Shawal 1447   ||   April 2026

মাত্র সাড়ে চার সেকেন্ড

জাভেদ চৌধুরী

নিয়াজ আহমাদের বয়স ছিল মাত্র ৩৬ বছর। তিনি ছিলেন উর্দূর শিক্ষক। একটি মাধ্যমিক স্কুলে উর্দূ পড়াতেন। আল্লাহ তাআলা তাকে সুন্দর কণ্ঠ, সুঠাম দেহ ও সুস্বাস্থ্যও দান করেছিলেন। পড়ানোর কৌশলও খুব ভালো জানতেন। ছাত্ররাও ছিল তার খুব ভক্ত।

এ জনপ্রিয়তাই তাকে শিক্ষক প্রশিক্ষণের দিকে নিয়ে যায়। আর তিনি হয়ে ওঠেন শিক্ষকদের শিক্ষক।

গত ১ জুলাই লাহোর ক্রিসেন্ট মডেল স্কুলে একটি লেকচার দিচ্ছিলেন। ক্লাসটিও শুরু করেছিলেন দারুণভাবে। পুরো উদ্যম নিয়েই তিনি পড়াচ্ছিলেন। এক ফাঁকে তিনি হোয়াইট বোর্ড থেকে ক্লাসরুমের দিকে ফিরে দাঁড়ান। কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ হয়ে যান। এরপর মাটিতে বসে পড়েন। দুই হাত মাটিতে রেখে দুইবার দীর্ঘ শ্বাস নেন। একপর্যায়ে উপুড় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং মাত্র সাড়ে চার সেকেন্ডের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে।

সহকর্মীরা তার দিকে ছুটে যাচ্ছিল, কিন্তু তারা পৌঁছার আগেই সে চলে গিয়েছিল। লেকচারটি যেহেতু রেকর্ড হচ্ছিল, তাই প্রায় সাথে সাথেই তা সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে আসে। লাখো মানুষের হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। আমি নিজেও ক্লিপটি দেখেছি। সাত দিন পার হয়ে গেলেও এখনো এর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারিনি।

একবার ভাবুন তো, মরহুম নিয়াজ আহমাদেরও নিশ্চয় অনেক স্বপ্ন ছিল। তিনিও হয়তো ধনী, প্রভাবশালী ও বিখ্যাত হতে চাইতেন। হয়তো তাঁরও চেষ্টা ছিল তিন-চার তলা বাড়ি বানানোর। তাতে থাকবে ফুল-ফলের বাগান। যেখানে বসে তিনি চা পান করবেন। তিনিও হয়তো দামি গাড়ি কিনতে চাইতেন। ব্যাংক-ব্যালেন্সের কথাও হয়তো ভাবতেন। হয়তো সন্তানদের নিয়েও তাঁর অনেক পরিকল্পনা ছিল। তিনিও হয়তো জীবনের খেলায় জয়ী হতে চাইতেন। তিনিও নিশ্চয় বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তার সাথে কী ঘটে গেল? মাত্র সাড়ে চার সেকেন্ডেই সব স্বপ্ন ফেলে তিনি চলে গেলেন। তার সব উপার্জন পড়ে রইল। যা উপার্জনের ছিল তাও পেছনে রয়ে গেল। আর এটাই জীবন, প্রকৃত জীবন।

আমাদের জীবনের সবকিছুই অনিশ্চিত ও অসম্পূর্ণ। এইসব অসম্পূর্ণতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে একমাত্র নিশ্চিত ও পূর্ণ হল মৃত্যু। আমরা তা ঠ্যাকাতেও পারি না, এড়িয়েও চলতে পারি না। কখন, কোথায়, কীভাবে মৃত্যু আসবে দুনিয়ার কেউই তা জানে না।

কিছুদিন আগে ডা. মাইকেল এগনরের (Dr. Michael Egnor) একটি লেকচার শুনেছিলাম। তিনি আমেরিকার একজন নিউরো সার্জন। সাত হাজার ব্রেন সার্জারি করেছেন। তিনি একজন অধ্যাপক এবং নিউরো সার্জারির খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় তিনি নাস্তিক ছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং তাক লাগিয়ে দেন।

তিনি তার লেকচারে এমন দুটি দাবি করেছেন, যা দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছে

প্রথম দাবি হল, মানুষের মন (Mind) তার মস্তিষ্কের ভেতরে থাকে না; ব্রেনের বাইরে থেকেই মন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে তা কোথায় থাকে এবং কীভাবে থাকে বিজ্ঞানের কাছে এর কোনো উত্তর নেই।

তিনি দাবি করেছেন, তার কাছে এমন অনেক রোগী এসেছে, যাদের দুই-তৃতীয়াংশ মস্তিষ্ক নষ্ট হয়ে গিয়েছিল অথবা তিনি তা অপারেশন করে ফেলে দিয়েছিলেন। এর পরও তারা ভাবতে ও সাড়া দিতে পারছিল। অথচ বিজ্ঞানমতে, ততক্ষণে তাদের মস্তিষ্ক থেকে চিন্তাশক্তি বিলুপ্ত হওয়ার কথা।

তিনি বলেন, কোমায় থাকা মানুষের মস্তিষ্কও নড়াচড়া করে, তারা সংখ্যা গোনে ও স্বজনদের নাম শুনলে সাড়া দেয়। এটা কীভাবে সম্ভব, তা তিনি নিজেও বোঝেন না।

তার সহকর্মী এক মৃগীরোগীর মস্তিষ্ক দুই ভাগ করে কেটে আলাদা করে ফেললেও দুই ভাগ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল এবং বাইরে থেকে বার্তা পাচ্ছিল। তবে কেন ও কীভাবে, তা কেউ জানে না।

দ্বিতীয় দাবিটি ছিল আত্মা (Soul) সম্পর্কে। তিনি বলেন, আত্মা আছে এবং এটি মরেও না। শুধু দেহ ছেড়ে কোথাও চলে যায়। কেন যায়, কোথায় যায় জানা নেই।

তিনি এক রোগীর কথা বললেন, যার মস্তিষ্কে অপারেশনের সময় হৃৎপিণ্ড (Heart) সম্পূর্ণ থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং মস্তিষ্ক (Brain) থেকে সব রক্ত বের করে দেওয়া হয়েছিল। পঞ্চাশ মিনিট পর্যন্ত সে জীবনের কোনো স্পন্দন ছাড়াই ছিল। তারপর আবার হৃৎপিণ্ড চালু করা হল, দেহে রক্ত দেওয়া হল, সে জীবিত হল। আর জ্ঞান ফেরার পর বলল, সে নিজের অপারেশন নিজের চোখে দেখেছে। সে দেহ ছেড়ে উঠে গিয়ে উপরে ভেসে থেকে তাদের সবকিছু দেখেছে। সব কথা শুনেছে। এমনকি অপারেশন থিয়েটারে কী মিউজিক বাজছিল, তাও বলেছে। অথচ তার হৃৎপিণ্ড পুরোপুরি বন্ধ ছিল, মস্তিষ্কে কোনো রক্ত ছিল না, তাহলে সে কীভাবে এসব জানল? এটা কীভাবে সম্ভব? এটা আমাকেও স্তব্ধ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে ফেরা ডজনখানেক রোগীর তিনি চিকিৎসা করেছেন। তাদের অধিকাংশই বলেছে, মৃত্যুর পর তারা এক টানেলের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে তাদের মৃত আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা হয়েছিল। অনেকে দুর্ঘটনার পর এমন মানুষের সঙ্গেও দেখা করে ফিরে এসেছে, যে তার সঙ্গে একই গাড়িতে ছিল এবং দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। অথচ তারা ওই সাথির অবস্থা জানতই না। কেন ও কীভাবে এমন হয়, ডাক্তারও জানেন না।

মরহুম নিয়াজ আহমাদ ও প্রফেসর মাইকেল এগনরের গল্প নিজ নিজ জায়গায় যথার্থ। কিন্তু এটি চূড়ান্ত বাস্তবতা যে, আমাদের সকলকেই মরতে হবে। আমাদের আত্মা দেহ ছেড়ে কবে চলে যাবে দুনিয়ার কেউ জানে না।

আল্লাহ তাআলা যদি বিষয়টি শুধু শরীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দিতেন, তাহলে আমরা হয়তো ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাস, জিন থেরাপি, ওষুধ ইত্যাদির মাধ্যমে জীবনের পরিধি বাড়িয়ে নিতাম। আমরা নিজেদের মস্তিষ্ক (Brain), হৃৎপিণ্ড (Heart), ফুসফুস (Lung), কিডনি (Kidney), যকৃতের (Liver) আয়ু বাড়িয়ে নিতাম। কিন্তু এটি শুধু দেহের খেলা নয়। এখানে আত্মা (Soul) এবং মনও (Mind) জড়িত। এই দুটি কোথায় লুকিয়ে থাকে বা দেহের বাইরে অন্য কোথা থেকে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা জানা নেই।

তাই আমাদের মস্তিষ্কে কখন চিন্তার সংকেত আসা বন্ধ হবে, কখন আত্মা এই সুন্দর সাজানো দেহ ছেড়ে চলে যাবে আমরা কেউই জানি না। বরং দুনিয়ার কেউই তা জানে না। সুতরাং আপনার মস্তিষ্কে যত ভালো চিন্তা আসে, তার সদকা (দান) দিন সে অনুযায়ী চলুন। আর সব ধরনের খারাপ চিন্তা তাড়িয়ে দিন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আর প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি দিনকে শেষ উপহার মনে করে আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করুন এবং এর সদ্ব্যবহার করুন। কারণ আত্মা ও দেহের মাঝে মাত্র সাড়ে চার সেকেন্ডের সম্পর্ক। কখন এই বাঁধন ছিঁড়ে যাবে, তা কেউ জানে না।

বিশ্বাস না হলে নিয়াজ আহমাদের ভিডিওটি আবার দেখুন। সে যদি মৃত্যু থেকে বাঁচতে না পারে, তবে আমি-আপনি কীভাবে বাঁচব?

[এক্সপ্রেস নিউজ

(০৮ জুলাই ২৫) থেকে

ভাষান্তর : মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ফাহাদ]

 

advertisement