Rabiul Awal 1448   ||   September 2026

বিতর্ক : যুক্তি ও প্রমাণ
স্রষ্টার অস্তিত্ব

জুলফিকার আহমাদ চীমা

[গত ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ভারতীয় লেখক জাভেদ আখতার ও একজন নওজোয়ান আলেমেদ্বীন মুফতী শামায়েল নদভীর সাথে স্রষ্টার অস্তিত্ব বিষয়ে একটি টেলিভিশন বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্পষ্টতই ওই মাওলানা সাহেব জাভেদ আখতারকে ধরাশায়ী করে ছাড়েন। বস্তুবাদী জগতের গুরুজনদের কাছে যা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার। জাভেদ আখতার এভাবে পরাস্ত হবেন, তা তারা চিন্তাও করতে পারেনি। তাই তাদের অনেকেই এ ঘটনাটি যত তাড়াতাড়ি দৃশ্যপট থেকে সরে যায়, সে অপেক্ষায় থেকেছেন। কিন্তু মুসলিম দুনিয়ায় এমন কিছু লোকজনও আছেন, যারা নিজেদেরকে অনেক শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক ভেবে থাকেন। আবার অল্পসল্প ধর্মকর্মও করে থাকেন।

অন্যদিকে আলেম-উলামা ও ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের ঘৃণা লুকাতে পারেন না। এরা বর্তমানে লিবারেল শ্রেণি বলে পরিচিত। জাভেদ আখতার ও মুফতী শামায়েল বিতর্কের পর এদের অনেকের গা-জ্বলাটাই বেশি দেখা গেল। একজন আলেমের কাছে একজন বুদ্ধিজীবী কেন হেরে যাবে—এটা তাদের গায়ে সয় না।

যদিও মূল বিষয়ে তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেনি। কারণ নিজেকে তো তারা নাস্তিক হিসেবে পরিচয় দেন না। তাই ওই শ্রেণির লোকেরা বলাবলি ও লেখালেখি শুরু করলেন, আসলে জাভেদ সাহেব সেদিন বিতর্কের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে যাননি। তিনি শামায়েলের ওই কথার এভাবে জবাব দিতে পারতেন। এমন এমন প্রশ্ন করে শামায়েলকে আটকে দিতে পারতেন। এভাবে বিভিন্ন দেশে লিবারেল শ্রেণির লোকেরা নিজেদের মুখ ঢাকার চেষ্টা করে থাকেন। তাদেরই জবাবে এক্সপ্রেস নিউজ পত্রিকার খ্যাতিমান কলামিস্ট জুলফিকার আহমাদ চীমা কয়েকটি কলাম লেখেন। আলকাউসারের পাঠকদের জন্য সেগুলো কিস্তি আকারে পেশ করা হচ্ছে।

অনুবাদ করেছেন— মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ফাহাদ]

 

অতি সচ্চরিত্রবান ও সত্যবাদী মানুষটি দীর্ঘ চল্লিশ বছর মক্কায় নিজের ছোট্ট বসতিতে সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করেছেন এবং সাধারণ কথাবার্তাই বলেছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন তিনি বসতির লোকদেরকে এ কথা বলে হকচকিয়ে দিলেন যে, আসমান ও জমিন এক মহান সত্তা সৃষ্টি করেছেন। তিনিই গোটা সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক।

মানুষ সৃষ্টি করেই তিনি ক্ষান্ত হননি; প্রত্যেকের প্রতিটি কথা ও কাজেরও তিনি খবর রাখেন। দুনিয়াকে মানুষের পরীক্ষার জন্য সৃষ্টি করেছেন। দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার পর তিনি তাঁর দরবার বসাবেন। সে দিনটি হবে হিসাব-নিকাশের দিন। যেদিন প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের পুরস্কার কিংবা শাস্তির ফয়সালা শোনানো হবে।

বস্তুত আমার মতো যে-কোনো বিবেকবান মানুষ এমন কথা বলা ব্যক্তির প্রতি অবশ্যই আকৃষ্ট হবে। বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসের আগে একটিবার হলেও সে ভাববে, যে মানুষ চল্লিশ বছরে একটিবারও মিথ্যা বলেননি, তিনি এখন মিথ্যা বললে তার এত বড় মিথ্যা বলার প্রয়োজন কেন হল? আর তার উদ্দেশ্যই-বা কী? তাছাড়া অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের দাবিতে শুধু অটলই থাকেননি; অন্যদেরও তার পক্ষে আনার চেষ্টা করছেন। যা হিংস্র বাঘের মুখের ভেতর হাত দেওয়ার শামিল। অথচ তিনি তা-ই করলেন। আবার তাঁর ওপর জুলুম-নির্যাতনের পাহাড় চাপানো হলেও নিজ দাবির ওপরই অনড় থাকলেন।

তাকে এসব কথা বলা থেকে বিরত থাকতে বলা হল। প্রস্তাব দেওয়া হল, যদি সে এসব কথার প্রচার না করে, তাঁকে নেতৃত্ব দেওয়া হবে, সবচেয়ে সুন্দরী নারী তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে।

উভয়টিই ছিল তৎকালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও লোভনীয় প্রস্তাব। কিন্তু তিনি সেসকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। আর তাঁর দৃঢ়তায় সামান্য চিড়ও দেখা যায়নি। সব কষ্ট সহ্য করেও তিনি তাঁর অবস্থানে অবিচল থাকলেন।

স্বভাবতই একজন সচেতন মানুষ ভাববেন, তাহলে তাঁর স্বার্থ (Motive) কী? আমি আইনের ছাত্র। আইনশাস্ত্রে কোনো কিছু প্রমাণ করার জন্য আচরণ (Conduct) ও উদ্দেশ্য (Motive) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দুনিয়াবি কোনো স্বার্থই যদি তাঁর উদ্দেশ্য হত, তাহলে এত বড় আকর্ষণীয় প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করে নিতেন। কিন্তু সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি শুধু নিজেই বিপদের সম্মুখীন হননি; তাঁর অনুসারীগণও সীমাহীন বিপদ-মসিবতের মুখোমুখি হয়েছেন। তারপরও তিনি এমনটা কেন করলেন!

 এখন বিবেচ্য হল, এ দাবির মাধ্যমে তিনি কোন্ সুবিধা কিংবা মর্যাদা কামনা করছেন। কারও হয়তো মনে হতে পারে, তিনি নিজেকে খোদার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কথাবার্তায় তো নিজেকে শুধু একজন বার্তাবাহক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সৃষ্টিজগতের রহস্য কিংবা কিয়ামত দিবসের জ্ঞান অথবা কর্তৃত্বের দাবিও করেননি। সব প্রশ্নের তাঁর একটাই উত্তর— সবকিছুর খবর ও জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। আমি শুধু তাঁর বার্তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিই।

এখন এ ভাবনাই আসবে, একজন অতি সত্যবাদী মানুষ পার্থিব কোনো স্বার্থ ছাড়াই এত কষ্ট বরণ করে নিচ্ছেন। অথচ সামান্য আপসও করতে নারাজ। এমনটি কেন? এটা তখনই সম্ভব, যখন নিজের পয়গামের সত্যতার প্রতি তার শত-সহস্র গুণ বিশ্বাস থাকে।

অতি সত্যবাদী ও নির্লিপ্ত এ মানুষটি যে পয়গাম শুনিয়েছে, তা-ও তো খুব বিস্ময়কর ও অতি অসাধারণ। আর ঐশী হুকূমতে পয়গম্বর নিজের কোনো কর্তৃত্বের দাবি করছে না দেখে বিরোধীরাও হতবাক। বসতির বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত লোকেরা পরস্পর বলতে লাগল, এই লোকটি যে উচ্চাঙ্গের কথাবার্তা বলছে, তা শুধু তিনি কেন, মক্কার সকল শিক্ষিত ও পণ্ডিতের জ্ঞানেরও বহু ঊর্ধ্বের।

তিনি তো মানবসৃষ্টির বিভিন্ন স্তরের কথা বলেন। ন্যায় ও মানুষের মাঝে সমতার কথা বলেন। নারী ও এতীমদের অধিকারের কথা বলেন। আর উত্তরাধিকার আইনের যে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তিনি তুলে ধরেছেন, এত জটিল ও ন্যায়ানুগ একটি আইন আরবের সব যোগ্য ব্যক্তি মিলেও প্রণয়ন করতে পারবে না।

ফলে ভেতরে ভেতরে সবাই তাঁর দাবি মেনে নিতে প্রস্তুত হচ্ছে আর তাদের শিরকী ও নাস্তিক্যবাদী বিশ্বাসও টলতে শুরু করেছে। নতুন কোনো ওহী আসামাত্রই অবিশ্বাসীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের নাস্তিক্যবাদী ধ্যান-ধারণায় ফাটল ধরতে শুরু করে। এজন্য গোটা আরবের সকল ভাষাবিদ ও কবি-সাহিত্যিককে একত্র হয়ে তার কথার অনুরূপ কিছু পেশ করতে বলা হল। একদিকে যখন এই পরিকল্পনা চলছে, অন্যদিকে তখন ওহী অবতীর্ণ হল— এ ধরনের একটি সূরা-ই তোমরা রচনা করে দেখাও। সবাই মিলে এর মতো একটি আয়াতই বানিয়ে দেখাও।

বড় বড় সাহিত্যিক ও বাগ্মীরাও এ চ্যালেঞ্জ শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার হিম্মতও কেউ করল না।

এছাড়া কয়েকজন বয়োবৃদ্ধ থেকেও জানা গেল যে, এই পয়গাম প্রথমবারের মতো মানুষকে শোনানো হয়নি; বরং হাজার বছর আগে তাঁর মতোই সত্যবাদী এক মহান ব্যক্তি ইবরাহীম আলাইহিস সালামও তাঁর কওমকে হুবহু এই পয়গাম শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আসমান ও জমিন শুধু আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন। সকল মানুষকে একদিন তাঁর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেদিন সকলের আমল অনুপাতে পুরস্কার কিংবা শাস্তির সিদ্ধান্ত হবে।

এরও বহু বহু বছর পর আরেক অতি সাধারণ মানুষ হুবহু একই পয়গাম তৎকালের মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছিলেন। তাঁর নাম মূসা। এরও বহু বছর পর আরেকজন মহান ব্যক্তি ঈসা ইবনে মারইয়ামও মানুষের কাছে একই পয়গাম পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর মূল বিষয়ও একই ছিল। এর অর্থ হল, প্রতিবার শুধু পয়গম্বরই বদল হয়েছেন। পয়গামের উৎস একই। অর্থাৎ পয়গাম প্রেরণকারী ও তাঁর পয়গাম একই।

মক্কায় যে পয়গাম শোনানো হয়েছে, তাতেও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এটি কোনো নতুন পয়গাম নয়। পূর্ববর্তী পয়গম্বরদের মাধ্যমেও আমি এ পয়গাম পাঠিয়েছি। তাঁর কথা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এতসব দলীল-প্রমাণ ও বাস্তবতা (Circumstantial evidence) সবকিছুই পয়গম্বরকে আরও সুদৃঢ় করে তুলেছে। আর সব রকমের চেষ্টা করেও বিরুদ্ধবাদীরা পয়গম্বরের কোনো ত্রুটি খুঁজে বের করতে পারেনি এবং তার পয়গামেও কোনো অসংগতি পায়নি। বর্তমান বাস্তবতা ও দলীল-প্রমাণের বিশ্লেষণ করা হলে অর্থাৎ সর্বপ্রথম পয়গম্বরের কর্মপন্থা/জীবনাচার (Previous conduct) যাচাই করলে গোটা আরবে তাঁর মতো সত্যবাদী ও সচ্চরিত্রবান মানুষ আর একটিও পাওয়া যাবে না। আর লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের (Motive) দিকে তাকালে বিরুদ্ধবাদীরা তো তার কোনো পার্থিব স্বার্থও খুঁজে পায়নি। 

সমগ্র আরবের সাম্রাজ্য লাভের পরও তাঁর জীবনাচার ছিল অতি সাদাসিধা। বেশির ভাগ সময় তাঁর হাঁড়িতে রান্নার মতো তরকারিও ছিল না। অন্যদিকে তার শোনানো পয়গামও নতুন নয়; বরং শত-সহস্র বছর আগে থেকে মহান ও সত্যবাদী লোকেরা মানুষদেরকে যে পয়গাম শুনিয়ে এসেছিলেন, এটা তারই ধারাবাহিকতামাত্র। এখন বুদ্ধি-বিবেকও স্বীকার করতে শুরু করেছে যে, তার দাবিটি খুবই মজবুত। কিন্তু অবিশ্বাসী মহল এখনও নিশ্চুপ কিংবা ভ্রান্তির শিকার।

তাদেরকে শুধু জিজ্ঞাসা করুন, মানবদেহের একটি অঙ্গ হৃৎপিণ্ড সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলুন তো— এটি কি নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে আর তার সকল কার্যক্রম (Functions) স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চালু হয়ে গিয়েছে? বিজ্ঞানী কিংবা মানবদেহ সম্পর্কে গবেষণাকারীর কেউই এ কথা বলবে না যে, এই হৃৎপিণ্ড স্বয়ংক্রিভাবেই তার কার্যক্রম শুরু করেছে। তারা এখন স্বীকার করে যে, এর পেছনে কারও চিন্তা ও পরিকল্পনা জড়িত আছে। তবে কার পরিকল্পনা? এর কোনো উত্তর তাদের কাছে নেই।

অপরদিকে সবকিছুরই সুস্পষ্ট জবাব রয়েছে। তা হল, শুধু মানুষই নয়; গোটা সৃষ্টিজগৎকে এক মহান সত্তা সৃষ্টি করেছেন। পাশাপাশি সেই মহান সত্তার পূর্ণ পরিচয় ও মানবসৃষ্টির পেছনে তাঁর উদ্দেশ্যও সুস্পষ্ট বিবৃত হয়েছে।

এত কিছুর পর এখন অবিশ্বাসীদের কাছে না মানার পক্ষে শুধু একটি দলীলই থেকে যায়। তারা বলবে, আচ্ছা। মেনে নিলাম, পয়গম্বর কখনও মিথ্যা বলেননি। তাঁর কোনো পার্থিব স্বার্থও নেই। এ দায়িত্ব পালনের জন্য পূর্ণ সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন ছেড়ে তিনি জুলুম-নির্যাতনকেই বরণ করে নিয়েছেন এবং নিজের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছেন। তাছাড়া তাঁর পয়গামও কোনো মানুষের নয়; আসমানী পয়গাম। হাজার হাজার বছর ধরে এর সত্যায়নও হয়ে আসছে। তবে আমরা আল্লাহ কিংবা সৃষ্টিকর্তাকে তখনই বিশ্বাস করব, যখন তাকে নিজ চোখে দেখব।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী এসব অবিশ্বাসীদের বলেছেন, কিছু বিষয় শুধু প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নয়; বরং বাস্তবতার (Circumstantial evidence) আলোকে মেনে নিতে হয়। যেমনপিতার নাম লেখার ঘরে আপনি যে নামটি লেখেন, তা তো ‘নিজ চোখে দেখা’ কিংবা ডিএনএ টেস্ট করা ছাড়া শুধু মা-বাবার কথা বিশ্বাস করেই লিখে থাকেন; তাহলে দুনিয়ার সকল পিতামাতার চেয়ে বেশি সত্যবাদী ও সুমহান চরিত্রের অধিকারী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা কেন বিশ্বাস করব না? উপরন্তু তাঁর সমর্থনে অনেক প্রাসঙ্গিক দলীল-প্রমাণও (Corroborative evidence) বিদ্যমান!

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

advertisement