Shaban 1447   ||   February 2026

মডার্নিজম : তিনটি সাক্ষাৎকার
‖ ‘পশ্চিমায়নের উদ্দেশ্যে ইসলামের বিকৃতিসাধন : বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের চরম লজ্জাজনক প্রকাশ’

মুফতী মুহাম্মাদ আমীন আলহুসাইনী রাহ.

[মুফতী মুহাম্মাদ আমীন আলহুসাইনী রাহ. (১৮৯৫-১৯৭৪) ছিলেন ফিলিস্তিনের সংগ্রামী ইতিহাসের এক উজ্জ্বল চরিত্র ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে তিনি ১৯২১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতী বা মুফতীয়ে আযমে দায়িত্ব পালন করেন এবং ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন

তাঁর অন্যতম স্মরণীয় অবদান ছিল আলআকসা অন্যান্য পবিত্র স্থানের সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ওয়াক্ফ প্রশাসনকে সুসংহত করা, যাতে মুসলিম ঐতিহ্য অটুট থাকে ব্রিটিশদের ফিলিস্তিন দখলনীতি ব্যাপক ইহুদী অভিবাসন পরিকল্পনার বিরোধিতায় তিনি ছিলেন প্রথম সারির কণ্ঠস্বর

১৯৩৬-১৯৩৯ সালের ফিলিস্তিনী জাতীয় বিদ্রোহে তিনি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা সমর্থন দিয়ে আন্দোলনকে সংগঠিত বিস্তৃত করেন, যা উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় আরব রাষ্ট্রগুলোকে একত্র করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে যৌথ অবস্থান গ্রহণে অবিরাম প্রচেষ্টা চালান, যার ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্ন তখন মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়

আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিন মুক্তির প্রশ্ন তিনি জোরালোভাবে তুলে ধরেন, যাতে বিশ্ব রাজনীতিতে এই ইস্যু কখনো উপেক্ষিত না হয় দ্বীনী স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে ফিলিস্তিনে মাদরাসা, লাইব্রেরি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন

শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম লেখেন, (যথাযথ পদ্ধতির) রাজনীতি দ্বীনের একটি শাখা যিনি সমসাময়িক রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন, সাধারণত তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ধীরে ধীরে আকীদা আমলের বন্ধন শিথিল হতে দেখা যায় কিন্তু হুসাইনী সাহেবের ব্যক্তিত্ব এই প্রবণতা থেকে অনেকটা মুক্ত ছিল দিনরাত রাজনীতির সঙ্গে কাটলেও তাঁর জীবনে ঈমানী দীপ্তি ছিল ঝলমলে তাঁর সরলতা, বিনয় নম্রতায় খোদাভীতির ছাপ ছিল সুস্পষ্ট

মুফতী আমীন আলহুসাইনী রাহ. এবং . মারুফ দাওয়ালীবী রাহ. যিলকদ ১৩৮৭ হি. মোতাবেক ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে অনুষ্ঠিত مؤتمر العالم الإسلامي তথা আন্তর্জাতিক ইসলামী সেমিনার’- যোগদানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান আগমন করেন সেই সফরে হযরত শায়খুল ইসলাম দামাত বারাকাতুহুম মাসিক আলবালাগ’-এর পক্ষ থেকে উভয় শায়েখের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন

সাক্ষাৎকারে উম্মাহর ঐক্যভাবনা এবং মডার্নিস্টদের সংস্কারবাদী ধ্যানধারণা সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা উঠে এসেছে, যাতে গভীর চিন্তা আমলের আহ্বান রয়েছে ঈষৎ সংক্ষেপণের পর আলকাউসারের পাঠকের জন্য এর অনুবাদ পেশ করা হচ্ছে -অনুবাদক]

প্রশ্ন : আপনার দৃষ্টিতে মুসলিম উম্মাহ্‌র ঐক্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা কী?

উত্তর : সবচেয়ে বড় বাধা হল, উপনিবেশবাদ (Colonialism) ও তার উত্তরাধিকারী শক্তি পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism) তার ঔপনিবেশিক লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের দুর্বল করে দিয়ে

একসময় গোটা ইসলামী বিশ্ব একটি খেলাফতের সুতোয় গাঁথা ছিল জাতিগত ও আঞ্চলিক ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলিমদের একক শাসনব্যবস্থা ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ মুসলিমদের পরস্পরে লড়াইয়ে লিপ্ত করে সেই মহৎ ঐক্যকে টুকরো টুকরো করে দেয় তারা বহু মুসলিম দেশ দখলে নেয় আর বাকি দেশগুলোকে ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত করে দুর্বল করে দেয়, যাতে তারা কখনোই সাম্রাজ্যবাদের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়

এই কাজে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র ছিল ‘জাতীয়তাবাদ’ (Nationalism) এটি ছিল একধরনের সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা (cultural colonialism), যা মুসলিমদের মাঝে বিভেদ তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে এর মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মুসলিমদের জাতিগত অহমিকা ও আঞ্চলিক গোঁড়ামি চরম মাত্রায় উসকে দিয়েছে ফলে মুসলিমরা অঞ্চল ও জাতীয়তাকে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে বসে

কিন্তু ইসলাম এই ধারণার ঘোর বিরোধী ইসলাম জাহেলী যুগের এসব বিভেদমূলক স্লোগান বর্জন করেছে এবং মুমিনদের এই সংকীর্ণ শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে, এক উম্মাহ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে

আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন

اِنَّ هٰذِهٖۤ اُمَّتُكُمْ اُمَّةً وَّاحِدَةً وَّاَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوْنِ.

(তাওহীদের) এ দ্বীনই তোমাদের দ্বীন, যা (নবী-রাসূলদের) অভিন্ন দ্বীন আর আমি তোমাদের রব, অতএব আমারই ইবাদত কর সূরা আম্বিয়া (২১) : ৯২

প্রশ্ন : ইসলামী বিশ্বে এই বাধা দূর করতে কী ধরনের প্রচেষ্টা চলমান? এসব প্রচেষ্টা সফল হওয়ার উপায় কী?

উত্তর : বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ্‌র ঐক্যের একমাত্র পথ মুসলিমরা ইসলামের প্রকৃত রূপ ও বাস্তবতা বুঝবে, দ্বীনের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে সুস্থ ও দৃঢ় ইসলামী চেতনা গড়ে তুলবে ইসলামী বিশ্বের যেখানেই এই চেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা চলছে, সেটিকে মুসলিম উম্মাহ্‌র ঐক্যের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব কার্যক্রম সঠিক ইসলামী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, সবই এই লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত

প্রশ্ন : মুসলিম দেশগুলো প্রাকৃতিক সম্পদে বিপুল সমৃদ্ধ হলেও বাস্তবিক অর্থে যেমন দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিকভাবেও পরাধীন এর কারণ কী?

উত্তর : সন্দেহ নেই, মুসলিম দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব নেই কিন্তু উম্মাহ্‌র ঐক্যের পথে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলোই এসব সম্পদকে অকার্যকর করে রেখেছে মুসলিমরা এর পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না

এই সম্পদের সঠিক ব্যবহার না হওয়ার আরেকটি কারণ হল, অনেক মুসলিম দেশ জ্ঞান-গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক পিছিয়ে ফলে তারা বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদ যথাযথ কাজে লাগানোর উপায়ও জানে না, নতুন সম্পদ সন্ধান ও আবিষ্কারের সক্ষমতাও রাখে না

তবে আশার কথা, ধীরে ধীরে মুসলিম দেশগুলো শিল্প ও প্রযুক্তিতে উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে

প্রশ্ন : ইসলামী বিশ্বের কিছু মহল থেকে এই দাবি শোনা যায়, মুসলিমদের উন্নতি করতে হলে কুরআন-সুন্নাহ্‌র ব্যাখ্যাকে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামকে পশ্চিমা চিন্তাধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এই ধারণা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

উত্তর : এই ধরনের চিন্তার মূল কারণ হল আমাদের একটি গুরুতর অবহেলা আমরা ইসলামের সর্বজনীন বাণী যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা এই মৌলিক সত্যটি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করিনি যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা দান করেছে ইসলাম প্রতিটি সুস্থ সমাজের সর্বোত্তম ভিত্তি প্রদান করে, যাতে সকল যুগের ও সকল অঞ্চলের মানব সমাজের সমস্যার সমাধান রয়েছে কোনো যুগের সমস্যা সমাধানে ইসলাম ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা ও দর্শনের মুখাপেক্ষী নয়

এই বাস্তবতা সম্পর্কে বেখবর থাকায় কিছু সংস্কৃতিপ্রেমী মুসলিম পশ্চিমা সভ্যতার বাহ্যিক জাঁকজমক দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে পশ্চিমাদের বস্তুগত উন্নতি দেখে এই সভ্যতাকেই প্রগতি ও সমৃদ্ধির মাপকাঠি ভেবে বসে

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, পশ্চিমা চিন্তার সাথে ইসলামের মিল খুঁজে পেলে তারা ইসলামের প্রশংসা করে; কিন্তু পশ্চিমা ধ্যানধারণার সাথে ইসলামের অমিল দেখলে তারা সন্দেহ ও দ্বিধা প্রকাশ করতে শুরু করে অথচ পশ্চিমা সভ্যতাই ভ্রান্তি ও অবক্ষয়ে পূর্ণ এটা নিঃসন্দেহে বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের জঘন্য রূপ, যা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ তার রাজনৈতিক প্রস্থান সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে রেখে গেছে

এই পরিস্থিতিতে, সকল দাঈ ও ধর্মীয় সংগঠনের দায়িত্ব বর্তায়, এ ধরনের বিভ্রান্ত মানুষকে সুস্থ চিন্তা ও সঠিক বিশ্বাসের পথে ফিরিয়ে আনার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া তারা যেন উপলব্ধি করতে পারে, ইসলামই সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা দান করেছে

প্রশ্ন : ইসলামী আইনে হাদীস ও সুন্নাহ্‌র অবস্থান কী?

উত্তর : কুরআন মাজীদের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সুন্নাহ দ্বীনের দ্বিতীয় ভিত্তি এবং ইসলামী আইনের দ্বিতীয় স্তম্ভ কুরআন অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ ও মৌলিক নীতিমালা বর্ণনা করেছে, সুন্নাহ এসব নীতিমালার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছে সুন্নাহ এমন সব বিধান প্রদান করেছে, যা অনুসরণ করে যুগে যুগে জীবনকে ইসলামসম্মতভাবে গড়ে তোলা সহজ হয় সুন্নাহ প্রকৃতপক্ষে কুরআন মাজীদেরই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সুন্নাহ ছাড়া ইসলামী আইন অকল্পনীয়

 

ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠায় চিন্তাগত ও আদর্শিক ঐক্যের বিকল্প নেই

ডক্টর মারুফ দাওয়ালীবী রাহ.

[ডক্টর মারুফ দাওয়ালীবী রাহ. (১৯০৯-২০০৪) একইসাথে ইসলামী ফিকহ, আধুনিক পাশ্চাত্য আইন রোমান আইন তুলনামূলক গভীর অধ্যয়ন করে প্রতিটি বিষয়ে স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেছেন() তাঁর লেখা বেশ কিছু বই ইলমী মহলে প্রশংসিত হয়েছে

দুই দফায় সিরিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি, ডক্টর সাহেব বিভিন্ন সময়ে সেই দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন কিন্তু যখন বাথ পার্টি ক্ষমতায় এল, যাদের চরম দলীয় আনুগত্য এবং আরব জাতীয়তাবাদের অন্ধ অনুসরণ দেখে বিরোধীরা তাদের চিন্তাকে এই ব্যঙ্গাত্মক শ্লোগানে প্রকাশ করেছিলÑ

نؤمن بالبعث ربا لا نظير له، وبالعروبة دينا لا مثيل لها.

বাথ পার্টি আমাদের রব, যার কোনো সমকক্ষ নেই আরব জাতীয়তা আমাদের অতুলনীয় ধর্ম!

তখন ইসলামপন্থি হওয়ার অপরাধেতাঁকে দেশ ছাড়তে হয় সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আযীয (১৯০৬-১৯৭৫) তাঁর রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে তাঁকে উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন Ñশায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম]

 

প্রশ্ন : বর্তমানে ‘মুসলিম ঐক্যে’র ভাবনা বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে এই ঐক্যের প্রকৃত অর্থ কী?

উত্তর : আমার বিবেচনায় ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য বিষয় হল চিন্তাগত ও আদর্শিক ঐক্য মনে রাখবেন, মানুষের মন-মনন এবং চিন্তা-বিশ্বাসই তার গোটা কর্মজীবনের ভিত্তি তার যাবতীয় কাজকর্ম সেই চিন্তারই প্রতিফলন মানুষ যা সঠিক মনে করে, তা-ই করতে চেষ্টা করে

মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হতে চাইলে প্রথমেই চিন্তা ও আদর্শে ঐক্য আনতে হবে আমার বিশ্বাস, মুসলিম ঐক্যের লক্ষ্য পূরণ হবে, যদি তাদের মৌলিক চিন্তার সূত্র এক হয়ে যায় কিন্তু এই সূত্র বিচ্ছিন্ন রেখে পুরো মুসলিম বিশ্বকে এক রাষ্ট্রের সুতোয় গাঁথলেও ঐক্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য কখনোই পূরণ হবে না

আজ মুসলিমদের মধ্যে যে বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ হল, তাদের চিন্তাভাবনার পদ্ধতি ও উপলব্ধির ধরন ভিন্ন ভিন্ন বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতাদর্শিক বিরোধ রয়েছে কেউ এক ধরনের লক্ষ্য স্থির করেছে, কেউ সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য বেছে নিয়েছে যদি এই পরিস্থিতি বদলে যায় এবং মুসলিমরা আদর্শিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে ইসলামী ঐক্যের বেশিরভাগ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে

প্রশ্ন : কিন্তু এই আদর্শিক ঐক্য কীভাবে অর্জন করা সম্ভব?

উত্তর : এটা তেমন কঠিন নয়, কুরআন ও সুন্নাহ্ই আমাদের জন্য আদর্শিক ঐক্যের সর্বোত্তম মাধ্যম যদি মুসলিমরা সত্যিকার অর্থে মুসলিম হয়ে কুরআন-সুন্নাহ্‌র মৌলিক শিক্ষায় ঐকমত্য পোষণ করে, তাহলে এই চিন্তাগত ঐক্য অর্জন সম্ভব ‘ঈমান’-এর সর্বসম্মত সংজ্ঞা হল

هُوَ الْاعْتِقَادُ بِكُلِّ مَا يُعْتَبَرُ مَعْلُومًا مِنَ الدِّينِ بِالضَّرُورَةِ.

দ্বীনের স্বতঃসিদ্ধ ও অকাট্য সব বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা

যদি সব মুসলিম সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত দ্বীনের সকল বিষয়ে তাদের বিশ্বাস সুদৃঢ় করে নেয়, তাহলে চিন্তাগত ঐক্যের পথে আর বাধা থাকবে না

সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বিষয় দুই ধরনের হতে পারে

১. আকীদা ও ইবাদত সংক্রান্ত মৌলিক শিক্ষা, যেমন : তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, কিতাব ও সুন্নাহ্‌র প্রতি ঈমান, আরকানে ইসলাম (নামায, রোযা ইত্যাদি) ফরয মনে করা

২. দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক জীবনের নীতিমালা, যেমন : মানুষের হক আদায় করা

এসব দ্বীনের সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয় যদি সব মুসলিম এগুলো সঠিকভাবে বুঝে বিশ্বাস ও আমলে দৃঢ় হয়, তাহলে চিন্তাগত ঐক্যের জন্য এগুলোই যথেষ্ট কিন্তু এসব বিষয়েই মতভেদ দেখা দিলে ঐক্যের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়

কোনো গোষ্ঠী যদি মৌলিক আকীদার ব্যাখ্যায় বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে, তাহলে ইসলামী ঐক্য বিঘ্নিত হবেই

যেমন কেউ যদি ইসলামকে সমাজতন্ত্রের সাথে মেলানোর চেষ্টা করে, আবার কেউ ইসলামকে পুঁজিবাদের সমর্থক বলে দাবি করে, তাহলে ঐক্য কীভাবে সম্ভব? অথচ ইসলামের নিজস্ব জীবনব্যবস্থা আছে; যা সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ উভয় থেকেই উত্তম!

প্রশ্ন : কিন্তু সমস্যা তো এখানেই; প্রত্যেকে নিজের মতকে ‘সঠিক ইসলাম’ মনে করে, অন্যদের ভুল বলে গণ্য করে এমন অবস্থায় চিন্তাগত ঐক্য নিয়ে হতাশাই জাগে!

উত্তর : না, না! হতাশ হওয়ার কিছু নেই ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোতে যে মতভেদ দেখা যায়, তা অজ্ঞতার কারণে এজন্যই ইসলামের গভীর জ্ঞান রাখেন এমন আলেমদের মধ্যে এসব নিয়ে কোনো বিরোধ নেই এখন আলেমদের দায়িত্ব এই অজ্ঞতা দূর করার চেষ্টা করা আমি বিশ্বাস করি, যদি তাঁরা ইখলাস ও প্রজ্ঞার সাথে কাজ করেন, ইনশাআল্লাহ, তারা অবশ্যই সফল হবেন

প্রশ্ন : আলেমদের এই প্রচেষ্টার পদ্ধতি কী হওয়া উচিত?

উত্তর : হাঁ, আপনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন

এই প্রচেষ্টায় গভীর প্রজ্ঞা ও সচেতনতা প্রয়োজন যারা ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোতে মতভেদ করে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা অজ্ঞতার ফল তারা মনে করে, আধুনিক যুগের সমস্যার সমাধান সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদের মতো জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেই সম্ভব

আলেমদের দায়িত্ব এই ভুল ধারণা দূর করা কার্যকর উপায়ে তাদের প্রমাণ করে দেখানো যে, মুসলিমদের জন্য চলমান শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই ইসলাম যে জীবননীতির শিক্ষা দিয়েছে, তা-ই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান

পাশ্চাত্য প্রোপাগান্ডা অনেকের মনে এই অবাস্তব ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, ইসলামও অন্যান্য ধর্মের মতো একটি ‘নিষ্ক্রিয়’ জীবনদর্শন, যা বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কহীন আমাদের উচিত, এই ভিত্তিহীন ধারণা ভেঙে দিয়ে মানুষের সামনে ইসলামের সেই শিক্ষাগুলো ব্যাপক প্রচার করা, যেখানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা আছে তাদের বুঝতে হবে, ইসলামের ডাক হল জীবনের ডাক যেমন, কুরআনে ইরশাদ হয়েছে

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اسْتَجِیْبُوْا لِلهِ وَلِلرَّسُوْلِ اِذَا دَعَاكُمْ لِمَا یُحْیِیْكُمْ.

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদেরকে এমন (জীবনবিধানের) দিকে ডাকেন, যা তোমাদেরকে প্রকৃত জীবন দান করে সূরা আনফাল (০৮) :  ২৪

আলেমরা যদি এই সত্য প্রচারে পূর্ণ সামর্থ্য ব্যয় করেন, তবে এই বিভ্রান্তি অনেকাংশে দূর হওয়া সম্ভব এভাবে চিন্তাগত মৌলিক বিভেদ মিটে যেতে পারে

প্রশ্ন : অধিকাংশ মুসলিম দেশ প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পরাধীন হয়ে আছে এর কারণ কী?

উত্তর : কারণটা সেটাই, যা প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলেছি তাদের চিন্তাধারা সঠিক নয় ইসলামের সঠিক শিক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হলে এই সব দুর্বলতা দূর করা সম্ভব যখন তারা ইসলামকে পুরোপুরি গ্রহণ করবে, তখন ইসলামই তাদেরকে মুসলিম উম্মাহ্‌র সমৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাতে, সমষ্টিগত স্বার্থ রক্ষা করতে এবং সাহস, উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে পরাধীনতার সব শেকল ভেঙে ফেলতে বাধ্য করবে তাই মুসলিমদের বস্তুগত উন্নতির পথও একটিই ইসলামকে জীবনের সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা

প্রশ্ন : প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশের ‘আহলে তাজাদ্দুদ’ বা মডার্নিস্ট গোষ্ঠীর অবস্থান হল, বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত জাতি পাশ্চাত্যের চিন্তা-দর্শন, সংস্কৃতি ও সামাজিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেই প্রগতি অর্জন করেছে মুসলিমরা উন্নতি চাইলে তাদেরকেও এই সভ্যতা গ্রহণ করতে হবে তাদের মতে, ইসলামের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী (ঞৎধফরঃরড়হধষ) ব্যাখ্যাই হল মুসলিমদের অগ্রগতির প্রধান বাধা তারা মনে করে, মুসলিম বিশ্বের কল্যাণের একমাত্র পথ হল আইনকানুনের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ্‌র নতুন ব্যাখ্যা হাজির করা, যা পশ্চিমা চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ

এই মতবাদ সম্পর্কে কী বলবেন?

উত্তর : (এই প্রশ্নে ডক্টর সাহেবের কপালের ভাঁজ গভীর হল কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,) শুনুন, আমি আগেই বলেছি, ইসলামের একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা রয়েছে; যার নীতি ও বিধান সুস্পষ্ট, সুনির্ধারিত ও সংকলিত ইসলামের এই নীতিগুলো ‘পূর্ব’ বা ‘পশ্চিম’ সব ধরনের ভৌগোলিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে ইসলাম কোনো অঞ্চল বা জাতিবিশেষের ধর্ম নয়; এটি এক বিশ্বজনীন ধর্ম ও জীবনপদ্ধতি

এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন

ক. পশ্চিমা সভ্যতার সবকিছুই ইসলামের দৃষ্টিতে মন্দ নয়

খ. এই সভ্যতার প্রতিটি বিষয় অনুসরণযোগ্যও নয়

ইসলাম নিজস্ব নীতিমালা ও বিধান নির্ধারণ করেছে যে বিষয় এই নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি সঠিক ও গ্রহণযোগ্য, তা যে অঞ্চল বা সভ্যতা থেকেই আসুক আর যে বিষয়টি এই নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক, তা পরিত্যাজ্য, পূর্বের হোক বা পশ্চিমের

আমাদের উচিত আইনকানুনের ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক নীতিমালাকেই ভিত্তিমূল হিসেবে গ্রহণ করা এরপর পশ্চিমের কোনো বিষয় যদি সেই নীতিমালার সাথে মানানসই হয়, তাহলে তা গ্রহণ করতে দ্বিধা নেই যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দক যুদ্ধে পারস্যের পরিখা খনন কৌশল গ্রহণ করেছিলেন এটি আসলে ইসলামী নীতিরই বাস্তবায়ন

কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি গোড়া থেকে গলদ প্রতিটি ক্ষেত্রে পশ্চিমা চিন্তাধারাকে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির মানদণ্ড গণ্য করে তাদের জীবনব্যবস্থা এমনভাবে গ্রহণ করা, যাতে ইসলামের সুনির্ধারিত নীতি ও বিধান লঙ্ঘিত ও বিকৃত হয়

সারকথা, ইসলামী নীতিমালাকে মূল স্থির করে পশ্চিমা রীতিনীতিকে এর অধীন করা যায়, কিন্তু পশ্চিমা ব্যবস্থাকে মানদণ্ড বানিয়ে ইসলামকে এর অধীন করা ভ্রান্ত কর্মপদ্ধতি

আইনের ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে, ইসলামের প্রকৃত বিধান কী? তারপর যদি পশ্চিমা কোনো পদ্ধতির ব্যাপারে ইসলাম সম্মতি দান করে, তবে তা গ্রহণ করা যেতে পারে কিন্তু পশ্চিমা মতবাদ ও দর্শনকে ‘নিঃশর্তভাবে শ্রেষ্ঠ’ ধরে নেওয়া, আর ইসলাম-এর বিরোধিতা করা, খোদ ইসলামের পরিবর্তন বা সংশোধনের চেষ্টা শুরু করা কিছুতেই সঠিক কর্মপন্থা হতে পারে না

ডক্টর সাহেব এই কথা বলছিলেন আর আমার মনে কুরআনের এই বাণী ভেসে উঠছিল

وَکَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا.

আর আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থি উম্মত বানিয়েছি সূরা বাকারা (০২) : ১৪৩

 

 

পশ্চিমা সভ্যতার উপাদান গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে মুসলিমদের অত্যন্ত সতর্কতা, সচেতনতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে’

শায়েখ মানসূর মুস্তফা মাহজুব রাহ.

[শায়েখ মানসূর মুস্তফা মাহজুব রাহ. (১৯২৩-২০০১ ঈ.) ছিলেন লিবিয়ার প্রখ্যাত আলেম, বিচারপতি ও ইসলামী শিক্ষার পথিকৃৎ

১৯৫২ সালে জামিয়া আযহার থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফেরেন তিনি ছোট্ট একটি ধর্মীয় কেন্দ্রকে (زاوية البيضاء) ধাপে ধাপে উন্নত করে, একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করেন মুহাম্মাদ বিন আলী সানূসী ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (বর্তমান উমর মুখতার বিশ্ববিদ্যালয়) তিনি এই ভার্সিটির প্রথম রেক্টর (উপাচার্য) ছিলেন

১৯৫৬ সালে লিবিয়ার সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস নিযুক্ত হন পাশাপাশি তিনি ছিলেন রাবিতাতুল আলামিল ইসলামী (Muslim World League)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য

তাঁর পুরো জীবন ছিল শিক্ষা, ন্যায়বিচার ও দাওয়াহ্‌র সমন্বিত উদাহরণ

শায়খ মানসূর রাহ. ১৩৮৭ হিজরীর যিলকদে করাচিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামিক কনফারেন্সে যোগ দিতে পাকিস্তান আগমন করলে হযরত শায়খুল ইসলাম দামাত বারাকাতুহুম তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন সাক্ষাৎকারটি মাসিক ‘আলবালাগ’-এ ১৩৮৮ হিজরীর মুহাররম মোতাবেক এপ্রিল ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় অনুবাদক]

প্রশ্ন : নানাবিধ অপরাধ ও অবিচার ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় পুরো বিশ্ব এখন ভীষণ বিপর্যস্ত একসময় কিছু লোক বলত, অপরাধের প্রধান কারণ হল দারিদ্র্য কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশগুলোতে অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি

আগে হয়তো বলা যেত, অপরাধ বৃদ্ধির জন্য দায়ী হল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা বা ঘাটতি কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার যন্ত্রপাতি ও বাহিনী বৃদ্ধি পেলেও অপরাধের হার তার চেয়েও দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে

তাহলে আসল কারণ কী? এই ভয়াবহ রোগের কোনো প্রতিকার বা স্থায়ী চিকিৎসা কি আদৌ সম্ভব?

উত্তর : আমি মনে করি, যারা এখন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তারা মানুষের, বিশেষত অপরাধীর মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারেননি তাদের মৌলিক ভুল হল, তারা চরিত্র গঠন ও মানসিক সুশিক্ষা ছাড়াই আইনের কঠোর শৃঙ্খল দিয়ে অপরাধ দমন করতে চান অথচ এই পদ্ধতি মানুষের স্বভাবজাত নয়, এর মধ্য দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের আশা করার অর্থ নিজেকেই ধোঁকা দেওয়া

এখানে এসে তার কণ্ঠে জোর এল তিনি বললেন, ‘বর্তমান বিশ্ব বস্তুবাদ ও কামনা-বাসনাকে পূজনীয় বানিয়ে ফেলেছে মানুষকে বোঝানো হয়েছে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য টাকাকড়ি রোজগার আর মনের ইচ্ছা পূরণ মানুষের মন থেকে এই চিন্তা মুছে ফেলা হয়েছে এই পৃথিবীতে অবস্থানের পর তাকে আরেক জীবনে যেতে হবে

ফলে মানুষ এই সাময়িক জীবনকেই সবকিছু ভাবছে বৈধ উপায়ে এই জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভাগ্যে না জুটলে সে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে এই বঞ্চনার অনুভূতিই তাকে অপরাধ ও পাপের জগতে ঠেলে দেয়

তখন শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে তাকে অপরাধ থেকে ফেরানো যায় না অন্ধকারে কিংবা একাকীত্বে, যেখানে কারও ভয় নেই, সে সহজেই অপরাধে জড়িয়ে যায় তার লালসা ও দুঃসাহস বাড়তে থাকলে প্রকাশ্যে আইন ভাঙতে শুরু করে কারণ তার চোখে বঞ্চনা ও শাস্তি দুটোই সমান

প্রশ্ন : তাহলে এ সমস্যার কোনো সমাধান আছে?

উত্তর : অবশ্যই আছে লোকে ‘গোঁড়া’ বা ‘পশ্চাৎপদ’ বলে উপহাস করবে এই ভয় ত্যাগ করতে পারলে এ সমস্যার কার্যকর সমাধান মুসলিমদের কাছেই আছে তা হচ্ছে ইসলামী শিক্ষা

প্রশ্ন : ইসলাম কীভাবে এই জটিলতার সমাধান দেয়?

উত্তর : আসলে ইসলাম প্রথমে চেষ্টা করেছে, অপরাধ যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম হয় এজন্য ইসলাম কেবল আইনকানুন প্রণয়নের ওপর নির্ভর করেনি; বরং মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি ও আখেরাতের বিশ্বাস জাগ্রত করায় জোর দিয়েছে

সর্বপ্রথম মানুষকে এ শিক্ষা দিয়েছে; দুনিয়ার জীবনই সবকিছু নয়, পেট ও কামনা-বাসনাকে জীবনের লক্ষ্য না বানিয়ে, নেক আমল ও আখেরাতের সফলতাকে জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করে সেই পথে অগ্রসর হতে হবে

ভাবুন তো যখন একজন মানুষের অন্তরে এই দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে ওঠে; এ জীবন অল্প কিছু দিনের, এর পরেই আসছে চিরন্তন জীবন, তখন দুনিয়াতে কিছু কষ্ট বা অভাব সহ্য করলেও সে ক্ষণিকের কষ্ট লাঘব করতে গিয়ে চিরস্থায়ী আখেরাত বরবাদ করবে না এই সাময়িক কষ্ট সেই বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করবে না, যেটাকে আমি অপরাধের মূল শেকড় মনে করি

তো ইসলাম প্রথমেই এমন মানসিকতা গঠনের চেষ্টা করেছে, যা লোভ-লালসার পরিবর্তে আখেরাতের কল্যাণকে প্রাধান্য দেয় এরপর সামগ্রিকভাবে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যাতে অপরাধের সুযোগ ও সম্ভাবনা কমে যায়

কিন্তু এত সব সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি কোনো দুর্বৃত্ত অপরাধ থেকে বিরত না থাকে, তবে ইসলাম তার সঙ্গে যথোচিত আচরণ করেছে সে আসলে সমাজের পচে যাওয়া অঙ্গ, যা সার্জারি করার জন্য শরীয়ত ‘হুদুদ’ (চুরি, ডাকাতি বা যিনার মতো জঘন্য সব অপরাধের শাস্তি) নির্ধারণ করেছে এ শাস্তিগুলো একবার কার্যকর হলে বহু বছর ধরে মানুষের জন্য শিক্ষা ও সতর্কতার উপকরণ হয়ে থাকে

প্রশ্ন : পশ্চিমা সভ্যতা গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে মুসলিমদের কর্মপন্থা কী হওয়া উচিত?

উত্তর : আমার মতে, পশ্চিমা সভ্যতার উপাদান গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে মুসলিমদের অত্যন্ত সতর্কতা, সচেতনতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতির যেসকল উপাদান উপকারী এবং ইসলামী নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেগুলো গ্রহণ করা উচিত বরং এর বেশিরভাগ ইসলাম থেকেই আহরিত যেমন, গবেষণা ও অনুসন্ধানের আগ্রহ, পরিশ্রম ও উদ্যোগ গ্রহণের চেতনা এসব গুণ অর্জনের ফলে তারা যেসকল উপকারী প্রযুক্তি ও শিল্প উদ্ভাবন করেছে, তা থেকে লাভবান হওয়া দরকার

কিন্তু একইসাথে পশ্চিমা সভ্যতার একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে অশ্লীলতা, উলঙ্গপনা, নাচ-গান, কৃত্রিমতা ও বাহুল্য, বস্তুবাদী চিন্তা এসব পশ্চিমা সভ্যতার কালো দাগ এগুলো মানবতার মারাত্মক ক্ষতি করেছে

দুঃখের বিষয়, আমাদের অনেকেই প্রথমোক্ত গুণাবলিতে পশ্চিমের অনুসরণ করে না, কিন্তু শেষোক্ত বিষয়গুলোতে তাদের থেকেও এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে গেছে! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুস্থ বিবেক ও সুস্থ রুচি দান করুন

আমীন!’ (আমার মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এল)

[অনুবাদ : মাওলানা আবু আনাস মুহাম্মাদ সালমান]

 

টিকা :

  তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ১৫টির মতো বই রচনা করেছেন তন্মধ্যে এই বিষয়ক কয়েকটি বই-

الإسلام أمام الاشتراكية والرأسمالية،

الوجيز في الحقوق الرومانية،

المدخل إلى التاريخ العام للقانون،

المدخل إلى علم أصول الفقه.

ينظر ترْجمته الموجزة فِيْ مقدمة >مذكرات الدكتوْر معْروْف الدواليبِي< صـ -، إعداد: د. عبد القدوس أبو صالح.

 

 

advertisement