ক্যান্টিনের কর্নারে পর্দা : সমস্যা কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক অনেকগুলো ক্যান্টিন বা খাবারের হোটেলের মতো রয়েছে। হলগুলোতে আছে, ক্যাম্পাসে আছে। এরকমই একটি ক্যান্টিন হচ্ছে টিএসসি বা ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ক্যান্টিন। ক’দিন আগে এই ক্যান্টিনের এক কোণা পর্দানশিন ছাত্রীদের সুবিধার্থে ঝুলন্ত পর্দা দিয়ে ঘেরাও করে দেওয়া হয়েছে। বড় ক্যান্টিনের খুবই ক্ষুদ্র একটি পাশে পর্দা ঝোলানো হয়েছে। ধরুন, শ খানেক ছাত্র-ছাত্রীর ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ওই ক্যান্টিনে পর্দা ঘেরাও জায়গাটিতে সর্বোচ্চ দশ জন বসতে পারবে।
পর্দানশিন মেয়েদের সুবিধার্থে এই আয়োজনটি করেছে নির্বাচিত ডাকসু—বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ। ছোট্ট এই আয়োজনের ফলে হিজাব-নেকাব পরা মেয়েরা বসে খাওয়ার সুবিধাটি স্বচ্ছন্দের সাথে ভোগ করতে পারার কথা। পর্দায় যারা মুখ ঢেকে রাখে, তাদের জন্য মানুষজনের সামনে বসে খাওয়াটা মুশকিল। কারণ এতে মুখের বা চেহারার অংশের পর্দা করা যায় না। এটি ছিল একটি নিরীহ ও কর্নারভিত্তিক আয়োজন। সবার জন্য কিংবা বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীর জন্যও পর্দা চাপিয়ে দেওয়ার কোনো ব্যাপার-চেষ্টা এর মধ্যে ছিল না বা নেই। ক্যান্টিনের বেশিরভাগ অংশই খোলামেলা।
দুই.
যাইহোক, গত আগস্টের শুরুতেই হঠাৎ দেখা গেল, টিএসসি ক্যান্টিনের এই পর্দাঘেরা ছোট্ট আয়োজনটি নিয়ে একশ্রেণির লোকজন মুখের কথা ও লেখার ভাষায় বিরুদ্ধতাপূর্ণ কথা বলতে শুরু করল। এখন তো অনেক ইস্যুর জন্মই হয় সামাজিক মাধ্যম—ফেসবুকে। বামঘেঁষা ছাত্র-ছাত্রীদের কেউ কেউ হয়তো প্রথম দিকে খোঁচা দিয়ে কিছু লিখেছিল। এরপরই পক্ষে-বিপক্ষে আরও কেউ কেউ কথা বলার পর সেটা চলে যায় মূলধারার গণমাধ্যমে। নিউজ, মতামত ও টকশোতেও কারও কারও বিষয় হয়ে যায় পর্দার জন্য ছোট্ট এই আয়োজনটির প্রতি বিষোদ্গার। শখের বামের খোঁচাখুঁচিটাকেই কোনো কোনো নারী রাজনীতিক লুফে নেন। তাদের মনোভাব অনেকটা এমন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ ও আধুনিক বিদ্যাপীঠেও যদি ক্যান্টিনে মেয়েদের একটি অংশের জন্য পর্দা ঘেরাও দিয়ে জায়গা রাখতে হয়, তাহলে তো এটা বিরাট সমস্যা! পশ্চাৎপদতার কিছু তো বাকি রইল না! আফসোস, প্রতিবাদ, ক্ষোভ সবই তারা ব্যক্ত করলেন।
কিন্তু পর্দা বিরোধী নামধারী মুসলিম শিক্ষার্থী ও রাজনীতিকরা তাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সময় এটা খেয়ালই করলেন না যে, তারা আসলে অন্যের অধিকার ও পছন্দের জায়গাটায় জোর করে বাঁ হাত ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। যেটা আসলে তাদের করা উচিত না এবং তারা করতে পারেনও না। দেশের মূলধারার মিডিয়া ও চিন্তা জগতের স্রোতটা যেহেতু বাম-আশ্রয়ী, তাই অন্যায্য হলেও তাদের অপছন্দের আলাপটা জোরালো করে সামনে আনা হয়েছে।
তিন.
এই লেখা তৈরি করার সময় পর্যন্ত আমি নিশ্চিত নই যে, এই আয়োজনটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে, নাকি পর্দা-ঘেরা অবস্থাটি ক্যান্টিনের কোণায় এখনও বাকি আছে? কিন্তু আমার কাছে এটা সুস্পষ্ট বেদনার একটি ব্যাপার মনে হয়েছে। পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের স্বতন্ত্র জীবন ও শিক্ষার প্রয়োজনে নবাব সলিমুল্লাহর দানকৃত জায়গায় পর্দানশিন মেয়েদের জন্য চা-নাস্তা খাওয়ার আয়োজনটিকে পর্দাবৃত্ত করে রাখতে চাইলেও বাধা বা সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে! দেশ থেকে ফ্যাসিবাদী ও হিন্দুত্ববাদ-এর কাছে আত্মসমর্পণি একটি গোষ্ঠীর পলায়ন তো ঘটেছে, কিন্তু মুসলিম-অনুকূল, ইনসাফপরায়ণ পরিবেশ এখনও অবাধ হয়ে ওঠেনি। জনপরিসর ও খোলামেলা অঙ্গনে দ্বীনের ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক চর্চায় বাধা দেওয়ার কাজটি এখনও করে যেতে চাচ্ছে একটি গোষ্ঠী। দ্বীনদার মানুষের দায়িত্ব হল, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও স্থিরতার সঙ্গে ভদ্রতা ও সুন্দর কর্মরীতি বজায় রেখে দ্বীনী রীতি ও আমল ধরে রাখা। বিড়ম্বনা-সমালোচনা সৃষ্টিকারীদের কথায় পিছিয়ে এলে প্রকাশ্য অঙ্গন ও জনপরিসরে দ্বীনের চর্চা বন্ধ হয়ে যাবে। এদেশে এটা হতে দেওয়া যাবে না। এখানেও জীবনাচার ও মূল্যবোধের যে দ্বীনী সুস্থ সংস্কৃতি আছে, এটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এই উপমহাদেশে এবং প্রতিবেশী ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেও ভিন্ন সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার যে চর্চা, সেটা থেকে সচেতনভাবে স্বতন্ত্র থাকার ও দ্বীনের সঙ্গে থাকার চেষ্টা আমাদের করতে হবে। নতুন প্রজন্মেরও করে যেতে হবে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবা ও কর্ম প্রতিষ্ঠানে হিজাব-নেকাব পরিহিতা বহু সংখ্যক নারী এখন বিদ্যমান। তবে নারীরা শিক্ষা কিংবা কর্ম উপলক্ষ্যে কোন্ পরিস্থিতিতে বাইরে কতটুকু বিচরণ করতে পারে— এ নিয়ে ফিকহী স্বতন্ত্র নির্দেশনা রয়েছে, সেটা স্বতন্ত্র আলোচনা, এখানে সে আলোচনার দিকে যাওয়ার অবকাশ নেই। শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী পর্দানশিন নারীদের জন্য তাদের বিচরণ ও অবস্থানের ক্ষেত্রগুলোতে যৌক্তিক যেসব পর্দা-অনুকূল পরিবেশ তৈরির দাবি ও বিবেচনা আসবে— সেগুলোর পক্ষে থাকা এবং রক্ষা করাই সবার জন্য উচিত।
বিষয়টি শুধু নারীদের পর্দার প্রসঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী-কর্মজীবী সবার জন্য দ্বীনের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলাটা সবার দায়িত্ব। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রাধান্য ও স্বাভাবিক ইনসাফের চাহিদার সঙ্গেও সামঞ্জস্যশীল।