আতাউর রহমান - মোহাম্মাদপুর, ঢাকা

৫২১৪. প্রশ্ন

আমার এক পরিচিত ব্যক্তির নগদ টাকার প্রয়োজন হওয়ায় আমি তার মালিকানাধীন একটি ফ্লোর ছয় মাস মেয়াদের জন্য ভাড়া গ্রহণ করি এবং পুনরায় তার কাছেই ভাড়া দিই। ভাড়া নেওয়া ও দেওয়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দুটি চুক্তিপত্র করা হয়। প্রথম চুক্তিপত্রে ফ্লোরটি দুই লক্ষ টাকার বিনিময়ে তার কাছ থেকে ভাড়া গ্রহণ করি এবং দুই লক্ষ টাকা ভাড়া নগদ পরিশোধ করি। দ্বিতীয় চুক্তিপত্রে ফ্লোরটি তার কাছে দুই লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকার বিনিময়ে পুনরায় ভাড়া প্রদান করি। তিনি প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা কিস্তিতে ছয় মাসে মোট ত্রিশ হাজার টাকা পরিশোধ করেন এবং ভাড়ার অবশিষ্ট দুই লক্ষ টাকা ছয় মাস পর পরিশোধ করেন। জানতে চাচ্ছি, আমাদের এ লেনদেন সহীহ হয়েছে কি না এবং এ কারবারের মাধ্যমে প্রাপ্ত অতিরিক্ত ত্রিশ হাজার টাকা আমার জন্য নেওয়া বৈধ হয়েছে কি না? জানিয়ে উপকৃত করবেন।

উত্তর

কোনো জিনিস ভাড়া নিয়ে তা ভাড়াদাতার কাছেই পুনরায় ভাড়া দেওয়া বৈধ নয়। তাই প্রশ্নোক্ত চুক্তি থেকে ভাড়ার নামে প্রাপ্ত অতিরিক্ত ত্রিশ হাজার টাকা সুদ বলে গণ্য হবে। এ টাকা আপনার জন্য নেওয়া জায়েয হয়নি। তা ঐ ঋণগ্রহীতাকে ফেরত দিয়ে দিবেন।

উল্লেখ্য, প্রশ্নোক্ত কারবারটি সুদী কারবারেরই একটি অপকৌশল। একথা ¯পষ্ট যে, এক্ষেত্রে বাহ্যত ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে ভাড়াদাতা ও গ্রহীতা কারোরই ভাড়া দেওয়া-নেওয়া উদ্দেশ্য থাকে না; বরং উভয়েরই উদ্দেশ্য থাকে ঋণ আদান-প্রদান করা। আর ঋণদাতার উদ্দেশ্য থাকে ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ ভোগ করা। তাই মুসলমানদের এ ধরনের কর্মকাÐ থেকে বিরত থাকা দরকার।

-আদ্দুররুল মুখতার ৬/৯১; শরহুল মাজাল্লাহ, আতাসী ২/৬৮৪; দুরারুল হুক্কাম শরহু মাজাল্লাতিল আহকাম ১/৬৭২

শেয়ার লিংক

আবু হাম্মাদ - সদর, কুষ্টিয়া

৫২১৩. প্রশ্ন

আমার বড় ভাই এই বলে মান্নত করেন যে, আমার চাকরি হলে তিন দিন ইতিকাফ করব। পরবর্তীতে তার চাকরি হয়, কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার মান্নতকৃত ইতিকাফ আদায় করেননি। এভাবে তিনি গত সপ্তাহে ইন্তেকাল করেন। আমাদের জানার বিষয় হল, তিনি যেন  মান্নতের দায় থেকে মুক্ত হতে পারেন- এজন্য আমরা কী করতে পারি?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার বড় ভাইয়ের পক্ষ থেকে তিনটি সদকাতুল ফিতর বা তার সমপরিমাণ টাকা গরিব-মিসকিনকে দিয়ে দিবেন।

-কিতাবুল আছল ২/১৮৮; বাদায়েউস সানায়ে ২/২৮৯; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৮৩ ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১৪

শেয়ার লিংক

মাহমূদুল হাসান - চর বেউথা, মানিকগঞ্জ

৫২১২. প্রশ্ন

স্বামী-স্ত্রী পর¯পরকে দুষ্টুমি করে ভাই বোন বলে সম্বোধন করলে কোনো সমস্যা আছে কি না? যেমন, স্ত্রী যদি তার স্বামীকে এই বলে ডাকে যে, ভাই এদিকে আসেন।

উত্তর

স্বামী-স্ত্রী পর¯পরকে ভাই বোন বলে সম্বোধন করা নিষেধ। এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বোন বলে সম্বোধন করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এভাবে সম্বোধন করতে নিষেধ করেন (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১৯৫৩১)। তাই দুষ্টুমির ছলেও এভাবে সম্বোধন করা থেকে বিরত থাকবে।

উল্লেখ্য, এভাবে বলে ফেললে এর কারণে তাদের বৈবাহিক স¤পর্কের কোনো ক্ষতি হবে না।

-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২২১০; মাআলিমুস সুনান ৩/১৩৫; ফাতহুল কাদীর ৪/৯১; আলবাহরুর রায়েক ৪/৯৮; আননাহরুল ফায়েক ২/৪৫৩; রদ্দুল মুহতার ৩/৪৭০

শেয়ার লিংক

আদনান - ময়মনসিংহ

৫২১১. প্রশ্ন

১. সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি স্ত্রীর উপর রাগ করে ঠাণ্ডা মাথায় একবার একথা বলি, ‘আমার ছোট ছেলের ২ বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে তুমি তালাক। একথা আমি একা একা বলি শব্দ করে। আবার প্রচÐ রাগের মাথায় একা একা শব্দ করেও ঐ জাতীয় কথা আলাদা আলাদা দিনে কয়েকদিন বলি।

অতএব হুজুর সমীপে নিবেদন উপরিউক্ত কথাগুলোর ভিত্তিতে ফতোয়া জানিয়ে বাধিত করবেন।

২. আমার এবং আমার স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকে। ঝগড়ার পর্যায়ে আমি আমার স্ত্রীকে এ কথা বলি-বেশি চিল্লাবা না; আর বেশি চিল্লাইলে তুমি আমার বউ থাকবা না।এ কথার পরও সে অনেক চিল্লিয়েছে। ঐ কথা বলার সময় দিলের নিয়ত কী ছিল তা বুঝতে পারছি না। অতএব, উপরিউক্ত কথার ভিত্তিতে মেহেরবানী করে ফতোয়া জানালে বাধিত থাকব।

উত্তর

১. আপনি যেহেতু আপনার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করেই ঐ বাক্যটি (আমার ছোট ছেলের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে তুমি তালাক) বলেছেন, তাই যেদিন আপনার ছোট ছেলের দুই বছর পূর্ণ হবে, সেদিন আপনার স্ত্রীর উপর এক তালাকে রাজয়ী পতিত হবে।

উল্লেখ্য, আপনার মৌখিক বর্ণনা অনুযায়ী আপনি প্রচÐ মানসিক চাপের কারণে ঐ বাক্যটি পরবর্তীতে বারবার উচ্চারণ করছিলেন এবং তা বলার সময় নতুন করে শর্তযুক্ত তালাক প্রদানের নিয়ত আপনার ছিল না। যদি কথাগুলো সঠিক হয় তবে ঐ বাক্যগুলো দ্বারা নতুন করে কোনো তালাক পতিত হবে না।

আরো উল্লেখ্য, তালাকে রাজয়ীর পর ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (ঋতুমতী হলে পূর্ণ তিন ঋতু, আর অন্তঃসত্ত্বা হলে সন্তান ভমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত) আপনি চাইলে স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে নতুন করে বিবাহ করতে হবে না।

আর আপনার মৌখিক বর্ণনা অনুযায়ী  যেহেতু ইতিপূর্বে স্ত্রীকে আরো একটি তালাক দিয়েছিলেন, তাই এ শর্তযুক্ত তালাকটি পতিত হওয়ার পর আপনি কেবল অবশিষ্ট এক তালাকের অধিকারী থাকবেন। কোনোভাবে এ তালাকটি হয়ে গেলে আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যাবে এবং পরস্পরের জন্য আপনারা হারাম হয়ে যাবেন। তখন নতুন করে বিবাহ করার সুযোগ থাকবে না। তাই ভবিষ্যতে তালাকের বিষয়ে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ১৬০৬২; কিতাবুল আছল ৪/৪৭১, ২/২৯৭; কিতাবুল আছার, ইমাম আবু ইউসুফ, বর্ণনা ৬৯৩; আলমাবসূত, সারাখসী ৮/১৫৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৬/৭৯

২.  আর বেশি চিল্লাইলে তুমি আমার বউ থাকবা নাপ্রশ্নের এ কথার কারণে আপনার স্ত্রীর উপর কোনো তালাক পতিত হয়নি। তাই আপনাদের বিবাহ যথারীতি বহাল আছে।

প্রকাশ থাকে যে, শরীয়তে তালাকের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। যা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, রাগ বা স্বাভাবিক অবস্থায় এমনকি ঠাট্টাচ্ছলে দিলেও কার্যকর হয়ে যায়। তাই সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথায় কথায় এ ধরনের ধমক দেওয়া ঠিক নয়। কেননা একটু অসতর্ক হলে বা শব্দের সামান্য হেরফেরের কারণে এ ধরনের বাক্য দ্বারা তালাক হয়ে যাওয়ার প্রবল আশংকা থাকে। তাই ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা আবশ্যক। -কিতাবুল আছল ৪/৪৫৬; বাদায়েউস সানায়ে ৩/১৭১; আলইখতিয়ার ৩/১৮০; আলবাহরুর রায়েক ৩/৩০৫

শেয়ার লিংক

তাইয়িব হাসান - ভালুকা, ময়মনসিংহ

৫২১০. প্রশ্ন

আমরা এক ভাই এক বোন। আমার এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। তার বয়স বর্তমানে এক বছর। আর আমার বোনের এক ছেলে। তার বয়স ৫ বছর। আমাদের পরিবারে আমার মেয়ের জন্য যেহেতু আমার দুলাভাই এবং ভাগ্নেই গাইরে মাহরাম তাই আমরা চিন্তা করছি, আমার বোন যদি আমার মেয়ের দুধ মা হয়ে যায় তাহলে তার জন্য আর পর্দা করতে হবে না। কিন্তু আমার বোনের এখন কোন দুধের বাচ্চা নেই। আমার মেয়েকে আমার বোন দুধ পান করাতে হলে ওষুধ খেতে হবে। এভাবে ওষুধ খাওয়ার পর যদি বুকে দুধ আসে এবং আমার মেয়েকে তা খাওয়ায় তবে আমার দুলাভাই কি আমার মেয়ের দুধপিতা এবং আমার ভাগ্নে আমার মেয়ের দুধভাই বলে গণ্য হবে? মাসআলাটির সঠিক সমাধান জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন। আল্লাহ তাআলা আপনাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন।

উত্তর

ওষুধ খেয়ে দুধ আসলেও সে দুধ আপনার মেয়েকে খাওয়ালে আপনার বোন আপনার মেয়ের দুধমা হয়ে যাবেন এবং এই বোনের ছেলেও আপনার মেয়ের দুধভাই হয়ে যাবে। কিন্তু এই দুধ খাওয়ানোর দ্বারা আপনার দুলাভাই আপনার মেয়ের দুধপিতা বলে গণ্য হবে না। কেননা কোনো ব্যক্তি দুধপিতা কেবল তখনই হবে যখন তার থেকে সন্তান হওয়ার কারণে দুধ হয়। অবশ্য আপন মায়ের স্বামী যেমন নিজের পিতা না হলেও মাহরামের অন্তর্ভুক্ত তেমনিভাবে দুধ মার স্বামী দুধ পিতা না হলেও মাহরামের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মাজীদে সূরা নিসার ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে যে চৌদ্দ শ্রেণীর মহিলার সাথে বিবাহ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এর এক প্রকার হল-

وَ رَبَآىِٕبُكُمُ الّٰتِیْ فِیْ حُجُوْرِكُمْ مِّنْ نِّسَآىِٕكُمُ الّٰتِیْ دَخَلْتُمْ بِهِنَّ.

অর্থাৎ এমন স্ত্রীর কন্যা, যেই স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়েছে। [সূরা নিসা (৪) : ২৩]

এখানে স্ত্রীর কন্যাএর মাঝে স্ত্রীর আপন মেয়ে যেমন রয়েছে তেমনিভাবে স্ত্রীর দুধ মেয়েও এর অন্তর্ভুক্ত। উক্ত আয়াতের তাফসীরে ইমাম বাগাবী রাহ. বলেন-

وَيَحْرُمُ عَلَيْهِ أَيْضًا بَنَاتُ الْمَنْكُوحَةِ وَبَنَاتُ أَوْلَادِهَا، وَإِنْ سَفَلْنَ مِنَ الرّضَاعِ وَالنّسَبِ بَعْدَ الدّخُولِ بِالْمَنْكُوحَةِ.

অর্থাৎ নিজের স্ত্রীর মেয়ে যেমন তার জন্য হারাম তেমনি স্ত্রীর মেয়ের মেয়ে এবং তার অধস্তন সকল মেয়েরাও তার জন্য হারাম। চাই সে তার স্ত্রীর দুধ মেয়ে হোক বা আপন মেয়ে। সবাই তার জন্য হারাম। (তাফসীরে বাগাবী-মাআলিমুত তানযীল ১/৫৯৩)

অতএব প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার বোন আপনার মেয়েকে এভাবে দুধ পান করালে এর দ্বারা আপনার দুলাভাই আপনার মেয়ের দুধপিতা না হলেও নিজের স্ত্রীর দুধ মেয়ে হিসেবে সে তার মাহরাম হয়ে যাবে। তবে এর দ্বারা আপনার দুলাভাইয়ের অন্য কোনো আত্মীয় (যেমন, দুলাভায়ের পিতা, ভাই) আপনার মেয়ের মাহরাম সাব্যস্ত হবে না।

-কিতাবুল আছল ৪/৩৬৯; আলমুহীতুল বুরহানী ৪/৯৭; ফাতহুল কাদীর ৩/৩১৩, ৩১৪; আলবাহরুর রায়েক ৩/২২৬, ৩/২২৫-৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৩৪৩; রদ্দুল মুহতার ৩/২২১; আলজাওহারাতুন নাইয়িরা ২/২৭; দুরারুল হুক্কাম শরহু গুরারিল আহকাম ১/৩৫৬

শেয়ার লিংক

মুহাম্মদ রাহাত করীম - চাটখিল, নোয়াখালী

৫২০৯. প্রশ্ন

পাঁচ বছর আগে আব্বুর সাথে ওমরা করার তৌফিক হয়। সেটা ছিল আমাদের প্রথম ওমরা। আমরা যখন তাওয়াফ ও সায়ী শেষ করে ইহরাম থেকে বের হওয়ার জন্য চুল কাটবো। তখন একটা বিষয় নিয়ে আমাদের মাঝে সংশয় দেখা দেয়। বিষয়টি হল, আমরা দুজনই তো ইহরাম অবস্থায় আছি। আর শুনেছি যে, এক মুহরিম আরেক মুহরিমের চুল কাটলে দম দিতে হয়। এজন্য  আব্বু মারওয়াতে এক ব্যক্তিকে, যে আগেই হালাল হয়ে গিয়েছিল অনুরোধ করলে সে কাঁচি দ্বারা আমাদের উভয়ের অল্প কিছু চুল কেটে দেয়। পরে আমরা হোটেলে এসে পূর্ণ মাথার চুল কাটি। প্রশ্ন হল, আমাদের এভাবে হালাল হওয়া সহীহ হয়েছে কি না? অল্পস্বল্প চুল কাটার দ্বারাও কি হালাল হওয়া যায়?

উত্তর

হজ¦ বা উমরা আদায়কারী হলকের আগ পর্যন্ত সকল কাজ আদায় করার পর নিজে হলক করার আগে অন্যের চুল কেটে দিতে পারবে। এর দ্বারা তার উপর কোনো ধরনের জরিমানা আসবে না। আর যদি মাথা মুণ্ডানো ছাড়া অন্য কাজ বাকি থাকে আর এ অবস্থায় অন্য কোনো ইহরামকারীর চুল কেটে দেয় তাহলে মুÐনকারীর উপর এক ফিতরা সমপরিমাণ সদকা করা ওয়াজিব। আর যার মাথা মুণ্ডানো হয়েছে তার কোনো আমল বাকি থাকলে তার উপর একটি দম ওয়াজিব।

লক্ষণীয় যে, মারওয়াতে অল্প চুল কাটার দ্বারা আপনারা ইহরাম থেকে হালাল হননি। পরে হোটেলে গিয়ে পূর্ণ মাথার চুল কাটার দ্বারাই হালাল হয়েছেন। কেননা চুল কাটা বা মাথা মুণ্ডানোর ক্ষেত্রে কমপক্ষে মাথার এক চতুর্থাংশের চুল কাটা বা মুণ্ডানো জরুরি। এর চেয়ে কম মুণ্ডালে বা চুল কাটলে হালাল হওয়া যায় না। চুল কাটার ক্ষেত্রে তা চুলের অগ্রভাগ থেকে আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ হওয়া জরুরি। এর চেয়ে কম পরিমাণ চুল কাটা হলে ইহরাম থেকে হালাল হবে না।

প্রকাশ থাকে যে, চুল ছোট করার চেয়ে মাথা মুণ্ডানো উত্তম। আর উভয় ক্ষেত্রেই আংশিক চুল না কেটে পূর্ণ মাথা মুণ্ডানো বা পূর্ণ মাথার চুল ছোট করাই নিয়ম।

-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১৬১৩৯; মানাসিক, মোল্লা আলী আলকারী, পৃ. ২৩০; গুনয়াতুন নাসিক, পৃ. ১৭৩, ২৫৮; আলমাসালিক ফিল মানাসিক ১/৫৭৭

শেয়ার লিংক

মাহমুদ আমিন - রাজাপুর, লক্ষীপুর

৫২০৮. প্রশ্ন

আমার নানাজানের উপর আগ থেকে হজ¦ ফরয ছিল। তিনি হজে¦ যাবেন যাবেন করতে করতে দেরী হয়ে যায়। এর মাঝে হঠাৎ করে তিনি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। যার দরুন তিনি হাঁটতে পারছিলেন না। নানা চাচ্ছেন তাড়াতাড়ি তার হজ¦টা যেন আদায় করা হয়। তাই এক ব্যক্তিকে তার পক্ষ থেকে বদলি হজ¦ করার জন্য পাঠান। সে নানাজানের পক্ষ থেকে হজ¦ আদায় করে আসে। এর প্রায় বছর খানেক পর আল্লাহর রহমতে নানা প্রায় পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এখন তিনি একা একা চলা-ফেরা করতে সক্ষম। জানার বিষয় হল, নানা সুস্থ হওয়ার পর কি ঐ হজ¦ যথেষ্ট হবে, নাকি আবার করা লাগবে? তিনি চাচ্ছেন, আবার নিজে গিয়ে হজ¦ করবেন। এটা কি তার ফরয হিসেবে গণ্য হবে না নফল হিসেবে?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার নানা যদি শারীরিক ও আর্থিকভাবে হজ¦ আদায় করতে সামর্থ্যবান হয়ে থাকেন তবে তিনি নিজে গিয়ে হজ¦ আদায় করবেন। এক্ষেত্রে তার পক্ষ থেকে আদায়কৃত হজ¦টি নফল বলে গণ্য হবে এবং বর্তমান হজ¦টি ফরয গণ্য হবে।

-শরহু মুখতাসারিত তাহাবী ২/৪৮১; আলমাবসূত, সারাখসী ৪/১৫২; ফাতাওয়া ওয়ালওয়ালিজিয়া ১/২৮৪; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/৬৪৮; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ১/৪৯২

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ কামরুজ্জামান - কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা

৫২০৭. প্রশ্ন

¤প্রতি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া দেশের নাগরিকদের প্রবেশ ঠেকাতে হঠাৎ করেই ওমরাহ ভিসা স্থগিত করেছে সৌদি আরব। এতে বিভিন্ন দেশের অনেক উমরা ইচ্ছুক ব্যক্তি উমরা আদায় করতে পারছেন না। এদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি উমরার ইহরাম বেঁধে ফেলার পর স্থগিতাদেশের সংবাদ জানতে পারেন। আমার জানামতে এমন ব্যক্তিগণ কারো মাধ্যমে হেরেম এলাকার ভেতর একটি দম জবাই করে ইহরাম থেকে মুক্ত হবেন এবং পরবর্তীতে উমরাটি কাযা করে নেবেন। কিন্তু জনৈক আলেম বলছেন, এক্ষেত্রে দম না দিয়ে রোযা রাখারও সুযোগ আছে। আমার জানার বিষয় হচ্ছে, তার বক্তব্য সঠিক কি না এবং উল্লেখিত অবস্থায় দম না দিয়ে সদকা করা বা রোযা রাখার মাধ্যমে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে কি না? জানিয়ে উপকৃত করবেন।

উত্তর

প্রশ্নোক্ত আলেমের উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে উমরার ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য হেরেমের এলাকাতে একটি দম জবাই করা আবশ্যক।  এক্ষেত্রে রোযা রাখা বা সদকা করার মাধ্যমে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর পরবর্তীতে সুযোগ মতো উমরাটির কাযা করে নিতে হবে।

-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১৪৩৭১-২; মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা ২/১৯৪; আলমাবসূত, সারাখসী ৪/১১৩; তুহফাতুল ফুকাহা ১/৪১৭; বাদায়েউস সানায়ে ২/৩৯৯; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৩০৬; আলবাহরুর রায়েক ৩/৫৪; মানাসিক, মোল্লা আলী আলকারী, পৃ. ৪২১

শেয়ার লিংক

আতহার আলী - সিলেট

৫২০৬. প্রশ্ন

আমি মসজিদের মুআযযিন। গত রমযানের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করেছিলাম। ইতিকাফের সময়ও আমাকে আযান দিতে হত। আযান দেওয়ার স্থানটি মসজিদের একটু বাইরে একটা রুমে। মসজিদ থেকে একটু বের হয়ে সেখানে যেতে হয়। এক ভাই আমার এ অবস্থা দেখে বললেন, আমার মসজিদ থেকে বের হয়ে সেখানে গিয়ে আযান দেওয়া বৈধ হয়নি।

হুযুরের নিকট জানতে চাচ্ছি, আমার জন্য মসজিদের বাইরে কামরায় গিয়ে আযান দেওয়া বৈধ হয়েছে কি না? আমার ইতিকাফ কি নষ্ট হয়ে গেছে?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ব্যক্তির কথা ঠিক নয়। আযানের জন্য বাইরে আযানস্থলে যাওয়ার দ্বারা আপনার ইতিকাফ নষ্ট হয়নি। কারণ ইতিকাফ অবস্থায় আযানের জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে।

-কিতাবুল আছল ২/১৯১; শরহু মুখতাসারিত তাহাবী ২/৪৭৫; ফাতাওয়া ওয়ালওয়ালিজিয়া ১/২৪৪; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৬৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২১২

শেয়ার লিংক

আব্দুস সালাম - চরফ্যাশন, ভোলা

৫২০৫. প্রশ্ন

আমি মোবাইলে কথা বলছিলাম। এর মধ্যে আযান শুরু হয়ে যায়। কথা বলা শেষ না হওয়াতে আযানের জবাব দিতে পারিনি। প্রশ্ন হল, কোনো কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে যদি আযান চলাকালীন আযানের জবাব দেয়ার সুযোগ না হয় তাহলে কি আযান শেষ হওয়ার পর জবাব দেওয়া যাবে?

উত্তর

হাঁ, আযানের পর খুব বেশি বিলম্ব না হলে জবাব দেওয়ার অবকাশ আছে।

-আলবাহরুর রায়েক ১/২৬০; আদ্দুররুল মুখতার ১/৩৯৭; তুহফাতুল মুহতাজ ২/১১০

শেয়ার লিংক

আবদুল হাসীব - চাঁদপুর

৫২০৪. প্রশ্ন

দুই দিন আগে মসজিদে আছরের চার রাকআত সুন্নত পড়ছিলাম। ইত্যবসরে জামাত দাঁড়িয়ে গেলে দুই রাকাতের পর সালাম ফিরিয়ে জামাতে শরীক হয়ে যাই। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন কি আমাকে অবশিষ্ট দুই রাকাত কাযা করত হবে? কেননা আমি তো চার রাকাতের নিয়তে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত পড়েছি?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে অবশিষ্ট দুই রাকাতের কাযা জরুরি নয়। কেননা সুন্নত ও নফল নামাযের ক্ষেত্রে চার রাকাতের নিয়তে নামায শুরু করলেও শুধু প্রথম দুই রাকাতই ওয়াজিব হয়। তৃতীয় রাকাত শুরু করার আগ পর্যন্ত অবশিষ্ট দুই রাকাত ওয়াজিব হয় না।

-কিতাবুল আছল ১/১৩৪; বাদায়েউস সানায়ে ২/৭; আলমুহীতুল বুরহানী ২/২১৯; তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৪৩৫; মাজমাউল আনহুর ১/১৯৮

শেয়ার লিংক

যাকির হুসাইন - রমনা, ঢাকা

৫২০৩. প্রশ্ন

নামাযের মধ্যে যদি কারো হাই আসে তবে সে কী করবে? নিজের হাত মুখের উপর রাখা কি যথেষ্ট? নাকি হাই আটকানোরও চেষ্টা করতে হবে? গতদিন জুমআর বয়ানে খতীব সাহেব বললেন যে, হাই আসার পর আটকানো সম্ভব হওয়া সত্তে¡ও কেউ যদি মুখের উপর হাত রাখে তাহলে সেটা মাকরূহ হবে। তার কথাটি কি সহীহ?

উত্তর

হাঁ, প্রশ্নোক্ত কথাটি সহীহ। নামাযে কারো হাই আসলে যথাসম্ভব তা আটকানোর চেষ্টা করবে। হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدّهُ مَا اسْتَطَاعَ.

কারো হাই আসলে সে যেন তা যথাসম্ভব আটকানোর চেষ্টা করে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬২২৬)

অবশ্য যদি আটকানো কষ্টকর হয় তাহলে হাত মুখের উপর রেখে দেবে। যতক্ষণ পর্যন্ত হাই আটকানো সম্ভব হয় ততক্ষণ হাত ব্যবহার করবে না।

-খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/৫৭; হালবাতুল মুজাল্লী ২/২৩১; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ১/৩১৪; আলবাহরুর রায়েক ২/৫২; আলইখতিয়ার ১/২১৫; হালবাতুল মুজাল্লী ২/২৩১; রদ্দুল মুহতার ১/৬৪৫

শেয়ার লিংক

আলি আসগর - না. গঞ্জ

৫২০২. প্রশ্ন

নামাযের মধ্যে সিজদার আয়াত পাঠের পর ভুলে যথাসময়ে সিজদা আদায় না করলে কী করণীয়? একজন হাফেজ সাহেব বললেন যে, নামায শেষ হওয়ার আগে যদি স্মরণ হয়ে যায় তাহলে তা আদায় করে নিবে এবং পরে সাহু সিজদা করবে। তার কথাটি কি ঠিক?

উত্তর

হাঁ, হাফেজ সাহেবের কথাটি সঠিক। নামাযে সিজদার আয়াত পাঠের পর ভুলে যথাসময়ে সিজদা আদায় না করার পর যদি নামাযের মধ্যেই বিষয়টি স্মরণ হয় তাহলে উত্তম হলো, স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে সিজদাটি আদায় করে নিবে। এবং বিলম্বে সিজদা দেওয়ার কারণে নামায শেষে সাহু সিজদা করবে।

-কিতাবুল আছল ১/২০৫; বাদায়েউস সানায়ে ১/৪০২; আলমুহীতুল বুরহানী ২/৩৩৫; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/১৭৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১২৬

শেয়ার লিংক

কামরান আহমদ - বাইতুন নূর মাদরাসা, ঢাকা

৫২০১. প্রশ্ন

অনেকসময় নামাযে মাথা থেকে টুপি পড়ে যায়। এক্ষেত্রে করণীয় কী?

উত্তর

নামাযে টুপি পড়ে গেলে যদি এক হাত দ্বারা তা উঠিয়ে পরে নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে টুপি উঠিয়ে পরে নেওয়াই উত্তম। আর যদি দুই হাত ব্যবহার করা ছাড়া উঠানো সম্ভব না হয় তাহলে সেক্ষেত্রে টুপি না উঠানোই উচিত। এতে নামাযের কোনো ক্ষতি হবে না।

প্রকাশ থাকে যে, দাঁড়ানো কিংবা রুকু অবস্থায় টুপি পড়ে গেলে তা উঠানোর চেষ্টা করবে না। আর সিজদা বা বৈঠকের সময় এমনটি হলে উপরোক্ত পন্থায় উঠিয়ে পরে নিবে।

-ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১/২০৩; শরহুল মুনইয়া পৃ. ৪৪২; দুরারুল হুক্কাম ১/১১১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১০২; রদ্দুল মুহতার ১/৬২৫

শেয়ার লিংক

রহমাতুল্লাহ - সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ

৫২০০. প্রশ্ন

একদিন মাদরাসার দফতরে একাকী ফযরের নামায পড়ছিলাম। সেখানে দুজন ছাত্র এসে আমার ইকতেদা করতঃ আমার সাথে নামাযে শরীক হয়ে যায়। আমি একাকী নামায আদায়কারী ব্যক্তি যেভাবে নামায পড়ে সেভাবেই নামায শেষ করি। নামায শেষে এদের একজন বলল, আপনার জন্য উচ্চ স্বরে কিরাত পড়া জরুরি ছিল। প্রশ্ন হল, এক্ষেত্রে সঠিক নিয়মটা কী? কেউ যদি উঁচু আওয়াজে না পড়ে, তাহলে কি তার নামায হবে?

উত্তর

একাকী নামায আদায়কারী ব্যক্তির পেছনে কেউ যদি ইকতেদা করে আর সে ঐ ব্যক্তির ইমামতির নিয়ত করে তাহলে তার উপর ইমামের বিধান আরোপিত হবে। অর্থাৎ উচ্চ স্বরে কিরাত বিশিষ্ট নামাযে জোরে কিরাত পড়া আবশ্যক হবে। এক্ষেত্রে কিরাত অবস্থায় কেউ শরীক হলে বাকি কিরাত তাকে উচ্চ স্বরেই পড়তে হবে। আর যদি একাকী নামায আদায়কারী ব্যক্তি শরীক হওয়া লোকটির ইমামতির নিয়ত না করে তাহলে তার উপর উচ্চ স্বরে কিরাত পড়া আবশ্যক হবে না। এক্ষেত্রে নি¤œ স্বরে কিরাত পড়লেও সকলের নামায সহীহ হয়ে যাবে। অতএব প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনি যদি ঐ ছাত্রদের ইমামতির নিয়ত করে থাকেন তাহলে আপনার উপর উচ্চ স্বরে কিরাত পড়া আবশ্যক ছিল। তা না করার কারণে সিজাদায়ে সাহু ওয়াজিব হয়েছিল। আর যদি ইমামতির নিয়ত না করে থাকেন তাহলে নি¤œ স্বরে কিরাত পড়ার দ্বারাও নামায সহীহ হয়ে গিয়েছে।

-শরহুল মুনইয়া, পৃ. ৬১৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৭২; রদ্দুল মুহতার ১/৫৩২; জামেউর রুমূয ১/১৬৪

শেয়ার লিংক

আব্দুল্লাহ বিন ইসমাঈল - চতুল, কানাইঘাট, সিলেট

৫১৯৯. প্রশ্ন

আজ যোহরের নামাযের পর এক মুরব্বী আমাকে ডেকে বললেন, সিজদায় তোমার পা জমিন থেকে উঠে যায়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা দুই পা জমিন থেকে উঠে গেলে তো নামাযই হবে না। বিষয়টি আমার পুরোপুরি বুঝে আসেনি। কেননা এ বিষয়ে আমি ভিন্ন মন্তব্যও শুনেছি। সঠিক মাসআলা দলীলসহ বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব?

উত্তর

সিজদার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুই পা জমিনে রাখা সুন্নতে মুআক্কাদা। আর সিজদার অধিকাংশ সময় ওযর ছাড়া দুই পা বা কোনো এক পা জমিন থেকে পৃথক রাখা মাকরূহে তাহরীমী। অবশ্য পা যদি অল্প সময়ের জন্যও জমিনে রাখে তাহলে নামায আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু পুরো সিজদার মধ্যে কোনো পায়ের সামান্য অংশও যদি একেবারেই জমিনে না লাগে তাহলে নামায হবে না।

-সহীহ বুখারী, হাদীস ৮১০; আলমুহীতুল বুরহানী ২/১২৩; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ১/৪৪৪; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/৫৫; আলবেনায়া শরহুল হেদায়া ২/২৭৫; হালবাতুল মুজাল্লী ২/৭১; আলবাহরুর রায়েক ১/৩১৮; রদ্দুল মুহতার ১/৪৪৭, ৪৯৯; শরহুল মুনইয়া, পৃ. ২৮৪

শেয়ার লিংক

মিসবাহুল ইসলাম - ঢালকানগর, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা

৫১৯৮. প্রশ্ন

শীতকালে আমাদের এলাকায় কোনো কোনো যুবক এমন কাপড় পরিধান করে, যাতে বিভিন্ন প্রাণীর ছবি থাকে। কখনো কখনো এ ধরনের কাপড় নিয়ে তারা নামাযও পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ কারণে নামাযের কোনো সমস্যা হবে কি না?

উত্তর

প্রাণীর স্পষ্ট ছবি, যা দৃশ্যমান- এমন কাপড় পরিধান করা মাকরূহ। এবং এ ধরনের কাপড় পরে নামায পড়াও মাকরূহ। এ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। তবে এমন কাপড় পরে নামায পড়া মাকরূহ হলেও নামায আদায় হয়ে যাবে। তা পুনরায় পড়তে হবে না।

-খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/৫৮; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ১/৩১২; আলমুহীতুল বুরহানী ২/১৩৯; আলহাবিল কুদসী ১/২০৯; হালবাতুল মুজাল্লী ২/২৯৬; আলবাহরুর রায়েক ২/২৭

শেয়ার লিংক

শাহজাদ পারভেজ - সিলেট

৫১৯৭. প্রশ্ন

কোনো কোনো লোককে দেখা যায় যে, চোখ বন্ধ করে নামায পড়ে। জিজ্ঞেস করলে বলে যে, এর দ্বারা নামাযে মন বসে, একাগ্রতা তৈরি হয়। এমন করা কি ঠিক?

উত্তর

নামাযে প্রয়োজন ছাড়া চোখ বন্ধ রাখা মাকরূহ তানযিহী। অবশ্য বিশেষ ক্ষেত্রে বা প্রয়োজনে অসুবিধা নেই। যেমন, ব্যথার কারণে চোখ খুলতে না পারা কিংবা একাগ্রতা বিনষ্টকারী কোনো কিছু নামাযীর সামনে চলে আসার কারণে এমনটি করলে মাকরূহ হবে না। তবে নামাযে চোখ বন্ধ রাখার অভ্যাস করে নেওয়া ঠিক নয়।

-বাদায়েউস সানায়ে ১/৫০৭; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ১/৩১০; আলইখতিয়ার ১/২১৫; আলবাহরুর রায়েক ২/২৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/১৯৯; রদ্দুল মুহতার ১/৬৪৫

শেয়ার লিংক

আলবাব আহমদ - সিলেট

৫১৯৬. প্রশ্ন

একদিন যোহরের নামাযের সময় প্রথম রাকাতের দ্বিতীয় সিজদাটি ভুলে যাই। তৃতীয় রাকাতের সিজদা আদায় করার পর স্মরণ হলে সাথে সাথে ভুলে যাওয়া সিজদাটি আদায় করে নিই। প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কি এ ভুলের কারণে আমার উপর সিজদায়ে সাহু করা জরুরি ছিল?

উত্তর

হাঁ, প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার জন্য সিজদায়ে সাহু করা জরুরি ছিল। কেননা এক্ষেত্রে আপনি সিজদাটি আদায় করলেও তা বিলম্বে আদায় করেছেন। আর এমন বিলম্বের কারণে সিজদায়ে সাহু করা ওয়াজিব।

-কিতাবুল আছল ১/২০৬; বাদায়েউস সানায়ে ১/৪০১; আলবাহরুর রায়েক ২/৯৪; ফাতহুল কাদীর ১/৪৩৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১২৭

শেয়ার লিংক

উম্মে আবদুর রহমান - বসিলা, ঢাকা

৫১৯৫. প্রশ্ন

আল্লাহর রহমতে আমার মেয়ে এ বছর হিফয শেষ করেছে। আমরা ঘরের মহিলারা এবং ওর কয়েকজন চাচি নিয়ত করেছে, আমার মেয়ের পেছনে খতম তারাবীহ পড়বে। যাতে ওর হিফ্জ মজবুত হয়ে যায় এবং আমাদেরও খতম হয়ে যায়। কিন্তু আমার এক ভাশুর বলেছেন, মহিলাদের পেছনে তারাবীহ পড়া যায় না। এ বিষয়ে সঠিক মাসআলাটি জানালে উপকৃত হতাম।

উত্তর

মহিলার ইমামতি মাকরূহে তাহরীমী তথা নাজায়েয। তারাবীর নামাযের জামাতেরও একই হুকুম। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বার এক বর্ণনায় এসেছে, হযরত আলী রা. বলেন-

لاَ تَؤُمّ الْمَرْأَةُ.

কোনো মহিলা যেন ইমামতি না করে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, বর্ণনা ৪৯৯৪)

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে ইবনে আউন রাহ. বলেন-

كَتَبْتُ إلَى نَافِعٍ أَسْأَلُهُ، أَتَؤُمّ الْمَرْأَةُ النِّسَاءَ؟ فَقَالَ : لاَ أَعْلَمُ الْمَرْأَةَ تَؤُمّ النِّسَاءَ.

আমি নাফে রাহ.-কে পত্রলিখে জিজ্ঞেস করলাম- কোনো মহিলা কি অন্য মহিলাদের ইমামতি করতে পারবে? (উত্তরে) নাফে রাহ. বললেন, ‘আমার জানামতে কোনো মহিলা অন্য মহিলাদের ইমামতি করতে পারবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, বর্ণনা ৪৯৯৫)

তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার মেয়ের ইমামতিতে ঐ তারাবীহের জামাতের আয়োজন করা ঠিক হবে না।

প্রকাশ থাকে যে, হাফেযা মহিলা কুরআনুল কারীম ইয়াদ রাখার জন্য নিয়মিত তিলাওয়াত করবে, অন্য হাফেযার সাথে দাওর করবে এবং তারাবীতে একাকী খতম করবে।

-কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মাদ, বর্ণনা ২১৭; তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৩৪৮; ফাতহুল কাদীর ১/৩০৬; বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৮৭; আলইখতিয়ার ১/২১০; আলবাহরুর রায়েক ১/৩৫১; আদ্দুররুল মুখতার ১/৫৬৫

শেয়ার লিংক

ইকবাল হোসেন - মতলব, চাঁদপুর

৫১৯৪. প্রশ্ন

আমরা কয়েকজন সহকর্মী একবার সফরে ছিলাম। দীর্ঘ যাত্রার কারণে জুমার নামায জামাতের সাথে পড়তে পারিনি। পরবর্তীতে আমরা গাড়ি থেকে নেমে এক মসজিদের বারান্দায় যোহরের নামায জামাতের সাথে আদায় করি। আমাদের এক সাথী বললেন, এমতাবস্থায় যোহরের নামায একাকী পড়তে হয়। জানার বিষয় হচ্ছে, আমাদের যোহরের নামায পড়া কি সহীহ হয়েছে?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে যোহরের নামায আদায় হয়ে গেছে। তা পুনরায় পড়তে হবে না। যেখানে জুমা আদায় করা হয় এমন এলাকায় জুমার আগে-পরে জামাত করে যোহর পড়া ঠিক নয়। এক্ষেত্রে আযান ছাড়া একাকী যোহর পড়াই নিয়ম।

عَنِ الْحَسَنِ فِي قَوْمٍ فَاتَتْهُمَ الْجُمُعَةُ، قَالَ: يُصَلّونَ شَتّى.

হাসান বসরী রাহ. বলেন, যারা জুমার নামায জামাতের সাথে আদায় করতে পারেনি তারা তা একাকী আদায় করবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৫৪৪০)

-কিতাবুল আছল ১/৩১৪; আলমুহীতুল বুরহানী ২/৪৭২; আলহাবিল কুদসী ১/২৪০; ফাতহুল কাদীর ২/৩৫; আলবাহরুর রায়েক ২/১৫৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৫৭

শেয়ার লিংক

সাইদ আহমাদ - আজিমপুর, ঢাকা

৫১৯৩. প্রশ্ন

গত ঈদের নামায পড়তে ঈদগাহে গিয়েছিলাম। অনেক মানুষ হয়েছিল। ইমাম সাহেবের বয়ানের পর নামায শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে আমার ওযু ভেঙে যায়। আমি ঈদগাহে মাঠের মধ্যখানে ছিলাম। তো মনে হল যে, এখন যদি ওযু করতে যাই তাহলে নামায হয়তো আর পাব না। কী করব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাই আমি নামাযের নিয়ত ছাড়া সবার সাথে এমনি রুকু সিজদা করি। প্রশ্ন হল, আমার এ কাজটি কি ঠিক হয়েছে? এমন অবস্থায় আমার করণীয় কী?

উত্তর

ঈদের জামাত শুরু হওয়ার পর অথবা জামাতের আগ মুহূর্তে যদি কেউ এমন অবস্থায় পড়ে যে, এখন ওযু করতে গেলে পুরো নামায ছুটে যাওয়ার আশংকা থাকে এবং পরে অন্য কোনো ঈদের জামাতে শরীক হওয়াও সম্ভব না হয়। তাহলে ঐ ব্যক্তি তায়াম্মুম করে নামায পড়ে নেবে। প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার জন্য এমনটি না করে নিয়ত ছাড়া এমনি রুকু সিজদা করা ভুল হয়েছে। এবং ঈদের নামায না পড়ার গোনাহ হয়েছে। এজন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ইস্তেগফার করবেন।

-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৫৯১৯; কিতাবুল আছল ১/৯৭; বাদায়েউস সানায়ে ১/১৭৮; আলবাহরুর রায়েক ১/১৫৮; হালবাতুল মুজাল্লী ১/২৫৩; আলইখতিয়ার ১/৮৬; মাজমাউল আনহুর ১/৬৩১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৩১

শেয়ার লিংক

আবদুল মালেক - চাঁদপুর

৫১৯২. প্রশ্ন

আমাকে এক হুজুর বলেছেন, ফজরের সুন্নতে সূরা কাফিরূন এবং সূরা ইখলাস পড়া সুন্নত। এ কথাটি কি সঠিক? দলীলসহ জানালে উপকৃত হব।

উত্তর

একাধিক বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময় ফজরের সুন্নতে প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়েছেন। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قَرَأَ فِي رَكْعَتَيِ الْفَجْرِ: قُلْ یٰۤاَیُّهَا الْكٰفِرُوْنَ، وَ قُلْ هُوَ اللهُ اَحَدٌ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের দুই রাকাত সুন্নতে- قُلْ یٰۤاَیُّهَا الْكٰفِرُوْنَقُلْ هُوَ اللهُ اَحَدٌ এ দুই সূরা পড়েছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২৬)

আরেক হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন-

رَمَقْتُ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ شَهْرًا فَكَانَ يَقْرَأُ فِي الرَّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الفَجْرِ، بِـ قُلْ یٰۤاَیُّهَا الْكٰفِرُوْنَ  وَ قُلْ هُوَ اللهُ اَحَدٌ.

আমি এক মাস পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খেয়াল করে দেখেছি, তিনি ফজরের সুন্নতে قُلْ یٰۤاَیُّهَا الْكٰفِرُوْنَ قُلْ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ এ দুই সূরা পড়েছেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস ৪১৭)

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। (সহীহ ইবেন খুযাইমা, হাদীস ১১১৪; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৬৩৯৫)

এ হাদীসের উপর ভিত্তি করে ফকীহগণ বলেছেন, ফজরের সুন্নতের দুই রাকাতে সূরা কাফিরূন এবং সূরা ইখলাস পড়া সুন্নত। তবে এটি সুন্নতে গায়রে মুআক্কাদাহ তথা মুস্তাহাব আমল। কেউ ভিন্ন সূরা পড়লে তাতেও কোনো সমস্যা নেই।

উল্লেখ্য, অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত আছে, তিনি অনেকসময় ফজরের সুন্নতের প্রথম রাকাতে সূরা বাকারার ১৩৬ নম্বর আয়াত এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নম্বর আয়াত পড়তেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

أَكْثَرُ مَا كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي رَكْعَتَيِ الْفَجْرِ: قُوْلُوْۤا اٰمَنَّا بِاللهِ وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْنَا وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلٰۤی اِبْرٰهٖمَ إِلَى آخِرِ الْآيَةِ. وَفِي الْأُخْرَى: قُلْ یٰۤاَهْلَ الْكِتٰبِ تَعَالَوْا اِلٰی كَلِمَةٍ سَوَآءٍۭ بَیْنَنَا وَ بَیْنَكُمْ إِلَى قَوْلِهِ: اشْهَدُوْا بِاَنَّا مُسْلِمُوْنَ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশির ভাগ সময় ফজরের সুন্নতের প্রথম রাকাতে قُوْلُوْۤا اٰمَنَّا بِاللهِ وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْنَا وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلٰۤی اِبْرٰهٖمَ এ আয়াতটি শেষ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় রাকাতে قُلْ یٰۤاَهْلَ الْكِتٰبِ تَعَالَوْا اِلٰی كَلِمَةٍ سَوَآءٍۭ بَیْنَنَا وَ بَیْنَكُمْ আয়াতটি اشْهَدُوْا بِاَنَّا مُسْلِمُوْنَ পর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন। (সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১১১৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২৭)

অতএব ফজরের সুন্নত নামাযে মাঝে মাঝে এই দুই আয়াত পড়াও উত্তম।

-খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/৬১; ফাতহুল কাদীর ১/২৯৪; আলবাহরুর রায়েক ১/৩৪২, ২/৪৮; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাল মারাকী পৃ. ৩৮৮; রদ্দুল মুহতার ১/৫৪৪, ২/২০

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ জুনায়েদ - মিরপুর, ঢাকা

৫১৯১. প্রশ্ন

আমরা জানি, পানি না থাকলে অথবা পানি ব্যবহার না করা গেলে ওযুর প্রয়োজন আছে- এমন কোনো ইবাদত করার জন্য তায়াম্মুম করতে হয়। কিন্তু অনেকসময় ওযুর প্রয়োজন নেই- এমন ইবাদতের জন্য পানি থাকা সত্তে¡ও আমি তায়াম্মুম করি। যেমন, দ্বীনী দরস প্রদান বা যিকির করা ইত্যাদি। আবার কখনো পানি থাকা সত্তে¡ও শুধু পবিত্র অবস্থায় থাকার উদ্দেশ্যেও তায়াম্মুম করে থাকি। জানার বিষয় হচ্ছে, আমার এভাবে তায়াম্মুম করা শরীয়তসম্মত হচ্ছে কি না? জানিয়ে উপকৃত করবেন।

উত্তর

আপনি যেসব ইবাদতের কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর জন্য পবিত্রতা অর্জন করা শর্ত না হলেও পবিত্র অবস্থায় তা আদায় করা উত্তম। এক্ষেত্রে পানি থাকলেও ওযু না করে তায়াম্মুম করার সুযোগ রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু না থাকা অবস্থায় এক ব্যক্তি তাকে সালাম দিলে তিনি তায়াম্মুম করে তার সালামের জবাব দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৩৭)

তাই পানি থাকা সত্তে¡ও দ্বীনী কোনো বিষয়ে দরস দেওয়া বা যিকির করার জন্য তায়াম্মুম করা সহীহ আছে। আর সর্বদা পবিত্র অবস্থায় থাকাও প্রশংসনীয় কাজ। এর জন্যও তায়াম্মুম করা যেতে পারে। তবে এসব কাজ পবিত্রতার সাথে আদায় করার জন্য ওযু করাই যে সর্বোত্তম পদ্ধতি- তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

মনে রাখতে হবে, যেসব ইবাদত পবিত্রতা ছাড়া আদায় করা যায় না তার জন্য এ ধরনের তায়াম্মুম যথেষ্ট নয়। পানি থাকা অবস্থায় এমন ইবাদতের জন্য ওযু করাই কর্তব্য। পানি না থাকলে তখন তায়াম্মুম করতে হবে।

-শরহুল মুনইয়া পৃ. ৮৩; আলবাহরুর রায়েক ১/১৫০; আদ্দুররুল মুখতার ১/২৪৩; আসসিআয়া ১/৫২৯

শেয়ার লিংক

আনোয়ারা বেগম - লালমোহন, ভোলা

৫১৯০. প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। আমি আনোয়ারা বেগম। আমার মোট পাঁচ সন্তান। ২ জন ছেলে, ৩ জন মেয়ে। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী। অন্য ছেলে পরিবার নিয়ে ভিন্ন থাকে। সে আমাদের ভরণ-পোষণ দেয় না। আমার স্বামী (ক্যানসারের রোগী ছিলেন) অসুস্থ হওয়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল খেদমত আমার ছোট মেয়ে করেছে এবং আমার ও আমার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলের সমস্ত দায়-দায়িত্ব মৃত্যু পর্যন্ত আমার ছোট মেয়ে বহন করবে। এই দায়-দায়িত্ব বহন করার শর্তে আমি তার নামে আমার বসত-বাড়ীর ৩১ শতাংশ জমি হেবা দলীল করে দিয়েছি। এছাড়া আমার আরো (১৪৪ শতাংশ ১৮ গণ্ডা) জমি আছে, যাতে আমার মৃত্যুর পর পাঁচ সন্তান মিরাছের ভিত্তিতে শরীক হবে। মুফতী সাহেবের কাছে আমার জানার বিষয় হল :

১. মৃত্যু পর্যন্ত আমার ও আমার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলের সকল দায়-দায়িত্ব বহন করার শর্তে আমার ছোট মেয়ের নামে বসত-বাড়ীর ৩১ শতাংশ দলীল করে দেওয়া শরীয়তসম্মত হয়েছে কি না?

২. আরো জানতে চাই, আমি আমার (১৪৪ শতাংশ ১৮ গণ্ডা) জমির আয় আমার ছোট মেয়েকে দিচ্ছি। উক্ত আয় এককভাবে তাকে দেওয়া বৈধ হচ্ছে কি না? নাকি আমার সকল সন্তানের মাঝে তা বণ্টন করে দিতে হবে?

৩. আরো জানতে চাই, আমার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলের পেছনে ছোট মেয়ের ব্যয়ের পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয়, তাহলে আমার ছেলে মিরাছসূত্রে যে সম্পদ পাবে, তা থেকে কর্তন করা যাবে কি না? নাকি ব্যয় বেশি হলেও তা ছোট মেয়েকেই বহন করতে হবে?

৪. আরো জানতে চাই, মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলে ওয়ারিশসূত্রে যে জমি পাবে, তার মৃত্যুর পর ঐ জমির মালিক কে হবে? যেহেতু তার স্ত্রী-সন্তান নেই। যেহেতু ছোট মেয়ে তার দায়-দায়িত্ব নিয়েছে, সুতরাং উক্ত সম্পদ ছোট মেয়ে পাবে, নাকি সকল ওয়ারিশই পাবে?

উপরোক্ত সব বিষয়ে দয়া করে সমাধান জানিয়ে আমাদের অস্থিরতা দূর করবেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : প্রশ্নে কেবলমাত্র আমার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে।

উত্তর

১. প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনি আপনার ও আপনার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলের মৃত্যু পর্যন্ত ব্যয়ভার বহন করার শর্তে ছোট মেয়েকে যে জমিনটুকু হেবা দলীল করে দিয়েছেন তা বৈধ হয়েছে। আপনার মেয়ে উক্ত জমি নিজে দখলে নেওয়ার দ্বারা তার মালিক হয়ে গেছে। এখন তার দায়িত্ব হল নিজের কৃত শর্ত পূরণ করা।

২. মেয়েকে হেবা করার পর আপনার মালিকানায় যে ১৪৪ শতাংশ জমি রয়েছে, তার আয়ের মালিক আপনি। উক্ত আয় কোথায় কীভাবে খরচ করবেন সে ব্যাপারে আপনার একক অধিকার রয়েছে। সন্তানরা সামর্থ্যবান হলে তাতে কারো কোনো বিশেষ অধিকার নেই। আপনি চাইলে তা নিজের কাছে জমা রাখতে পারেন। অথবা সন্তানদের তা বণ্টন করে দিতে পারেন। আবার এক্ষেত্রে ছোট মেয়ে যেহেতু একা আপনাদের দেখাশোনা করছে তাই উক্ত জমির আয় বিশেষভাবে তাকে দিতেও কোনো অসুবিধা নেই।

৩. ৪. আপনি ও আপনার অসুস্থ ছেলে যে সম্পদ নিজেদের মালিকানাধীন রেখে যাবেন তা পরবর্তীতে মীরাছনীতি অনুযায়ীই বণ্টিত হবে। আপনার ও আপনার অসুস্থ ছেলের সেবার কারণে আপনার ছোট মেয়ে কোনো অতিরিক্ত অংশ দাবি করতে পারবে না। তবে আপনি চাইলে নিজ জীবদ্দশায় তাকে এ ব্যাপারে আর্থিক সহযোগিতা করতে পারেন। -আলমুহীতুল বুরহানী ৯/১৯৯; ফাতাওয়া খানিয়া ৩/২৭৯; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৪০০

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ মিজানুর রহমান - ঘুইংগারহাট, ভোলা

৫১৮৯. প্রশ্ন

আমার একটি বিষয় জানার খুবই প্রয়োজন। যেহেতু হালাল বা হারামের বিষয় তাই মেহেরবানী করে সমাধান দিলে কৃতজ্ঞ হব।

বিষয়টি হল, আমি একটি লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানির এজেন্ট। আমি এখানে মানুষকে দিয়ে ডিপিএস করাই। কোম্পানি তা থেকে আমাকে কিছু কমিশন দেয়। আমার জানার বিষয় হল, এখান থেকে যে টাকা পাই তা কি হালাল হবে? আর যদি হালাল না হয়, তাহলে আমি কি এই টাকা মসজিদ-মাদরাসা বা অন্যান্য সেবামূলক কাজে খরচ করতে পারব? আমি কি চাকরিটা চালিয়ে যা পাই তা যদি এইভাবে ব্যয় করি, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে কি আমি দায়মুক্ত থাকব। আর যাদেরকে দিয়ে ডিপিএস করাই তাদের কাছে কি দায়ী থাকব? কেননা ডিপিএস করার এক বছরের ভিতরে ভাঙলে ডিপিএসকারী কোনো টাকাই পাবে না। এমনকি এক বছর পরে ভাঙলেও ডিপিএসকারীর কিছু লস হয়। যদিও আমি গ্রাহকদেরকে এই বিষয়গুলো জানিয়ে ডিপিএস করিয়ে থাকি।

মুফতী সাহেবকে আর একটু জানিয়ে রাখি, আমি আমার এলাকার এক আলেম থেকে জানতে পারি যে, আমাদের দেশের প্রায় সব ব্যাংক-বীমার কার্যক্রম হারামের ভিতরে পরে। তারপর আমি আমার ম্যানেজারকে বলি যে, স্যার এই চাকরি করা তো শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়। তখন সে আমাকে ড. জাকির নায়েকের একটি ভিডিও দেখায়; সেখানে তিনি বলেন, ইন্সুরেন্স করা যাবে না- এরকম কথা কুরআনের কোথাও লেখা নেই। তবে তিনি বলেছেন, যেখানে সুদ আছে সেখানে কখনোই মুমিন যেতে পারে না।

তাই মুফতী সাহেবের কাছে আমার আকুল আবেদন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শরীয়তের দলীল দ্বারা দিলে আমি অনেক উপকৃত হব এবং হারাম থেকে বাঁচতে পারব।

উত্তর

লাইফ ইন্সুরেন্সে শরীয়ত নিষিদ্ধ রিবা, কিমার ও আলগারার সবই বিদ্যমান। আর এসবকিছুই ইসলামে হারাম। এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা বা এজেন্ট হওয়ার মানে হল হারাম ও জঘন্যতম গুনাহের কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَ تَعَاوَنُوْا عَلَی الْبِرِّ وَ التَّقْوٰی وَ لَا تَعَاوَنُوْا عَلَی الْاِثْمِ وَ الْعُدْوَانِ.

তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য কর, পাপ কাজে ও জুলুমে একে অপরকে সাহায্য করো না। -সূরা মায়েদা (৫) : ৩

সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্য এ ধরনের কোম্পানিতে চাকরি করা বা এজেন্ট হওয়া জায়েয নয়। এখান থেকে যে কমিশন বা বেতন দেওয়া হয় তা-ও বৈধ নয়। এটাকা গ্রহণ করে ফেললে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরীব-মিসকীনদের দিয়ে দিতে হবে।

আপনার মাধ্যমে যারা ডিপিএস করেছেন, তাদেরকে যদি আপনি কোম্পানির নিয়ম-নীতি সম্পর্কে ভুল কোনো তথ্য না দিয়ে থাকেন, তাহলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর দায়ভার আপনার উপর আসবে না।

-সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ২৩৫৯৩; আলমাবসূত, সারাখসী ১৬/৩৮; তাবয়ীনুল হাকায়েক ৭/৬০; বাযলুল মাজহুদ ১/১৪৮

শেয়ার লিংক

নূর মুহাম্মাদ মণ্ডল - মহাব্যবস্থাপক (অব.) বিএডিসি-কৃষিভবন, ঢাকা

৫১৮৮. প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আমি বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন)-এ কর্মরত ছিলাম। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। বিএডিসি একটি কর্পোরেশন হলেও সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীর যাবতীয় বিধান অনুসরণপূর্বক বেতন-ভাতাদিসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। জাতীয় বেতন স্কেল অনুসরণে বেতন-ভাতাদি ও চাকরির অবসরকালীন যাবতীয় আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়। তবে সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারিদের অবসরকালীন পেনশন ও গ্রাচ্যুটি প্রদান করা হয় আর বিএডিসির কর্মকর্তাদের সরকারি কর্মকর্তাদের ন্যায় পেনশন প্রদান করা হয় না। বিএডিসির কর্মকর্তা/কর্মচারীদের গ্রাচ্যুটি ও প্রভিডেন্ট-এর সুবিধা প্রদান করা হয়। তাই, জানতে চাই গ্রাচ্যুটি/প্রভিডেন্ট ফান্ড হতে প্রাপ্ত অর্থ পেনশন স্কিম (সঞ্চয়পত্র)-এ রাখা যাবে কি না? পেনশন স্কিমের সুবিধা হল, পঞ্চাশ লক্ষ টাকা জমা রাখলে প্রতি তিন মাস পর পর পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রদান করা হয় এবং মূল অর্থ অক্ষত থাকে।

উল্লেখ্য, সরকারের জাতীয় স্কেলভুক্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীরাই শুধু পেনশন স্কিম (সঞ্চয়পত্র)-এ টাকা লগ্নি করতে পারে।

উত্তর

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। পেনশন স্কিম বা সঞ্চয়পত্র একটি সুদি স্কিম। এ থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত অর্থ সুদ। আর ইসলামে সুদ নিকৃষ্টতম হারাম। প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য তা থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ اَحَلَّ اللّٰهُ الْبَیْعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا.

আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম। -সূরা বাকারা (২) : ২৭৫

জাবের রা. বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُؤْكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ.

সুদ গ্রহণকারী, সুদপ্রদানকারী, সুদের হিসাব লেখক এবং সুদের সাক্ষী- এদের সবার উপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন এবং বলেছেন (গুনাহের ক্ষেত্রে) তারা সকলেই সমান। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮

উল্লেখ্য, পেনশন স্কিম কেবলমাত্র সরকারি চাকরিজীবীদের দেওয়া হয়। তাই সরকারি হওয়ার কারণে কারো মধ্যে এ ধারণা থাকতে পারে যে, এটি সুদ নয়। এমন ধারণা অমূলক।

-আহকামুল কুরআন, জাসসাস ১/৪৬৯; ফাতহুল কাদীর ৬/১৪৬; আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৬/৪৩৬

শেয়ার লিংক

নুরুল আলম - মিরপুর, ঢাকা

৫১৮৭. প্রশ্ন

আমাদের এলাকায় ব্যবসায়ীগণ একধরনের সমিতি করে থাকে। সমিতিতে দুটি পক্ষ থাকে। এক. মালিক পক্ষ। দুই. সদস্য পক্ষ। যারা সদস্য হয় তাদের সাথে মালিক পক্ষের চুক্তি হয় নি¤œরূপ :

সমিতির মেয়াদ এক বছর (৩৬৫ দিন)। মালিকপক্ষ দৈনিক নির্ধারিত পরিমাণ টাকা (১০০০/২০০০/৫০০০) সদস্যের দোকান থেকে উত্তোল করবে। এভাবে এক বছর (৩৬৫দিন) টাকা তুলবে। বছর শেষে উত্তোলনকৃত টাকা থেকে ৩৬০ দিনের টাকা মালিক পক্ষ সদস্যকে ফেরত দেবে, আর অবশিষ্ট ৫ দিনের টাকা দৈনিক টাকা উত্তোলনের পারিশ্রমিক বাবদ মালিকপক্ষ রেখে দেবে।

উল্লেখ্য, মালিকপক্ষ নিজে দোকানে দোকানে গিয়ে এই টাকা উত্তোলন করে কিংবা টাকা তোলার জন্য বেতনের উপর কোনো কর্মচারী নিয়োগ করে। উত্তোলনকৃত টাকা মালিকপক্ষের হাতে যতদিন থাকবে ততদিন এই টাকা স্বাধীনভাবে মালিকপক্ষ যেকোনো কাজে ব্যবহার করতে পারবে। যারা সদস্য হয় তাদের কারো কারো নিয়ত থাকে, এক বছর টাকা জমানোর পর এই টাকা বছর শেষে উত্তোলন করবে। আবার কারো নিয়ত থাকে, ৩৬০ দিনে সে যে টাকা জমা করবে (যেমন দৈনিক ১০০০ টাকা করে জমা করলে তিন লাখ ষাট হাজার টাকা) তা বছরের মাঝেই উত্তোলন করে নেয়ার আবেদন করবে। মালিকপক্ষের জন্য তার আবেদন গ্রহণ করা বা না করার অধিকার থাকবে। আবেদন গ্রহণ করলেও কখনো পুরো বছরের টাকাই দিয়ে দেয় অথবা এর চেয়ে কিছু কম দেয়। (তবে সবসময়ই তা বর্তমান জমাকৃত টাকার চেয়ে বেশি হয়ে থাকে।)

আর কেউ এ ধরনের চুক্তি করেই সমিতির সদস্য হয়। সেক্ষেত্রে মালিকপক্ষ সদস্যের সাথে চুক্তির কারণে বছরের মাঝখানে ৩৬০ দিনের টাকা সদস্যকে প্রদান করে।

উপরোক্ত অবস্থায় মালিকপক্ষ সদস্য থেকে পাঁচ দিনের টাকার চেয়ে অতিরিক্ত কোনো অর্থ গ্রহণ করে না।

মুফতী সাহেবের কাছে জানতে চাচ্ছি, শরীয়তের দৃষ্টিতে এই লেনদেন সহীহ কি না? সহীহ না হয়ে থাকলে শরীয়তসম্মতভাবে করার জন্য এতে কী কী পরিবর্তন আনতে হবে?

উত্তর

প্রশ্নোক্ত সমিতিতে সদস্যদের টাকা উত্তোলনের তিনটি পদ্ধতি বলা হয়েছে-

১) বছর শেষে পুরো টাকা উত্তোলন করা।

২) পুরো বছরে যে পরিমাণ টাকা জমা করা হবে বছরের মাঝেই তা উত্তোলনের আবেদন করা।

৩) বছরের মাঝে পুরো বছরের টাকা উত্তোলন করার শর্তে সমিতিতে অংশগ্রহণ করা।

প্রথম পদ্ধতিতে সদস্যরা যেহেতু নিজেদের জমানো টাকাই উত্তোলন করে তাই এতে কোনো অসুবিধা নেই।

দ্বিতীয় পদ্ধতিতে মালিকপক্ষের যেহেতু সদস্যদের আবেদন মঞ্জুর করা বা না করার পুরো অধিকার রয়েছে  (যেমনটি প্রশ্নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে) তাই মালিকপক্ষ যদি সদস্যদের আবেদন মঞ্জুর করে উক্ত টাকা প্রদান করে তাহলে তা জায়েয হবে। এক্ষেত্রে সমিতিতে টাকা জমা করা এবং মালিকপক্ষ থেকে অগ্রিম টাকা গ্রহণের আবেদন পৃথক পৃথক হতে হবে। একটির সাথে অন্যটিকে শর্তযুক্ত করা যাবে না। আর সমিতির পক্ষ থেকে জমাকৃত টাকার অতিরিক্ত যা দেওয়া হবে তা করযে হাসানা হবে।

তৃতীয় পদ্ধতিতে যেহেতু মালিকপক্ষ থেকে ঋণ পাওয়ার শর্তে সমিতিতে অংশগ্রহণ করা হয় তাই এ পদ্ধতি বৈধ নয়। কেননা সদস্যরা সমিতিতে যা জমা করে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে ঋণ হিসেবে বিবেচিত। আর কারো থেকে ভবিষ্যতে ঋণ পাওয়ার শর্তে তাকে ঋণ প্রদান করা জায়েয নয়। তাই এ পদ্ধতি বাদ দিতে হবে।

আর প্রশ্নে সমিতির আয়োজকদের পক্ষ থেকে ৫ দিনের টাকা খরচ বাবদ রেখে দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে তা জায়েয হবে না। কেননা আয়োজকগণ কর্তৃক উক্ত টাকা নিজেদের কাজে খরচ করার বিষয়টি থাকায় শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি الأمانة المضمونة -এর অন্তর্ভুক্ত, যা القرض তথা ঋণ-এর হুকুমে। আর কারো থেকে ঋণ গ্রহণ করতে গিয়ে তার থেকে সার্ভিস চার্জ নেওয়ার বিধান শরীয়তে নেই। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৩৭৮৩; আলজামে লিআহকামিল কুরআন, কুরতুবী ২/২২৫; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৩/৫৩; বাদায়েউস সানায়ে ৬/৫১৮; আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৬/৪৩৭

শেয়ার লিংক

মাওলানা মুহাম্মাদ উমায়ের - চাঁদপুর

৫১৮৬. প্রশ্ন

আমি আমার এক বন্ধু থেকে বিকাশের মাধ্যমে কিছু টাকা ঋণ নিয়েছি। সে টাকা ক্যাশআউট করার কোনো খরচ সে দেয়নি। আমি খরচ দিয়ে ক্যাশআউট করেছি। এখন টাকা ফেরত দেওয়ার সময় উক্ত খরচের টাকা কেটে রাখতে পারব কি না? আর ঋণ পরিশোধের সময় আমি যদি টাকাগুলো পুনরায় বিকাশের মাধ্যমে পাঠাই তাহলে সেক্ষেত্রে ক্যাশআউট করার খরচ আমাকে দিতে হবে কি না? জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

ঋণ বা করজে হাসানার পুরো টাকা ঋণদাতার প্রাপ্য। ঋণ দেওয়া-নেওয়ার মাঝে বাস্তব কোনো খরচ হলে তা ঋণগ্রহীতা বহন করবে; ঋণদাতা নয়। সুতরাং বিকাশের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করলে তা ক্যাশআউট করার খরচ আপনাকেই বহন করতে হবে। এ টাকা ঋণের টাকা থেকে কেটে রাখা জায়েয হবে না। তদ্রƒপ ঋণের টাকা বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করলেও আপনাকেই তার ক্যাশআউট করার খরচ প্রদান করতে হবে। এসংক্রান্ত কোনো খরচই ঋণদাতার উপর চাপানো যাবে না। তবে ঋণদাতা স্বেচ্ছায় কোনো খরচ প্রদান করতে চাইলে এটা তার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও ছাড় ধরে নেওয়া হবে এবং তা গ্রহণ করা জায়েয হবে।

-আলমুহীতুল বুরহানী ১১/৩১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৪/৩৭২; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯; রদ্দুল মুহতার ৫/৬৮২

শেয়ার লিংক

মুনির হুসাইন - কিশোরগঞ্জ

৫১৮৫. প্রশ্ন

মাননীয় মুফতী সাহেব, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা।

জনাব, আমাদের জানার বিষয় হচ্ছে :

(১) জামে মসজিদের উপর মাদরাসা করা যাবে কি না?

(২) মসজিদের উন্নয়নকল্পে অতিরিক্ত ওয়াক্ফকৃত জমিতে মাদরাসা করা যাবে কি না?

(৩) মসজিদের ওয়াক্ফকৃত জমির ভাড়ার টাকা প্রতি মাসে এত পরিমাণ জমা হয়, যার ২৫% টাকা মসজিদের কাজে লাগে, বাকি ৭৫% টাকা জমা থেকে যায়। উক্ত ৭৫% টাকা মাদরাসার কাজে ব্যবহার করা যাবে কি না? অন্যথায় উক্ত টাকা-পয়সার জন্য কী ব্যবস্থা করা যেতে পারে? জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর

(১) মসজিদের উপর ও নিচতলাসহ পুরোটাই মসজিদ হিসেবে বহাল রাখা আবশ্যক। তাই মসজিদের উপরে স্থায়ীভাবে মাদরাসা বা অন্যকিছু প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তবে দ্বীনী ইলমের তালীম মসজিদের মৌলিক উদ্দেশ্যাবলী ও কার্যক্রমের অংশ। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীতে দ্বীনী তালীমের গোড়াপত্তন করেছেন। তাই মসজিদে প্রয়োজনীয় দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা শরীয়তের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে মসজিদে তালীম হওয়া উচিত অনাবাসিক ভিত্তিতে। স্থায়ীভাবে আবাসিক মাদরাসা করা যাবে না। কোনো এলাকায় দ্বীনী শিক্ষার জন্য পৃথক ব্যবস্থা না থাকলে অস্থায়ী ভিত্তিতে ভিন্ন আয়োজন হওয়া পর্যন্ত মসজিদে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে উস্তায, তালিবে ইলম ও সংশ্লিষ্ট সকলকে অবশ্যই মসজিদের সম্মান ও আদব যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। মসজিদের আদব ক্ষুণœ হয় এমন সব আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। সাথে সাথে মুসলমানদের নামায ও ইবাদতে বিঘœ ঘটে এমন সকল কাজ থেকেও বিরত থাকতে হবে এবং এলাকায় দ্বীনী তালীমের ব্যবস্থা হলে আবাসিক ব্যবস্থা মসজিদ থেকে সরিয়ে নিতে হবে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ১৭২৬; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২২৯; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৬৫; আলবাহরুর রায়েক ২/৩৫

(২) মসজিদের উন্নয়নের জন্য ওয়াক্ফকৃত জায়গা মসজিদের কাজে ব্যবহার করাই শরীয়তের বিধান। এলাকার মানুষদের দ্বীনী শিক্ষা-দীক্ষার উদ্দেশ্যে পৃথক জায়গার ব্যবস্থা করে তাতে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কর্তব্য। মসজিদের জায়গায় স্থায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ নেই। তবে মসজিদের অতিরিক্ত জমি যদি এখনই  মসজিদের কাজে না লাগে তাহলে মসজিদ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে সেখানে সাময়িকভাবে মাদরাসার জন্য ঘর বানানো যাবে এবং তাতে মাদরাসার কার্যক্রমও পরিচালনা করা যাবে। তবে পরবর্তীতে যখনই ঐ জায়গা মসজিদের প্রয়োজন হবে তখন তা মসজিদের জন্য দ্রæত খালি করে দিতে হবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২/৪৯০; আদ্দুররুল মুখতার ৪/৩৬০

(৩) মসজিদ স্বতন্ত্র একটি ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠান। আর শরীয়তের নির্দেশনা হল, মুতাওয়াল্লি বা তার লোকজন ওয়াক্ফকারীর উদ্দেশ্য সাধন করে যাবে। তাই ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, মসজিদের আয় মসজিদের খাতেই ব্যয় হবে। যদি কোনো মসজিদের যাবতীয় খরচাদি নির্বাহ করার পরও তার আয় থেকে যায় তাহলে উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে নি¤œাক্ত কাজগুলো করা যেতে পারে :

১. পর্যাপ্ত ও যৌক্তিক পরিমাণে ইমাম-মুয়াযযিন ও খাদেমদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা।

২. তারা যাতে নিশ্চিন্ত মনে মসজিদের খেদমত আঞ্জাম দিতে পারেন সে লক্ষ্যে মসজিদের অদূরে তাদের বসবাসের জন্য আবাসন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

৩. সাধারণ মুসল্লিদের দ্বীনী ইলম চর্চা ও সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে মানসম্মত ও যুগোপযোগী পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা।

৪. দ্বীনী ইলমের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে সকল শ্রেণি-পেশার মুসলামনদের জন্য খণ্ডকালীন দ্বীন শেখার আয়োজন করা।

৫. এলাকার স্কুলগামী ছেলেদের জন্য এবং স্কুলগামী মেয়ে শিশুদের জন্য প্রভাত ও বৈকালিক মক্তবের আয়োজন করা এবং পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য শিক্ষকের মাধ্যমে তা পরিচালনা করা।

৬. মুসল্লিদের নামায, ইতিকাফ ও অন্যান্য ইবাদত আদায়ে আরাম হয়- এমন ব্যবস্থা করা।

৭. মসজিদের অযুখানা যদি অপর্যাপ্ত বা অস্বস্তিকর হয় অথবা মসজিদের জায়গার ভেতর এর যথাযথ সংকুলান না হয় তাহলে পার্শ্ববর্তী জায়গায় ভিন্নভাবে আলাদা ভবন নির্মাণ করে অযু-ইস্তিঞ্জার পর্যাপ্ত ও আরামদায়ক ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

এমন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পর টাকা উদ্বৃত্ত থাকলে তা ভবিষ্যতে মসজিদ-এর সম্ভাব্য নির্মাণ-স¤প্রসারণ ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সংরক্ষণ করে রাখবে। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য খরচের যোগান দেওয়া যায়- এ পরিমাণ টাকা গচ্ছিত রাখার পরও টাকা অতিরিক্ত হলে তা বাস্তবে প্রয়োজন আছে, আশপাশের এমন কোনো মসজিদে দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এমনকি তখন দ্বীনী তালীম যেহেতু মসজিদের মৌলিক কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত তাই কর্তৃপক্ষ চাইলে সে টাকার অংশবিশেষ মাদরাসার খাতেও খরচ করতে পারে। -আলমুহীতুল বুরহানী ৯/১৫১; ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩১৫

শেয়ার লিংক