সুমাইয়া ইসলাম - ঢাকা
৬৯৩৫. Question
মুহতারাম মুফতী সাহেবের কাছে জানতে চাচ্ছি, বিতির নামায কি এক রাকাত পড়া যাবে? জানিয়ে বাধিত করবেন।
Answer
বিতির নামায তিন রাকাত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতির তিন রাকাত পড়তেন। এটি বহু হাদীস ও আছার দ্বারা প্রমাণিত। পক্ষান্তরে শুধু এক রাকাত বিতির পড়া নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত তাহাজ্জুদের পর বিতির পড়তেন। বয়স ও পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন অবস্থার কারণে তাহাজ্জুদের রাকাত-সংখ্যা কমবেশি হলেও বিতির সর্বদা তিন রাকাতই পড়তেন।
বিতির নামায তিন রাকাত হওয়ার বিষয়টি সুপ্রমাণিত। এ বিষয়ে বহু হাদীস ও আছার বর্ণিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হল–
১.
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمূنِ، أَنَّه أَخْبَرَه: أَنَّه سَأَلَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا، كَيْفَ كَانَتْ صَلاَةُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي رَمَضَانَ؟ فَقَالَتْ: مَا كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزِيْدُ فِيْ رَمَضَانَ وَلاَ فِيْ غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُصَلِّيْ أَرْبَعًا، فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّيْ أَرْبَعًا، فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّيْ ثَلاَثًا.
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞাসা করেন, রমযানে নবীজীর নামায কেমন হত?
তিনি উত্তরে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে এবং রমযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন। এর দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে তুমি জানতে চেয়ো না। অতঃপর চার রাকাত পড়তেন। এরও দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে চেয়ো না। এরপর তিন রাকাত (বিতির) পড়তেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৪৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৩৮)
২. আবদুল্লাহ ইবনে আবী কায়েস রাহ. বলেন–
قُلْتُ لِعَائِشَةَ: بِكَمْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوْتِرُ؟ قَالَتْ: كَانَ يُوْتِرُ بِأَرْبَعٍ وَثَلَاثٍ، وَسِتٍّ وَثَلَاثٍ، وَثَمَانٍ وَثَلَاثٍ، وَعشْرٍ وَثَلَاثٍ، وَلَمْ يَكُنْ يُوْتِرُ بِأَنْقَصَ مِنْ سَبْعٍ، وَلَا بِأَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثَ عَشَرَةَ.
আমি আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, নবীজী বিতির কত রাকাত পড়তেন?
উত্তরে তিনি বলেন, চার এবং তিন, ছয় এবং তিন, আট এবং তিন, দশ এবং তিন। তিনি বিতিরে সাত রাকাতের কম এবং তেরো রাকাতের বেশি পড়তেন না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩৫৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৫১৫৯; শরহু মাআনিল আছার, হাদীস ১৬৫৬)
৩.
عَنْ سَعْدِ بْنِ هِشَامٍ، أَنَّ عَائِشَةَ حَدَّثَتْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ لَا يُسَلِّمُ فِيْ رَكْعَتَيِ الْوِتْرِ.
সা‘দ ইবনে হিশাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়েশা রা. তাকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতিরের (শেষ) দুই রাকাতে মাঝে সালাম ফেরাতেন না। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১৬৯৭; মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ, হাদীস ২৬৬)
উক্ত হাদীসসমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সালামে তিন রাকাত বিতির পড়তেন। বিতিরের দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহ্হুদের জন্য বসতেন; কিন্তু সালাম ফেরাতেন না। সালাম ফেরাতেন সবশেষে তৃতীয় রাকাতের পর।
৪. বিতিরের তিন রাকাতে তিনি কোন্ কোন্ সূরা পড়তেন, তাও বহু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, বিশিষ্ট তাবেয়ী সাঈদ ইবনে জুবায়ের রাহ. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন–
كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوْتِرُ بِثَلَاثٍ، يَقْرَأُ فِي الْأُوْلَى بِسَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلىূ، وَفِي الثَّانِيَةِ بِقُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ، وَفِي الثَّالِثَةِ بِقُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন রাকাত বিতির পড়তেন। প্রথম রাকাতে সূরা আ‘লা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরূন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়তেন। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১৭০২; জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৬৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১১৭২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৭২০)
এছাড়াও আয়েশা রা., উবাই ইবনে কা‘ব রা., আবদুর রহমার ইবনে আবযা রা.-সহ আরও অনেক সাহাবী থেকে বিতিরের তিন রাকাতে উপরিউক্ত তিন সূরা পড়া সম্পর্কে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এর প্রত্যেকটি হাদীস এ কথা প্রমাণ করে যে, বিতির নামায তিন রাকাত।
৫. সাহাবায়ে কেরামও তিন রাকাত বিতির পড়তেন; শুধু এক রাকাত বিতির পড়তেন না।
বিশিষ্ট তাবেয়ী আবুল আলিয়া রাহ. যিনি খুলাফায়ে রাশেদীনসহ অনেক মুহাজির ও আনসার সাহাবীর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাকে বিতির নামাযের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন–
عَلَّمَنَا أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْ عَلَّمُوْنَا أَنَّ الْوِتْرَ مِثْلُ صَلَاةِ الْمَغْرِبِ، غَيْرَ أَنَّا نَقْرَأُ فِي الثَّالِثَةِ، فَهَذَا وِتْرُ اللَّيْلِ وَهَذَا وِتْرُ النَّهَارِ.
সাহাবায়ে কেরাম আমাদের শিখিয়েছেন, বিতির নামায মাগরিবের নামাযের মতো। পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, (মাগরিবের তৃতীয় রাকাতে কেরাত পড়তে হয় না; কিন্তু) বিতিরের তৃতীয় রাকাতে আমরা কেরাত পড়ি। এটা হল রাতের বিতির। আর ওটা হল দিনের বিতির। (শরহু মাআনিল আছার, বর্ণনা ১৭০১)
মোটকথা, বিতির নামায তিন রাকাত পড়াই সুন্নাহসম্মত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ তিন রাকাত বিতির পড়তেন। পক্ষান্তরে শুধু এক রাকাত বিতির পড়া নবীজী থেকে প্রমাণিত নয়।
বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুস সালাহ রাহ. বলেন–
لا نعلم في روايات الوتر مع كثرتها أنه عليه السلام أوتر بواحدة فحسب.
বিতির সম্পর্কে বিপুল হাদীস থাকা সত্ত্বেও আমরা এটা পাইনি যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এক রাকাত বিতির পড়েছেন। (আলবাদরুল মুনীর ৪/৩০৩; আততালখীসুল হাবীর ২/৩৯)
উল্লেখ্য, কোনো কোনো বর্ণনায়
أوتر بركعة-এর কথা পাওয়া যায়। কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে, এর অর্থ বিতির নামায শুধু এক রাকাত পড়া নয়; বরং ওই বর্ণনাটি এ সম্পর্কিত অন্য বিশদ বর্ণনার সংক্ষিপ্ত রূপ। যার কয়েকটি এখানেও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সকল হাদীসের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেখা হলে বিষয়টি একদমই স্পষ্ট যে, ওই এক রাকাতের সঙ্গে এর পূর্বে তিনি আরও অনেক রাকাত নামায পড়েছেন। এর মধ্যে শেষের তিন রাকাত বিতির আর বাকিগুলো তাহাজ্জুদ। এ কথাটি দ্বারা রাবীর মূলত উদ্দেশ্য হল, দুই দুই রাকাত করে নামায পড়ে শেষ দুই রাকাতের সঙ্গে এক রাকাত যোগ করে তিনি আগের রাকাতগুলোকে বেজোড় করেছেন।
কিন্তু এর সঙ্গে পূর্বে দুই/চার রাকাত নামায না পড়ে কখনও তিনি শুধু এক রাকাত বিতির পড়েছেন– এটি প্রমাণিত নয়।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহ. বলেন–
الأحاديث التي جاءت أن النبي صلى الله عليه وسلم أوتر بركعة، كان قبلها صلاة متقدمة.
যেসব হাদীসে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাকাত বিতির পড়েছেন, সেখানে এক রাকাতের আগে আরও নামাযের কথা আছে। (মাসায়িলুল ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ১/৬৫; আলজামে‘ লিউলূমিল ইমাম ইমাম আহমদ ৬/৪০০)
সুতরাং বিতির নামায তিন রাকাতই পড়তে হবে; শুধু এক রাকাত পড়া যাবে না।
–কিতাবুল হুজ্জাহ, ইমাম মুহাম্মাদ ১/১৩১-১৩৯; শরহু মাআনিল আছার ১/১৬৯-২০৭; নুখাবুল আফকার ৩/১৯৮-২৯২; আছারুস সুনান, নীমাবী ১৯৪-২০৭