Zilhajj 1447   ||   June 2026

বাংলাদেশের দুই সীমান্তেই গেরুয়া আগ্রাসন
‖ সতর্ক থাকতে হবে দেশ ও জাতিকে

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির বিজেপির ভরাডুবি হলেও বাংলাদেশের দুই সীমান্তের দুইটি প্রদেশে বড় জয় পেয়েছে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী দলটি। মে মাসে ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তের পশ্চিম বাংলায় ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি। বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে মোট ২০৭টি আসন পেয়েছে তারা। ইতোমধ্যেই সেখানে শপথ নিয়েছেন চরম মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী।

এই রাজ্যে ক্ষমতার স্বাদ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ছিল বিজেপি। বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা সেখানে চেষ্টা চালিয়েছে এবং বহু কলাকৌশল খাটিয়েছে। বারবার কেন্দ্রীয় বড় বড় মন্ত্রী সেখানে সফর করেছেন। প্রায় তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসকে সরাতে এবার তারা মরণকামড় দিয়েছিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কলাকৌশল এঁটেই ক্ষমতার মসনদে বসেছে হিন্দুত্ববাদী এই উগ্র দলটি।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে মোদির দলে এত খুশির বন্যা বয়ে গিয়েছে যে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই উড়ে এসেছেন শুভেন্দুর শপথ অনুষ্ঠানে। তিনি বাংলার মাটিতে কপাল ছুঁয়ে বাংলা মাকে (তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী) অভিবাদন ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তার সাথে ছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় বড় বড় মন্ত্রীরা।

অন্যদিকে যেমনটি আশঙ্কা করা হয়েছিল, ঠিক তেমনি দেখা যাচ্ছে শুরু থেকে। শুভেন্দু শপথ নেওয়ার আগেই পুরো পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ব্যাপকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন মুসলিমরা। উগ্রবাদী বিজেপির কর্মীরা মুসলিমদের বাড়িঘর, দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। সে আগুনে ঘি ঢেলেছেন খোদ শুভেন্দু। তিনি বলেছেন, আমরা হিন্দুদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। মুসলিমরা মমতাকে ভোট দিয়েছে।

তার এ সাম্প্রদায়িক বক্তব্য কর্মীদেরকে মুসলিম নির্যাতনে আরও উসকে দিয়েছে। এতে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পশ্চিমবঙ্গজুড়ে।

অন্যদিকে ‘ভারতের অনেক মুসলিম বাংলাদেশ ও আশপাশের দেশ থেকে গিয়েছে’ এ মিথ্যা ও ঠুনকো দাবিতে, যা বিজেপি আগে থেকেই বলে আসছিল, বিভিন্ন মুসলিম ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া শুরু করেছে। সেগুলো সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিবিকে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তের ভারতীয় প্রদেশ আসামেও পুনরায় নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি সরকার। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসার পর প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির তরফ থেকে এখন উভয় চাপে পড়ল। একদিকে ভারত সরকারের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিবাদী পলাতক প্রধানমন্ত্রীকে বউ আদরে আশ্রয় প্রদান, যিনি কিনা আবার উগ্রবাদী বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ে অভিনন্দন জানাতেও বিলম্ব করেননি; অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দুই সীমান্তের দুই প্রদেশে বাংলাদেশবিরোধী বৈরী সরকার। এই উভয় সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের জনগণ।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই বাংলাদেশকে অগ্রসর হতে হবে। দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা, সাহসিকতা দিয়ে যে-কোনো আগ্রাসন রুখে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, নমনীয়তা ও আত্মমর্যাদা পরিপন্থি কোনো মানসিকতা ও সিদ্ধান্ত কখনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না; বরং এই ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও দেশকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং লজ্জায় ফেলে। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চলবে সম্মান ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে। দেওয়া এবং নেওয়া এই দুটোকে সমন্বয় করতে গিয়ে ক্রমেই আগ্রাসনের কাছে মাথা নোয়ানো যাবে না। যে-কোনো কড়া বক্তব্যের জবাব সেভাবেই দিতে হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এটি কারও দয়ায় চলে না। সুতরাং বাংলাদেশের সরকার এবং বাংলাদেশের জনগণ তাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ থাকবে। কোনো উসকানিতে পা দেবে না।

যে-কোনো আগ্রাসন মোকাবেলা করার সাহস ও সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে এটাও প্রতিবেশীদের মনে রাখতে হবে। সাথে ভারতে অবস্থানরত মুসলমান ভাইবোনদের প্রতিও আমাদের সমর্থন ও সমবেদনা অব্যাহত থাকবে। ভারতের সাধারণ জনগণ, যারা নিরুপায় আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সহায়তা করুন, জালেমদের হাত দুর্বল করে দিন।

বিজেপি যতই মুসলমানদেরকে নির্যাতন করুক, তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাক এবং সেটা তারা করেও যাচ্ছে বহু বছর থেকে, কিন্তু তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে, মুসলিমরা দমে যাওয়ার মতো জাতি নয়। ভারতীয় মুসলিমরা সেটার প্রমাণও দিয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং হিম্মত হারানো নয়; বরং ঈমানী বলে বলীয়ান হয়েই জালেমদের মোকাবেলা করতে হবে। আর মুসলিমরা সেটা করতেও জানে।

 

advertisement