১৯৪৭ সালের দেশবিভক্তি নিয়ে হামেদ মীরের দুটি কলাম
হামেদ মীর
১৯৪৭ সালে ইংরেজরা এই অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার পর ভারত-বিভক্তি নিয়ে ব্যাপক মতভেদ ছিল। অখণ্ড ভারত এবং দ্বিজাতি-তত্ত্ব বা মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি— এই দুই মতের পক্ষেই বহুজন ছিলেন। ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যেও দ্বিধা-বিভক্তি ছিল। তৎকালীন উলামায়ে কেরামের মধ্যেও একাধিক মত ছিল। তার পরও ভারত বিভক্ত হয়েছে। এ অঞ্চলে দুটি রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে— পাকিস্তান ও ভারত। ১৯৭১ সালে আবার পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান নয় মাসের যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
যতই দিন যাচ্ছে, যতই ঢেকে পড়া ইতিহাস সামনে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, আসলে আমাদের এই অঞ্চলের অনেক নেতা এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ অনেকেই কেন মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি চেয়েছিলেন। বর্তমানে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের সময় তা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ভারতের জঙ্গি ভাবাপন্ন হিন্দুরা সে দেশের সংখ্যালঘুদের ওপরে, বিশেষ করে মুসলমানদের ওপরে যে নির্যাতন-গুম-হত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু কাশ্মীরে তারা যে জুলুমের ধারা যুগ যুগ ধরে চালু রেখেছে, তা দেখে এখন বহু লোকেই বলছেন, দ্বিজাতি-তত্ত্বই আসলে ঠিক ছিল। পুরো পাকিস্তান ভারতের সাথে থাকলে মুসলিমরা সংখ্যালঘুই থাকত। হিন্দুদেরই জয়-জয়কার হত। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোতেও হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদেরকে হয়তো শাসন করতে দিত না। তারা তাদের দোসরদেরকে দিয়ে সেটা চালাত এবং জুলুম করে যেত, যেমনটা তারা করে যাচ্ছে জম্মু কাশ্মীরে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট হামেদ মীর পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে এ সংক্রান্ত দুটি কলাম লিখেছেন। আলকাউসারের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন— ওয়ালিউল্লাহ আবদুল জলীল
মাতাজির পাকিস্তান
কয়েক বছর আগের কথা। ইমরান খান তখন প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানী গণমাধ্যমে এই অধমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামীদের কৃপায় আমাকে শুধু টিভি পর্দা থেকেই গায়েব করে দেওয়া হয়নি; প্রিন্ট মিডিয়ায়ও আমার কলাম ছাপা বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ডি ডব্লিউ উর্দু-এ কলাম লেখা শুরু করি। নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে লেখা কলামের একটি সংকলন ২০২৩ সালে ‘সাচ বোলনা মানা হ্যায়’ (সত্য বলা নিষেধ) নামে প্রকাশিত হয়।
বইটিতে ২০২১ সালের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে লেখা একটি কলামও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাতে ১৯৪৭ সালে জম্মুতে মুসলমানদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে আমি বলেছিলাম, আমার মা জম্মু থেকে হিজরতের সময় মৃতদেহের নিচে লুকিয়ে তাঁর জীবন রক্ষা করেছিলেন, কিন্তু আমার নানি অপহৃত হয়েছিলেন। এরপর থেকে আমার মা সারা জীবন তাঁর অপহৃত মাকে খুঁজে ফিরেছেন।
আমার সেই বইটি প্রকাশ পাওয়ার কিছুদিন পর (কানাডার শহর) টরন্টোর এক বয়স্ক মহিলা আমার সঙ্গে আমারই এক বন্ধুর মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। সে মহিলা আমার নানি ও মা দুজনকেই চিনতেন। জম্মুতে তারা একই মহল্লার অধিবাসী ছিলেন।
এই বয়োবৃদ্ধ মহিলা আমাকে নিজের সম্পর্কে বেশি কিছু বলতে পছন্দ করেননি, তবে তিনি আমাকে বারবার জিজ্ঞাসা করেন, তুমি ১৯৪৭ সালের গণহত্যার কথা উল্লেখ করেছ, কিন্তু এটা কেন বলো না যে, কে এই গণহত্যা করিয়েছিল? এর মূল দায় কার?
আমি তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আমি টিভিতে আপনার সাক্ষাৎকার নিই, সেখানে আপনি খোলাখুলি বলবেন— এই গণহত্যা কে করেছিল?
কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর ভদ্রমহিলা মৃদু স্বরে বললেন, বাবা! আমি কাউকে আমার চেহারা দেখানোর উপযুক্ত নই, আমি টিভিতে আসব কী করে?
অল্প কিছুক্ষণ পর এই মহিলা দুইবার একটি নাম উচ্চারণ করলেন, যাদবেন্দ্র সিং; এই লোকটাই আমাদের সবাইকে ধ্বংস করেছে।
এই বলে মহিলা কাঁদতে শুরু করলেন। কেউ একজন তার হাত থেকে ফোনটি কেড়ে নিল। এবার শুনতে পেলাম পুরুষের কণ্ঠস্বর। (শিখদের প্রচলিত নিয়মে তিনি অভিবাদন জানালেন—) ‘সৎশ্রী আকাল’ জি!
(এরপর বললেন,) আমার নাম আরমান সিং। একটু আগেই আমার মাতাজি আপনার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি এখন কথা বলতে পারছেন না। আপনার অনুগ্রহ যে আপনি শাহেদ সাহেবের অনুরোধে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
শাহেদ থাকে টরন্টোতে। আমি শাহেদকে লাহোরের সরকারি কলেজের সময় থেকে চিনি। তিনি আরমান সিং-এর বন্ধুও। আমি আরমান সিংকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই যাদবেন্দ্র সিংটা কে?
তিনি উত্তরে বলেন, ১৯৪৭ সালে এই লোক পাতিয়ালার মহারাজা ছিলেন। আমরাও পাতিয়ালার, তবে আমার মাতাজি জম্মুর বাসিন্দা। তিনি আপনার বড় ভক্ত। জেনারেল মোশাররফের শাসনামলে যখন আপনাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তখন মাতাজি মোশাররফকে খুব বকাঝকা করতেন।
আমি বললাম, মাতাজি মোশাররফের প্রতি এত বিরূপ কেন ছিলেন?
আরমান সিং বলেন, মোশাররফ ভারতীয় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংকে পাকিস্তানে আমন্ত্রণ করেছিলেন এবং উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে মাতাজি মোশাররফের দুশমন হয়ে গিয়েছিলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, অমরিন্দরকে মাতাজি কেন ঘৃণা করেন?
উত্তরে আরমান বলেছিলেন, অমরিন্দর সিং আসলে যাদবেন্দ্র সিংয়েরই ছেলে। যাদবেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই মাতাজির কাছে খারাপ লাগে।
***
ফোনে এই কথোপকথনের পর বন্ধু শাহেদের মাধ্যমে এই বয়োবৃদ্ধ মহিলার ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি। কিন্তু এ ব্যাপারে শাহেদ বড় সতর্ক ছিল। পরবর্তীতে সে একবার পাকিস্তানে এল। লাহোরে ওল্ড রেভেনস ইউনিয়নের একটি অনুষ্ঠানে তার সাথে আমার দেখা হয়। সেদিন অনেক জোর করার পর সে আমাকে বলেছিল, যে বৃদ্ধ মহিলার সাথে ফোনে কথা হল, তাঁকে আসলে ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে জম্মু থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। পাতিয়ালার মহারাজা যাদবেন্দ্র সিংয়ের প্রেরিত সেনাবাহিনী আরএসএসের সাথে মিলে যৌথভাবে জম্মুতে এই গণহত্যা চালিয়েছিল। তখন মহিলার বয়স ছিল চৌদ্দ কি পনেরো বছর!
সে সময় অনেক মুসলিম মহিলাকে অপহরণ করে গুরুদাসপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অপহৃত হিন্দু মহিলাদের বিনিময়ে কিছু মুসলিম মহিলাকে ফেরত দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কম বয়সি মুসলিম মেয়েদের শেষ পর্যন্ত বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। চারজন মুসলিম মহিলাসহ এই মুসলিম মেয়েকে পাতিয়ালার রাজা যাদবেন্দ্র সিংয়ের এক সেনা অফিসার পাতিয়ালার আরেক সিনিয়র অফিসারকে উপহার দিয়েছিল।
সে সময় পাতিয়ালার অফিসারদের বাড়িগুলো মুসলিম যুবতি দিয়ে পূর্ণ ছিল। এদের মধ্যে যেমন পাতিয়ালার মেয়েরা ছিল, তেমনি কিছু মহিলাকে জম্মু থেকে অপহরণ করে আনা হয়েছিল। এই মহিলাটিকে তখন বিক্রির হাত থেকে রক্ষা করতে মহারাজা পাতিয়ালার কর্মীদের মধ্যে একজন তরুণ শিখ ডাক্তার মেয়েটিকে বিয়ে করে ফেলে।
এই শিখ আসলে পাতিয়ালা মহারাজার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার আবদুল আজীজ খানের শিষ্য ছিলেন। যখন পাতিয়ালার মহারাজা যাদবেন্দ্র সিং সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালে পাতিয়ালায় অপহৃত মুসলিম নারীদের বিবস্ত্র মিছিল বের করে, তখন ডাক্তার আবদুল আজীজ খান এর প্রতিবাদ করেন। ফলে যাদবেন্দ্র সিং একটি খঞ্জর দিয়ে ডাক্তার আবদুল আজীজ খানের চোখ উপড়ে ফেলে। তারপর তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এই আবদুল আজীজ খানের শিষ্য ওই তরুণ শিখ ডাক্তার ১৯৫১ সালে তার এক মুসলিম বন্ধুর সহায়তায় শিয়ালকোটে মেয়েটির পরিবারকে খুঁজে পান। মেয়েটির বাবা-মা জম্মুতে নিহত হয়েছিলেন। মেয়েটির বড় বোন তখনও নিখোঁজ ছিল। বাকি তার দুই ভাই তখন চাচার সাথে শিয়ালকোটে বসবাস করছিল। চাচার চাপে তারা মেয়েটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। শিখ ডাক্তার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন, তিনি কেবল মেয়েটির জীবন রক্ষার জন্য এই বিয়ে করেছিলেন। তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেননি। কিন্তু মেয়েটির চাচা বলছিল, মেয়েটি ফিরে এলে আমরা কাউকে মুখ দেখাতে পারব না।
এই মজলুম মেয়েটির তখন আর কোনো উপায় ছিল না। সে ওই শিখ ডাক্তারেরই আসল স্ত্রী হয়ে যায়। পরবর্তীতে তাদের ঔরসে ১৯৫৬ সালে আরমান সিং জন্মগ্রহণ করেন। কিছুদিন পরে এই শিখ ডাক্তারের গোটা পরিবার কানাডায় চলে যায়।...
***
গত বছর শাহেদ হঠাৎ একদিন আমাকে বলে, আরমান সিং পাকিস্তানে এসেছেন।
সে আমাকে এবার আরমান সিংয়ের সাথে সরাসরি কথা বলিয়ে দেয়। আরমান সিং শিয়ালকোটে বাবা ফরিদের শিষ্য ইমাম আলিউল হকের মাজার যিয়ারতে এসেছেন। ইমামের মাজারে হাজির হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি আমাকে কারণ বলেননি। মাতাজি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, মাতাজি এখন আর সফর করার উপযুক্ত নন। তিনি পাকিস্তানকে খুব ভালবাসেন, কিন্তু তিনি বলেন, সেখানে গিয়ে আমি কার সাথে দেখা করব! মাতাজি তাঁর বাবা-মাকে খুব স্মরণ করেন, যাঁরা পাকিস্তানের জন্য নিহত হয়েছিলেন এবং আজও তিনি যাদবেন্দ্র সিংকে অভিশাপ দেন।
আরমান সিং বলেন, আমার বয়স যখন ১০, আমার বাবা টরন্টোতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর মাতাজি আর বিয়ে করেননি। কঠোর পরিশ্রম করে আমাকে আর আমার বোনকে বড় করেন। আমরা মাঝে মাঝে দিল্লি অথবা পাতিয়ালা যাই; কিন্তু মাতাজি আর কখনও ওদিকে যাননি। তাঁর হৃদয় পাকিস্তানে আটকে আছে। তিনি তাঁর সমস্ত আত্মীয়দের খবর রাখেন, যারা তাঁকে আপন করে নিতে রাজি ছিলেন না।
আরমান সিং বলেন, হয়তো আপনার কাছে পাকিস্তানের অতটা কদর নেই, কিন্তু আমার মায়ের কাছে পাকিস্তানের অনেক কদর, তিনি আপনার দেশের জন্য তাঁর সম্ভ্রম হারিয়েছেন।
আমি জিজ্ঞাসা করি, আমি যদি টরন্টোতে আসি, আপনি কি আমাকে মাতাজির সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেবেন?
আরমান সিং বলেন, অবশ্যই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেব। তবে মাতাজি কোনো সাক্ষাৎকার দেবেন না। কারণ এতে তাঁর পাকিস্তানী আত্মীয়-স্বজনের বদনাম হবে। তিনি মরে গেলেও তাদের দুঃখ দিতে চান না।
—১০ আগস্ট ২০২৬ ঈসায়ী
চাচা জানির পরিণতি
জম্মুর একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ৯৫ বছর বয়সি এক মহিলা কানাডার এক শিখ পরিবারে মৃত্যুর অপেক্ষা করছেন। এই বয়োবৃদ্ধ মহিলার পাকিস্তানের প্রতি মহব্বত নিয়ে গত সোমবার প্রকাশিত কলামে পাতিয়ালার মহারাজা যাদবেন্দ্র সিংয়ের কথাও ছিল, যার নির্দেশে পাতিয়ালা সেনাবাহিনী জম্মুতে গিয়ে মহারাজা হরি সিংয়ের সেনাবাহিনীর সাথে মিলে মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল।
পরবর্তীতে এই যাদবেন্দ্র পাতিয়ালায় যাদবেন্দ্র পাবলিক স্কুল নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ওই স্কুলের এক শিক্ষক গত রাতে আমার সাথে যোগাযোগ করেন এবং অভিযোগের সুরে বলেন, আমরা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং ইন্ডিয়া টুডেতে আপনার কলাম পড়তাম। আমরা আপনাকে খুব সম্মান করতাম, কিন্তু ১০ আগস্ট ২০২৬-এ জং পত্রিকার কলামে যাদবেন্দ্র সিং সম্পর্কে আপনি যে অভিযোগ করেছেন, তাতে আমরা অনেক দুঃখ পেয়েছি। আপনার কলাম তো উর্দুতে প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু এখানে কেউ একজন আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে হিন্দি অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিয়েছে। আপনার কলামে যে মাতাজির কথা উল্লেখ করেছেন, তাঁর প্রতি আমাদের গভীর সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু তিনি ভুল বুঝেছেন, যাদবেন্দ্র সিং মুসলিম গণহত্যা করেননি। আজও অনেক মুসলিম শিশু যাদবেন্দ্র পাবলিক স্কুলে পড়ে, তাই তাঁর বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত।
আমি তাঁর সব কথা শুনি এবং উত্তরে বলি, আপনার নামসহ আপনার ব্যাখ্যা আমার কলামে প্রকাশ করব কি না?
তিনি বললেন, আমার নাম থাকুক, আপনি যাদবেন্দ্র পাবলিক স্কুলের মুখপাত্রের পক্ষে লিখে দিন যে, স্কুলের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
এরপর তিনি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেন, আপনি ১৪ আগস্ট ২০১৭ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ এমন একটি গল্প লিখেছিলেন। আপনি সেখানে পাতিয়ালার মহারাজার নাম উল্লেখ করেননি।
আমি তাঁকে বললাম, আপনি যথেষ্ট রিসার্চের পর আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন। তবে সেই কলামটি আমার আপন নানি গোলাম ফাতেমাকে নিয়ে ছিল। আমার অনুরোধে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আমার নানির একটি ছবিও সেখানে প্রকাশ করেছিল। এভাবে হয়তো তাঁকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তবে তিনি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। আমার মা আমার নিখোঁজ নানির গল্প অনেকবার বলেছিলেন, যিনি নিজেই লাশের নিচে লুকিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিলেন। তিনি কীভাবে জানবেন, জম্মুতে গণহত্যার জন্য সেনাবাহিনী কোথা থেকে এসেছিল!
জবাবে যাদবেন্দ্র পাবলিক স্কুলের মুখপাত্র ব্যঙ্গ করে বললেন, আজ ১৯৪৭ নয়, ২০২৬। আজ মহারাজা পাতিয়ালার সেনাবাহিনী আপনার রাওয়ালাকোটে গুলি চালাচ্ছে না। সারা বিশ্ব জানে, এখন বেলুচিস্তানে কী ঘটছে! আপনি আপনার পাকিস্তানের ফিকির করুন আর যাদবেন্দ্র সিংয়ের মতো ব্যক্তিত্বদের মাফ করে দিন, যিনি আপনার জবাব দেওয়ার জন্য আর বেঁচে নেই।
আমি এই বলে কথা শেষ করে দিই যে, আপনারা আজ ভারতে মুসলমানদের সঙ্গে যা করছেন, তা প্রমাণ করে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা সঠিক ছিল। পাকিস্তান না হলে আজ পাকিস্তানেও ‘রামরাজ্য’ থাকত।
লাহোরের এক প্রবীণ আইনজীবীও ১০ আগস্টে লেখা ‘মাতাজির পাকিস্তান’ কলামের ওপর এক দীর্ঘ মন্তব্য পাঠিয়েছেন। এই আইনজীবী সেই ডাক্তার আবদুল আজীজ খানের পরিবারের সদস্য, যাকে পাতিয়ালার মহারাজা নিজের সামনে হত্যা করিয়েছিল। উকিল সাহেব অনুযোগ করে বলেছেন, আজ পাকিস্তানের ওপর যারা কবজা করে আছে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তাদের অগ্রজ ডাক্তার আবদুল আজীজ খানের আত্মত্যাগের কথা তারা ভুলে বসে আছে।
আমি উকিল সাহেবকে বললাম, লাহোরে একজন ডাক্তার আছেন সাঈদ আহমাদ মালিক, যিনি দিল্লি থেকে হিজরত করে লাহোরে চলে এসেছিলেন। তিনি বহু বছর ব্রিটেনে ডাক্তারি করেছেন এবং সারা জীবন হিজরতের গল্প সংগ্রহ করেন। ২০২০ সালে এসে তিনি ‘১৯৪৭ ঈ. কা মুসলিম কতলে আম’ (১৯৪৭ সালে মুসলিম গণহত্যা) নামে একটি বই লেখেন, যেখানে তিনি ডাক্তার আবদুল আজীজ খান হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত উল্লেখ করেন। তিনি এ-ও লেখেন, তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল, তিনি মহারাজাকে মুসলিম মহিলাদের বিবস্ত্র করে মিছিল বের করতে মানা করেছিলেন। যার ফলে মহারাজা তাঁর চোখ উপড়ে ফেলেছিল এবং তাঁর বাড়ি গুড়িয়ে দিয়েছিল।
এই বইয়ে শক্তিশালী প্রমাণ ও সাক্ষ্যসহ লেখা হয়েছে, পাতিয়ালার মহারাজা একাই তার প্রাসাদে পাঁচ শ অপহৃত নারীকে বন্দি করে রেখেছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার চৌদ্দ বছর পর অক্টোবর ১৯৬১ সালে এক পাকিস্তানী প্রতিনিধি দল পাতিয়ালা সফর করে। ১৯৪৭ সালে যারা পাতিয়ালা থেকে পাকিস্তানে চলে এসেছিল, প্রতিনিধি দলে তাদেরও কয়েকজন ছিল। প্রতিনিধি দলটি পূর্ব পরিচিত একজন মুসলিমের খোঁজ পেয়েছিল, যিনি তাঁর জীবন রক্ষার জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। এখন তিনি ‘চাচা জানি’ নামে পরিচিত। ‘চাচা জানি’ পাকিস্তানী প্রতিনিধি দলটিকে শহর ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। এরমধ্যে পাতিয়ালার লাল মসজিদের কাছে একটি আঙিনায় পাঁচ-ছয়জন মহিলাকে বসা দেখতে পেলেন। চাচা জানি মহিলাদের কাছে থেমে তাদের বললেন, এই যে ইনারা পাকিস্তান থেকে এসেছেন।
জবাবে এক মহিলা বলে উঠল, কাপুরুষ, নির্বোধ!
প্রতিনিধি দলের সদস্য সাঈদ আহমাদ আখতার চাচা জানির কাছে জানতে চাইলেন, এই নারীরা কারা?
চাচা জানি উদাসীনভাবে উত্তর দিলেন, এরা একসময় মুসলমান ছিল। ১৯৪৭ সালে অপহরণের শিকার হয়েছিল। এরপর হিন্দু ও শিখরা তাদেরকে বিবাহ করে নেয়।
ড. সাঈদ আহমাদ মালিকের বইয়ে একজন নারীর মুখ থেকে পাকিস্তানীদের সম্পর্কে এই কথাগুলো পড়ে আমার অনেক কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু তারপর আমি পাকিস্তানে সেসব মহিলাদের দুঃখ নিয়ে ভাবিত হলাম, যাদেরকে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা যখন স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করি, তখন লক্ষ লক্ষ শহীদের কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়, জীবন ও সম্ভ্রম দিয়ে যাঁদের স্বাধীনতার মূল্য চোকাতে হয়েছে।
যে বুদ্ধিজীবীরা প্রশ্ন তোলেন, ১৯৪৭ সালের বিভাজনে ভুল কোথায় হয়েছিল? সে বুদ্ধিজীবীরা যেন ১৯৩১ সালে মালিক ফজল হাসান রচিত ‘হিন্দু রাজ কি মানসুবেঁ’ (হিন্দু রাজত্বের রূপরেখা) বইটি পড়ে। লাহোর প্রস্তাব পাস হওয়ার নয় বছর আগে লেখা এই বইটিতে মালিক ফজল হাসান হিন্দু নেতাদের বক্তব্য ও বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উভয়ই ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতার পরে ভারতে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে মুসলমানদের ধর্মত্যাগ করে হিন্দু হতে হবে।
মুনির আহমাদ মুনির সাহেবকে অভিনন্দন! যিনি এই পুরোনো বইটি পুনরায় প্রকাশ করেছেন। এই বইটি সকল ক্ষমতাসীনের পড়া উচিত। কারণ এই বইয়ে উল্লিখিত হিন্দু চরমপন্থিদের ৩১টি মূল উদ্দেশ্যই আজকের ভারতে বিজেপির নীতি।
মালিক ফজল হাসানের বইয়ে বলা হয়েছে, মুসলিমদের নিজস্ব একটি দেশ এজন্য প্রয়োজন যে, ব্রিটিশরা চলে গেলে একটি হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে সকল মুসলমানকে হিন্দু বানানো হবে। সকল মসজিদ মন্দিরে রূপান্তর করা হবে। আফগানিস্তান দখল করে ভারতভুক্ত করা হবে। অবশেষে মক্কা ও মদীনায় ওম-এর পতাকা উত্তোলন করা হবে। (নাউযুবিল্লাহ)
পাকিস্তান না হলে আমাদেরও বলা হত, ইসলাম ত্যাগ করে চাচা জানির মতো হিন্দু হয়ে যাও। আজ আমাদের পাকিস্তানে কোনো অমুসলিমকে জোর করে ইসলামে ধর্মান্তর করার প্রয়োজন নেই, তবে চাচা জানির পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে লড়াই বন্ধ করতে হবে।
পাকিস্তান নিরাপত্তা ও ইনসাফের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানকে সেই জুলুমবাজ প্রভাবশালী শ্রেণি থেকে আমাদের মুক্ত করতে হবে, যাদের ভুলের কারণে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছিল।
—১৪ আগস্ট ২০২৬ ঈসায়ী