Shaban 1447   ||   February 2026

কিসমুত তাফসীর ওয়া উলূমিল কুরআন
‖ গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

Mawlana Muhammad Abdul Malek

طلب العلم তথা ইলম অন্বেষণের বিভিন্ন স্তর রয়েছে এ কথাও সত্য যে

طلب العلم من المهد إلى اللحد.

অর্থাৎ কোল থেকে কবর পর্যন্ত ইলম অন্বেষণ চলমান থাকবে

আর এটা তো হাদীস শরীফেরই বাণী

مَنْهُوْمَانِ لا يَشبَعان : طالبُ علم وطالبُ دُنيا.

(قال ابن حجر:..وعن الحسن مرسل، وسنده صحيح الى الحسن.)

দুই লোভাসক্ত কখনো তৃপ্ত হয় না ইলম অন্বেষী এবং দুনিয়া অন্বেষী মুসনাদে বাযযার, হাদীস ৪৮৮০; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ৩১৫আলকামিল, ইবনে আদী ৬/২৯৬; আলমাতালিবুল আলিয়া, ইবনে হাজার ১২/৬৭৬

এটা বাস্তব যে, তলাবুল ইলমের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই এর পরও বলা যায়, প্রত্যেক শাস্ত্রের দিক থেকে আনুষ্ঠানিক তলবের শেষ স্তর হল مرحلة التخصصঅর্থাৎ কোনো শাস্ত্রে ইখতিসাস পয়দা করার মেহনতের আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তর ইখতিসাসেরও বিভিন্ন স্তর রয়েছে আনুষ্ঠানিক তাখাসসুসে ইখতিসাসের প্রাথমিক স্তরগুলো অবশ্যই হাসিল হয়ে যাওয়া উচিত

কওমী মাদরাসায় যেসব ইলম ও ফন পড়ানো হয়, প্রায় সবকটিই এমন যে, সেগুলোর বিষয়ে ফুযালায়ে মাদারিসের একেক জামাত সেগুলোর একেকটিতে ইখতিসাস হাসিল করবে বিশেষ করে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে

১- التفسير وعلوم القرآن

- علوم الحديث

- علم الفقه والفتوى

- علم أصول الدين

- الدعوة الإسلامية : أصولها وآدابها

- أصول الجدل وآدابها

- علوم العربية و الأدب العربي

- السيرة النبوية وحياة الصحابة

- علوم التاريخ

১০- لوازم ومستلزمات الدعوة وعلوم الشريعة من العلوم والفنون القديمة والعصرية والوسائل الحديثة.

বা-খবর তালিবে ইলম ভাইয়েরা জানেন, এই প্রতিটি শিরোনামের অধীনে কত শাখা-শিরোনাম রয়েছে, যার প্রতিটি বলতে গেলে স্বতন্ত্র তাখাসসুসের দাবি রাখে

এ উপমহাদেশে দাওরায়ে হাদীসের পর দিরাসাতে উলইয়ার অনেক শাখাতেই তাখাসসুসের আম রেওয়াজ রয়েছে প্রয়োজন হল, বিভাগুলোকে মি‘য়ারী তথা মানসম্মত বানানোর চেষ্টা করা

رئیس، نگران، طالب علم، مکتبہ، ماحول، نصاب  ونظام،

وسائل  التحقیق  সবদিক থেকেই মি‘য়ার তথা মান রক্ষা করলেও অনেক শাস্ত্রই এমন যে, তার জন্য এক-দুই বছর কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়

মারকাযুদ দাওয়াহ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার পর দিরাসাতে উলইয়ার শাখাগুলোর নামে التخصص শব্দের পরিবর্তে التدريب শব্দ ব্যবহার করা শুরু করেছে যদিও মৌলিক বিভাগগুলোতে অধ্যয়নের বাধ্যতামূলক সময় পূর্ণ তিন বছর

আজকের অবসরে তাখাসসুস ও ইখতিসাস সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার ইচ্ছা নেই এবং উপরিউক্ত শিরোনামগুলো বিশ্লেষণের সময়ও এখন নেই এখন শুধু قسمُ التفسيرِ وعلومِ القرآن বিষয়ে দুয়েকটি কথা আরয করতে চাই

উলূমুল হাদীসের বিষয়ে তো ইমাম আবু বকর হাযিমী (৫৪৮-৫৮৪ হি.) রাহ. বলেছেন

علم الحديث يشتمل على أنواع كثيرة تقرب من مائة نوع.. وكل نوع منها علم مستقل، لو أنفد الطالب فيه عُمُرَه لما أدرك نهايته.

অর্থাৎ ইলমুল হাদীসের প্রায় একশ’টি শাখা রয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র ইলম সেগুলোর কোনো একটির জন্য তালিবে ইলম যদি নিজের জীবন কুরবান করে দেয়, তবু সে তার শেষ অবধি পৌঁছতে পারবে না উজালাতুল মুবতাদী ওয়া ফুযালাতুল মুনতাহী ফিন নাসাব, ইমাম আবু বকর হাযিমী, পৃ. ৩

উলূমুল হাদীসের ক্ষেত্রে এটা যদি সত্য হয় আর বিজ্ঞজনেরা জানেন, আসলেই তা সত্য তাহলে উলূমুল কুরআনের বিষয়টি কেমন হবে!

কোনো সন্দেহ নেই, তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের নতুন ও পুরোনো শাস্ত্রসমূহের সংখ্যা ১০০-এরও বেশি الأهم فالأهم-এর তারতীব অনুযায়ী প্রতিটি শাস্ত্রই গুরুত্বের দাবি রাখে

উলূমুল কুরআনের মৌলিক ভাগও অনেক কিছু আছে

العلوم الموصلة إلى القرآن

কিছু

العلوم المحافظة للقرآن

কিছু

أنواع العلوم التي في القرآن

কিছু

علوم نشر القرآن وتعليماته

প্রতিটি ভাগে রয়েছে উলূম ও ফুনূনের অনেক প্রকার ও অনেক শাখা

উলূমুল কুরআনের বড় একটি বিভাগ হল علم التفسيرইলমুত তাফসীরের অনেক প্রকার একটি প্রকার হল

ترجمة معاني القرآن الكريم

শুধু এ শাখাটি কেন্দ্র করেই হতে পারে কয়েক বছরের একটি প্রাতিষ্ঠানিক তাখাসসুস অথচ এটাকে অনেকে খুব সহজ একটি বিষয় মনে করে থাকে

কুরআন কারীমের হেদায়েত, আহকাম ও তালীমাতের নাশ্র, ইশাআত ও হেফাযতের জন্য বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন আমাদের আকাবির ও আসলাফ কিন্তু এ বিষয়টি একটি চলমান প্রক্রিয়া এতে স্থবিরতা কোনোভাবেই কাম্য নয়

উলূমুল কুরআনের যে কোনো শাখা সফল হওয়ার জন্যই আমরা উলূমুল কুরআনের মাহেরীনের মুহতাজ সে হিসেবে উলূমুল কুরআনের সকল শাখার মধ্যে মাহেরীনের এক জামাতের উপস্থিতি কাম্য কিন্তু যদি আমরা দুটি বিষয় সামনে রাখি

১. ইসলামের শত্রু ও কুরআনের দুশমনদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত শুবুহাতের দলীলগত ও যুক্তিগত খণ্ডন

২. কুরআনের হেদায়েত, আহকাম ও তালীমাতের নাশ্র, ইশাআত ও হেফাযত

শুধু এ দুটি বিষয়ের কথা যদি চিন্তা করি, তাহলেই বোঝা যাবে, উলামায়ে কেরামের কাফেলার মধ্যে উলূমুল কুরআন বিষয়ে কী পরিমাণ আহলে ইখতিসাস থাকা উচিত

ما لا يُدرَكُ كلُّه لا يُترَكُ قُلُّه -এর উসূল মোতাবেক এ বিষয়ে মারকাযুদ দাওয়াহ্‌র অনেক আগে থেকেই অংশগ্রহণের ইচ্ছা থাকলেও কার্যত তা সম্ভব হয়েছে ১৪৪৫-৪৬ হিজরী শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সানায়ে তামহীদিয়্যাহ-সহ সর্বমোট তিন বছরের নেসাব قسم التدريب في التفسير وعلوم القرآن-এর শিরোনামে কিছু মাওলানা তালিবে ইলম বিশেষ নেসাব ও নেযামে কমপক্ষে তিন বছর সময় ব্যয় করলে আশা করা যায় তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার সাথে তাদের উল্লেখযোগ্য মুনাসাবাত গড়ে উঠবে এরপর মশওয়ারাক্রমে যারা তরিকামতো আরও বেশি সময় লাগাবেন, আশা করা যায়, আল্লাহর রহমতে তারা ইখতিসাসের দিকে অগ্রসর হতে থাকবেন ইনশাআল্লাহ

আফসোস, আজকাল আমাদের মাঝে পরিসংখ্যানের বড় অভাব সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণের তো আরও বেশি অভাব দাওরায়ে হাদীসের পর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ও অবকাশ যাদের আছে, তাদের অনেকেই বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফাহ্ম ও ফিরাসাতের পরিচয় দেয় না এমনকি নিজের ইস্তেদাদ ও তবয়ী মুনাসাবাতের বিষয়টিও বিবেচনায় আনে না এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রবণতা হল, দ্বীনী ও দাওয়াতী জরুরতের চেয়ে সমাজের অবুঝ চাহিদা ও রুচিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় সমাজের দ্বীনী ও দাওয়াতী জরুরতের দিক থেকে বর্তমানে কোন্ কোন্ বিভাগের তাখাসসুসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার, সেটাও আমরা চিন্তা করে দেখি না সমাজে এখন ব্যাপকহারে ‘মুফতী’ আর ‘মুফতী’-এর চাহিদা তাই সবচেয়ে বেশি স্রোত এদিকেই ফিকহ-ফতোয়ার গভীরতা কতটুকু হাসিল করলাম, ফিকহ-ফতোয়ার দ্বারা যামানার তাকাযা পূরণ করার যোগ্যতা কী পরিমাণ অর্জন করলাম ওই দিকে খুব একটা তাওয়াজ্জুহ দেওয়া হচ্ছে না ব্যস, প্রাতিষ্ঠানিক নিসবত বা সনদ এবং মুফতী লকবই (!) যেন তাখাসসুসের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে

এই স্রোতের একটি প্রকাশ এটাও যে, তালিবে ইলমরা সাধারণত ফিকহ-ফতোয়ার বিভাগে পড়াশোনা করার পর অন্য কোনো বিভাগে পড়াশোনার জরুরত অনুভব করে না (এর ব্যতিক্রম একেবারেই বিরল) কিন্তু উলূমুল হাদীস বা অন্য কোনো বিভাগে পড়াশোনার পর তাখাসসুসের তৃষ্ণা মেটে না; বরং  ওই প্রতিষ্ঠানে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে জরুরি ভিত্তিতে ফিকহ-ফতোয়ার বিভাগে দাখেলা নেওয়ার জরুরত অনুভব করে

(کاش کہ ایسا پورا اخلاص اور پوری بصیرت کے ساتھ ہوتا، اگرچہ بعضوں کے بارے میں یہ امید تو ضرور ہے۔)

অনেক তালিবে ইলম ভাই এ বিষয় নিয়েও ভালোভাবে হয়তো চিন্তা করেন না যে, দিরাসাতে উলইয়ার কোন্ বিভাগ কত গভীর ও কত বিস্তৃত ব্যস, স্থূল একটা ধারণা থেকেই মনে করা হয়, অমুক বিভাগ খুব কঠিন আর অমুক বিভাগ সহজ আর অমুক বিভাগ তো একেবারেই সহজ; সেটার জন্য আলাদা করে দাখেলা নেওয়ারই বা কী প্রয়োজন!

কিসমুত তাফসীর ওয়া উলূমিল কুরআন-এর বিষয়েও হয়তো অনেকের ধারণা এমন যে, এটা আলাদা করে তাখাসসুস করার কী? বেশির চেয়ে বেশি দাওরায়ে হাদীসের মতো একটি দাওরায়ে তাফসীর করে নিলেই তো হয়!

আমার ধারণা, অনেক তালিব ইলম হয়তো কিসমুদ দাওয়াহকে সবচেয়ে সহজ মনে করে এবং এ বিষয়ে আলাদা ও দীর্ঘ সময় দেওয়াকে সবচেয়ে কম জরুরি মনে করে

অনেক কিছুই বলা হল; তবে মুজমালভাবে যে বিষয়ে বলার ইচ্ছা ছিল, সে বিষয়ে তেমন কিছু বলা হল না লেখাটি এ হালতেই শেষ করে দিলাম আল্লাহ তাআলা কবুল করার মালিক

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.

বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক

১১ রজব ১৪৪৭ হি.

১ জানুয়ারি ২০২৬ ঈ.

বৃহস্পতিবার

 

advertisement