Muharram 1448   ||   July 2026

হযরত হুসাইন রা.-এর দৃষ্টিতে মাতম
[শিয়াদের বর্ণনার আলোকে]

Mawlana Muhammad Abdur Rahman

হিজরী বছরের প্রথম মাস মুহাররম। এ মাসের দশম তারিখকে আশুরার দিন বলা হয়। ইতিহাসের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ দিনে ঘটেছে। বেদনাদায়ক কারবালার ঘটনাও এই দিনে ঘটেছে। ৬১ হিজরীর এই দিনে হযরত হুসাইন রা. পরিবার-পরিজন ও সাথি-সঙ্গীদের এক জামাতসহ কারবালার ময়দানে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাত বরণ করেন।

এই শাহাদাত বরণ তাঁর এবং তাঁর পরিবারবর্গের জন্য তো উচ্চ মর্যাদার বিষয়। তিনি ন্যায় ও সত্যের জন্য এমন তাৎপর্যপূর্ণ দিনে আল্লাহ্‌র পথে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আমাদের জন্য অবশ্য তা হয়ে গেছে পরীক্ষা ও মসিবতের বিষয়। আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্রকে হারালাম।

বিপদাপদের ক্ষেত্রে ইসলামের সুস্পষ্ট শিক্ষা ও নির্দেশনা রয়েছে। যার সারকথা হল, এ বিশ্বাস রাখা যে, বিপদ আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকেই আসে। অন্তরে এই দৃঢ় বিশ্বাস রেখে আল্লাহ্‌র ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ্‌র ফয়সালার ওপর অভিযোগ না তোলা। তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া। সবর করা। মাতম, হাত-পা আছড়ানো, বুক চাপড়ানো, চেহারা খামচানো, নিজের ধ্বংস ডাকা, মৃত্যুকামনা করাএজাতীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা।

শিয়া সম্প্রদায় হযরত হুসাইন রা.-এর শাহাদাত দিবসে তাযিয়া মিছিল করা, বুক চাপড়ানো, চেহারা খামচানোসহ শরীয়তে নিষিদ্ধ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে থাকে। অথচ এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ্‌র প্রকৃত শিক্ষা ও নির্দেশনা শিয়ারা যাদেরকে নিজেদের ইমাম মনে করে, খোদ তাঁদের বক্তব্যেও স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। যেমন আলী রা., হুসাইন রা., যাইনুল আবিদীন রাহ. প্রমুখ।  শিয়াদের নিকট নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলিতে তাদের সূত্রে বর্ণিত এ সম্পর্কিত অনেক হাদীসও রয়েছে এবং অনেক বড় বড় শিয়া ফকীহ ও মুফতীগণ হাত-পা আছড়ানো, বুক চাপড়ানো, চেহারা খামচানো, দুঃখ ও ধ্বংস ডাকাকে না-জায়েয বলে ফতোয়াও দিয়েছেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যার শাহাদাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ সম্প্রদায়টি আশুরার দিন মাতম-তাযিয়ার কুসংস্কার আবিষ্কার করেছে, সেই হযরত হুসাইন রা.-ও এজাতীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিষেধ করেছেন, যা খোদ শিয়াদের নিকট নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলিতেই বিদ্যমান।

এখানে আমরা এ সংক্রান্ত দুটি বর্ণনা উল্লেখ করছি

এক.

শিয়া পণ্ডিত জাফর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে কুলাওয়াই আলকুম্মী (৩৬৮ হি.)-এর কামিলুয যিয়ারাত গ্রন্থে এসেছে

عن محمد بن علي قال: لما هم الحسين بالشخوص من المدينة أقبلت نساء بني عبد المطلب، فاجتمعن للنياحة، حتى مشى فيهن الحسين فقال: أنشدكن الله أن تبدين هذا الأمر معصية لله ولرسوله.

فقالت له نساء بني عبد المطلب: فلمن نستبقي النياحة والبكاء؟

মুহাম্মাদ ইবনে আলী (আবু জাফর বাকির, শিয়ারা যাকে নিজেদের ৫ম ইমাম মনে করে) থেকে বর্ণিত, ‘হুসাইন রা. যখন মদীনা থেকে চলে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করলেন, তখন বনী আবদুল মুত্তালিবের মহিলারা বিলাপের জন্য জড়ো হল। হুসাইন রা. তাদের কাছে গিয়ে বললেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহ্‌র কসম দিয়ে বলছি, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করে এ কাজ করো না।

বনী আবদুল মুত্তালিবের মহিলারা বলল, তাহলে আমরা আর কার জন্য বিলাপ-আহাজারি করব! কামিলুয যিয়ারাত, শিয়া পণ্ডিত জাফর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে কুলাওয়াই আলকুম্মী, পৃ. ১৯৫

আরও দ্রষ্টব্য : জামিউ আহাদীসিশ শিয়া, শিয়া পণ্ডিত হুসাইন আলবুরুজিরদীর তত্ত্বাবধানে রচিত ৩/৬৩৩

এটা সম্ভবত ওই সময়ের কথা, যখন ইয়াযীদের পক্ষ থেকে নিযুক্ত মদীনার গভর্নরের কাছে বাইআত হওয়ার জন্য হুসাইন রা.-কে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তিনি পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে মদীনা ছেড়ে মক্কা মুকাররমা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন বনী আবদুল মুত্তালিবের কিছু মহিলা বিলাপ করার জন্য জড়ো হয়।

ওপরের বর্ণনাটিতে আমরা দেখলাম, হুসাইন রা. তাদেরকে আল্লাহ্‌র কসম দিয়ে তা থেকে নিষেধ করেছেন। তাঁর নিষেধের ভাষা থেকে স্পষ্ট যে, বিলাপ করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অসন্তুষ্ট হন।

 

দুই.

হুসাইন রা.-এর শাহাদাতের আগের দিন সন্ধ্যাবেলার কথা। হুসাইন রা. শত্রু বাহিনী থেকে এক দিনের সময় নিলেন। রাতটি নিবিড় ইবাদত-বন্দেগী ও দুআ-মুনাজাতে কাটানোর জন্য।

সার্বিক পরিস্থিতি দেখে তাঁর বোন যায়নাব বিনতে আলী অনুমান করেন, আগামীকাল তার ভাই হয়তো শহীদ হয়ে যাবেন। তাই তিনি কান্নাকাটি শুরু করেন। তখন হুসাইন রা. তাকে গুরুত্বপূর্ণ নসীহত করেছেন।

নসীহতটি তাঁর পুত্র যাইনুল আবিদীন রাহ. (শিয়ারা যাকে নিজেদের ৪র্থ ইমাম মনে করে) বর্ণনা করেছেন। ইয়াকুবী, মুফীদ, তবরাসী, মাজলিসী, আব্বাস আলকুম্মীসহ অনেক বড় বড় শিয়া পণ্ডিত নিজেদের কিতাবে এটি উল্লেখ করেছেন।

সেই বর্ণনায় যাইনুল আবিদীন রাহ. বলেন

إِنِّي لَجَالِسٌ فِي تِلْكَ الْعَشِيَّةِ الَّتِي قُتِلَ أَبِي فِي صَبِيحَتِهَا، وَعِنْدِي عَمَّتِي زَيْنَبُ تُمَرِّضُنِي، إِذِ اعْتَزَلَ أَبِي فِي خِبَاءٍ لَهُ، وَعِنْدَهُ جَوْنٌ مَوْلَى أَبِي ذَرٍّ الْغِفَارِيِّ، وَهُوَ يُعَالِجُ سَيْفَهُ وَيُصْلِحُهُ، وَأَبِي يَقُولُ...

فَأَعَادَهَا مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا حَتَّى فَهِمْتُهَا وَعَرَفْتُ مَا أَرَادَ، فَخَنَقَتْنِي الْعَبْرَةُ فَرَدَدْتُهَا وَلَزِمْتُ السُّكُوتَ، وَعَلِمْتُ أَنَّ الْبَلَاءَ قَدْ نَزَلَ، وَأَمَّا عَمَّتِي فَإِنَّهَا سَمِعَتْ مَا سَمِعْتُ، وَهِيَ امْرَأَةٌ، وَمِنْ شَأْنِ النِّسَاءِ الرِّقَّةُ وَالْجَزَعُ، فَلَمْ تَمْلِكْ نَفْسَهَا أَنْ وَثَبَتْ تَجُرُّ ثَوْبَهَا، وَإِنَّهَا لَحَاسِرَةٌ، حَتَّى انْتَهَتْ إِلَيْهِ، فَقَالَتْ: وَاثَكْلَاهْ! لَيْتَ الْمَوْتَ أَعْدَمَنِي الْحَيَاةَ الْيَوْمَ، مَاتَتْ أُمِّي فَاطِمَةُ وَأَبِي عَلِيٌّ وَأَخِي الْحَسَنُ، يَا خَلِيفَةَ الْمَاضِي وَثُمَالَ الْبَاقِي.

فَنَظَرَ إِلَيْهَا الْحُسَيْنُ فَقَالَ لَهَا: يَا أُخَيَّةُ، لَا يَذْهَبَنَّ حِلْمُكِ الشَّيْطَانُ، وَتَرَقْرَقَتْ عَيْنَاهُ بِالدُّمُوعِ، وَقَالَ: لَوْ تُرِكَ الْقَطَا لَنَامَ.

فَقَالَتْ: يَا وَيْلَتَاهُ! أَفَتَغْتَصِبُ نَفْسَكَ اغْتِصَابًا؟! فَذَاكَ أَقْرَحُ لِقَلْبِي وَأَشَدُّ عَلَى نَفْسِي، ثُمَّ لَطَمَتْ وَجْهَهَا، وَهَوَتْ إِلَى جَيْبِهَا فَشَقَّتْهُ، وَخَرَّتْ مُغْشِيًّا عَلَيْهَا.

فَقَامَ إِلَيْهَا الْحُسَيْنُ، فَصَبَّ عَلَى وَجْهِهَا الْمَاءَ، وَقَالَ لَهَا: يَا أُخْتَاهُ! اتَّقِي اللهَ، وَتَعَزَّيْ بِعَزَاءِ اللهِ، وَاعْلَمِي أَنَّ أَهْلَ الْأَرْضِ يَمُوتُونَ، وَأَهْلَ السَّمَاءِ لَا يَبْقَوْنَ، وَأَنَّ كُلَّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَ اللهِ، الَّذِي خَلَقَ الْخَلْقَ بِقُدْرَتِهِ، وَيَبْعَثُ الْخَلْقَ وَيَعُودُونَ، وَهُوَ فَرْدٌ وَحْدَهُ، أَبِي خَيْرٌ مِنِّي، وَأُمِّي خَيْرٌ مِنِّي، وَأَخِي خَيْرٌ مِنِّي، وَلِي وَلِكُلِّ مُسْلِمٍ بِرَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ.

فَعَزَّاهَا بِهَذَا وَنَحْوِهِ، وَقَالَ لَهَا: يَا أُخَيَّةُ! إِنِّي أَقْسَمْتُ فَأَبْرِي قَسَمِي، لَا تَشُقِّي عَلَيَّ جَيْبًا، وَلَا تَخْمِشِي عَلَيَّ وَجْهًا، وَلَا تَدْعِي عَلَيَّ بِالْوَيْلِ وَالثُّبُورِ، إِذَا أَنَا هَلَكْتُ.

আমার পিতা যে দিন শহীদ হয়েছেন, তার আগের দিন সন্ধ্যায় আমি বসা ছিলাম। আমি অসুস্থ হওয়ায় ফুফু যায়নাব বিনতে আলী আমার সেবা করছিলেন। হঠাৎ আমার পিতা নিজের তাঁবুতে চলে গেলেন। তাঁর কাছে ছিল জুআইন। সে তরবারি মেরামত করছিল আর আমার পিতা কবিতা আবৃত্তি করছিলেন...।

কবিতাটি তিনি দুই-তিনবার আবৃত্তি করেছেন। আমি কবিতাটির মর্ম এবং আমার পিতার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছি। তখন আমার দম বন্ধ হয়ে এল। আমি বুঝে ফেললাম, বিপদ সন্নিকটে।

আমার ফুফুও কবিতাগুলো শুনেছেন। নারীরা কোমল ও আবেগপ্রবণ হয়। ফুফু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। তিনি অস্থির হয়ে কাপড় মাটিতে হেঁচড়ে আমার পিতার কাছে গিয়ে বললেন, হায়! যদি আমার মৃত্যু হয়ে যেত! আমার মা ফাতেমা, পিতা আলী, ভাই হাসান দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। এখন আপনিই অতীতদের জানেশীন এবং বর্তমানদের রাহবার।

হুসাইন রা. তার দিকে তাকিয়ে বললেন, প্রিয় বোন! শয়তান যেন তোমার হিলম (সহনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা) ছিনিয়ে না নেয়।

এ কথা বলার সময় তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরল। তিনি আরও বললেন, শিকারি যদি ‘কাতা’কে (এক প্রকার পাখি) ছেড়ে দেয়, তাহলে সে আরামে ঘুমায়।

ফুফু বললেন, হায়! আপনাকে কি শেষ করে ফেলা হবে? এ তো আমার জন্য ভীষণ পীড়াদায়ক হবে।

এ কথা বলে তিনি নিজের চেহারায় থাপ্পড় মারলেন। কাপড় ছিঁড়ে ফেললেন এবং বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন।

হুসাইন রা. কাছে গিয়ে তার মুখে পানি ছিটালেন এবং বললেন, হে আমার বোন, তুমি আল্লাহকে ভয় কর। তাঁর বিধান অনুযায়ী সান্ত্বনা গ্রহণ কর। জেনে রাখ, জমিনবাসী সবাই মৃত্যুবরণ করবে। আসমানবাসীও অবশিষ্ট থাকবে না। সব ধ্বংস হয়ে যাবে। একমাত্র আল্লাহ বাকি থাকবেন, যিনি নিজ কুদরতে মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আবার জীবিত করবেন। আমার পিতা আমার থেকে শ্রেষ্ঠ। আমার মা আমার থেকে শ্রেষ্ঠ। আমার ভাইও আমার থেকে শ্রেষ্ঠ। আমার জন্য ও সকল মুসলমানের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদর্শ।

এভাবে তিনি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, হে আমার বোন, আমি তোমাকে শপথ দিয়ে বলছি, তুমি আমার শপথ পূরণ করবে। আমি মৃত্যুবরণ করলে তুমি আমার জন্য কাপড় ছিঁড়বে না। চেহারা চাপড়াবে না। দুঃখ ও ধ্বংস ডাকবে না। (দ্র. আলইরশাদ, শিয়া পণ্ডিত মুফীদ ২/৯৩-৯৪; ই‘লামুল ওয়ারা বি আ‘লামিল হুদা, শিয়া পণ্ডিত ফযল ইবনে হাসান তবরাসী ১/৪৫৬-৪৫৭; বিহারুল আনওয়ার, শিয়া পণ্ডিত বাকির মাজলিসী ৪৫/২; মুনতাহাল আমাল, শিয়া পণ্ডিত আব্বাস আলকুম্মী ১/৪৮০-৮১; হায়াতুল ইমাম হুসাইন, শিয়া গবেষক বাকির শরীফ ৩/১৭৮-১৭৯; তারিখুল ইয়াকুবী ২/২১৬-১৭)

ওপরের বর্ণনায় হুসাইন রা.-এর বক্তব্য থেকে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়

ক. যে-কোনো বিপদে সকলের জন্য করণীয় হল, আল্লাহ্‌র ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। ধৈর্যধারণ করা এবং শান্ত থাকার চেষ্টা করা।

খ. বিপদের কারণে অস্থির হয়ে হা-হুতাশ করা, কাপড় ছিঁড়ে ফেলা, চেহারা চাপড়ানো, নিজের জন্য দুঃখ-ধ্বংস ডাকা, মৃত্যুকামনা করা শয়তানী কর্মকাণ্ড।

পাঠক লক্ষ করেছেন, হুসাইন রা.-এর বোন যখন হা-হুতাশ ও মৃত্যুকামনা করছিল, তখন হুসাইন রা. বলেছেন

يا أخية! لا يذهبن حلمك الشيطان.

হে বোন! শয়তান যেন তোমার হিলম (সহনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা) ছিনিয়ে না নেয়।

গ. এ কাজগুলো এত ভয়াবহ এবং তা আল্লাহ তাআলার এত বেশি অপছন্দনীয় যে, হুসাইন রা. তাঁর মৃত্যুর পরে তা থেকে বিরত থাকার জন্য বোনকে কসম দিয়ে বলেছেন

يا أخية! إني أقسمت فأبري قسمي، لا تشقي علي جيبا، ولا تخمشي علي وجها، ولا تدعي علي بالويل والثبور، إذا أنا هلكت.

হে আমার বোন, আমি তোমাকে শপথ দিয়ে বলছি, তুমি আমার শপথ পূরণ করবে। আমি মৃত্যুবরণ করলে তুমি আমার জন্য কাপড় ছিঁড়বে না। চেহারা চাপড়াবে না। দুঃখ ও ধ্বংস ডাকবে না।

ঘ. এ কাজগুলো তিনি কেন, তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ তাঁর পিতা-মাতা-ভাই এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুতেও বৈধ নয়। যদি এগুলো কারও মৃত্যুতে বৈধ হত, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুতেই বৈধ হত। কারণ তিনি সায়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন।

উম্মতের জন্য তাঁর মৃত্যুর চেয়ে বড় কোনো মসিবত নেই। কেননা তাঁর মৃত্যুতে ওহী, নবুওত ও আসমানের খবর চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। যা অন্য কোনো মানুষের মৃত্যুতে ঘটবে না। কিন্তু হুসাইন রা.-এর দৃষ্টিতে নবীজীর মৃত্যুতেও শোক-মাতম জায়েয নয়; তো আর কার মৃত্যুতে জায়েয হবে!

এদিকে ইঙ্গিত করেই হুসাইন রা. বলেছেন

أبي خير مني، وأمي خير مني، وأخي خير مني، ولي ولكل مسلم برسول الله صلى الله عليه وآله أسوة.

আমার পিতা আমার থেকে শ্রেষ্ঠ। আমার মা আমার থেকে শ্রেষ্ঠ। আমার ভাই আমার থেকে শ্রেষ্ঠ। আমার জন্য ও সকল মুসলমানের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদর্শ।

 

***

উপরিউক্ত বর্ণনাদুটি থেকে প্রমাণিত হল হুসাইন রা.-এর দৃষ্টিতে মাতম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এ থেকে তিনি মক্কা মুকাররমার দিকে রওয়ানা হওয়ার সময় এবং কারবালার ময়দানে শাহাদাতের আগের সন্ধ্যাবেলায় পরিবারের সদস্যদের সামনে জোরালোভাবে নিষেধ করেছেন।

কিন্তু শিয়ারা আজ তাঁর শাহাদাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর নিষিদ্ধ কাজগুলো করছে। হুসাইন রা.-এর শাহাদাতের ঘটনার স্মরণে শিয়া-মতাবলম্বীরা বুক চাপড়ায়, চেহারা খামচায়, হা-হুতাশ করে, নিজের মৃত্যুকামনা করে। তাযিয়া মিছিল করে। সেখানে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয়।

শুধু তাই নয়; তাযিয়ার নামে মূর্তি স্থাপন করে খোলামেলা শিরকের আয়োজন করা হয়। আর এর নাম দেয় হযরত হুসাইনের প্রতি ভালবাসা!

মিডিয়ায় এগুলো আবার প্রচার করা হয় যে, আমাদেরকে হযরত হুসাইনের আদর্শে উজ্জীবিত হতে হবে!

হুসাইন রা.-এর সঙ্গে এর চেয়ে বড় প্রতারণা কী হতে পারে! তাঁর দ্ব্যর্থহীন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে এবং সুস্পষ্ট হারাম ও শিরকী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে তাঁর মহব্বত ও আদর্শের কথা বলা প্রতারণা ও বিভ্রান্তি ছড়ানো বৈ কী?

যে কাজ করতে তিনি নিজে শাহাদাতের আগে বনী আবদুল মুত্তালিবের মহিলাদের ও আপন বোনকে নিষেধ করে গেছেন, সেই কাজ আজকের শিয়ারা কীভাবে নিজেদের জন্য শুধু জায়েযই নয়, নেহাত সওয়াবের বানিয়ে ফেলল?

যেখানে হুসাইন রা. মাতম করতেই নিষেধ করেছেন, সেখানে কি তিনি শিয়াদের নবউদ্ভাবিত প্রচলিত তাযিয়াকে সমর্থন করতে পারেন! কোনো হারাম ও শিরকী কর্মকাণ্ডে কি নবী-দৌহিত্র হুসাইন রা.-এর সামান্যতম সমর্থন থাকতে পারে!

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর আহলে বাইতের প্রতি মহব্বত পোষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। তবে সে মহব্বত প্রকাশের উপায় মাতম-তাযিয়া নয়; বরং মাতম-তাযিয়াসহ সকল অনাচার-পাপাচার পরিহার করে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সুন্নাহ যথার্থভাবে অনুসরণ করা এবং তাঁর আহলে বাইত ও সাহাবীগণের শিক্ষা ও আদর্শের ওপর অটল থাকা।

সুতরাং কারও অন্তরে যদি সত্যিই আহলে বাইত ও হুসাইন রা.-এর মহব্বত থাকে, তাহলে তার জন্য বাঞ্ছনীয় হল, হুসাইন রা.-এর শাহাদাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাতম-তাযিয়ার কুসংস্কার পরিহার করা।

সর্বোপরি এই মাতম-তাযিয়া করে হুসাইন রা. এবং আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসার দাবি একদমই অসার ও ভিত্তিহীন। 

 

টীকা

অন্য সাহাবী-তাবেয়ীগণের মতো আলী রা., হাসান রা., হুসাইন রা., যাইনুল আবিদীন রাহ. প্রমুখ আহলে বাইতের মহান পুরুষগণও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আদর্শ। শিয়ারা আহলে বাইতের বিশুদ্ধ শিক্ষা ও আদর্শের অনুসারী নয়। তারা মূলত আহলে বাইতের মহান পুরুষগণের নামে রটানো বিভিন্ন আপত্তিকর কথাবার্তার অনুসরণ করে।

আহলে বাইতের বিশুদ্ধ শিক্ষার একমাত্র অনুসারী হল, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ। বর্তমান নিবন্ধে আহলে বাইতকে যে শিয়াদের ইমাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটা কেবল সম্প্রদায়টির দাবির দিকে লক্ষ করে করা হয়েছে; বাস্তবতার নিরিখে নয়।

 

advertisement