Muharram 1448   ||   July 2026

তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত দ্বীনী মজলিস
‖ সংক্ষিপ্ত চিত্র

জীবনের প্রতিটি অঙ্গনকে আখেরাতমুখী করুন

আলহামদু লিল্লাহ, গত ৪ মুহাররম ১৪৪৮ মোতাবেক ২০ জুন ২০২৬, শনিবার মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’র পল্লবী ক্যাম্পাসের সেমিনার হলে সদ্য এসএসসি পরীক্ষা সমাপনকারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি দ্বীনী মজলিস অনুষ্ঠিত হয়।

মজলিসের কয়েকদিন আগে পল্লবী ও হযরতপুর (কেরানীগঞ্জ) এরিয়ার শিক্ষার্থীদের কাছে দাওয়াতনামা পাঠানো হয়েছিল। যাতে লেখা ছিল– ‘মজলিসে পরীক্ষা-পরবর্তী দীর্ঘ বিরতিতে ছাত্রদের করণীয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ও উপকারী পরামর্শ দেওয়া হয়। একজন আদর্শ মুসলিম ছাত্র কীভাবে আগামী জীবন সফল করে তুলতে পারেন, সেই দিকনির্দেশনাও থাকে।’

সকাল সাড়ে দশটায় কুরআনুল কারীম তিলাওয়াতের মাধ্যমে মজলিস শুরু হয়। দ্বীনী আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে ইসলামের সাধারণ জ্ঞান সম্পর্কিত কুইজ পর্ব ছিল। বিজয়ীদের মজলিস শেষে পুরস্কৃত করা হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের দুআর মধ্য দিয়ে মজলিস সমাপ্ত হয়।

মারকাযের পক্ষ থেকে সর্বস্তরের মানুষের জন্য নিবেদিত কিছু সেবা

মজলিসে শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি লিফলেট বিতরণ করা হয়। শিরোনাম ছিল– ‘সর্বস্তরের মানুষের জন্য নিবেদিত কিছু সেবা’। স্বাগত বক্তব্যে লিফলেটটি পড়ে শোনানো হয়। এতে সর্বসাধারণের জন্য মারকাযের চলমান কয়েকটি সেবার কথা বলা হয়

১. তালীমুদ্দীন একাডেমি

যে-কোনো বয়স ও পেশার মুসলিমদেরকে ইসলামের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ২০১৭ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে তালীমুদ্দীন একাডেমি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর ২৯টির বেশি শাখা ও উপশাখা আছে।

এখানে শেখানো হয়

* কুরআন মাজীদের সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত।

* ইসলামের সহীহ আকীদা-বিশ্বাস।

* পাঁচ ওয়াক্ত নামায, ঈদ, জুমা ও জানাযার নামায আদায়ের পদ্ধতি।

* রোযা, যাকাত ও হজ্বের বিধিবিধানসহ ইসলামের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। 

* পেশাজীবীদের নিজ নিজ পেশা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ জরুরি মাসায়েল।

* পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনাসমূহ।

* রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সীরাত।

* দিন-রাতের মাসনূন দুআসমূহ।

* লেনদেন ও হালাল-হারামের বিধিবিধান।

* শান্তিপূর্ণ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় ইসলামের জরুরি হেদায়েতসমূহ ইত্যাদি।

যারা জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করছেন বা চাকরি করছেন, তাদের জন্য ‘তালীমুদ্দীন একাডেমি’ দ্বীন শেখার একটি সহজ মাধ্যম। এখানে সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই; কেউ চাইলে সকালেও পড়তে পারেন আবার রাতেও পড়তে পারেন। বছরের যে-কোনো দিন যুক্ত হতে পারেন।

২. মাসিক দ্বীনী মাহফিল

পল্লবী

ক. প্রতি ইংরেজি মাসের তৃতীয় শনিবার আসর থেকে এশা পর্যন্ত একটি দ্বীনী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মাহফিলের শেষ অংশে উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে।

খ. প্রতি মঙ্গলবার এশার পর তাফসীর মজলিস হয় ।

হযরতপুর

ক. প্রতি ইংরেজি মাসের প্রথম সোমবার আসর থেকে এশা পর্যন্ত দ্বীনী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এখানেও শেষ দিকে প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে।

খ. প্রতি ইংরেজি মাসের প্রথম শুক্রবার সকালে দ্বীনী মজলিস হয়। এতে মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম আলোচনা করে থাকেন।

৩. মাসিক আলকাউসার

মারকাযুদ দাওয়াহ্‌র মুখপত্র ও একটি নির্ভরযোগ্য ইসলামিক ম্যাগাজিন মাসিক আলকাউসার। ২০০৫ থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বাংলাভাষী পাঠকদের দ্বীনী চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে। প্রিন্ট সংস্করণের পাশাপাশি এর ওয়েব সংস্করণও নিয়মিত প্রকাশিত হয়।

এছাড়া মাসিক আলকাউসার-এর ত্রৈমাসিক সাপ্লিমেন্ট হিসেবে নারীদের জন্য বিশেষ আয়োজন ত্রৈমাসিক নারী এবং শিশু-কিশোরদের জন্য ত্রৈমাসিক শিশুকিশোরও নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে।

‘মাসিক আলকাউসার’-এর মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য আলেমদের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং সমসাময়িক বিষয়ে উপযুক্ত শরয়ী সমাধান পাওয়া যায়।

৪. দারুত তাসনীফ বা রচনা, সংকলন ও অনুবাদ বিভাগ

এই বিভাগের অন্যতম কাজ

ক. সমকালীন সমাজ ও দেশের চাহিদা মাফিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ-নিবন্ধ, পুস্তিকা ও নির্ভরযোগ্য বইপত্র রচনার মাধ্যমে দ্বীনের জরুরি ও মৌলিক বিষয় মুসলমানদের মাঝে সঠিক ও সহজভাবে তুলে ধরা।

খ. কুফর ও বাতিল শক্তি কর্তৃক ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের বিরুদ্ধে ছড়ানো বিষোদ্গার ও বিভ্রান্তির সময়োপযোগী ও যথাযথ প্রামাণ্য জবাব প্রদান করা।

সমাজে প্রচলিত ভিত্তিহীন জাল হাদীস, মনগড়া তাফসীর, লোকমুখে প্রসিদ্ধ উদ্ভট কিস্সা-কাহিনী ও ধ্যান-ধারণা দূর করা এই বিভাগের অন্যতম লক্ষ্য।

আলহামদু লিল্লাহ, ইতিমধ্যে নির্ভরযোগ্য বেশ কিছু বইপত্র এখান থেকে প্রকাশিত হয়ে জনসাধারণের উপকারে এসেছে।

৫. দারুল ইফতা বা ফতোয়া বিভাগ

এখানে নির্ভরযোগ্য মুফতীগণ ইসলাম সংক্রান্ত যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব দিয়ে থাকেন। লিখিত ফতোয়ার পাশাপাশি দারুল ইফতায় এসে মৌখিকভাবেও মাসআলা জানা যায়।

আলোচনা পর্ব

তিনটি বিষয়কে শক্তভাবে ‘না’ বলুন

মজলিসে আলোচনা শুরু করেন তালীমুদ্দীন একাডেমির ধানমন্ডি শাখার শিক্ষক মাওলানা আব্দুল হাসিব সাহেব। বিষয় ছিল– ‘কলেজ লাইফে দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার উপায়’।

তিনি বলেন, পরীক্ষা পরবর্তী এই অবসর সময় এবং আসন্ন কলেজ জীবন আপনার ঈমান ও চরিত্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি কয়েকটি জরুরি পয়েন্ট তুলে ধরেন

ক. পরিকল্পিত বিরতি : কলেজ শুরুর আগের এই দুই মাস স্মার্টফোন বা গেমে বুঁদ না হয়ে কুরআন কারীম শেখা ও নির্ভরযোগ্য দ্বীনী বই পড়ায় উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করুন।

খ. বড়দের মান্যতা : ‘বড় হয়ে গেছি’ ভেবে মুরব্বীদের শাসন থেকে বেপরোয়া হওয়া যাবে না। বড়দের দুআ ও তত্ত্বাবধানই আপনার রক্ষাকবচ।

গ. তিনটি ‘না’ : হারাম রিলেশন, মাদক ও সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাডিকশনএই তিনটিকে শক্তভাবে ‘না’ বলতে হবে।

তিনি দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার কয়েকটি উপায় আলোচনা করেন

এক. পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে জামাতের সাথে পড়া।

দুই. নিয়মিত কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত এবং সকাল-সন্ধ্যার দুআ-যিকির আদায় করা।

তিন. কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের সাথে সম্পর্ক রাখা। তাঁর তত্ত্বাবধানে নিয়মিত দ্বীনী বইপত্র পড়া।

চার. দ্বীনী পরিবেশে সময় কাটানো এবং এই ধরনের দ্বীনী আয়োজনে শরীক হওয়া।

পাঁচ. দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে সর্বদা দুআ করা।

আসল লক্ষ্য স্রষ্টা ও সৃষ্টির কাছে ভালো হওয়া

দ্বিতীয় আলোচনা করেন মারকাযের দারুত তাসনীফের সদস্য মাওলানা আবরারুযযামান সাহেব। বিষয় ছিল– ‘ফরয ইলমের গুরুত্ব এবং দ্বীনী জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম’।

তিনি বলেন, জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘আমি কী হব’ নয়, বরং ‘আমি কেমন মানুষ হব’। আসল লক্ষ্য স্রষ্টা ও সৃষ্টির কাছে ভালো মানুষ হওয়া।

একজন আদর্শ মানুষ হওয়ার মূল ফর্মুলা হল, স্রষ্টা ও সৃষ্টির হক সম্পর্কে জানা ও তা মেনে চলা। এই প্রয়োজনীয় জ্ঞানকেই ‘ফরয ইলম’ বলা হয়।

ফরয ইলম অনেক বিস্তৃত। আকীদা-বিশ্বাস, আমল ও ইবাদত, হৃদয় ও অন্তঃকরণের শুদ্ধির পাশাপাশি আচরণ, লেনদেনসহ জীবনের সকল অঙ্গনে আমার অবস্থা ও অবস্থান কেমন হওয়া উচিতএ বিষয়ক ইসলামের নির্দেশনাগুলোর আবশ্যক পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করা সবার ওপর ফরয।

আমাদের জন্য ফরয ইলম অর্জনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও স্বভাবসিদ্ধ মাধ্যম ও উৎস হলেন আহলে হক উলামায়ে কেরাম।

স্মার্টফোন আমাদের মনোযোগ ও একাগ্রতা নষ্ট করে দিচ্ছে

এরপর মারকাযের তাহাফফুযে আকীদায়ে খতমে নবুওত বিভাগের উস্তায মাওলানা হুসাইন আহমাদ সাহেব আলোচনা করেন। বিষয় ছিল– ‘স্মার্টফোন : ব্যবহার ও অপব্যবহার’।

তিনি বলেন, স্মার্টফোনের অধিক ব্যবহারের ফলে আমাদের মনোযোগ ও একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। কারণ একেকটি অ্যাপের নানা ফিচার ব্যবহার করে তাদের মস্তিষ্ক প্রতি সেকেন্ডে নতুন নতুন আনন্দ পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ফলে তারা দীর্ঘক্ষণ কোনো একটি বিষয়ে গভীর মনোযোগ দিতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো অ্যাপগুলো ডিজাইন করেছেন নিউরো সাইন্টিস্টরা। তারা মানুষের মস্তিষ্কের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অ্যাপগুলো এমনভাবে তৈরি করেছেন, যেন মানুষ একবার ঢুকলে বের হতে না চায়।

ধরুন, পড়ার সময় একজন ছাত্রের ফোনে বারবার নোটিফিকেশন আসে, সে নোটিফিকেশন চেক করার জন্য ফোন হাতে নেয়। প্রসিদ্ধ একটি গবেষণা অনুযায়ী পরবর্তীতে তার ডিপ ফোকাস বা গভীর মনোযোগ ফিরে পেতে প্রায় ২৩ মিনিট সময় লাগে।

এই সমস্যা থেকে বাঁচতে তিনি স্মার্টফোনবিহীন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চেষ্টা করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, শুরুতে তিন-চার দিন নিজেকে খুব একা বা মরুভূমিতে থাকার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

শিক্ষাঙ্গন, কর্মস্থল এবং পাবলিক প্লেসে মুসলিম পরিচয় বজায় রাখুন

প্রথম অধিবেশনের শেষ আলোচনা করেন মারকাযের দাওয়াহ বিভাগের উস্তায মাওলানা মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর সাহেব। বিষয় ছিল– ‘মুসলিম শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার চিন্তা’। তিনি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করেন

ক. নিআমতের শুকরিয়া আদায় : ক্যারিয়ারের মূল লক্ষ্য হবে আল্লাহ্‌র দেওয়া মেধা ও নিআমতকে তাঁর বিধান অনুযায়ী ব্যবহার করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

খ. ইসলামের জীবনমুখী প্র‍্যাকটিস : কেবল মসজিদে নয়; বরং শিক্ষাঙ্গন, কর্মস্থল, পাবলিক প্লেস সবখানে একজন মুসলিম হিসেবে নিজের পরিচয় ও আদর্শ বজায় রাখতে হবে।

গ. মানবসেবা : মানুষের পার্থিব কষ্ট দূর করা ও অন্যের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত রাখাকে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বানানো, যাতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌র সাহায্য পাওয়া যায়।

যে ব্যক্তি আখেরাতকে জীবনের মূল লক্ষ্য বানায়, আল্লাহ তার জীবনটা গুছিয়ে দেন

যোহরের পরের অধিবেশনের শুরুতে সঞ্চালক মাওলানা ওয়ালিউল্লাহ সাহেব বলেন, নিজ স্রষ্টা, দ্বীন ও আখেরাতকে ভুলে দুনিয়াকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য স্থির করা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। তিনি এই প্রসঙ্গে একটি হাদীস শরীফ শোনান

مَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّه، فَرَّقَ اللهُ عَلَيْهِ أَمْرَه، وَجَعَلَ فَقْرَه بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَلَمْ يَأْتِه مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا كُتِبَ لَه.

وَمَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ نِيَّتَه، جَمَعَ اللهُ لَه أَمْرَه، وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِه، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ.

অর্থাৎ যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়া নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তার জীবন অগোছালো হয়ে যায়। সে সব সময় মনে করেতার আরও কিছু দরকার, অনেক কিছু তার কম আছে। অথচ সে দুনিয়া থেকে তার জন্য তাকদীরে লেখা অংশের বেশি কিছু পাবে না।

আর যে ব্যক্তি আখেরাতকে জীবনের মূল লক্ষ্য বানায়, আল্লাহ তার জীবনকে গুছিয়ে দেন, তার হৃদয়কে সন্তুষ্ট ও প্রশান্ত করে দেন এবং দুনিয়ার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোও তার কাছে সহজ হয়ে আসে। সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪১০৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২১৫৯০; সুনানে দারিমী, হাদীস ২২৯; আততারগীব ওয়াত তারহীব, মুনযিরী ৪/৫৬; মিসবাহুয যুজাজাহ, বূসীরী ৪/২১২

বন্ধুত্বের সার্থকতা পারস্পরিক কল্যাণে

যোহরের পর প্রথম আলোচনা করেন মারকাযুদ দাওয়াহর রঈস (পরিচালক) মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম।

তিনি বলেন, আমাদের জীবনে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয়। এই সামাজিক যোগাযোগ তখনই সফল হবে, যখন আমরা একে অন্যের ভালো গুণগুলো গ্রহণ করতে পারব।

বন্ধুত্বের সার্থকতা হল পারস্পরিক কল্যাণে। যদি কোনো বন্ধুর কারণে আমরা খারাপ কাজে লিপ্ত হই, তবে সেই বন্ধুত্ব আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেটিই আসল বন্ধুত্ব, যা পারস্পরিক কল্যাণের মাধ্যম হয়।

উভয়শ্রেণির দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে

তিনি সাধারণ শিক্ষিত ও আলেম-উলামার মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার প্রসঙ্গে  বলেনঅতীতে মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থায় জাগতিক ও দ্বীনী শিক্ষার কোনো বিভাজন ছিল না; মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল মুসলিম শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় জাগতিক জ্ঞান এবং ফরযে আইন (আবশ্যক পরিমাণ) ইলম একইসাথে অর্জন করত।

ইংরেজ ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের সময় মুসলমানদের ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও পাল্টে দেওয়া হয়, যার ফলে শিক্ষা জাগতিক ও ধর্মীয়—এই দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।

জাগতিক শিক্ষায় দ্বীনকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে মুসলমানদের অস্তিত্ব ও ঈমান বড় সংকটে পড়ে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে অন্তত কালিমা, নামায ও ইসলামের মৌলিক পরিচয়টুকু ভুলে না যায়, সেই আশঙ্কা থেকেই তৎকালীন দূরদর্শী আলেমগণ কেবল দ্বীনী জ্ঞানচর্চার জন্য স্বতন্ত্র মাদরাসা গড়ে তোলেন; যেখানে দীর্ঘ সময় জাগতিক শিক্ষার সমন্বয় ছিল না।

বর্তমানের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামের মৌলিক ও জরুরি অংশও পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয়, ফলে সাধারণ শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের বোধ গড়ে উঠছে না এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দুর্নীতি বাড়ছেই।

দ্বীনী মাদরাসাগুলোতে এখন প্রাথমিক পর্যায়ে জাগতিক শিক্ষারও ব্যবস্থা আছে। কিন্তু জাগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামের উপস্থিতি খুবই সীমিত। বরং বিভিন্ন সময়েই পাঠ্যবইয়ের ধর্মবিরোধী বা ধর্মবিদ্বেষী কথাবার্তা নিয়ে সমালোচনা ও পর্যালোচনা হয়।

তো শিক্ষাব্যবস্থার এই বিভাজনের কারণে রাষ্ট্র আদর্শ মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা দক্ষ প্রশাসক পাচ্ছে না। সাধারণ শিক্ষিতরা দ্বীনী জ্ঞানের অভাবে নৈতিকভাবে দুর্বল হচ্ছে।

আলেম ও সাধারণ শিক্ষিত—উভয় শ্রেণিরই একে অপরের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ও অর্জনের সুযোগ রয়েছে। উভয় শ্রেণির মাঝে দূরত্ব থাকার ফলে প্রয়োজনীয় দ্বীনী মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানের সঠিক সমন্বয় ঘটছে না। তাই উভয় শ্রেণির দূরত্ব কমিয়ে আনার বিকল্প নেই।

অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করার দক্ষতা অর্জন করা চাই

এরপর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী জনাব শামসুল আরিফীন সাহেব আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, এসএসসি সার্টিফিকেট উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের প্রাথমিক যোগ্যতা তৈরি করে মাত্র। বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে হলে সারা জীবন শেখার ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। বর্তমান যুগে কেবল মুখস্থ করে ভালো রেজাল্ট করলে সফল হওয়া যায় না; বরং যে-কোনো বিষয় গভীরভাবে বুঝতে হবে এবং সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা সাধারণত রিযিক বা উপকরণের পেছনে ছুটি, কিন্তু ভুলে যাই সেই সত্তাকে, যিনি রিযিক দান করেন। উপকরণের চেয়ে উপকরণের মালিক তথা আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্ক গভীর করাই আসল সফলতা।

প্রশ্নোত্তর পর্ব

প্রশ্নোত্তর পর্বে মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম তরুণদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

সহশিক্ষা ও দৃষ্টির হেফাযত : সহশিক্ষার কঠিন পরিবেশে ঈমান রক্ষা করা অনেক বড় মুজাহাদার কাজ। এক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব হল, নিজের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিনা প্রয়োজনে বিপরীত লিঙ্গের সাথে কথা বলা বা অযথা মেলামেশা থেকে বিরত থাকতে হবে। মোবাইলে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং অবচেতনভাবে কোনো ভুল হয়ে গেলে সাথে সাথে আল্লাহ্‌র কাছে তওবা করতে হবে।

ক্যারিয়ার গঠন ও দুর্নীতিমুক্ত জীবন : ভবিষ্যতে ক্যারিয়ার গড়ার সময় নিয়ত হতে হবে মানবসেবা। প্রকৌশলী, ডাক্তার বা ব্যবসায়ী যে পেশায়ই কেউ যাক না কেন, তাকে শুরু থেকেই এই প্রতিজ্ঞা করতে হবেসে ঘুস খাবে না, দুর্নীতির আশ্রয় নেবে না, অন্যায় অনিয়ম করবে না। এই শুভ সংকল্প ছাত্রাবস্থা থেকেই সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য হবে।

যদি কেউ মানুষের সেবার নিয়ত করে এবং সততার সাথে দায়িত্ব পালন করে, তবে তার এই পেশাগত কাজও নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে এবং সে সওয়াব পেতে থাকবে।

গুনাহ বারবার হয়ে গেলেও হাল ছাড়া যাবে না : কোনো গুনাহ বারবার হয়ে গেলেও হাল ছাড়া যাবে না। তওবা অব্যাহত রাখতে হবে। আর যদি মনের ভেতর আল্লাহ বা রাসূল সম্পর্কে ওয়াসওয়াসা বা খারাপ চিন্তা আসে, তবে বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। এটি শয়তানের কাজ। এমতাবস্থায় ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়ে আল্লাহ্‌র আশ্রয় চাইতে হবে এবং কোনো আলেমের সাথে পরামর্শ করতে হবে।

মাদকাসক্তি থেকে সাবধান : ইসলাম মাদককে সকল অপরাধের মূল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য মাদকই যথেষ্ট। তাই মাদকাসক্ত বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করা এবং সর্বদা সচেতন থাকা প্রত্যেক তরুণের দায়িত্ব।

খেলাধুলা নিয়ে মেতে থাকা এবং অযথা সময় অপচয় : ফুটবল বা ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা হল সময় নষ্টকারী বিনোদন। বিশেষ করে ভিনদেশি দলের জন্য মাতামাতি করা, অন্যের পতাকা উড়ানো অহেতুক কাজ। আর খেলার নেশায় নামায বা পড়াশোনায় অবহেলা করা গুনাহের কাজ। এসব অনর্থক কাজ থেকে বেঁচে থাকাই ঈমানের দাবি।

জাগতিক শিক্ষা কীভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করা যায়, তা আলেমদের কাছ থেকে জেনে নিন

সর্বশেষ আলোচনা করেন মারকাযের আমীনুত তালীম (শিক্ষা বিভাগীয় প্রধান) ও বায়তুল মোকাররমের খতীব মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম।

তিনি বলেন, আমাদের জাগতিক শিক্ষা (স্কুল-কলেজের পড়াশোনা) কেবল দুনিয়ার জন্য হওয়া উচিত নয়; বরং এটিও আল্লাহকে রাজি করার জন্য এবং পরকালের পাথেয় হিসেবে হওয়া প্রয়োজন। এই জ্ঞান কীভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করা যায়, তা আলেমদের কাছ থেকে জেনে নিন।

ঈমান বিনষ্টকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকুন

বর্তমান সময়ের নানা ফেতনার বিষয়ে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেন, ঈমান হেফাযত করতে হলে ইসলামের দাবিদার কিন্তু আসলে ইসলামের গণ্ডিভুক্ত নয়এমন সব ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকুন।

কাদিয়ানী সম্প্রদায় কাদিয়ানী ধর্ম গ্রহণ করে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে

বিশেষ করে কাদিয়ানী সম্প্রদায় সম্পর্কে তিনি বলেন, কাদীয়ানীরা নিজেদের ‘আহ্মদীয়া মুসলিম জামাত’ বলে পরিচয় দিলেও আসলে তারা অমুসলিম। তাদের উপাসনালয়কে ‘মসজিদ’ বলা যাবে না; যেমন হিন্দুদের মন্দির এবং খ্রিস্টানদের গির্জাকে মসজিদ বলা যায় না।

কাদিয়ানীরা নিজেদের উপাসনালয়ে কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ লিখে রাখে এবং তাদের বইপত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এটি মারাত্মক প্রতারণা ও চরম ধোঁকাবাজি।

কারণ এটা ইসলামের কালেমা, মুসলমানদের কালেমা। কাদিয়ানী সম্প্রদায় তো কাদিয়ানী ধর্ম গ্রহণ করে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে। কাদিয়ানীরা নবুওতের মিথ্যা দাবিদার মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ওপর ঈমান আনার মাধ্যমে ইসলাম ছেড়ে ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করেছে। কাদিয়ানীদের দৃষ্টিতে মুমিন হওয়ার জন্য এবং আখেরাতে নাজাত পাওয়ার জন্য মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ওপর ঈমান আনা ও তার অনুসরণ করা জরুরি। এজন্য তারা নিজেদের দলের লোক ছাড়া দুনিয়ার সকল মুসলমানকে কাফের মনে করে।

তো কাদিয়ানী সম্প্রদায় ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি ধর্মের অনুসারী। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের কালেমা ব্যবহার করা চরম প্রতারণা।

তাছাড়া তারা তো কালেমায়ে তায়্যিবাহ্‌র অর্থ ও মর্মের বিকৃতি ঘটিয়েও কালেমাকে জঘন্যভাবে অস্বীকার করেছে। ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ দ্বারা তাদের কাছে তাদের গুরু মির্জা কাদিয়ানী উদ্দেশ্য।

এর পরও কাদিয়ানীদের এই কালেমা ব্যবহার করাইসলাম ও মুসলমানদের সাথে গাদ্দারী, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরম অবমাননাকালেমায়ে তায়্যিবাহ্‌র চরম অবমাননা।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কাদিয়ানীরা ধোঁকা দিয়ে বলবে, মির্জা গোলাম আহমদ হল মাসীহ। কখনও বলবে, সে মুজাদ্দিদ। বিশেষ করে বলবে, সে মাহদী। আসলে তারা গোলাম আহমদকে নবী বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু নবুওতের মিথ্যা দাবিদার এই ব্যক্তিকে তারা যে নবী হিসেবে গ্রহণ করেছে, তা তোমার সামনে প্রকাশ করবে না।

মনে রাখতে হবে, নবুওতের মিথ্যা দাবিদার নিঃসন্দেহে অমুসলিম। কেউ নবুওতের মিথ্যা দাবিদারকে মাহদী, মাসীহ বা মুজাদ্দিদ মনে করলেও নিশ্চিত ঈমানহারা হবে।

হাদীস অস্বীকারকারী গোষ্ঠী

তিনি আরও বলেন, ইসলামের গণ্ডিভুক্ত নয়, এমন আরেকটি গোষ্ঠী হল হাদীস অস্বীকারকারী, রাসূল অবমাননাকারী এবং কুরআন কারীম ও ইসলামী শরীয়ত অবমাননাকারী গোষ্ঠী– ‘আহলে কুরআন’। এদের থেকেও দূরে থাকতে হবে। কারণ হাদীস অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে এরা মূলত কুরআন, রাসূল ও শরীয়তকেই অস্বীকার করে।

তিনি শিক্ষার্থীদের আরও কিছু কুফরী মতবাদের ব্যাপারে সতর্ক করেন; যে মতবাদগুলোর প্রচারকরা নিজেদের কুফরকে ‘ইসলাম’ বলে প্রচার করে জনসাধারণকে বিপথগামী করে যাচ্ছে

ক. হেযবুত তওহীদ : হেযবুত তওহীদের বিশ্বাস ইসলামের অকাট্য বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা সব ধর্মকেই সত্য মনে করে; অথচ ইসলামের অকাট্য ও শাশ্বত আকীদা হলআল্লাহ্‌র কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলাম। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম আল্লাহ্‌র কাছে গৃহীত নয়। আখেরাতে মুক্তির একমাত্র উপায় ইসলাম। সর্বশেষ নবীর আগমনের পর এবং তাঁর শরীয়ত প্রচার হয়ে যাওয়ার পর ইহুদী ধর্ম, খ্রিস্টধর্মসহ সব ধর্মই রহিত হয়ে গেছে।

হেযবুত তওহীদের লোকেরা নিজেদের দলের লোক ছাড়া পৃথিবীর সকল মুসলমানকে কাফের ও মুশরিক মনে করে। মুসলমানদেরকে তারা ‘অভিশপ্ত’ ও ‘লানতপ্রাপ্ত’ বলে গালাগাল করে।

তারা রাসূলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ ও সুন্নাহকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। আর যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাসূলের সুন্নাহকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করে, তারা মুসলমান নয়। 

খ. কোয়ান্টাম মেথড : এ ধরনের আরও মেথড আছে, যারা বাহ্যিকভাবে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কথা বলে। কিন্তু সেবার আড়ালে মানুষের ঈমান নষ্ট করে।

কোয়ান্টাম মেথড আসলে একটি কুফরী প্রতিষ্ঠান, যার মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার মধ্যে অনেক কুফর ও গোমরাহী বিদ্যমান। কোয়ান্টামের লোকেরাও হেযবুত তওহীদের মতো সব ধর্মকে সত্য মনে করার কুফুরী বিশ্বাস রাখে। এসব কুফরী বিশ্বাস ও গোমরাহীপূর্ণ ধ্যান-ধারণা তারা তাদের কথাবার্তা, কাজকর্ম ও লেখালেখিতে প্রচার করে থাকে।

তাই একজন মুমিন-মুসলিমের জন্য কোয়ান্টাম ও এ ধরনের কুফরী চিন্তা-চেতনা লালনকারী প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ত হওয়া এবং তাদের প্রোগ্রাম ও অনুষ্ঠানে যোগদান করা কিছুতেই জায়েয নয়।

গ. মাজার ও ভণ্ড পীর : মাইজভান্ডার, আটরশি, দেওয়ানবাগী, চন্দ্রপাড়া, এনায়েতপুরীএরা চরম পর্যায়ের পথভ্রষ্ট। তিনি এই ধরনের সব আস্তানা থেকে দূরে থাকার জোর তাকীদ দেন, যারা বহু রকমের কুফরী বিশ্বাস ও শিরকী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত।

তিনি বলেন, যত ভণ্ড ও পথভ্রষ্ট পীরএদের সকলে দ্বীনের অপব্যাখ্যাকারী এবং মূলত ইসলামী শরীয়তের অস্বীকারকারী।

দ্বীন শেখার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট-নির্ভর হওয়া যাবে না

দ্বীন শেখার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া-ইন্টারনেট-নির্ভর হয়ে যাওয়ায় এখন বহু মানুষ ঈমান বিনষ্টকারী উপরিউক্ত গোষ্ঠীগুলোর ফাঁদে পা দিয়ে বসেন। এই প্রসঙ্গে সতর্ক করে তিনি বলেন, দ্বীন শেখার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া-ইন্টারনেট-নির্ভর হওয়া যাবে না। কারণ অনেক পথভ্রষ্ট বেঈমান লোকও দাড়ি-টুপি ও দ্বীনী লেবাস পরে অনলাইনে কুফরী মতবাদ ও বিশ্বাস ছড়ায়।

নির্ভরযোগ্য আহলে হক আলেমদের সংস্পর্শ ও পরামর্শে সঠিক, পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ দ্বীন শিখতে হবে। নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভেবে দ্বীনী বিষয়ে ইন্টারনেট-নির্ভর হলে নানা ধরনের কুফুরী ফেতনার শিকার হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

পরিশেষে তিনি সেক্যুলারিজম ও মডার্নিজমের কুফর ও গোমরাহী সম্পর্কে সচেতন হতে বলেন।

অনুষ্ঠান শেষে তিনি কুইজে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন এবং মজলিসে উপস্থিত সকলকে মাসিক আলকাউসার ও এর দুটি সাপ্লিমেন্ট ত্রৈমাসিক নারী ও ত্রৈমাসিক শিশুকিশোর হাদিয়া দেন।

দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহ্‌র জন্য দুআর মধ্য দিয়ে মজলিস শেষ হয়।

[প্রতিবেদনটি আলোচকগণ কর্তৃক সংযোজিত ও পরিমার্জিত

প্রস্তুতকরণ : মাওলানা আবু আনাস মুহাম্মাদ সালমান]

টীকা

১. সর্বসাধারণের উপযোগী নির্ভরযোগ্য দ্বীনী বইয়ের একটি তালিকা দেখুনÑ শিক্ষা পরামর্শ, মাসিক আলকাউসার, যিলকদ ১৪৩৭ মোতাবেক আগস্ট ২০১৬।

২. জরুরি ইলমের পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুনÑফরয ইলম শিক্ষা ও বিস্তার’, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, পৃ. ১৭-৫১, ২য় সংস্করণ, মারকাযুদ দাওয়াহ প্রকাশনী।

৩.  এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই দুটি প্রবন্ধ দেখুন

ক. ‘সাধারণ শিক্ষিত ও আলেম উলামা পরস্পর কাছাকাছি আসা উচিত’, মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ, মাসিক আলকাউসার, রজব ১৪৩৮ মোতাবেক এপ্রিল ২০১৭

খ. ‘উলামায়ে কেরাম ও আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে সেতুবন্ধন : চাই মধ্যপন্থী ভাবনার চর্চা’, মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম, মাসিক আলকাউসার, জুমাদাল আখিরাহ ১৪৩৬ মোতাবেক এপ্রিল ২০১৫।

৪.  সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক ধারা সম্পর্কে আরও জানতে এই আলোচনা দেখুন– ‘প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থা’, হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী, অনুবাদ : আশিক বিল্লাহ তানভীর, মাসিক আলকাউসার, শাবান-রমযান ১৪৪১ মোতাবেক এপ্রিল-মে ২০২০

৫.  কাদিয়ানীদের সম্পর্কে মূল উৎস থেকে বিস্তারিত উদ্ধৃতিসহ জানতে পড়ুন– ‘কাদিয়ানী সম্প্রদায় অমুসলিম হওয়ার কারণ’, মাওলানা মুহাম্মাদ সাজিদুল ইসলাম, মাসিক আলকাউসার, রবিউল আখির ১৪৪৬ মোতাবেক অক্টোবর ২০২৪।

৬.  এদের কুফরের ফিরিস্তি ও অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে আরও জানতে নিম্নোক্ত বইটি দেখুনÑ নব্য আহলে কুরআন (কুরআন অবমাননা, রাসূল অবমাননা, হাদীস অবমাননা, কুরআনের অর্থ বিকৃতি, ইসলামী শরীয়ত অস্বীকার), তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনা : মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, মারকাযুদ দাওয়াহ প্রকাশনী।

৭.  প্রাগুক্ত।

৮.  দেখুন– ‘ঈমান-আকীদা বিনষ্টকারী বিভিন্ন চিন্তা ও কথা : একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর’, মাহমুদ বিন ইমরান, মাসিক আলকাউসার, সফর ১৪৪৬ মোতাবেক আগস্ট ২০২৪।

৯.  এই ভ্রষ্ট পীরদের কুফরি বক্তব্য ও তার খণ্ডন দেখুনÑ তাসাওউফ তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ, পৃ. ২৫০-৩০৪, দ্বিতীয় প্রকাশ : ২০২৩, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, মারকাযুদ দাওয়াহ প্রকাশনী।

 

advertisement