মানবসেবায় ওয়াকফের ভূমিকা
‖ আরও কিছু খাত ও ধরন
মাওলানা শাহাদাত সাকিব
[মানবসেবায় ওয়াকফের ভূমিকা বিষয়ে আমরা গত মে ২০২৫ সংখ্যায় অজানা অনেক বিষয় জানতে পেরেছি। ওয়াকফের বিভিন্ন ধরন ও খাত সম্বন্ধে জেনেছি। এ সংখ্যায়ও ওয়াকফের আরও কিছু খাত ও ধরন সম্পর্কে আমরা জানতে পারব এবং বুঝতে পারব, ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সেবাধর্মী কাজে ওয়াকফের ভূমিকা কত বিস্তৃত ছিল।
মানবসেবার এ গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম থেকে বঞ্চিত হয়ে আমরা কত শত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশেই অমুসলিম সম্পদশালী কর্তৃক তাদের বড় বড় সম্পদ উইল করে যাওয়ার খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সে সম্পদ সেবাধর্মী বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি মিশনারি বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নেও ব্যয় হয়।
এদিকে মুসলিমদের বিভিন্ন সেবাখাত ও ধর্মীয় কার্যাদি পরিচালনার জন্য অর্থ সংকট দেখা দেয়। সুতরাং মুসলিমদের উচিত, ওয়াকফের এ ধারা আবার চালু করা। সম্পদ ওয়াকফের মাধ্যমে শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা, দারিদ্র্যবিমোচনসহ সেবার বিভিন্ন খাতে ভূমিকা রাখা। –সম্পাদক]
মসজিদে আলো জ্বালানোর জন্য ওয়াকফ
মসজিদ আল্লাহর ঘর, পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান। এখানে সব সময় আল্লাহর রহমত নাযিল হয়। তাই মসজিদ আবাদ রাখা, বেশি সময় মসজিদে থাকা আল্লাহর রহমত লাভের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। হাশরের ময়দানে যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তি আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে। তন্মধ্যে একজন হল যার হৃদয় মসজিদের সাথে জুড়ে থাকে।
মসজিদ মুসলিম সমাজের প্রাণকেন্দ্র। তবে আগের যুগে রাতের বেলা মসজিদে আগমনকারী মুসল্লিদের সমস্যায় পড়তে হত। বর্তমান যুগে রাতের বেলা আলোর প্রয়োজনে আমরা লাইট, বাতি ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকি। তবে একটা সময় এমন বৈদ্যুতিক বাতি ছিল না। তখন কুপি ইত্যাদি দিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হত। আর কুপি জ্বালানোর জন্য প্রয়োজন পড়ত তেল। তাই মসজিদে আলো জ্বালানোর জন্য তেলের সরবরাহ যেন স্বাভাবিক থাকে, এজন্যও কেউ কেউ নিজেদের সম্পদ ওয়াকফ করতেন, যা ‘হাবসুস যাইত’ নামে পরিচিত ছিল। এ সম্পদের আয় দিয়ে ক্রয় করা হত মসজিদের তেল। কেউবা আবার বেশি পরিমাণ তেলই ওয়াকফ করে দিত মসজিদের জন্য। যেন কখনো তেল সংকটের কারণে আলো জ্বালাতে ব্যাঘাত না ঘটে।
وحبس الزيت للإضاءة، وذلك تحبيس كمية من الزيت على إضاءة الميضأة في المسجد.
হাবসুস যাইত। অর্থাৎ মসজিদে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থাস্বরূপ নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল ওয়াকফ করা। –জামইয়্যাতুল আওকাফ ওয়া দাউরুহা, পৃ. ২১
মুআযযিনদের জন্য ওয়াকফ
হাদীস শরীফে মুআযযিনদের বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। কিয়ামতের দিন যেসকল মানুষ বিশেষ সম্মান লাভ করবে, তাদের মধ্যে মুআযযিনের কাফেলা অন্যতম। তাদের বিশেষ মর্যাদা লাভের একটি কারণ এটাও যে, তারা প্রতিদিন পাঁচ বার আযানের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন। সবার কাছে পৌঁছে দেন আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের পয়গাম।
আল্লাহ তাআলার বড়ত্বের এ পয়গাম যেন বেশি মানুষ শুনতে পারে, তাকবীরের এ ধ্বনি যেন বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পরে, এজন্য আগের যুগে মসজিদের উপরে, উঁচু জায়গা থেকে মুআযযিন সাহেবান আযান দিতেন। অনেকেই আবার উঠতেন মসজিদের মিনারের চূড়ায়। তবে শীতকালে এক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হত তাদের। বিশেষত শীতপ্রধান অঞ্চলগুলোতে। যেখানে শীত নামে তুষারকে সঙ্গে নিয়ে। উঁচু, ফাঁকা ও খোলামেলা স্থানে শীতের প্রকোপ থাকে বেশি। তাই উঁচু স্থানে উঠে কিংবা মিনারের চূড়ায় গিয়ে আযান দিতে গিয়ে তাদের শীতের কষ্ট বরদাশত করতে হত। তাদের এ কষ্ট লাঘবে এগিয়ে এসেছিলেন সমাজের হৃদয়বান মানুষেরা। মুআযযিন সাহেবান উঁচু জায়গায় উঠে আযান দিতে গিয়ে যেন শীতের কষ্ট না পান– এজন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল বিশেষ শীতবস্ত্র। এ উদ্দেশ্যে ছিল স্বতন্ত্র ওয়াকফ-ব্যবস্থা। যা ‘হাবসুল বারনূস’ নামে পরিচিত।
وحبس البرنوس: هناك من حبس برنسا للمؤذن،ليلحق به عند صعوده الصومعة أيام الشتاء الباردة.
অর্থাৎ বিশেষ শীতবস্ত্রের জন্য ওয়াকফ। কেউ কেউ মুআযযিনদের জন্য বিশেষ শীতবস্ত্র ওয়াকফ করতেন। যেন প্রচণ্ড শীতে মিনারে ওঠার সময় তারা তা গায়ে জড়াতে পারেন। –জামইয়্যাতুল আওকাফ ওয়া দাউরুহা, পৃ. ২২
কাফন-দাফনের জন্য ওয়াকফ
মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা ফরযে কিফায়া। মুসলিম জাতি পরম যত্ন ও মমতার সাথে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করে থাকে। সাধারণত মৃত ব্যক্তির সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনরাই পালন করে এ দায়িত্ব। তবে কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, মৃত ব্যক্তিকে দাফন-কাফন করার মতো কেউ থাকে না। এর একটা নমুনা করোনাকালীন সময়ে আমরা দেখেছি। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে তখন মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়রা পর্যন্ত মৃত আপনজনকে কাফন-দাফন করার সাহস পেত না। এ যুগে এটা যেমন বাস্তব ঘটনা, আগের যুগে এ ধরনের বাস্তবতার সম্মুখীন মানুষ আরও বেশি হত। মাঝে মাঝেই দেশজুড়ে শুরু হত মহামারি। যাতে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার, কখনোবা লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যেত। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে অনেক সময় মৃত ব্যক্তিকে কাফন-দাফন দেওয়ার মতো লোক পাওয়া যেত না। তাই সমাজের হৃদয়বান মানুষেরা কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তৈরি করেছিলেন। যারা মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ফরযে কেফায়া দায়িত্ব পালন করত। আর এ সংস্থার কার্যক্রম যেন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়– এজন্য করেছিলেন ওয়াকফ-ব্যবস্থা। এসকল ওয়াকফের মধ্যে সুলতান যাহির বাইবার্সকৃত ‘ওয়াকফুত তুরাহা’ ছিল সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ। মৃতদের কাফন-দাফনের সামাজিক দায়িত্ব পালনকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম কেন্দ্রগুলোকে সাধারণত ‘মাগাসিলুল মাওতা’ ও ‘মুসাল্লাইয়াতুল আমওয়াত’ নাম দেওয়া হত। অসহায় মায়্যেতদেরকে এ ধরনের মাগাসিলে (মায়্যেতের গোসলের স্থান) আনা হলে এখানকার দায়িত্বশীল লোকেরা মায়্যেতের কাফন-দাফনের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করত। এ মাগসালগুলো সাধারণত বড় একটি ভবনের মতো হত। যেখানে এক স্থানে থাকত গোসল দেওয়ার ব্যবস্থা। পুরুষ ও মহিলাদের গোসল দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল আলাদা আলাদা। একটি রুমে থাকত কাফন-দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জাম। মায়্যেতকে গোসল দেওয়ার পর পাশেই থাকত তার জানাযার নামাযের ব্যবস্থা। এ পুরো কার্যক্রমের অর্থায়ন করা হত ওয়াকফের আয় থেকে।
কেউ আবার ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা ওয়াকফ প্রকল্পের একটি খাত বরাদ্দ রাখত মৃতদের কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করার জন্য। মিশরের আহমাদ পাশা বাদরাভী ১৯০৭ সালে করা তার ওয়াকফকৃত সম্পদের একাধিক সেবাখাত উল্লেখ করেন। তার মধ্যে একটি খাত ছিল বেওয়ারিশ লাশ কাফন-দাফন বাবদ।
তিনি লেখেন–
সামনূদ এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নীলনদে কেউ যদি ডুবে মারা যায় কিংবা উদ্ধার করার পর মারা যায় আর তার আপনজন বলতে কেউ না থাকে, এমনিভাবে সামনূদ এলাকায় কোনো গরিব কিংবা অপরিচিত মানুষ মারা যায় আর তার অর্থ সম্পদ বলতে কিছুই না থাকে, তাহলে এমন মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের জন্য... যত অর্থ ব্যয় হবে, তার পুরো ব্যয়ভার ওয়াকফকৃত সম্পদের লভ্যাংশ থেকে বহন করা হবে। –আলওয়াকফু ওয়াল মুজতামা, পৃ. ১৩৬
পাখির নষ্ট করা জিনিসের ক্ষতিপূরণের জন্য ওয়াকফ
কিছু কিছু পাখি মানুষের ফসল, খাবার ইত্যাদি নষ্ট করে। যেমন চিল মানুষের মাথায় বহন করা খাবার বা কোনো জিনিস ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। এতে মানুষের বেশ ক্ষতি হয়। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষটি যদি হয় অসহায় কিংবা অসচ্ছল। এ ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণের জন্যও ছিল ওয়াকফের বিশেষ ধরন, যার আয় এ ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কল্যাণে ব্যয় করা হত।
وقف الحِدَأَة: الذي يصرف إيراده في تعويض ما تخطفه الحدأة من المأكولات المحمولة على رؤوس الناس في الطرق، ولا سيما الخدم والأطفال، الذين يطالبون بما فقد منهم.
ওয়াকফুল হিদাআহ : চিল রাস্তার মাঝে মাথায় বহন করা খাবার ছোঁ মেরে নিয়ে গেলে মানুষের ক্ষতি হয়। বিশেষত শিশু ও খাদেমদের এ জন্য জবাবদিহিতার আশঙ্কা থাকে। তাই চিলের নষ্ট করা খাবারের ক্ষতিপূরণ দেওয়া বাবদ এ ওয়াকফের লভ্যাংশ ব্যয় করা হত। –জামইয়্যাতুল আওকাফ ওয়া দাউরুহা, পৃ. ২২