তার প্রতিশ্রুতি কেবলই প্রতারণা
জীবনে সফল হতে চাইলে শত্রু-মিত্র নির্ণয় করা খুবই জরুরি। চলার পথে বিশ্বস্ত বন্ধুর সঙ্গ যেমন প্রয়োজন, তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, শত্রু থেকে বেঁচে থাকা।
এমন ব্যক্তিই অগ্রসর হতে পারে, যে বন্ধুর সহযোগিতা পায় আর শত্রু চিনতে ভুল করে না। শত্রুর শক্তি সম্পর্কে অবগত থাকা, তার আক্রমণ ও কৌশলের ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং আত্মরক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে প্রকৃত শত্রু-মিত্রের পরিচয় দিয়েছেন। নেক ও সত্যবাদী বন্ধু গ্রহণ করার তাগিদ করেছেন।
পক্ষান্তরে প্রকৃত শত্রুরও সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। তার শক্তিমত্তা ও ষড়যন্ত্রের বিবরণ দিয়েছেন। তার আক্রমণের রূপ-প্রকৃতি বর্ণনা করেছেন এবং আত্মরক্ষার উপায় ও অবলম্বনও বাতলে দিয়েছেন। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন জায়গায় বিষয়গুলো সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না— আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই আমাদের প্রকৃত বন্ধু এবং একমাত্র অভিভাবক। আর শয়তান আমাদের প্রকাশ্য শত্রু। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথের দিশা দেন। আঁধার থেকে আলোয় নিয়ে আসেন। সিরাতে মুস্তাকীমের পথ দেখান। কিন্তু শয়তান মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করে সিরাতে মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করতে থাকে। সে প্রকাশ্য শত্রু হলেও তার ষড়যন্ত্রগুলো সূক্ষ্ম ও প্রচ্ছন্ন। তাই সামান্য অসতর্ক হলেই কেউ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যেতে পরে।
আল্লাহ তাআলা বান্দাকে সতর্ক করে বলেন—
وَمَنْ يَّتَّخِذِ الشَّيْطٰنَ وَلِيًّا مِّنْ دُوْنِ اللهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِيْنًا، يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيْهِمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطٰنُ اِلَّا غُرُوْرًا، اُولٰٓىِٕكَ مَاْوٰىهُمْ جَهَنَّم وَلَا يَجِدُوْنَ عَنْهَا مَحِيْصًا.
যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে বন্ধু/অভিভাবক বানায়, সে সুস্পষ্ট লোকসানের মধ্যে পড়ে যায়। শয়তান তো তাদের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনা সৃষ্টি করে। (প্রকৃতপক্ষে) শয়তান তাদের যে প্রতিশ্রুতিই দেয়, তা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। তাদের সকলের ঠিকানা জাহান্নাম। তারা তা থেকে বাঁচার জন্য পালানোর কোনো পথ পাবে না। —সূরা নিসা (০৪) : ১১৯-১২১
এখানে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে যে বিষয়গুলো সম্পর্কে সতর্ক করছেন তা হল— প্রকৃত বন্ধু ও একমাত্র অভিভাবক আল্লাহ। আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানকে বন্ধু বানানো মানে স্পষ্ট লোকসানে নিপতিত হওয়া। এটা এমন অপূরণীয় ক্ষতি, যা চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। আর কেউ এ থেকে ফিরে না এলে, সে জেনে রাখুক— শয়তান ও তার দলের লোকদের ঠিকানা জাহান্নাম। সেদিন তা থেকে নিষ্কৃতির কোনো উপায় থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা এখানে আরও বলেছেন— শয়তান তার দলে লোক ভেড়ানোর জন্য ছলনার আশ্রয় নেয়। সে তাদেরকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে থাকে। পার্থিব জীবনের ক্ষুদ্র ভোগ বিলাসিতা ও অন্যায়-আনন্দে বুঁদ করে রাখে। দুনিয়ার সামান্য আমোদ-প্রমোদে বিভোর রেখে পরকালের চিরস্থায়ী জীবন সম্পর্কে উদাস করে তোলে। মিথ্যা আশ্বাস ও প্রলোভন দেখিয়ে দেখিয়ে আশ্বস্ত করে। কিন্তু এগুলো কেবলই তার প্রতারণা।
বস্তুত, শয়তান যখন বিতাড়িত হয় তখন সে এ সংকল্প নিয়েই পৃথিবীতে আসে যে, কিয়ামত পর্যন্ত বনী আদমকে সে মিথ্যা আশ্বাস ও অন্যায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভ্রান্ত করতে থাকবে, এটাই তার মিশন। [দ্র. সূরা ছদ (৩৮) : ৮২]
কিন্তু আল্লাহ তাআলা বান্দাকে আগ থেকেই শয়তানের প্রতারণার ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। বলেছেন—
وَ مَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطٰنُ اِلَّا غُرُوْرًا.
(প্রকৃতপক্ষে) শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতিই দেয়, তা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র আরও বলেন—
يٰۤاَيُّهَا النَّاسُ اِنَّ وَعْدَ اللهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللهِ الْغَرُوْرُ، اِنَّ الشَّيْطٰنَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوْهُ عَدُوًّا اِنَّمَا يَدْعُوْا حِزْبَهٗ لِيَكُوْنُوْا مِنْ اَصْحٰبِ السَّعِيْرِ.
হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং এই পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই ধোঁকায় না ফেলে এবং আল্লাহর ব্যাপারেও যেন মহা ধোঁকাবাজ (শয়তান) তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে। নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রুই গণ্য করো। সে তার অনুসারীদেরকে দাওয়াত দেয় কেবল এ জন্যই, যাতে তারা জাহান্নামবাসী হয়ে যায়। —সূরা ফাতির (৩৫) : ৫-৬
যখন এ বিষয়টি কিয়ামতের ময়দানে দিবালোকের মতো পরিস্ফুট হবে, তখন শয়তান যে বিষয়টি স্বীকার করে নেবে, আল্লাহ তাআলা তা-ও বলে দিয়েছেন—
وَقَالَ الشَّيْطٰنُ لَمَّا قُضِيَ الْاَمْرُ اِنَّ اللهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُّكُمْ فَاَخْلَفْتُكُمْ وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُمْ مِّنْ سُلْطٰنٍ اِلَّاۤاَنْ دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِيْ فَلَا تَلُوْمُوْنِيْ وَلُوْمُوْۤا اَنْفُسَكُمْ مَاۤ اَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَاۤ اَنْتُمْ بِمُصْرِخِيَّ اِنِّيْ كَفَرْتُ بِمَاۤ اَشْرَكْتُمُوْنِ مِنْ قَبْلُ اِنَّ الظّٰلِمِيْنَ لَهُمْ عَذَابٌ اَلِيْم.
যখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে, তখন শয়তান (তার অনুসারীদের) বলবে, বস্তুত আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর আমিও তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের ওপর তো আমার কর্তৃত্ব ছিল না, আমি কেবল তোমাদেরকে (আল্লাহর অবাধ্যতা করার) দাওয়াত দিয়েছিলাম আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছ। সুতরাং এখন আমাকে দোষারোপ করো না; বরং নিজেদেরই দোষারোপ কর। তোমাদের উদ্ধারে আমি কোনো সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমাকে উদ্ধার করতে কোনো সাহায্য করতে সক্ষম নও। এর আগে তোমরা যে আমাকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করেছিলে (আজ) আমি তা প্রত্যাখ্যান করলাম। যারা এ সীমালঙ্ঘন করেছিল, আজ তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। —সূরা ইবরাহীম (১৪) : ২২
এ আয়াতগুলো আমাদের বার্তা দেয়— শয়তান আমাদের প্রকাশ্য শত্রু। কিন্তু তার ষড়যন্ত্র খুবই গভীর। সে প্রচ্ছন্নভাবে মানুষকে বিপথগামী করে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অন্যায় মনোবাসনা তৈরি করে মানুষকে প্রবঞ্চিত করে। এক্ষেত্রে তার প্রধান হাতিয়ার হল, পার্থিব জীবনের চাকচিক্য। এতে সে মানুষকে বিমোহিত করে রাখে। হক গ্রহণ ও ন্যায়ের পথে চলতে নিবৃত্ত করে। অন্যায় ও নাফরমানীর পথ সুগম করে তোলে। কুফর-শিরক, পাপাচার-অনাচার ইত্যাদি নানা নাফরমানীতে লিপ্ত করে।
আল্লাহ তাআলা বান্দাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করেন। এগুলো মূলত আসমানী তরবিয়ত। যাতে বান্দা সতর্ক হয় এবং পাপাচারের পথ পরিহার করে ন্যায়ের পথ অবলম্বন করে। দর্প ও অহমিকা পরিত্যাগ করে বিনীত হয়। মন-দিল বিগলিত করে তওবার প্রতি মনোনিবেশ করে।
কিন্তু এখানেও সেই শয়তান এসে হাজির হয়। ব্যবহার করে তার ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার। অন্যায়কারীর দৃষ্টিতে অন্যায়কে মনোরম করে তোলে। ফলে সে সত্য গ্রহণে অন্ধ হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَقَدْ اَرْسَلْنَاۤ اِلٰۤي اُمَمٍ مِّنْ قَبْلِکَ فَاَخَذْنٰہُمْ بِالْبَاْسَآءِ وَالضَّرَّآءِ لَعَلَّہُمْ يَتَضَرَّعُوْنَ، فَلَوْلَاۤ اِذْ جَآءَہُمْ بَاْسُنَا تَضَرَّعُوْا وَلٰکِنْ قَسَتْ قُلُوْبُہُمْ وَزَيَّنَ لَہُمُ الشَّيْطٰنُ مَا کَانُوْا يَعْمَلُوْنَ.
(হে নবী!) তোমার পূর্বেও বহু জাতির নিকট আমি রাসূল পাঠিয়েছি। অতঃপর আমি (অবাধ্যতার কারণে) তাদেরকে অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত করেছি, যাতে তারা অনুনয়-বিনয় করে।
অতঃপর যখন তাদের কাছে আমার (পক্ষ হতে) সংকট আসল, তখন তারা কেন অনুনয়-বিনয় করল না? বরং তাদের অন্তর আরও কঠিন হয়ে গেল এবং তারা যা করছিল, শয়তান তা তাদের নিকট শোভনীয় করে দিল। —সূরা আনআম (০৬) : ৪২-৪৩
হাদীসের ভাষায়— বনী আদমকে সে অবিরাম অন্যায়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে এবং সত্য গ্রহণে অনীহ করে তোলে। (দ্র. জামে তিরমিযী, হাদীস ২৯৮৮)
মূলত এ সবকিছুই ছলনা ও প্রতারণা মাত্র। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলাও ওয়াদা করেছেন। আল্লাহর ওয়াদাই সত্য। আল্লাহর বিধান মানলে রয়েছে সফলতা। পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী। এর পরে রয়েছে চিরস্থায়ী জীবন। মৃত্যুর পর আল্লাহর সামনে সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। সে জীবনের সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা। ক্ষণস্থায়ী জীবনে সামান্য কিছু অন্যায়-সুবিধা পেতে চিরস্থায়ী জীবন ধ্বংস করা মোটেও সমীচীন নয়। কিন্তু এখানেই শয়তান তার অনুসারীদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে।
কিয়ামতের ময়দানে এ বিষয়গুলো খুব স্পষ্টভাবে সামনে আসবে। তখন শয়তান বাস্তব সত্যটি স্বীকার করে বলবে— দেখ, আমি তো তোমাদের কোনো অপরাধ করতে বাধ্য করিনি। সেই ক্ষমতাও আমার নেই। আমি অন্যায় পথে তোমাদের ডেকেছি মাত্র। অপরাধকে তোমাদের সামনে আকর্ষণীয় করে তুলেছি। তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়ে নিজেরা নিজেদের সর্বনাশ করেছ।
এভাবেই ওপারের জীবনে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। অতএব সময় থাকতেই মহান রাব্বুল আলামীনকে প্রকৃত বন্ধু ও একমাত্র অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
পার্থিব জীবনের চাকচিক্য ও শয়তানের কুমন্ত্রণা যেন আমাদের প্রতারিত না করে এ ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই তাওফীক দান করুন— আমীন।