Rabiul Akhir-Jumadal Ula 1448   ||   October 2026

মাদরাসাশিক্ষায় জেনারেল বিষয় অন্তর্ভুক্তকরণ
‘যদি মাদরাসার নেসাব ও নেযামে এমন পরিবর্তন ও সংস্কার করা হয়, যা এর রুচি-প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক, তাহলে তা মাদরাসাগুলোর মূল প্রাণশক্তিই খতম করে দেবে’

Mawlana Mufti Taqi Usmani

...যারা দ্বীনী মাদরাসাগুলোর নেযামের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এবং এখানকার শিক্ষাধারার ব্যাপারেও যাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই, তাদের পক্ষ থেকে বরাবরই একটি প্রস্তাবনা এসে থাকে। তা এই যে, মাদরাসাগুলোর সিলেবাসে বিজ্ঞান, গণিত, প্রকৌশলবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যাতে করে এসব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাসমাপনকারী আলেমগণের দ্বীনী ইলমের সাথে সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানেও পর্যাপ্ত জানাশোনা ও গভীর দৃষ্টি থাকে।

এ প্রস্তাবনা যতই আন্তরিকতা ও সৎ উদ্দেশ্যে পেশ করা হোক না কেন, বাস্তবে এটি একটি অগভীর ও স্থূল চিন্তা। এটা আসলে দ্বীনী মাদরাসাসমূহের উদ্দেশ্য সম্পর্কে না জানার পরিণতি।

মাদরাসার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তো হল, যোগ্যতাসম্পন্ন আলেমেদ্বীন তৈরি করা। যারা কুরআন-সুন্নাহ ও তৎসংশ্লিষ্ট শাস্ত্রসমূহে গভীর ব্যুৎপত্তি ও পাণ্ডিত্য অর্জন করবে। এর জন্য প্রয়োজন পূর্ণ একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতা। তাই একজন ব্যক্তি কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতাসম্পন্ন আলেমেদ্বীন হবে, আবার একইসাথে দক্ষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী বা অর্থনীতিবিদও হবে— এ অসম্ভবই বটে।

আলেম হওয়ার সাথে সাথে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানবিশেষজ্ঞ হওয়া অসম্ভব

এ বাস্তবতা সর্বযুগেই সমানভাবে প্রযোজ্য। আর প্রত্যেক বিদ্যা ও শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞতা অর্জনের এ যুগে তো এটা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।

যদি কেউ চিকিৎসা শাস্ত্রকে নিজের বিষয় বানিয়ে নেয় এবং মেডিকেল সাইন্সে দক্ষতা অর্জন করে, তার ব্যাপারে ন্যূনতম বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিও এই আপত্তি করবে না যে, সে ডাক্তার হওয়ার সাথে সাথে ইঞ্জিনিয়ারও কেন হল না? কিংবা কোনো ব্যক্তি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে শিক্ষা সমাপন করলে তার ব্যাপারে কেউ এই আপত্তি করে না যে, সে মেডিকেল সাইন্স কেন পড়ল না? বিজ্ঞান সংক্রান্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু বিজ্ঞানই পড়ানো হয়; কিন্তু কেউ এই আপত্তি করে না যে, এই প্রতিষ্ঠানে সাহিত্য, কাব্য বা কমার্স কেন পড়ানো হয় না? কোনো কমার্স কলেজের ব্যাপারে কখনও এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় না যে, এখান থেকে ইঞ্জিনিয়ার কেন তৈরি হয় না? কোন ল কলেজের ব্যাপারে কখনও এমন প্রস্তাব শোনা যায়নি, সেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানও পড়ানো হোক।

আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ইসলামী উলূমে বিজ্ঞ লোক তৈরি করা

এ-ই যখন বাস্তবতা, তাহলে দ্বীনী মাদরাসাসমূহের সকল কর্মপ্রচেষ্টা যদি ইসলামী উলূমে বিজ্ঞ লোক তৈরিতেই নিবদ্ধ থাকে এবং সেখান থেকে কোনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানবিদ বা অর্থনীতিবিদ তৈরি না হয়, এ নিয়ে এত উচ্চবাচ্য কেন?

তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইলমুল কালাম ও তৎসংশ্লিষ্ট শাস্ত্রসমূহ কি এমন বিষয় নয়, যার পঠন-পাঠনের জন্য কিছু স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান থাকা উচিত? যে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধ্যের সবটুকু এ শাস্ত্রগুলোর খেদমতে ব্যয় করবে? এসব শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ আলেম তৈরি করবে?

যদি কেউ এ কাজের প্রয়োজনীয়তাই উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার ব্যাপারে আফসোস করা ছাড়া আর কী-ই-বা করার আছে? পক্ষান্তরে যে এ শাস্ত্রগুলোর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য কিছুটাও অনুভব করতে সক্ষম, সে অবশ্যই এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবে যে, আলেমদের ব্যাপারে ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানবিদ হওয়ার প্রত্যাশা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অবাস্তব।

কারিগরি শিক্ষা প্রদানও মাদরাসার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নয়

কেউ কেউ দ্বীনী মাদরাসাসমূহের কল্যাণচিন্তা ও সহানুভূতি থেকে এই প্রস্তাবও পেশ করে থাকেন যে, এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা উচিত। যাতে করে, যে আলেমগণ এখান থেকে শিক্ষা সমাúন করে বের হবেন, তারা আর্থিকভাবে সমাজের ওপর বোঝা হয়ে না যান। অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে কারিগরি শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে নিজেই নিজের কর্মসংস্থান করে নিতে পারেন এবং কোনো ধরনের বিনিময় গ্রহণ করা ছাড়া দ্বীনী খেদমত আঞ্জাম দিতে পারেন।

এ প্রস্তাবও যতই ভালো উদ্দেশ্যে পেশ করা হোক এবং তা বাহ্যত যত আকর্ষণীয়ই মনে হোক, এ-ও আসলে অবাস্তব চিন্তা, যা কখনোই বাস্তবায়নযোগ্য নয়।

এক্ষেত্রে প্রথম কথা হল, দ্বীনী মাদরাসাসমূহ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দাবিই হল, এখানে কুরআন-সুন্নাহর যথাযথ শিক্ষাদানে পূর্ণ সময় ও শ্রম ব্যয় করা।

তাছাড়া বর্তমান সময়ে জীবন-জীবিকার বিষয়টি যত জটিল ও কঠিন হয়ে উঠেছে, তাতে বাস্তব অভিজ্ঞতাও সাক্ষ্য দেয় যে, কারিগরি কাজে যুক্ত হয়ে যাওয়ার পর দ্বীনী ইলমের খেদমত করার আকাঙ্ক্ষা অপূরণীয়ই থেকে যায়। আসলে এ আকাঙ্ক্ষা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। কোনো কোনো ছাত্র (ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগে) দ্বীনী ইলমের পাশাপাশি কিছু কারিগরি দক্ষতাও হাসিল করে নেয়। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের অবস্থা এই যে, শিক্ষা সমাপনের পর যে ইলমে দ্বীনের খেদমতে মশগুল হয়, সে আর ওই দক্ষতা নিয়ে ভাবারও ফুরসত পায় না। আর সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে যে জীবিকা অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তার দ্বীনী ইলমের সাথে সম্পর্ক থাকে না।

তাই এ বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই যে, যেহেতু মাদরাসাসমূহের প্রতিষ্ঠাই হয়েছে উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন আলেম তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে, তাই এটি সম্ভবও নয় এবং সমীচীনও নয় যে, এসব প্রতিষ্ঠান ছাত্রদেরকে দ্বীনী উলূম শিক্ষাদানের সাথে সাথে কারিগরি প্রশিক্ষণও দেবে।

দ্বিতীয়ত এ বড়ই আশ্চর্য মানসিকতা যে, সমাজের দ্বীনী প্রয়োজন পূরণ করে কোনো ব্যক্তি সম্মানী গ্রহণ করলে সে সমাজের ওপর বোঝা হয়ে যায় বা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে যায়!

সকল বিদ্যা ও শাস্ত্রের ক্ষেত্রে এ নিয়মই চলে যে, নির্দিষ্ট কোনো শাস্ত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে কোনো ব্যক্তি যখন সমাজের সংশ্লিষ্ট প্রয়োজন পূরণ করে, তখন তার জীবিকার ব্যবস্থাও ওই অঙ্গন থেকেই হয়ে থাকে। ওই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট অঙ্গনে সমাজের প্রয়োজন পূরণ করে সম্মানি বা বেতন গ্রহণ করার ফলে সমাজের ওপর বোঝা হয়ে গেল বা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ল— এমন ধারণা কেউ করে না। বরং এ তো সমাজব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার ওপর পুরো মানবসমাজের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত।

কোনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ বা বিজ্ঞানবিদ যখন নিজ অঙ্গনে সমাজের প্রয়োজন পূরণ করে আর সমাজের পক্ষ থেকে এর প্রতিদান লাভ করে, তখন এটা না তার ওপর কারও অনুগ্রহ আর না এর কারণে একথা বলার সুযোগ আছে যে, সে সমাজের ওপর বোঝা হয়ে আছে বা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে গেছে।

ইলমে দ্বীনের খেদমত সমাজের মৌলিক প্রয়োজন

প্রশ্ন হল, দ্বীনী ইলমের খেদমত কি সমাজের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ নয়? একটি মুসলিম সমাজে কি এমন আহলে ইলমের প্রয়োজন নেই, যারা সমাজের জরুরি দ্বীনী খেদমতগুলো আঞ্জাম দেবেন? মুসলিম শিশুদের দ্বীন শেখাবেন। তাদের ভবিষ্যৎ দ্বীনী যিন্দেগীর হেফাজতে নিজের জীবন ওয়াকফ করে দেবেন। দ্বীনের বিরুদ্ধে তৎপর ফেতনাগুলো রুখে দেবেন। সর্বোপরি দ্বীনসংশ্লিষ্ট ওই সকল দায়-দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবেন, যা অপরাপর কাজকর্মে ব্যস্ত মানুষের পক্ষে আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব নয়।

এটি যদি একটি মুসলিম সমাজের মৌলিক প্রয়োজন হয়ে থাকে (আর অবশ্যই এটি মৌলিক প্রয়োজন), তাহলে মুসলিম সমাজ যদি নিজের অপরিহার্য কর্তব্য পালনার্থে ইলমের জন্য নিবেদিত এসকল ব্যক্তিবর্গকে বৈষয়িক দিক থেকে চিন্তামুক্ত রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তবে কি ওই আহলে ইলমের প্রতি কোনো অনুগ্রহ প্রদর্শন করা হল? কখনোই না। সুতরাং এই চিন্তা কীভাবে আসে, আলেমগণ যেহেতু সমাজের বোঝা ও অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে আছেন, তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য তাদের কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা উচিত?

বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে নিজেদের সনদের স্বীকৃতি অর্জনও উদ্দেশ্য নয়

কেউ কেউ দ্বীনী মাদরাসাসমূহের নেসাব ও নেযামে এ কারণে পরিবর্তন আনতে চান, যেন মাদরাসাসমূহের সনদ দেশ-বিদেশের ইউনিভার্সিটিগুলোতে স্বীকৃত হয়। এখান থেকে শিক্ষালাভকারী ছাত্ররা সেসব ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ পায়। কিংবা এখানকার সনদধারীগণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি লাভ করতে পারে। আর যেহেতু ইউনিভার্সিটিগুলোর শিক্ষাক্রমের সম্মান লাভ করতে হলে মাদরাসাসমূহের নেসাব ও নেযামে পরিবর্তন আনা জরুরি, তাই তারা মাদরাসার নেসাবে ব্যাপক সংস্কারের প্রত্যাশী! 

মাদরাসার নেসাব সংস্কারের ক্ষেত্রে সঠিক চিন্তা-পদ্ধতি

আমাদের দৃষ্টিতে উপরিউক্ত চিন্তাও শুদ্ধ নয়। আমাদের মতে, দ্বীনী মাদরাসাসমূহের নেসাব ও নেযাম সম্পর্কে কেবল এই দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করা উচিত যে, একজন যোগ্যতাসম্পন্ন দূরদর্শী সচেতন আলেমেদ্বীনের বাস্তব (ইলমী) প্রয়োজন কোন্গুলো? আর তা কীভাবে পূরণ হতে পারে— এই দৃষ্টিকোণ থেকে নেসাব ও নেযামে যে পরিবর্তন আনা জরুরি মনে হবে, তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করা যেতে পারে। পক্ষান্তরে এই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গিয়ে কেবল এই উদ্দেশ্যে কোনো পরিবর্তন আনা যে, মাদরাসার সনদ অপরাপর ইউনিভার্সিটি কিংবা সরকারি দপ্তরগুলোতে গ্রহণযোগ্য হবে— এমন চিন্তা এসকল দ্বীনী দরসগাহের প্রাণশক্তিই শেষ করে দেবে।

ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাত, কুরবানী ও খেদমতের জযবার ওপর যে মাদরাসাগুলোর ভিত্তি রাখা হয়েছে, তাতে কখনও এই চিন্তা করা হয়নি, দুনিয়ার বাজারে এর মূল্যমান কী হবে? আকাবির উলামায়ে দেওবন্দের মাঝে এমন কত ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যারা ফারেগ হওয়ার পর কোনোদিন সনদপত্র হাতে নিয়ে দেখারও ফুরসত পাননি। ‘সনদ-চিন্তা’র পরিবর্তে তাঁদের কাছে এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, এখান থেকে শিক্ষা সমাপনকারী আলেমদের মাঝে দ্বীনী উলূমে পূর্ণ দক্ষতা, ইত্তেবায়ে সুন্নতের প্রেরণা, আল্লাহভীতি ও তাকওয়া, আল্লাহমুখিতা ও দ্বীনের খেদমতের জযবা কীভাবে তৈরি হবে?

আসল কথা হল, দ্বীনী মাদরাসাগুলো যদি নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যায়, এসকল প্রতিষ্ঠান থেকে যদি এমন যোগ্যতাসম্পন্ন আলেম তৈরি হতে থাকে, সমাজে যাদের অতীব প্রয়োজন, তাহলে এমন চিন্তাই আসবে না যে, এখান থেকে শিক্ষালাভকারী ছাত্রদের অন্যান্য ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করা দরকার। তদ্রূপ তাদের কাউকে নিজের সনদ মঞ্জুর করাতে সরকারি দপ্তরগুলোতে দরখাস্ত নিয়ে ঘুরতে হবে না। তাই উক্ত বিবিধ চিন্তা পরিহার করে দ্বীনী মাদরাসাগুলোর উচিত, নিজেদের শিক্ষা-দীক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগী হওয়া।

আর এ-ও নিশ্চিত, মাদরাসাগুলো যদি কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারে, তাহলে অন্য সকল প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজনেই এই সনদকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হবে।

দ্বীনী ইলমের গাইরত ও আত্মসম্মানবোধের দাবি

আমাদের দ্বীনী মাদরাসাগুলো যে ইলমের ধারক-বাহক এবং এগুলো যে স্বভাব-রুচির উত্তরাধিকারী, তার প্রেক্ষাপটে এটা বরং লজ্জার যে, তারা অন্যদের কাছে নিজেদের ইলমী যোগ্যতার স্বীকৃতি লাভ করার জন্য দরখাস্ত করবে, আপিল করবে কিংবা তা দাবি করে বেড়াবে। এই ইলমের উন্নত রুচিবোধের দাবি তো এই যে, ব্যক্তি নিজের দায়িত্ব যথাযথ আঞ্জাম দানে ও আপন কাজে লেগে থাকবে। কারও দরকার হলে সে নিজ প্রয়োজনে আলেমের কাছে এসে ধরনা দেবে। অন্যথায় কারও কাছ থেকে নিজের আলেম-পরিচয়ের স্বীকৃতি নেওয়ার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই।

অতীতের অভিজ্ঞতাও একথা বলে যে, যারা এসকল মাদরাসা থেকে ইলমী-আমলী উন্নতি লাভ করেছেন, তাদের কখনও নিজেদের সনদ প্রদর্শন করার প্রয়োজন পড়েনি; বরং উচ্চস্তরের ইউনিভার্সিটি থেকে সরকারি দপ্তরগুলো পর্যন্ত সবাই নিজ থেকেই তাদেরকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। কখনোই অবমূল্যায়নের অভিযোগ তাদেরকে করতে হয়নি।

কিন্তু এসব তখনই সম্ভব হয়েছে, যখন তাঁরা পূর্ণ ইখলাসের সাথে সাধনা করে নিজেদেরকে ইলমের ভূষণে সজ্জিত করেছেন। শুধু প্রথাগত শিক্ষাসমাপনে তুষ্ট না হয়ে সত্যিকারার্থে নিজেদেরকে ইলমে দ্বীনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছেন। তারা দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে ইলম হাসিল করেননি; বরং দ্বীনের খেদমতকেই জীবনের মিশন বানিয়েছেন। ফলে দুনিয়া নিজেই হীন ও নত হয়ে তাঁদের পদতলে এসে হাজির হয়েছে।

অতএব মনে রাখতে হবে, কেবল নিজেদের সনদের স্বীকৃতি হাসিলের জন্য যদি মাদরাসার নেসাব ও নেযামে এমন পরিবর্তন ও সংস্কার করা হয়, যা এর রুচি-প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক, তাহলে তা মাদরাসাগুলোর মূল প্রাণশক্তিকেই খতম করে দেবে।

 মাদরাসা থেকে শিক্ষাসমাপনকারীদের প্রকৃত (ইলমী) প্রয়োজন পূরণ হবে এবং তারা অধিকতর যোগ্য হবে— একমাত্র এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে নেসাব ও নেযাম বিষয়ে পুনর্বিবেচনা হওয়া উচিত

তবে এ আলোচনার উদ্দেশ্য কখনও এই নয় যে, আমরা দ্বীনী মাদরাসাগুলোতে প্রচলিত নেসাব ও নেযামে কোনো ধরনের সংস্কারের পক্ষপাতী নই বা এর কোনো প্রয়োজনীয়তা আমরা উপলব্ধি করি না। বরং আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, নেসাব ও নেযামে যে-কোনো সংস্কার বা সংযোজন করার পূর্বে আমাদেরকে এর উদ্দেশ্য স্থির করে নিতে হবে। উদ্দেশ্য যদি উল্লিখিত তিনটির কোনো একটি হয়, তাহলে আমরা এই উদ্দেশ্যে কোনো পরিবর্তন আনা প্রয়োজন মনে করি না। শুধু তা-ই নয়; বরং আমরা কঠোরভাবে এমন সংস্কারের বিরোধিতা করি।

আর যদি নেসাব ও নেযামে সংস্কারের উদ্দেশ্য এই হয় যে, মাদরাসা থেকে শিক্ষাসমাপনকারীরা আলেমেদ্বীন হিসেবে অধিকতর শক্তিশালী যোগ্যতার অধিকারী হবে এবং পূর্বাপেক্ষা আরও ব্যাপক মাত্রায় দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দেবে, তাহলে নেসাব-নেযামে এমন সংস্কার কেবল মোবারকবাদ পাওয়ার যোগ্যই নয়; বরং এটি সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি বটে।

তবে এর পূর্বশর্ত হল, ওপরে বর্ণিত তিন উদ্দেশ্য মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। তারপর কেবল এই দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে হবে যে, একজন আলেমেদ্বীনের সত্যিকার (ইলমী) প্রয়োজন কী এবং বর্তমান নেসাব ও নেযামের দ্বারা তা পূরণ হচ্ছে কি না? যদি তা পূরণ না হয়ে থাকে, তাহলে এর জন্য কোন্ কারণগুলো বাস্তবেই দায়ী এবং এগুলো দূর করে কীভাবে কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা হাসিল করা যায়?

 

পুনশ্চ : এ আলোচনার পর হযরত শাইখুল ইসলাম দা. বা. উক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে নেসাব ও নেযামে কী কী সংস্কার হওয়া প্রয়োজন— তা বিস্তারিত তুলে ধরেন।

 

[মাদারেসে দ্বীনিয়্যা কা নেসাব ও নেযাম, পৃ. ১১১-১১৫

(সংস্কার বিষয়ে : পৃ. ১১৬-১৩১);

হামারা তা‘লীমী নেযাম, পৃ. ৮৭ -৯২

(সংস্কার বিষয়ে : পৃ. ৯২-১০৬)

ভাষান্তর : রায়হান বিন ইমরান]

 

advertisement