Shawal 1447   ||   April 2026

‘মাআলিমুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ’
‖ সংকলকের কিছু দাবি ও তার পর্যালোচনা

মাওলানা আতাউল্লাহ ও মাওলানা শরীফ হাসান

بسم الله الرحمن الرحيم

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের আরেক নাম সুন্নাহ। হাদীস ও সুন্নাহ ইসলামী শরীয়তের বহুত বড় দলীল; কুরআন কারীম বোঝা, কুরআনের বিধিবিধানের বিবরণ জানা এবং কুরআনের তাফসীরের সবচেয়ে বড় উৎস।

কুরআন কারীম সূরা ফাতেহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত ওহীর এই পূর্ণ কিতাব একই মুসহাফে সংরক্ষিত আছে। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল হাদীস ও সুন্নাহ কোনো একটি বা দুটি কিতাবে এসে গেছে, এমন নয়। কিন্তু ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় বিভিন্ন সময় কিছু লোক বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা দাবি করেছে, অমুক অমুক কিতাবে সকল হাদীস এসে গেছে। একসময় কিছু লোক সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম সম্পর্কেও এমন দাবি করেছিল। হাদীসের ইমামগণ এই ভুল চিন্তা খণ্ডন করেছেন। সেইসাথে বাস্তব বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় পেশ করেছেন এবং প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

হাদীস শরীফের মৌলিক অনেকগুলো গ্রন্থ থেকে সহীহ ও হাসান হাদীসের বড় একটি সংকলন তৈরি করেছেন শায়েখ সালেহ আহমাদ শামী হাফিযাহুল্লাহ। সমষ্টিগতভাবে কাজটি সুন্দরই ছিল। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়াল যখন তিনি যথাযথ না ভেবে এ দাবি করে বসলেন যে, সকল সহীহ হাদীস এখন তার এই এক কিতাবেই সন্নিবেশিত হয়ে গেছে। অথচ বাস্তবতা হল, কোনো একটি বা দুটি কিতাবে সকল সহীহ হাদীস সন্নিবেশিত হয়ে যাওয়ার দাবি কালও যেমন ভুল ছিল আজও তেমনি ভুল।

ইমামগণ সত্যই বলেছেন

مَن ادّعى أَنَّ السُنّةَ اجتمعتْ كلها عندَ رجلٍ واحدٍ فَسَقَ، ومن قالَ: إنَّ شيئًا منها فاتَ الأمةَ فَسَقَ.

অর্থাৎ যে দাবি করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল হাদীস ও সুন্নাহ কোনো এক ব্যক্তির আয়ত্তে এসে গেছে, সে একটা ফাসেকী কথা বলল। তেমনিভাবে যে দাবি করে, হাদীস ও সুন্নাহ্র কোনো একটি অংশ গোটা উম্মত থেকে হারিয়ে গেছে, সে-ও ফাসেকী কথা বলল। আননুকাতুল ওয়াফিয়্যাহ, বিকায়ী ১/১২৬

মাআলিমুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ’ কিতাবটি যুগোপযোগী একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ সংকলন হওয়ায় কারও ক্ষেত্রে এ অবাস্তব দাবিতে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রয়োজন ছিল, কিতাবটির উপকারিতা স্পষ্ট করার পাশাপাশি এ বাস্তব বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা যে, কী কী কারণে এটিকে সকল ‘সহীহ হাদীস সম্বলিত সংকলন’ বলা বাস্তবসম্মত নয়।

মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর উলূমুল হাদীস বিভাগের প্রধান উস্তায হযরত মাওলানা সাঈদ আহমদ বিন গিয়াসুদ্দীন দামাত বারাকাতুহুমের তত্ত্বাবধানে এ বিভাগের দুজন তালিবুল ইলম মাওলানা আতাউল্লাহ ও মাওলানা শরীফ হাসান প্রবন্ধটি প্রস্তুত করেছেন। পরে এতে আরও কিছু সংযোজন করেন মাওলানা মাহমুদ বিন ইমরান। মাওলানা সাঈদ আহমদ এবং অধমের নযরে সানীর পর প্রবন্ধটি আলকাউসারে প্রকাশ করা হচ্ছে।

আজকাল হাদীস অস্বীকারের মতো কুফুরী ফেতনা যত ব্যাপক হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রবন্ধ পাঠকবৃন্দের জন্য খুবই জরুরি। আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা সবাইকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন আমীন।

বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক]

 

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস ও সুন্নাহ শরীয়তের দলীল। তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআন কারীমের সঙ্গে নবীজীর হাদীস ও সুন্নাহ্ও সংরক্ষণ করবেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য নূর ও হেদায়েত হিসেবে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত রাখবেন। কুরআনের মতো হাদীসের খেদমতের জন্যও আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে তাঁর নির্বাচিত বান্দাদেরকে অর্থাৎ মুহাদ্দিসীন, ফুকাহা ও বিভিন্ন ফনের আহলে ইলমকে নিয়োজিত রেখেছেন।

হাদীসে নববীর শব্দমালার হেফাযতের জন্য মুহাদ্দিসীনে কেরাম নানা দিক থেকে বিভিন্ন খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। যে যুগে যে ধরনের খেদমতের জরুরত ছিল, তারা সে যুগে সে ধরনের খেদমতই আঞ্জাম দিয়েছেন।

মুহাদ্দিসীনের খেদমতের একটি ধারা হল, উলামা-তলাবার সহজতার জন্য একাধিক হাদীসগ্রন্থের হাদীসগুলোকে সুবিন্যস্তরূপে একটি গ্রন্থে নিয়ে আসা।  এই কাজটি তারা বিভিন্ন আঙ্গিকে করেছেন। উদাহরণস্বরূপ সহীহাইন তথা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসগুলো জমা করা, কুতুবে সিত্তার  হাদীসগুলো একত্র করা, যেসকল হাদীস কুতুবে সিত্তায় আসেনি, হাদীসের অন্যান্য কিতাব থেকে সেগুলো জমা করা ইত্যাদি। পরিভাষায় শেষ প্রকারের সংকলনগুলোকে কুতুবুয যাওয়ায়েদ   (كُتُبُ الزَّوَائِد) বলা হয়।

হিজরী পঞ্চম শতক থেকেই এই ধারা আরম্ভ হয়ে গেছে এবং এখনো চলমান আছে, আলহামদু লিল্লাহ।

এ ধারার প্রসিদ্ধ কয়েকটি কিতাব হল

১- الجمع بين الصحيحين

সংকলক : ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ফুতূহ আলহুমাইদী  রাহ. (৪৮৮ হি.)।

এতে তিনি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসগুলো জমা করেছেন।

২- جامع الأصول في أحاديث الرسول

সংকলক : ইমাম ইবনুল আসীর রাহ. (৬০৬ হি.) ।

এতে তিনি কুতুবে সিত্তার হাদীস জমা করেছেন। তবে তিনি ষষ্ঠ কিতাব হিসেবে সুনানে ইবনে মাজাহর পরিবর্তে ইমাম মালেক রাহ. সংকলিত মুয়াত্তা নির্বাচন করেছেন।

৩- مجمع الزوائد ومنبع الفوائد

সংকলক : ইমাম নূরুদ্দীন হাইসামী  রাহ. (৭৩৫-৮০৭ হি.)।

এতে তিনি মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে আবু ইয়ালা, মুসনাদে বাযযার এবং ইমাম তবারানীর মু‘জামে কাবীর, মু‘জামে আওসাত ও মু‘জামে সগীর এই ছয় কিতাবের যাওয়ায়েদ জমা করেছেন। অর্থাৎ কুতুবে সিত্তার বাইরে অতিরিক্ত যে হাদীসগুলো এসব কিতাবে রয়েছে, সেগুলো তিনি এই সংকলনে বিষয়ভিত্তিক অধ্যায় আকারে একত্র করেছেন।

৪- جمع الفوائد من جامع الأصول ومجمع الزوائد

সংকলক : ইমাম সায়্যিদ মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান রূদানী মাগরিবী মালেকী  রাহ. (১০৯৪ হি.)।

এ কিতাবে তিনি জামেউল উসূল ও মাজমাউয যাওয়ায়েদের হাদীসসমূহ জমা করেছেন এবং সঙ্গে সুনানে ইবনে মাজাহ ও সুনানে দারেমীর যাওয়ায়েদ (অর্থাৎ যে হাদীসগুলো উক্ত দুই সংকলনে নেই) যুক্ত করেছেন। কিতাবের তারতীব বিষয়ভিত্তিক।

৫- المطالب العالية بزوائد المسانيد الثمانية

সংকলক : হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী  রাহ. (৮৫২ হি.)।

এতে তিনি হাদীসের আটটি মুসনাদগ্রন্থ থেকে কুতুবে সিত্তা ও মুসনাদে আহমাদে আসেনি এমন হাদীসগুলো জমা করেছেন। আটটি মুসনাদ হল মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী, মুসনাদে হুমাইদী, মুসনাদে ইবনে আবী উমর আলআদানী, মুসনাদে মুসাদ্দাদ ইবনে মুসারহাদ, মুসনাদে আহমাদ ইবনে মানী‘, মুসনাদে আব্দ ইবনে হুমাইদ, মুসনাদে আবু বকর ইবনে আবী শাইবা (এটি ইমাম ইবনে আবী শাইবা রাহ.-এর প্রসিদ্ধ মুসান্নাফ নামক গ্রন্থ নয়, বরং তারই সংকলিত ভিন্ন ও স্বতন্ত্র গ্রন্থ) ও মুসনাদে হারেস ইবনে আবী উসামা।

এই কিতাবে হাদীসগুলো ফিকহী অধ্যায়ের তারতীবে সনদসহ জমা করা হয়েছে।

৬- إتحاف الخيرة المهرة بزوائد المسانيد العشرة

সংকলক : হাফেয শিহাবুদ্দীন আহমাদ ইবনে আবু বকর ইবনে ইসমাঈল আলবূসিরী  রাহ. (৭৬২-৮৩৯ হি.)।

এতে তিনি হাদীসের দশটি মুসনাদগ্রন্থ থেকে কুতুবে সিত্তায় আসেনি এমন হাদীসগুলো জমা করেছেন। দশটি মুসনাদ হল মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী, মুসনাদে হুমাইদী, মুসনাদে মুসাদ্দাদ ইবনে মুসারহাদ, মুসনাদে আবু বকর ইবনে আবী শাইবা, মুসনাদে ইসহাক ইবনে রাহুইয়াহ, মুসনাদে ইবনে আবী উমর আলআদানী, মুসনাদে আহমদ ইবনে মানী‘, মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদ, মুসনাদে হারেস ইবনে আবী উসামা ও মুসনাদে আবু ইয়া‘লা মাওসিলী।

তিনি এ কিতাবে হাদীসগুলো সনদসহ বিষয়ভিত্তিক অধ্যায় আকারে একত্র করেছেন।

রচনা-গবেষণা, ফিকহ-ফতোয়া দাওয়াত ও তাবলীগে দ্বীন এবং ওয়ায-নসীহতের ময়দানে এই কিতাবগুলোর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এসকল কাজে নিয়োজিত আলেম, গবেষক, লেখক, মুফতী, দায়ী ও অন্যান্য আহলে ইলম এবং তালিবে ইলমগণ যুগ যুগ ধরে এই কিতাবগুলোর মাধ্যমে খুব উপকৃত হচ্ছেন। তবে এটাও ঠিক যে, এই কিতাবগুলোকে তারা কখনো মূলের বিকল্প মনে করতেন না। অর্থাৎ যেহেতু এই কিতাবগুলোতে বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থের হাদীসগুলো জমা করা হয়েছে, সেহেতু এই কিতাবগুলো অধ্যয়ন করলেই যথেষ্ট হবে; হাদীসের মৌলিক গ্রন্থগুলো আর দেখার প্রয়োজন হবে না এমন কথা তারা বলেননি। তেমনিভাবে এই কিতাবসমূহের খোদ সংকলকগণও এই দাবি করেননি যে, এগুলোর দ্বারা পূর্বের সমস্ত হাদীসগ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ খোলাসা ও সারাংশ জমা হয়ে গেছে এবং সকল মুসলিমের দ্বীন-দুনিয়ার সমস্ত জরুরি বিষয়ের দিকনির্দেশনা এই কিতাবগুলোতে চলে এসেছে; অতএব এখন হাদীসের ইলম হাসিল করার জন্য কেবল এই কিতাবগুলো অধ্যয়ন করলেই চলবে; আর কোনো কিতাব দেখার প্রয়োজন নেই! এমন দাবি না সেই সংকলকগণ করেছেন আর না বাস্তবে এমন দাবি করা সম্ভব।

হযরাতুল উস্তায মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের এই কথা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

وكتب الزوائد كثيرة لستُ بصدد استقصائها هنا، وإنما أردت أن أذكر أن الرجوع إلى كتب الزوائد، أعني زوائد المسانيد على الكتب الستة، طريق من طرق الاستفادة من كتب المسانيد، وإن كان الاقتصارُ على كتب الزوائد (وكذا كتب الجمع) يَحْرِم الطالب الكثيرَ والكثيرَ من الفوائد الحديثية المتعلقة بالأسانيد والمتون، فلا بد من الرجوع إلى الأصول في مجال التحقيق، وأما من أراد العلم والحفظ فإنما يديم النظر فيها ويكثر من درسها، أعني الكتب التي هي الأصول.

(আলমাদখাল ইলা উলূমিল হাদীসিশ শরীফ, পৃ. ৫৪-৫৫)

এ কথার সারমর্ম হল, যদিও আমরা কুতুবুল মাসানীদ (হাদীসের এক প্রকারের মৌলিক গ্রন্থসমূহ) থেকে উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে কুতুবুয যাওয়ায়েদের শরণাপন্ন হতে পারি, কিন্তু তা কখনো হাদীসের মূল গ্রন্থসমূহের বিকল্প হতে পারে না। হাদীসের মৌলিক কিতাবসমূহের শরণাপন্ন না হয়ে কেবল কুতুবুয যাওয়ায়েদ (বা এজাতীয় শাখাগ্রন্থসমূহ)-এ আবদ্ধ থাকলে হাদীসের মূল পাঠ ও বর্ণনাসূত্র সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ ফায়েদা ও মূল্যবান তথ্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে মৌলিক গ্রন্থসমূহের শরণাপন্ন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আর যে ব্যক্তি গভীর ইলম ও প্রজ্ঞা পেতে চায় এবং হাদীসে নববী আত্মস্থ করতে চায়, তার জন্য তো হাদীসের মৌলিক গ্রন্থসমূহে গভীর মনোনিবেশ করা এবং সেগুলো নিয়মিত চর্চায় রাখা অপরিহার্য।

শায়েখ সালেহ আহমাদ শামী ও তাঁর কিতাব ‘মাআলিমুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ’

আরবের একজন প্রসিদ্ধ আলেম ও দায়ী  হলেন আল্লামা সালেহ আহমাদ শামী হাফিযাহুল্লাহু তাআলা ওয়া রাআহু। দাওয়াত, তাযকীর ও ইলমের ময়দানে তাঁর খেদমত ও রচনাবলি উলামায়ে কেরাম ও সাধারণ পাঠকদের মাঝে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। মিন মায়ীনিশ শামায়েল, মিন মায়ীনিস সীরাহ, আলমুহাযযাব মিন ইহ্ইয়াই উলূমিদ্দীন-সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন।

শায়েখ সালেহ আহমাদ শামী হাফিযাহুল্লাহ তাঁর কাজের একটি অঙ্গনের কথা বলেছেন

جمع السُّنَّة المطهرة وتقريبها.

অর্থাৎ নবীজীর হাদীস আলেম, তালিবুল ইলম, খতীব, দায়ী-মুবাল্লিগ ও সাধারণের কাছে এই যুগের চাহিদা অনুযায়ী সহজভাবে উপস্থাপন করা। যদিও এ ধরনের কাজ ইতিপূর্বে হয়েছে, তবে তাঁর মতে সেগুলো এ যুগের পাঠকদের জন্য যথেষ্ট নয়।

এই লক্ষ্যে তিনি বেশ কয়েকটি কিতাব সংকলন করেছেন।

প্রথমে তিনি হাদীসের সুপ্রসিদ্ধ ১৪টি কিতাব নির্বাচন করেছেন। যথা

(১-৬) কুতুবে সিত্তাহ, (৭) মুয়াত্তা মালেক, (৮) মুসনাদে আহমাদ, (৯) সুনানে দারেমী, (১০) সুনানে কুবরা, বাইহাকী, (১১) সহীহ ইবনে খুযাইমা, (১২) সহীহ ইবনে হিব্বান, (১৩) মুস্তাদরাকে হাকেম, (১৪) আলআহাদীসুল মুখতারাহ, যিয়া মাকদিসী। (দ্র. মাআলিমুস সুন্নাহ ১/৭-৮)

এরপর নির্বাচিত এই ১৪টি কিতাব থেকে নিম্নোক্ত ৬টি কিতাব সংকলন করেছেন

 -১ الجامع بين الصحيحين -২ زوائد السنن على الصحيحين (و>سنن الدارمي< ملحق بالسنن الأربعة) -৩ زوائد >الموطأ< و>المسند< على الكتب الستة -৪ زوائد >السنن الكبرى< للبيهقي على الكتب الستة -৫ زوائد >ابن خزيمة< و>ابن حبان< و>المستدرك< على الكتب التسعة -৬ زوائد >الأحاديث المختارة< على الكتب التسعة<.

এগুলোতে (তাঁর দাবি অনুযায়ী) তাকরার (তথা একই সাহাবী থেকে বর্ণিত পুনরুক্ত হাদীস) বাদ দিয়ে ১৪ কিতাবের সকল হাদীস জমা হয়ে যায়। তবে এগুলোতে যয়ীফ হাদীস বাদ দেওয়া হয়নি এবং বিষয়বস্তুর বিবেচনায় প্রচুর পরিমাণে তাকরার (অর্থাৎ একই বিষয়ে একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত হাদীস) থেকে যায়।

তাই তিনি উক্ত ৬ কিতাবকে সামনে রেখে বিষয়বস্তুর পুনরুক্তি এবং যয়ীফ ও দুর্বল হাদীসগুলো বাদ দিয়ে সংকলন করেন ‘মাআলিমুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ’।

সংকলকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৪ কিতাবের মোট হাদীস সংখ্যা ছিল ১,১৪,১৯৪, যা উক্ত ৬ কিতাবে তাকরার বাদ দিয়ে ২৮,৪৩০ হয়েছে এবং মাআলিমুস সুন্নাহ্য় আরও কমে মাত্র ৩,৯২১ -এ নেমে এসেছে(!)। (এ বিষয়ক পর্যালোচনা সামনে আসছে।)

মাআলিমুস সুন্নাহ কিতাবটির ইতিমধ্যে একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। সংকলক প্রথম সংস্করণের ভূমিকা লিখেছেন শাবান ১৪৩৪ হিজরীতে (মোতাবেক ১০-০৬-২০১৩ ঈ.)। তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা লিখেছেন ১৩ শাওয়াল ১৪৩৬ হি. তারিখে (মোতাবেক ২৯-০৭-২০১৫ ঈ.); তবে তৃতীয় সংস্করণটি প্রকাশিত হয় ১৪৩৯ হিজরীতে (মোতাবেক ২০১৮ ঈ.)। কিতাবটি মোট তিন খণ্ড। এর বিষয়বস্তু প্রধান দশটি শিরোনামে ভাগ করা হয়েছে

 -১ العقيدة، -২ العلم ومصادره، -৩ العبادات، -৪ أحكام الأسرة، -৫ الحاجات الضرورية، -৬ المعاملات، -৭ الإمامة وشؤون الحكم، -৮ الرقائق والأخلاق والآداب، -৯ التاريخ والسيرة والمناقب، -১০ الفتن

কিতাবটি পাঠকমহলে ব্যাপক প্রচার লাভ করেছে। হাদীসের অতি গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি কিতাব সামনে রেখে এই সংকলনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। হাদীস নির্বাচনের ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে সহীহ-সাকীমের (শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের) বিষয়টি খেয়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া কলেবরও সংক্ষিপ্ত। এসব কারণে অনেকেই এই কিতাবটির প্রতি আগ্রহী হয়েছেন। অনেক উস্তায তালিবে ইলমদেরকে এই কিতাবটি মুুতালাআয় রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

কিতাবটি মুফীদ ও উপকারী। উসূল রক্ষা করে এটি অধ্যয়ন করলে ফায়েদা হবে ইনশাআল্লাহ।

তবে এটাও বাস্তব যে, কিতাবটিতে বিভিন্ন দিক থেকে বেশ ত্রুটি ও অসঙ্গতিও রয়ে গেছে। তাছাড়া পূর্ববর্তী ইমাম ও আলেমগণের এজাতীয় সংকলনগুলোতে বিভিন্ন কিতাবের হাদীস জমা করা ও যাওয়ায়েদ সংকলন করার ক্ষেত্রে যে دِقّةعُمُق তথা নৈপুণ্য ও গভীরতা পরিলক্ষিত হয়, এই কিতাবে অনেক ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত।

এতকিছু সত্ত্বেও সংকলক হাফিযাহুল্লাহ কিতাবটির ভূমিকায় কিতাব সম্পর্কে এমন কিছু দাবি করে বসেছেন, যেগুলো অত্যন্ত আপত্তিকর এবং বাস্তবতার সম্পূর্ণ খেলাফ। এগুলোর কারণে তালিবে ইলম ও সাধারণ পাঠকগণ মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝিতে পড়তে পারেন। তাই এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি কথা আরয করা মুনাসিব মনে হচ্ছে। সংকলকের দাবিসমূহের পর্যালোচনার পূর্বে হাদীসে নববীর বিস্তৃতি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন। মহান আল্লাহ তাআলাই একমাত্র তাওফীকদাতা।

হাদীসে নববীর বিস্তৃতি

হাদীসে নববীর ভান্ডার অনেক বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ। একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে তা পরিপূর্ণ আয়ত্ত করা বা নির্দিষ্ট কিছু কিতাবে সীমাবদ্ধ করে পেশ করা সম্ভব নয়। আয়ত্ত তো দূরের কথা, হাদীসের সুনিশ্চিত কোনো সংখ্যা বলাও কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

ইমাম আবু যুরআ রাহ.-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিল, মানুষ বলে, নবীজীর হাদীস নাকি মাত্র চার হাজার?

তখন তিনি গায়রতপূর্ণ ভাষায় বলেছিলেন

ومن قال ذا؟ قلقل الله أنيابه، هذا قول الزنادقة، ومن يحصي حديث رسول الله؟! قبض رسول الله  صلى الله عليه وسلم عن مائة ألف وأربعة عشر ألفا من الصحابة ممن روى عنه وسمع منه. فقال له الرجل: يا أبا زرعة هؤلاء أين كانوا وسمعوا منه؟ قال: أهل المدينة وأهل مكة ومن بينهما والأعراب ومن شهد معه حجة الوداع: كل رآه وسمع منه بعرفة.

অর্থাৎ কে বলেছে এমন কথা! আল্লাহ তার অমঙ্গল করুন। এ তো যিন্দীকদের কথা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস গুনে শেষ করার সাধ্য কার আছে! লক্ষাধিক সাহাবী রেখে তিনি বিদায় নিয়েছেন। মক্কা-মদীনাসহ কত এলাকার কত সাহাবী, তাঁদের প্রায় সকলেই আরাফায় নবীজীকে দেখেছেন এবং তাঁর হাদীস শুনেছেন। আলজামে লি আখালাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে‘, খতীব বাগদাদী ২/২৯৩

ইমাম হাকেম রাহ. আলমাদখাল ইলা কিতাবিল ইকলীল গ্রন্থে (পৃ. ৩০-৩৩) এ বিষয়ে অত্যন্ত চমৎকার বলেছেন, যার সারমর্ম হল

একথা বলার কী অবকাশ আছে যে, নবীজীর হাদীস দশ হাজারেও পৌঁছাবে না; অথচ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন এমন সাহাবীর সংখ্যাই চার হাজার! তাঁরা (সামগ্রিকভাবে) ২৩ বছর নবুওতী যিন্দেগীর সোহবত পেয়েছেন। নবীজীর বাণী ও কর্ম, নিদ্রা ও জাগরণ, আচরণ ও চালচলন, ইবাদত-বন্দেগী ও জিহাদ, ভাষণ ও চিঠিপত্র, চুক্তি ও সন্ধি, সওয়ারী ও বাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, এমনকি নবীজীর চাহনি, হাসি-রসিকতা ও পানাহার, পরিবারের সাথে নবীজীর আচরণসহ যাবতীয় বিষয় সংরক্ষণ করেছেন তাঁরা। বিদায় হজ্বে আরাফার ময়দানে বিপুল সংখ্যক সাহাবী নবীজীর ভাষণ শুনেছেন। এভাবে হাদীস সংরক্ষণের ধারা অব্যাহত থেকেছে। পরবর্তী মুহাদ্দিসীনে কেরামের মাঝে এমন বহু হাফিযুল হাদীস তৈরি হয়েছেন, যাঁদের একেকজনের স্মৃতিতে পাঁচ-ছয় লাখ হাদীস সংরক্ষিত ছিল। ...’

এককথায় নবী-জীবনের প্রতিটি বিষয়ই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। সাহাবায়ে কেরামও নববী যিন্দেগীর প্রতিটি বিষয় তাঁদের হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছেন। বিদায় হজ্বের সময় লক্ষাধিক সাহাবী নবীজীর সাথে ছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই সাধ্যানুযায়ী নবীজীর শিক্ষা ও আদর্শ ধারণ করেছেন এবং পরবর্তী উম্মতের কাছে তা যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। এত বিস্তৃত হাদীসে নববীকে কোনো সংখ্যায় বা কয়েকটি মাত্র কিতাবে সীমাবদ্ধ করা যায় কি?!

দ্বিতীয়ত : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেসকল মুহাদ্দিসীনে কেরামের মাধ্যমে হাদীসের হেফাযত করেছেন, তাঁদের একেকজন লাখ লাখ হাদীস স্মৃতিতে ধারণ করতেন। মুহাদ্দিসগণের জীবনী-গ্রন্থগুলোতে এর অসংখ্য সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে।

তৃতীয়ত : মুহাদ্দিসীনে কেরাম অসংখ্য হাদীসগ্রন্থ সংকলন করেছেন। গ্রন্থগুলোর نوع তথা ধরন ও প্রকারই ৪০-এর বেশি। প্রতিটি প্রকারের অধীনে রয়েছে প্রচুর কিতাব। প্রায় কিতাবে রয়েছে শত-সহস্র হাদীস। সংকলনগুলোর শুধু তালিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনেক গ্রন্থ। এত শত, হাজার কিতাবে কী পরিমাণ হাদীস থাকতে পারে, তা অনুমান করে বলাও মুশকিল।

একথা সত্য, এ কিতাবগুলোতে সাহাবা ও তাবেয়ীনের আছার (তাঁদের উক্তি, বক্তব্য, ফতোয়া ও ঘটনা ইত্যাদি)-ও উল্লেখ করা হয়েছে। মুনকার ও মা‘লূল (আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য) বর্ণনাও এসেছে এবং  মুর্কারার (পুনরুক্ত) বর্ণনাও রয়েছে। তবে এসব কিছু বাদ দিয়েও সহীহ হাদীসের সংখ্যা যে বিশাল হবে, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, হাদীসে নববী অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। এ বিস্তৃত ভান্ডার আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পুরো উম্মতের মাধ্যমে হেফাযত করেছেন।

অতএব, নির্দিষ্ট  কিছু ব্যক্তি বা কিতাবের মাধ্যমে সকল হাদীস সংরক্ষিত হয়ে যাওয়ার দাবি একেবারেই অবাস্তব। আর একক কোনো কিতাবে বা একক কোনো ব্যক্তির কাছে সকল হাদীস সংরক্ষিত থাকার তো প্রশ্নই আসে না।

কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয়, শায়েখ সালেহ আহমাদ শামী হাফিযাহুল্লাহর লেখায় এ ধরনের বিভিন্ন অবাস্তব দাবি চলে এসেছে, যেগুলোর কারণে তালিবে ইলম ও সাধারণ পাঠক বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সুস্পষ্ট প্রমাণাদির মাধ্যমে সেগুলোর ভ্রান্তি স্পষ্ট করে দেওয়া জরুরি মনে হচ্ছে।

সংকলকের কিছু দাবি ও তার পর্যালোচনা

প্রথমে আমরা সংকলকের কয়েকটি বক্তব্য পড়ে নিই।

কিতাব সম্পর্কে লেখক দাবি করেছেন

إن الهدف الذي يقصد إليه هذا الكتاب، هو إيجاد مرجع لكل مسلم -أيا كانت ثقافته- يرجع إليه للوقوف على الأحاديث النبوية الشريفة التي توضح له ما يهمه في كل شؤونه، دينية كانت أم دنيوية.

وبتعبير آخر: إيجاد كتاب يحوي مجمل السنة، بحيث يُلِمُّ قارئه بأقوال النبي صلى الله عليه وسلم وأفعاله في كل شأنٍ دوَّنته كتب السنة المطهرة.

প্রথম সংস্করণের ভূমিকার শেষে (পৃ. ২৩) বলেন

وقد رأينا كيف أن كل كتاب من الكتب الأربعة عشر -التي هي أصل هذا الكتاب- كان خلاصة لمئات آلاف الأحاديث التي كانت لدى مؤلفه، فاختار كتابه منها.

وفي هذا المولَّف، أقدِّم خلاصة لمجموع تلك الخلاصات، وافية بالأحكام إن شاء الله، أمينة على المعاني، ولعلها -بهذه المواصفات- تكون في معنى قوله صلى الله عليه وسلم: (أوتيت الكتاب ومثله معه).

সংকলক তার ভূমিকায় এজাতীয় আরও একাধিক বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এ বক্তব্যগুলোর সারমর্ম হল

দ্বীন-দুনিয়ার সমস্ত বিষয়ে নবীজীর সমস্ত আহকাম ও হেদায়েত এই সংকলনে চলে এসেছে। তাই একজন মুসলিমের জীবনে সে যে শ্রেণি ও সংস্কৃতিরই হোক না কেন এই একটি কিতাবই যথেষ্ট। এই এক কিতাবেই নবীজীর ইরশাদকৃত সমস্ত আহকাম ও হেদায়েত পেয়ে যাবে।

শুধু তা-ই নয়, তার দাবি অনুযায়ী সংকলনটি এতটাই পূর্ণাঙ্গ যে, নবীজী হাদীসে যে বলেছেন

أوتيت الكتاب ومثله معه.

[আমাকে (আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে) কিতাব তথা কুরআন দান করা হয়েছে এবং সাথে তার অনুরূপ (তথা সুন্নাহ্ও) দান করা হয়েছে।]

এই সংকলনকে (হাদীসে বর্ণিত) সেই ‘مثله’-এর উদাহরণ হিসেবে পেশ করা যায়। অর্থাৎ মহাগ্রন্থ আলকুরআন তো আমরা একত্রে দেখতে পাই। পক্ষান্তরে হাদীস ও সুন্নাহ বিস্তৃত হওয়ায় তা নির্দিষ্ট কিতাবের কলেবরে আবদ্ধ নয়। কিন্তু ‘মাআলিমুস সুন্নাহ’ কিতাবটি এতটাই পূর্ণাঙ্গ যে, হাদীসে বর্ণিত ‘مثله’ (কুরআনের অনুরূপ তথা সুন্নাহ)-কে সামগ্রিকরূপে দেখতে চাইলে এ কিতাবটি দেখে নেওয়াই যথেষ্ট! যেন ‘مثله’ (তথা সুন্নাহ্)-এর পুরোটাই এই কিতাবে বিদ্যমান!!

শায়েখের কলম থেকে এ ধরনের বাক্য বের হওয়া সত্যিই আশ্চর্যজনক। হাদীসের বিস্তৃত অঙ্গনকে যেখানে কোনো কিতাব বা ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না, সেখানে লেখক মাত্র ৩,৯২১টি হাদীস সম্বলিত একটি সাধারণ সংকলনের বিষয়ে এমন দাবি করছেন! তাতেও আবার রয়েছে নানা শূন্যতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি! (বিস্তারিত সামনে আসছে।)

তার এ ধরনের দাবি-দাওয়ার কারণে কী প্রভাব পড়েছে দেখুন! সংকলনের প্রকাশক এই সংকলন সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখেছেন, যার শিরোনাম দিয়েছেন

هل ختمت السنة؟

অর্থাৎ তিনি মুসলিম উম্মাহকে এই বার্তা দিতে চাইছেন যে, আপনারা তো কুরআন খতম করেছেন; হাদীসের কি খতম করেছেন? হাদীসের খতম করতে চাইলে ‘মাআলিমুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ’ কিতাবটি পড়ুন। এই কিতাবের খতম করা মানে হাদীসের খতম করা!

অথচ পাঠকগণ হাদীসের বিস্তৃতি সম্পর্কে জেনেছেন, যার আলোকে  এই দাবি যে অবাস্তব, তা একেবারেই স্পষ্ট।

কিতাব সম্পর্কে সংকলকের এই অবাস্তব দাবির মূল কারণ

সংকলক তার কিতাবের পূর্ণাঙ্গতা বোঝাতে যে অবাস্তব দাবিগুলো করেছেন, তার মূল কারণ হল ১৪ কিতাব সম্পর্কে সংকলকের ভুল ধারণা। প্রথমে আমরা সংকলকের এ সংক্রান্ত দুয়েকটি বক্তব্য পড়ে নিই।

তিনি مكانة كتب هذا المشروع শিরোনোমের অধীনে (পৃ. ১০-১২) প্রথমে নির্বাচিত ১৪ কিতাব সম্পর্কে পূর্ববর্তী বিভিন্ন ইমাম ও আলেমের প্রশংসামূলক বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, যাতে আল্লামা কাত্তানী রাহ. (১৩৪৫ হি.) ও শায়েখ খাওলী রাহ. (১৩৪৯ হি.)-এর মতো একেবারে নিকটতম সময়ের আলেমদের বক্তব্যও রয়েছে। এসকল বক্তব্য তুলে ধরার পর তিনি বলেন

وإذا كانت >الكتب الستة< هي أمهات الكتب الحديثية وأصولها، كما يقول الكتاني، وهي التي كادت لا تغادر من صحيح الأحاديث إلا النزر اليسير، كما يقول الخولي، فما هو القول المناسب إذا اجتمعت هذه الكتب الأربعة عشر.

إن أكبر الظن أنها لم تغادر حديثا صحيحا، وإذا وقع ذلك فإن في الأحاديث المروية فيها ما يغني عنه، إن من أتيح له قرائتها، فإنه قد اطلع على مجمل السنة، بل على معظمها.

১৯ নং পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন

 إن الكتب التسعة قد حوت مجمل السنة، وما جاء في سواها فلن يضيف إلى أحاديث الأحكام فيها شيئا، وإن كان يضيف بعض الأحاديث في الفضائل، فإن فيها ما يسد مسده.

উপরের বক্তব্যগুলো দ্বারা বোঝা যায়, নির্বাচিত ১৪ কিতাব সম্পর্কে তাঁর ধারণা হল, এই ১৪ কিতাবে সমস্ত সহীহ হাদীস চলে এসেছে। ১৪ কিতাবের বাইরে যদি কোনো সহীহ হাদীস থেকেও থাকে, তবুও ১৪ কিতাবের হাদীসসমূহ দ্বারা সেটার প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাবে।

সংকলক গত শতাব্দীর আলেম শায়েখ খাওলী রাহ.-এর কথার ওপর ভিত্তি করে মনে করেন, কুতুবে সিত্তায় অধিকাংশ সহীহ হাদীস এসে গেছে। এরপর সেই ধারণাকে নিজের পক্ষ থেকে আরও সম্প্রসারিত করে দাবি করেন, এই ছয় কিতাবের সঙ্গে যদি আরও তিন কিতাব যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে দারেমী, তাহলে সমস্ত হাদীস (বিশেষত আহকাম সংক্রান্ত হাদীস) এক জায়গায় এসে যাবে। এগুলোর বাইরে ফাযায়েল সংক্রান্ত কিছু সহীহ হাদীস থাকতে পারে; তবে নয় কিতাবে সেগুলোর বিকল্প হাদীস রয়েছে। অতঃপর নয় কিতাবের সাথে যদি আরও পাঁচ কিতাব যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ সহীহ ইবনে খুযাইমা, সহীহ ইবনে হিব্বান, মুস্তাদরাকে হাকেম, বাইহাকীর সুনানে কুবরা ও যিয়া মাকদিসীর আলআহাদীসুল মুখতারা, তাহলে তো নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই ১৪ কিতাবের বাইরে আর কোনো সহীহ হাদীস নেই!

আর যেহেতু ‘মাআলিমুস সুন্নাহ’ সেই ১৪ কিতাবেরই সারসংক্ষেপ, (যেমন তিনি কিতাবের প্রচ্ছদে লিখেছেন

هو خلاصة (১৪) كتابا هي أصول كتب السنة(

এবং এতে সংকলকের দাবি অনুযায়ী কেবল যয়ীফ ও তাকরার (তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী হাদীসের পুনরুক্তি বা বিষয়বস্তুর পুনরুক্তি) ছাড়া ১৪ কিতাবের সকল সহীহ হাদীস এবং ১৪ কিতাবে বর্ণিত সমস্ত আহকাম ও বিষয়বস্তু চলে এসেছে, তাই দ্বীন-দুনিয়ার সমস্ত বিষয়ে নবীজীর সমস্ত আহকাম ও হেদায়েত জানতে এ একটি মাত্র কিতাবই যথেষ্ট!

অথচ বাস্তবে না ১৪ কিতাব সম্পর্কে শায়েখের উক্ত ধারণা সঠিক আর না শায়েখের পক্ষে ১৪ কিতাবের পূর্ণাঙ্গ সারসংক্ষেপ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। (সামনে কিতাবের শূন্যতা ও অপূর্ণাঙ্গতা সংক্রান্ত আলোচনায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।)

নির্বাচিত ১৪ কিতাব সম্পর্কে সংকলকের দাবির বাস্তবতা

হাদীসে নববী ও ফিকহে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন এমন যে কেউ বুঝবেন, শায়েখ ১৪ কিতাব সম্পর্কে যে দাবি করেছেনএগুলোর বাইরে আর কোনো সহীহ হাদীস থাকবে না, থাকলেও ১৪ কিতাবের হাদীসসমূহ দ্বারা সেটার প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাবে’ তা একেবারে অমূলক। তারপরও পাঠকগণের বোঝার সুবিধার্থে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে। এগুলোর মাধ্যমে ইনশাআল্লাহ সুস্পষ্ট হয়ে যাবে, ১৪ কিতাবের বাইরেও আছে বহু সহীহ হাদীস এবং ‘মাআলিমুস সুন্নাহ’ থেকেও বাদ পড়েছে অসংখ্য সহীহ হাদীস বা সহীহ হাদীসের অংশবিশেষ।

وما توفيقي إلا بالله.

এক.

এজাতীয় দাবি আগের কারও কারো বক্তব্যেও পাওয়া যায়। বলার

অপেক্ষা রাখে না, এ ধরনের দাবিকে যদি আক্ষরিক অর্থে ধরা হয়, তাহলে বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল পাওয়া যায় না। তাই পরবর্তী ইমামগণের কেউই বক্তব্যগুলোকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেননি। হয়তো কোনো ব্যাখ্যা করেছেন, নয়তো খণ্ডন করেছেন।

ইমাম নববী রাহ. পাঁচ কিতাব (সুনানে ইবনে মাজাহ ব্যতীত কুতুবে সিত্তার বাকিগুলো) সম্পর্কে বলেছেন, এর বাইরে অল্প কিছু সহীহ হাদীস থাকবে। (আততাকরীব ওয়াত তাইসীর, ইমাম নববী, পৃ. ২৬)

তবে পরবর্তী অনেক ইমাম তাঁর এ বক্তব্যের খণ্ডন করেছেন। (দ্রষ্টব্য : আততাবসিরাহ ওয়াততাযকিরাহ, যাইনুদ্দীন ইরাকী, পৃ. ৯৮; নুকাতুয যারকাশী ১/১৮১; আননুকাতুল ওয়াফিয়্যাহ, বিকায়ী ১/১২৬)

আরও দুয়েকজন ইমাম থেকে এজাতীয় বক্তব্য পাওয়া যায়। এসব বক্তব্য সম্পর্কে শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. বলেন

فأمثال هذه الكلمات عن هؤلاء الأئمة وغيرهم مؤولة أو محمولة على أن كلا منهم قال بحسب ما وصل إليه علمه.

অর্থাৎ এই ইমামগণ থেকে বর্ণিত এজাতীয় কথাগুলো ব্যাখ্যাসাপেক্ষ, অথবা এটাই বলতে হবে যে, প্রত্যেকে তাঁর জ্ঞানানুসারে কথাগুলো বলেছেন। রিসালাতুল ইমাম আবী দাউদের টীকা, পৃ. ৩৫

দুই.

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, হাদীসগ্রন্থাদির ৪০-এরও অধিক نوع বা প্রকার রয়েছে। নির্বাচিত ১৪ কিতাবে মাত্র চার-পাঁচটি প্রকার থেকে বাছাইকৃত অল্প কয়টি কিতাব এসেছে। এগুলোর বাইরেও রয়েছে হাদীসগ্রন্থের আরও অনেক প্রকার। প্রতিটি প্রকারের অধীনে রয়েছে প্রচুর কিতাব।  অতএব নির্বাচিত ১৪ কিতাবের বাইরেও যে প্রচুর পরিমাণে অতিরিক্ত সহীহ হাদীস রয়েছে, তা একেবারেই স্পষ্ট।

তিন.

নির্বাচিত ১৪ কিতাবের কোনো কোনোটির আবার একাধিক বিশুদ্ধ বর্ণনাকারী  রয়েছেন। এক্ষেত্রে দেখা যায়, একই কিতাবের এক বর্ণনাকারীর বর্ণনায় এমন কিছু সহীহ হাদীস এসেছে, যা উক্ত কিতাবের অন্য বর্ণনাকারীর বর্ণনায় নেই।

এসব ক্ষেত্রে সংকলক একটি কিতাবের বিভিন্ন বর্ণনাকারীর মধ্য থেকে কেবল একজনের বর্ণনাকে বেছে নেওয়ায় অন্য বর্ণনাকারীদের বর্ণিত কিছু সহীহ হাদীস বাদ পড়ে গেছে।

উদাহরণস্বরূপ মুয়াত্তা মালেক কিতাবের বেশ কয়েকজন বিশুদ্ধ বর্ণনাকারী রয়েছেন। কারও কারও বর্ণনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এমন কিছু সহীহ হাদীস রয়েছে, যা মুয়াত্তার অন্য বর্ণনায় নেই। কিন্তু মাআলিমুস সুন্নাহ্য় কেবলমাত্র ইয়াহইয়া লাইসী রাহ.-এর বর্ণনার ওপর নির্ভর করায় মুয়াত্তা মালেকের অন্য বর্ণনায় থাকা কিছু হাদীস বাদ পড়েছে; অথচ তা মুয়াত্তারই অংশ। সংকলকের কাজটি নিখুঁত হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল, এমন ক্ষেত্রে নির্বাচিত কিতাবের বিশুদ্ধ সকল বর্ণনা সামনে রাখা।

চার.

নির্বাচিত ১৪ কিতাবের মুসান্নিফগণের অন্যান্য কিতাব তিনি তালিকায় রাখেননি। অথচ এর অনেকগুলোই গুরুত্বের বিবেচনায় নির্বাচিত ১৪ কিতাবের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এগুলোতেও এমন প্রচুর সহীহ হাদীস পাওয়া যাবে, যা নির্বাচিত ১৪ কিতাবে আসেনি। পরবর্তী ইমামগণের মধ্যে যারা ‘কুতুবে সিত্তাহ্’র হাদীস ও রিজালের খেদমত করেছেন, তারা কুতুবে সিত্তার মুসান্নিফগণের অন্যান্য কিতাবগুলো বাদ দেননি। আর এজাতীয় কাজের দাবিও তা-ই।

এখানে আমরা ১৪ কিতাবের মুসান্নিফগণেরই সংকলিত (১৪ কিতাব ছাড়া) উল্লেখযোগ্য কিছু কিতাবের নাম তুলে ধরছি

ইমাম বুখারী রাহ.-এর ‘আলআদাবুল মুফরাদ’ (হাদীস সংখ্যা : ১,৩২২), ‘জুযউল কিরাআতি খালফাল ইমাম’ (হাদীস সংখ্যা : ১৮৯) ও ‘জুযউ রাফ্ইল ইয়াদাইন’ (হাদীস সংখ্যা : ১১৮)।

ইমাম তিরমিযী রাহ.-এর ‘কিতাবুশ শামায়েল’ (হাদীস সংখ্যা : ৪১৭)।

ইমাম নাসায়ী রাহ.-এর ‘আসসুনানুল কুবরা’ (হাদীস সংখ্যা : ১১,৯৪৯)।

ইমাম আহমাদ রাহ.-এর ‘কিতাবুয যুহ্দ’ (হাদীস সংখ্যা : ২,৩৬৮) ও ‘ফাযায়েলুস সাহাবাহ’ (হাদীস সংখ্যা : ১,৯৬২)।

ইমাম বাইহাকী রাহ.-এর ‘মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল আসার’ (হাদীস সংখ্যা : ২০,৮৭৮), ‘শুআবুল ঈমান’ (হাদীস সংখ্যা : ১১,২৬৯), ‘আলআসমাউ ওয়াস সিফাত’ (হাদীস সংখ্যা : ১,০৮২), ‘আলকাযাউ ওয়াল কদর’ (হাদীস সংখ্যা : ৬৪৬), ‘আদদাআওয়াতুল কাবীর’ (হাদীস সংখ্যা : ৬৭১) ও ‘আযযুহদুল কাবীর’ (হাদীস সংখ্যা : ৯৮২) ইত্যাদি।

পাঁচ.

নির্বাচিত ১৪ কিতাবের মুসান্নিফগণ ছাড়াও অন্য ইমামগণের বেশ কিছু প্রসিদ্ধ ও সমৃদ্ধ কিতাব তালিকায় রাখা হয়নি। যেমন, ‘মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক’ (হাদীস সংখ্যা : ২২,১১০), ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা’ (হাদীস সংখ্যা : ৪০,৭৫৪), ‘মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী’ (হাদীস সংখ্যা : ২,৮৯০), ‘মুসনাদে আবু ইয়া‘লা’ (হাদীস সংখ্যা : ৭,৫৫৫), ‘মুসনাদে বাযযার’ (হাদীস সংখ্যা : ১০,০৮২), ‘সুনানে দারাকুতনী’ (হাদীস সংখ্যা : ৪,৮৩৬), ইমাম তহাবী রাহ.-এর ‘শরহু মাআনিল আসার’ (হাদীস সংখ্যা : ৭,৪৬৭) ও ‘শরহু মুশকিলির আসার’ (হাদীস সংখ্যা : ৬,১৭৯) এবং ইমাম তবারানী রাহ.-এর ‘আলমু‘জামুল কাবীর’ (হাদীস সংখ্যা : ২২,৭১১), ‘আলমু‘জামুল আওসাত’ (হাদীস সংখ্যা : ৯,৪৮৯), ও ‘আলমু‘জামুস সাগীর’ (হাদীস সংখ্যা : ১,১৯৮)-সহ আরও অনেক কিতাব। নির্বাচিত ১৪ কিতাবের কোনো কোনোটির চেয়ে বিভিন্ন দিক থেকে অধিক অগ্রগণ্য কিতাবও এগুলোর মধ্যে রয়েছে। এসকল কিতাবেও পাওয়া যাবে অনেক সহীহ হাদীস বা সহীহ হাদীসের অংশবিশেষ, যেগুলো ১৪ কিতাবে আসেনি। এ সবই ‘মাআলিমুস সুন্নাহ’ থেকে বাদ পড়েছে।

ছয়.

সংকলকের অনুসন্ধানেই ১৪ কিতাবের প্রত্যেকটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এমন সহীহ হাদীস পাওয়া গেছে, যা অবশিষ্ট কিতাবগুলোতে নেই। এতে স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়, ১৪ কিতাবের বাইরে অন্যান্য হাদীসগ্রন্থেও এমন প্রচুর সহীহ হাদীস পাওয়া যাবে, যা ১৪ কিতাবে আসেনি।

সাত.

সংকলক ন্যূনতম কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করলেন, ১৪ কিতাবের বাইরে কোনো সহীহ হাদীস নেই। অথচ কোনো একটি গ্রন্থ আদ্যোপান্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল এ দাবি করা যায় যে, তাতে ১৪ কিতাবের অতিরিক্ত কোনো সহীহ হাদীস নেই। বাস্তবে ১৪ কিতাবের বাইরের সকল কিতাব এভাবে যাচাই করা যে-কারও পক্ষেই একটি দুঃসাধ্য ও দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ বিষয়। অতএব এমন দাবি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

আট.

সংকলকের ১৪ কিতাব সম্পর্কে এত বড় দাবির মূল ভিত্তি হল, ‘কুতুবে সিত্তাহ’ সম্পর্কে গত শতাব্দীর আলেম শায়েখ খাওলী রাহ. (১৩৪৯ হি.)-এর বক্তব্য। তিনি বলেছেন, ‘কুতুবে সিত্তায় প্রায় সকল সহীহ হাদীস এসে গেছে; খুব সামান্য পরিমাণ বাদ পড়েছে’।

এর ওপর ভিত্তি করে সংকলক বলতে চান, কুতুবে সিত্তাহ থেকে যদি খুব সামান্য সহীহ হাদীসই বাদ পড়ে, তাহলে নয় কিতাবের বাইরে তেমন কোনো সহীহ হাদীস থাকার কথা নয়। আর ১৪ কিতাবের বিষয়ে তো বেশ নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এর বাইরে কোনো সহীহ হাদীস নেই। (দ্রষ্টব্য : ‘মাআলিমুস সুন্নাহ’ ১ : ১০)

কিন্তু সংকলক নিজেও শায়েখ খাওলীর এ বক্তব্য আক্ষরিক অর্থে আমলে নেননি। কারণ তিনি ‘মাআলিমুস সুন্নাহ্’য় ৬ কিতাবের বাইরের প্রচুর সহীহ হাদীস উল্লেখ করেছেন। এতে ‘মাআলিমুস সুন্নাহ’ দ্বারাই বাস্তবতার নিরিখে শায়েখ খাওলীর বক্তব্যের যুক্তিহীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর পরও শায়েখ হাফিযাহুল্লাহ কেন খাওলী রাহ.-এর কথাকে ভিত্তি করে ১৪ কিতাব সম্পর্কে এমন ভুল ধারণার শিকার হলেন, তা বোধগম্য নয়।

নয়.

১৪ কিতাব সম্পর্কে সংকলকের উক্ত দাবির আরেকটি ভিত্তি হল, এ কিতাবগুলো সম্পর্কে ইমামগণের প্রশংসামূলক কিছু বক্তব্য। অথচ এজাতীয় প্রশংসামূলক বাক্য ১৪ কিতাব ছাড়াও আরও অনেক কিতাব সম্পর্কে পাওয়া যায়। এ ধরনের প্রশংসামূলক বাক্যের উদ্দেশ্য কখনোই এটা নয় যে, কিতাবগুলোতে সকল হাদীস চলে এসেছে বা এগুলো অন্য কিতাব থেকে বেনিয়ায ও অমুখাপেক্ষী করে দেয়।

দশ.

নির্বাচিত ১৪ কিতাবের বাইরে যে অসংখ্য সহীহ হাদীস রয়েছে, তা এমনিতেই স্পষ্ট। তবুও সহজে কিছুটা অনুমানের সুবিধার্থে এখানে আমরা যাওয়ায়েদের চারটি কিতাবের পরিসংখ্যান পেশ করছি।

১. হাফেয ইবনে হাজার রাহ. ‘আলমাতালিবুল আলিয়াহ’ গ্রন্থে হাদীসের মাত্র আটটি মুসনাদগ্রন্থ থেকে কুতুবে সিত্তাহ ও মুসনাদে আহমাদে নেই এমন হাদীস সংকলন করেছেন। সেখানে হাদীসের মোট সংখ্যা সাড়ে চার হাজারেরও অধিক।

২. শায়েখ নাবীল সা‘দুদ্দীন জাররার ‘আলঈমা ইলা যাওয়াইদিল আমালী ওয়াল আজযা’ সংকলন করেছেন। এখানে তিনি কুতুবে সিত্তাহ, মুয়াত্তা ও মুসনাদে আহমাদে নেই, এমন হাদীসগুলো সংকলন করেছেন প্রায় ৩৪৬টি ‘আমালী’ ও ‘আজযা’ ধরনের গ্রন্থ থেকে, যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭,৪৩৭। এখানে সব আজযার হাদীস আসেনি। কারণ তিনি বিষয়ভিত্তিক ‘আজযা’ তালিকায় রাখেননি। আর স্বাভাবিক কথা, তার শর্তে উত্তীর্ণ সব ‘আজযা’ও তার হাতে ছিল না। এর অনেকগুলো ‘মাখতূত’ তথা পাণ্ডুলিপি আকারে রয়েছে আর কিছু ‘মাফকূদ’ তথা হারিয়ে গেছে।

৩. হাফেয হাইসামী রাহ. মাজমাউয যাওয়ায়েদে ছয়টি কিতাব থেকে কুতুবে সিত্তায় আসেনি, এমন হাদীসগুলো সংকলন করেছেন। সেখানে হাদীসের মোট সংখ্যা ১৮,৭১৫।

৪. হাফেয বূসীরী রাহ. ‘ইতহাফুল খিয়ারাতিল মাহারা’ গ্রন্থে বহু মুসনাদ বাছাই করে মাত্র দশটি মুসনাদ থেকে কুতুবে সিত্তায় আসেনি এমন হাদীস সংকলন করেছেন। সেখানে হাদীসের সংখ্যা প্রায় আট হাজার।

উক্ত হাদীসগুলোতে কিছু তাকরার বা পুনরুক্তি থাকবে। অনেক মা‘লূল, মুনকার ও মাওযূ (অগ্রহণযোগ্য, আপত্তিকর ও জাল) বর্ণনাও পাওয়া যাবে। সবকিছুর পর সহীহ হাদীসও যে প্রচুর থাকবে, তাতে সন্দেহ নেই।

উপরিউক্ত চারটি কিতাবে মাত্র অল্প কিছু কিতাব থেকে যাওয়ায়েদ সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া হাদীসের আরও অসংখ্য কিতাব রয়ে গেছে। স্পষ্ট যে, তাতেও প্রচুর যাওয়ায়েদ পাওয়া যাবে।

এগারো.

সংকলকের অনুসন্ধানের পরও ‘মাআলিমুস সুন্নাহ’য় ১৪ কিতাবেরই প্রচুর সহীহ হাদীস বাদ পড়েছে (বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে)। অতএব ১৪ কিতাবের বাইরে কোনো সহীহ হাদীস নেই এমন দাবি সংকলকের জন্য একেবারেই বেমানান।

বারো.

নির্বাচিত ১৪ কিতাবে সীমাবদ্ধ থাকার চিন্তা যে অগ্রহণযোগ্য ও অবিবেচনাপ্রসূত, তা আমরা এভাবেও বুঝতে পারি যে, ১৪ কিতাবের হাদীসগুলোরই পূর্ণ তাহকীক ও যাচাই করা এ কিতাবগুলোতে সীমাবদ্ধ থেকে সম্ভব হয় না। কারণ সনদ-মতনের (হাদীসের পাঠ ও বর্ণনাসূত্রের) বিভিন্ন জটিলতার সমাধান পেতে এর বাইরেরও বহু কিতাবের শরণাপন্ন হতে হয়। কিছু কিছু জটিলতা নিরসন করতে একটি হাদীস-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সনদ ও মতন সামনে রেখে তাহকীক করতে হয়।

এমনকি সংকলক যেসকল গবেষক ও টীকাকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে হাদীসের মান বর্ণনা করেছেন, তারাও ১৪ কিতাবে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেননি। সুতরাং এর বাইরের কিতাবগুলোর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ছোট করে দেখা বা পাঠকদের এমন ধারণা দেওয়া বড়ই আপত্তিকর।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

টীকা

(১) অর্থাৎ হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয়টি কিতাব ১. সহীহ বুখারী, ২. সহীহ মুসলিম, ৩. জামে তিরমিযী, ৪. সুনানে নাসায়ী, ৫. সুনানে আবু দাউদ ৬. সুনানে ইবনে মাজাহ।

(২) (كُتُبُ الزَّوَائِد) কুতুবুয যাওয়ায়েদ বলতে ওইসকল হাদীসগ্রন্থকে বোঝায়, যাতে নির্দিষ্ট এক বা একাধিক কিতাবের ওইসকল হাদীস সংকলন করা হয়, যা নির্দিষ্ট অন্য কিছু কিতাবে নেই। যেমন, কোনো সংকলনে মুসনাদে আহমাদের ওইসকল হাদীস জমা করা হল, যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই।

 

advertisement