Shaban 1447   ||   February 2026

গাজার শিকারক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতির ছুঁতা

ওয়াসআতুল্লাহ খান

হিরোশিমার তুলনায় প্রায় অর্ধেক আয়তনের গাজায় হিরোশিমা-আকারের অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি পারমাণবিক বোমার সমান শক্তিশালী বোমা ইতিমধ্যে দুই দফায় বর্ষণ করা হয়েছে বর্তমানে গাজা প্রায় পাঁচ কোটি টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপের নগরীতে পরিণত হয়েছে মৃতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে সত্তর হাজার ঘোষণা করা হলেও এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় দশ হাজার মরদেহ চাপা পড়ে আছে যাদের উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানির ওপরও ইসরাইল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে

আহতদের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য যেসব বিদেশি চিকিৎসক গাজা কিংবা পশ্চিম তীরে আসতে চান, ইসরাইল তাদের ভিসা দিতেও অস্বীকৃতি জানাচ্ছে ১০ অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল ছয়শ’রও বেশি বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে এই যুদ্ধবিরতির পরও প্রায় চারশ ফিলিস্তিনী শহীদ হয়েছেন এবং এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন

যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, ত্রাণসামগ্রী বোঝাই অন্তত ছয় শ ট্রাক প্রতিদিন প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু গড়ে মাত্র দেড় শ ট্রাক গাজায় প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের খাদ্য হিসেবে গোশত, দুগ্ধজাত দ্রব্য বা সবজির বদলে শুধু টিনজাত এমন খাবারই আনার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, যেগুলোর পুষ্টিগুণ খুবই কম এমনকি ওষুধ, তাঁবু, শীতের কাপড় এবং নির্মাণসামগ্রী আনারও অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না

ত্রাণ সংস্থাগুলোর ধারণা, বর্তমানে যে পরিমাণ খাদ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও কম মানুষের প্রয়োজন মিটতে পারে অথচ ফিলিস্তিনী শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) সীমান্তবর্তী গুদামগুলোতে যে পরিমাণ খাদ্য মজুত আছে, তা গাজার পুরো জনসংখ্যার তিন মাসের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট কিন্তু ইসরাইল ইউএনআরডব্লিউএ-কে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে আসছে যদিও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অক্টোবর মাসের যুদ্ধবিরতির পর একটি রায়ে জানিয়েছে, ইসরাইল ইউএনআরডব্লিউএ-সহ কোনো আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাকে গাজায় প্রবেশে বাধা দিতে পারে না পাশাপাশি আদালত ইসরাইলের এই অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে যে, ইউএনআরডব্লিউএ কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয় আদালতের বক্তব্য হল, ইউএনআরডব্লিউএ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ত্রাণ সংস্থা

অবশ্য ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছিল কিন্তু দুই সপ্তাহ পার হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রাম্পের সভাপতিত্বে যে শান্তি বোর্ড এবং গাজার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক যে অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠিত হওয়ার কথা ছিল, তার কোনো খোঁজ নেই এ ব্যবস্থাও ইসরাইলের সম্মতির ভিত্তিতেই গঠিত হওয়ার কথা ছিল, যাতে ফিলিস্তিনীদের ওপর সরাসরি দখলকে ইসরাইল-সমর্থিত আন্তর্জাতিক দখলের রূপ দেওয়া যায় কিন্তু এ পরিস্থিতিতেও ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা চলমান আছে অথচ ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার জামিনদার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের কোনো দেশই এর প্রকাশ্য নিন্দা করেনি যদিও গতানুগতিক দুঃখপ্রকাশ ও আনুষ্ঠানিক উদ্বেগের যান্ত্রিক কিছু বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে

এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে গাজায় যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালনের জন্য আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনও সন্দেহপূর্ণ হয়ে উঠবে ইসরাইলের সচেতন প্রচেষ্টা, শান্তিরক্ষী বাহিনী যেন গঠিতই না হয় যাতে তাদের গণহত্যার পথ উন্মুক্ত থাকে তাছাড়া ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় গণহত্যা বন্ধের কোনো দফা অন্তর্ভুক্তও নেই

তথাকথিত এ যুদ্ধবিরতির ফলে শুধু এতটুকু পরিবর্তন এসেছে, আগে যেখানে প্রতিদিন এক শ নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও যুবক শহীদ হতেন, এখন সে সংখ্যা কিছুটা কমেছে তবে খাদ্য ও মানবিক সহায়তা পরিবহণে ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞার ফলে গণহত্যার ভিন্ন প্রক্রিয়া আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে

নামমাত্র এ যুদ্ধবিরতির ফলে জনসংযোগের ক্ষেত্রে বড় লাভ হয়েছে ইসরাইল ও তার মিত্র সরকারগুলোর যুদ্ধবিরতির কারণে বড় কোনো বিক্ষোভ হচ্ছে না এমনকি যেসব দেশ প্রতীকীভাবে হলেও ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি জানিয়েছিল, এখন জার্মানিসহ সে দেশগুলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে করে কাগুজে নিষেধাজ্ঞাও তুলে নিয়েছে অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি এখন ইসরাইলের গণহত্যামূলক নীতিকে এক বাড়তি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মুখোশ প্রদান করেছে, যা সে আরও স্বাধীনভাবে প্রতিদিন খুলে ফেলতে ও ধারণ করতে পারছে

বর্তমানে গাজার প্রায় তিপ্পান্ন শতাংশ অঞ্চলের ওপর ইসরাইলের পূর্ণ সামরিক দখল রয়েছে ফলে এখানে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনারও পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে না আবার ইসরাইলের কাছে এ দাবিও জানানো হবে না যে, পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তাদের সেনা আরেকটু পেছনে সরিয়ে নেবে

দখলের সীমা নির্ধারণের জন্য ইসরাইল শুধু একটি কল্পিত হলুদ রেখা এঁকে রেখেছে যেহেতু এটি কল্পিত সীমারেখা, তাই প্রতিদিনই তা সামনে-পেছনে সরে যায় ইচ্ছাকৃতভাবেই এর কোনো স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়নি

গাজার কোনো বাসিন্দাই এই কল্পিত হলুদ রেখা সম্পর্কে জানে না; ফলে অজ্ঞাতসারেই তারা ইসরাইলী সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো মিত্রই যুদ্ধবিরতির পর থেকে আজ পর্যন্ত ইসরাইলের কাছে তথাকথিত হলুদ রেখায় স্পষ্ট চিহ্ন বসানোর দাবি জানায়নি যেন ফিলিস্তিনীরা তা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে পারেইসরাইল তা করবে না কারণ এতে প্রতিদিনের শিকারের পরিমাণ কমে যেতে পারে চূড়ান্ত লক্ষ্য তো এই, ফিলিস্তিনীরা হয়তো অতিষ্ঠ হয়ে অবশিষ্ট এলাকাও ছেড়ে দেবে, অন্যথায় তাদের লাশে পরিণত করে হলেও এ এলাকা খালি করানো হবে যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধবিরতি উভয় ক্ষেত্রেই ইসরাইলের মূল লক্ষ্য একই

[একটি বিদেশি দৈনিক থেকে

অনুবাদ : মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ফাহাদ]

 

advertisement