Rabiul Awal 1448   ||   September 2026

সাক্ষাৎকার
‘ইলমের প্রতি মহব্বত থাকতে হবে এবং মুতালাআর উদ্দেশ্য হতে হবে ইলমে নাফে হাসিল করা’

Mawlana Muhammad Abdul Malek

[২৭ জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪১ হিজরী মোতাবেক ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে পাকিস্তানের করাচি ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডিরত লেখক জনাব মুহাম্মাদ যফর ইকবাল সাহেব হযরাতুল উস্তায মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার উদ্দেশ্যে স্বতন্ত্র দরখাস্তসহ একটি ‘সুওয়ালনামা’ বা ‘জিজ্ঞাসাপত্র’ পাঠিয়েছিলেন। উস্তাযে মুহতারাম তার কিছু জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন। পরবর্তীতে তাতে আরও কিছু জরুরি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। হুজুরের অনুমতি ও নযরে ছানীর পর নিম্নে তার অনুবাদ বর্ধিত অংশসহ তুলে ধরা হল। —তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব]

 

[মুহতারাম ভাই! আত্মকথন ও জীবন-বিবরণ তো হয়ে থাকে বড়দের। এ ধরনের প্রশ্নগুলো তাঁদের সামনে করা যায়। আমার মতো শিক্ষানবিশ তালিবুল ইলমের সামনে নয়। —বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক]

 

প্রশ্ন : মেহেরবানী করে আপনার পারিবারিক অবস্থা ও পড়াশোনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু বলবেন?

উত্তর : যতটুকু শুনেছি, পূর্বপুরুষদের মধ্যে আমার আব্বাজান রাহ.-ই প্রথম আলেম। দাদাজান ও তাঁর বাবা ছিলেন দ্বীনদার ও নেককার। তাঁদের পূর্বপুরুষদের অবস্থা সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

আমার আম্মা হাফিযাহাল্লাহু তাআলা ওয়া রাআহা হলেন হাফেজা, আলেমা ও একজন বিদূষী নারী। তাঁর কোলই ছিল আমাদের সব ভাইবোনের প্রথম মাদরাসা।

আম্মার নানার পরিবারে বহু আগে থেকেই ইলম ও দ্বীনদারীর পরিবেশ ছিল।

আমার আব্বাজান রাহ. এবং আমার মেজো মামা হযরত মাওলানা সাইফুল্লাহ ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম হলেন আমার খাস ও বুনিয়াদি উস্তাযদের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন : মুতালাআ ও অধ্যয়নের জন্য সর্বোত্তম বয়স কোন্টি, যে বয়সে অধ্যয়নকৃত বিষয় বোঝা ও মনে রাখা অধিক স্থায়ী হয়? তাছাড়া মুতালাআর জন্য দিনরাতের কোন্ সময়টি বেশি উপযোগী?

উত্তর : মুতালাআর জন্য পুরো জীবনই উপযুক্ত সময়। শর্ত হল, ইলমের প্রতি মহব্বত থাকতে হবে এবং মুতালাআর উদ্দেশ্য হতে হবে ‘ইলমে নাফে’ হাসিল করা।

সফল মুতালাআ সেটাই, যা হজমও হয়। এমন মুতালাআই ইলম, আমল ও দাওয়াত— সর্বক্ষেত্রে উপকারী হয়ে থাকে।

মুতালাআর জন্য উপযুক্ত সময় কোন্টি?’— এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, ব্যক্তিভেদে সময়ের উপযোগিতা ভিন্ন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল বিষয় হল, যেহেন ফারেগ হওয়া এবং ধ্যান ও মনোযোগ বজায় থাকা।

মুতালাআ হজম হওয়ার ধারণা পূর্বসূরি মনীষীদের মধ্যেও পাওয়া যায়। বিখ্যাত উক্তি আছে যে, ‘বড়দের খাবার ছোটদের জন্য বিষতুল্য।’ তাছাড়া সালাফের বাণীতে আছে— ‘মানুষকে তার আকলের মাত্রা অনুযায়ী কথা বলো।’ এই বাণীগুলো তো এজাতীয় প্রেক্ষাপটেই এসেছে।

তবে ইলম ও মুতালাআ হজম হওয়ার বিষয়ে যতটুকু মনে পড়ে— উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা আবদুর রশীদ নুমানী রাহ.-এর কাছে শুনেছি। তাঁকে মুতালাআর বিবরণ শোনালে প্রথমে উৎসাহ দিতেন। তারপর একদিন বললেন, ‘হজমও তো করো, নাকি!’

এখানে ‘হজম’ বলতে খাদ্য-পানীয় হজম হওয়ার অর্থেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ঠিকমতো হজম হলে দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খাদ্য-পানীয় থেকে উপকৃত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ বর্জ্য হিসেবে বেরিয়ে যায়। একইভাবে, কোনো কিতাবের মুতালাআ যদি যথাযথভাবে হজম হয়, তাহলে কিতাবের উপকারী অংশ গ্রহণ করা হবে; অপ্রয়োজনীয় অংশ (লেখকের ভিত্তিহীন ব্যক্তিগত কথা বা কোনো ভুল ও বিচ্যুতি) চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হবে; সেগুলোকে ‘ইলমে নাফে’-এর অংশ বানানো হবে না।

এই কারণেই তালিবুল ইলমদের মুতালাআ হতে হবে বিশুদ্ধ এবং বড়দের সযত্ন তত্ত্বাবধানে।

প্রশ্ন : শৈশবে কোন্ কিতাবটি মুতালাআর পর আপনার যেহেনে রেখাপাত করেছিল?

উত্তর : আম্মার ছোট্ট কুতুবখানা থেকে ‘হায়াতে মুফতী আযম’ এবং ‘মারসিয়ায়ে মুফতী আযম’ মুতালাআ করার স্মৃতি মনে আছে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘মুফতী আযম’ হযরত মাওলানা মুফতী ফয়যুল্লাহ চাটগামী রাহ. (১৩৯৬ হি.)-এর জীবনী পড়ে ‘ফানা ফিল ইলম’ অর্থাৎ ইলমের জন্য জীবনোৎসর্গ-এর গুরুত্ব এবং আকাবির বুযুর্গদের প্রতি মহত্ত্ববোধের বীজ আমার হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল।

প্রশ্ন : যে কিতাবগুলো আপনার ইলমী ও কলমী সফরে বিভিন্ন সময় সঙ্গ দিয়েছে এবং আপনার মুতালাআ ও ফিকরে বৈচিত্র্য ও গভীরতা এনেছে, সেই কিতাবগুলোর নাম এবং সেগুলোর মাধ্যমে সৃষ্ট অভিজ্ঞতা ও প্রভাব সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণা করবেন?

উত্তর : এমন মুজমাল ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন আমার মতে যথাযথ নয়। কোনো একটি দিক অথবা বিষয় নির্ধারণ করে প্রশ্ন হলে উত্তর দেওয়া সহজ হয়।

প্রশ্ন : কোন্ কিতাবগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বা অনেক দিন থেকে আপনার মুতালাআয় আছে? দীর্ঘ সময় ধরে সেগুলো মুতালাআয় থাকার পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে?

উত্তর : এই প্রশ্নটিও মুজমাল। তবু কিছু কথা পেশ করছি, এতে হুবহু প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে না, তবে আশা করি, কোনো কথা কারও উপকারে আসবে।

আমার আম্মার কুতুবখানায় যেহেতু মুফতী ফয়যুল্লাহ রাহ.-এর পুস্তিকাগুলোই বেশি ছিল, তাই আমার মুতালাআর সূচনা সেগুলোর মাধ্যমেই হয়েছে। আলহামদু লিল্লাহ, সেগুলো থেকে অনেক উপকার হয়েছে। তবে যেহেতু তাঁর লেখায় কিছু তাফাররুদাত বা নিজস্ব বক্তব্য ছিল, অথবা এভাবে বলা যায়, শাখাগত কিছু মাসাআলায় হযরতের একধরনের কঠোরতা ছিল, তাই কিছু পুস্তিকার কিছু কিছু আলোচনা সেই বয়স হিসেবে উপযুক্ত ছিল না।

পরবর্তীতে মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. ও হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ.-এর বিভিন্ন পুস্তিকা খুবই উপকারী হয়েছে।

মেশকাতের বছর আমি ‘আলাতে জাদীদাহ কে শরয়ী আহকাম’ ও ‘বাওয়াদিরুন নাওয়াদির’ পড়েছিলাম। ‘মাআরিফুল কুরআন’ মুতালাআও সেই বছর বা তার কিছু আগেই শুরু হয়েছিল।

অন্যদিকে ‘বয়ানুল কুরআন’, ‘তাফসীরে উসমানী’ এবং ‘জালালাইন’-এর পাঠ সম্ভবত ‘শরহে জামী’ জামাত থেকেই শুরু হয়েছে।

১৪০৫ হিজরীতে বড় ভাইয়াজান হযরত মাওলানা মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ বানূরী টাউন করাচির জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া’য় ‘আততাখাসসুস ফিল ফিকহ’ বিভাগে ভর্তি হন। তাঁর মাধ্যমে ‘মাদরাসা আরাবিয়া খেড়িহর’-এ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিতাব আসে। তন্মধ্যে ‘বাওয়াদিরুন নাওয়াদির’ ও ‘জাওয়াহিরুল ফিকহ’সহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কিতাব ছিল।

এর আগে হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ.-এর ‘আদাবুল মুআশারাত’ কিতাবটি হাতে আসে। এ কিতাবের মাধ্যমে আমার সামনে ইলম ও ফিকরের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

শরহে বেকায়া পড়ার বছর ভাইয়াজান ‘উমদাতুর রিআয়াহ’-এর ভূমিকা পড়তে বলেন। সেটি তখন মুতালাআ করি।

উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা আবদুল বারী ছাহেব রাহ. (১৪৩৩ হি.) আমাকে ‘দরসে ইবরাত’ ও ‘উম্মুল আমরায’ পুস্তিকাদুটি পাঠ করতে বলেন। এতে ‘তাওয়াযু’ বা বিনয়ের পরিচয় অনুধাবন করতে শুরু করি। হুজুরের অনুমান ছিল যে, বিনয় সম্পর্কে আমি ‘জাহলে মুরাক্কাব’-এর শিকার।

তাঁর মাধ্যমেই আমি ‘আরওয়াহে ছালাছা’ ও ‘মাআরিফে মসনবী’ সম্পর্কে জানতে পারি। এমনিভাবে ‘কাশফুয যুনূন আন আসামিল কুতুবি ওয়াল ফুনূন’-এর নাম এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কেও প্রথম তাঁর কাছ থেকেই শুনি। এটি এমন এক কিতাব, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার মতো এবং বারবার পড়ার মতো।

কোনো কোনো উস্তাযের নির্দেশে দরসে নেযামীর বিভিন্ন বর্ষে (দাওরায়ে হাদীসের আগেই) আমি আলবাহরুর রায়েক, আলবিনায়া, আলইনায়া, ফাতহুল কাদীর, রদ্দুল মুহতার, ফয়যুল বারী, আলাতে জাদীদাহ, জাওয়াহিরুল ফিকহ, বাওয়াদিরুন নাওয়াদির, আহসানুল ফাতাওয়া ইত্যাদি কিতাবের বিভিন্ন অংশ মুতালাআ করেছি এবং সেগুলোতে কিছু বিষয় মুরাজাআত করারও সুযোগ পেয়েছি। এর ফলে উপলব্ধি হয়েছে যে, ইলমের রয়েছে অনেক গভীরতা, সূক্ষ্মতা ও ব্যাপকতা। সম্ভবত সেখান থেকেই তাহকীক ও অনুসন্ধানের প্রতি একধরনের আগ্রহ ও মহব্বত তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

দাওরায়ে হাদীসের বছর ‘মাআরিফুস সুনান’-এর সাথে পরিচয় হয় এবং এর মাধ্যমেই শায়েখ যাহেদ কাউসারী রাহ.-এর লেখার সঙ্গে পরিচিত হই। সে বছরই ‘উমদাতুল কারী’, ‘ফাতহুল বারী’, ‘ফযলুল বারী’ ও ‘ইরশাদুল কারী’-এর সাথে আমলী সম্পর্ক তৈরি হয়। ইমাম নববী রাহ.-এর ‘শরহে মুসলিম’, ‘ফাতহুল মুলহিম’, ‘তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম’, ‘বাযলুল মাজহুদ’-এর সাথেও আমলী সম্পর্ক তৈরি হয়।

বড় ভাইয়াজান তখন হযরত নুমানী রাহ.-এর কিতাব ‘ইমাম ইবনে মাজাহ আওর ইলমে হাদীস’ পড়তে বলেন। আল্লাহর মেহেরবানীতে এসব কিতাবের শুধু পৃষ্ঠা ওল্টানোর মাধ্যমেও ইলমের স্বাদ অনুভব হতে থাকে।

১৪০৮ হিজরীর শাওয়াল মাসে আমি হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রশীদ নুমানী রাহ.-এর খেদমতে হাজির হই। এটা ছিল আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়। হযরতের সান্নিধ্যের বিবরণ ও প্রভাব এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই কেবল একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেই সামনে অগ্রসর হচ্ছি।

আমার অনুভূতি হল, বিশিষ্ট কয়েকজন আকাবিরের রচনাবলি এমন, যা একজন তলিবুল ইলমের ইলমী ও আমলী সফরে সব সময়ই সাথে থাকা উচিত এবং থাকেও বটে। বিনয় ও সহীহ চিন্তাধারা নিয়ে এগুলো মুতালাআ করলে আশা করা যায়— ইলমী পরিপক্বতা, গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা, দরদি দিল, পূর্বসূরিদের প্রতি আস্থা, আকাবির-আসলাফের প্রতি ভক্তি ও মহব্বত, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ভারসাম্যপূর্ণ মতাদর্শের ওপর অবিচলতা, ইলমের আদব ও বিনয়— এসব গুণ অর্জিত হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

সেই মনীষীদের মধ্যে রয়েছেন—

১. হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. (১৩৬২ হি.)

২. শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রাহ. (১৩৭৭ হি.)

৩. শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রাহ. (১৩৬৯ হি.)

৪. আল্লামা যাহেদ কাউসারী রাহ. (১৩৭১ হি.)

৫. মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. (১৩৯৬ হি.)

৬. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানূরী রাহ. (১৩৯৭ হি.)

৭. হযরাতুল উস্তায হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর আহমাদ নুমানী রাহ. (১৪১৬ হি.)

৮. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রশীদ নুমানী রাহ. (১৪২০ হি.)

৯. হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রাহ. (১৪২০ হি.)

১০. ফযীলাতু শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. (১৪১৭ হি.)

১১. হযরত মাওলানা সরফরাজ খান সফদর রাহ. (১৯ জুমাদাল উলা ১৪৩০ হি.)

১২. শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা (হাফিযাহুল্লাহ)

১৩. মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ লুধিয়ানভী রাহ. (১৮ মে ২০০০ ঈ.)

১৪. আল্লামা খালেদ মাহমুদ রাহ. (২০ রমযান ১৪৪১ হি.)

১৫. শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম

অন্যান্য আকাবির ও মাশায়েখের নির্বাচিত কিতাবগুলোও মুতালাআর তালিকায় থাকবে। সেগুলোর উপকারিতা ও গুরুত্ব নির্দ্বিধায় স্বীকৃত। তবে এখানে নির্দিষ্ট কিছু দিক ও বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য যে-কোনো মুসান্নিফের দলীলবিহীন মতামত, অসচেতনতা ও ভুল-বিচ্যুতি সর্বক্ষেত্রেই আলাদা হিসেবে বিবেচিত হবে।

কোন্ বিষয়ের নির্ভরযোগ্য কিতাব কোন্গুলো, কোন্ বিষয়ে প্রাজ্ঞতা ও পরিপক্বতা অর্জনে কোন্ কিতাবগুলো বেশি সহায়ক, কোন্ বিষয়ে কোন্ কিতাবগুলো শ্রেষ্ঠ— এসব দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। এখানে সেই আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে উল্লিখিত আকাবির-আসলাফের রচনাবলি থেকে সরাসরি বা ইশারায় এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া যায়।

প্রশ্ন : কোনো কিতাব পাঠ করার সময় কোন্ কোন্ বিষয় আপনি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনায় রাখেন? তাছাড়া কোনো কিতাব পছন্দ বা অপছন্দ হওয়ার পেছনে কী কী কারণ থাকে?

উত্তর : কোনো কিতাবে বিশেষ কোনো কথা থাকলে সেটি বিশেষভাবে বিবেচনায় আসে। কোনো লেখক যদি কোনো ‘খলা’ বা শূন্যতা পূরণ করেন অথবা কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরিয়ে দেন, যদি উসূলের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেন কিংবা কোনো জটিল সমস্যার সমাধান পেশ করেন অথবা সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন; এমনিভাবে যদি কিতাবটিতে উপকারী, শিক্ষণীয় কোনো ঘটনা বা গভীর মর্মসমৃদ্ধ কোনো কবিতা পাওয়া যায়, সেগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা হয়।

পছন্দের মানদণ্ড হল— কিতাবটিতে কোনো না কোনো বিশেষত্ব বা স্বাতন্ত্র্য থাকা।

অপছন্দের মানদণ্ড হল— তাতে কোনো বিশেষত্ব বা স্বাতন্ত্র্য না থাকা।

আর যদি তাতে মুনকার বক্তব্য, মুনকার বর্ণনা, মুনকার উপস্থাপন, তাখলীত ও সাতহিয়্যাত থাকে, তাহলে তো খুবই অস্বস্তি বোধ হয়।

প্রশ্ন : মুতালাআর জন্য কিতাব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? একজন শিক্ষার্থী কি শুধু তার নিজস্ব নির্ধারিত বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্য বিষয়েও তার পড়া উচিত?

আপনি কি মনে করেন, সাহিত্য ও জাগতিক বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বীনী বিষয়েও মুতালাআ করা জরুরি? এমনিভাবে, দ্বীনী বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সাহিত্য ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়ন জরুরি?

উত্তর যদি হাঁ-বাচক হয়, তাহলে কোন্ দিকগুলো বিবেচনায় রাখা উচিত এবং কোন্ কোন্ কিতাবের প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত? অনুগ্রহ করে এ বিষয়ে মৌলিক কিছু দিকনির্দেশনা দেবেন।

উত্তর : আমার মতে, একজন শিক্ষার্থীর পাঠ্যসাধনা তার বড়দের তত্ত্বাবধানে হওয়া জরুরি। যখন তার মধ্যে ‘মালাকায়ে তাময়ীয’ (ভালো-মন্দ ও প্রাসঙ্গিকতা বিচার করার যোগ্যতা) অর্জিত হয়ে যাবে, তখন সে বিভিন্ন বিষয় ও কিতাব নিজের মতো করে নির্বাচন করতে পারবে। এর আগে তাকে অবশ্যই বড়দের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে এবং তাঁদের দিকনির্দেশনা ও নসীহতকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

যেহেতু এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে, তাই বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না।

তবে এতটুকু স্পষ্ট করে বলি, ‘ফরযে আইন’ পরিমাণ ইলম অর্জন করা, তা হজম করা, সে অনুযায়ী ইলমী ও আমলী দৃঢ়তা অর্জন করা, সেইসাথে নিজের ঈমানের হেফাযতের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন তা সবকিছুর চেয়ে অগ্রগণ্য।

এই দিকটি অপূর্ণ রেখে ‘আল্লামা’ হওয়া কিংবা ‘উপকারী ব্যক্তি’ হওয়ার আশায় মুতালাআ করার উদ্যোগ— এককথায় অর্থহীন।

প্রশ্ন : একজন মানুষের জীবন গঠনে কোন্ বিষয়টি অধিক কার্যকর? মনীষী-সাহচর্য, না কিতাবপত্র? সহজ ভাষায়, একজন মানুষ গ্রহণযোগ্য হিসেবে গড়ে উঠতে কিতাবের অবদান বেশি, নাকি গুণী ব্যক্তিদের সান্নিধ্যের প্রভাব বেশি?

উত্তর : নিঃসন্দেহে মনীষী-সান্নিধ্যই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাবক। তাঁদের সাহচর্যেই মানুষের সঠিক বোধশক্তি, বিশুদ্ধ চিন্তাধারা ও সুন্দর চরিত্র অর্জিত হয়।

মন-মানস ও চিন্তা-চেতনা ঠিক হয়ে যাওয়ার পর আসবে কিতাব থেকে উপকৃত হওয়ার বিষয়।

প্রশ্ন : মানুষের মাঝে প্রভাব সৃষ্টিকারী গুণাবলি কি প্রধানত ইলম-নির্ভর, নাকি আমল-নির্ভর?

অর্থাৎ গভীর জ্ঞান মানুষকে বেশি প্রভাবিত করে, না দীর্ঘস্থায়ী আমল? নাকি ইলম ও আমল এক্ষেত্রে একটি অপরটির পরিপূরক? অর্থাৎ একটি ছাড়া অপরটির অস্তিত্ব অপূর্ণাঙ্গ, কিংবা অস্তিত্বহীন?

উত্তর : ইলম ও আমল একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তবে একথা ঠিক যে, কেউ আমল দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়, কেউ ইলম দ্বারা। নেককারদের সাহচর্য বিষয়ে হাদীস শরীফে এসেছে—

مَنْ ذَكَّرَكُمْ بِاللهِ رُؤْيَتُهُ، وَزَادَ فِي عِلْمِكُمْ مَنْطِقُهُ، وَذَكَّرَكُمْ بِالْآخِرَةِ عَمَلُهُ.

যাঁকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যাঁর কথা জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং যাঁর আমল আখেরাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। —মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদ, হাদীস ৬৩১; যিয়া মাকদিসী, আলআহাদীসুল মুখতারাহ ১১/২১৭ 

আমলের মধ্যে— ইবাদত-শ্রেণির সকল আমলসহ লেনদেনে স্বচ্ছতা, উত্তম আদাব ও উত্তম চরিত্র বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত। সেইসাথে রয়েছে— ইলমের গভীরতা, পরিপক্বতা ও প্রাজ্ঞতা এবং উন্নত চিন্তাধারা।

প্রশ্ন : আপনি আপনার জীবনে কোন্ মনীষীদের ইলমী ও আমলী প্রভাব বিশেষভাবে গ্রহণ করেছেন? সেই প্রভাব আপনার জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে?

উত্তর : নিকট অতীতের এবং সমকালীন মনীষীদের মধ্যে উল্লিখিত পনেরোজন ছাড়াও যাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, তন্মধ্যে রয়েছেন— মুফতী হাবীবুর রহমান আযমী রাহ., মাওলানা সামীউল হক রাহ., মাওলানা আমীন সফদর রাহ. এবং মাওলানা যাহেদ আররাশেদী দা. বা.।

দূর অতীতের মনীষীদের তালিকা তো অনেক দীর্ঘ। তাছাড়া কার থেকে কোন্ প্রভাব কীভাবে পড়েছে— তা তো বিশদ আলোচনার বিষয়। তাই পরবর্তী কোনো অবসরে তা আলোচনা করা যেতে পারে।

প্রশ্ন : কিতাবপত্র কি কেবল মানসিক উৎকর্ষ ও চিন্তাগত শক্তি জোগায়, নাকি আমলী দৃঢ়তারও মাধ্যম হয় এবং কখনও জীবন্ত ব্যক্তিত্বেরও উত্তম বিকল্প হতে পারে?

উত্তর : নিঃসন্দেহে কিছু কিতাব এমন আছে, যেগুলোকে গভীরতা ও ব্যাপকতার কারণে জীবন্ত ব্যক্তিত্বের বিকল্প হিসেবে ধরা যেতে পারে।

তবে সেটা ওই সময় হবে, যখন মুতালাআকারী কোনো খাস ব্যক্তির সাহচর্যে থেকে মুতালাআ করবে। পাশাপাশি পর্যালোচনার যোগ্যতা, অর্ন্তদৃষ্টি ও দূরদৃষ্টি হাসিল করে নেবে।

একথা সত্য যে, আল্লাহর অনুগ্রহে কোনো কোনো পুস্তিকা, প্রবন্ধ, কবিতা বা জ্ঞানগর্ভ কোনো কথা কারও কারও ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। আর সেই পথপ্রদর্শন তাকে কোনো নেককার ও সংস্কারক ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

প্রশ্ন : আপনি কি মুতালাআর সময় কিতাবের ওপর কোনো ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করেন? মুতালাআধীন কিতাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা কোনো তথ্য কি আপনি আপনার নোটবুক বা ডায়েরিতে সংরক্ষণ করেন, নাকি কেবল স্মৃতিতে রেখে সময়মতো ব্যবহার করেন?

উত্তর : যখন মুতালাআর আদব সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলাম, তখন কিতাবে দাগ দিতাম। তবে এটা করা উচিত নয়। অন্যের কিতাব বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কিতাব হলে তো এমন কিছু করা জায়েযই নয়। হাঁ, নোটখাতায় প্রয়োজনীয় ও উপকারী অংশগুলো সংরক্ষণ করা উচিত। আলহামদু লিল্লাহ, এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার তাওফীক হয়। তবে শিক্ষাজীবনের শুরুর দিকে এ বিষয়ে সচেতন ছিলাম না।

প্রশ্ন : আপনি কি ব্যক্তিগত মুতালাআর জন্য কোনো মাকতাবা থেকে কিংবা সাথি-বন্ধুদের থেকে কিতাব ধার নেন, নাকি আপনার নিজস্ব মাকতাবা আছে? থাকলে তার পরিসর কেমন? তাতে কোন্ ধরনের কিতাবাদি বেশি? কোনো বিশেষ কিতাব সংগ্রহ করতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া বা কোনো বিশেষ ঘটনা থাকলে বলুন।

উত্তর : আমার ব্যক্তিগত মাকতাবা খুবই ছোট ছিল; যা আমাদের প্রতিষ্ঠানের সাথিরা প্রতিষ্ঠানের মাকতাবার অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

এখন আমার ছেলেদের মাকতাবা —মাশাআল্লাহ— তাদের বাবার মাকতাবার চেয়ে বড়। তবে সেটাও তুলনামূলক সীমিত। সেজন্য তারও কোনো পরিসর উল্লেখ করার মতো নয়।

তাছাড়া আমি আলহামদু লিল্লাহ প্রতিষ্ঠানের মাকতাবারই এক প্রান্তে বসি। তাই আলাদা করে কিতাব ধার নেওয়ার প্রয়োজন কম হয়। অবশ্য প্রয়োজন হলে কোনো কিতাব কোথাও থেকে ধার নিতে হয়। সেক্ষেত্রে কিতাব হেফাযত করা ও যথাসময়ে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকি।

কিতাব সংগ্রহের ক্ষেত্রে কিছু ঘটনা-অভিজ্ঞতা অবশ্যই আছে, তবে তা অন্য কোনো অবসরে আলোচনা করা যাবে ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন : কিতাব মুতালাআর সময় অপছন্দের বা অসন্তোষজনক কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন? কখনও কি মুতালাআর নেতিবাচক কোনো প্রভাব অনুভব করেছেন? কোনো বিষয় বা নির্দিষ্ট কোনো ধরনের কিতাব পড়তে কি আপনি মানসিক অস্বস্তি বোধ করেন?

উত্তর : এই প্রশ্নের উত্তর অনেক দীর্ঘ হবে। 

তবে মনে হয়, মুতাআলার নেতিবাচক প্রভাব থেকে আল্লাহ তাআলা আমাকে হেফাযত করেছেন।

والله أعلم بالصواب، ومنه أستمد السداد والصواب.

আমার মুতাআলার পরিধি অত্যন্ত সীমিত। তাই প্রশ্নের তৃতীয় অংশ থেকে আমাকে ক্ষমা করবেন।

প্রশ্ন : কিতাব ধার দেওয়া ও নেওয়া বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি কী? অনেকে বলেন, “কিতাব ধার দেওয়া বোকামি, ধার নিয়ে ফেরত দেওয়া ‘অন্যায়’(?)।” এ বিষয়ে আপনার কোনো তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতা আছে?

উত্তর : ‘ইলম নিজেই ইলমের অধিকারী ব্যক্তিকে এই শিক্ষা দেয় যে, সে যেন অন্যকে ইলম বিতরণে কৃপণতা না করে’। ব্যস্, এটাই আমার চিন্তা।

এই প্রশ্নের অবশিষ্ট অংশ —মাফ করবেন— আমার পছন্দ হয়নি।

প্রশ্ন : গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রবন্ধ বা আলোচনার জন্য আপনি যখন প্রস্তুতি নেন, তখন কি পুরোনো মুতালাআ দিয়ে কাজ চালিয়ে নেন, নাকি নতুন করে মুতালাআ করেন? নাকি আগের মুতালাআ থেকে গ্রহণকৃত নোট থেকে সাহায্য নেন?

উত্তর : শুধু পুরোনো মুতালাআর ওপর ভিত্তি করে কিছু লেখা, বলা বা পড়ানো আমি ঠিক মনে করি না। নতুন করে মুতালাআ করে নেওয়া জরুরি।

এটা অনেক বড় দুর্বলতা যে, কেউ কোনো বিষয়ে লিখবে এবং এমন স্তর পর্যন্ত এসে থেমে যাবে, যেখান থেকে আরও সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

কখনও এমন হয়, পরবর্তী যামানার লেখকের চেয়ে পূর্বের কোনো লেখক এগিয়ে থাকে। অথচ পরের যামানার লেখকের এ বিষয়টি জানাও থাকে না।

রচনা ও আলোচনার জন্য মুতালাআর নবায়ন ও বিস্তৃতি খুব জরুরি। সেইসাথে এটাও জরুরি যে, মুতালাআ হবে বিশ্লেষণমূলক ও গভীর। মুতালাআ অসম্পূর্ণ হবে না এবং ভাসাভাসাও হবে না। এমনিভাবে তুলনামূলক মুতালাআও জরুরি। অর্থাৎ কেবল একপাক্ষিক মুতালাআ হবে না। কেননা মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে একপাক্ষিক মুতালাআ অন্যায় পক্ষপাত অথবা বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ির দিকে নিয়ে যায়।

নোটকৃত উদ্ধৃতির ওপরও নির্ভর করা উচিত নয়। কারণ সাধারণ মুতালাআর সময় নেওয়া তাৎক্ষণিক নোটে আলোচ্য বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে উঠে আসে না।

প্রশ্ন : ইলম ও উম্মাহ উভয় বিবেচনায় মুসলমানদের ইতিহাসে সোনালী যুগ ছিল ‘খাইরুল কুরূন’ (ইসলামের শুরুর তিনযুগ)। ঐ সময়ও কিতাবাদি ছিল; তবে খুব কম। সিনা থেকে সিনা ইলম বিতরণ হত। তাওয়াতুরে আমালী বা দ্বীনী উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আমলের পরম্পরা এবং ইলমী হালাকা বা দরসগাহ ছিল সেইসব যুগের বৈশিষ্ট্য।

খাইরুল কুরূনের পর মুসলমানদের মাঝে কিতাবাদি রচনা ও সংকলন এবং জীবনচরিত সংরক্ষণের যুগ শুরু হয়। বলা যায়, এটা ছিল কিতাবী যুগের সূচনাকাল। সেসময় মৌখিক ও সিনা থেকে সিনা ইলম হাসিল এবং আমলী তাওয়াতুরের জায়গায় অনেকটা দখল বিস্তার করেছে কিতাবপুস্তক। বিভিন্ন বিষয়ের ইলম ও বিভিন্ন বিভাগ ও শাখায় বিশেষজ্ঞতা অর্জনের সূচনা হয়েছে। আপনি এই দুই যুগের মুতালাআ ও ইলমচর্চার পার্থক্যকে কীভাবে দেখেন? এক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা প্রসঙ্গে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?

উত্তর : উভয় যুগেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু আপনার একথা ঠিক নয় যে, খাইরুল কুরূনে কিতাবের সংখ্যা কম ছিল। কিতাবাতে ইলম, তাদভীনে ইলম তাসনীফ-তালীফের ইতিহাস যথাযথভাবে এবং গভীরভাবে অধ্যয়ন না করার কারণে অনেকে এমন ধারণা করে থাকে।

যাইহোক, উভয় যুগই আমাদের পূর্বসূরি। আমরা উভয় যুগেরই ভালো দিকগুলোর মুখাপেক্ষী।

আল্লামা শাতিবী রাহ. বলেন—

إن العلم كان في صدور الرجال، ثم انتقل إلى الكتب، وصارت مفاتحه بأيدي الرجال.

সারকথা হল, আহলে দিল ও আহলে ফিকহ মনীষীদের থেকে অমুখাপেক্ষী হওয়া— কোনো যুগে কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়।

এই দুই যুগের মিরাস থেকে যথাযথভাবে উপকৃত হওয়ার জন্য উসূল ও আদাবের প্রতি লক্ষ রাখা জরুরি। সেইসব উসূল ও আদাব উল্লেখিত হয়েছে উসূলে ফিকহ, উসূলে হাদীস ও আদাব বিষয়ে রচিত কিতাবাদিতে।

প্রশ্ন : বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব যেসকল রাজনৈতিক, চিন্তানৈতিক এবং ইলমী ও অভ্যন্তরীণ সমস্যার সম্মুখীন, সেসব ক্ষেত্রে কোন্ কোন্ কিতাব সহায়ক ও সহযোগী হতে পারে?

যদি এসব বিষয়ে সমকালীন মেযাজ ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উপযোগী কিতাব না থাকে, তাহলে নতুন কিতাব রচনার সময় কোন্ কোন্ দিক বিবেচনায় রাখা উচিত?

উত্তর : এ ধরনের ‘মুজমাল’ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তো কঠিন। কোনো একটি বিষয় নির্দিষ্ট করে প্রশ্ন হলে ভালো হয়।

যাইহোক, সমকালীন বিষয়াদির জন্য হযরাতুল উস্তায শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম ও আল্লামা যাহেদ আররাশেদী দামাত বারাকাতুহুম-এর কিতাবাদি ও বয়ান সংকলন থেকে উপকৃত হওয়া বেশ উপযোগী হবে, ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন : বর্তমান যুগকে বিভিন্ন কারণে মুতালাআহীন ও কিতাববিমুখ যুগ বলা হয়। যন্ত্র ও ডিভাইস নির্ভর এই যুগে কোন্ ধরনের মাধ্যম ব্যবহার করে আমরা ব্যক্তিগতভাবে এবং সামাজিক পর্যায়ে কিতাবের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারি? পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে পারি?

উত্তর : এই প্রশ্নের উত্তর আগেও ইমাম মালেক রাহ.-এর উক্তিতে ছিল, আজও তাই; ভবিষ্যতেও এটাই থাকবে। সেই উক্তিটি হল—

لَن يَصْلُح آخِرُ هذِهِ الْأُمَّةِ إِلَّا بِمَا صَلَحَ بِه أَوَّلُهَا./ إِنَّ آخِرَ هذَا الأَمْرِ لا يَصْلُحُ إِلا بِمَا صَلَحَ أَوَّلُه.

অর্থাৎ এই উম্মতের পরবর্তী প্রজন্মের ইসলাহ ও সালাহ সেভাবেই অর্জন হবে, যেভাবে তা অর্জন করেছেন উম্মতের পূর্ববর্তীরা। —তারীখে তাবারী ৪/৪৪৭

এই মূলনীতি সময়োপযোগী পদ্ধতিতে গ্রহণ করতে হবে।

কিতাবের সঙ্গে সম্পর্কই তো মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হল, ইলম ও উলামা এবং ফিকহ ও ফুকাহায়ে কেরামের সাথে সম্পর্ক।

প্রশ্ন : অনুগ্রহ করে আপনার জীবনব্যাপী মুতালাআ ও পাঠমনস্কতালব্ধ অভিজ্ঞতা সংক্ষেপে উপস্থাপন করুন।

উত্তর : শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. থেকে শুনেছি, একবার শায়েখ আহমাদ যারকা রাহ.-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য এক বেদুঈন এসেছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার সময় কুতুবখানার দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলেন—

ما تقول هذه الكتب؟

শায়েখ! এই কিতাবগুলো কী বলছে?

শায়েখ উত্তরে বললেন, তুমি বলো।

বেদুঈন বললেন—

تقول هذه الكتب : كن رجلا صالحا.

এই কিতাবগুলো বলছে, তুমি একজন ভালো মানুষ হও।

এটাই আমার মুতালাআ ও পাঠমনস্কতার খোলাসা। তবে ‘ভালো’ বা ‘নেককার’ শব্দটি ব্যাপক অর্থে নেওয়া উচিত।

দ্বিতীয় খোলাসা হল—

ولا تقف ما ليس لك به علم.

যে বিষয়ে তোমার ইলম নেই, সে বিষয়ের পিছনে পড়ো না।

তৃতীয় খোলাসা হল—

من حسن إسلام المرء تركه ما لا يعنيه.

একজন মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হল— অনর্থক বিষয় পরিহার করা।

 

নোট :

মুতালাআ প্রসঙ্গে আমার সর্বশেষ কথা হল, মুতালাআ অনেক ধরনের হয়ে থাকে। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকারকে আমি দায়েমী মুতালাআ বা ওযীফার মুতালাআ নাম দিয়ে থাকি। এই মুতালাআর উদ্দেশ্য হল— ঈমান হেফাযত করা, দ্বীনী মেযাজ যিন্দা রাখা এবং ইলম তাজা রাখা। এই মুতালাআর রোকন পাঁচটি। পরিমাণ যত কমই হোক, প্রতিদিন এই মুতালাআ হওয়া উচিত। 

রোকন পাঁচটি হল—

১. কুরআন মাজীদ

সংক্ষিপ্ত ও নির্ভরযোগ্য কোনো অনুবাদ বা তাফসীরের সহায়তায় দৈনিক সরাসরি কুরআন সামনে নিয়ে মুতালাআ করা উচিত। দৈনন্দিনের তিলাওয়াত যদি তারতীল ও তাদাব্বুরের সাথে হয়, তাহলে আলাদাভাবে কুরআনের মুতালাআ না হলেও তেমন সমস্যা নেই। (অর্থাৎ তারতীল ও তাদাব্বুরের সাথে তিলাওয়াত করা হলে সেটাও কুরআন মুতালাআর প্রয়োজন অনেকটা পূরণ করে থাকে।)

২. হাদীস শরীফ

সুন্নাতে নববীর সাধারণ পাঠ। সেটা হতে পারে ‘আলআদাবুল মুফরাদ’, ‘রিয়াযুস সালিহীন’ ও ‘মাআরিফুল হাদীস’ জাতীয় কোনো কিতাবের মাধ্যমে।

৩. সীরাত ও শামায়েল

এটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর জন্য নির্বাচিত বর্ণনা ও সহজ উপস্থাপনসম্পন্ন কোনো কিতাব অধিক উপযুক্ত হবে। যেমন সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রাহ. ও সালিহ আহমাদ শামী হাফিযাহুল্লাহ-এর কিতাবসমূহ।

এ বিষয়ের মধ্যে সাহাবায়ে কেরামের জীবনীও অন্তর্ভুক্ত। কেননা তাঁদের জীবন মূলত নবীজীবনেরই প্রতিচ্ছবি। সেজন্য ‘উসদুল গাবাহ’-এর সাথে মাওলানা আবদুস সালাম নদভী রাহ.-কৃত ‘উসওয়ায়ে সাহাবা’-ও মুতালাআ করা উচিত।

এছাড়া হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ কান্ধলভী রাহ.-এর ‘হায়াতুস সাহাবাহ’ কিতাবটিও বেশ সুন্দর। তবে কিতাবটি থেকে যয়ীফ জিদ্দান ও মুনকার পর্যায়ের রেওয়ায়েতগুলো বাদ দিয়ে সংক্ষিপ্ত করা উচিত এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনের যে দিকগুলো সেখানে উল্লেখ হয়নি, সেগুলো যোগ করা উচিত।

৪. দ্বীন ও শরীয়তের প্রায় সকল অধ্যায় নিয়ে আলোচনা আছে, এমন কিতাবপত্র

যেমন, হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নুমানী রাহ.-এর কিতাব ‘ইসলাম কিয়া হ্যায়?’, ‘দ্বীন ও শরীআত’, ‘কুরআন আপ সে কিয়া ক্যাহতা হ্যায়?’

মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রাহ.-এর ‘দস্তূরে হায়াত’।

হযরত শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুমের ‘যিক্র ও ফিক্র’, ‘ইসলাহী মাজালিস’, ‘ইসলাম ও আমাদের জীবন’।

হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর বিভিন্ন কিতাব থেকে সংকলিত রচনা— ‘মাআরেফে হাকীমুল উম্মত’, ‘আশরাফুল জাওয়াব’, ‘বাসায়েরে হাকীমুল উম্মত’ এবং হযরতের রচনাবলির মধ্য থেকে ‘হায়াতুল মুসলিমীন’, ‘তালীমুদ্দীন’, ‘ইসলাহে ইনকিলাবে উম্মত’।

ড. আবদুল কারীম যাইদানের ‘আলমুফাসসাল ফী আহকামিল মারআতি ওয়াল বাইতিল মুসলিম’ এ ধরনের কোনো কিতাব। তবে আমি সেটি পুরো মুতালাআ করিনি। তাই কিতাবটির ইলমী অবস্থান সম্পর্কে আমার পুরোপুরি জানাশোনা নেই।

পূর্ববর্তীদের কিতাবাদির মধ্যে আবুল হাসান মাওয়ারদীকৃত ‘আদাবুদ দ্বীন ওয়াদ দুনিয়া’ এবং ‘আলমুহাযযাব মিন ইহইয়াই উলূমিদ্দীন’ পড়া উচিত। ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন তো হিজরী পঞ্চম শতকের কিতাব। তবে সেটি ‘আলমুহাযযাব’-এর মাধ্যমে মুতালাআ করলেই ভালো হবে আশা করি।

উলামায়ে কেরাম এ উদ্দেশ্যে উমদাতুল কারী, ফয়যুল কাদীর, ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন— এজাতীয় কিতাবাদি মুতালাআ করতে পারেন।

৫. আমাদের আকাবির বুযুর্গদের জীবনী, মালফূযাত (বাণী সংকলন), মাকাতীব (চিঠিপত্র), খুতুবাত (বয়ান সংকলন), মাজালিস (ঘরোয়া আলোচনা) ইত্যাদিরও সুবিশাল সংকলন রয়েছে, মাশাআল্লাহ। সেজন্য নির্বাচন করে মুতালাআ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এসবের মধ্যে যে বিষয়গুলো সর্বস্তরের ও সকলশ্রেণির মানুষের জন্য উপকারী, তন্মধ্যে হযরত শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম-এর বিভিন্ন পুস্তিকা, বয়ান সংকলন ও মজলিসী আলোচনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আহলে ইলমের বিশেষ শ্রেণি তো নিজেরাই উপযোগী কিতাব নির্বাচন করে নিতে পারবেন। সাধারণ শ্রেণি ও আম জনসাধারণ তাদের থেকে পরামর্শ নিয়ে মুতালাআ করবেন।

খুতুবাতে হাকীমুল উম্মত’ ও ‘মালফূযাতে হাকীমুল উম্মত’ থেকে আহলে ইলম মাশাআল্লাহ অনেক উপকৃত হচ্ছেন।

এই পাঁচ রুকনের মধ্যে মূল বিষয় তো হল কুরআন মাজীদ, হাদীস শরীফ এবং সীরাত ও শামায়েল। বাকি বিষয়দুটি এসবের ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক রূপ হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

অবশেষে আপনাকে শুকরিয়া জানাই। আপনি আমার মতো অনুপযুক্ত ব্যক্তির কাছেও এইসব প্রশ্ন পেশ করেছেন। এরপর অধমের সুদীর্ঘ বিলম্বকেও সহ্য করেছেন।

জাযাকুমুল্লাহু তাআলা খাইরান।

هذا، وصلى الله تعالى وبارك وسلم على سيدنا ومولانا محمد خاتم النبيين ورحمة للعالمين، وعلى آله وصحبه أجمعين.

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.

মুহাম্মাদ আবদুল মালেক -গুফিরালাহু-

মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা

০৯-০৪-১৪৪৩ হিজরী

১৫-১১-২০২১ ঈসায়ী

 

 

advertisement