Muharram 1448   ||   July 2026

কথিত হালালা সেন্টার
‖ শরীয়ত বিকৃতকারী ও ইসলাম নিয়ে তামাশাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা দরকার

Mufti Abul Hasan Muhammad Abdullah

যতই দিন যাচ্ছে শাশ্বত দ্বীন ইসলাম নিয়ে ষড়যন্ত্রকারী এবং শরীয়তের বিধি-বিধান নিয়ে কটাক্ষকারী লোকদের স্পর্ধা বেড়েই চলেছে। যে যেভাবে পারছে ফ্রি স্টাইলে দ্বীন-ধর্ম নিয়ে তামাশা করছে। কেউ নাস্তিক পরিচয়ে করছে। কেউ লিবারেল পরিচয়ে করছে। কারও কাছে ইসলামের কোনো একটা বিধান পছন্দ হচ্ছে না আর অমনি সে সমালোচনা করে বসছে। কেউ আবার ইসলামের কোনো বিধানের মনগড়া ব্যাখ্যা দিচ্ছে। এসব যেন আর থামছেই না। অথচ ৯০% মুসলমানের দেশে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

মুসলমানের দেশে ইসলাম নিয়ে কেউ কটূক্তি করবে, শরীয়তের বিধানকে তামাশার বিষয় বানাবে, খাঁটি ইসলামী বিষয়ের মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদান করবেএমনটি কী করে সম্ভব? কিন্তু সঠিক নিয়ম-নীতি না থাকা, বিধি-বিধানের বিষয়ে মুসলমানদের গাফেল থাকা, সঠিক জ্ঞান অর্জন না করা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকার কারণে দুষ্কৃতিকারীরা তাদের কাজগুলো অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে।

এমন নয় যে, শুধু ইসলাম বিরোধিতার নামে ইসলামকে নিয়ে তামাশা করা হচ্ছে; বরং এমন অনেক দুষ্ট লোকও রয়েছে, যারা ঘরের শত্রু, যারা ইসলামী লেবাসধারী, যারা নিজেদেরকে মুসলিম বা ধার্মিক বলে পরিচয় দেয়, তারাও মনগড়া বিষয়কে ইসলামে দাখিল করা, ইসলামের নামে চালিয়ে যাওয়া, ইসলামের বিষয়গুলোকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা, ভুল ব্যাখ্যা দেওয়ার বেলায় পিছিয়ে নেই। এই ধরনেরই একটি বিষয় সম্প্রতি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তা হচ্ছে, কথিত ‘হালালা সেন্টার’।

হালালা সেন্টার, অতঃপর...

১২ জুন ২০২৬ দৈনিক সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী– “ফেসবুকে ‘হালালা সেন্টার’ নামে একটি কথিত প্রতিষ্ঠানের হিল্লা বিয়ের বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে শত শত মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য পাঠিয়েছিলেন। তবে বিয়ের প্রক্রিয়ার বদলে কয়েকদিন পর সামাজিক মাধ্যমে তাদের জীবনবৃত্তান্ত, ছবি, ই-মেইল ও ফোন নম্বরসহ সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে তারা সামাজিকভাবে বিব্রত হওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ করেছেন।

এদিকে হালালা সেন্টারের প্রচারণা চালানো সংশ্লিষ্ট ফেসবুক আইডির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে কেউ কেউ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। আবার কেউ ফেসবুকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে বারবার নাম বদল করা হয়েছে ওই আইডির।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার সূত্রপাত হয় ‘সানজিদা আক্তার’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে। কয়েক দিন আগে ওই আইডি থেকে হিল্লা বিয়ের (মুহাল্লিল-সংক্রান্ত) জন্য আগ্রহী পুরুষদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। পোস্টে হাফেয, আলেম, শিক্ষক, ইমাম, ব্যবসায়ী, প্রবাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আগ্রহী হওয়ার দাবি করা হয় এবং ইমেইলে আবেদন পাঠাতে বলা হয়। পরে একই আইডি থেকে একটি পোস্টে অন্তত ৮০ জন আবেদনকারীর ই-মেইল ও সিভির স্ক্রিনশট প্রকাশ করা হয়। সেখানে অনেকের নাম, ফোন নম্বর, পেশা ও ব্যক্তিগত পরিচয় দৃশ্যমান ছিল। পোস্টে দাবি করা হয়, ‘হাজার হাজার’ আবেদন এসেছে এবং সেগুলোর একটি অংশ ‘স্মারক হিসেবে’ প্রকাশ করা হয়েছে। তথ্য প্রকাশের পর থেকেই সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। অনেক ব্যবহারকারী বিষয়টি ব্যঙ্গাত্মকভাবে দেখলেও, ভুক্তভোগীদের জন্য এটি গুরুতর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার সংকট তৈরি করে।”

উক্ত ঘটনা রাষ্ট্রের সকল শ্রেণির লোকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেএখানে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ কতটা দুর্বল! না হয় একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্র, যেখানে সাধারণ আইন-কানূন রয়েছে, যেখানে বহু লোক ধার্মিক, অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা রয়েছে, লক্ষ আলেম-উলামা রয়েছেন, সেখানে একটি বিষয়কে ধর্মীয় লেবাস পরিয়ে, মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে উপস্থাপন করা যেতে পারেচিন্তা করা যায়!

হালালা সেন্টার নিয়ে কথা বলার আগে প্রথমেই বলে নেওয়া উচিত, ইসলামী শরীয়তে এই ধরনের হালালা বা হালালা সেন্টারের কোনো স্থান নেই। কুরআন-সুন্নাহ্‌র কোথাও এ ধরনের হালালার কথা বলা হয়নি, হালালা সেন্টার তো দূরের কথা। পুরো বিষয়টাই কল্পিত, মনগড়া ও বানানো। এটি যারাই করেছে, তারা ইসলাম ও উলামায়ে কেরামকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই করেছে। ইসলামকে বদনাম করার জন্যই করেছে।

গেঁয়ো লোকের কথায়, গেঁয়ো সরদারের সালিশকে কেন্দ্র করে এদেশে সর্বোচ্চ আদালতে কুখ্যাত বিচারক গোলাম রব্বানী এবং আরও কেউ কেউ বিভিন্ন শরীয়া বিরোধী রায় প্রদান করে গেছেন, যেগুলো পরবর্তীতে আপিল বিভাগে বাতিল হয়েছে। সেই গেঁয়ো লোকদের সালিশকে তখন ফতোয়া হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল, ইসলাম হিসেবে দেখানো হয়েছিল। সেগুলোর বরাতে ইসলামী শরীয়ত ও মুসলমানদের জীবনের জন্য অপরিহার্য ‘ফতোয়া’কেও নিষিদ্ধ করার স্পর্ধা দেখিয়েছেন বিচারক নামের কোনো কোনো দ্বীন সম্পর্কে জাহেল ব্যক্তি।

হিল্লা বিয়ে নামটি একসময় এদেশে খুব প্রচার করা হয়েছিল। ধর্মের বদনাম করার জন্য হিল্লা বিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল। অথচ ইসলামে না হিল্লা বিয়ে আছে, না কথিত ‘হালালা’ আছে।

এই ষড়যন্ত্রের শুরু কোন্ জায়গা থেকে? তাদের উর্বর মস্তিষ্কে এই চিন্তা এল কীভাবে? এটা কি আদৌ ইসলামে আছে?

কুরআনে কারীমের সূরা বাকারার ২২৯ নম্বর আয়াত পড়লেই বোঝা যাবে। সেখানে তালাক সংক্রান্ত মৌলিক বিধান বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ فَاِمْسَاكٌۢ بِمَعْرُوْفٍ اَوْتَسْرِيْحٌۢ بِاِحْسَانٍ.

[তরজমা : তালাক (বেশির বেশি) দুই বার হওয়া চাই। অতঃপর অর্থাৎ যদি এক বা দুই তালাক দেওয়া হয় (স্বামীর জন্য দুটি পথই খোলা আছে) : হয়তো নীতিসম্মতভাবে (স্ত্রীকে) রেখে দেবে (অর্থাৎ স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবে) অথবা উৎকৃষ্ট পন্থায় তাকে ছেড়ে দেবে (অর্থাৎ ফিরিয়ে না এনে ইদ্দত শেষ করতে দেবে)।]

তালাক দুই বার দেওয়ার সুযোগ আছে। একটি তালাক দেবে, দুইটি তালাক দেবে। এক ও দুই তালাক দেওয়ার পরে করণীয় কীসেটাও বলা হয়েছে যে, কেউ যদি স্ত্রীকে এক বা দুই তালাক প্রদান করে, তাহলে সে স্ত্রীকে রাখতেও পারবে, চাইলে স্ত্রীকে ছেড়েও দিতে পারবে।

পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে

فَاِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهٗ مِنْۢ بَعْدُ حَتّٰي تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهٗ فَاِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَاۤ اَنْ يَّتَرَاجَعَاۤ اِنْ ظَنَّاۤ اَنْ يُّقِيْمَا حُدُوْدَ اللهِ وَتِلْكَ حُدُوْدُ اللهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَّعْلَمُوْنَ.

[তরজমা : অতঃপর সে (স্বামী) যদি (তৃতীয়) তালাক দিয়ে দেয়, তবে সে (তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী) তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিবাহ করবে। অতঃপর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তাকে তালাক দিয়ে দেয়, তবে তাদের জন্য এতে কোনো গোনাহ নেই যে, তারা (নতুন বিবাহের মাধ্যমে) পুনরায় একে অন্যের কাছে ফিরে আসবে—শর্ত হল, তাদের প্রবল ধারণা থাকতে হবে যে, (এবার) তারা আল্লাহ্‌র সীমা কায়েম রাখতে পারবে। এসব আল্লাহ্‌র স্থিরীকৃত সীমা, যা তিনি জ্ঞানবান লোকদের জন্য স্পষ্টরূপে বর্ণনা করছেন।]

উক্ত আয়াতের শেষাংশ দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল, কেউ যদি স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে ওই মহিলা তার ওপর হারাম হয়ে যাবে। সে এই মহিলার সাথে আর ঘর সংসার করতে পারবে না। এখন এই তিন তালাক দিয়ে দেওয়ার পর মহিলা স্বাধীন হয়ে গেল। চাইলে অন্য যে-কোনো ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। চাইলে স্বামী পরিত্যক্তা হিসেবে নিজের ঘরে থাকতে পারবে। পূর্বের স্বামী তার বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যদি এই মহিলা অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তাহলে স্বামীর সাথে দাম্পত্য জীবন নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারবে। যতদিন তারা একমত থাকবে, তাদের দাম্পত্য জীবন চলতে থাকবে। এই স্বামীর মৃত্যু হয়ে গেলে চার মাস ১০ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে।

ইদ্দত চলাকালে মহিলাদের বাড়িতে অবস্থান করতে হয়। সে সময় মহিলারা বিবাহ করতে পারে না। ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে এই মহিলা স্বাধীন। অন্য যে-কোনো জায়গায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। আগের তিন তালাকদাতা স্বামী যদি তাকে নিতে চায় এবং মহিলা যদি যেতে চায়, সেখানেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেঅন্য যে-কোনো জায়গায়ও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।

একইভাবে যদি এই দ্বিতীয় স্বামী বা পরবর্তী কোনো স্বামী তাকে তালাক প্রদান করে এবং তালাকের ইদ্দত পূরণ করা হয়, তাহলে মহিলাটি অন্য যে-কোনো জায়গায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।

তেমনিভাবে এই মহিলা তার পূর্বে তিন তালাকদাতা স্বামীর সাথে ঘর সংসার করতে পারবে, যদি তারা দুজন একমত হয়। তবে কেউ কাউকে বাধ্য করতে পারবে না। স্বামী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বাধ্য করতে পারবে না, স্ত্রীও তালাকদাতা স্বামীকে বাধ্য করতে পারবে না।

কুরআনে কারীমের সূরা বাকারার ২২৯ ও ২৩০ নম্বর আয়াত, সাথে রিফাআ রা.-এর স্ত্রীর হাদীসএই দুই জায়গার মধ্যে এই কথাগুলো খুবই স্পষ্টভাবে বলা আছে।

কুরআন কারীমের আয়াত তো দেখা হল, এবার হাদীসটি দেখা যাক। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন

جاءتِ امرأةُ رفاعةَ القرظيِّ إلى رسولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فقالت: إنِّي كنتُ عندَ رفاعةَ فطلَّقني، فبتَّ طلاقي، فتزوَّجتُ عبدَ الرَّحمنِ بنَ الزُّبيرِ، وما معَهُ إلاَّ مثلُ هدبةِ الثَّوب. فقالَ: أتريدينَ أن ترجعي إلى رفاعةَ؟ لاَ، حتَّى تذوقي عسيلتَهُ ويذوقَ عسيلتَكِ.

রিফাআ কুরাযী রা.-এর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাযির হয়ে বলল, আমি রিফাআর বিবাহ বন্ধনে ছিলাম। সে আমাকে তালাক দিয়েছে। সে আমাকে তিন তালাক দিয়েছে। এরপর আমি আবদুর রহমান ইবনে যুবাইর-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। কিন্তু তার শারীরিক সমস্যা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি রিফাআর কাছে পুনরায় ফিরে যেতে চাও?

সে বলল, জী হাঁ।

তিনি বললেন, না, যতক্ষণ না তুমি তার স্বাদ গ্রহণ কর এবং সে তোমার স্বাদ গ্রহণ করে। জামে তিরমিযী, হাদীস ১১১৪

সেখানে কিন্তু কোনো প্রকারের হিলা-হালালার কিছুই ছিল না; বরং মহিলাটির আগে বিবাহ হয়েছে। যে মহিলা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আর্জি নিয়ে এসেছিলেন, তিনি কিন্তু আগে তালাকপ্রাপ্তা হয়েছেন, তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পরে তিনি অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, স্বাভাবিক সংসার তারা যাপন করছিলেন। সে স্বাভাবিক সংসার যাপন করে তিনি তৃপ্ত হচ্ছিলেন না। তখন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অভিযোগ করেছেন, আমাকে তো আমার পূর্বের স্বামী তালাক দিয়েছিলেন। এরপর এখানে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। কিন্তু এখানে আমার ভালো লাগছে না।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অবস্থা দেখে বুঝতে পেরেছিলেন, মনে হয় আবার পূর্বের স্বামীর কাছে যেতে চাচ্ছে। তখন তাকে বললেন, তুমি কি আগের স্বামীর কাছে আবার যেতে চাও?

তোমাদের দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে থাকলে, স্বামী-স্ত্রীসুলভ আচরণ হয়ে থাকলে এবং এই স্বামী তোমাকে তালাক দিলে পূর্বের স্বামীর কাছে তুমি যেতে পারবে।

হাদীসের এই ঘটনাটা স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। দ্বিতীয় বিবাহ হওয়ার পরে তিনি রাসূলুল্লাহ্‌র কাছে এসেছেন। এমন না যে, তিনি হিলার জন্য বিবাহ করেছেন; বরং তিনি বিবাহ করেছেন সাধারণ জীবনযাপনের জন্য।

হাদীসের বর্ণনা থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, তারা সাধারণ ঘর-সংসার করার জন্যই বিবাহ করেছেন। বিবাহের পর বনিবনা ছিল না। সংসার চলছিল না। তখন তিনি অভিযোগ করেছেন। তো আমরা যদি কুরআনের আয়াত এবং হাদীসগুলো দেখি এবং শরীয়তের নিয়ম-নীতির দিকে তাকাই, তাহলে দেখব, হালালা নামক বানানো কাহিনীর অস্তিত্ব শরীয়তে নেই। শুধুই কন্টাক্টে বিবাহ, শুধু হালাল বানানোর জন্য বিবাহ শরীয়ত চালু করেনি।

এখন ভিন্ন আরেকটা প্রসঙ্গ রয়ে গেছে। সেটা হল, কারও বিবাহ হল। তারপর তালাক হয়ে গেল। তালাকের পর সাধারণ সব নিয়ম পালন করল। ইদ্দত পূর্ণ করল। ইদ্দতের পরে আরেক জায়গায় বিবাহ হল। স্বামী-স্ত্রীসুলভ আচরণও হল। হয়তো বিবাহকারীর নিয়ত ছিল অস্থায়ী বিবাহ। বিবাহের পরে তালাক দিয়ে দেবে। এর পরে তালাক হয়েও গেল। ইদ্দত পালন করল এবং আগের স্বামীর কাছে ফেরত গেল। তো এটা সাধারণ বিবাহ হল না, যেহেতু নিয়তই ছিল ছেড়ে দেওয়ার। এটা হিলা হয়েছে। ইসলাম এই হিলাকে উৎসাহিত করেনি। এই ধরনের হিলা করার কথা ইসলাম বলেনি। তবে যেহেতু এখানে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তাই পূর্বের স্বামীর জন্য মহিলা হালাল হয়ে যাবে বটে; কিন্তু এধরনের কাজকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন হাদীসে এধরনের মানুষের ওপর লানত করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

أَلَا أُخْبِرُكَ بالتيسِ المستعارِ؟ هو الْمُحِلُّ، فلَعَنَ اللهُ الْمُحِلَّ والْمُحَلَّلَ له.

আমি কি তোমাদেরকে ধার করা পাঁঠা সম্পর্কে অবহিত করব না? সে হল মুহিল, যে তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য হলাল করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে। আল্লাহ তাকে এবং যে স্বামীর জন্য তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে হালাল করা হয়উভয়কে লানত করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৯৩৬

এর কাছাকাছি হাদীস অন্যান্য কিতাবেও বর্ণিত হয়েছে।

এধরনের কাজের ব্যাপারে ধমকি এসেছে। অভিসম্পাত এসেছে। তাই একটি হল মানুষের বানানো তরীকা এবং হিলা পদ্ধতি। আরেকটি হল ইসলাম এবং শরীয়ত কী বলে? কুরআন-সুন্নাহ কী বলে? কুরআন-সুন্নাহ্য় এধরনের হিলা পদ্ধতি বলেও দেওয়া হয়নি, উৎসাহিতও করা হয়নি; বরং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

কুরআন-সুন্নাহ্য় যে কাজটির ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং যেই পদ্ধতি কুরআন-সুন্নাহ্য় নেই, সেটাকে যারা জাতীয়করণ করতে চায়, যারা একটি পদ্ধতি বানিয়ে ফেলতে চায়, নিজেদের মনমতো করে একটা হালালা নাম দিল, আবার সেন্টারও নাম দিল, তারা যে দ্বীন ইসলাম শরীয়তের শত্রু, মুসলমানদের শত্রুএটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কথিত হালালা সেন্টারের লোকেরা এভাবে শত শত লোককে সদস্য করেছে। মাসিক আলকাউসারের পক্ষ থেকে পরিচয় না দিয়ে লিক হওয়া লোকদের বায়োডাটা ধরে তথ্য যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। আসলেই তারা সদস্য হয়েছিল কি না। তাদের অনেকে অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, আমাদের সিভি কম্পিউটারের দোকানে ছিল। সেখান থেকে নিয়ে গেছে। অনেকে বলেছে, আমরা লিক হওয়ার পরে বিষয়টি জেনেছি। আবার তাদের কারও কারও কথায় নমনীয় ভাবও দেখা গেছে। কেউ বলেছে, আমাদেরকে তাদের পক্ষ থেকে ফোন করে সদস্য বানানো হয়েছে। কীসের সদস্য বানানো হয়েছে বুঝতে পারিনি। কেউ বলেছে, আমি কিছু জানি না, আমার নম্বর ও যেসকল তথ্য তারা প্রচার করেছে, সম্ভবত ফেসবুক থেকে নিয়েছে।

কারও সাথে কথা বলে জানা গেছে, সে একটি কারখানায় কাজ করা সাধারণ শ্রমিক; কিন্তু তার নম্বর দিয়ে লেখা হয়েছে, মাওলানা...। আবার ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ঢাকার, অথচ সে থাকে অন্য জেলায়।

ঘটনা যাই হোক, সেখানে যদি এক-দুইজন আলেম নামধারী লোক সদস্য হয়েও থাকে এবং এই ধরনের কার্যক্রমের সাথে নিজেদেরকে জড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে, তাহলে তারা লেবাস-পদবিতে আলেম হলেও বাস্তবে তারা আলেম নয় এবং ইলমের সাথে তাদের দূরতম সম্পর্কও নেই। এই ধরনের লোক আলেম নামের কলঙ্ক। তারা ইসলামকে শুধু বদনামই করে। এদের দ্বারা ইসলামের ফায়দা না হয়ে ক্ষতিই শুধু হয়ে থাকে।

দুষ্কৃতিকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা দরকার

এই ধরনের কথিত হালালা সেন্টারের মতো গর্হিত কাজে জড়িত ব্যক্তিদের এবং যারা শরীয়তের বিধি-বিধানকে তামাশায় পরিণত করে, ইসলাম বিদ্বেষীদেরকে ইসলামের নামে বদনাম করার সুযোগ করে দেয় এবং সাধারণ মুসলমানদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলে, তাদেরকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা খুবই জরুরি।

রাষ্ট্র দেশের যোগ্যতাসম্পন্ন, গণ্যমান্য আলেম-উলামার সাথে পরামর্শ করে এবং তাদের সহযোগিতা নিয়ে এই ধরনের কাজ প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। এটা করলেই রাষ্ট্র নিজ দায়িত্ব পালন করেছে বলে মনে হবে। ভবিষ্যতে এই ধরনের অপতৎপরতায় যেন কেউ লিপ্ত হতে না পারেসে ব্যাপারেও রাষ্ট্র তাদেরকে সতর্ক করতে পারবে।

আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে বড়। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ কত ঘটনা ধরে ফেলে। কথিত হালালা সেন্টার যেই মহিলার নামে চালানো হয়েছে, সেটার পেছনে কেউ না কেউ তো ছিল। এটা তো আর রোবট করেনি। যে বা যারা এটার সাথে জড়িত ছিল এবং যারা এখানে বাস্তবেই নিজেদের নাম দিয়েছে, তাদের সকলকে আইনের আওতায় আনা দরকার। কম-বেশি যার যে শাস্তি প্রাপ্য তাদেরকে সে শাস্তি দেওয়া দরকার।

প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

এই ধরনের অপতৎপরতা এবং ইসলামের নামে তামাশা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে জনগণ, উলামায়ে কেরাম, ইসলামপ্রিয় ব্যক্তিদের সজাগ-সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই। যখন যেখানে যাদেরকে এই ধরনের তামাশা সৃষ্টি করতে দেখা যাবে, তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। নারী-পুরুষ সে যে-ই হোক না কেন, সে যে শ্রেণিরই হোক না কেন, সে আলেমের লেবাসধারী হোক, আলেমার লেবাসধারী হোক কিংবা সে সাধারণ মানুষের লেবাসধারী হোকসে যেই হোক, যারাই এরকম কাজ করবে, তাদেরকে সামাজিকভাবে একঘরে করে ফেলার প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতা নিয়ে ইসলামপ্রিয় ব্যক্তিদের সহযোগিতা নিয়ে এধরনের অপতৎপরতায় লিপ্ত এবং তামাশাকারীদের একঘরে করতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। সামাজিকভাবে যদি তাদেরকে বয়কট করা হয়; তাদের সাথে কেউ আত্মীয়তা না করে, তাদের সাথে লেনদেন না করে, তাদেরকে সকল কাজে এড়িয়ে চলে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যরাও এজাতীয় কাজ করতে ভয় পাবে।

পরিশেষে আমরা মনে করি, এই ধরনের অপতৎপরতা ও তামাশা বন্ধে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন এবং সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন, যেন কেউ এধরনের কাজ করে ভবিষ্যতে সাধারণ মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত ও বিব্রত করতে না পারে এবং ইসলামের বদনাম রটাতে না পারে।

 

advertisement