কুরআনের সংস্পর্শে রয়েছে জীবনের সজীবতা
মাওলানা আবু উনাইস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এভাবে দুআ করতে শিখিয়েছেন, হে আল্লাহ, কুরআনকে আমার হৃদয়ের বসন্ত বানিয়ে দিন। আমার দিলের নূর বানিয়ে দিন, পেরেশানীর উপশম বানিয়ে দিন। কুরআনের মাধ্যমে যেন আমার দুঃখ-দুর্দশা দূর হয়ে যায়, সে ব্যবস্থা করে দিন। (দ্রষ্টব্য : মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৩৭১২)
ঋতুরাজ বসন্ত। এর ছোঁয়ায় প্রকৃতি নতুন সাজে সজ্জিত হয়। গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়। বাগানে রংবেরঙের ফুল ফোটে। পাখির কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত হয়। ঠিক তেমনি মুমিনের জীবনে সজীবতা বিরাজ করে পবিত্র কুরআন মাজীদের সংস্পর্শে। কুরআনের প্রতি গভীর প্রেম ও মমত্বে জীবন সুরভিত হয়। কুরআনকে জীবনের বসন্ত হিসেবে বরণ করে নিলে ঈমান তরতাজা থাকে। কুরআনের সাথে যার সম্পর্ক যত প্রগাঢ়, তার ঈমান তত সুদৃঢ়। কাজেই আমাদের দায়িত্ব কুরআন মাজীদের সাথে সম্পর্ক মজবুত ও প্রাণবন্ত করা।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন–
اَلَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَتۡلُوۡنَہٗ حَقَّ تِلَاوَتِہٖ اُولٰٓئِکَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِہٖ وَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِہٖ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ .
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা যখন তা তিলাওয়াত করে, যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত, তখন তারাই তার প্রতি (প্রকৃত) ঈমান রাখে। আর যারা তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত লোক। –সূরা বাকারা (০২) : ১২১
ঈমানের অনিবার্য দাবি, আল্লাহর কিতাবের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা। এ বিষয়টিই আয়াতে ‘যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত’ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং প্রকৃত ঈমানের সাথে একে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। পবিত্র কালামুল্লাহ্র তিলাওয়াত তখনই যথাযথ হয়, যখন মুমিনের যিন্দেগীজুড়ে বিরাজ করে কুরআনের প্রতি যথাযথ বিশ্বাস ও বিশ্বাসের প্রকাশ, চূড়ান্ত আস্থা ও ভালবাসা, সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত, কুরআনের পয়গামের প্রতি আত্মসমর্পণ; আর গোটা জীবনে প্রতিফলিত হয় কুরআনী বিধানের আলো।
এ বিষয়গুলো কীভাবে একজন মুমিনের জীবনে প্রতিফলিত হতে পারে তা নিয়েই এই নিবন্ধ।
কুরআন মাজীদের প্রতি যথাযথ বিশ্বাস স্থাপন করা
ঈমানের জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত কিতাবুল্লাহ্র প্রতি যথাযথ ঈমান আনা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন–
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَالۡکِتٰبِ الَّذِیۡ نَزَّلَ عَلٰی رَسُوۡلِہٖ وَالۡکِتٰبِ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ مِنۡ قَبۡلُ وَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِاللّٰہِ وَمَلٰٓئِکَتِہٖ وَکُتُبِہٖ وَرُسُلِہٖ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا.
হে মুমিনগণ! ঈমান আনয়ন কর আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং তিনি যে কিতাব তাঁর রাসূলের ওপর নাযিল করেছেন, সেই কিতাবের প্রতি এবং যে কিতাবসমূহ তার পূর্বে নাযিল করেছেন, তার প্রতি। যে ব্যক্তি আল্লাহকে, তাঁর ফেরেশতাগণকে, তাঁর কিতাবসমূহকে, তাঁর রাসূলগণকে এবং পরকালকে অস্বীকার করে, সে সুদূর (চরম) ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়। –সূরা নিসা (০৪) : ১৩৬
কুরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে–
اٰمَنَ الرَّسُوۡلُ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡہِ مِنۡ رَّبِّہٖ وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ کُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَمَلٰٓئِکَتِہٖ وَکُتُبِہٖ وَرُسُلِہٖ ...
রাসূল ঈমান এনেছেন ওইসকল বিষয়ের প্রতি, যা তার রবের পক্ষ থেকে তার প্রতি নাযিল হয়েছে এবং মুমিনরাও। তারা সকলেই ঈমান এনেছেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাকুলের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি...। –সূরা বাকারা (০২) : ২৮৫
কাজেই আল্লাহর কিতাবের প্রতি যথাযথ বিশ্বাস স্থাপন করা মুমিনের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। পাশাপাশি এই বিশ্বাসের প্রকাশ যেন আচার-আচরণ, বোধ-উপলব্ধি, চিন্তা-দর্শন ও জীবনে প্রতিফলিত হয়, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য।
কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতের প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া
আল্লাহ তাআলা মানব জাতির পথের দিশার জন্য কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন আর তা পড়ে শোনানো এবং তা শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন প্রিয় নবীজীর প্রতি। এর মাধ্যমে তিনি মুমিনগণকে আলোর পথ দেখাবেন। যতদিন কুরআনের আলোতে তারা পথ চলবে, ততদিন সীরাতে মুস্তাকীম তথা হেদায়েতের ওপর থাকবে। আর যখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তখনই অন্ধকার তথা গোমরাহীতে নিপতিত হবে।
কুরআনের অন্যতম অলৌকিকত্ব ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল– এটা এমন এক কিতাব, যা তিলাওয়াত ও পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
প্রিয় নবীজী নিজেও তিলাওয়াত করতেন এবং উম্মতকেও তিলাওয়াত করে শোনাতেন। হাদীস ও সীরাতের কিতাবে এর সবিস্তার বিবরণ রয়েছে।
নববী এ যিম্মাদারীর বিষয়টি পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন স্থানে এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন–
لَقَدۡ مَنَّ اللّٰہُ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ بَعَثَ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡ اَنۡفُسِہِمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَیُزَکِّیۡہِمۡ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَاِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ.
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি (অতি বড়) অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের কাছে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেয়, যদিও এর আগে তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে ছিল। –সূরা আলে ইমরান (০৩) : ১৬৪
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন–
ہُوَ الَّذِیۡ بَعَثَ فِی الۡاُمِّیّٖنَ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَیُزَکِّیۡہِمۡ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَاِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ.
তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবে, যদিও তারা এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিপতিত ছিল। –সূরা জুমুআ (৬২) : ০২
পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত এমন এক আমল, যার মাধ্যমে ঈমান সজীব হয়। দিলে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়। সর্বোপরি মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন–
اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِیْنَ اِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَاِذَا تُلِیَتْ عَلَیْهِمْ اٰیٰتُهٗ زَادَتْهُمْ اِیْمَانًا وَّعَلٰی رَبِّهِمْ یَتَوَكَّلُوْنَ.
মুমিন তো তারাই, (যাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে। –সূরা আনফাল (০৮) : ০২
তিলাওয়াতে কুরআন এমন ইবাদত, যার মাধ্যমে দেহ-মন শিহরিত হয় এবং হৃদয় বিগলিত হয় মহান প্রভুর দরবারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন–
اَللهُ نَزَّلَ اَحْسَنَ الْحَدِيْثِ كِتٰبًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُوْدُ الَّذِيْنَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِيْنُ جُلُوْدُهُمْ وَ قُلُوْبُهُمْ اِلٰي ذِكْرِ اللهِ .
আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী– এমন এক কিতাব, যার বিষয়বস্তুসমূহ পরস্পর সুসমঞ্জস, (যার বক্তব্যসমূহ) পুনরাবৃত্তিকৃত, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, এর দ্বারা তাদের শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তারপর তাদের দেহ-মন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। –সূরা যুমার (৩৯) : ২৩
সুতরাং প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য– কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা এবং হক আদায় করে তিলাওয়াত করা। দৈনন্দিন জীবনে একটি সময় কুরআন তিলাওয়াত এবং তাফাক্কুর-তাদাব্বুরের (কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা এবং তা থেকে উপদেশ গ্রহণের) জন্য নির্ধারণ করা। কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে দিনের সূচনা হলে তা আরও ভালো।
মাসে কমপক্ষে এক খতম কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসে এক বার খতম করতে বলেছেন।
তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি এরচে বেশি পারব।
নবীজী বললেন, তাহলে বিশ দিনে খতম কর।
তিনি বললেন, আমি আরও বেশি পড়তে পারব।
নবীজী বললেন, তাহলে সাত দিনে খতম কর। এরচে বেশি নয়। (দ্রষ্টব্য : সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৫৯; সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৭৬৭, ৫০৫৪)
কুরআনের বিধান ও পয়গামের প্রতি আত্মসমর্পণ
কুরআন মাজীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল– কুরআনের বার্তা ও বিধান মাথা পেতে গ্রহণ করা। কুরআন যা করতে বলেছে, তা করা। যা করতে নিষেধ করেছে, তা থেকে বিরত থাকা। যিন্দেগীতে ঈমানের নূর তখনই প্রতিফলিত হবে, যখন তাতে কুরআনের আলো বিকিরিত হবে।
একদিকে কুরআনের বিধান মাথা পেতে গ্রহণ করা। আবার একজন কুরআনপ্রেমী হিসেবে কুরআনের বার্তা ও পয়গাম গ্রহণে উন্মুখ থাকা। কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর ও তাফাক্কুর করা।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন–
كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَیْكَ مُبٰرَكٌ لِّیَدَّبَّرُوْۤا اٰیٰتِهٖ وَلِیَتَذَكَّرَ اُولُوا الْاَلْبَابِ.
(হে রাসূল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তাফিকির করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে। –সূরা ছদ (৩৮) : ২৯
মোটকথা, দিলের জট ও জং দূর করতে কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং এর থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা অপরিহার্য।
এভাবে সর্বদা কুরআনের শরণাপন্ন যে ব্যক্তি হবে, কুরআন তাকে আলোর পথ দেখাবে। উভয় জগতে মুক্তি ও সফলতার মঞ্জিলে পৌঁছে দেবে।
আসুন, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করি, কুরআনের সংস্পর্শে জীবনকে সজীব করি, কুরআনের বিধান মেনে চলি, কুরআনের রঙে রঙিন হই।