মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি
আশা ও আশঙ্কার কথা
গত ৭ আগস্ট হঠাৎ করেই সৌদি আরবের মক্কা মুকাররমায় ঘটে গেল আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো বড় একটি ঘটনা। দৈনিক আমার দেশ আলজাজিরা সূত্রে বলছে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও সংশয় বাড়ছে।
এ চুক্তির মূল লক্ষ্য হল, কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সম্মিলিতভাবে তা মোকাবেলা করা এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা। তিন দেশের যে-কোনো একটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। —দৈনিক আমার দেশ (৮ আগস্ট ২০২৬)
উক্ত চুক্তির খবর বিশ্ব গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, চুক্তিটির ভবিষ্যৎ যাইহোক, এর বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব রয়েছে। এ চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর অনেকের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে। কেউ অস্বস্তি থেকে বিদ্রুপও করেছেন।
অনেকে চুপ থাকলেও গভীর পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন। এসবের মধ্যেই চুক্তিকারী দেশগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এটি নিছক একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি; কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের জন্য নয়।
স্বভাবতই এই চুক্তির মূল আবেদন হল, ‘এই তিন দেশের কেউ আক্রান্ত হলে সবাই আক্রান্ত হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে।’ বিদেশি পত্রিকাগুলো এ পয়েন্টটাকেই শিরোনাম করে। অর্থাৎ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই তিন দেশের ওপর কোনো দেশ হামলা করলে অন্য দুই দেশ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে।
এই চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর থেকেই চলছে এর পক্ষে-বিপক্ষে বিশ্লেষণ। যে যার মতো করে বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। দেশি-বিদেশি পত্রিকা ও অন্যান্য গণমাধ্যমে চুক্তিটি নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
এর মধ্যে শোনা যাচ্ছে, এই চুক্তিতে আরও দেশ যুক্ত হতে পারে। তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অচিরেই মিশর যোগ দিতে পারে। অতি সম্প্রতি প্রচারিত হয়েছে, বাংলাদেশও এই চুক্তিতে যুক্ত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কিছু দেশ এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার কথা আলোচনায় আছে।
চুক্তিটির ভালো-মন্দ নিয়ে যদি কথা বলা হয়, তাহলে প্রাথমিক দৃষ্টিতে চুক্তিটিকে অনেকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তাঁরা মনে করছেন, বৃহৎ পরাশক্তিগুলোকে এই চুক্তির মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এ কথা বোঝার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর নজর দেওয়া প্রয়োজন। উসমানী সালতানাত পতনের পর এই অঞ্চলে পশ্চিমাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশগুলো এখন বিভক্ত, সেগুলো সম্মিলিতভাবেই উসমানী সালতানাতের অধীনে ছিল। সেগুলোকে ইংরেজরা খণ্ড-বিখণ্ড করে। বিভিন্ন সরদার ও গোত্রপ্রধানদের মাধ্যমে সেগুলো আলাদা হয়। এরপরে প্রতিষ্ঠিত হয় অনেকগুলো দেশ। বিদেশিরা চলে গেলেও আগের ঐক্য আর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। স্থানীয় সরদার ও গোত্র প্রধানরাই এসব দেশের রাজা-বাদশাহ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে এই দেশগুলোতে আল্লাহপ্রদত্ত খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত হতে থাকে। তেল-গ্যাস দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তারা। এসবের মধ্যেও তারা বরাবর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়ে যায়। কারণ তাদের সুসংহত কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল না। এদিকে তাদের মনোযোগও ছিল না।
এর মধ্যে ঘটে দীর্ঘ ইরাক-ইরান যুদ্ধ। পরবর্তীতে সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক কুয়েত আক্রমণ এবং দখল করে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। যার প্রেক্ষাপটে ইউরোপ-আমেরিকার বৃহৎ শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে আস্তানা গাড়ার সুযোগ পায়। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলো সামরিক ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে স্থাপন করে। শুধু স্থাপনই করে না, সেখানে নিরাপত্তার যাবতীয় নীতি ও কৌশল পরোক্ষভাবে তারাই তৈরি করে দেয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বিষয়টি দিনে দিনে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তাদের নীতি-আদর্শ ও তাদের ব্যয়ভার বহনের জাঁতাকলে পড়ে নিজেদের স্বকীয়তা হারায়।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমারা জোর করে বসিয়ে দেয় ভুঁইফোঁড় রাষ্ট্র ইসরাইলকে। সবাই জানে, এই ইহুদী দেশটি পশ্চিমা গোষ্ঠীগুলোর প্রক্সি হিসেবেই এখানে কাজ করে। তাদের মতলবেই এদেরকে এখানে বসানো হয়েছে, যারা নিরীহ ফিলিস্তিনী, লেবানিজ ও সিরীয়দের ওপরে শুধু জুলুমের স্টিম রোলার চালাচ্ছে না; তাদের বহু ভূমি ইতোমধ্যেই জবরদখল করে নিয়েছে। সাথে সাথে হারামাইনসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য দিন দিন হুমকি হয়ে উঠছে। সেই গোষ্ঠীটিকেই হরেক রকমের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো।
এসকল প্রেক্ষাপটেই অনেকে এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছেন। কেউ আবার মনে করছেন, এই চুক্তি আরও বিস্তৃত হলে, বাংলাদেশসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র এ চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলে, ভবিষ্যতে এটি মুসলিম দেশগুলোর জন্য একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে গণ্য হতে পারে। এতে পরাশক্তিদের ওপর মুসলিম দেশগুলোর নির্ভরতা কমে আসতে পারে। নিজেদের একটা স্বকীয়তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
এই চুক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে— তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে এই চুক্তির ফলে খুব বেশি অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে জায়নবাদী ইসরাইল এবং আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী সরকারের মধ্যে। যেহেতু এই দুটি দেশ আমাদের এই অঞ্চলে ও মধ্যপ্রাচ্যে বরাবরই আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন। ভবিষ্যতে তারা এরকম আগ্রাসী ভাব দেখালে, তারা কোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ করলে অন্য আরও দুটি দেশ চুক্তি অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। এছাড়া মুখে না বললেও পরাশক্তিগুলোর অনেকেই যে এই চুক্তির সফলতাকে তাদের মোড়লগিরির জন্য হুমকি মনে করছেন— তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে এসব চিন্তা ও আশাবাদের ভেতরেই অনেকে সতর্ক মন্তব্যও করছেন। তাদের চিন্তার বিষয়টা হচ্ছে, এ ধরনের চুক্তি করার চেয়ে বাস্তবায়ন করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। যদি একটি দেশ আক্রান্ত হলে সব দেশ আক্রান্ত হয়েছে ধরে নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে এসব দেশের কোনো একটি আক্রান্ত হলে সে দেশ যেমনিভাবে সকল শক্তি নিয়ে নিজ ভূখণ্ড ও জাতিকে রক্ষার জন্য পুরো সামরিক-বেসামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, বাকি দুই দেশও কি সেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে?
যদি সৌদি আরবের প্রসঙ্গ আনা হয়, এটি শুধু একটি দেশই নয়; বরং তার অধীনে মুসলমানদের দুই পবিত্র নগরী— মক্কা মুকাররমা ও মদীনা মুনাওয়ারা রয়েছে এবং এর শাসনব্যবস্থাও তাদের নিয়ন্ত্রণে। সৌদির রাজারা খাদেমুল হারামাইন তথা দুই হারামের সেবক খেতাবও নিজেদের জন্য গ্রহণ করে থাকেন। আলোচিত প্রতিরক্ষা চুক্তিটিও রিয়াদ বা জেদ্দায় না হয়ে মক্কা মুকাররমায় হওয়ার গুরুত্বও সম্ভবত সেখানেই। এদিক থেকে হারামাইন বিশ্ব মুসলিমের আবেগেরও জায়গা। সেক্ষেত্রে মক্কা-মদীনা আক্রান্ত হলে হয়তো সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে; কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে এটা কতটুকু কার্যকর হবে! বাস্তবিক ক্ষেত্রে সেটা হবে কি না— এ নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে।
চুক্তি নিয়ে অন্য কথাও আছে। অনেকে বলছেন, এসকল দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা তাদের ক্ষমতা সুরক্ষিত করার চিন্তা থেকে এ ধরনের চুক্তির দিকে অগ্রসর হয়েছেন। সুতরাং এসকল চুক্তি কাগজে-কলমেই হয়তো থেকে যাবে। একটা মেয়াদ পর্যন্ত এটা নিয়ে আলোচনা হবে। পরবর্তীতে এগুলো আর কার্যকর না-ও থাকতে পারে।
আমরা মনে করি, ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে অন্তত প্রথম দৃষ্টিতে হলেও ইতিবাচকভাবেই দেখা উচিত। বর্তমান পৃথিবীতে তো বিভিন্ন জোট আছেই। ন্যাটো জোটের কথা সকলেই জানি। পশ্চিমাদের জোট; সেখানে আমেরিকা আছে, ইউরোপিয়ানরা আছে। জোটগুলো কার্যকরও আছে। মুসলিমদেরও তো একটা সংস্থা— ওআইসি আছে; কিন্তু সেটা অনেকটাই অকার্যকর। সেই দৃষ্টিতে যদি মুসলিম দেশগুলো বিশেষত যে তিনটি মুসলিম দেশ এই প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে তুরস্ক সামরিক ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে আছে। বিশেষত তারা যে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করে চলেছে, সেদিক থেকে শুধু মুসলিম দেশগুলোই নয়, অমুসলিম দেশগুলোর কাছেও তাদের বেশ গুরুত্ব রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্র। সৌদি আরব তেল-গ্যাসে সমৃদ্ধ উন্নত অর্থনীতির দেশই নয়; সেখানে রয়েছে মুসলমানদের দুই পবিত্র নগরী। এসব বিবেচনায় একে একটি শক্তিশালী চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
তবে এটাও ঠিক যে, যে-কোনো চুক্তিই সৎ উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়ে হওয়া উচিত। যেসকল দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে, তাদের সম্মিলিত হিসাব করলে ৯০ ভাগেরও বেশি মানুষ মুসলিম। তো মুসলিম উম্মাহর দৃষ্টিকোণ থেকে যদি এই চুক্তিকে দেখা হয়, ভবিষ্যতে যদি আরও সম্প্রসারিত হয় এবং ব্যক্তিস্বার্থ প্রতিষ্ঠিত না করে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে নিরাপদ রাখা, অন্যের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা ও অন্যের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করার সাহস তৈরির কাজে এই শক্তি ব্যবহার করা হয়, তাহলে অবশ্যই তা সুফল বয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ।
সুতরাং চুক্তির একেবারে শুরুতেই এটাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা দরকার আছে বলে আমরা মনে করি না। অবশ্য সকল কিছুর মধ্যেই সততা, নিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সঠিক হওয়া অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা দেশে দেশে মুসলিম শাসকদের সুমতি দান করুন। তাদেরকে ‘হাবলুল্লাহ’ তথা আল্লাহর রজ্জু মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার তাওফীক দান করুন। নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার এবং ঐক্য ধরে রাখার তাওফীক দান করুন।
মুসলিমরা যেন হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী ‘কাজাসাদিন ওয়াহিদিন—এক দেহ বহু অঙ্গ’ হিসেবে থাকতে পারে এবং পরস্পর বিরোধে না জড়ায়। অন্যদের আক্রমণের শিকার হলে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঈমানী চেতনা মুসলিম শাসকদের মধ্যে, মুসলিম জাতির মধ্যে যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই আবার মুসলিম উম্মাহ হারানো গৌরব ফিরে পেতে থাকবে।