Rabiul Akhir-Jumadal Ula 1448   ||   October 2026

একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্ত
বিএনপিকে বুঝতে হবে জনসমর্থন কোনো স্থায়ী বিষয় নয়

জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে সাত মাসের মতো হয়েছে। এরই মধ্যে এ সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা এককথায় গণবিরোধী। যার বিরূপ প্রভাব জনজীবনে ইতোমধ্যেই ব্যাপকভাবে পড়েছে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিবাদী সরকার অধিষ্ঠিত থেকে শুধু দেশকেই লুটপাট করেনি; বরং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও গণবিরোধী নানান সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের নাভিশ্বাস তুলেছিল। এরপর ২০২৪ সালে ছাত্রজনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে এ বছরের শুরুতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।

সংগত কারণেই জনগণ আশা করেছিল, এই সরকার সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝবে। গণমানুষের কল্যাণের প্রতি লক্ষ রেখেই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। কিন্তু সরকারের ক্ষমতা লাভের অর্ধবছর পার হতে না হতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ভর করেছে। কাঙ্ক্ষিত কিছু বিষয়ে তো এমনিতেই সরকার সফলতা দেখাতে পারেনি। যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি। দীর্ঘদিনের সংস্কার ও মেরামতের অভাবে রাস্তাঘাটের যে বেহাল দশা হয়েছে, একারণে সারা দেশের মানুষ যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, সেক্ষেত্রেও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এসবের মধ্যেই মরার ওপর খাঁড়ার ঘা! সরকার দুই-দুইবার জ্বালানি তেলের দাম বড় আকারে বৃদ্ধি করেছে। ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে বিদ্যুতের দাম। কে না জানে, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এমন একটি বিষয়, যা শুধু গাড়িচালকদের নয়; বরং পুরো জাতিকেই প্রভাবিত করে।

বর্তমানে সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে সব ধরনের পরিবহণ ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ যে হারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি হারে বেড়ে যায় পরিবহণ ভাড়া। বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি ভাড়া বৃদ্ধি করে দেয়। এদেশে কখনও কোনো সরকার এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। তাই এই ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে পুরো জাতির ওপর।

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি মানেই হল, বাজারে আগুন লেগে যাওয়া। এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তার ওপরে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথেই পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ব্যাপকভাবে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করা হয়। যার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরে তৎক্ষণাৎ পড়ে।

বিদ্যুতের ব্যাপারটিও একই রকম। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশের পুরো শিল্পখাত। লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে বহু শিল্প মালিক মিল-কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে ফ্যাক্টরি চালানো এবং তাতে উৎপাদিত পণ্যের খরচ উঠিয়ে লাভবান হওয়া সম্ভব নয় বলে তারা মন্তব্য করেছেন। একদিকে তো সরকার ঠিকমতো বিদ্যুৎ-গ্যাস সাপ্লাইও দিতে পারছে না, অন্যদিকে এগুলোর মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে অস্বাভাবিক হারে। এই সরকার ক্ষমতায় বসেই বিদ্যুতের মূল্য এত হারে বৃদ্ধি করল যে, মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। মানুষ কিছু বুঝেই উঠতে পারল না যে, সরকারের কী এত বড় ঠেকা পড়ে গেল যে, ক্ষমতায় বসেই এত হারে বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি করতে হল! গদিতে বসার সাথে সাথে জ্বালানি তেলের মূল্য কত পারসেন্ট বাড়িয়েছে— তারা কি চিন্তা করেছে? জ্বালানি তেলের মূল্য দুই দফায় প্রায় ৪০% বৃদ্ধি করা হয়েছে; ভাবা যায়!

অজুহাত দেখানো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির। অথচ সরকার যেদিন তেলের দাম বাড়াল সেদিনও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপরিস্থিতি তো আজকে তৈরি হয়নি। এটা পুরোনো বিষয়। সরকার কত খাতে, কত রকমের ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তেলের মূল্য দিয়ে সরকার আর কত টাকা কামাবে? জ্বালানি তেলের ওপরে যদিও সরকার ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলে থাকে; কিন্তু সেটাতে যে লেভি, ট্যাক্সসহ বিভিন্ন ধরনের বিষয় যুক্ত করা হয়, সে খাতে সরকারের আয় কত? সরকার যদি গণমুখী এই খাতটিকে আয়ের উৎস না বানিয়ে ভর্তুকি দিত, তাহলে জনগণের কল্যাণ হত। এ ভর্তুকি সরকার অন্য দিক থেকে সমন্বয় করতে পারত। কিন্তু জনগণের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়ে সরকারি লোকেরা উৎসাহী হয়ে গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তা সরকারের জন্য ভবিষ্যতে কী পরিণতি বয়ে আনে— এ নিয়ে ভাবা দরকার।

একইসাথে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও বৃদ্ধি করা হয়েছে বিশাল আকারে। প্রশ্ন হল, এ মুহূর্তে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের এত পরিমাণে বেতন বৃদ্ধি করা কি খুব আবশ্যক ছিল? খোদ জাতীয় সংসদের স্পিকার সাহেব বলেছেন, ‘এদেশের অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর।’ আমরা বললে তো দোষ হয়ে যায়। জাতীয় সংসদের স্পিকারের মুখ থেকে যে কথা বের হয়েছে, সেটা আসলে এদেশের ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণের কথা। স্পিকারের মুখ দিয়ে ‘হক’ কথাটা বের হয়ে গেছে। তো এই যে সরকারের বিশাল অংশ, জনপ্রশাসনের বড় অংশ দুর্নীতির সাথে জড়িত, এদেশে ঘুষ-উৎকোচ যে ওপেন সিক্রেট থেকেও আরও বেশি খোলাখুলিভাবে চলছে— সরকারের বেতন বৃদ্ধির কারণে কি তা কমবে? ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা কি কখনও বেতনকে আসল কিছু মনে করেছে? তাহলে এ বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন বাজারের ওপর কুপ্রভাব তৈরি করা হল? মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ করে দেওয়া হল?

আসলে সাধারণ জনগণ বুঝে উঠতে পারছে না, কারা এসকল সিদ্ধান্ত নেয়? এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কারা কাজ করছে? এজাতীয় সিদ্ধান্তের বিষয়ে পরামর্শদাতা কারা? তারা কি বাস্তবে সরকারের কল্যাণ চায়, না অন্য কিছু চায়? সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টারা বলে দিচ্ছেন, ‘আর কোনো উপায় ছিল না।’ ‘জ্বালানি তেলের দাম বিদেশ থেকে কম।’ আপনি এখানকার লোকদেরকে ইউরোপ-আমেরিকা দেখালে তো হবে না। ইউরোপ-আমেরিকার লোকদের আয় কত আর এখানকার লোকদের আয় কত? সেখানে কারও কামাই না থাকলে রাষ্ট্র ভাতা দেয়। এদেশে কি উপার্জনহীন ও দরিদ্রদের সরকার চালায়?

এই সময়ে এত বৃহৎ আকারে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সরকারকে দিয়ে আসলে কে করিয়ে নিল? স্বাভাবিকভাবে তো দেখা যাচ্ছে, আমলাদের বিশাল অংশই আগের সরকারের দোসর। সরকার কেন সাধারণ জনগণকে বিরাগভাজন করে কর্মচারীদের খুশি করতে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে! এটাও সরকারের বোঝা দরকার।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, এ সরকারকে জনগণ নিরঙ্কুশ সমর্থন ও ব্যাপকভাবে ভোট দিয়ে এজন্য বিজয়ী করেনি যে, তারা ক্ষমতায় বসেই তাদেরকে দুঃখ-কষ্ট উপহার দেবে। বরং কিছু প্রত্যাশা নিয়েই মানুষ তাদেরকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। দুনিয়ার সকল সরকারেরই বোঝা উচিত, জনসমর্থন কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তো এ কথাটি আরও অনেক বেশি প্রযোজ্য। কারণ এদেশের জনগণ নগদকে মনে রাখে। অতীত খুব দ্রুত ভুলে যায়।

সুতরাং সরকারকে জনগণের স্বভাব-প্রকৃতি ও মন-মেযাজ বুঝে অগ্রসর হতে হবে। সরকার যদি চায়, জনসমর্থনে ধস না নামুক, দ্রুত মানুষ তাদের প্রতি বিরূপ হয়ে না উঠুক, তাহলে এসকল সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহার করা দরকার। জ্বালানি তেলের দাম যেভাবে বাড়ানো যায়, তেমনি কমানোও যায়। সরকারের উচিত সেটাকে সমন্বয় করা এবং কমিয়ে নিয়ে আসা। জনগণের দুঃখ-কষ্টের দিকে নজর দেওয়া। জ্বালানি তেলের দাম যখন কমানো হবে, তার প্রভাব যেন বাজারের ওপরে পড়ে, সেটাও সরকারকে পাকাপোক্তভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে সরকার যত দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে, ততই তাদের কল্যাণ হবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কল্যাণ হবে, সর্বোপরি জনগণের উপকার হবে।

 

advertisement