণীয়? জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

হাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য শরীরের অঙ্গের আকৃতি অনুযায়ী তৈরিকৃত বা সেলাইকৃত পোশাক পরা নিষেধ। সে হিসাবে জাঙ্গিয়াও পরা নিষেধ। কেউ একসাথে ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় এ ধরনের পোশাক পরে থাকলে তার উপর জরিমানা হিসাবে দমদেওয়া ওয়াজিব হবে। আপনি যেহেতু উমরা এবং হজ্ব উভয়টি আদায়ের সময় তা পরেছিলেন। তাই আপনার উপর দুটি জরিমানা দমওয়াজিব হয়েছে।

উল্লেখ্য, উমরা বা হজ্বের দমহেরেমের এলাকায় আদায় করা জরুরি। তাই আপনার এ দমদুটি হেরেমের এলাকার মধ্যে যবেহ করতে হবে। তবে এজন্য নিজের উপস্থিতি জরুরি নয়; বরং সেখানে কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমেও আদায় করানো যেতে পারে। আর এ দমের গোশত গরীব-মিসকীনের হক। ধনী ব্যক্তিকে দেওয়া বা নিজে খাওয়া যাবে না।

তবে হাঁ, বাস্তবেই যদি আপনার জন্য এমন কাপড় পরা ছাড়া সতর হেফাজত করা কঠিন হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে ওজরের কারণে আপনি চাইলে প্রতি জরিমানা দমের পরিবর্তে তিন দিন রোযা রাখতে পারেন বা ছয়জন মিসকীনের প্রত্যেককে একটি সদকা ফিতর পরিমাণ দান করতে পারেন। আর এ সদকা হেরেমের এলাকার ফকিরদের দেওয়া উত্তম, আবশ্যক নয়। অন্য জায়গার ফকিরদের দিলেও আদায় হয়ে যাবে।

-আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৪২৮-৪২৯; আলবাহরুর রায়েক ৩/১৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২৪৪; মানাসিক, মোল্লা আলী আলকারী, পৃ. ৩০০; রদ্দুল মুহতার ২/৫৪৭, ৫৪৩

শেয়ার লিংক

আফিফা মারজানা - সিলেট

৫১৫৬. প্রশ্ন

হজ্বের মৌসুমে দেখা যায়, কয়েকজন বোরকা পরিহিতা মহিলা কেচি নিয়ে দাড়িয়ে থাকে। কারো চুল  ছোট করার (কছর করা) প্রয়োজন হলে তারা অল্প কিছু চুল কেটে দেয়। মুহতারামের নিকট জিজ্ঞাসা হল, চুল কাটার সর্বনিম্ন পরিমাণ কতটুকু? পুরো মাথা থেকে কাটতে হবে, নাকি অল্প কিছু চুল কাটলেও চলবে? এক্ষেত্রে নারী পুরুষ উভয়ের জন্য উত্তম তরিকা কী? বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানালে উপকৃত হতাম।

উত্তর

ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার জন্য মাথার এক চতুর্থাংশ পরিমান চুলের অগ্রভাগ থেকে আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ চুল ছোট করা ওয়াজিব। এটাই চুল ছোট করার সর্বনিম্ন পরিমাণ। তবে পুরুষদের জন্য সর্বাবস্থায় মাথা মুণ্ডানো উত্তম। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা মুণ্ডিয়েছেন এবং মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য বিশেষভাবে দুআ করেছেন।

হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ حَلَقَ رَأْسَهُ فِي حَجّةِ الوَدَاعِ.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্বের দিন মাথা মুণ্ডন করেছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪১০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩০৪)

عَنْ يَحْيَى بْنِ الْحُصَيْنِ، عَنْ جَدّتِهِ، أَنّهَا سَمِعَتِ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فِي حَجّةِ الْوَدَاعِ دَعَا لِلْمُحَلِّقِينَ ثَلَاثًا، وَلِلْمُقَصِّرِينَ مَرّةً.

ইয়াহইয়া ইবনে হুসাইন তার দাদীর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বিদায় হজ্বের দিন দেখেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য দুআ করেছেন তিনবার। আর চুল ছোটকারীদের জন্য একবার। (সহীহ মুসিলম, হাদীস ১৩০৩)

আর  মহিলাদের জন্য পুরো মাথা থেকে এক কর পরিমাণ চুল ছোট করা উত্তম। তবে চার ভাগের এক ভাগ থেকে এক কর পরিমাণ চুল কাটলেও ইহরাম-মুক্ত হয়ে যাবে।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

تَجْمَعُ الْمُحْرِمَةُ شَعْرَهَا ، ثُمّ تَأْخُذُ مِنْهُ قَدْرَ أُنْمُلَةٍ.

ইহরামকারী নারী তার চুলকে একত্রিত করে সেখান থেকে এক কর পরিমাণ কাটবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ১৩০৬৫)

তবে কেউ যদি কেবলমাত্র মাথার এক চতুর্থাংশ পরিমাণ থেকে চুল ছোট করে, তাহলে সেক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম এক করের চেয়ে কিছুটা বেশি ধরে কাটতে বলেছেন। যাতে ঐ অংশের যে চুলগুলো তুলনামূলক ছোট, সেটাও এক কর পরিমাণ কাটা হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, প্রশ্নে উল্লেখিত মহিলাদের থেকে চুল কাটা উচিত হবে না। কেননা এতে চেহারা ও চুলের পর্দা লঙ্ঘন হতে পারে। বরং চুল নিজ হোটেলে এসে কাটবে। আর মেয়েরা ঘরে এসে নিজের চুল নিজেই কেটে নিতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই।

-আলমাবসূত, সারাখসী ৪/৭০; বাদায়েউস সানায়ে ২/৩৩০; আলবাহরুল আমীক ৩/১৭৯৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩৫; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫১৫; মানাসিক, মোল্লা আলী আলকারী, পৃ. ২২৯

শেয়ার লিংক

মাসুম বিল্লাহ - খুলনা

৫১৫৫. প্রশ্ন

আমার জানার বিষয় হল, আমাদের মাদরাসায় লিল্লাহ বোডিং আছে। আমাদের ছাত্রদের থেকে মৌখিক স্বীকৃতি নেওয়া আছে যে, তারা তাদের পক্ষ হতে উস্তাযদেরকে যাকাত গ্রহণ করার জন্য প্রতিনিধি সাব্যস্ত করেছে। এমতাবস্থায় উস্তাদগণ তাদের পক্ষ হতে উকিল সাব্যস্ত হয়ে যাকাত গ্রহণ করতঃ টাকা হস্তগত করলে মালিকদের পক্ষ হতে যাকাত আদায় হবে কি না?

অতঃপর উক্ত টাকা ছাত্রদেরকে মালিক বানানো ছাড়াই সেখান থেকে উসূলকারীগণ আমেল হিসাবে ২০% গ্রহণ করতে পারবে কি না? এব্যাপারে শরীয়তের সঠিক নির্দেশনা জানতে চাই।

পাশাপাশি শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে আমেল হওয়ার সঠিক সূরাত  বর্তমান সময়ে কী হতে পারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

 

উত্তর

বর্তমান প্রচলন (العرف) অনুযায়ী যেসব মাদরাসায় গোরাবা ফান্ড রয়েছে সেসব মাদরাসার মুহতামিম/কর্তৃপক্ষ গরীব ছাত্রদের পক্ষ হতে যাকাত গ্রহণের উকিল তথা প্রতিনিধি। তাই মাদরাসার প্রতিনিধির হাতে যাকাতের টাকা অর্পণ করার দ্বারাই যাকাতদাতার যাকাত আদায় হয়ে যাবে এবং এ টাকার মালিক সম্পূর্ণভাবে গরীব ছাত্ররাই হবে।

আর বর্তমানে যাকাত উসূলকারীগণ শরয়ী আমেলনন। বরং তারা প্রতিনিধি মাত্র। তাই আমেল হিসাবে সেখান থেকে তারা বেতন/ভাতা নিতে পারবে না। তবে এক্ষেত্রে প্রতিনিধিদেরকে মাদরাসার জেনারেল ফান্ড থেকে নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে।

প্রকাশ থাকে যে, আমেল হল ইসলামী হুকুমতের পক্ষ হতে যাকাত উসূলের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তাদের বেতন-ভাতাদী উসূলকৃত যাকাতের টাকা থেকে দেওয়া যায়। আর বর্তমান যাকাত উসূলকারীগণ তাদের মত নয়।

উল্লেখ্য, উসূলকৃত যাকাতের টাকা এর প্রাপককে (গরীব ছাত্রগণ) বুঝিয়ে দেওয়ার পর মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাদের থেকে মাদরাসার নির্ধারিত ফি তথা মাদরাসা কর্তৃক অর্পিত তাদের খরচাদি নিতে পারবে। ছাত্ররা যদি যাকাত-সদকা বাবদ প্রাপ্ত টাকা থেকে তা পরিশোধ করে, তাতেও দোষ নেই। এরপর মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সে টাকা দিয়ে চাইলে যাকাত উসূলকারীদেরকে পারিশ্রমিক দিতে পারবে।

-আলমুহীতুল বুরহানী ৩/২১৪; ইমদাদুল মুফতীন পৃ. ৮৯৫; আহাম ফেকহী ফায়সালে পৃ. ৫৪; আলমাবসূতসারাখসী ৩/৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/১৫১

শেয়ার লিংক