Zilqad 1447   ||   May 2026

মডার্নিজম
‖ আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন : পাঁচ দিনের স্মৃতিকথা

Mawlana Mufti Taqi Usmani

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

১১ যিলকদ ১৩৮৭ হিজরী

আজ উন্মুক্ত অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা।’ সভাপতিত্ব করছিলেন তাশখন্দের মুফতী জিয়াউদ্দিন বাবাখানভ। সহ-সভাপতি হিসেবে ছিলেন শায়েখ আহমাদ কুফতারো এবং পূর্ব পাকিস্তানের জাস্টিস সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ। পর্যালোচনার দায়িত্বে ছিলেন প্রফেসর আবু বকর হালীম এবং খাজা সরওয়ার হাসান (পাকিস্তান)।

অধিবেশনের বিষয়টি বেশ সরল। এতে তেমন বিতর্কের অবকাশ ছিল না। কারণ এ সত্য কে অস্বীকার করবে

مزدکي ہو کہ فرنگي، ہوس خام ميں ہے

امن عالم تو فقط دامن اسلام ميں ہے

মজদকী  কিংবা ফিরাঙ্গী সবাই আছে অপূর্ণ আকাক্সক্ষায়,

বিশ্বশান্তি তো শুধু ইসলামের আঁচলে।

এ কারণে পর্যালোচকদের মঞ্চে দাঁড়াতে হয়নি।

মুফতীয়ে আযম ফিলিস্তিন মুহাম্মাদ আমীন আলহুসাইনী, মরক্কোর আবদুর রহমান আদদুক্কালি, সিরিয়ার শায়েখ আহমাদ কুফতারো, মালয়েশিয়ার ড. এস এ হাসান, সৌদি আরবের শায়েখ হাসান কুতবী, পাকিস্তানের পীর সাহেব দেওল শরীফ এবং ব্রিগেডিয়ার গুলযার আহমাদ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। কয়েকজন বক্তা ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদেরও সমালোচনা করেন। অবশেষে দুপুর ১টা পেরিয়ে গেলে এই অধিবেশনও সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

বিকেল দুইটার পর থেকে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বৈঠক শুরু হওয়ার কথা। এ উদ্দেশ্যে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়। পারিবারিক আইনসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য গঠিত প্রথম কমিটিতে ছিলেন

হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী, হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানূরী, মুফতী মাহমুদ (মুলতান), আল্লামা আলাউদ্দিন সিদ্দিকী, হযরত মাওলানা রাগিব আহসান (পূর্ব পাকিস্তান), মুফতী জাফর হুসাইন, প্রফেসর নাশাত চুগতায়ী (তুরস্ক), জনাব জাফর শাহ ফুলওয়ারী, ড. ফজলুর রহমান, জনাব মুহাম্মাদ মাসউদ (মহা ব্যবস্থাপক, ওয়াকফ আদালত, পশ্চিম পাকিস্তান), জনাব করম শাহ (পূর্ব পাকিস্তান) এবং  জনাব আবুল হাশেম (পূর্ব পাকিস্তান)। মাওলানা গোলাম মোরশেদ সাহেবকে এই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়।

দ্বিতীয় কমিটির বিষয় ছিল, ‘মানুষের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য।’ এর চেয়ারম্যান ছিলেন সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ। সদস্যরা ছিলেন

প্রফেসর যাকী ওলীদী তোগান (তুরস্ক), প্রফেসর এ বি এ হালীম (পাকিস্তান), শায়েখ মানসূর আলমাহজূব (লিবিয়া), শায়েখ হাসান কুতবী (সৌদি আরব), ড. হোসেইন নাসর (ইরান), শায়েখ আবদুর রহমান আদদুক্কালী (মরক্কো), জনাব উমর ফররূখ (লেবানন) এবং ড. সিরাজুল হক (পাকিস্তান)।

তৃতীয় কমিটির আলোচ্য বিষয় ছিল, ‘ব্যাংকিং ও বীমা ব্যবস্থা।’ এর চেয়ারম্যান ছিলেন জনাব মুমতাজ হাসান সাহেব। এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা শামসুল হক আফগানী (পাকিস্তান), জনাব ইয়াকুব শাহ (পাকিস্তান), শায়েখ আহমাদ কুফতারো (সিরিয়া), ড. জাওয়াদ আলী (ইরাক), জনাব কামাল তারযী (তিউনিসিয়া), প্রফেসর আবু বকর আলখলীফা (সুদান), ড. এস এ হাসান (মালয়েশিয়া), ড. মাহমুদ ফাতহুল্লাহ (ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক বা সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র) এবং জনাব আবদুল কুদ্দুস প্রমুখ।

মৌলিক মানবাধিকার সম্পর্কিত কমিটির সদস্যদের সন্ধ্যা পর্যন্ত কোরাম পূরণ করায়  ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল। বাকি দুই কমিটি বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যায়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈঠক পরদিন হবে।

বিকেলে প্রতিনিধিদের ইসলামাবাদ শহর ঘুরে দেখার কথা ছিল। তাই ৫টা বাজার কিছু আগে পুরো কাফেলা হোটেল থেকে রওয়ানা হয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যে ইসলামাবাদ পৌঁছে গেল।

পাকিস্তানের এই নয়া রাজধানী হিমালয় পর্বতমালার কোল ঘেঁষে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে উঠছে। ইনশাআল্লাহ, যৌবনের পূর্ণতায় পৌঁছে এটি বিশ্বের সুন্দর শহরগুলোর একটি হয়ে উঠবে। এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া ও মুগ্ধকর দৃশ্য স্রষ্টার অপার দান। উত্তরদিকে হিমালয়ের প্রাকৃতিক প্রাচীর শহরের সৌন্দর্য ও গৌরবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে আর দক্ষিণ দিকে রাওয়াল বাঁধ নির্মাণের ফলে এর সবুজ শোভা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

এখানে এসে অজান্তেই সায়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সেই দুআটি মনে পড়ে গেল

رَبِّ اجۡعَلۡ ہٰذَا الۡبَلَدَ اٰمِنًا وَّاجۡنُبۡنِيۡ وَبَنِيَّ اَنۡ نَّعۡبُدَ الۡاَصۡنَامََ.

হে আমার রব! এই নগরীকে শান্তি ও নিরাপত্তার স্থান বানিয়ে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন। সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৩৫

আমি মনে মনে দুআ করতে লাগলাম, আল্লাহ করুন, এই শহর সত্যিকার অর্থেই ‘ইসলামাবাদ’ হয়ে উঠুক। শুধু পাথর পূজা নয়; ভ্রান্ত মতবাদ, নফস ও প্রবৃত্তির কামনা এবং সব ধরনের মিথ্যা পূজা থেকেও নিরাপদ থাকুক, আমীন।

ইসলামাবাদ পৌঁছে আমরা হোটেল শেহেরযাদের লনে আসর নামায আদায় করলাম। নামাযের পর একজন দায়িত্বশীল অফিসার আমাদের সামনে ইসলামাবাদের মানচিত্র ব্যাখ্যা করলেন। মাগরিবের একটু আগে আমরা ইসলামাবাদ সেক্রেটারিয়েটে (সচিবালয়) পৌঁছলাম। সে সময় এটি রুচিশীল নকশায় নির্মিত ইসলামাবাদের সবচেয়ে সুন্দর ইমারত ছিল।

মাগরিব নামায আমরা জামে মসজিদে আদায় করলাম। নামাযের পর তিউনিসিয়া প্রতিনিধি কামাল তারযী ‘কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার স্মরণে আয়োজিত জশন’-এ বক্তব্য দেন। তিনি বলেন

‘এই জশন বা আনন্দ মাহফিল উদ্যাপনের অর্থ এই নয় যে, আমরা কয়েকটি জমায়েত বা সমাবেশ করে দায়িত্ব শেষ করে ফেলব; বরং এর প্রকৃত দাবি হল, প্রত্যেকে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি, পবিত্র কুরআনকে আমাদের জীবনে কতটা ধারণ করেছি; কুরআনী শিক্ষার কতখানি আমরা আমল করেছি আর কত নির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।’

পাকিস্তানের সাধারণ মুসলমান আমলের দিক থেকে যেমনই হোক না কেন, ইসলামের প্রতি গভীর ভালবাসা তাদের রক্তে মিশে আছে। মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া নানা দেশ ও চেহারার মুসলিমদের একত্রে দেখে তারা আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠেছিল। তারা অতিথিদের ভাষা বোঝে না; কিন্তু ভালবাসার প্রকাশ তো আর ভাষায় আটকে থাকে না। তারা প্রফুল্ল চেহারায় মেহমানদের স্বাগত জানাচ্ছিল। তাদের ভালবাসা-ভরা দৃষ্টিতে আপন করে নেওয়ার হৃদয়স্পর্শী বার্তা ছিল।

কিছুক্ষণ পর এই কাফেলা ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটে গেল। সেখানে তাদের দপ্তর ও গ্রন্থাগার পরিদর্শন করার পর রাওয়ালপিন্ডি ফিরে এল।

১২ যিলকদ ১৩৮৭ হিজরী

আজ অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘ইসলামে সামাজিক ইনসাফ।’ সভাপতিত্ব করছিলেন জামিয়া আযহারের পরিচালক জনাব বাকুরী। সহ-সভাপতি ছিলেন তুরস্কের ড. যাকী ওলীদী তোগান এবং ইসলামাবাদ ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর ড. রযীউদ্দীন সিদ্দিকী।

পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত শেষে সর্বপ্রথম যাকী ওলীদী তোগান প্রবন্ধ পাঠ করেন। তাঁর পাঠের ধরনে প্রথমে বোঝা যাচ্ছিল না যে, তিনি ইংরেজিতে পড়ছেন। আমরা যখন প্রবন্ধের বিষয়বস্তু বুঝে ওঠার চেষ্টা করছি, তখনই প্রবন্ধ পাঠ শেষ হয়ে গেল।

ইসলামে সম্পদ বণ্টনরীতি

এরপর আমার শ্রদ্ধেয় পিতা হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব মুদ্দা যিল্লুহু মঞ্চে আসেন। তাঁর প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘ইসলামে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা’।

এই প্রবন্ধে তিনি সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় আঙ্গিকে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিপরীতে ইসলামে সম্পদ বণ্টন-নীতি এবং এই বিষয়ে ইসলামী শিক্ষার চমৎকার উপস্থাপন করেন। বিশেষত সুদের নিষিদ্ধতা, ব্যক্তি-মালিকানার ধারণা এবং নিয়োগকর্তা ও শ্রমদাতার পারস্পরিক সম্পর্কের ইসলামী রূপ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন।

প্রবন্ধের প্রায় অর্ধেক পড়া হয়ে গেলে সহ-সভাপতি ড. রযীউদ্দীন সিদ্দিকী সময় স্বল্পতার কথা বলে প্রবন্ধ সংক্ষিপ্ত করার অনুরোধ জানান। কিন্তু উপস্থিত শ্রোতারা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে শুনছিলেন। তারা সভাপতির কাছে প্রবন্ধটি সম্পূর্ণ পড়ার অনুরোধ করেন।

ফলে মুফতী ছাহেব গোটা প্রবন্ধ পড়ে শোনান। পড়ার সময় বারবার প্রশংসা-ধ্বনি উঠতে থাকে। বিশেষ করে যখন তিনি ব্যক্তি-মালিকানা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেন এবং সুদের নিষিদ্ধতার অর্থনৈতিক যুক্তিগুলো তুলে ধরেন, তখন প্রায় প্রতিটি অংশেই দীর্ঘ সময় ধরে ‘মারহাবা’ ধ্বনিতে হল মুখরিত হয়ে ওঠে।

প্রবন্ধটি উর্দূ ভাষায় হলেও আরব অতিথিরা মাঝে মাঝে কুরআনের আয়াত এবং উর্দূতে ব্যবহৃত আরবী শব্দের সাহায্যে এর অর্থ কিছুটা ধরতে পারছিলেন। তাই মুফতী সাহেব বক্তব্য শেষ করলে অধিবেশনের সভাপতি জনাব বাকূরী তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন

وَاللهِ عِلْمٌ غَزِيرٌ!

‘নিঃসন্দেহে প্রবন্ধটি অগাধ ইলমে পূর্ণ!’

এরপর চায়ের বিরতি হল। বিরতির সময়ও মুফতী সাহেবের প্রবন্ধটি সবার মুখে মুখে ছিল। আমি অনুভব করলাম, প্রবন্ধটি শ্রোতাদের ওপর ভালো প্রভাব ফেলেছে।

সভার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হল। আমি মুহতারাম আব্বাজানের শারীরিক অসুস্থতা ও দুর্বলতার কথা বিবেচনা করে তাঁকে কামরায় ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলাম, যাতে দুপুর দুইটার অধিবেশনের আগে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। তিনি কামরায় চলে গেলেন।

মুহতারাম মাওলানা সামীউল হকের সঙ্গে আমি যখন আবার সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করলাম, তখন কুয়েতের এক মন্ত্রী জনাব রিফায়ী সাহেব বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি একটি ‘আন্তঃইসলামী সংস্থা’ গড়ার প্রস্তাব দেন, যা ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞানচর্চা, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে পারে।

‘ব্যক্তি-মালিকানা অবৈধ’

তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানের ওয়াক্ফ আদালতের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মাদ মাসউদ প্রবন্ধ পাঠ করা শুরু করেন।

আমি বিস্মিত হলাম যিনি উর্দূ ভাষার এত বড় ‘সমর্থক’, এমনকি নামাযও উর্দূতে পড়ার পক্ষে মত দেন, তিনিই আবার ‘ইংরেজি’তে প্রবন্ধ পড়ছেন!

প্রবন্ধের মূল বক্তব্য ছিল, ইসলামে ব্যক্তি-মালিকানা বৈধ নয়; বরং (সোশ্যালিজম বা সমাজতন্ত্রের মতো) ইসলামের শিক্ষা হল, সব জমি সরকারের মালিকানাধীন হওয়া উচিত!

কিন্তু এই বিষয়টি আলোচনার আগে তিনি কোনো কারণে আলেমদের ‘কথা’ শোনানো দরকার মনে করলেন।

ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ

প্রবন্ধের দীর্ঘ ভূমিকায় তিনি আলেমদের বিরুদ্ধে শুধু শব্দের মাধ্যমেই নয়; কণ্ঠস্বর এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করলেন। এই উত্তেজনাপূর্ণ বরং অনেকটা নাটুকে বক্তৃতাভঙ্গি বিদ্বানদের গুরুগম্ভীর এই সম্মেলনে হাসির খোরাক জোগাচ্ছিল।

এরপর জনাব মুহাম্মাদ মাসউদ ব্যক্তি-মালিকানা অবৈধ হওয়ার দাবি প্রমাণ করতে গিয়ে কুরআনের কিছু আয়াত থেকে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেন এবং নিজের মনমতো কয়েকটি হাদীসও পেশ করলেন।

বক্তব্যের সময় তিনি সাহাবীদের নাম বারবার ভুল উচ্চারণ করছিলেন। যেমন রাফে‘ ইবনে খাদীজ রা.-এর নাম ‘রাফেয়া ইবনে খুদাইজ’ পড়ছিলেন। আর বিলাল ইবনে রাবাহ-কে ‘বুলাল হাবশী’ উচ্চারণ করছিলেন।

এতে শ্রোতাদের একজন উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, ‘জনাব! সাহাবীদের নাম সঠিক উচ্চারণ করুন। ‘রাফেয়া’ নয়, রাফে‘ হবে। আর ‘বুলাল’ নয়, বিলাল হবে!’

এই আপত্তির পর বক্তার হঠাৎ তীব্র পিপাসা অনুভূত হল। তিনি আয়োজকদের কাছে পানি চাইলেন। কিন্তু পানি চাওয়ার ভঙ্গিটা অদ্ভুত ছিল। ফলে শ্রোতারা হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। কয়েক মুহূর্তের জন্য সভাকক্ষে হাসির রোল পড়ে গেল।

পানি পান করার পর তিনি আবার প্রবন্ধ পড়া শুরু করলেন। এক জায়গায় এসে বললেন, ‘এই বিষয়ে আমি আরও অনেক প্রমাণ উল্লেখ করেছিলাম, কিন্তু সংক্ষিপ্ততার জন্য সেগুলো বাদ দিচ্ছি।’

এ কথা শুনে শ্রোতাদের মধ্য থেকে কেউ বলে উঠল, ‘এই অনুগ্রহের জন্য আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ!’

প্রবন্ধের শেষে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত উঁচু করে তিনবার বললেন

هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْم فَتُخْرِجُوهُ لَنَا؟

‘তোমাদের কাছে কোনো জ্ঞান থাকলে হাজির করো!’

চ্যালেঞ্জ ছোড়ার এই ভঙ্গি দেখে বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল এটা কি জ্ঞানতত্ত্ব ও গবেষণার সম্মেলন, নাকি বাজারি বিতর্কের ময়দান!

সভায় শোরগোল

এই সময় হযরত মাওলানা মুফতী মাহমুদ সাহেব দাঁড়িয়ে সভাপতির কাছে প্রবন্ধটি পর্যালোচনা করার অনুমতি চান। কিন্তু সহ-সভাপতি রযীউদ্দীন সিদ্দিকী সময় স্বল্পতার অজুহাত দেন।

তখন শ্রোতারা বলে উঠলেন, পর্যালোচনার জন্য অবশ্যই সময় দেওয়া উচিত। বারবার জোর দাবি ওঠার পর সভাপতি জনাব বাকূরী বললেন, ‘অধিকাংশ শ্রোতা পর্যালোচনার দাবি করলে সময় দেওয়া হবে।’

এরপর চারদিক থেকে আওয়াজ উঠতে লাগল, ‘পর্যালোচনার সুযোগ দিতে হবে।’

কিন্তু রযীউদ্দীন সিদ্দিকী সুযোগ না দিয়ে উল্টো ঘোষণা করলেনএখন জনাব মুমতাজ হাসান সাহেব প্রবন্ধ পেশ করবেন।’

এই ঘোষণার পর শ্রোতাদের দাবি প্রথমে ‘প্রতিবাদে’, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘উত্তেজনায়’ রূপ নিল। মুহূর্তেই অনেক শ্রোতা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

সামনের সারিতে বসা একজন অতিথি তো খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদ মাসউদ সম্পর্কে বেশ কঠিন কথা বলতে শুরু করলেন। পুরো হলে তাঁর কণ্ঠই সবচেয়ে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী জনাব এস এম যফর সাহেব অনেক কষ্টে তাঁকে শান্ত করলেন।

কিন্তু ততক্ষণে সভার শৃঙ্খলা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। অনেক শ্রোতা আসন ছেড়ে স্টেজের কাছে চলে এসেছিলেন। আমার পক্ষে স্টেজ দেখা কঠিন হয়ে পড়ছিল।

যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করল, মুফতী মাহমুদ সাহেব সভাপতির কাছে গিয়ে বললেন, এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক।  পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া না হলে শ্রোতাদের এই প্রতিবাদ যথার্থ বলে বিবেচিত হবে। তাছাড়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। আপনি যদি আমাকে দশ মিনিট কথা বলার সুযোগ দেন, আশা করি পরিস্থিতি শান্ত হবে। বাজারি বিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ বা উত্তেজনা তৈরি করা আমার উদ্দেশ্য নয়; আমি ইলমী ভাষায় ভারসাম্যপূর্ণ পন্থায় প্রবন্ধটি পর্যালোচনা করতে চাই।

এই কথা সভাপতির মনে ধরল। তিনি অনুমতি দিলেন। কিছুক্ষণ পর মুফতী মাহমুদ সাহেবকে ডায়াসে দেখা গেলে ধীরে ধীরে সভাকক্ষ শান্ত হতে লাগল। প্রায় এক মিনিট ধরে পুরো হল ‘মারহাবা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে রইল।

পর্যালোচনা

হযরত মুফতী ছাহেব সংযত ও সতর্ক ভঙ্গিতে মুহাম্মাদ মাসউদের প্রবন্ধের ওপর মন্তব্য করা শুরু করলেন।

এ সময় জনাব মাসউদের এক সমর্থক হঠাৎ দাঁড়িয়ে কিছু বলতে শুরু করলেন। কিন্তু মনে হচ্ছিল, এর আগে কখনো বড় মঞ্চে কথা বলার নাযুকতা অনুভব করেননি। ফলে দাঁড়ানোর পর তিনি বেশ বিব্রত অবস্থায় পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ আটকে আটকে কয়েকটি অসংলগ্ন বাক্য বললেন। এরপর পেছন থেকে এক ব্যক্তি তাকে বসে পড়ার পরামর্শ দিলে তিনি তা মেনে নিতে মোটেও দেরি করলেন না এবং দ্রুতই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেলেন।

এরপর হযরত মুফতী সাহেব মুহাম্মাদ মাসউদের উপস্থাপিত যুক্তিগুলো (পড়ুন, সংশয়গুলো) পর্যালোচনা করতে গিয়ে বললেন

‘জনাব মাসউদ সাহেব কুরআনের যেসব আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করেছেন, খোদ সেগুলোই তাঁর মত খণ্ডন করে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ব্যক্তি-মালিকানার প্রামাণ্যতার বিরুদ্ধে যে আয়াতটি উদ্ধৃত করেছেন

إِنَّ ٱلۡأَرۡضَ لِلهِ.

‘নিশ্চয়ই জমিন আল্লাহর’

সেখানে তিনি আয়াতটির পরের অংশ লক্ষ করেননি

يُورِثُهَا مَن يَشَآءُ.

‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তাকে এর উত্তরাধিকারী করেন।’

আর রাফে‘ ইবনে খাদীজ রা.-এর যে হাদীস তিনি পেশ করেছেন, সেই হাদীসেই অপর মুসলিম ভাইকে জমি উপহার হিসেবে দেওয়ার কথা এসেছে। অথচ উপহার তখনই দেওয়া সম্ভব, যখন দানকারী ব্যক্তি নিজেই সেই সম্পদের মালিক হয়।

মুফতী সাহেব আরও বলেন

‘ইসলামে ব্যক্তি-মালিকানার স্বীকৃতি ও এর স্বপক্ষে বিস্তারিত দলীল-প্রমাণ আমার আগে শ্রদ্ধেয় মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব তাঁর প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এই সাধারণ বিষয়টি তো যে কেউ বুঝতে পারে; যদি ব্যক্তি-মালিকানা স্বীকারই না করা হয়, তাহলে যাকাত, উশর, খারাজ  এবং আল্লাহর রাস্তায় দান এইসব বিধানের অর্থই-বা কী থাকে? অথচ কুরআন-হাদীস তো এসব নির্দেশনায় ভরপুর।’

মুফতী সাহেবের প্রতিটি বাক্যের পরই শ্রোতারা আনন্দ ও জোরালো সমর্থন প্রকাশ করছিলেন। প্রায় দশ মিনিট বক্তব্য দেওয়ার পর তুমুল প্রশংসার মধ্য দিয়ে তিনি ডায়াস থেকে নেমে আসেন। এরপরই সভা সমাপ্তির ঘোষণা করা হয়।

সেদিন সন্ধ্যায় পূর্বোক্ত তিনটি কমিটির শেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু বৈঠকগুলোর কার্যবিবরণী প্রকাশ করা হয়নি।

১৩ যিলকদ ১৩৮৭ হিজরী

সেদিন ছিল সমাপনী অধিবেশন। সভাপতিত্ব করছিলেন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী খাজা শিহাবুদ্দিন। সহ-সভাপতি ছিলেন আল্লামা আলাউদ্দিন সিদ্দিকী এবং ড. ফজলুর রহমান।

প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে ড. ফজলুর রহমান ইংরেজিতে সম্মেলনের তিনটি অধিবেশনের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সম্মেলন আয়োজনে জোর দেন।

এরপর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রতিনিধিরা নিজেদের অনুভূতি ও মতামত প্রকাশ করেন। সর্বশেষে ইরানের প্রতিনিধি ড. হোসেইন নসর বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কথা বলে যান।

এক. ‘আমরা নিজেরা কীভাবে সত্যিকার মুসলিম হব’

সম্মেলনের বিভিন্ন বক্তৃতায় ইসলাম প্রচারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেনঅমুসলিমদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর পাশাপাশি আমাদের এ বিষয়েও গভীর চিন্তা করা উচিত আমরা নিজেরা কীভাবে সত্যিকার মুসলমান হব। দীর্ঘদিন ধরে ওঠা-বসা, আচার-আচরণ ও জীবনযাপনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা অমুসলিমদের রীতি-নীতি অনুসরণ করছি এবং ইসলামী আদব-আখলাককে অগ্রাহ্য করছি। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।’

দুই. ‘গবেষণা পদ্ধতি সঠিক হতে হবে’

তিনি বলেনবর্তমান যুগে নতুন সৃষ্ট বিষয়ে ইসলামী বিধান আহরণে ইজতিহাদ ও গবেষণার বড় প্রয়োজন। কিন্তু সেই গবেষণার পদ্ধতি ও নীতি অবশ্যই ইসলামসম্মত হতে হবে। নইলে এমন হবে যে, প্রবন্ধের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’, শেষে ‘ওয়া বিহী নাস্তাঈন’, কিন্তু মাঝখানে সব কথাই অনৈসলামিক। এমন প্রবন্ধের কোনো উপকার নেই।”

“কুরআনে ‘উলামা’ শব্দে বিজ্ঞানচর্চাকারীদের বোঝানো হয়েছে!”

সবশেষে খাজা শিহাবুদ্দিন সভাপতির প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধের মূলকথা ছিল

১. মুসলমানদের পতনের কারণ সাধারণত যেভাবে বলা হয় পাশ্চাত্য রীতি গ্রহণ করা, নাচ-গান ইত্যাদিতে লিপ্ত হওয়া তা আসল কারণ নয়।  আসল কারণ হল, পবিত্র কুরআন নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা ছেড়ে দেওয়া।

২. কুরআনের মৌলিক আহ্বানই হচ্ছে সৃষ্টিজগৎ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনে ‘আলেম’ বলা হয়েছে সেইসব মানুষকে, যারা সঠিক চিন্তা অনুযায়ী সাইন্স ও বিজ্ঞান চর্চা করে। আর

اِنَّمَا يَخۡشَي اللّٰہَ مِنۡ عِبَادِہِ الۡعُلَمٰٓؤُا.

‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে ভয় করে ইলমের অধিকারীরাই।’

আয়াতটিতে ‘আলেম’ বলতে মূলত এই ধরনের ব্যক্তিদেরকেই বোঝানো হয়েছে, (যারা বিজ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করে)!

৩. মুসলমানদের স্থবিরতার একটি কারণ হল, তারা নিজেদের ইতিহাসকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে। অথচ এটা সেই ইতিহাস, যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত ও পবিত্র জীবনীকে কলুষিত করেছে।

৪. এই কারণে মুসলমানদের উচিত শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ‘ইসলামী চিন্তা’ গড়ে তোলা, যাতে তারা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাকে ‘ধর্মের কল্যাণে’ ব্যবহার করে।

৫. সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন রীতিনীতি পুনঃযাচাই করা এবং ‘যুগের নতুন প্রয়োজন’ অনুযায়ী প্রচলিত ফিকহ পুনর্বিন্যাস বা নতুনভাবে সংকলন করা।

সম্মেলনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি

এই প্রবন্ধটি সভাকক্ষকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দেয়।

প্রথমত, সমাপনী অধিবেশন এমন বিষয় আলোচনার উপযুক্ত ছিল না, যা নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। সে কারণেই সেদিনের কর্মসূচিতে এ ধরনের কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, যদি ওই দিন এই মতামত প্রকাশ করা অপরিহার্য হয়ে থাকে, তাহলে যেহেতু প্রবন্ধের অনেক বক্তব্য মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত ও সর্বজনস্বীকৃত বিষয়ের বিপরীত ছিল; তাই যে খোলামেলা ভঙ্গিতে এসব মতামত প্রকাশ করা হয়েছে, ঠিক তেমনি খোলা মনে অন্যদের মতামত শোনা যুক্তিযুক্ত হত। কারণ একটি সম্মেলনের উদ্দেশ্যই তো হল বিভিন্ন মতের মানুষ একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি দূর থেকে শুনে বিচার করার পরিবর্তে কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করবে।

তাই যুক্তিসংগত হত, যদি খাজা শিহাবুদ্দিন প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর সভায় উপস্থিত থেকে অন্যদেরও মতামত প্রকাশের সুযোগ দিতেন। কারণ আগের অধিবেশনগুলোতেও এই নিয়ম ছিল।

তাছাড়া তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছিলেন, তিনি ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে এসব মতামত প্রকাশ করছেন, এগুলোকে সরকারি অবস্থান হিসেবে বোঝা উচিত নয়।

কিন্তু উপস্থিত শ্রোতারা যখন প্রবন্ধটি আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা করার সুযোগ পেলেন না, তখন তারা দাঁড়িয়ে প্রবন্ধের ওপর আপত্তি জানাতে শুরু করলেন। এদিকে খাজা শিহাবুদ্দিন অল্পক্ষণের মধ্যেই সম্মেলন থেকে চলে গেলেন।

এর ফলে ব্যাপক শোরগোল সৃষ্টি হল। অনেকেই আসন ছেড়ে উচ্চৈঃস্বরে প্রবন্ধটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে লাগলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সভার শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল।

যে সম্মেলনের শেষ অধিবেশনটি অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত এক দুঃখজনক হট্টগোলের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হল।

বিদেশি প্রতিনিধিদের ওপর এই পরিস্থিতির কী প্রভাব পড়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়। অনেক বিদেশি প্রতিনিধি তো খাজা শিহাবুদ্দিনের প্রবন্ধে বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন।

 

কাদিয়ানী অপতৎপরতা!

এই সম্মেলনের মাঝখানে একটি মজার ঘটনাও ঘটেছিল, যা শেষে উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে।

বিদেশি প্রতিনিধিরা রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থানকালে কাদিয়ানীরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তাদের দাওয়াতী অপতৎপরতা জারি রেখেছিল। তবে অধিকাংশ অতিথি কাদিয়ানী মতবাদের ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত হওয়ায় তাদের বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল না। তবে একদিন একটি ঘটনা ঘটে।

মুফতী জিয়াউদ্দিন বাবাখানভের তরুণ সেক্রেটারি একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আহমদী কারা?’

আমি সংক্ষেপে তাকে কাদিয়ানীদের পরিচয় দিলাম। তিনি বললেনপরশু আমার সঙ্গে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।’

আমি বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বললেন, “পরশু সন্ধ্যায় আমি হোটেলের লাউঞ্জে বসে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি পাশে এসে বসলেন। তিনি খুব সাবলীল আরবী বলছিলেন। আমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই মুহূর্তে আপনার হাতে কী কাজ?’

আমি বললাম, ‘আমি একটু শহর ঘুরে দেখতে চাই।’

তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের গাড়িতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তারপর আমাকে নিয়ে পুরোনো শহরের দিকে গেলেন এবং একটি জায়গায় গাড়ি থামালেন।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কোন্ জায়গা?’

তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে আমাকে গাড়ি থেকে নামার ইশারা করলেন এবং একটি ভবনের ভেতর নিয়ে গেলেন।

গিয়ে দেখি, কয়েকজন লোক গোল হয়ে বসে আছে। ক্লাসের মতো মনে হল। সেখানে তিনি আমাকে কিছু বই দেখালেন। কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং বললেন, ‘এটি একটি মাদরাসা, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়।’

আমি বারবার বলছিলাম, এখানে না থেকে আমি শহরটা ঘুরে দেখতে চাই। কিন্তু তিনি প্রতিবারই কোনো না কোনো অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন এবং আমাকে বেশ কিছুক্ষণ সেখানেই বসিয়ে রাখলেন।

এর মধ্যেই তিনি একটি রেজিস্টার নিয়ে এলেন এবং আমাকে অনুরোধ করলেন, যাতে আমি সেখানে মাদরাসা পরিদর্শন সম্পর্কে আমার মন্তব্য লিখি।

ততক্ষণে তাঁর ধোঁয়াশাপূর্ণ ও কিছুটা প্রতারণামূলক আচরণ আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল। তাই আমি সেখানে কয়েকটি সাধারণ ও নিরপেক্ষ ধরনের বাক্য লিখে দিলাম।

এরপর তিনি আমাকে অনেকগুলো বই দিয়ে আবার হোটেলে পৌঁছে দিলেন।

হোটেলে এসে বইগুলো খুলে দেখি, সেগুলোতে ‘জামাআতে আহমদীয়া’র নাম লেখা। বাবাখানভকে এই দলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি বললেনএটা আসলে কাদিয়ানী মতবাদের আরেক নাম। এরা মুসলমান নয় এবং এক মিথ্যুককে ‘নবী’ বা ‘মাসীহ’ বলে মানে।  তাদের সঙ্গে যাওয়া উচিত হয়নি তোমার।’

পরদিন সন্ধ্যায় আমি হোটেলের লাউঞ্জে বসে ছিলাম। তখন সেই লোক আবার এসে বলল, ‘আমার সঙ্গে চলুন!’

গতদিনের আচরণে আমি খুবই বিরক্ত ছিলাম। তাই কঠোর স্বরে তাকে বললাম, আমি আপনার সঙ্গে কিয়ামতের দিনই যেতে পারব! আর যতক্ষণ না আপনাকে আপনার আসল ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পারি, ততক্ষণ আপনার সঙ্গ ছাড়ব না।”

ইসরার সাহেব শেষের এই কথাটি এমন সরলভাবে বলছিলেন যে, আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না।

‘অবিলম্বে কথা থেকে কাজে অগ্রসর হওয়া’

সেদিন রাতে কুরআন কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ইসলামাবাদের হোটেল শেহেরযাদে একটি নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। ভোজপূর্ব বক্তব্যে কুয়েত প্রতিনিধি জনাব রিফায়ী সাহেব বলেন, ‘পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার স্মরণে আয়োজিত জশনকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা হলে তা কুরআনের প্রতি অবিচারের শামিল হবে। তাই আমাদের উচিত বিলম্ব না করে কথা থেকে কাজে অগ্রসর হওয়া।’

তিনি একটি প্রস্তাব দেন পবিত্র কুরআন হিফজ করানো এবং এর হেদায়েত ও শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপক আন্দোলন শুরু করা উচিত, যাতে এই উদ্যাপনের বাস্তব ফলাফল সামনে আসে।

এরপর ড. মাহমুদ ফাতহুল্লাহ বক্তব্য রাখেন। প্রায় ৪৫ মিনিটের বক্তৃতায় তিনি পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায় কুরআন বোঝার মৌলিক নীতিমালা ও সুন্নাহর প্রামাণিকতা ব্যাখ্যা করেন এবং কুরআনের তাফসীর করার শর্ত ও আদব বিস্তারিত তুলে ধরেন।

তিনি বিশেষভাবে ‘তাফসীর বির-রায়’ (উম্মাহর অনুসৃত ও গৃহীত নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজ খেয়াল-খুশি ও নির্দিষ্ট মতবাদ অনুসরণ করে তাফসীর করার) নানাবিধ সমস্যা চিহ্নিত করেন। পাশাপাশি তিনি প্রচলিত সেই স্লোগানের জবাব দেনকুরআনের তাফসীর করার জন্য আলেম হওয়ার শর্তারোপ করা মানে ধর্মের ওপর আলেমদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।’

বক্তৃতার মাঝখানে হঠাৎ আমার দৃষ্টি সামনের সারিতে বসা কয়েকজন ‘ইসলামী গবেষক’(!)-এর’ দিকে পড়ল। দেখি তারা মাথা নিচু করে বসে আছেন। কেন জানি না, হঠাৎ আমার মনে এই কবিতা ভেসে উঠল

مرا قصۂ شبِ غم ہو بياں تو سنتے سنتے

وہ جہاں نظر جھکا ديں وہيں لطفِ داستاں ہے

আমার শোকের রাতের গল্প যদি বলি,

শুনতে শুনতে সে যখন চোখ নামিয়ে ফেলে, সেখানেই গল্পের মাধুর্য।

[সমাপ্ত]

 

টীকা

(১) ‘মজদকী’ বলতে প্রাচীন পারস্যের (ইরান) মজদক (Mazdak)-এর অনুসারীদের বোঝায়।  মজদকের চরম সাম্যবাদের মূলকথা ছিল, ‘সম্পদ ও নারী সবাই সমানভাবে ভোগ করবে’! ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও একক বিবাহবন্ধন অবৈধ এবং লোভ ও সংঘাতের মূল কারণ’! মরহুম ইকবাল এখানে মজদককে সোশ্যালিজম বা কমিউনিজমের প্রাচীন প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ফিরাঙ্গী’ শব্দটি ইউরোপীয় বা পশ্চিমা (বিশেষ করে ইংরেজ-ফরাসি) সভ্যতা ও মানুষকে বোঝায়। এর দ্বারা পশ্চিমা পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আধুনিকতাবাদ ও ভোগবাদকে নির্দেশ করা হয়েছে।

(২) কোরাম (Quorum) হল কোনো সভা, পরিষদ বা আইনসভায় বৈধভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপস্থিত থাকতে হবে এমন ন্যূনতম সদস্য সংখ্যা।

(৩) উশর জমির ফসলের যাকাত। আর খারাজ ইসলামী রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট জমির কর।

(৪) পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও বার্তা নিয়ে সঠিকপন্থায় চিন্তা করলে পরিষ্কার হবে, কুরআন-সুন্নাহ্র বিধান ও নির্দেশনা না মেনে বা উপেক্ষা করে বিজাতীয় বিশ্বাস, চিন্তা, কর্মপদ্ধতি ও জীবনাচার গ্রহণ করা মুসলিমদের বিচ্যুতি ও পতনের মৌলিক কারণ। আল্লাহ তাআলা নামাযের প্রতি রাকাত সূরা ফাতিহার মাধ্যমে শুরু করার বিধান দিয়েছেন। কুরআনের এই প্রথম সূরার শেষ আয়াত মুমিনদেরকে বিজাতীয়দের পথ ও পন্থা বর্জনের বার্তা দেয়।

(৫) এটি স্পষ্টতই আয়াতের অর্থবিকৃতি।  তাফসীরে উসমানীতে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে

তবে ভয় করে তারাই, যারা আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব, আখেরাতের স্থায়িত্ব ও অবিনশ্বরতা এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব ও নশ্বরতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করে, নিজ প্রভুর বিধি-বিধান ও আদেশ-নিষেধের পূর্ণ জ্ঞান ও ইলম রাখে এবং ভবিষ্যতের (কবরের, আখেরাতের) ব্যাপারে সর্বদা ফিকির করে। যার মধ্যে এ উপলব্ধি ও জ্ঞান যে পরিমাণে থাকবে, সে আল্লাহ তাআলাকে ওই পরিমাণ ভয়ই করবে। আর যার মধ্যে আল্লাহ্র ভয় নেই, সে আলেম আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্যতাই রাখে না।’ [সূরা ফাতির (১৪) : ২৮, তাফসীরে উসমানীর বাংলা অনুবাদ ৩/১৫৩, ২য় টীকা দ্রষ্টব্য]

বিশ্বজগতের সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা অন্তরে আল্লাহ্র ভয় তৈরি হওয়ার একটি মাধ্যম হতে পারে। আর সঠিক উদ্দেশ্য ও যথাযথ পন্থায় সাইন্স বা বিজ্ঞানচর্চা (সাইন্টিসিজম বা বিজ্ঞানবাদ নয়) এই জ্ঞানলাভের একটি সূত্র হতে পারে। কিন্তু কুরআনে ‘আলেম’ বলে সরাসরি বিজ্ঞানচর্চাকারীকে বোঝানো হয়েছে এমন দাবি নেহাত অজ্ঞতাপ্রসূত।

(৬) অথচ জাল, বানোয়াট বর্ণনা এবং কুরআনুল কারীম, বিশুদ্ধ সুন্নাহ, ইজমা ও সাহাবায়ে কেরামের সীরাতের মাধ্যমে যে সীরাত ও নবীজীবন প্রমাণিত, তার বিপরীত চিত্রায়ণ করে এমন সব বর্ণনা মুসলিম উম্মাহ্র সর্বযুগের ইমাম ও আলেমগণের কাছে অনির্ভরযোগ্য ও পরিত্যাজ্য। উম্মাহ কখনোই তা সীরাতে নববীর অংশ বলে গণ্য করেনি।

(৭) এটিই মডার্নিজমের চিন্তাগত মূল ভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্নতা, যা এর ধারকরা তরুণ ও যুবকশ্রেণির মাঝে ছড়িয়ে দিতে চায়। পরবর্তী দাবিটিও এই চিন্তা বাস্তবায়নের নমুনা।

 (৮) বিষয়টি মূল উদ্ধৃতিসহ বিস্তারিত জানতে পড়ুন, ‘কাদিয়ানী সম্প্রদায় অমুসলিম হওয়ার কারণ’, মাওলানা মুহাম্মাদ সাজিদুল ইসলাম, মাসিক আলকাউসার, শাওয়াল ১৪৪৬ মোতাবেক এপ্রিল ২০২৫ সংখ্যা।

 

advertisement