Rabiul Akhir-Jumadal Ula 1448   ||   October 2026

জর্ডান ও ফিলিস্তিনে কয়েকদিন

আবু যাকওয়ান রাইয়ান বিন লুৎফর রহমান

আলআকসা-আলকুদ্স। সেই শৈশব থেকেই আমার অন্তরে এ নাম সূর্যের আলোর মতোই প্রোজ্জ্বল। আমি স্বপ্ন দেখতাম, একদিন ফিলিস্তিন সফর করব, আলকুদ্স যিয়ারত করব, মসজিদে আকসায় নামায আদায় করব এবং কৃতজ্ঞতার দু-ফোঁটা অশ্রু আল্লাহর প্রতি নিবেদন করব। সেইসাথে আরেকটি স্বপ্নও...! তবে আমার ছোট্ট হৃদয়ে কখন এবং কীভাবে এ স্বপ্ন অঙ্কুরিত হয়েছিল, জানা নেই! শুধু মনে পড়ে, যখনই এই পবিত্র ভূখণ্ডে বর্বর ইহুদীদের হাতে মুসলিমদের রক্ত ঝরত, তখন সুদূর বাংলাদেশে আমার হৃদয়েও রক্তক্ষরণ হত।

শৈশব-কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনে পদার্পণ করলাম। সেইসাথে হৃদয়ের নিভৃতে লালিত আলকুদ্স যিয়ারতের স্বপ্ন নতুনভাবে উজ্জীবিত হল।

তবে স্বপ্ন দেখা সহজ হলেও স্বপ্নের বাস্তবায়ন বড়ই কঠিন। বিশেষত আমার মতো এক নগণ্য মানুষ যদিও-বা হৃদয়ের গভীরে কোনো স্বপ্ন লালন করে, বাস্তবে ওই স্বপ্নের ছোঁয়া পাবে কীভাবে!

সম্ভবত ২০০৭ সাল। একটি বই উপলক্ষ্য করে আল্লাহ যেন আমার সামনে পথের মানচিত্র মেলে ধরলেন। বইটির নাম ছিল ‘উহুদ থেকে কাসিয়ুন’। শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দা. বা. রচিত ঐতিহাসিক সফরনামা ‘জাহানে দীদাহ’-এর বাংলা অনুবাদ। হযরতের ধারাবাহিক সফরনামার এ অংশে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ জর্ডান সফরের বিবরণ। হযরত এই সফরে জর্ডান নদী এবং ডেড-সি―মৃত সাগরের তীরে দীর্ঘসময় অবস্থান করেছেন এবং সীমান্তের ওপারে ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূমি সরাসরি অবলোকন করেছেন। বিশেষত মসজিদে আকসার মিনারের সামান্য একটু ঝলক দেখার আশা নিয়ে মৃত সাগর তীরে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু দিগন্তে কুয়াশা থাকায় সেটা আর সম্ভব হয়নি। তখনকার অনুভব-অনুভূতি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তিনি এই সফরনামায় তুলে ধরেছেন।

সত্যি কথা হল, হযরতের সফরনামার এই অংশটুকু পড়ার সময় আমার সমগ্র দেহে যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল। তখনই প্রতিজ্ঞা করে ফেলি, কুদ্সের সন্ধানে অবশ্যই জর্ডান সফর করব। সীমান্তের এপারে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূমি সরাসরি অবলোকন করব, কাছে থেকে না হোক, অন্তত দূর থেকেই আলআকসা যিয়ারতের সৌভাগ্য অর্জন করব। তাছাড়া জর্ডান তো আমাদের সেই শামেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ; যেই শামের ফযীলত বিষয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। অতীতের সেই শাম বর্তমানে চারটি আলাদা রাষ্ট্রে বিভক্ত―সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তিন ও লেবানন। এই জর্ডানের মাটিতে শুয়ে আছেন অসংখ্য নবী-রাসূল এবং প্রসিদ্ধ সাহাবায়ে কেরাম। এছাড়াও রয়েছে অগণিত ইসলামী ঐতিহ্য এবং সাহাবীদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান।

সর্বশেষ ১৯৬৭ সালে এই জর্ডানের হাত থেকেই আমাদের প্রথম কেবলা ছিনিয়ে নিয়েছে ইহুদীবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল।

পরবর্তীতে আরও একটি ঘটনা জর্ডান সফরের প্রতি আমাকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করে। ২০০৮ সালের দিকে মিরপুর পল্লবীতে এক আরব জামাত আসে। জামাতের একজন সাথি ছিলেন জর্ডানের নাগরিক। তার সাথে পরিচিত হলাম। কথাবার্তার একপর্যায়ে তিনি বললেন, জর্ডানে ‘সাল্ত’ নামক একটি পাহাড় আছে। এই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে বহু দূরে বাইতুল মাকদিসের আলো দৃষ্টিগোচর হয়।

শোনামাত্র হৃদয়ের গভীরে লালিত সেই স্বপ্নটি আবার জেগে উঠল। মনের অবস্থা এমন হল, পারলে এখনই জর্ডান সফর করি এবং সাল্ত পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পড়ি। কিন্তু মানুষ তো স্বপ্নের তরঙ্গ দোলায় দোল খেতে পারে; স্বপ্নকে পূর্ণতা দান করতে পারে না।

২০১৩ সাল, হঠাৎ এক ভদ্রলোকের সন্ধান পেলাম। তিনি শুধু জর্ডান নয়, ফিলিস্তিনও সফর করেছেন। মসজিদে আকসায় নামায আদায় করেছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে আমিও আশায় বুক বাঁধলাম। এবার হয়তো আমার স্বপ্ন আলোর মুখ দেখবে।

দেখতে দেখতে আমাদের এলাকায় একটি কাফেলাও প্রস্তুত হয়ে গেল। সেই কাফেলায় ছিলেন আমার পরমপ্রিয় উস্তায মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ দা. বা.। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভিসা হল না। আমাদের সফরও হল না। আশার প্রদীপ জ্বলে উঠতে না উঠতেই দপ করে নিভে গেল। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাই আর ভাবি—

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?

এখনও তোমার আসমান ভরা মেঘে?

দুই.

প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে আমার জীবন থেকে আরও দশটি বছর অতীত হল।

৫ অক্টোবর ২০২৩। আল্লাহ এই অধমকে হারামাইন শরীফাইন যিয়ারতের সৌভাগ্য দান করলেন। প্রথম দুটি দিন মদীনার শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে বেশ প্রশান্তির সাথে অতিবাহিত করলাম। সফরের তৃতীয় দিন ছিল ৭ অক্টোবর। যোহর নামাযের জন্য হোটেল কক্ষ থেকে বের হয়ে লিফ্টে উঠলাম। আরও দুজন আরবীভাষী ভদ্রলোক লিফ্টে উঠলেন। তাদের একজন আরেকজনকে ফোনে কিছু একটা দেখাচ্ছেন। সেইসাথে দুজনের চেহারায় আবেগ, আনন্দ, উচ্ছ্বাস উপচে পড়ছে।

হঠাৎ একজন ফোনের দিকে তাকিয়ে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন—

اُدْخُلُوْا عَلَيْہِمُ الْبَابَ فَاِذَا دَخَلْتُمُوْہُ فَاِنَّکُمْ غٰلِبُوْنَ.

দুজনের আচরণ-উচ্চারণ বিশেষ করে এই সময়ে এই আয়াতের পঠন আমার অন্তরে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করল। নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে তাদের সাথে পরিচিত হলাম। জানতে পারলাম, দুইজনই ফিলিস্তিনী তবে বর্তমানে জর্ডানের অধিবাসী। এই দুটি নামই আমার হৃদয়ের শান্ত নদীতে মৌজ সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এরপর তারা যা বললেন আর আমি যা শুনলাম ভাব ও আবেগের তরঙ্গ দোলায় হৃদয় এমনই উদ্বেলিত হল যে, মুহূর্তের জন্য আমি নিজেকে হারিয়ে ফেললাম।

তারা বললেন, আজ বাদ ফজর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরাইলী ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছে এবং স্থল অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘তূফানুল আকসা’।

প্রথমে বিশ্বাস করতে কষ্ট হল। মনে হল, আমি সঠিক শুনলাম, নাকি ভুল! বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার জন্য আবার প্রশ্ন করলাম, ইসরাইল গাজা ভূখণ্ডে স্থল অভিযান শুরু করেছে!

তারা বললেন যে, আজকের অভিযান ইসরাইল নয়, হামাস শুরু করেছে এবং শুধু রকেট হামলা নয়; বরং সরাসরি স্থল অভিযান শুরু করেছে।

এক অদ্ভুত তন্ময়তার মধ্যে মসজিদে নববীতে পৌঁছলাম এবং একসাথেই যোহর নামায আদায় করলাম। নামাযের পরে তারা ফোন থেকে ‘তূফানুল আকসা’ অভিযানের সেই অভূতপূর্ব দৃশ্যগুলো দেখালেন, যা সমগ্র বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা জানালেন, আজই তারা দেশে চলে যাবেন। সেইসাথে আমাকেও জর্ডান সফরের দাওয়াত দিলেন। আরও বললেন, তূফানুল আকসার সফলতার জন্য যেন দুআ অব্যাহত রাখি।

এতটুকু বলে তারা বিদায় নিলেন। এতক্ষণ আমি হয়তো স্বপ্নের ঘোরে ছিলাম। কিছু সময় পর সংবিৎ ফিরে পেলাম। মসজিদে নববীতে বসেই পূর্ণ প্রতিজ্ঞা করলাম, এবার জর্ডান সফর অবশ্যই করব। দূর থেকে হলেও আলআকসার সান্নিধ্য গ্রহণ করব ইনশাআল্লাহ। পথিকের পথচলার ক্লান্তি দেখে পথেরই হয়তো দয়া হবে এবং পথই দেখিয়ে দেবে সামনের পথ। বাস্তবে তা-ই হল। জর্ডান সফরই আমাকে আলকুদসের পথ চিনিয়ে দিল। হারামাইনের অবশিষ্ট দিনগুলো এক অজানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করলাম।

শেষ দিনটি ছিল অত্যন্ত বেদনার। গাজার আলআহলিয়া হাসপাতালে হামলা করে বসে ইহুদীবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল। বহু নিরীহ মানুষ শাহাদাত বরণ করলেন। বাদ এশা বিদায়ী তাওয়াফের সময় দেখলাম, কিছু মুসলিম ভাই ইহুদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষায় বদদুআ করছে। কিন্তু পুলিশি হস্তক্ষেপে সেটাও থামিয়ে দেওয়া হল। হায়! মজলুম ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর সৎসাহস তো বহু আগেই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আর এখন দুআর অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হবে!

তিন.

অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে দেশের মাটিতে ফিরে এলাম। প্রতিনিয়ত তূফানুল আকসার খবর রাখছিলাম এবং অসহনীয় যন্ত্রণা বুকে ধারণ করে একেকটি দিন পার করছিলাম।

ফিলিস্তিন এবং আলআকসা প্রসঙ্গে মাঝে মাঝেই তালিবে ইলম ভাইদের সাথে মুযাকারা করতাম। একদিন কথায় কথায় হঠাৎ চতুর্থ বর্ষের এক তালিবে ইলম বলল, আমি তো ছোটবেলায় বাবার সাথে জর্ডানে গিয়েছি, সীমান্তের এপারে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনের ভূমি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছি।

আমি চমকে উঠে তার দিকে তাকালাম। কী বলে ছেলেটা! সে জর্ডান সফর করেছে! আবার ফিলিস্তিনের ভূমিও দেখে এসেছে! তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আরও অনেক প্রশ্ন করলাম। সেইসাথে বললাম, দ্রুত তোমার বাবাকে খবর দাও। তার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করো।

তার বাবা দুয়েকদিনের মধ্যেই সাক্ষাৎ করলেন। কথা বলে জানতে পারলাম, তার বড় ভাই জাতিসংঘে কর্মরত। এই সুবাদে তিনি দীর্ঘদিন জর্ডানেও ছিলেন। বড় ভাইয়ের আমন্ত্রণে একবার তিনি জর্ডান সফর করেছিলেন। তখন ছেলেকে সাথে নিয়েছিলেন।

আমি বললাম, সেই কত বছর থেকে জর্ডান সফরের স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনও অধরাই রয়ে গেল। আর আপনি ছেলেসহ কত সহজে জর্ডান সফর করে এলেন!

এরপর তিনি যা বললেন আর যা করলেন, তাতে আমি সারা জীবন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। তিনি বললেন, আপনার পাসপোর্ট দিন, আমি বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলে দেখি, কোনোভাবে আপনার ভিসার এন্তেজাম করতে পারি কি না!

হৃদয় তখন আবেগের তরঙ্গে এমন উদ্বেলিত হল, যা প্রকাশ করার যথাশব্দ আমার জানা নেই। আর কেনই-বা হবে না! এটা তো নিছক জর্ডান সফর নয়। এ তো হল কুদসের সন্ধানে সেই শামের সফর, যেই শামের বিষয়ে আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

اللّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي شَامِنَا.

আল্লাহ! আমাদের শামে আমাদের জন্য বরকত দান করুন। —সহীহ বুখারী, হাদীস ১০৩৭

এভাবেই আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন তখন গায়েবের পর্দার আড়াল থেকে সব আয়োজন সম্পন্ন হতে থাকে। আমারও সব আয়োজন সেভাবে সম্পন্ন হতে লাগল। অবশেষে পশ্চিম আকাশে রমযানের চাঁদ উদিত হল, সেইসাথে আমার ভাগ্যের আকাশেও উদিত হল নতুন চাঁদ। রমাযানের কোনো এক বিকেলে বাসার নিচে বসে আছি। হঠাৎ সেই তালিবে ইলমের বাবার আগমন। হাতে আরবীতে লেখা একটি কাগজ। তিনি সেই কাগজ আমার হাতে তুলে দিলেন। কাগজে যা লেখা, তার তরজমা করলে অর্থ দাঁড়ায়— মুহাম্মাদ রাইয়ানকে জর্ডান প্রবেশ করামাত্র ভিসা প্রদানের অনুমতি প্রদান করা হল।

প্রথমে আল্লাহর শোকর আদায় করলাম। তারপরে এই মানুষটিরও শোকর আদায় করলাম। কারণ এই মানুষটির ওসীলায় শৈশব থেকে পুষে রাখা স্বপ্ন একটু একটু করে পেখম মেলতে শুরু করেছে। তবে জর্ডান থেকে যিনি আমার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়ে ভিসার ব্যবস্থা করেছেন তিনি হলেন জনাব আলম সাহেব। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং জর্ডান-বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক।

আল্লাহ তাকে উত্তম থেকে উত্তম বিনিময় দান করেন— আমীন।

চার.

রমযানের শেষ দশকে আল্লাহ আবার তাঁর ঘরের সান্নিধ্য দান করলেন। এবার আরেকজন জর্ডান নিবাসী ফিলিস্তিনী ভাইয়ের সাথে পরিচয় হল। তূফানুল আকসা অভিযান বিষয়ে তাঁর সাথে অনেক কথা হল। যখন তিনি জানতে পারলেন, আমি জর্ডানের ভিসা পেয়েছি, তিনি আরবীয় আভিজাত্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়ে বললেন, তোমার সব ধরনের খেদমতের জন্য আমি প্রস্তুত।

জর্ডান সফরে এই মানুষটির সঙ্গ আমাকে পদে পদে উপকৃত করেছে; সেকথা পরে বলব ইনশাআল্লাহ। বাইতুল্লাহ থেকে বিদায়ের আগমুহূর্তে আল্লাহর কাছে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিয়ে বললাম, আল্লাহ! জর্ডানের এই সফরকে তুমি কবুল করো, একে বাইতুল মাকদিসের সফরের ওসীলা করে দাও।

তখন কি কল্পনাও করেছি, আমার দুআর প্রতিটি শব্দ আল্লাহ এভাবে কবুল করে নেবেন! কত মেহেরবান আমার আল্লাহ!

ঈদের দিন দেশের মাটিতে ফিরে এলাম। এরমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে গেল আরেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সিরিয়াতে অবস্থিত ইরানের কনসুলেটে হামলা করে বসে ইসরাইল। এতে বেশ কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়। ইরান তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ গ্রহণের ঘোষণা দেয়। কিছুদিনের মধ্যে সমস্ত জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে ইসরাইলী ভূখণ্ডে রাতভর মিসাইল ছোঁড়ে ইরান। আর এই মিসাইলের অধিকাংশ জর্ডানের আকাশসীমা ভেদ করে দখলকৃত ভূখণ্ডে আঘাত হানে। তবে অনেকগুলো মিসাইল জর্ডানের মাটিতে আছড়ে পড়ে। আবার কিছু মিসাইল জর্ডানের সেনাবাহিনী ভূপাতিত করে। এমনিতেই তূফানুল আকসার প্রভাবে জর্ডানে প্রতিনিয়ত ইসরাইল বিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর কড়াকড়িও পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। এরই মধ্যে আবার জর্ডানের আকাশসীমার মধ্যে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তোলে। এই ঘটনার পরে অনেক আপনজন আত্মীয়-স্বজন এই মুহূর্তে জর্ডান সফরের প্রতি নিরুৎসাহিত করতে থাকে। কিন্তু এসব উত্তেজনা আমাকে সফরের প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে।

এই নাজুক পরিস্থিতিতে আমার মুসলিম ভাইয়েরা কেমন আছেন, কী চিন্তা করছেন— তা আমাকে জানতেই হবে। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা করে বিমানের টিকেট কেটে ফেললাম। সফরের প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম।

বিগত ১৫ বছর যাবৎ একটি নীতি আমি সব সময় অনুসরণ করে আসছি। যখনই বাইতুল্লাহর সফর নসীব হয়েছে, আদীব হুজুরের খেদমতে যমযম নিয়ে হাজির হয়েছি। এই ওসীলায় হুজুরের অনেক দুআ আমি পেয়েছি। এবারেও তার ব্যত্যয় হল না। যথারীতি হুজুরের বাসায় যমযমের পানি নিয়ে উপস্থিত হলাম।

হুজুর কোনো এক প্রসঙ্গে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তুমি কি জুমার দিন হযরতপুর আসতে পারবে?

আমি বললাম, জুমার দিন তো আমি শামের উদ্দেশে জর্ডান সফরে যাচ্ছি ইনশাআল্লাহ।

হুজুর সফরের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে বললাম, সেই শৈশব-কৈশোর থেকে স্বপ্ন দেখেছি, আলকুদস সফর করব এবং মসজিদুল আকসায় নামায পড়ব। তূফানুল আকসা শুরু হওয়ার পরে এই পিপাসা আরও তীব্র হয়েছে। শুনেছি জর্ডানের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বহু দূরে কুদসের আলো দেখা যায়। তাই দূর থেকেই কুদসের সান্নিধ্য লাভের জন্য এই সফরের নিয়ত করেছি। আর হাদীস শরীফে তো শামের ফযীলত বরকতের কথা বারবার আল্লাহর নবী তুলে ধরেছেন। সেই বরকত লাভের উদ্দেশ্যেই এই সফর।

আমার কথা শুনে আদীব হুজুর ক্ষণিকের জন্য ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলেন। তারপর সফরের সফলতা এবং নিরাপত্তার জন্য দুআ করে আমাকে বিদায় জানালেন। সফরের দুই দিন আগে আমার পরমপ্রিয় উস্তায ও মুরব্বী হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। সফরের দিন-তারিখ অবগত করলাম। হুজুরও দুআ দিয়ে বিদায় দিলেন।

পাঁচ.

অবশেষে রাত পোহাল, ভোরের আলো দেখা দিল। আমার জীবনের বহুল প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্তটি ঘনিয়ে এল।

১৪৪৫ হিজরীর ২৪ শাওয়াল মোতাবেক ৪ মে ২০২৪ ঈসায়ী, শুক্রবার। যথারীতি জুমার নামায পড়ালাম, কর্তৃপক্ষ থেকে রুখসত গ্রহণ করলাম। তবে কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, পরিবারের একান্ত সদস্য ব্যতীত প্রায় সবার কাছেই গোপন রাখলাম।

জীবনে এই প্রথম জর্ডান সফর। তা-ও আবার সম্পূর্ণ একাকী। নানারকম শঙ্কা-আশঙ্কা মনের মধ্যে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত বিষয় আমার সমস্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করে মনের মধ্যে এক অদম্য সাহস সঞ্চার করল। আসরের পরে ফোন বেজে উঠল। তাকিয়ে দেখি, আদীব হুজুরের ফোন। ফোন ধরতেই আদীব হুজুরের প্রশ্ন, তোমার না আজ শামের সফর!

বেশ অবাক হলাম যে, হুজুর মনে রেখেছেন আমার কথা! বললাম, জী আজ শেষ রাতেই রওয়ানা হব, ইনশাআল্লাহ।

আদীব হুজুর সফরের কামিয়াবীর জন্য অনেক দুআ করলেন। সত্যি বলতে বড়দের দুআই ছিল আমার এই সফরের সবচেয়ে বড় পাথেয়। একের পর এক বিপদ এসেছে; কিন্তু খুব সহজেই কেটে গেছে।

আল্লাহ আমাদের প্রত্যেক মুরব্বীকে সিহ্হত ও আফিয়াতের সাথে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করেন— আমীন।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল। মা-বাবার দুআ নিয়ে রাত ১টার দিকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

advertisement