Muharram 1448   ||   July 2026

সম্পপাদকীয়

ভারতীয় নতুন হাই কমিশনারের সাম্রাজ্যবাদী বক্তব্য <br/>

এ শুধু শিষ্টাচার বিবর্জিতই নয়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি

সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী খুবই জঘন্য ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। নবনিযুক্ত হাই কমিশনার বেনাপল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় সাংবাদিকদের সাথে আলাপ করতে গিয়ে বলেন, ‘একটা ক্রিকেট দল যদি মিলেমিশে হয়, তাহলে কত ভালো হবে। খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, টেকনোলজি সব মিলেমিশে কাজ করব। এজন্য উভয় পক্ষের সমর্থন থাকতে হবে।

ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা। আমার তো মনে হচ্ছে না, আমি বাংলাদেশে এসেছি। ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি, এই ১৬০ কোটি জনগণের জন্য যা ভালো হয়, সেটাই করা হবে। দুই দেশের জন্য ভালো হয়, সেই পদক্ষেপ সামনের দিনে নেব।’

মিস্টার ত্রিবেদীর উপরিউক্ত উক্তিগুলো যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি জঘন্য ধরনের হুমকি, তা বোঝার জন্য কারও কূটনীতিক হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার কথাগুলো থেকে এ কথা বুঝতে কারোই অসুবিধা হয় না, তিনি অখণ্ড ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। ভারত তার জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বড় ভাইসুলভ আচরণ করে আসছে। বড় ভাইয়ের অর্থ সাধারণ বড় ভাই নয়; গ্যাংয়ের মধ্যে যে বড় ভাইয়েরা থাকে, তারা যেভাবে অন্যদেরকে টর্চার করতে চায় এবং অন্যদের ওপর নিজেদের প্রভাব ফলাতে চায়, ভারতের আচরণ বরাবরই তেমনই ছিল। তবে এই সবকিছুই ছাড়িয়ে গেছে ভারতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির উত্থানের পর। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত আবার গ্রেটার ইন্ডিয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে।

অনেকেরই মনে থাকবে, ভারতীয় নতুন পার্লামেন্ট ভবনে যে মানচিত্র আঁকা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে তাদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে যখন বাংলাদেশে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে জনগণ প্রতিবাদ জানানো শুরু করেছিল, তখন ক্ষমতাসীনরা বিষয়টি বেমালুম চেপে গিয়েছিল। কারণ তারা হয়তো ভেবেছিল, এতে অসুবিধা কী? বিগত ফ্যাসিবাদীরা তো ভারতের অধীনে থেকে তাদের গোলাম হয়ে ক্ষমতায় ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে তাদের চিন্তাই ছিল না।

দীর্ঘদিন থেকেই ভারতের একশ্রেণির মিডিয়া এবং তাদের থিংক ট্যাংকগুলো এমন কথাবার্তা ও আচরণ করছে, যার দ্বারা তারা বোঝাতে চাচ্ছে, তাদের আশেপাশের রাষ্ট্রগুলো তাদেরই। যদিও বাংলাদেশ ছাড়া সব দেশ থেকেই ভারত বিতাড়িত হয়েছে। নেপাল ও ভুটানের মতো রাষ্ট্র ভারতকে পরিত্যাগ করেছে। মালদ্বীপ ভারতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। আর পাকিস্তানের কথা তো বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। শুধু বাংলাদেশ এমন একটা রাষ্ট্র, যে এখনও নতজানু ভাব নিয়ে ভারতের সামনে আছে। এমনটি না হলে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে একজন দূত হয়ে আসা ব্যক্তি কীভাবে এমন কথা বলতে পারে; যার দ্বারা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তিনি বলতে চাচ্ছেন, বাংলাদেশ ভারতের সাথে একাকার হয়ে গেলেই তো পারে! বাংলাদেশ-ভারতের একটা ক্রিকেট টিম হবে। একই ইকোনমি হবে। একসাথে জনগণের হিসাব হবে।

ত্রিবেদী ও ভারতকে, বিশেষত মোদি ও বিজেপিকে মনে রাখতে হবে, তাদের এই ধরনের অলীক আকাক্সক্ষা কখনোই বাস্তব হবে না ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশের জনগণ তাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে জানে। তারা যেন কোনো সময়ই এ অঞ্চলের দিকে চোখ তুলে না তাকায়।

বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। তারা চায় না, কারও সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে। কিন্তু কেউ এসে যদি তাদেরকে খোঁচায়, তাদের এক ইঞ্চি জমি দখল করতে আসে, তাহলে এখানকার মানুষ অবশ্যই তাদের জান-মাল দিয়ে নিজেদের দেশ রক্ষা করবে।

ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, ভারত যতই অখণ্ডতার কথা বলেছে, তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হতে থাকবে। ভারত জোড়া নেবে না; বরং ভাগই হতে থাকবে। ১৯৪৭ সালে ভাগ হয়েছে। যদি এই দেশ তাদের সাথে মিলে যাওয়ার আশা করত, এ দেশের লোকেরা যদি সেটাতে সায় দিত, সেটা ১৯৭১ সালেই হতে পারত। কিন্তু এদেশের জনগণ পাকিস্তান থেকে তো আলাদা হয়েছে; ভারতের সাথে মিশতে রাজি হয়নি। এই দেশের নিজস্ব সভ্যতা আছে, সংস্কৃতি আছে, নিজস্ব পতাকা আছে, নিজস্ব সীমান্ত আছে এবং নিজস্ব মূল্যবোধ আছে। ভারতীয়দের কোনোভাবেই বাংলাদেশের সাথে, বাংলাদেশিদের সাথে তাদের সংস্কৃতিকে এবং তাদের উগ্রবাদী চিন্তা মিলিয়ে ফেলার কথা মাথায় আনা উচিত নয়।

সবশেষে আমরা বলব, দেশের সরকার, বিরোধী দল এবং সাধারণ জনগণকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। করণীয় ছিল, এই ধরনের ব্যক্তিকে শুরুতেই প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা।

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে জাতিসংঘের সভাপতি হয়েছেন। কিন্তু তার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত ব্যক্তি এই দেশে এসে এমন কথা বলছেন, যা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাঁর উচিত ছিল, ওইদেশীয় পক্ষের সাথে কথা বলে এ ব্যক্তিকে প্রত্যাহার করতে বলা। সে দেশে এ বার্তা দেওয়া, তিনি হয় তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করবেন, না হয় তাকে প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে এমন কিছু করা হয়েছে বলে এ পর্যন্ত জানতে পারিনি। শুধু এতটুকু শোনা গেছে, তাকে তলব করা হয়েছে। তলব করে কী বলা হয়েছে, সেটাও কিন্তু জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সরকার জনগণকে অভিহিত করতে এবং তাদেরকে আশ্বস্ত রাখতে বাধ্য। এটা সরকারকে বুঝতে হবে। এসব বিষয়ে সরকার নমনীয়তা দেখালে জনগণ খুবই খারাপভাবে নেবে।

 

সনাতনীদের হইহুল্লোড়

অন্যদিকে ভারতীয় হাই কমিশনার মিস্টার ত্রিবেদীর শিষ্টাচার বিবর্জিত এবং অকূটনৈতিক বক্তব্যের জের কাটতে না কাটতেই এ দেশে শুরু হয়ে গেছে আরেকটি হাঙ্গামা। সনাতন ধর্মের গুটিকয়েক লোক, যারা সব সময় এ ধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টি করতেই ব্যস্ত থাকে, তারা তামাশা সৃষ্টি করে চলেছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী রাম মন্দির বানানো হচ্ছিল। দেশের স্পর্শকাতর স্থানে মন্দির নির্মাণের নামে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের উপস্থিতির দরুন সেখানে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সেই অজুহাতে সারা  দেশে তারা একটা হাঙ্গামা সৃষ্টি করে চলেছে। তারা তো পারলে পুরা বাংলাদেশ তাদের মালিকানায় নিয়ে নেয়! তাদের কিছু নেতা অদ্ভুত সব বক্তব্য দিচ্ছে। তাদের অনেকে আলাদা প্রদেশের দাবি তুলছে। অথচ বাংলাদেশ তো ভারতের মতো না। বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র। এখানে কোনো প্রদেশই নেই। এসব ঘটনাকে অনেকে মনে করছেন একই সূত্রে গাঁথা। ত্রিবেদীর অসংলগ্ন বক্তব্যের দরুন এখানে একটা আওয়াজ উঠেছিল। বিভিন্নজন কথা উঠিয়েছিলেন। হয়তো সেগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই চিহ্নিত কিছু সনাতনীকে এখানে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এদেশের সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের মনে রাখতে হবে, এই দেশের জনগণ শান্তিপ্রিয়। তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে চলেছে তাদের সাথে। পাশেই যে বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি, যেখানে সনাতনীরা সংখ্যাগুরু। তারা সেই দেশের সংখ্যালঘু বিশ-পঁচিশ কোটি মুসলমানের সাথে এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে কেমন আচরণ করছে! অন্য ধর্মের উপাসনালয়গুলো, মুসলিমদের মসজিদগুলো কীভাবে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে! শত শত মসজিদ-মাদরাসা ধ্বংস করে দিচ্ছে! এখানে তো কেউ কোথাও চোখ তুলেও তাকায়নি, তাকাচ্ছে না আর তাকাবেও না। তাহলে এখানে তারা কীভাবে এমন বড় বড় কথা ছাড়ছে এবং তাদের কাল্পনিক অধিকারের কথা বলছে! এখনও দেখলে দেখা যাবে, বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন স্তরে দেশের যে পরিমাণে অফিসার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আছে, আনুপাতিক হার হিসাব করলে অনেক অনেক বেশি।

বিগত সময়ের কথা তো অনেকেরই মনে থাকবে, পুলিশের বড় কোনো ব্যক্তির নাম আসলেই দেখা যেত, তিনি সনাতনী ধর্মের লোক। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের বড় বড় পদের খোঁজ করলে দেখা যায়, সনাতনী ধর্মের লোক। এদেশের জনগণ সেগুলো নিয়েও কোনো আন্দোলন করেনি। এত সুযোগ-সুবিধা এদেশে ভোগ করার পরেও তারা হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে চায়। এটা খুবই দুঃখজনক এবং ন্যক্কারজনক।

এদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয় ছিল, আছে এবং থাকবে। কিন্তু সনাতনীদের উচিত, নিজেদেরকে নিজেদের গণ্ডির মধ্যে রাখা। যতটুকু মুখ ততটুকু মাপে কথা বলা এবং মানুষের ধৈর্যের বাঁধ না ভাঙা।

দেশের সাধারণ মানুষের উচিত, এই ধরনের ব্যক্তিদের বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং শান্তিপূর্ণ থাকা। তারা যেন পেছন থেকে কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।

 

advertisement