প্রিয় হাজ্বী সাহেবান!
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ.
[১লা সফর ১৩৮২ হিজরীতে, হজের সফর থেকে ফেরার পথে হাজ্বী সাহেবানের উদ্দেশে মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ.-এর চিন্তা জাগানিয়া বয়ান।]
কুরআন মাজীদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন–
فَاِذَا قَضَيْتُمْ مَّنَاسِکَکُمْ فَاذْکُرُوا اللّٰہَ کَذِکْرِکُمْ اٰبَآءَکُمْ اَوْ اَشَدَّ ذِکْرًا.
তোমরা যখন হজ্বের কাজসমূহ সম্পাদন করে ফেল, তখন আল্লাহকে সেইভাবে স্মরণ কর, যেভাবে নিজেদের বাপ-দাদাকে স্মরণ করে থাক; বরং তার চেয়েও বেশি স্মরণ কর। –সূরা বাকারা (২) : ২০০
হারামাইন শারীফাইন থেকে হজ্ব¦ ও উমরার সৌভাগ্য লাভ করে ফেরা যাত্রী ভাই ও বন্ধুদের উদ্দেশে এটি আমার তৃতীয় বয়ান। এ বয়ানগুলো করা হয়েছে কুরআন মাজীদের উপরিউক্ত আয়াতকে সামনে রেখে। উক্ত আয়াতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, হজ্ব ও উমরা সম্পন্ন করার পর আপনার করণীয় কী এবং হজ্ব ও উমরা-পরবর্তী সময়ে আপনাকে কীভাবে থাকতে হবে।
মোটকথা, এই আয়াতে হজ্ব ও উমরা আদায়কারীদের ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা পেশ করা হয়েছে। সেজন্য তাতে সবার জীবনের, সব অঙ্গনের সাথে সম্পৃক্ত, সকল অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকার কথা। কিন্তু কুরআনের বালাগাত বা অলংকার শাস্ত্র এবং তার অভিভাবকসুলভ প্রকাশভঙ্গি তাতে এমনভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে যে, তার বক্তব্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত; তবে গভীর ভাব ও মর্মসমৃদ্ধ। যা স্মরণ রাখা যেমন সহজ, তেমনি সে অনুযায়ী আমল করাও সহজ। পাশাপাশি তা অনেক ধরনের বিস্তারিত নির্দেশনাকেও অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে।
মানব জীবনের সকল শাখা-প্রশাখার সাথে সম্পৃক্ত নির্দেশনা তো পুরো কুরআনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল মৌখিক ও প্রায়োগিক শিক্ষা এসবের সাথেই সম্পৃক্ত। তবে এখানে খুব সংক্ষিপ্ত এক শব্দের মাধ্যমে এই সকল নির্দেশনাকে অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আর তা হল, যিকরুল্লাহ বা আল্লাহর স্মরণ।
আয়াতটির প্রতি মনোযোগ দিন
বিস্তারিত আলোচনা শোনার আগে আয়াতটির তরজমা শুনুন। আল্লাহ তাআলা বলেন–
فَاِذَا قَضَيْتُمْ مَّنَاسِکَکُمْ فَاذْکُرُوا اللّٰہَ کَذِکْرِکُمْ اٰبَآءَکُمْ اَوْ اَشَدَّ ذِکْرًا.
তোমরা যখন হজ্বের কাজসমূহ সম্পাদন করে ফেল, তখন আল্লাহকে সেইভাবে স্মরণ কর, যেভাবে নিজেদের বাপ-দাদাকে স্মরণ করে থাক; বরং তার চেয়েও বেশি স্মরণ কর। –সূরা বাকারা (২) : ২০০
এই আয়াতে বেশি পরিমাণে আল্লাহর যিকির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেশি পরিমাণে যিকিরের কথাটি এই শিরোনামে বলা হয়েছে যে, যেমন তোমরা তোমাদের বাপ-দাদাদের স্মরণ কর।
ইমামুত তাফসীর হযরত আতা খুরাসানী রাহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল বাচ্চা যেমন তার মা-বাবাকে সব সময় সর্বাবস্থায় আম্মু আব্বু ডাকতে থাকে; মুমিনের কাজও এমনিভাবে সব সময় এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা। (দ্র. তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/৫৫৭)
মুফাসসিরীনে কেরাম বলেছেন, এই আয়াতে জাহেলী যুগের একটি ভুল প্রথা মিটিয়ে দেওয়ার প্রতি ইশারা করা হয়েছে। জাহেলী যুগে আরবদের অভ্যাস ছিল, তারা হজ্বের কাজ সম্পন্ন করার পর কয়েকদিন ‘বাজার জমাত’ এবং বিভিন্ন ধরনের সভা-সমাবেশ করত। তাদের সেসব সভা-সমাবেশের প্রধান বিষয় হত, নিজেদের পূর্বপুরুষদের গুণ ও কীর্তি বর্ণনা করা এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা।
স্পষ্ট কথা যে, সেটা ছিল সম্পূর্ণ অনর্থ কাজ। যাতে ওই পূর্বপুরুষদের পর্যন্ত না কোনো ফায়েদা পৌঁছাত আর না এই অহংকারী গুণকীর্তণকারীদের কোনো লাভ হত।
কুরআন মুসলমানদেরকে ওই কাজের পরিবর্তে এ বিধান দিয়েছে যে, হজ্ব সম্পন্ন করার পর তোমাদের কাজ তো কেবল এটা হওয়া উচিত যে, তোমরা আল্লাহ তাআলার স্মরণে মগ্ন থাকবে। এছাড়া অন্য সকল চিন্তা-ভাবনা তোমাদের কাছে অপছন্দের হবে।
ہر فکر درد سر ہے ہر انديشہ بار دل
প্রতিটা চিন্তা মাথার ব্যথা, প্রতিটা দুশ্চিন্তা হৃদয়ের বোঝা।
এককথায় আল্লাহর স্মরণ ছাড়া বাকি সবকিছু যেন তোমার দিল থেকে মিটে যায়।
কবির ভাষায়–
ياد ميں تيرے سب کو بھلا دوں کوئي نہ مجھ کو ياد رہے
سب خوشيوں کو آگ لگا دوں غم سے تيرے دل شاد رہے
তোমার স্মরণে সবকিছু ভুলে যাব, আর কিছুই যেন আমার মনে না থাকে।
সকল আনন্দে আগুন লাগিয়ে দেব, কেবল তোমার স্মরণে যেন হৃদয় বাগবাগ থাকে।
মোটকথা, হজ্ব-উমরার সকল আমল ও কাজ তো কেবল আল্লাহর স্মরণ। তার মাঝে মুখেও যেন আল্লাহর যিকির জারি থাকে; যেমন আগের আয়াতে আছে–
فَاِذَاۤ اَفَضْتُمْ مِّنْ عَرَفٰتٍ فَاذْكُرُوا اللهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ .
আর তোমরা যখন আরাফা থেকে প্রত্যাবর্তন কর, তখন মাশআরুল হারামের নিকট (যা মুযদালিফায় অবস্থিত) আল্লাহর যিকির কর। –সূরা বাকারা (২) : ১৯৮
অতএব এমন যেন না হয় যে, এই যিকির হজ্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সমাপ্ত হয়ে যায়। বরং হজ্বের পর যখন আর কোনো কাজ বাকি থাকবে না, তখন আল্লাহর যিকির আগের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণে হওয়া উচিত।
হজ্ব ও উমরার উদ্দেশ্য
হজ্ব ও উমরা– এই দুটি ইবাদতের উদ্দেশ্য মানুষকে আল্লাহর হুকুমের পূর্র্ণ অনুগামী বানানোর আগে ওই মাকামে পৌঁছানো, যেখানে মানুষ আল্লাহর মহব্বত ও বড়ত্বের উপলব্ধি হাসিল করে সত্যিকারার্থে আল্লাহ্ওয়ালা হয়ে যাবে।
এ আয়াতে হজ্ব ও উমরা থেকে ফারেগ হয়ে অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকিরের নির্দেশনা প্রদানের সারকথাও এটাই যে, এখন তো তোমাদের হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ এবং যবানে আল্লাহর যিকির এমনভাবে জারি হয়ে যাওয়া উচিত যে, তোমাদেরকে দেখলেই আল্লাহর কথা মনে পড়ে যাবে। যেমন এক হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ওয়ালা বান্দাদের এই গুণ বর্ণনা করেছেন–
الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا، ذُكِرَ اللهُ.
যাদেরকে দেখলেই আল্লাহর কথা মনে পড়ে যায়। –কিতাবুয যুহদ, ইবনুল মুবারক, হাদীস ২১৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৯৯৮
আল্লাহর যিকিরের ব্যাপক অর্থ
এ আয়াতে হজ্ব ও উমরা সম্পন্নকারীদের জন্য আমল নির্ধারণ করা হয়েছে অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির। এজন্য প্রথমে আল্লাহর যিকিরের হাকীকত বুঝতে হবে।
যিকিরের শাব্দিক অর্থ হল, স্মরণ করা; যা মূলত দিলের কাজ। যবানে আল্লাহর নাম নেওয়া যবানের যিকির। এমনিভাবে হাত-পায়ের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করা হাত ও পায়ের যিকির।
ইমাম ইবনুল জাযারী রাহ. ‘হিসনে হাসীন’ কিতাবে বলেন, যেসকল কাজ শরীয়তের বিধানের অনুগামী হবে, সেগুলো আল্লাহর যিকিরের অন্তর্ভুক্ত হবে। সে হিসেবে দুনিয়াবী কাজকর্ম যেমন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কারিগরি, মজদুরি ইত্যাদি– এসকল কাজেও যদি খেয়াল রাখা হয়– তাতে শরীয়তের খেলাফ কিছু হবে না; তাহলে এসকল কাজও আল্লাহর যিকির হিসেবে গণ্য হবে।
এজন্যই বেশি পরিমাণে আল্লাহর যিকির করার আদেশ করা হয়েছে।
এ আয়াতে এবং অন্য আয়াতেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে–
يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اذْكُرُوا اللهَ ذِكْرًا كَثِيْرًا .
হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির কর। –সূরা আহযাব (৩৩) : ৪১
অধিক পরিমাণে যিকিরের বিধান
আল্লাহর যিকির ছাড়া অন্য কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বেশি করার হুকুম কুরআন মাজীদে দেওয়া হয়নি। যেমন–
صلوا صلاة كثيرة.
তোমরা অধিক পরিমাণে নামায পড়। অথবা–
صوموا صوما كثيرا.
অধিক পরিমাণে রোযা রাখ– এমন নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
আল্লাহর বিধানে সহজতা ও কাঠিন্য : একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ
ইসলামী শিক্ষার প্রতিটি ধাপে এ বিষয়ের খেয়াল রাখা হয়েছে– যে ইবাদত তুলনামূলক কঠিন, সেটাকে কম পরিমাণে আবশ্যক করা হয়েছে। পাশাপাশি সেটা আদায় করার ক্ষেত্রে শর্তও খুব কম রাখা হয়েছে।
পক্ষান্তরে যেসকল আমল ও ইবাদত খুব সহজ, সেগুলোকে বারবার করার বা দৈনিক করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হল হজ্ব। যাতে সফরের বিষয় আছে। শারীরিক পরিশ্রম আছে। অর্থ খরচ করার বিষয় আছে। এমন মহান ইবাদতকে জীবনে শুধু একবার আদায় ফরয করা হয়েছে। সেটাও কেবল তাদের ওপর, যাদের এই পরিমাণ সম্পদ আছে, যার দ্বারা হজ্বের খরচ এবং সে সময় তার পরিবারের খরচের ব্যবস্থা হয়ে যায়।
এরপর তা আদায় করাকে এতটা সহজ করে দেওয়া হয়েছে যে, যিলহজ্বের ৯ তারিখে আরাফার ময়দানে অবস্থান করার দ্বারাই হজ্ব হয়ে যায়। কেউ যদি সেইদিন আরাফার ময়দান অতিক্রম করে চলে যায়, তাতেও যথেষ্ট হয়ে যাবে। বাকি সমস্ত কাজের কাফফারা কুরবানী, দম বা পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আদায় হয়ে যাবে।
আরাফার ময়দানে উপস্থিত হয়ে গেলে হজ্ব ফওত হওয়ার আর কোনো আশঙ্কা থাকে না। তবে ৯ তারিখ সূর্যাস্তের আগে যদি কোনো ব্যক্তি কোনোভাবেই আরাফার ময়দানে না পৌঁছাতে পারে, তাহলে তার কথা ভিন্ন।
হজ্বের পর কঠিন ইবাদত হল রোযা। যেখানে সারাদিন পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হয়।
এই ইবাদত সারা বছরের মধ্যে কেবল এক মাসের জন্য ফরয করা হয়েছে। তা আদায়ের ক্ষেত্রেও অনেক সহজতা ও ছাড়ের বিধান দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি রোযা রেখে ভুলবশত পানাহার করে ফেলে, তাতে রোযা ভাঙে না।
যাকাতের বিধান দেওয়া হয়েছে শতকরা আড়াই ভাগ। এটা মোটেও বড় কোনো পরিমাণ নয়। তারপরও মানব স্বভাবে তা কিছুটা ভারী মনে হতে পারে। সেজন্য এটাকেও বছরে মাত্র একবার ফরয করা হয়েছে।
সেটাও এমন সম্পদের ওপর, যার ওপর এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। উপরন্তু সেই সম্পদ হতে হয় বর্ধনশীল অর্থাৎ যে সম্পদ নিয়মিত বৃদ্ধি পায়। যেমন, ব্যবসার সম্পদ, সোনা-রুপা, পালিত পশু অর্থাৎ উট-বকরি ইত্যাদি।
সবচেয়ে সহজ ইবাদত হল নামায। এতে না কোনো সম্পদ ব্যয় হয়, না কোনো ভারী কষ্ট বা পরিশ্রম হয়। মাত্র কয়েক মিনিটের কাজ। এটাকে ফরয করা হয়েছে দিনে পাঁচ বার।
নামাযের চেয়েও সহজ ইবাদত হল আল্লাহর যিকির। যার জন্য না কোনো সময় নির্ধারিত আছে, না তার জন্য ওযু বা পবিত্রতা শর্ত। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, সর্বাবস্থায় এই আমল করা যায়।
সেজন্য যিকরুল্লাহ্র বিধান দেওয়া হয়েছে খুব বেশি পরিমাণে। সাধারণ ইবাদতগুলো থেকে ফারেগ হলে বিশেষভাবে এই ইবাদতের প্রতি মনোযোগী হতে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন, জুমা থেকে ফারেগ হওয়ার পর কুরআনের নির্দেশ হল–
فَاِذَا قُضِيَتِ الصَّلٰوةُ فَانْتَشِرُوْا فِي الْاَرْضِ وَ ابْتَغُوْا مِنْ فَضْلِ الله ِ وَاذْكُرُوا اللهَ كَثِيْرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ.
অতঃপর নামায শেষ হয়ে গেলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর। আর আল্লাহর যিকির কর বেশি বেশি, যাতে তোমরা সফলকাম হও। –সূরা জুমুআ (৬২) : ১০
এমনিভাবে হজ্ব ও উমরার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে–
فَاِذَا قَضَيْتُمْ مَّنَاسِکَکُمْ فَاذْکُرُوا اللّٰہَ کَذِکْرِکُمْ اٰبَآءَکُمْ اَوْ اَشَدَّ ذِکْرًا.
তোমরা যখন হজ্বের কাজসমূহ সম্পাদন করে ফেল, তখন আল্লাহকে সেইভাবে স্মরণ কর, যেভাবে নিজেদের বাপ-দাদাকে স্মরণ করে থাক; বরং তার চেয়েও বেশি স্মরণ কর। –সূরা বাকারা (২) : ২০০
অধিক পরিমাণে যিকিরের বিধান কেন?
অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকিরের নির্দেশ এজন্য যে, সকল ইবাদত ও আনুগত্যের মূল প্রাণ এবং আসল উদ্দেশ্যই হল আল্লাহর যিকির। চিন্তা করলে দেখা যাবে– এই পুরো জগতের রূহ বা প্রাণ হল আল্লাহর যিকির।
হাদীস শরীফে এসেছে–
لا تقوم الساعة حَتَّى لَا يُقَالَ فِي الأَرْضِ:اللهُ،اللهُ.
ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবে না, যতক্ষণ পৃথিবীতে ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ বলা হবে। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৮
অর্থাৎ পুরো পৃথিবীতে যখন ‘আল্লাহ’ বলার মতো কেউ থাকবে না, তখন কিয়ামত আসবে।
এক হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–
إِنَّ الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ، مَلْعُونٌ مَا فِيهَا، إِلَّا ذِكْرُ اللهِ وَمَا وَالَاهُ.
নিশ্চয় দুনিয়া অভিশপ্ত। দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তাও অভিশপ্ত। তবে আল্লাহর যিকির এবং আল্লাহর যিকিরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়াদি ছাড়া। –জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩২২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪১১২
এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলার কাছে পুরো দুনিয়ার মধ্যে আল্লাহর যিকির ছাড়া অন্য কোনো জিনিস গ্রহণযোগ্য ও পছন্দনীয় নয়। তবে যে বিষয় আল্লাহর যিকিরের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেটাও গ্রহণযোগ্য।
তাতে দুনিয়াবী ওই সকল কাজ, ব্যবসা, কারিগরি, চাষাবাদ ইত্যাদি এসে যাবে, যা শরীয়তের হুকুম মোতাবেক করা হয়। কেননা ইমাম ইবনুল জাযারী রাহ.-এর স্পষ্ট বক্তব্য হিসেবে সেগুলোও আল্লাহর যিকিরের অন্তর্ভুক্ত।
মোটকথা, যিকরুল্লাহ বা আল্লাহর যিকিরই সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য এবং এটাই পুরো পৃথিবীর প্রাণ।
উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা সায়্যিদ মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রাহ. এ বিষয়ে একটি ফারসি কবিতা লিখেছেন–
بگزر از ياد گل وگلين کہ ہيچم ياد نيست
در زمين و آسماں جز ذکر حق اباد نيست
ফুল ও ফুলবাগানের স্মৃতিচারণা রাখ, সেসবের কিছুই আর আমার মনে নেই।
আসমান-জমিনে আল্লাহর যিকির ছাড়া আর কিছুই স্থায়ী নয়।
যিকিরের বৈশিষ্ট্য
যিকির যেমন সকল ইবাদত, বরং পুরো দুনিয়ার আসল উদ্দেশ্য; তেমনি যিকিরের এই বৈশিষ্ট্য আছে যে, তা মানুষকে সকল মন্দ ও গোনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখে। সকল নেকী ও ভালো কাজকে সহজ বানিয়ে দেয়। মানুষকে নেক আমল ও ভালো কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
কেননা যিকরুল্লাহ্র আসল অর্থ হল, হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করা, আল্লাহকে মনে রাখা। হৃদয়ে যদি আল্লাহর স্মরণ না থাকে, তাহলে শুধু মুখে তাসবীহ জপার মাধ্যমে উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। মাওলানা রূমী রাহ. বলেন–
بر زباں تسبيح و درد دل گا و خر
اي چني تسبيح کے دارد اثر
মুখে তাসবীহ, কিন্তু মনে গরু ও গাধার চিন্তা।
এমন তাসবীহের কী-ইবা প্রভাব পড়বে!
যখন এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যিকরুল্লাহ্র আসল হকীকত হল হৃদয়ে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ রাখা। তাহলে একথাও সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, যিকরুল্লাহ মূলত একটি কিমিয়া বা পরশপাথর; যার মাধ্যমে মানুষের জীবনে বিপ্লব আসে। মানুষের সকল আমল ও আখলাক ঠিক হয়ে যায়। মানুষ প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে যায়।
কেননা এ কথা স্পষ্ট, যে ব্যক্তির হৃদয় ‘আল্লাহ’র যিকির দিয়ে আবাদ হবে, তার হৃদয়ে ‘আল্লাহ’র যিকির অত্যন্ত স্বাদ ও আনন্দের বিষয় হবে। তার কোনো কদম আল্লাহর সন্তুষ্টির বিপরীতে চলবে না। আল্লাহকর্তৃক নির্ধারিত ফরয ও ওয়াজিব আমলের ক্ষেত্রে তার কোনো শিথিলতা বা অবহেলা হবে না।
হজ্ব ও উমরার পর যিকিরের বিধান
এ আলোচনা থেকে আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে, হজ্ব ও উমরার কাজগুলো থেকে ফারেগ হওয়ার পর বেশি পরিমাণে আল্লাহর যিকিরের নির্দেশ কেবল এজন্য দেওয়া হয়নি যে, মুখে শুধু সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ বলতে থাকবে! বরং এটা একটা সংক্ষিপ্ত শিরোনাম– এ কথার যে, হজ্ব ও উমরা আদায় করার পর এমনভাবে ফিরবে যে, আল্লাহ তাআলার স্মরণ আপনার হৃদয়ে লেপ্টে থাকবে। আপনি পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর অনুগত বান্দা হবেন। বরং আল্লাহ তাআলার জন্য উৎসর্গপ্রাণ আশেক বা প্রেমিক হবেন।
ফলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা আপনার স্বভাব ও অভ্যাসে পরিণত হবে। আপনার হাত, পা, চোখ, কান, যবান– সব আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি মোতাবেক চলবে। এর বিপরীত চলাটা হবে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।
এই হল কুরআনী নির্দেশনা ওই সকল লোকদের জন্য, যারা হজ্ব ও উমরা সম্পন্ন করে ফিরছেন।
এবার নিজেদের হিসাব নিন
এখন প্রত্যেকেরই উচিত নিজ নিজ আমল ও অবস্থার হিসাব নেওয়া। যদি হারামাইন থেকে আল্লাহর স্মরণকে হৃদয়ে ভরে নিয়ে আসেন এবং প্রতি কদমে কদমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির ফিকির করেন, তাহলে আপনার এই সফর মোবারক। মোবারক আপনার দিন ও দুনিয়ার সফলতা।
আর যদি এমন না হয়; বরং যতটুকু আল্লাহর যিকির এবং আখেরাতের ফিকির হৃদয়ে সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাকে মক্কায় কিংবা জেদ্দায়ই রেখে এসেছেন; এখন আবার সেই উদাসীনতা, দুনিয়ার প্রেম, মন্দ আখলাক এবং নাজায়েজ কাজে লিপ্ত আছেন, তাহলে বুঝে নিন– বাস্তবে কেবল প্রথাগত একটি হজ্ব ও উমরা পালন করে এসেছেন। তার প্রকৃত সুফল ও বরকত থেকে আপনি মাহরূম।
একশ্রেণির হজ্বযাত্রী
অত্যন্ত আফসোস ও পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে, আমাদের অনেক ভাই এমনও আছেন, যারা হয়তো কেবল হজ্বের নাম শুনেছেন অথবা রওযায়ে আতহার যিয়ারতের ফযীলত শুনেছেন। ব্যস, তারা কেবল এতটুকুর ওপর ভিত্তি করেই ঘর থেকে বের হয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে তো এমনও আছে, যাদের নামায ঠিক নেই। পাক-নাপাক সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। অন্যকে কষ্ট দেওয়া কিংবা বিপদে ফেলার বিষয়ে তার কোনো পরোয়া নেই। হালাল-হারাম, জায়েয-নাজায়েয এবং সত্য-মিথ্যার কোনো চিন্তা নেই।
এ ধরনের লোকদের জন্যই হাজ্বীদের বদনাম হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হল, এসকল লোক, যাদের দ্বীনের বিধি-বিধান সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, তাদের এই মোবারক সফরেও এসব বিষয়ের কোনো চিন্তা নেই। তাদের এমন কোনো ভাবনা নেই যে, তারা আল্লাহর বিধান বা আল্লাহর রাসূল সম্পর্কে কিছু জানবে এবং সে অনুযায়ী আমল করবে।
নামাযীর সামনে দিয়ে চলা
অসংখ্য মানুষকে দেখা যায়, মসজিদে নববীতে নামাযী ব্যক্তির একেবারে সামনে দিয়ে অতিক্রম করছে। অথচ বিষয়টি সম্পর্কে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত কঠিন ভাষা ব্যবহার করেছেন। কত শক্তভাবে এ কাজ নিষেধ করেছেন। বলেছেন–
لَوْ يَعْلَمُ الْمَارُّ بَيْنَ يَدَيِ الْمُصَلِّي مَاذَا عَلَيْهِ، لَكَانَ أَنْ يَقِفَ أَرْبَعِينَ خَيْرًا لَه مِنْ أَنْ يَمُرَّ بَيْنَ يَدَيْهِ.
নামাযের সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী যদি জানত এজন্য কী কঠিন শাস্তি রয়েছে, তাহলে সে ৪০ (বছর) অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা সহজ মনে করত; তবুও নামাযের সামনে দিয়ে অতিক্রম করত না। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫০৭
মসজিদে নববী যেহেতু অনেক বড়, তাই ফুকাহায়ে কেরামের মতে সেখানে নামাযী ব্যক্তির এক-দুই গজ সামনে দিয়ে অতিক্রম করার অবকাশ আছে। কিন্তু দেখা যায়, একেবারে নামাযী ব্যক্তির সিজদার জায়গার মধ্য দিয়েও অতিক্রম করে। এটা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্যের সম্পূর্ণ খেলাফ।
অত্যন্ত আফসোসের কথা হল, নবীজীর হুকুমের বিরোধিতা করা হচ্ছে নবীজীর সামনে! এরপরও আমরা আশা করছি– রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সালাম পেয়ে খুশি হবেন এবং আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন!
পবিত্রতার বিষয়ে অসতর্কতা
শরীর ও কাপড় পবিত্র রাখা গুরুত্বপূর্ণ ফরযসমূহের অন্যতম। যা নামাযেরও আগের বিধান। কিন্তু দেখা যায়, অনেকে নাপাক পানি কিংবা নাপাক জায়গায় বসে যাচ্ছে। এরপর সেই কাপড় বা জুতা অন্যের কাপড়ের সঙ্গে ঘেঁষে নিয়ে চলছে।
একটু ভাবুন তো, হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ ও তার রাসূলের মহব্বতের এ কেমন হালত যে, এই সফরেও শরয়ী বিধানের বিপরীত কাজ করা হবে! এমনকি তা করা হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি মহব্বত ও আনুগত্য প্রকাশের প্রস্তুতি স্বরূপ!
কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে পবিত্রতার বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
الطُّهُورُ شَطْرُ الإِيمَانِ.
পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৩
হাত ও মুখে অন্যকে কষ্ট দেওয়া
সফরসঙ্গীদেরকে কিংবা অন্য কাউকে হাত ও মুখ দিয়ে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা হচ্ছে না। অথচ এটা এমন গোনাহ, যা নির্দিষ্ট ওই ব্যক্তি ক্ষমা না করা পর্যন্ত মাফ হবে না।
আর সফরে এবং বিশেষ করে এই সফরে যার সাথে মন্দ আচরণ করা হয়, তাকে আরেকবার কাছে পাওয়া তো খুব সহজ নয়। তাহলে কীভাবে তার কাছ থেকে ক্ষমা করিয়ে নেবে?
একটু সাবধান হোন
কিছুটা অজ্ঞতা আর কিছুটা উদাসীনতার কারণে অনেকে এ সফরেও বিভিন্ন ধরনের গোনাহে লিপ্ত থাকে। তারা শুধু এতটুকু শুনেছে যে, হজ্ব-উমরার মাধ্যমে অতীত জীবনের সকল গোনাহ মাফ হয়ে যাবে। অথচ বান্দার হক বান্দা নিজে মাফ না করলে মাফ হবে না!
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন, যেন আমরা কুরআনের নির্দেশনার পূর্ণ অনুসরণ করতে পারি। আল্লাহর স্মরণ যেন আমাদের সবকিছুর ওপর প্রাধান্য পায়। যার ফলে নিজেদের আমল ও আখলাকের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি এবং সেগুলো সংশোধনের ফিকির করতে পারি।
শেষ সময়ে করণীয়
এখন আমাদের এই সফর সমাপ্ত হচ্ছে। আমরা তওবা-ইস্তিগফার ও দুআ কবুলের বড় বড় জায়গা হারামাইনে রেখে এসেছি; কিন্তু নিরাশ না হই। কেননা হজ্ব ও উমরাকারী যতক্ষণ নিজের ঘরে না ফিরবে, ততক্ষণ সে যেন হজ্ব ও উমরার মধ্যেই আছে। তাই এই অবস্থায়ও তার দুআ কবুল হয়।
এজন্য বাকি সময়টুকু অনেক বড় নিআমত ও গনীমত মনে করে নিজের অতীত গোনাহসমূহ থেকে তওবা করি। এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজ আমল সংশোধনের দৃঢ় সংকল্প করি।
যদি দ্বীনের বিধি-বিধান ও মাসায়েল জানা না থাকে, তাহলে এখান থেকে এই মজবুত নিয়ত করি যে, দেশে গিয়ে তা শেখার জন্য পূর্ণ মেহনত ও চেষ্টা শুরু করব। নিজ সন্তান-সন্ততিকে অবশ্যই দ্বীনের জরুরি ইলম শেখাব।
আমরা যদি এই শেষ সময়েও নিজেদের আমল ও আখলাক সংশোধনের মজবুত সংকল্প করি এবং অতীত গোনাহ ও দুর্বলতাগুলোর জন্য মন থেকে তওবা করি, তাহলে অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের অসম্পূর্ণ ইবাদত ও ত্রুটিপূর্ণ কাজগুলোকেও কবুল করে নেবেন। দয়াময় আল্লাহর দয়া, ক্ষমা ও উদারতার তো কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
এই অনুরোধ করেই আজকের আলোচনা সমাপ্ত করছি। সেইসাথে আপনাদের সকলের কাছে এই দরখাস্ত করছি, আল্লাহর ওয়াস্তে এই অধম গোনাহগারের জন্য মাগফিরাতের দুআ করবেন। আমল-ইবাদতের তাওফীক ও যাবতীয় অবস্থা সংশোধনের দুআ করবেন। হয়তো আপনাদের দুআর ওসিলায় আল্লাহ তাআলা আমাকেও ক্ষমা করে দেবেন। দুআ কবুলের এই মুহূর্তগুলোকে নিজের জন্য, নিজের পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের জন্য কল্যাণের দুআ ও নিজ আমল সংশোধনের ফিকিরে ব্যয় করবেন।
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العلمين.
[মুফতী শফী রাহ.-এর ‘হজ্ব ও যিয়ারত’ পুস্তিকা থেকে
অনুবাদ :
মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব]