তওবা ও সালাতুত তাওবা
‖ চাই পরিশুদ্ধ পবিত্র জীবন
তওবা শব্দের আভিধানিক অর্থ– প্রত্যাবর্তন করা, অভিমুখী হওয়া, নিজের ভুল স্বীকার করে সঠিক পথে ফিরে আসা এবং অন্যায়-অপরাধ ছেড়ে আনুগত্য অভিমুখী হওয়া।
শরীয়তের পরিভাষায় তওবা হল– নিজের কৃত গোনাহ পরিত্যাগ করে, অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে গোনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
তবে যদি গোনাহটি কোনো বান্দার সাথে সম্পৃক্ত হয়, যেমন সম্পদ আত্মসাৎ, আপবাদ আরোপ কিংবা গীবত ইত্যাদি, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হক আদায় করে কিংবা তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে উপরিউক্ত নিয়মে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। (দ্রষ্টব্য : রিয়াযুস সালিহীন, ইমাম নববী রাহ., তওবা অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৪)
একসঙ্গে জীবনের সকল গোনাহ থেকে যেমন তওবা করা যায়, তেমনি নির্দিষ্ট কোনো একটি গোনাহ থেকেও তওবা করা যায়। তবে চূড়ান্ত অনুতাপ এবং ভবিষ্যতে গোনাহটি না করার দৃঢ় সংকল্প করা সর্বাবস্থায় জরুরি। পাশাপাশি তওবাকালেও গোনাহটি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে নেওয়া আবশ্যক। এসবের পর করণীয় হল, কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং বিগলিত হৃদয়ে অনুতাপ প্রকাশ করা।
তওবার প্রয়োজনীয়তা
আল্লাহ তাআলা মানুষের মাঝে ভালো ও মন্দ দুই প্রবণতাই রেখেছেন। পাশাপাশি উভয় প্রবণতার সহায়ক কিছু গুণ-যোগ্যতাও দান করেছেন। তা দিয়ে মানুষ সৎকর্ম যেমন করে, অসৎকর্মেও জড়িয়ে যায়। আল্লাহর হুকুম যেমন পালন করে, অমান্যতাও করে বসে। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ বিবেচনায় আল্লাহ-অভিমুখী যেমন হয়, অবহেলা কিংবা উদাসীনতায় আল্লাহবিমুখও হয়ে যায়।
তবে এমন কিছু হয়ে গেলে যেন কেউ নিরাশ না হয়; বরং নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। সেইসাথে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বিগলিত হৃদয়ে ক্ষমা চায়– এ মর্মে পরিষ্কার ভাষায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কুরআন মাজীদে।
আল্লাহ তাআলা বলেন–
قُلْ یٰعِبَادِیَ الَّذِیْنَ اَسْرَفُوْا عَلٰۤی اَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَّحْمَةِ اللهِ اِنَّ اللهَ یَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِیْعًا اِنَّهٗ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِیْمُ، وَ اَنِیْبُوْۤا اِلٰی رَبِّكُمْ وَاَسْلِمُوْا لَهٗ مِنْ قَبْلِ اَنْ یَّاْتِیَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنْصَرُوْنَ.
আপনি বলে দিন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজ সত্তার ওপর সীমালঙ্ঘন করেছে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। নিশ্চয় তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হও এবং তাঁর সমীপে আনুগত্য প্রকাশ কর– তোমাদের নিকট শাস্তি আসার আগে, যার পর আর তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। –সূরা যুমার (৩৯) : ৫৩-৫৪
এখানে বান্দার স্বভাব দুর্বলতার কারণে যে গোনাহ হয়ে যেতে পারে– সেকথা মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে গোনাহ হয়ে গেলে করণীয় কী– সেকথাও স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আল্লাহর ক্ষমাগুণ ও মহানুভবতা সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। যেন গোনাহ হয়ে গেলে বান্দা আশাবাদী হয়ে ফিরে আসে এবং অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়।
অন্যত্র আল্লাহর অসীম ক্ষমাগুণের সাথে শাস্তিদানের প্রসঙ্গও উল্লেখ করে বলা হয়েছে–
نَبِّئْ عِبَادِیْۤ اَنِّیْۤ اَنَا الْغَفُوْرُ الرَّحِیْمُ وَ اَنَّ عَذَابِیْ هُوَ الْعَذَابُ الْاَلِیْمُ.
আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দিন, নিশ্চয় আমিই প্রকৃত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এবং এটাও (শুনিয়ে দিন) যে, আমার শাস্তিই মর্মন্তুদ শাস্তি। –সূরা হিজর (১৫) : ৪৯
অর্থাৎ গোনাহ হয়ে গেলে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই, তবে নির্ভয় হওয়ারও সুযোগ নেই। তাই গোনাহ হওয়ামাত্র তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে।
তওবার মাধ্যমে মুমিনের জীবন সফলতা অভিমুখে অগ্রসর হয়, এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে–
وَ تُوْبُوْۤا اِلَی اللهِ جَمِیْعًا اَیُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ.
হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হও। –সূরা নূর (২৪) ৩১
অর্থাৎ তওবার মাধ্যমে মুমিন গোনাহমুক্ত হয়। আর গোনাহমুক্ত হওয়া ছাড়া কারও পক্ষেই সফলতা লাভ করা সম্ভব নয়। কেননা তওবা না করলে বিপুল পাপের বোঝা নিয়ে কবরে যেতে হবে। আর আখেরাতে নেকীর চেয়ে গোনাহ বেশি হলে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। নিঃসন্দেহে জাহান্নামে যাওয়া মানবজীবনের সর্বোচ্চ ব্যর্থতা। সফলতা হল জাহান্নাম থেকে মুক্ত হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করা।
অন্যত্র মুত্তাকীদের গুণাবলি প্রসঙ্গে তওবা ও ইস্তিগফারের কথা উল্লেখিত হয়েছে এভাবে–
وَالَّذِیْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْۤا اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوْبِهِمْ وَمَنْ یَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللهُ وَ لَمْ یُصِرُّوْا عَلٰی مَا فَعَلُوْا وَهُمْ یَعْلَمُوْنَ.
তারা সেইসকল লোক, যারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা (অন্য কোনোভাবে) নিজেদের প্রতি জুলুম করে বসলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গোনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে আছে, যে গোনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা জেনেশুনে তাদের কৃতকর্মে অবিচল থাকে না। –সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৩৫
এখানে গোনাহ হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া, একমাত্র তিনিই গোনাহ ক্ষমা করতে পারেন– এই বিশ্বাস ও আশাবাদ পোষণ করা এবং গোনাহের ওপর অবিচল না থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।
কোন্ কোন্ গোনাহ থেকে তওবা করব
ছোট বড় সকল গোনাহ থেকেই তওবা করা উচিত। তবে কিছু গোনাহ আছে এমন, যেগুলো থেকে তওবা ছাড়াও ক্ষমা লাভের আশা করা যায়। যেমন সাধারণ সগীরা গোনাহ– মাকরূহ ওয়াক্তে নামায পড়া, যোহরের আগের ও পরের সুন্নত আদায় না করা, অনর্থ কাজে লিপ্ত হওয়া, বাম হাতে পানাহার করা ইত্যাদি। কিন্তু কবীরা গোনাহ থেকে তওবা ছাড়া কিছুতেই ক্ষমা লাভ করা যায় না।
কবীরা গোনাহের মধ্যে সবচে কঠিন গোনাহ হল কুফর ও শিরক। অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা, দ্বীন ও শরীয়তের কোনো বিধান নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা ইত্যাদি।
তার পরের স্তরে আছে এমনকিছু কবীরা গোনাহ, যা ঠিক কুফরের স্তরের নয়; তবে সাধারণ পর্যায়েরও নয়। যেমন, মিথ্যা বলা, চুরি করা, সুদ খাওয়া, ব্যভিচার করা, গীবত করা, নামায না পড়া, যাকাত না দেওয়া, মা-বাবার অবাধ্যতা করা ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, কোনো সগীরা গোনাহ বারবার করতে থাকলে তা আর সগীরা থাকে না; কবীরা গোনাহে পরিণত হয়ে যায়।
এজাতীয় সকল গোনাহের জন্য তওবা করা আবশ্যক। তওবা ছাড়া এসব গোনাহ ক্ষমা করা হয় না।
কখন তওবা করব
গোনাহ হয়ে যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তওবা করে নেওয়া উচিত। তওবার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা উচিত নয়। কারণ, যে কোনো সময় মানুষের মৃত্যু হতে পারে। মৃত্যুর সময় হয়ে গেলে কারও কোনো তওবা কবুল হবে না।
এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে–
وَ لَیْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِیْنَ یَعْمَلُوْنَ السَّیِّاٰتِ حَتّٰۤی اِذَا حَضَرَ اَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ اِنِّیْ تُبْتُ الْـٰٔنَ وَلَا الَّذِیْنَ یَمُوْتُوْنَ وَ هُمْ كُفَّارٌ اُولٰٓىِٕكَ اَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا اَلِیْمًا.
তওবা কবুল তাদের প্রাপ্য নয়, যারা অসৎকর্ম করতে থাকে, পরিশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যুক্ষণ এসে পড়ে, তখন বলে, এখন আমি তওবা করলাম।... এরূপ লোকদের জন্য তো আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। –সূরা নিসা (৪) : ১৮
এখানে পরিষ্কার ভাষায় জানানো হয়েছে, মৃত্যুক্ষণ এসে গেলে আর তওবা করার সুযোগ নেই। তখন তওবা করলে তা কবুল হওয়ারও কোনো আশা নেই।
পক্ষান্তরে তওবা যত তাড়াতাড়ি করা যায়, ততই তা কবুল হওয়ার আশা থাকে। কেননা, প্রকৃত মুমিন তো এমনই যে– সে পরিকল্পিতভাবে কোনো গোনাহ করবে না। হঠাৎ কোনো গোনাহ হয়ে গেলে সেটা হবে আকস্মিক দুর্ঘটনার মতো কিংবা পিচ্ছিল পথে আছড়ে পড়ার মতো। কেউ কি পরিকল্পিতভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয় কিংবা ইচ্ছে করে আছড়ে পড়ে?
কেউ যখন হঠাৎ অসতর্কতাবশত কোথাও পড়ে যায়, দ্রুত উঠে নিজেকে স্বাভাবিক করে এবং যথাসাধ্য কাপড়চোপড় পরিষ্কার করে নেয়। ঠিক তেমনি কোনো মুমিনের দ্বারা গোনাহ হয়ে গেলে দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করবে। যথাসাধ্য নিজেকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে নেবে।
একথাই ইরশাদ হয়েছে কুরআন মাজীদে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন–
اِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَی اللهِ لِلَّذِیْنَ یَعْمَلُوْنَ السُّوْٓءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ یَتُوْبُوْنَ مِنْ قَرِیْبٍ فَاُولٰٓىِٕكَ یَتُوْبُ اللهُ عَلَیْهِمْ وَكَانَ اللهُ عَلِیْمًا حَكِیْمًا.
নিশ্চয় তওবা, যা কবুল করা আল্লাহর দায়িত্ব– তা কেবল এমন লোকদের জন্য, যারা অজ্ঞতাবশত কোনো গোনাহ করে ফেলে, তারপর অবিলম্বে তওবা করে নেয়। এমন লোকদের তওবা আল্লাহ কবুল করেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত, প্রজ্ঞাময়। –সূরা নিসা (৪) : ১৭
অর্থাৎ মুমিনের গোনাহ হবে অজ্ঞতাবশত কিংবা উদাসীনতাবশত। তখন উচিত অবিলম্বে তওবা করে নেওয়া। তওবা করতে বিলম্ব বা গড়িমসি না করা। তাতে সেই তওবা কবুল হওয়ার অধিক আশা করা যায়। কেননা, আয়াতে বলা হয়েছে– ‘এমন লোকদের তওবা আল্লাহ কবুল করেন।’
আর আল্লাহ তাআলা খুব ভালো করেই জানেন– মানুষ গোনাহ করেছে কি ইচ্ছায়, না অনিচ্ছায়; ভুলবশত, নাকি পরিকল্পিত; অজ্ঞতাবশত, নাকি বুঝেশুনে। জানেন– কে কতটা অনুতপ্ত এবং কে কী পরিমাণ ইখলাস নিয়ে তওবা করছে!
কীভাবে তওবা করব
তওবা করার পদ্ধতি অতি সহজ। তওবার জন্য কোনো মাধ্যম গ্রহণের প্রয়োজন হয় না, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির কাছে যেতে হয় না, নির্দিষ্ট কোনো সময়ের অপেক্ষাও করতে হয় না। যে কোনো মুহূর্তে, যে কোনো অবস্থায়, যে কেউ– একাকী বা সম্মিলিতভাবে, নীরবে বা সরবে আল্লাহর কাছে তওবা করতে পারে।
তওবার প্রকৃত মর্ম ও যথার্থতা নিশ্চিত করার জন্য এবং আল্লাহর কাছে তওবা কবুল হওয়ার জন্য চারটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হয়–
১. যে গোনাহ থেকে তওবা করা হবে তা পরিত্যাগ করা।
অর্থাৎ তওবা করা অবস্থায় নির্দিষ্ট গোনাহটিতে লিপ্ত না থাকা।
২. মনে মনে অনুতপ্ত হওয়া।
অর্থাৎ কাজটি করা ঠিক হয়নি– এই অপরাধবোধ ও অনুশোচনা জাগ্রত হওয়া।
৩. ভবিষ্যতে গোনাহটি না করার মজবুত সংকল্প করা।
অর্থাৎ সুযোগ হলে গোনাহটি আবার করব– এমন চিন্তা না করা; বরং গোনাহটি আর কখনোই করব না, এমন অঙ্গীকার করা।
৪. গোনাহটি যদি কোনো বান্দার হক সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে তার হক আদায় করে দেওয়া। কিংবা তার থেকে ক্ষমা চেয়ে দায়মুক্তি নেওয়া।
উদাহরণস্বরূপ, কারও সাথে আর্থিক লেনদেন থাকলে তা পরিশোধ করা। শারীরিক আঘাত বা নির্যাতন করে থাকলে বদলা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া কিংবা তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। কাউকে কোনো অপবাদ দিলে বা কারও কোনো গীবত করে থাকলে শাস্তি গ্রহণ করা ইত্যাদি। তা সম্ভব না হলে তাহলে অবশ্যই তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।
বোঝা গেল, বান্দার হক সংশ্লিষ্ট কোনো গোনাহ না থাকলে মুহূর্তে তওবা করে নেওয়া যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়। পাশাপাশি তা কবুল হওয়ারও দৃঢ় আশা করা যায়। কিন্তু গোনাহটি যদি কোনো বান্দার হক সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে প্রথম কর্তব্য হল– ঐ বান্দার কাছ থেকে দায়মুক্তি নেওয়া। তারপর উপরিউক্ত নিয়মে তওবা করা।
প্রসঙ্গ : ‘তাওবাতুন নাসূহ’
কুরআন মাজীদে উত্তমভাবে তওবা করার প্রসঙ্গে ‘তাওবাতুন নাসূহ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
ইরশাদ হয়েছে–
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا تُوْبُوْۤا اِلَی اللهِ تَوْبَةً نَّصُوْحًا عَسٰی رَبُّكُمْ اَنْ یُّكَفِّرَ عَنْكُمْ سَیِّاٰتِكُمْ وَیُدْخِلَكُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ.
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে ‘তাওবাতুন নাসূহ’ (খাঁটি তওবা) কর। আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে এমন উদ্যানে প্রবেশ করাবেন, যার নিচে নহরসমূহ বহমান থাকবে। –সূরা তাহরীম (৬৬) : ৮
এখানে ‘তাওবাতুন নাসূহ’-এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর বদৌলতে পাপমোচন ও জান্নাতে প্রবেশের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সেজন্য উলামায়ে কেরাম ও বুযুর্গানেদ্বীন মানুষকে ‘তাওবাতুন নাসূহ’-এর প্রতি উৎসাহ দিয়ে থাকেন।
‘তাওবাতুন নাসূহ’ শব্দের অর্থ হল, একনিষ্ঠ তওবা, খাঁটি তওবা, সত্য তওবা, যে তওবার মধ্যে প্রকৃত অর্থেই নিজের কল্যাণকামিতা থাকে এবং কোনো রকমের ভেজাল বা অস্বচ্ছতা থাকে না। (দ্রষ্টব্য, তাজুল আরূস ৭/১৭৯)
তাওবাতুন নাসূহ সম্পর্কে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন–
أَنْ يَّتُوْبَ الرَّجُلُ مِنَ الْعَمَلِ السَّيِّئِ، ثُمَّ لَا يَعُوْدُ إِلَيْهَ أبدًا.
তাওবাতুন নাসূহ হল, ব্যক্তি তার মন্দ কাজ বা গোনাহ থেকে তওবা করবে, এরপর আর কখনো সেটি করবে না। –সুনানে সায়ীদ ইবনে মানসূর, বর্ণনা ২২৫৯; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৪৪৯১
বিখ্যাত তাবিয়ী হাসান বসরী রাহ. বলেন–
أَنْ يَهْجُرَ الْعَبْدُ الذَّنْبَ، وَهُوَ يُحَدِّثُ نَفْسَه أَلَّا يَعُودَ إِلَيْهِ أَبَدًا.
তাওবাতুন নাসূহ হল, বান্দা গোনাহ পরিত্যাগ করবে এবং এমন দৃঢ় সংকল্প করবে যে, পরে আর কখনো সেই কাজটি করবে না। –শুআবুল ঈমান, বাইহাকী, বর্ণনা ৬৬৩৬
মোটকথা, তওবার যে মূল বিষয়গুলো– (অর্থাৎ গোনাহ পরিত্যাগ করা, অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে কাজটি না করার মজবুত সংকল্প করা) এসব আন্তরিকভাবে করা, প্রকৃত অর্থেই করা এবং তাতে একনিষ্ঠ থাকা। (দ্র. আলআদাবুশ শারইয়্যাহ, ইবনে মুফলিহ ১/৮৪-৮৬)
প্রসঙ্গ : ইস্তিগফার
তওবার পাশাপাশি আরেকটি শব্দ ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। সেটি হল, ‘ইস্তিগফার’।
ইস্তিগফার শব্দের আভিধানিক অর্থ– মাফ চাওয়া বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। কোনো অপরাধের শাস্তি রহিত করার বিনীত আবেদন করা। (দ্র. লিসানুল আরব ৫/৩২৭৪)
তবে পরিভাষায় ইস্তিগফারকে তওবা অর্থেও ব্যবহার করা হয়। আবার কখনো একইসঙ্গে দুই শব্দ এসে একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে কিংবা সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
হাঁ, আলাদা আলাদা অর্থ হিসেবে ইস্তিগফার হল, হৃদয়ে অপরাধ বোধ জাগ্রত হওয়া এবং কৃত গোনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া। আর তওবা হল, গোনাহ পরিত্যাগ করা, ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে গোনাহ না করার সংকল্প করা। (দ্র. মাদারিজুস সালিকীন ১/৪৭৫)
এই অর্থে অনেক সময় তওবার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত না হলেও ইস্তিগফারের আমল জারি রাখা সম্ভব।
দুটি প্রচলন
আমাদের সমাজে ‘তওবা পড়ানো’ শিরোনামে একটি প্রচলন আছে। মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কিংবা বার্ধক্যজনিত শয্যাশায়ী কাউকে কোনো আলেম বা ইমাম সাহেবের মাধ্যমে তওবা পড়ানো হয়। এছাড়া সামাজিক পর্যায়ে কেউ কোনো বড় অন্যায় করলে জনসম্মুখে বা আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে তওবা পড়ানো হয়।
সেক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তওবা হল ব্যক্তির একান্ত হৃদয়ের বিষয়। অনুভূতি, উপলব্ধি ও আত্মনিবেদনের বিষয়। তওবা পড়ানো বা আনুষ্ঠানিক তওবার ক্ষেত্রেও সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তওবাকারীর মনে অনুতাপ, অনুশোচনা ও একনিষ্ঠভাবে ক্ষমাপ্রার্থনার আগ্রহ তৈরি করতে হবে।
আরেকটি ধারণা প্রচলিত আছে, তওবা করতে হবে শেষ বয়সে। জীবনের পড়ন্ত বেলায়। অর্থাৎ ভোগ-উপভোগ ও নানা পাপকর্মে ‘তৃপ্ত’ হওয়ার পর করা হবে তওবা।
এক্ষেত্রে প্রথম কথা হল, কে কতদিন দুনিয়ায় থাকবে তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে কোনো মুহূর্তে, যে কোনো জায়গায়, যে কোনো অবস্থায়, আকস্মিক দুর্ঘটনা, সাধারণ কোনো কারণ, এমনকি একেবারে কোনো কারণ ছাড়াই যে কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। তাই তওবার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা হবে নিতান্ত বোকামি। যার পরিণাম হতে পারে আক্ষেপ, আফসোস ও চূড়ান্ত পরিতাপের বিষয়।
আর ‘পাপাচারে তৃপ্তির পর তওবার চিন্তা’ সম্পূর্ণ শয়তানী ওয়াসওয়াসা। কারণ এমন ব্যক্তির কপালে অনেক সময় তওবাই জোটে না। তাছাড়া পাপে লিপ্ত অবস্থায় যদি মৃত্যু এসে যায়, তখন কী অবস্থা হবে!
উপরন্তু হাদীস শরীফে আছে–
إِنَّ اللهَ عز وجل يَبْسُطُ يَدَه بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَه بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا.
আল্লাহ তাআলা রাতে তাঁর হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনের অপরাধী তওবা করে এবং দিনে তাঁর হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতের অপরাধী তওবা করে; যাবৎ না পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হয়। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭৫৯
অর্থাৎ গোনাহ করার সঙ্গে সঙ্গে তওবা না করলেও যেন দিন পার না হয়, রাত কেটে না যায়। যথাসম্ভব দ্রুত তওবা করা হয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সম্পর্কে বলেছেন–
وَاللهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً.
আল্লাহর কসম! আমি দিনে সত্তর বারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছে তওবা করি। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৭
সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও নবীজী দিনে সত্তর বারের বেশি তওবা-ইস্তিগফার করতেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, দৈনিক এক শ বার তওবা করতেন। [দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭০২]
উম্মতের জন্য এর চেয়ে বেশি তওবা-উদ্দীপক বার্তা আর কী হতে পারে!
তওবার জন্য সালাতুত তাওবা
গোনাহ হয়ে যাওয়ার পর অনুতাপ, অনুশোচনা ও ভবিষ্যতে গোনাহ না করার সংকল্পের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি মাধ্যম অবলম্বনের কথা আছে হাদীস শরীফে। সেটি হল দুই রাকাত নামায। অর্থাৎ তওবার উদ্দেশ্যে সালাতুত তওবা আদায় করা।
হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
مَا مِنْ عَبدٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا، فَيُحْسِنُ الطهُورَ ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّيْ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللهَ، إِلَّا غَفَرَ اللهُ لَهُ، ثُمَّ قَرَأَ هَذِهِ الآيَةَ: وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا اللهُ وَلَمْ يُصِرُّواْ عَلىٰ مَا فَعَلُواْ وَهُم يَعْلَمُوْنَ.
কোনো বান্দা যখন গোনাহ করে ফেলে, এরপর উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে (ওযু কিংবা গোসল করে), এরপর দুই রাকাত নামায আদায় করে, এরপর আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহলে আল্লাহ তার গোনাহ মাফ করে দেন।
এতটুকু বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করেছেন–
وَالَّذِیْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْۤا اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوْبِهِمْ وَمَنْ یَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللهُ وَ لَمْ یُصِرُّوْا عَلٰی مَا فَعَلُوْا وَهُمْ یَعْلَمُوْنَ.
তারা সেইসকল লোক, যারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা (অন্য কোনোভাবে) নিজেদের প্রতি জুলুম করে বসলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গোনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া কে আছে, যে গোনাহ ক্ষমা করবে? তারা জেনেশুনে তাদের কৃতকর্মে অবিচল থাকে না। [সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৩৫]
হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে হুমাইদী, মুসনাদে আবী ইয়ালা, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, সহীহ ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে খুযাইমা (মুআল্লাক), সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহসহ নির্ভরযোগ্য ও বিখ্যাত অনেক কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।
বর্ণনা করেছেন আলী ইবনে আবী তালিব রা. আবু বকর সিদ্দীক রা. থেকে, তিনি হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে।
(দ্র. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৬২৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫২১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৪০৬, ৩০০৬; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২, ৪৭; আলআহাদীসুল মুখতারাহ, যিয়া আলমাকদিসী, হাদীস ৮)
হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী, ইমাম যাহাবী ও ইমাম ইবনে কাসীর রাহ. প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ ‘হাসান’ বলেছেন। (দ্র. জামে তিরমিযী, হাদীস ৪০৬; তাযকিরাতুল হুফফায ১/১৪; তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/৪২৬)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, আবুদ দারদা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি–
مَنْ تَوَضَّأَ، فَأَحْسَنَ وُضُوءَه، ثُمَّ قَامَ، فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ، أَوْ أَرْبَعًا -شَكَّ سَهْلٌ- يُحْسِنُ فِيهِمَا الذِّكْرَ وَالْخُشُوعَ، ثُمَّ اسْتَغْفَرَ اللهَ عز وجل، غَفَرَ لَهُ.
যে ব্যক্তি ওযু করবে এবং উত্তমভাবে ওযু সম্পন্ন করবে, এরপর দাঁড়াবে এবং দুই রাকাত অথবা চার রাকাত (বর্ণনাকারী সাহল-এর সন্দেহ) নামায আদায় করবে, তাতে সুন্দরভাবে যিকির ও তাসবীহসমূহ পাঠ করবে এবং খুশু-খুযূর সাথে নামায আদায় করবে, এরপর আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে– আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৭৫৪৬; আলমুজামুল আওসাত, তবারানী, হাদীস ৫০২৬
ইমাম মুনযিরী ও নূরুদ্দীন হাইসামী রাহ. বলেন– إِسْنَادُهُ حَسَنٌ
(দ্র. আততারগীব ওয়াত তারহীব ১/১০৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ২/২৭৯)
তওবার নামাযের নিয়ম
সালাতুত তওবা বা তওবার নামাযের জন্য আলাদা কোনো নিয়ম নেই। নির্দিষ্ট কোনো কেরাত বা দুআ পড়ার বিধান নেই। বরং সাধারণ নফল নামাযের মতোই– যে কোনো কেরাত, ধীরস্থির রুকু ও সাজদা, স্বাভাবিক তাসবীহ, তাশাহহুদ, দরূদ ও দুআয়ে মাসূরের মাধ্যমে নামায আদায় করবে। সকল নামাযের মতোই পূর্ণ পবিত্রতা, নিমগ্নতা ও খুশু-খুযূ রক্ষা করার চেষ্টা করবে।
সালাতুত তওবা দুই বা চার রাকাত। তবে বারবার দুই রাকাত করে অনেক রাকাত আদায় করতেও কোনো সমস্যা নেই।
সালাতুত তওবা আদায়ের পর কায়মনোবাক্যে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করবে এবং বিগলিত হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
হাদীস শরীফে তওবা ও ইস্তিগফারের বিভিন্ন বাক্য রয়েছে। তন্মধ্যে একটিকে বলা হয়েছে ‘সায়্যিদুল ইস্তিগফার’। সেটি হল–
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّي، لَا إِلهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدَكَ ، وَأَنَا عَلى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِيْ، فَاغْفِرْ لِيْ، فَإِنَّه لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ.
এ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দিনের বেলা (সকালে) এই ইস্তিগফার পড়বে এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগেই মারা যাবে, সে জান্নাতী। যে ব্যক্তি রাতের বেলা (সন্ধ্যায়) এটি পাঠ করবে এবং সকাল হওয়ার আগেই ইন্তেকাল করবে, সে জান্নাতী। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৬
অন্য একটি হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত ইস্তিগফার পাঠ করবে, তার সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে এসে থাকে। সেই ইস্তিগফারের বাক্যগুলো এই–
أَسْتَغْفِرُ اللهَ الَّذِيْ لَا إلهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّوْمُ، وَأَتُوْبُ إلَيْهِ.
আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি সেই আল্লাহর কাছে যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। যিনি চিরঞ্জীব, (সমগ্র সৃষ্টির) নিয়ন্ত্রক। আর আমি তাঁর কাছে তওবা করছি। –জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৮৯৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১৭; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ১৯০৫
যাইহোক, তওবার পূর্বোক্ত শর্তসমূহ পালনের পর গুরুত্বের সাথে সালাতুত তওবা আদায় এবং এ জাতীয় ‘মাসূর ইস্তিগফার’ পাঠ তওবা কবুলের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।
তওবাকারীর পুরস্কার ও মর্যাদা
কুরআন ও হাদীসে তওবা-ইস্তিগফারের প্রতি উৎসাহিত করে যেমন অনেক বক্তব্য রয়েছে, তেমনি তওবাকারীর পুরস্কার বিষয়েও অনেক ওয়াদা রয়েছে। ফলে মানবীয় দুর্বলতাহেতু কিংবা ভুলবশত যদি কেউ কোনো গোনাহ করে ফেলে, এরপর অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করে, তাহলে তার গোনাহ ক্ষমা হওয়ার প্রতিশ্রুতি যেমন রয়েছে, তেমনি বিশেষ কিছু মর্যাদা প্রদানের আশ্বাসও রয়েছে।
এ বিষয়ক কয়েকটি আয়াত নিম্নে উল্লেখ করা হল–
১. আল্লাহর মহব্বত লাভ
যারা অধিক পরিমাণে তওবা করে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ভালবাসেন।
এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে–
اِنَّ اللهَ یُحِبُّ التَّوَّابِیْنَ وَ یُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِیْنَ.
নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পরিমাণে তওবাকারীদের ভালবাসেন এবং ভালবাসেন তাদেরকে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে। –সূরা বাকারা (২) : ২২২
২. আল্লাহর ক্ষমা ও দয়া লাভ
তওবাকারী আল্লাহকে পাবে পরম ক্ষমাশীল এবং অতি দয়ালু।
এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে–
وَمَنْ یَّعْمَلْ سُوْٓءًا اَوْ یَظْلِمْ نَفْسَهٗ ثُمَّ یَسْتَغْفِرِ اللهَ یَجِدِ اللهَ غَفُوْرًا رَّحِیْمًا.
যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ করে ফেলে বা নিজের প্রতি জুলুম করে বসে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে অবশ্যই আল্লাহকে পাবে অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। –সূরা নিসা (৪) : ১১০
৩. শাস্তি থেকে রেহাই
তওবা-ইস্তিগফার করা অবস্থায় আল্লাহ তাআলা কাউকে শাস্তি দেন না।
এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে–
وَ مَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَ هُمْ یَسْتَغْفِرُوْنَ.
আর আল্লাহ এমন নন যে, তারা ইস্তিগফার রত অবস্থায় তাদেরকে শাস্তি দেবেন। –সূরা আনফাল (৮) : ৩৩
৪. উত্তম জীবনোপকরণ লাভ
হূদ আলাইহিস সালামের ভাষায় আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, তওবা ও ইস্তিগফার করলে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করে দেবেন।
ইরশাদ হয়েছে–
وَّاَنِ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوْبُوْۤا اِلَیْهِ یُمَتِّعْكُمْ مَّتَاعًا حَسَنًا اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی وَّ یُؤْتِ كُلَّ ذِیْ فَضْلٍ فَضْلَهٗ.
তোমরা আপন রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁর অভিমুখী হও। তাহলে তিনি তোমাদেরকে এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত উত্তম জীবন উপভোগ করতে দেবেন। আর যে অধিক আমল করবে, তাকে নিজের পক্ষ থেকে দেবেন অধিক প্রতিদান। –সূরা হূদ (১১) ০৩
৫. বৃষ্টি বর্ষণ ও শক্তি বৃদ্ধি
আরও জানিয়েছেন, তওবা-ইস্তিগফারের ফলে আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন।
ইরশাদ হয়েছে–
وَ یٰقَوْمِ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوْبُوْۤا اِلَیْهِ یُرْسِلِ السَّمَآءَ عَلَیْكُمْ مِّدْرَارًا وَّ یَزِدْكُمْ قُوَّةً اِلٰی قُوَّتِكُمْ.
হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আপন রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই অভিমুখী হও (তওবা কর)। তিনি তোমাদের প্রতি আকাশ থেকে মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের বর্তমান শক্তির সাথে বাড়তি আরও শক্তি জোগাবেন। –সূরা হূদ (১১) : ৫২
৬. গোনাহসমূহ নেকীতে পরিবর্তিত হওয়া
তওবার মাধ্যমে অতীত গোনাহ তো ক্ষমা হই-ই, সেইসাথে গোনাহগুলো নেকীতে পরিণত হয়ে যায়।
এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে–
اِلَّا مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَ عَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَاُولٰٓىِٕكَ یُبَدِّلُ اللهُ سَیِّاٰتِهِمْ حَسَنٰتٍ وَكَانَ اللهُ غَفُوْرًا رَّحِیْمًا.
তবে যারা তওবা করবে, ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে, আল্লাহ তাদের পাপরাশিকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। –সূরা ফুরকান (২৫) : ৭০
এই আয়াতে– ‘আল্লাহ তাদের পাপরাশি পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন’ এর অর্থ কী? মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন, এর দুটি অর্থ হতে পারে–
এক. গোনাহের অবস্থা ও পাপপ্রবণতা দূর করে দেওয়া। অর্থাৎ জীবন ও মন মানসিকতা পরিবর্তন হয়ে যাওয়া।
দুই. সকল গোনাহের বদলে নেকী দান করা। (দ্র. তাফসীরে ইবনে কাসীর ৬/১২৭-১২৯)
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। তা হল, তওবার পর নেক আমল জারি রাখা। অর্থাৎ তওবার ওপর অটল অবিচল থাকা। পাশাপাশি অধিক পরিমাণে নেক আমলের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।
৭. সম্পদ ও সন্তান লাভ
হযরত নূহ আলাইহিস সালামের ভাষায় আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন যে, তওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং সম্পদ ও সন্তান দ্বারা বান্দাকে সমৃদ্ধ করেন। ইরশাদ হয়েছে–
اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ اِنَّهٗ كَانَ غَفَّارًا، یُّرْسِلِ السَّمَآءَ عَلَیْكُمْ مِّدْرَارًا، وَّ یُمْدِدْكُمْ بِاَمْوَالٍ وَّ بَنِیْنَ وَیَجْعَلْ لَّكُمْ جَنّٰتٍ وَّ یَجْعَلْ لَّكُمْ اَنْهٰرًا.
তোমরা আপন রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। এবং তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে। এবং তোমাদের জন্য সৃষ্টি করবেন উদ্যানরাজি, তোমাদের জন্য প্রবাহিত করবেন নদনদী। –সূরা নূহ (৭১) : ১০-১২
উৎসাহ-উদ্দীপক তিনটি হাদীস
১. তওবার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ.
প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে তওবাকারীগণই উত্তম। –জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৪৯৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ৪২৫১; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৭৮০৯
২. শুধু তাই নয়, সীমাহীন সান্ত্বনা ও উৎসাহের বার্তা এসেছে হাদীসের ভাষায়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللهُ بِكُمْ، وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُونَ اللهَ، فَيَغْفِرُ لَهُمْ.
ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা গোনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে অপসারণ করে এমন জাতি সৃষ্টি করতেন, যারা গোনাহ করত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত। আর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭৪৯
৩. আরেক হাদীসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয় কোনো বান্দা যখন গোনাহ করার পর বলে, হে আমার রব! আমি তো গোনাহ করে ফেলেছি। আপনি আমার এ গোনাহ ক্ষমা করে দিন।
তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা কি জানে যে, তার একজন ‘রব’ আছেন; যিনি গোনাহ ক্ষমা করেন অথবা এর জন্য পাকড়াও করেন?! আমি আমার বান্দাকে মাফ করে দিলাম।
এরপর আল্লাহ যতদিন চান, সে গোনাহ না করে থাকে। কিন্তু সে আবার গোনাহ করে ফেলে। এরপর বলে, হে আমার রব! আমি তো আবার গোনাহ করে ফেলেছি। আমার এ গোনাহ ক্ষমা করুন।
আল্লাহ তাআলা আবার বলেন, আমার বান্দা কি জানে, তার একজন ‘রব’ আছেন, যিনি গোনাহ মাফ করেন অথবা এর জন্য শাস্তি দেন? আমি আমার বান্দাকে মাফ করে দিলাম।
এরপর আল্লাহ যতদিন চান, সে গোনাহ না করে থাকে। তারপর আবারও গোনাহ করে ফেলে এবং বলে, হে আমার রব! আমি তো আবার গোনাহ করে ফেলেছি। আপনি আমার এ গোনাহ ক্ষমা করে দিন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা কি জানে, তার একজন ‘রব’ আছেন, যিনি গোনাহ ক্ষমা করেন, অথবা এর জন্য শাস্তি দেন? আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। সে যা চায় করুক। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৫০৭
এই তিনটি হাদীস ছাড়াও আরও অনেক হাদীস আছে, যেগুলো থেকে বোঝা যায়– বান্দা আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাআলা খুবই খুশি হন। বান্দার সাথে আল্লাহ তাআলা খুব মমতার আচরণ করেন। তাকে একান্ত নৈকট্য দান করেন।
সারকথা
মানব জীবনের নানা ক্ষেত্রে মানুষের ভুল-বিচ্যুতি হতে পারে। নফস ও শয়তানের কুমন্ত্রণায় মানুষ যে কোনো গোনাহ করে ফেলতে পারে। এটা একরকম স্বভাবজাত এবং এটাই জীবনের স্বাভাবিকতা। তবে এমন কিছু হয়ে গেলে যেন মানুষ অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে ফিরে আসে এবং বিগলিত হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে শিক্ষাই দেওয়া হয়েছে ইসলামে। ইসলামের সেই সুন্দর ও মমতাসুলভ শিক্ষার নাম তওবা ও ইস্তিগফার।
তওবা ও ইস্তিগফার বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে অনেক বক্তব্য বিবৃত হয়েছে। এসবের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহমুখী হতে উৎসাহিত করা হয়েছে। অতীত গোনাহ থেকে পবিত্র হয়ে সুন্দর জীবন গঠনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ লেখায় সে সংক্রান্ত প্রাথমিক কিছু বিষয় আলোচনা করা হল।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তার ফায়দা দান করুন। তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আমাদের জীবনকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করুন। সকল প্রকার গোনাহ থেকে বেঁচে আল্লাহমুখী জীবনযাপন করার তাওফীক দান করুন– আমীন।