Shaban 1447   ||   February 2026

হযরত মাওলানা আবদুর রহীম রহিমাহুল্লাহ
‖ নমুনায়ে সালাফ এক আলেমেদ্বীনের বিদায়

Mufti Abul Hasan Muhammad Abdullah

গত ৮ রজব ১৪৪৭ হিজরী মোতাবেক ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ রোজ রবিবার মাগরিবের পর ইহজগৎ ছেড়ে চলে গেছেন হযরত মাওলানা আবদুর রহীম রহিমাহুল্লাহ সমাপ্তি ঘটল প্রায় ছয় দশকের ইলমে ওহীর ফয়েয বর্ষণের ধারা যে মনীষী আক্ষরিক অর্থেই জীবন ওয়াক্ফ করে দিয়েছিলেন আল্লাহর জন্য, আল্লাহর দ্বীনের জন্য, কুরআন-সুন্নাহ, দ্বীনের তাদরীস ও প্রচারের জন্য এমন ব্যক্তিত্বগণ ক্ষণজন্মাই হয়ে থাকেন বিশেষত বস্তুবাদিতার এই যুগে যখন আমাদের দ্বীনী ঘরানাগুলোকেও কোনো না কোনোভাবে ইহজাগতিকতা আক্রান্ত করছে, সে সময় এমন একজন বুজুর্গ, মুত্তাকী, নমুনায়ে সালাফ উস্তাযের বিদায় নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি

মাওলানা আবদুর রহীম ছাহেব হুজুরের জন্ম আনুমানিক ১৯৪১ সালের দিকে কুমিল্লা জেলার বরুড়া থানার একটি দ্বীনদার পরিবারে ছয় কি সাত বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারিয়ে এতিম হন তাঁর দ্বীনদার বাবা জীবদ্দশায় সে অঞ্চলের বিখ্যাত আলেমেদ্বীন শেখজি হুজুর খ্যাত মাওলানা আবুল কাসেম রাহ.-এর হাতে সোপর্দ করে যান শেখজি হুজুরের হাতেই তাঁর তালীম-তরবিয়তের গোড়াপত্তন হয় মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত যাবতীয় কিতাবাদী তাঁর কাছেই পড়েন এরপর তৎকালীন শীর্ষ ইসলামী বিদ্যাপীঠ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগে হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (ছদর ছাহেব) রাহ.-এর হাতে সোপর্দ করেন তাঁর উস্তায শেখজি হুজুর এখানে তিনি জামানার শ্রেষ্ঠ আলেমদের কাছে হাদীস-তাফসীরসহ উচ্চস্তরের কিতাবগুলো পড়েন তার উস্তাযগণের মধ্যে ছিলেন মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রাহ., হযরত মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ রাহ., মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান রাহ.-এর মতো সে যুগের বড় বড় বুজুর্গ আলেম

লালবাগ মাদরাসায় দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করার পর তিনি মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান ছাহেবের তত্ত্বাবধানে দুই বছর তাফসীরের ওপর উচ্চতর পড়াশোনা করেন এরপর স্বীয় উস্তাযের পরামর্শে শিক্ষকতার খেদমত শুরু করেন রাজধানীর জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদরাসায় এখানে পাঁচ বছর শিক্ষকতার পর উস্তাযগণ তাকে লালবাগ মাদরাসায় নিয়ে আসেন শুরু হয় শিক্ষকতা জীবনের নতুন অধ্যায় এক যুগের বেশি সময় এখানে শিক্ষকতার পর লালবাগে কিছু দুঃখজনক ঘটনা ঘটে তখন উস্তাযের পরামর্শে তিনি চাঁদপুরের মুমিনপুর মাদরাসায় চলে যান সেখানে পাঁচ বছর তাদরীসী খেদমত আঞ্জাম দেন এরপর লালবাগ মাদরাসার দায়িত্বশীলগণ এবং খাজে দেওয়ান এলাকার মুসল্লিদের অনুরোধে তিনি আবার লালবাগে ফিরে আসেন সেই থেকে চার দশকের কাছাকাছি সময় তিনি সেখানেই ইলমী ও দ্বীনী খেদমতে নিয়োজিত থাকেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ছিলেন মাদরাসাতেই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম থেকে শুরু করে বহু গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের অধ্যাপনা করেছেন এই অধমেরও হযরতের দরসে বসার তাওফীক হয়েছিল

একজন দক্ষ মুআাল্লিম হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন বহু অসাধারণ গুণের অধিকারী একদিকে বংশগতভাবেই ছিলেন শরীফ, ভদ্র ও নম্র; অন্যদিকে ছিলেন উসূল-পছন্দনীতির প্রশ্নে ছাড় দিতেন না কোনো ফেতনার অংশীদার হতেন না বিগত সরকারের আমলে লালবাগ কব্জা করে রাখা মতলববাজ লোকেরা তাঁকে প্রিন্সিপাল বানাতে চেয়েছিল একাধিকবার তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন দুনিয়ার জৌলুস তাঁকে স্পর্শ করেনি সাদাসিধা জীবনযাপন করে গেছেন আমৃত্যু নিজ সন্তানদেরও তিনি দক্ষ আলেমেদ্বীন বানিয়ে গেছেন মাশাআল্লাহ তাঁর পাঁচ ছেলে যোগ্য আলেম হয়ে বিভিন্ন প্রসিদ্ধ মাদরাসায় গুরুত্বপূর্ণ ইলমী খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন হুজুর যেভাবে নিজে ফেতনার বাইরে থেকে দ্বীনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাঁর সন্তানদেরও একই অসিয়ত করে গেছেন

লালবাগ মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি পার্শ্ববর্তী খাজে দেওয়ান মহল্লা মসজিদে নিয়মিত তাফসীর মজলিস করতেন তাঁর তাফসীর থেকে কুরআনের ফয়েযপ্রাপ্ত হয়েছে অসংখ্য মুসলমান ওই অঞ্চলে তাঁর অসংখ্য ভক্ত তৈরি হয়েছে তাফসীর শুনে

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আবেদ ও যাহেদ নিয়মিত নাওয়াফেলের পাবন্দ ছিলেন এমনকি ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তেও তিনি মাগরিবের সুন্নতের পর আওয়াবীন আদায় করেছিলেন এর অল্প সময়ের মধ্যেই কালিমা পড়া অবস্থায় সকলকে ছেড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন সে সময় তাঁর ছেলে মাওলানা ফরীদ আহমদ ও তাঁর নাতি কালিমা শরীফ ও সূরা ইয়াসীন পড়ছিলেন এমন সুন্দর বিদায় অল্প মানুষেরই নসীব হয় জীবদ্দশায় তিনি প্রতিদিন নিয়মিত দশ পারার মতো কুরআন তিলাওয়াত করতেন রমযানে তা উন্নীত হত ১৫ পারায়

শেষের দিকে কিছু দুআ তিনি নিয়মিত করতেন তার মধ্যে ছিল, তাঁকে যেন হাসপাতালে নিতে না হয়, ইন্তেকালের সময় যেন পাশে সূরা ইয়াসীন পড়া হয় এবং ইন্তেকাল যেন মাদরাসায় হয় এ সবই পুরোপুরি কবুল হয়েছে ছোটবেলায় উস্তাযের কাছে উর্দু শের শুনেছি

ہمیں دنیا سے کیا مطلب مدرسہ ہے وطن اپنا

مریں گے ہم کتابوں پر ورق ہوگا کفن اپنا

দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের কী, মাদরাসা আমাদের ঘর/

মৃত্যু আমাদের হবে কিতাবের ওপর, কাগজ হবে কাফন আমাদের

উস্তায ও মুরব্বীদের রো‘ব আমার ওপর খুব বেশি থাকে আগেও তাঁদের কাছে ভিড়তে ভয় হত, এখনো হয় তাই কাউকে অনুরোধ করে মারকাযুদ দাওয়াহ্য় নিয়ে আসাও আমার দ্বারা হয়ে ওঠে না তবে মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেবের ওসিলায় হুজুর বেশ কয়েকবার মারকাযুদ দাওয়াহ্য় তাশরীফ এনেছিলেন আমাদেরকে দুআ ও উৎসাহ দিয়ে গেছেন মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেবকে তিনি খুবই স্নেহ করতেন ছাত্রদেরকে তাঁর ইলম থেকে উপকৃত হতে বলতেন হুজুরের ইন্তেকালে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’ও এক মুশফিক মুরব্বী হারিয়েছে লালবাগ মাদরাসায় যে বছর আমি হেদায়া জামাতে ভর্তি হই, সে বছরই হেদায়া দ্বিতীয় খণ্ড পুরোটা হুজুরের কাছে পড়ার সৌভাগ্য হয় জামাতে সবচেয়ে ছোট ও নবাগত হওয়া সত্ত্বেও হুজুর খুবই স্নেহ করতেন তাঁর দুই ভাতিজা মাওলানা আবদুল্লাহ রাহ. ও মাওলানা আবু আহমদ আমার হামসবক ছিলেন সে সূত্রেও তাঁদের ওসিলায় হুজুরের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেত হুজুর কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন এবং উৎসাহ দিতেন

মাওলানা আবদুর রহীম ছাহেব হুজুরের বিদায় শুধু ইলমী জগতে শূন্যতা তৈরি করেনি; বরং একজন প্রথিতযশা মুআল্লিম ও মুফাসসির হওয়ার পাশাপাশি তিনি যে অসাধারণ গুণাবলির অধিকারী ছিলেন সেসব থেকেও তুল্লাবে ইলম ও সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে

আল্লাহ তাআলা হুজুরকে জান্নাতুল ফিরদাউসের আ‘লা দারাজা দান করুন ভুল-ত্রুটিগুলো নিজগুণে ক্ষমা করে দিন লাওয়াহিকীন ও গুণগ্রাহীদের সবরে জামীলের তাওফীক দান করুন ছাত্রদেরকে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণের তাওফীক দান করুন তাঁর দ্বীনী খেদমতগুলোর সিলসিলা কিয়ামত পর্যন্ত সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে বহমান রাখুন আমীন 

 

advertisement