Rabiul Awal 1448   ||   September 2026

জাতীয়তাবাদ ও জাতির পিতা নিয়ে প্রকাশিত একটি কলাম
প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

Mufti Abul Hasan Muhammad Abdullah

বহু বছর থেকেই দৈনিক পত্রিকার কলামগুলো তেমন একটা পড়া হয় না। দেশ-বিদেশের নির্বাচিত কিছু লেখকের লেখায় মাঝে মাঝে নজর বোলানো হয়।

২১ আগস্ট ২০২৬ চোখে পড়ল দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের একটি কলাম। শিরোনাম— ‘এ জাতিকে লইয়া আমরা কী করিব’।

শিরোনাম থেকে বোঝা যাচ্ছিল না, কী বিষয়ে তিনি লিখতে চাচ্ছেন। লেখকের শিরোনাম প্রসঙ্গে আমরা আমাদের প্রবন্ধের শেষের দিকে আসছি। তার লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত দু-চারটি কথা আরজ করার ইচ্ছে হয়েছে।

লেখায় তিনি জাতীয়তাবাদ ও জাতির পিতা নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। সেখানে তিনি প্রচলিত জাতীয়তাবাদকে মানবতার জন্য ক্ষতিকর বলেই পেশ করতে চেয়েছেন। বিভিন্ন দেশে জাতির পিতার যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটিতেও তিনি আপত্তি করেছেন। তাঁর লেখা পড়ে মনে হয়েছে, বর্তমানে ভাষা ও গোষ্ঠীভিত্তিক যে জাতীয়তাবাদ দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে চালু আছে বা ছিল, সেগুলোকে তিনি নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন এবং সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

এই কথাগুলো পড়ে মনে হয়েছে, এই ধরনের জাতীয়তাবাদের বিষয়ে ইসলামের দর্শন ও শিক্ষা এখানে বলার সুযোগ রয়েছে। আমরা কুরআন-সুন্নাহ্য় বর্ণিত রাষ্ট্র ও জাতি গঠনের নির্দেশনাগুলো ভালোভাবে পড়লে দেখতে পাই, ইসলাম মানুষকে ভাষা, গোত্র বা রঙের ভিত্তিতে বিভক্ত করতে রাজি নয়। কোনো জাতির মর্যাদা নির্ধারণে এসব বিষয়কে মানদণ্ড করা হয়নি; বরং এই ধরনের জাতীয়তাবাদকে জাহেলিয়াত আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু হাদীস দেখতে পারি—

ليس منَّا من دَعا إلى عصبيّةٍ، وليس مِنا من قاتل على عَصبيّةٍ، وليس منا من مات على عصبيّة.

যে ব্যক্তি মানুষকে আসাবিয়াতের (সাম্প্রদায়িকতা ও অন্যায় পক্ষপাত) দিকে ডাকে, নিজেও আসাবিয়াতের সমর্থনে যুদ্ধ করে এবং আসাবিয়াত নিয়ে মৃত্যুবরণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। —সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫১২১

অন্যত্র নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—

مَنْ قُتِلَ تَحْتَ رَايَةٍ عِمِّيَّةٍ، يَدْعُو عَصَبِيَّةً، أَوْ يَنْصُرُ عَصَبِيَّةً، فَقِتْلَةٌ جَاهِلِيَّةٌ.

যে ব্যক্তি সঠিক আদর্শহীন নেতৃত্বের পতাকাতলে যুদ্ধ করে, গোত্রপ্রীতির দিকে আহ্বান জানায় এবং গোত্রপ্রীতির কারণেই সাহায্য করে, তার মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু। —সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৮৫০

জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

كُنَّا فِي غَزَاةٍ - قَالَ سُفْيَانُ مَرَّةً: فِي جَيْشٍ - فَكَسَعَ رَجُلٌ مِنْ الْمُهَاجِرِينَ رَجُلًا مِنْ الْأَنْصَارِ، فَقَالَ الْأَنْصَارِيُّ: يَا لَلْأَنْصَارِ، وَقَالَ الْمُهَاجِرِيُّ: يَا لَلْمُهَاجِرِينَ، فَسَمِعَ ذَاكَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: مَا بَالُ دَعْوَى جاهلية. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، كَسَعَ رَجُلٌ مِنْ الْمُهَاجِرِينَ رَجُلًا مِنْ الْأَنْصَارِ، فَقَالَ: دَعُوهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ.

আমরা এক জিহাদে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। তখন একজন মুহাজির একজন আনসারকে আঘাত করে। সে সময় আনসারী চিৎকার করে বলল, হে আনসারীরা! আর মুহাজির ব্যক্তি ডাক দিল, হে মুহাজিরগণ!

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কী ব্যাপার! জাহেলী যুগের মতো হাঁক-ডাক কেন?

তারা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! একজন মুহাজির একজন আনসারকে আঘাত করেছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা এমন কথাবার্তা ছেড়ে দাও। কেননা এ তো পূতিগন্ধময়। —সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৬২২

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—

مَن نَصَرَ قومَه على غيرِ الحق، فهو كالبعير الذي ردِيَ، فهو يُنْزَعُ بِذَنَبِه.

যে ব্যক্তি অন্যায়ের ওপর আপন গোত্রের সাহায্য করে, তার দৃষ্টান্ত সেই উটের মতো, যা কূপে পতিত হয়েছে, এরপর তার লেজ ধরে টানা হচ্ছে। —সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫১১৭

শুধুই আমার গোষ্ঠীর লোক, আমার ভাষাভাষী লোক, আমার সম্প্রদায়ের লোক, আমার দেশের লোক বলেই আমি তার পক্ষপাতিত্ব করব; সে অন্যায় কিছু করলেও তাকে বাঁচাতে চেষ্টা করব এবং যে ন্যায়ের ওপর আছে সে আমার গোষ্ঠীর নয়, আমার দলের নয়, আমার ভাষার নয় বলে তার বিরোধিতা করব— ইসলাম এটাকে জাহেলিয়াত ও বর্বরতা আখ্যা দিয়েছে। একেই বলেছে আসাবিয়াত তথা সাম্প্রদায়িকতা।

বিদায় হজ্বে প্রদত্ত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষণের একথাটি অনেক মুসলমানেরই মুখস্থ আছে। সে ভাষণের শিক্ষাগুলো, সে ভাষণের বাক্যগুলো শুধু মুসলিমই নয়, অনেক অমুসলিমকেও আলোড়িত করে।

সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—

يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ، وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى عَجَمِيٍّ، وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ، وَلَا أَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى.

হে মানুষ, জেনে রাখ তোমাদের রব এক এবং তোমাদের পিতা একজন। শুনে রাখ, কোনো আরবের ওপর অনারবের কোনো মর্যাদা নেই এবং কোনো অনারবের ওপর আরবের কোনো মর্যাদা নেই। সাদার ওপর কালো, কালোর ওপর সাদার কোনো মর্যাদা নেই, একমাত্র তাকওয়া ব্যতীত। —মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩৪৮৯

এই বাক্যগুলো এতটাই স্পষ্ট এবং এতটাই মর্মস্পর্শী যে, কিয়ামত পর্যন্তের জন্য সমগ্র বিশ্বমানবতাকে এই বাক্যগুলোর মাধ্যমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরক্ষা দিতে চেষ্টা করেছেন। মানব সম্প্রদায়কে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে একে অপরের সহায়ক হতে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। মানুষের সম্মান, মর্যাদা নিশ্চিত হবে কর্মের মাধ্যমে। যে মানুষ কর্মে যত ভালো, সে তত মর্যাদাবান বলে বিবেচিত হবে। শুধু ভাষার কারণে, শুধু অঞ্চলের কারণে, শুধু দেশের কারণে কেউ আলাদা মর্যাদার অধিকারী হবে না। প্রচলিত জাতীয়তাবাদগুলোকে ইসলাম এভাবেই খণ্ডন করেছে।

কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ইসলাম যদি এই ধরনের জাতীয়তাবাদকে সমর্থনই না করে থাকে, তাহলে সৃষ্টিকর্তা কেন মানুষকে এত ভাষা দান করলেন? বিভিন্ন গোত্রে, বিভিন্ন বর্ণে কেনই-বা বিভক্ত করলেন?

এর জবাব কিন্তু পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবেই আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنَّا خَلَقْنٰكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَّاُنْثٰی وَجَعَلْنٰكُمْ شُعُوْبًا وَّقَبَآىِٕلَ لِتَعَارَفُوْا اِنَّ اَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ اَتْقٰىكُمْ اِنَّ اللهَ عَلِیْمٌ خَبِیْرٌ .

হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে চিনতে পার। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মুত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। —সূরা হুজুরাত (৪৯) : ১৩

কুরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে— বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন গোত্রে মানুষকে আল্লাহ তাআলা বিভক্ত করেছেন শুধুই তাদের পরিচিতির জন্য।

মহিউদ্দিন আহমদ বর্ষীয়ান গবেষক, লেখক। তিনি লেখাটার মাঝখানে অল্প কথায় একটি বাক্য বলেছেন, ‘জাতীয়তাবাদ জার্মানি ও ইতালির মতো দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো বহুজাতিক সাম্রাজ্যকে ভেঙে দিয়েছে।’

এখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এই ধরনের জাতীয়তাবাদগুলো বহুজাতিক সাম্রাজ্য ভাঙার পেছনেও কাজ করেছে। কথা তো সত্য। কিন্তু তিনি যদি আরও বিশ্লেষণ করতেন যে, সেই বহুজাতিক সাম্রাজ্যগুলো যেমন সালতানাতে উসমানিয়া বা অটোমান সাম্রাজ্যের অবদান কী ছিল এবং কীভাবে বহুভাষাভাষী ও বহু জাতিকে একত্র করে রেখেছিল শত শত বছর। এরপর জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে যে বিভক্তি এসেছে, বিশেষত আমরা যদি আরব দেশগুলোর দিকে তাকাই, সেখানে আরব জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তোলা হয়েছে অটোমান সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য। পরবর্তীতে নিজেদেরকে স্বতন্ত্র রাখার জন্য আরব লীগ গঠিত হল; কিন্তু তাতে কি মধ্যপ্রাচ্য বা আরব দেশগুলোর মধ্যে পরস্পর দ্বন্দ্ব কমেছে? তাদের পারস্পরিক যুদ্ধ কি থেমে গেছে? তাদের মধ্যে মতানৈক্য কি দূর হয়েছে! বরং উল্টোটা ঘটেছে। তারা এখনও এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে লেগে আছে। মাঝে মাঝে কয়েক দেশ মিলে আরও কয়েকটি দেশকে কোণঠাসা করার কাজে লেগে পড়ছে।

আমরা দেখেছি, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণই বিফলে গিয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলেও ভাষার ধোঁয়া তোলা হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই, সকল ভাষাই আল্লাহ তাআলার দান। প্রত্যেক ব্যক্তি তার ভাষায় কথা বলার অধিকার রাখে। পরস্পরে যোগাযোগ রক্ষায় সে ভাষা ব্যবহারেরও অধিকার রাখে। এটা কেউ তার থেকে কেড়ে নিতে পারে না। এখানে অন্যের হস্তক্ষেপ কিছুতেই কাম্য নয়। কিন্তু শুধু ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ কোনো জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না— সেটা সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যে মানবতার খেলাফ— এটা কে না বোঝে? গোষ্ঠীভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ শুধু আল্লাহর জমিনকে খণ্ডিত ও বিভক্ত করতেই ভূমিকা রাখে।

মহিউদ্দিন আহমদ তার লেখা শুরু করেছেন এই বলে, ‘পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে। আল্লাহর দুনিয়া মানুষ তাদের ইচ্ছা ও শক্তির জোরে ভাগাভাগি করে নিয়েছে।’

তাঁর এই বাক্যদুটি পড়ে ভালোই লেগেছে। তিনি অবশ্য লেখাটি সংক্ষিপ্ত রেখেছেন। তিনি স্রেফ সমস্যাগুলো দেখিয়েছেন, কিন্তু সমাধানের দিকে যাননি বা কোনো মতামত পেশ করেননি।

আমরা মনে করি, পৃথিবীর মানুষ যদি সংকীর্ণতা ও ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে এবং ক্ষমতাবানেরা তাদের নিজস্ব স্বার্থ পরিহার করে জাতিকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করার পথ থেকে ফিরে আসে এবং মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং সেভাবে যদি মানুষ মানুষের জন্য হয়, একে অন্যের জন্য নিবেদিত হয়, যেভাবে আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু হাদীসে ইরশাদ করে গেছেন, তবেই পৃথিবীতে শান্তির সুবাতাস বয়ে যাবে। এছাড়া অন্য কোনো বিকল্প এখন পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেনি। এ পর্যন্ত সকল বিকল্পই বিফলে গিয়েছে।

মানুষ হানাহানি মারামারি করে বেড়াচ্ছে। ক্ষমতাবানেরা নিজেদের স্বার্থের জন্য জুলুম করছে, মানুষ মারছে। গোষ্ঠী গোষ্ঠীতে, দেশে দেশে মারামারি হচ্ছে আর এর কুফল ও ক্ষতি ভোগ করছে সাধারণ মানুষ।

জাতীয়তাবাদ নিয়ে বলার অনেক কিছু আছে। এটি অনেক দীর্ঘ বিষয় বটে। বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদ নিয়ে যত আন্দোলন হয়েছে, জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে যত রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে কথা বলা সময় সাপেক্ষ।

প্রচলিত জাতীয়তাবাদগুলো নিয়ে ইসলামের চিন্তা, ইসলাম এসব ক্ষেত্রে জাতি-গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে কী কী ভূমিকা রাখে এবং কী কী নির্দেশনা প্রদান করে— সেটাও আজকে আমরা আলোচনায় আনার সুযোগ পাইনি। আমরা শুধু লেখাটি পড়ে প্রথম দৃষ্টিতে যে কথাটা চিন্তায় এসেছে, সেটা আলকাউসারের সম্মানিত পাঠকদের জন্য পেশ করার চেষ্টা করেছি।

জনাব মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর লেখার শেষ দিকে জাতির পিতা নিয়েও কথা তুলেছেন। এই কথাগুলো একেবারেই প্রাসঙ্গিক মনে হয়। একটি জাতির পিতা কীভাবে নির্ধারিত হয়? যে জাতি আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, যে জাতির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য আছে, পরবর্তী যুগে সেই জাতির কোনো একটা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়ে একজন কীভাবে ‘জাতির পিতা’ হয়ে যায়?! জাতির পিতার এই ধারণাগুলো সংকীর্ণ।

ইসলাম জাতির পিতার এমন ধারণা বিশ্বাস করে না। কারণ ইসলাম এভাবে জাতিকে বিভক্ত করাতেও বিশ্বাসী নয়, যেটা একটু আগেই আমরা আরজ করেছি। যদি মানব জাতির পিতার কথা আসে, তাহলে সেটি তো সর্বস্বীকৃত। আমাদের পুরো মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম আ. এবং আদি মাতা হযরত হাওয়া আ.। এছাড়া পবিত্র কুরআন মাজীদে আমরা জাতির পিতার আরেকটি ধারণা পাই। তা হল—

مِلَّةَ اَبِیْكُمْ اِبْرٰهِیْمَ هُوَ سَمّٰىكُمُ الْمُسْلِمِیْنَ مِنْ قَبْلُ وَ فِیْ هٰذَا.

নিজেদের পিতা ইবরাহীমের দ্বীন দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর। তিনিই পূর্বেও তোমাদের নাম রেখেছিলেন মুসলিম এবং এ কিতাবেও (অর্থাৎ কুরআনেও)। —সূরা হজ্ব (২২) : ৭৮

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য যে দ্বীন রেখে গেছেন, এই দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলোর যেখান থেকে সূচনা, যে নবী এগুলোর সূচনা করেছেন এবং যিনি আমাদেরকে মুসলিমরূপে আখ্যা দিয়েছেন, তিনি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম।

কুরআন কারীমে তাঁর নাম ব্যবহারের আগে বলা হয়েছে—

اَبِیْكُمْ اِبْرٰهِیْمَ.

তোমাদের পিতা ইবরাহীম।

অর্থাৎ ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে যে মুসলিম জাতির পিতা বলা হয়েছে, সেটা কোনো অঞ্চলের ভিত্তিতে, গোষ্ঠীর ভিত্তিতে বলা হয়নি; বরং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বিশ্ব মানবতার জন্য আল্লাহপ্রদত্ত যে কল্যাণ ও সফলতার বিধান রেখে গেছেন, সকল বক্রতা ও গোমরাহী পরিহার করে তাওহীদ ও হেদায়েতের ওপর যে বিশ্ব মানবতাকে একত্রিত করতে চেয়েছেন, সেটারই সর্বশেষ শিক্ষা ও নির্দেশনা দিয়ে গেছেন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম— পবিত্র কুরআনুল কারীম এবং তাঁর হাদীস ভান্ডারের মাধ্যমে। সেই সূত্রেই আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বলেছেন— اَب তথা মুসলিম জাতির পিতা। এখানে ‘পিতা’ বলার একটা সার্থকতা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের সামনে আসে এবং ওইসকল বিতর্ক আর উত্থাপিত হয় না যে, একটি জাতি অনেক পুরোনো, পরবর্তীতে এসে একজন লোক কীভাবে সেই জাতির পিতা হয়ে যায়? পিতা তো আগে আসবে। জাতি পরে আসবে।

দিলে আসা একটি কথা

বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশের লেখক-দার্শনিকদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি নিয়ে লেখা পড়া হয়। তাদের মধ্যে মুসলিম-অমুসলিম সবাই আছেন। অমুসলিমদের কথা বাদই দিলাম। তাদের এ বিষয়ে পড়াশোনা না-ও থাকতে পারে, আবার পক্ষপাতিত্বও থাকতে পারে। কিন্তু মুসলিম লেখকদের ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবেই দেখা যায়, তারা যে বিষয়ে লিখছেন বা বলছেন, সে বিষয়ে অনেক পরের যুগ থেকে কথা শুরু করেন। দুই-তিন-চার শ বছর তাদের পরিধি থাকে। অনেকে তো কথা শুরু করেন হয়তো পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে; কিন্তু মাঝে এক-দেড় হাজার বছর বাদ দিয়ে পরবর্তী যুগে চলে আসেন। তখন দিলে আসে, হায় যদি এই লেখকেরা মুসলমানদের হাজার বছরের ইতিহাস অথবা আমাদের মুসলিম শাসকদের কথা না বললেও কুরআন-সুন্নাহ তথা ইসলাম এসকল ক্ষেত্রে যে নীতি, আদর্শ ও বিধি-বিধান রেখে গেছে এবং যেগুলো যুগের পর যুগ শত শত বছর সুন্দরভাবে পৃথিবীতে পরিচালিত হয়েছে, সুপ্রতিষ্ঠিত থেকেছে, সেগুলো যদি এই লেখকরা তাদের লেখায় আনতেন এবং যথাযথ সূত্র থেকে পড়ে আনতেন!

কেউ কেউ কিছু কিছু আনার চেষ্টা করেন, কিন্তু সেটাও বিকৃত থাকে। কারণ সেটা ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখা থেকে নেওয়া হয়, যাদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব ও বিকৃতি সুস্পষ্ট। সেখান থেকে না এনে যথাযথ সূত্র থেকে বিষয়গুলো তাদের লেখায় উপস্থাপিত হলে দুনিয়াবাসী আরও বেশি উপকৃত হত এবং মানুষ জানতে পারত, প্রচলিত ইজম ও তন্ত্র-মন্ত্র, রাজনৈতিক ধারণা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাগুলো ছাড়াও মানুষের জন্য, মানবতার জন্য সত্যিকারের আদর্শ ও বৈপ্লবিক শিক্ষা ও নীতি ইসলামে রয়েছে।

লেখকের আক্ষেপ : এই জাতিকে লইয়া আমরা কী করিব

লেখক মহিউদ্দিন সাহেব কলাম শেষ করেছেন এই বাক্যটি দিয়ে, ‘এই জাতিকে লইয়া আমরা কী করিব?’ তিনি কলামের শিরোনামও করেছেন এ বাক্যটি।

এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে, তিনি হতাশা ও আক্ষেপ ব্যক্ত করেছেন। এই জাতির সামনে কোনো কথা বললে বিচার-বিবেচনা ও চিন্তা ছাড়াই অনেকে ব্যঙ্গাত্মক আচরণ শুরু করেন। অনেকে ভালো কথাও খুব খারাপভাবে উপস্থাপন শুরু করেন। জাতির পিতা সংক্রান্ত তাঁর কোনো বক্তব্যের কারণে হয়তো তিনি এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, যা তিনি কলামে ইঙ্গিত করেছেন।

সন্দেহ নেই এটি সত্যিকার অর্থেই কষ্টদায়ক। বিশেষত যদি কোনো ব্যক্তি অসদুদ্দেশ্যে নয়; বরং ভালো চিন্তা থেকেই কোনো কথা বলে থাকেন, তাকে যুক্তিতে খণ্ডন না করে গালমন্দ করা হয়, ব্যঙ্গ করা হয়, তখন তো সেই লেখকের, সেই বক্তার কষ্ট হতেই পারে।

আজকে আরেকটি কথা যোগ করতে ইচ্ছে করছে। সেটা হল, আমাদের জাতির এই অবস্থা হল কেন? আমাদের দেশের প্রায় ২০ কোটি জনতার একটা বড় অংশ আজকে এই ধরনের উগ্রতার শিকার, তাদের মধ্যে সহিষ্ণুতা নেই, কোনো যুক্তি-তর্কে তারা যেতে চায় না, তারা সাম্প্রদায়িক চিন্তার শিকার, তারা যে যার মতো করে গবেষক বিশ্লেষক হয়ে যাচ্ছে, আদব-কায়দা এদের অনেকের থেকেই উঠে যাচ্ছে— এগুলোর আসলে কারণ কী? কারা এই অধঃপতনে নিয়ে গেছে?

মহিউদ্দিন আহমদ সাহেবরা কি বলতে পারবেন, তাদের যৌবনে এ ধরনের পরিস্থিতি ছিল! তারা যখন কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন, তখনকার পরিস্থিতি কেমন ছিল? তখনকার যুবকরা, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সাথে কেমন আচরণ করত? মুরব্বীদের সাথে কেমন ব্যবহার করত? কীভাবে কথা বলত? কোনো কথার প্রতিবাদ করতে হলে কীভাবে করত?

এখন পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? এখন শিক্ষার্থী বা যুবক শ্রেণি কেমন আচরণ করে? কীভাবে কথা বলে? এর জন্য আসলে কারা দায়ী?

সমাজ নিয়ে যারা চিন্তা করেন, তাদের কি এগুলো নিয়ে ভাবা উচিত নয়? যারা অসদুদ্দেশ্যে কথা বলছেন, লিখছেন, যারা চাটুকারিতা করছেন, সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য বানাতে সিদ্ধহস্ত— ওই ধরনের লোকদের কথা আর তুলতে চাই না। আমরা বলতে চাই, ভালো লেখকদের কথা, সৎ ব্যক্তিদের কথা, আর যারা সমাজ নিয়ে ভাবেন, দেশ নিয়ে ভাবেন, ভালো কিছু চান, তাদের কি চিন্তা করা উচিত নয়? সমাজ ও জাতিকে এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা কি অত্যাবশ্যক নয়? সেটা কোন্ পথে হতে পারে? এ প্রশ্ন কিন্তু আজকে দেশ ও জাতির জন্য থেকেই যাচ্ছে। আমরা কেউই কিন্তু এ দায় এড়িয়ে থাকতে পারি না।

 

advertisement