তাফসীরে মাতুরীদী
কুরআনের খেদমতে হানাফী আলেমদের এক অনন্য কীর্তি
মাওলানা হুযাইফা জা‘ফর
মধ্য এশিয়ার অন্যতম প্রধান একটি নদীর নাম ‘আমু’। এ নদীর পূর্ব তীরের অঞ্চলগুলোকে বলা হয়— بلاد ما وراء النهر (মা-ওয়ারাউন নাহর-এর অঞ্চল)।
বর্তমান উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, দক্ষিণ কিরগিজিস্তান, দক্ষিণ-পশ্চিম কাজাখাস্তান জুড়ে এই অঞ্চল বিস্তৃত। মধ্য এশিয়ার এ অঞ্চলটি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় প্রবেশের পর থেকে ইলমের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এ অঞ্চলের প্রসিদ্ধ কিছু নগর হল— বুখারা, তিরমিয, সমরকন্দ, তাশখন্দ, মারভ ইত্যাদি। এ সমস্ত অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিলেন সহস্রাধিক ফকীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির। তাঁদেরই এক কীর্তিমান পুরুষ হলেন ইমাম আবু মানসূর মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ আলমাতুরীদী আস্সামারকান্দী আলহানাফী রাহ. (মৃ. ৩৩৩ হি.)। তাঁর জন্মও এ অঞ্চলে।
হযরাতুল উস্তায মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম মাসিক আলকাউসার নভেম্বর ২০২১ সংখ্যায় ইমাম মাতুরীদী রাহ.-এর পরিচয় ও মাকাম নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা করেছেন, যা আমরা পড়ে নিতে পারি। এই মহা মনীষীর মর্যাদা ও মাকাম বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, তিনি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের অন্যতম মুখপাত্র ও ইমাম হিসেবে সমাদৃত।
তাঁর একটি মহান কীর্তি হল তাঁর তাফসীরগ্রন্থ। এ তাফসীরগ্রন্থের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ হানাফী ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী রাহ. (মৃ. ৫০৮ হি.) ও আল্লামা আবদুল কাদের কুরাশী রাহ. (মৃ. ৭৭৫ হি.) বলেন—
كتاب لا يوازيه في فنه كتاب، بل لا يدانيه شيء من تصانيف من سبقه في ذلك الفن. (تبصرة الأدلة ১/৩৫৯، الجواهر المضية ৩/৩৬০)
ইমাম আলাউদ্দীন সামারকান্দী রাহ. বলেন—
كتاب جليل القدر عظيم الفائدة. (شرح التأويلات -مخطوط-، ق:১/أ)
তাফসীরের নাম প্রসঙ্গে
কিতাবটির প্রসিদ্ধ নাম—
تأويلات أهل السنة
এই নামে একাধিক মাকতাবা থেকে তাফসীরটি প্রকাশিত হয়েছে। তবে এর নাম تأويلات القرآن হওয়াটাই সম্ভবত অগ্রগণ্য ও রাজেহ। কারণ আবুল মুঈন নাসাফী, ইবনে কুতলূবুগা, যাবিদী রাহ.-সহ আরও অনেক আহলে ইলম এ কিতাবের নাম تأويلات القرآن -ই উল্লেখ করেছেন।
চতুর্থ শতাব্দীর একজন ইমাম হলেন মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া বাশাগারী মাতুরীদী রাহ.। একদিকে তিনি ইমাম মাতুরীদী রাহ.-এর স্বদেশি, আবার এক মাধ্যমে তাঁর শাগরেদও। তিনি তাঁর ‘ইসমাতুল আম্বিয়া’ কিতাবে একাধিক স্থানে এ তাফসীরের নাম উল্লেখ করেছেন— تأويل القرآن (দ্র. কাশফুল গাওয়ামিয ফী আহওয়ালিল আম্বিয়া (ইসমাতুল আম্বিয়া), পৃ. ৮৫৫, ৮৮৭, ৯৯৩)
আবার অনেক আহলে ইলম যেমন, আবুল ইয়ুসর বাযদাভী রাহ. ও আলাউদ্দীন সামারকান্দী রাহ. সংক্ষেপে একে كتاب التأويلات নামেও উল্লেখ করেছেন।
তবে হাঁ, হাজী খলীফা রাহ. তাঁর কাশফুয যুনূন গ্রন্থে تأويلات أهل السنة নামটি উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে সমসাময়িক একাধিক মুহাক্কিকের ভাষ্যমতে এ তাফসীরের অধিকাংশ পাণ্ডুলিপিতে কিতাবের নাম تأويلات القرآن রয়েছে, যদিও কিছু কিছু নুসখায় প্রসিদ্ধ নামটিও আছে। দেখুন—
الإمام الماتريدي ومنهج أهل السنة، ص ৫৫-৫৮، تأويلات القرآن: مدخل وصفي تحليلي، كلاهما للدكتور أحمد سعد الدمنهوري، وإمام أهل السنة، للدكتور عبد الفتاح المغربي، ص: ২৪-২৬ ومقدمة التحقيق، لطبعة دار الميزان من >تأويلات القرآن<.
ড. আহমাদ সা‘দ দামানহুরী হাফি. —যিনি ইমাম মাতুরীদী রাহ.-এর তুরাছ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ আলেম— تأويلات القرآن নামটিকেই অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করেছেন। এ তাফসীরের আমাদের জানা মতে সর্বশেষ প্রকাশনা, যা তুরস্কের দারুল মীযান থেকে ছেপেছে, তাতেও এই নামই অবলম্বন করা হয়েছে।
এ তাফসীরের কিছু বৈশিষ্ট্য
* এতে রিওয়ায়াত ও দিরায়াতের মাঝে এক সুন্দর সমন্বয় এবং নকল ও আকলের মাঝে এক চমৎকার সেতুবন্ধন ঘটেছে।
* এ তাফসীরে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের আকীদা, মাসলাক এবং তৎসংক্রান্ত মাসআলাগুলোর প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মাতুরীদী রাহ. বিভিন্ন আয়াত থেকে আহলে সুন্নতের আকীদার সপক্ষে ইস্তিদলাল করেছেন। বিশেষ করে ‘সিফাতে মুতাশাবিহা’ বিষয়ে তিনি একাধিক স্থানে মজবুত ও দলীলনির্ভর আলোচনা করেছেন।
এই বিষয়ে তিনি জুমহূর আহলে সুন্নতের দুটি কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেছেন—
১. তাফবীয।
২. শর্তস্বাপেক্ষে যুক্তিসংগত তাবীল।
* ফিরাকে বাতেলার রদ এ তাফসীরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আয়াত থেকে কোনো বাতিল ফেরকা দলীল দিয়ে থাকলে তার খণ্ডন এ কিতাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
যেমন, যেসব আয়াত থেকে মুশাব্বিহা বা সাদৃশ্যবাদীরা ইস্তিদলাল করে থাকে বা তাশবীহের ভুল ধারণা হতে পারে, সেসব আয়াতে ইমাম মাতুরীদী রাহ. খুব বলিষ্ঠকণ্ঠে আহলে সুন্নতের মাসলাক সাব্যস্ত করেছেন।
এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় মুতাযিলী, খারেজী, বাতেনী, ইমামিয়া, নাস্তিক, দার্শনিক ও ভ্রান্ত সুফী ইত্যাদি বাতিল গোষ্ঠীগুলোরও রদ করেছেন।
* এ তাফসীরের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল, ইসমতে আম্বিয়া সংক্রান্ত আলোচনা। এ আলোচনাগুলো তাঁর প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের বড় স্বাক্ষর। যেসব আয়াতে ভুল বুঝে অনেকে ইসমতে আম্বিয়ার অকাট্য আকীদাপরিপন্থি কথা বলে, সেসব আয়াতের আলোচনায় ইসমতে আম্বিয়াকে দৃপ্তকণ্ঠে সাব্যস্ত করেছেন। আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা করেছেন, যা আম্বিয়ায়ে কেরামের শানের উপযোগী।
যেমন, দাউদ আ.-এর ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন—
فإن قيل: كيف عوتب كل هذا العتاب...إن كان معذورا في ذلك غير مؤاخذ به؟!
قيل: إن الأنبياء -صلوات الله عليهم أجمعين- كانوا يؤاخذون بأدنى شيء كان منهم ما لا يؤاخذ غيرهم بذلك، بل يعد ذلك منهم من أرفع الخصال وأجلها، نحو ما عوتب يونس عليه السلام في خروجه من بين قومه؛ ليسلم دينه أو نفسه، لكنه خرج بلا إذن كان له من الله؛ فعوتب لذلك؛ فعلى ذلك داود عليه السلام إنما فعل بلا إذن من الله عز وجل. (تأويلات القرآن ৮/৬১৬-৬১৭، ط. دار الكتب العلمية)
অন্য এক স্থানে বলেন—
قوله عز وجل: {لِیَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْۢبِكَ وَ مَا تَاَخَّرَ} (الفتح : ২)، لا يجوز لنا أن نبحث عن ذنبه ونتكلف أنه ما كان ذنبه؟ وأيش كانت زلته؟ لأن البحث عن زلته مما يوجب التنقص فيه، فمن تكلف البحث عن ذلك يخاف عليه الكفر، لكن ذنبه وذنب سائر الأنبياء عليهم السلام ليس نظير ذنبنا؛ إذ ذنبهم بمنزلة فعل مباح منا، لكنهم نُهُوا عن ذلك، والله أعلم. (تأويلات القرآن ৯/২৯২)
হযরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনায় বলেন—
أما ما قاله أهل التأويل إنها استلقت له {وَهَمَّ بِهَا} أي حل سراويله، وأمثال هذا من الخرافات؛ فهذا كله مما لا يحل أن يقال فيه شيء من ذلك، والدلالة على فساد ذلك من وجوه... (تأويلات القرآن ৬/২২৫)
* ইমাম মাতুরীদী রাহ. তাঁর এ তাফসীরে হানাফী মাযহাবের বিভিন্ন উসূল ও কাওয়ায়েদ এবং মাসায়েল কুরআনের আলোকে প্রমাণিত করেছেন। আবুল মুঈন নাসাফী রাহ.-এর ভাষ্যমতে মাতুরীদী রাহ. হলেন ((أعرف الناس بمذاهب أبي حنيفة)) —তাবসিরাতুল আদিল্লাহ ১/১৬২
তাই মাতুরীদী রাহ.-এর এ সংক্রান্ত আলোচনাগুলো হানাফী মাযহাবের মূল্যবান সম্পদ।
* কুরআনের পরিভাষা বোঝার ক্ষেত্রে কারও কারও মধ্যে এ ত্রুটি দেখা যায়, আপন যুগের বা কোনো শাস্ত্রের ভাষা ও পরিভাষা দ্বারা কুরআন বোঝার চেষ্টা করে। অথচ কুরআনের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও ভঙ্গি, স্বতন্ত্র অর্থ ও মর্ম, যা বুঝতে হবে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত ও সুন্নত, উম্মতের ফাহমে মুতাওয়ারাস , কুরআন নাযিলের প্রেক্ষাপট ও সেসময়ের ভাষাভাষীদের ব্যবহারের আলোকে। শুধু শাব্দিক মিল বা কোনো ধরনের সামঞ্জস্য দেখে কুরআনের আয়াত বা শব্দকে নবসৃষ্ট পরিভাষা দ্বারা ব্যাখ্যা করা বা বোঝার চেষ্টা করা অনেক সময় ভুলের কারণ হয়। সম্ভবত এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ নীতির দিকে ইমাম মাতুরীদী রাহ. ইঙ্গিত করে বলেছেন—
قوله:{فَسُبْحٰنَ اللهِ حِیْنَ تُمْسُوْنَ وَحِیْنَ تُصْبِحُوْنَ} فهمت الأمة من قوله: {سُبْحٰنَ اللهِ}: الصلاة ু ولفظه فيما نقل عنه صاحب البدائع ১/৮৯: >إنهم فهموا من هذه الآية فرضية الصلوات الخمس< - أي: صلوا لله، ولو كانت أفهام أهل زماننا هذا لكانوا لا يفهمون سوى التسبيح المذكور. (تأويلات القرآن ৮/২৫৮)
وينظر أيضا: ৭/৫৫৮، ৯/১১০
* কুরআনের যেসব আয়াত কারও কাছে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে, অথচ প্রকৃতপক্ষে কুরআনে কোনো সংঘর্ষ নেই, সে আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।
* এ তাফসীরগ্রন্থে মাতুরীদী রাহ.-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হল, আয়াতের মূল মর্ম ও শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করা। বিস্তারিত ব্যাখ্যা, যার ওপর কুরআন বোঝা মওকূফ নয়, তাতে অতিরিক্ত ব্যস্ত না হওয়া।
যেমন, সূরা সাফফাতের ১১৩ নং আয়াত—
وَبٰرَكْنَا عَلَیْهِ وَ عَلٰۤی اِسْحٰقَ وَمِنْ ذُرِّیَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَّظَالِمٌ لِّنَفْسِهٖ مُبِیْنٌ.
এখানে (مُحْسِنٌ)-এর মিসদাক নিয়ে বিভিন্ন মত উল্লেখ করার পর বলেন—
لا حاجة لنا إلى معرفة ذلك أنه فلان أو فلان؛ إذ لو كان لنا إلى بيان ذلك حاجة لبَيَّن وأزال الإشكال، واختلاف الناس في ذلك والتكلم فيه فضلٌ وتكلفٌ؛ إذ لا يحتمل أن يكون بالناس حاجة إلى معرفة ذلك وبيانه، ثم لا يبيِّن لهم ولا يعرِّف ذلك، فدل ترك التنازع لذلك: على أن لا حاجة لهم إلى ذلك. (تأويلات القرآن ৮/৫৮২)
অন্য জায়গায় বলেন—
وقوله عز وجل: وَ اتْلُ عَلَیْهِمْ نَبَاَ ابْنَیْ اٰدَمَ بِالْحَقِّ اِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا... (المائدة ( ২৭ :
(فساق بعض الأقوال والحكايات في قصة ابني آدم، ثم قال:) ولكن لا ندري كيف كانت، وفيما كانت القصة؟ وكانا ابني آدم لصلبه، أو لم يكونا؟ وليس لنا إلى معرفة هذا حاجة، إنما الحاجة في هذا إلى معرفة ما فيه من الحكمة والعلم؛ ليُعلم ذلك ويُعمَل به. (تأويلات القرآن( ৩/৪৯৬
উল্লিখিত মূলনীতিরই বহিঃপ্রকাশ হল ইসরাঈলী বর্ণনার ক্ষেত্রে মাতুরীদী রাহ.-এর সতর্কতা ও সংযম এবং ইসরাঈলী বর্ণনায় কোনো আপত্তিকর কথা থাকলে তার নকদ ও খণ্ডন। এজন্য পরবর্তী অনেক তাফসীরের তুলনায় এ তাফসীরে ইসরাঈলী বর্ণনা খুবই কম।
যেমন— আইয়ূব আলাইহিস সালামের মসিবতের ঘটনা প্রসঙ্গে সাধারণত বিভিন্ন ইসরাঈলী বর্ণনা উল্লেখ করা হয়। তবে এ প্রসঙ্গে ইমাম মাতুরীদী রাহ.-এর আলোচনা ভিন্ন রকম—
وقوله عز وجل: {وَ اذْكُرْ عَبْدَنَاۤ اَیُّوْبَ ۘ اِذْ نَادٰی رَبَّهٗۤ اَنِّیْ مَسَّنِیَ الشَّیْطٰنُ بِنُصْبٍ وَّعَذَابٍ} ثم لا ندري ما الذي كان من الله من تمكين الشيطان عليه حتى أضاف ذلك إلى الشيطان، وليس لنا أن نقول: إنه مكن عليه كذا، وفعل كذا في كذا، وفعل به كذا، إلا أن يثبت عن الله...
وقوله عز وجل: {وَ خُذْ بِیَدِكَ ضِغْثًا فَاضْرِبْ بِّهٖ وَ لَا تَحْنَثْ اِنَّا وَجَدْنٰهُ صَابِرًا نِّعْمَ الْعَبْدُ اِنَّهٗۤ اَوَّابٌ} اختلف في السبب الذي كان من أيوب عليه السلام الحلف بضرب امرأته، ولكن لسنا ندري ما السبب الذي حمله على الحلف بضربها، ولا حاجة لنا إلى معرفة ذلك السبب. (تأويلات القرآن ৮/৬৩২-৬৩৫)
(আরও দেখুন : তাফসীরে মাতুরীদী, ৭/১৫৬, ৭/৩০৩, ৬/৪১৪, ৭/১৯৯ এবং الإمام الماتريدي ومنهج أهل السنة، ص ৩৯৩-৩৯৬)
এ প্রসঙ্গে মাতুরীদী রাহ. বিশেষভাবে যে বিষয়টি বারবার বলেছেন, তা হল, কুরআন কারীমে পূর্ববর্তী নবীগণ ও বনী ইসরাঈলের যে ঘটনাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হল, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওতের সত্যতা প্রমাণ করা যে, তিনি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ না পড়েও কীভাবে সে ঘটনাগুলোর নিখুঁত বিবরণ দিচ্ছেন! এ সংক্রান্ত আয়াতগুলো বিশেষভাবে আহলে কিতাবের বিপক্ষে প্রমাণ ও তাদের ওপর হুজ্জত।
অতএব আমরা যদি এসব ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ইসরাঈলী বর্ণনা উল্লেখ করি, তাহলে যে উদ্দেশ্যে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে, তার উল্টোটা হতে পারে। কারণ ইসরাঈলী বর্ণনায় সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ রয়েছে, বৈপরীত্য রয়েছে, এগুলো নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়নি। (দ্র. তাফসীরে মাতুরীদী ৭/৬-৭, ১৯৪, ২৪৪, ৩০৩-৩০৪, ৩৫৬; ৮/৫৯; ৯/৩৮৫, ৫৬৮; ১০/৯৮, ৪৮৩)
উক্ত মূলনীতির আরেকটি বহিঃপ্রকাশ হল, যেসব বর্ণনা শানে নুযূলের নামে অনেক কিতাবে উল্লেখ করা হয়, অথচ সেগুলোর ওপর আয়াতের মর্ম অনুধাবন নির্ভরশীল নয়, ইমাম মাতুরীদী রাহ. সেসব বর্ণনার সমাহার ঘটিয়ে তাফসীরকে দীর্ঘ করেননি। যেমন—
قوله تعالى: {یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَخُوْنُوا اللهَ وَالرَّسُوْلَ وَ تَخُوْنُوْۤا اَمٰنٰتِكُمْ وَاَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ}، اختلف أهل التأويل في نزول الآية، قال بعضهم: نزلت في أبي لبابة، وقال بعضهم: نزلت في شأن حاطب بن أبي بلتعة، وقيل...
لكنا لا ندري في شأن من نزلت، وليس لنا إلى معرفة ذلك حاجة، سوى أن فيه ما ذكرنا من النهي عن الخيانة في أمانة الله، والأمر بحفظها، والله أعلم. (تأويلات القرآن (৫/১৮৬
আরেকটি বহিঃপ্রকাশ হল হুরূফে মুকাত্তাআতের তাফসীরের ব্যাপারে ইমাম মাতুরীদী রাহ.-এর অবস্থান। তিনি এসব হরফের তাফসীরের বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করেছেন।
* কুরআনে মাজীদ সঠিকভাবে বুঝতে হলে أصول فهم القرآن এবং أصول الفقه -এর আলোকে বুঝতে হবে। এ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি মাতুরীদী রাহ. বিভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, আবার বহু জায়গায় এর প্রয়োগও দেখিয়েছেন। (দ্র. তাফসীরে মাতুরীদী ১/৫৮৯, ৬/৫৭০, ৬/৫৩৮, ৯/৬০৭)
* কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে আমলে মুতাওয়ারাস ও মুতালাক্কা বিল কবুল হাদীসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ দুই ধরনের দলীলের ব্যাপারে যাদের আপত্তি বা অনীহা থাকে, তাদের খণ্ডন ও সম্বোধন করে বিভিন্ন জায়গায় এ দলীলগুলোর গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। (দ্র. তাফসীরে মাতুরীদী ২/১৮, ৩/১৭৭, ৪/২৯৩-২৯৮)
এ তাফসীরের ওপর হওয়া কিছু কাজ
তাফসীরে মাতুরীদী পূর্ণ প্রকাশিত হয় ১৪২৫ হি. (২০০৪ ঈ.) মুআসসাসাতুর রিসালা থেকে ফাতেমা ইউসুফের তাহকীকে, পরে ১৪২৬ হি. (২০০৫ ঈ.) দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা থেকে ড. মাজদী বাসালূমের তাহকীকেও পূর্ণ তাফসীর প্রকাশিত হয়। উভয়ে নিজ প্রকাশনায় দুই থেকে তিনটি পাণ্ডুলিপির ওপর কাজ করেছেন। প্রত্যেকে এমন পাণ্ডুলিপি সামনে রেখেছেন, যা অন্যজন রাখেননি। সর্বশেষ তুরস্কের দারুল মীযান থেকে وقف الإمام أبي حنيفة والإمام الماتريدي للبحوث -এর উদ্যোগে ২০০৫ ঈ. থেকে ২০০৭ ঈ. পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এর একটি তাহকীক প্রকাশিত হয়। এ তাহকীকটিতে মূল তাফসীরের একাধিক নুসখার পাশাপাশি সামারকান্দী রাহ.-এর শরাহও সামনে রাখা হয়েছে।
প্রসিদ্ধ হানাফী ইমাম আলাউদ্দীন সামারকান্দী রাহ. (মৃ. আনুমানিক ৫৩০ হি.-৫৫০ হি.) —যিনি ‘বাদায়েউস সানায়ে’-এর মতন ‘তুহফাতুল ফুকাহা’সহ আরও অনেক মূল্যবান কিতাবের মুসান্নিফ— তাফসীরে মাতুরীদীর শরাহ লিখেছেন, যা মূলত তাঁর শায়খ ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী রাহ.-এর দরসের ইফাদাতের সংকলন এবং شرح التأويلات নামে পরিচিত। এর মুকাদ্দিমায় সামারকান্দী রাহ. লিখেছেন—
>إن كتاب التأويلات المنسوب إلى الشيخ الإمام علم الهدى أبي منصور محمد بن محمد بن محمود الماتريدي رضي الله عنه كتاب جليل القدر عظيم الفائدة؛ إذ فيه بيان أن مذهب أهل السنة والجماعة في أصول التوحيد ومذهب أبي حنيفة وأصحابه رحمهم الله في أصول الفقه وفروعه على موافقة القرآن.
غير أن هذا الكتاب ليس مما صنفه بنفسه، وإنما أخذ منه أصحابه المبرزون تلقفا، ولهذا كان أسهل مُتَناولًا من كتبه المصنفة بكثير، لكن مع هذا لا يخلو عن نوع إغلاق في اللفظ وإبهام في المعنى، بحيث يعجز عن دركه كثير ممن يدعي التبريز في العلوم، وإنما يحصِّله من أفنى عمره في أصول التوحيد وأصول الفقه ومعرفة صناعة الكلام ومعاني اللغة.
ولما اتفق لنا قراءة هذا الكتاب على الشيخ الإمام أبي المعين رحمه الله، وكان فريد عصره في الأصول والفروع، مستجمعا جميع أنواع العلوم، فأخذ في شرحه على ما هو الشرط في الباب، من إيضاح المغلق، وتفصيل المطلق، ومن زيادة فوائد تليق بالكتاب، فكرهت أن تفوتني هذه الفوائد التي هي فرائد القلائد، فاستخرت الله تعالى وسألته التوفيق في تسويدها بأسهل اللفظ والعبارة على شرط الإيجاز دون الإطناب والإشارة...
)شرح التأويلات -مخطوط-، نسخة أسعد أفندي: ৪৮، ونسخة شهيد علي باشا: ২৮৩، ونسخة الحميدية(১৭৬ :
সামারকান্দী রাহ.-এর শরাহটি এখনও পাণ্ডুলিপি আকারে তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের জাদুঘর ও লাইব্রেরিগুলোতে রয়েছে।
খুশির খবর হল, তুরস্কের কিছু বাহেছ এই কিতাবের ওপর কাজ করছেন। আল্লাহ তাআলা সহজ ও কবুল করুন।
সমসাময়িক আলেমদের মধ্যে ড. আহমাদ সা‘দ দামানহুরী হাফি. ইমাম মাতুরীদী রাহ. ও তাঁর তুরাছ নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করছেন। উজবেকিস্তানের مركز الإمام الماتريدي الدولي للبحوث العلمية -এর তত্ত্বাবধানে এবং স্বতন্ত্রভাবেও তিনি অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে জাযায়ে খায়ের দান করুন এবং আমাদেরকে এ মহান তাফসীরগ্রন্থ থেকে যথাযথ উপকৃত হওয়ার তাওফীক নসীব করুন। ·
টীকা
১. অর্থাৎ সাহাবী-তাবেয়ীন তথা সালাফ থেকে কুরআন-সুন্নাহ্র যে বুঝ ও ব্যাখ্যা প্রজন্ম পরম্পরায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে।