Shaban 1447   ||   February 2026

শাবান ও শবে বরাত : গুরুত্ব ও ফযীলত

Muhammad Ashiq Billah Tanveer

আল্লাহ তাআলা একটি বছরকে বারোটি মাসে সাজিয়েছেন তিনি কোনো কোনো মাসকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন তন্মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস হল শা‘বান আলমুয়ায্যাম বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে এ মাসের গুরুত্ব ও ফযীলত এবং করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে কিঞ্চিত আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ

শাবান মাস : গুরুত্ব ও ফযীলত

মুমিনের প্রতীক্ষিত রমযান মাসের আগের মাসের নাম শাবান দ্বীনী বিবেচনায় এই মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. বলেন ফরয নামাযের আগে-পরে যেভাবে সুন্নত-নফলের বিধান রয়েছে, তেমনি রমযানের আগে-পরে শাবান ও শাওয়াল মাসে রোযার বিধান রয়েছে মূল বিধানের পরিপূরক হিসেবে তাই মূল ইবাদতের পাশাপাশি পূর্বাপরের নফল ইবাদতগুলোর প্রতিও যত্নবান হওয়া চাই (দ্রষ্টব্য : লাতায়েফুল মাআরেফ, পৃ. ১৮০)

অতএব রমযানের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস

যে মাসে নবীজী বেশি বেশি রোযা রাখতেন

আমরা দেখতে পাই, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রোযা রাখতেন, বেশি বেশি রোযা রাখতেন

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন

مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ قَطّ إِلَّا رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُه فِي شَهْرٍ أَكْثَرَ مِنْهُ صِيَامًا فِي شَعْبَانَ.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ব্যতীত পূর্ণ মাস রোযা রাখতে দেখিনি আর শাবান মাস অপেক্ষা অন্য মাসে অধিক রোযা রাখতে তাঁকে দেখিনি সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৯১

আয়েশা রা. আরও বলেন

كَانَ أَحَبّ الشّهُورِ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَنْ يَصُومَه شَعْبَانَ...

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রিয় আমল ছিল শাবান মাসে রোযা রাখা... মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৫৫৪৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩১

এ হিসাবে পয়লা শাবান থেকে সাতাশ শাবান পর্যন্ত রোযা রাখা ফযীলতপূর্ণ একটি আমল তবে হাদীস শরীফে শাবানের শেষ দুয়েকদিন রোযা রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে রমযানের প্রস্তুতি নেওয়ার লক্ষে (দ্রষ্টব্য : সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯১৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৮২; লাতায়েফুল মাআরেফ, পৃ. ১৭৯)

শাবান মাসে মুমিন বান্দার আমল আল্লাহর নিকট পেশ করা হয়

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শাবান মাস সর্বাধিক প্রিয় ছিল, তাই তিনি রমযান মাসের পর এ মাসেই সবচেয়ে বেশি রোযা রাখতেন কিন্তু কেন?

এর উত্তর রয়েছে উসামা বিন যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে তিনি বলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রমযান ছাড়া) শাবান মাসে যত রোযা রাখতেন, অন্য কোনো মাসে এত রোযা রাখতেন না

তিনি বলেন, আমি (একবার) বললাম

وَلَمْ أَرَكَ تَصُومُ مِنْ شَهْرٍ مِنَ الشُّهُورِ مَا تَصُومُ مِنْ شَعْبَانَ.

আমি আপনাকে কোনো মাসেই এত রোযা রাখতে দেখিনি, শাবান মাসে আপনি যতটা রোযা রাখেন?

এ প্রশ্নের উত্তরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

ذَاكَ شَهْرٌ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ، وَهُوَ شَهْرٌ تُرْفَعُ فِيهِ الْأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ.

শাবান হল রজব ও রমযানের মধ্যবর্তী মাস এ মাস সম্পর্কে (অর্থাৎ এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে) মানুষ গাফেল থাকে শাবান হল এমন মাস, যে মাসে রব্বুল আলামীনের কাছে (বান্দার) আমল পেশ করা হয় আমি চাই, রোযাদার অবস্থায় আমার আমল (আল্লাহর দরবারে) পেশ হোক মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২১৭৫৩; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২৩৫৭; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস ৯৮৫৮

শাবান মাসের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন এত গুরুত্বারোপ করতেন, এই হাদীসে তা ফুটে ওঠেছে অর্থাৎ এই মাসে যেহেতু বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়, সুতরাং এ মাসটি এত গুরুত্বপূর্ণ

মানুষের অবস্থা হল ফযীলতপূর্ণ মাস হিসেবে রমযানকে গুরুত্ব প্রদান করা হয় শাবান মাসের আগে রজব মাস আছে, রজব মাস পবিত্র চার মাসের একটি ফলে রজব মাসকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় মাঝখানে শাবানের ব্যাপারে গাফলতি হয়ে যায়

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করলেন দেখো, একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে এই মাসটিও গুরুত্বের দাবিদার এ মাসে বান্দার গোটা বছরের আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় তাই শাবান আল্লাহর দরবারে আমলনামা পেশ হওয়ার মাস অতএব এই মাসেরও যথাযথ কদর করা চাই এ কারণেই আমি এ মাসে এত রোযা রাখি (দ্রষ্টব্য : লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃ. ১৮১)

সুতরাং সারা বছরের আমলনামা পেশ হওয়ার মাস হিসেবে শাবান মাসকেও যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা কর্তব্য এই গুরুত্ব প্রদান করার উপায় হল, সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে নেক আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া শাবান মাসের অধিকাংশ দিন রোযা রেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে এই নির্দেশনাই দিয়ে গেছেন

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সহীহ হাদীসে আছে আল্লাহর দরবারে প্রতিদিন বান্দার আমলনামা পেশ করা হয় দিনের আমলনামা রাতে আর রাতের আমলনামা দিনে পেশ করা হয় (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭৯)

এটি হল প্রতিদিনের আমলনামা অপর একটি সহীহ হাদীসে আছে, সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমলনামা পেশ করা হয় (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৬৫) এটি হল সাপ্তাহিক আমলনামা আর একবার পেশ করা হয় বাৎসরিকভাবে সেটা হল শাবান মাসে এখানে সেটার কথাই বলা হয়েছে

লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান : ফযীলতপূর্ণ এক রজনী

শাবান মাস পুরোটাই গুরুত্বপূর্ণ তবে এ মাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত হচ্ছে অর্ধ শাবানের রজনী তথা চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত এ রাতের রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য হাদীসের ভাষায় এ রাতকে বলা হয়লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান’ মুহাদ্দিসীনে কেরাম হাদীসের মৌলিক গ্রন্থসমূহে এ শিরোনামে স্বতন্ত্র অধ্যায় কায়েম করেছেন সেখানে সবিস্তারে এ রাত সম্পর্কে আলোকপাত হয়েছে সংক্ষেপ কথা হল

মুআয ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন

يَطَّلِعُ اللهُ إِلَى خَلْقِه فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِه إِلّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ.

অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ সৃষ্টির প্রতি (রহমতের বিশেষ) দৃষ্টি প্রদান করেন অতঃপর শিরককারী ও বিদ্বেষপোষণকারী ছাড়া সমগ্র সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৬৬৫

এছাড়াও আরও কিছু হাদীসে লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বানের কথা এসেছে আমরা ব্যবহারিক ভাষায় এ রাতকে ‘শবে বরাত’ বলে আখ্যায়িত করে থাকি শবে বরাত মূলত ফারসি শব্দ যেহেতু এ রাতে অবারিত ক্ষমার ঘোষণা এসেছে তাই একে শবে বরাত তথা মুক্তি বা পরিত্রাণের রাত বলা হয়ে থাকে

এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেছেন

পনেরো শাবানের রাতের ফযীলত সর্ম্পকে একাধিক ‘মারফূ’ হাদীস ও ‘আসারে সাহাবা’ বর্ণিত রয়েছে এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফযীলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয় সালাফে সালেহীনের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাযের ব্যাপারে যত্নবান হতেন আর শাবানের রোযার ব্যাপারে তো সহীহ হাদীসসমূহই রয়েছে

কোনো কোনো আলেম যদিও এই রাতের ফযীলত অস্বীকার করেন; কিন্তু হাম্বলী ও গায়রে হাম্বলী অধিকাংশ আলেমই এই রাতের ফযীলতের কথা স্বীকার করে থাকেন ইমাম আহমাদ রাহ.-এর মতও তাই কেননা এর ফযীলত সম্পর্কে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং এগুলোর সমর্থনে সালাফ (সাহাবী ও তাবেয়ী)-এর ‘আসার’ও বিদ্যমান রয়েছে; যেগুলো ‘সুনান’ ও ‘মুসনাদ’ শিরোনামে সংকলিত হাদীসের কিতাবে [বরং কতক ‘সহীহ’ শিরোনামের কিতাবেও যেমন সহীহ ইবনে খুযাইমা (কিতাবুত তাওহীদ), সহীহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতিতে] রয়েছে যদিও এ ব্যাপারে বহু বিষয় জালও করা হয়েছেইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম ২/১৩৬, ১৩৭

 

শবে বরাত : করণীয় আমলসমূহ

এ রাতের আমল সম্পর্কে ‘শুআবুল ঈমান’ বায়হাকীর নিম্নোক্ত হাদীসটি লক্ষ করি আলা ইবনুল হারিছ রাহ. থেকে বর্ণিত, আয়েশা রা. বলেন

قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مِنَ اللّيْلِ يُصَلِّي فَأَطَالَ السّجُودَ حَتّى ظَنَنْتُ أَنّه قَدْ قُبِضَ، فَلَمّا رَأَيْتُ ذلِكَ قُمْتُ حَتّى حَرّكْتُ إِبْهَامَه فَتَحَرّكَ، فَرَجَعْتُ، فَلَمّا رَفَعَ رَأْسَه مِنَ السّجُودِ، وَفَرَغَ مِنْ صَلَاتِه، قَالَ: يَا عَائِشَةُ أَوْ يَا حُمَيْرَاءُ ظَنَنْتِ أَنّ النّبِيّ خَاسَ بِكِ؟ قُلْتُ: لَا وَاللهِ يَا رَسُولَ اللهِ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنّكَ قُبِضْتَ لِطُولِ سُجُودِكَ، فَقَالَ: أَتَدْرِينَ أَيّ لَيْلَةٍ هَذِهِ؟ قُلْتُ: اللهُ وَرَسُولُه أَعْلَمُ، قَالَ: هذِهِ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، إِنّ اللهَ عَزّ وَجَلّ يَطَّلِعُ عَلى عِبَادِه فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِينَ، وَيَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِينَ، وَيُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ.

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সিজদা করেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি হয়তো মৃত্যুবরণ করেছেন আমি  তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ করে বললেন, হে আয়েশা, অথবা বলেছেন, ও হুমায়রা! তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন?

আমি উত্তরে বললাম আল্লাহর কসম, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না

নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন্ রাত?

আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ইরশাদ করলেন এটা হল অর্ধ শাবানের রাত (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে তাঁর বান্দার প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই শুআবুল ঈমান, বাইহাকী, হাদীস ৩৫৫৪

ইমাম বাইহাকী রাহ. এই হাদীসটি বর্ণনা করার পর এর সনদের ব্যাপারে বলেন

هذا مرسل جيد.

এ রাতের আমলের ব্যাপারে হাদীস শরীফের বর্ণনা থেকে যতটুকু পাওয়া যায় তা হচ্ছে এ রাতে বিশেষভাবে তওবা-ইস্তিগফার, দুআ-রোনাযারী এবং নফল ইবাদতে মশগুল থাকা একা একা যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব সাধারণ নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া যিকির-তাসবীহ পড়া, দুআ-দরূদ পড়া, লম্বা লম্বা রুকূ-সিজদায় নফল পড়া, কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা ইত্যাদি এ পরিমাণ ইবাদত করা, যাতে এর দ্বারা ফরয আমলে ব্যাঘাত না ঘটে এমন যেন না হয়, সারারাত নফলে মশগুল থেকে ফজরের জামাত ছুটে গেল বা কাযা হয়ে গেল

তেমনি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা বিশেষ করে ওইসব গুনাহ এবং নাফরমানী থেকে গুরুত্বের সাথে বেঁচে থাকা, যেগুলো এ রাতের সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত করে দেয়

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. এ রাতের করণীয় উল্লেখ করে বলেন

এ রাতে মুমিনগণ আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকবে বিপদাপদ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করবে রিযিকের প্রশস্ততা কামনা করবে তওবার প্রতি মনোনিবেশ করবে মনে রাখবে, আল্লাহর নিকট শিরক, হত্যা ও ব্যভিচার ভয়াবহ অপরাধ তেমনিভাবে কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা আল্লাহ পছন্দ করেন না এসকল গুনাহ আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়

সকল মুমিন-মুসলমানের ব্যাপারে দিল সাফ রাখবে কারও প্রতি কোনো বিদ্বেষ পোষণ করবে না বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের প্রতি বিদ্বেষ রাখা আরও জঘন্য পাপ এটা হল বিদআতীদের আচরণ কাজেই প্রিয় নবীর সুন্নতের প্রতি অবহেলা ও বিদআতে লিপ্ত হওয়া মাহরুমীর আলামত (দ্রষ্টব্য : লাতায়েফুল মাআরেফ, পৃ. ১৯২-১৯৩)

এছাড়া নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ রাতকে ঘিরে বিশেষ কোনো আমলের ব্যাপারে বিশেষ কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না সম্মিলিত ইবাদত, নির্দিষ্ট সূরা দিয়ে বিশেষ নামায, সম্মিলিত মীলাদ-মাহফিল, শবীনা খতম ইত্যাদি যেসকল রেওয়াজ কোথাও কোথাও প্রচলিত রয়েছে; এমনকি কোনো কোনো বাজারী বইয়ে লেখাও থাকে তা গ্রহণযোগ্য নয়

শাবানের পনেরো তারিখের রোযার বিধান

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. বলেন, শাবানের পনেরো তারিখে রোযা রাখা নিষিদ্ধ নয় কেননা এই পনেরো তারিখ তো আইয়ামে বীযেরই (প্রত্যেক আরবী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) একটি দিন হাদীস শরীফে এ দিনগুলোতে রোযা রাখার কথা এসেছে এছাড়া ১৫ তারিখে রোযা রাখার ব্যাপারে সুনানে ইবনে মাজাহ-এ আলী ইবনে আবী তালেব রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসও রয়েছে যদিও তার সনদ দুর্বল লাতায়েফুল মাআরেফ, পৃ. ১৮৯

এক্ষেত্রে চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান পাই উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব (দামাত বারাকাতুহুম)-এর নিকট, যা তিনি এক প্রশ্নের জবাবে উল্লেখ করেছেন তিনি বলেন

ইবনে মাজাহ্‌র হাদীসটি ‘মওযূ’ তো কখনোই নয়; তবে সনদের দিক থেকে ‘যয়ীফ’ যেহেতু ফাযাইলের ক্ষেত্রে ‘যয়ীফ’ গ্রহণযোগ্য, তাই আলেমগণ শবে বরাতের ফযীলতের ব্যাপারে এ হাদীস বয়ান করে থাকেন

শায়েখ আলবানী রাহ. ‘সিলসিলাতুয যয়ীফা’ (৫/১৫৪) গ্রন্থে এই বর্ণনাকে ‘মওযূউস সনদ’ লিখেছেন অর্থাৎ এর ‘সনদ’ মওযূ যেহেতু অন্যান্য ‘সহীহ’ বর্ণনা উক্ত বর্ণনার বক্তব্যকে সমর্থন করে, সম্ভবত এজন্যই শায়েখ আলবানী রাহ. সরাসরি ‘মওযূ’ না বলে ‘মওযূউস সনদ’ বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন তবুও শায়েখ আলবানী রাহ.-এর এই ধারণা ঠিক নয় সঠিক কথা এই যে, এই বর্ণনা ‘মওযূ’ নয়, শুধু ‘যয়ীফ’ ইবনে রজব রাহ. প্রমুখ বিশেষজ্ঞদের এই মত আলবানী সাহেব নিজেও বর্ণনা করেছেন

এ প্রসঙ্গে আলবানী সাহেব যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন তা এই যে, এ বর্ণনার সনদে ‘ইবনে আবী ছাবুরা’ নামক একজন রাবী রয়েছেন তার সম্পর্কে হাদীস জাল করার অভিযোগ রয়েছে অতএব এই বর্ণনা ‘মওযূ’ হওয়া উচিত তবে এই ধারণা এজন্য সঠিক নয় যে, ইবনে আবী সাবুরাহ সম্পর্কে উপরোক্ত অভিযোগ ঠিক নয় তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি হলে এটুকু বলা যায় যে, জয়ীফ রাবীদের মতো তাঁর স্মৃতিশক্তিতে দুর্বলতা ছিল রিজাল শাস্ত্রের ইমাম আল্লামা যাহাবী রাহ. পরিষ্কার লিখেছেন যে, ‘স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণেই তাঁকে জয়ীফ বলা হয়েছে’ (দেখুন, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৭/২৫০)

সারকথা এই যে, উপরোক্ত বর্ণনা মওযূ নয়, শুধু যয়ীফ

পনেরো শাবানের রোযা সম্পর্কে থানভী রাহ. যে ‘মাসনূন’ বলেছেন তার অর্থ হল মুস্তাহাব আর ইসলাহী খুতুবাতের আলোচনা মনোযোগ দিয়ে পড়া হলে দেখা যায় যে, তা এ কথার বিপরীত নয় ওই আলোচনায় ‘যয়ীফ’ হাদীসের ওপর আমল করার পন্থা বিষয়ে একটি ইলমী আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে হযরত মাওলানা পনেরো তারিখের রোযা রাখতে নিষেধ করেননি তিনি শুধু এটুকু বলেছেন যে, একে শবে বরাতের রোযা বলবে না গোটা শাবান মাসেই শুধু শেষের দুই দিন ছাড়া, রোযা রাখা মুস্তাহাব তাছাড়া প্রতি মাসের ‘আইয়ামে বীয’ (চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রোযা রাখা মুস্তাহাব এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ দিনের রোযা রাখা হলে ইনশাআল্লাহ সওয়াব পাওয়া যাবে” (দ্রষ্টব্য : মাসিক আলকাউসার, আগস্ট ২০০৮)

প্রান্তিকতা থেকে বেঁচে থাকি

শবে বরাতকে ঘিরে আমাদের সমাজে রয়েছে দ্বিমুখী প্রান্তিকতা কেউ কেউ শবে বরাতের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতে চান, যা একদমই অনুচিত তাদের জন্য আশা করি উপরোক্ত হাদীসের বিবরণ যথার্থ হবে আর কোথাও কোথাও এ রাতকে ঘিরে রয়েছে নানা ধরনের রসম-রেওয়াজ এবং বিভিন্ন গর্হিত কর্মকাণ্ড, যা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য

শবে বরাতে কী করণীয় তা সবিস্তারে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে এর বাইরে ভিন্ন কিছু করার অনুমতি নেই

শবে বরাত উপলক্ষে খিচুরি হালুয়ার রসম, পটকা-আতশবাজির সংস্কৃতি, দোকান-পাট, ঘরবাড়ি, এমনকি মসজিদ আলোকসজ্জা করা, বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা, কবরস্তান ও মাজারে মাজারে জমায়েতের রসম, কিশোর-যুবকদের দলবেঁধে ঘোরাঘুরি করার প্রবণতা, মাজারে এবং মেলায় নারীদের ভিড় জমানো ইত্যাদি যে রসম-রেওয়াজ রয়েছে, তা অত্যন্ত গর্হিত ও আপত্তিকর তেমনিভাবে আগরবাতি, মোমবাতি, গোলাপজলের সংস্কৃতি, বিভিন্ন প্রাণির আকৃতিতে খাবারদাবারের আয়োজন ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়

শায়েখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলবী রাহ. বলেন, অমুসলিমদের থেকে মুসলমানদের মাঝে এসব সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে প্রবল ধারণা, হিন্দুদের দেওয়ালী প্রথা থেকে এগুলো মুসলমানদের মাঝে এসেছে এ ধরনের অপসংস্কৃতির পক্ষে কোনো বিশুদ্ধ কথা তো দূরের কথা, কোনো বানোয়াট কথাও পাওয়া যায় না আর আগুন জ্বালিয়ে বিভিন্ন পর্ব উদ্যাপন করার সংস্কৃতি অগ্নিপূজকদের থেকে এসেছে (দ্রষ্টব্য : মা সাবাতা বিস সুন্নাহ ফী আইয়ামিস সানাহ, পৃ. ২৩৬-২৩৭)

এছাড়া শবে বরাত কেন্দ্রিক কিছু কিছু বিষয় এমন রয়েছে, যা সাধারণ অবস্থায় বৈধ হলেও (যেমন হালুয়া রুটি খাওয়া এবং খাওয়ানো) শবে বরাতের আমল মনে করা বিদআত অতএব এসবে সময় নষ্ট না করে বিশেষ সময়ের বিশেষ কদর করা চাই বেশি আমল করা সম্ভব না হলে অন্তত এশা ও ফজরের নামায জামাতে আদায় করি মাঝে যতটুকু সম্ভব নফল আমল করি কিছু তিলাওয়াত করি, কিছু যিকির করি, কিছু নামায পড়ি, চোখের পানি ফেলে ইস্তিগফার করি, আল্লাহর কাছে জীবনের যাবতীয় গুনাহ থেকে তওবা করে ক্ষমা প্রার্থনা করি, দুআ-মুনাজাত করি...

শয়তানের ধোঁকায় পড়ে অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে কিংবা নানা রসম-রেওয়াজে লিপ্ত হয়ে নিজের দ্বীন-ঈমানের ক্ষতি করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মূল্যবান মুহূর্তগুলোর যথাযথ কদর করার তাওফীক নসীব করুন আমীন 

 

advertisement