বিশেষ নিবন্ধ

(সাক্ষাৎকারটি আগস্ট ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিতব্য। সময় ও প্রসঙ্গ বিবেচনায় এখানে প্রকাশ করা হল।)

ই-ভ্যালির নৈরাজ্য

আলেমগণ কিন্তু অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ

 

প্রশ্ন : সম্প্রতি দেশের ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত অনলাইনভিত্তিক বিপণন প্রতিষ্ঠান ই-ভ্যালি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা শোনা যাচ্ছে। মাসিক আলকাউসারের অনেক পাঠক এ বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন এবং মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর ফতোয়া বিভাগেও এ বিষয়ক প্রশ্ন ব্যাপকভাবে আসছে। আজকে আমরা আপনার নিকট থেকে উক্ত বিষয়ে শরয়ী নির্দেশনা শুনতে চাই। তাছাড়া মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা ও মাসিক আলকাউসারের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে বিগত প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন পদ্ধতিতে ফুলে-ফেঁপে ওঠা বিভিন্ন ব্যবসায়িক কারবার নিয়ে আপনারা যে রাহনুমায়ি করেছিলেন সে সম্পর্কেও কিছু জানার আশা প্রকাশ করছি।

উত্তর : বলুন।

প্রশ্ন : শুরুতেই আমরা সংক্ষেপে ই-ভ্যালি সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।

উত্তর : ই-ভ্যালি যখন এদেশে ঢাকঢোল পিটিয়ে তাদের কারবার শুরু করে তখনই এ বিষয়ে আমরা আমাদের মতামত দিয়ে দিয়েছি এবং প্রায় বছরখানেক আগে একটি বিস্তারিত সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো মুসলমানদের সামনে তুলে ধরেছি। যতটুকু মনে পড়ে, ই-ভ্যালির নাম আমি প্রথম দেখেছি বিমানবন্দরের ট্রলিগুলোর পিছনে বিজ্ঞাপন হিসাবে।

একটা অচেনা নতুন কারবারি প্রতিষ্ঠান একেবারে দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ট্রলিগুলোতে (বিজ্ঞাপন হিসাবে) জায়গা করে নিয়েছেÑ তা দেখেই ওদের মন-মেযাজ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। এরপর তো দেশের হরেক রকমের গণমাধ্যমে বলতে গেলে ই-ভ্যালি হয়ে গিয়েছে বিজ্ঞাপনদাতাদের অন্যতম। 

মারকাযের কোনো কোনো খিররিজ ওদের কিছু নতুন নতুন পদ্ধতি আমাদের সামনে নিয়ে আসেন। আমরা নিয়ম অনুযায়ী পড়াশোনা করে তাদের কারবারের অনেক কিছুই যে জায়েয নয়Ñ তা স্পষ্টভাবে বলে দিই। এবং সর্বশেষ গত বছরের ২৭ আগস্ট একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বলে দেওয়া হয়েছে।

ই-ভ্যালি ও তাদের ধাঁচের অন্যান্য অনলাইন কারবার যে বহুবিধ শরয়ী সমস্যার কারণে শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যানযোগ্য তা আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছি। আমরা আরো সতর্ক করে দিয়েছি যে, এজাতীয় কারবারগুলো শরয়ী দৃষ্টিতে শুধু নাজায়েযই নয়; বরং এগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রতারণাপূর্ণ এবং গণমানুষের জন্য ক্ষতিকরও বটে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী।

প্রশ্ন : ই-ভ্যালি সম্পর্কে আমরা আবারও আপনার কাছ থেকে শুনব। এই ফাঁকে আমরা অন্য একটি বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইব। বিগত কয়েক দশক থেকে লক্ষ্য করা গেছে, আপনারা নতুন নতুন বিভিন্ন আর্থিক ও কারবারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে যথাসময়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। ঠিক যখন এগুলো বিপথে চলার প্রতিযোগিতা করছিল এবং একশ্রেণির মানুষ সেগুলো না বুঝেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল তখনও মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা ও মাসিক আলকউসার মুসলমানদেরকে সতর্কবাণী শুনিয়েছে। শেয়ারবাজার সম্পর্কে বিগত শতাব্দীর শেষ ও বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে তার কৃত্রিম দুটি উত্থানের সময়ও সতর্কবাণী শুনিয়েছেন। তেমনিভাবে যখন এ দেশে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কারবার শুরু হয় এবং কয়েক বছর পর তারা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখনও আপনারা মানুষকে সতর্কবাণী শুনিয়েছেন।

তো আমরা জানতে চাই যে, আপনারা কীসের ভিত্তিতে অগ্রিম সতর্কবাণী দিয়ে ফেলেন?

এছাড়া ২০০৭-২০০৮ -এর দিকে বিভিন্ন ব্যক্তি কর্তৃক (যাদের মধ্যে কিছু দ্বীনদার ও উলামা-তলাবাও ছিল) বুঝে না বুঝে কমিশনভিত্তিক কারবারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সময় যে সময়োচিত ও অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সচেতন আলেমগণ নিয়েছেন- এসবের পেছনে মূলত কী উপলব্ধি ও প্রয়োজন থেকে তখন স্রোতের বিপরীতে কথা বলা হয়েছিল?

উত্তর : আসলে আপনি যদি ফিক্হ-ফতোয়ার কাজে নিয়োজিত থাকেন তাহলে এ কাজগুলো আপনার পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। মানুষ যদি আপনার কাছে এমন কিছু আশা করে অথবা আপনি মানুষের লেনদেন ও কারবারে রাহনুমায়ী করার চেষ্টা করেন তাহলে আপনাকে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। শুধু চোখ-কান খোলা রাখলেই হবে না; বরং এই জঞ্জাল-বিক্ষুব্ধ আর্থিক দুনিয়ায় দৃষ্টিটা একটু দূরেও নিতে হবে এবং সেগুলোর জন্য আপনাকে ইসলামের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইসলামের শাশ^ত ও পরিচ্ছন্ন নীতিমালাগুলো মাথায় রাখতে হবে। সাথে সাথে বর্তমান পুঁজিবাদী দুনিয়ার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ও বদলি হয়ে যেতে থাকা কলাকৌশলগুলোর উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এ দুটো বিষয়ের সমন্বয় করলে আপনি শুধু ঐ বিষয়ের শরয়ী মাসআলাই বলবেন না; বরং আর্থিক ফলাফল ও পরিণামের দৃষ্টিতে একটি কারবারের গতি কোন্ দিকে যাচ্ছে বা ঐ কারবারিরা তাদের চটকদার নতুন নতুন কথাগুলো কী মতলবে বলছে সেটাও ধরতে পারবেন। বিভিন্ন সময়ে শেয়ারবাজার, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং, মাল্টি পারপাস সোসাইটি এবং এজাতীয় অন্যান্য নতুনভাবে গজিয়ে ওঠা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে শরয়ী মাসআলা বলার সাথে সাথে তাদের দেউলিয়া হওয়া যে অপরিহার্য সে কথাগুলো আগেই বলে দেওয়া গিয়েছিল এসব নীতির উপর ভিত্তি করেই।

প্রশ্ন : কিন্তু দেখা যায়, অনেক সময় আপনারা তৎক্ষণাৎ কোনো বিষয়কে হারাম বলে দেন না।

উত্তর : দেখুন, কোনো কারবারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সন্দেহ জাগলেই অথবা কেউ জিজ্ঞাসা করলেই তাড়াহুড়ো করে সেটিকে জায়েয বা নাজায়েয বলে দেওয়ার সুযোগ নেই; বরং আপনি যদি আপনার পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতা থেকে তাদের অবস্থান মোটামুটি আঁচ করে ফেলেন তবুও চূড়ান্ত মতামতটি দিতে হবে ইসলামী শরীয়ার উসূল ও যাওয়াবেত তথা নীতিমালার আলোকে। এজন্য অপেক্ষা করতে হলে, সময় নিতে হলে তা করতে হবে। আবার কিছু বিষয় এমনও থাকে, যেগুলো কৌশলগত কারণে আপনি একা না বলে ফিকহের খেদমতে অন্য যাঁরা জড়িত আছেন, এমন ব্যক্তিত্বদের সাথে আলোচনা করে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়া।

যাইহোক, সঙ্গত কারণেই শুরুর দিকের আচরণ দেখে কোনো কারবারের চরিত্র আঁচ করে ফেললেও তাদের ব্যাপারে শরয়ী মতামত দেওয়ার আগে আমাদেরকে উপরোক্ত নীতি মেনে চলতে হবে।

আমাদের দেশে প্রথম মাল্টিলেভেল কোম্পানি হল টংচেং। ১৯৯৯ সালের দিকে তারা যখন এদেশে আসে তখন বেকার ও স্বল্প আয়ের লোকদের মাঝে এতে অংশগ্রহণের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে তারা বিভোর ছিল। কিছু কিছু মাদরাসা ছাত্র ও দ্বীনদার শ্রেণির লোকও এতে যোগ দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’র ফতোয়া বিভাগসহ অন্যান্য ফতোয়া বিভাগগুলোতে ব্যাপকভাবে মানুষ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা শুরু করে।

আমাকে প্রথম যখন এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তখন শুনেই বলেছিলাম, ব্যবসার যে চক্করটা শুনলাম শরীয়তে এ ধরনের ব্যবসা বৈধ হওয়ার কথা নয়। তবে আমি সিদ্ধান্তও দিচ্ছি না। অন্যান্য দারুল ইফতার সাথে কথা বলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরপর আমরা বিভিন্ন দারুল ইফতার সাথে কথা বলে যৌথভাবে তা নাজায়েয হওয়ার সিদ্ধান্ত দিই। (দ্রষ্টব্য : মাসিক আলকাউসার, জানুয়ারি ২০১২, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং)

তবে এ ফতোয়া প্রস্তুত করতে গিয়ে শুরুতেই আমাদেরকে একটু বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। কারণ তখন ওমানে বিজনাস ডটকম নামের প্রতিষ্ঠান একটি ফতোয়া প্রকাশ করেছিল। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং-এর সাথে জড়িত এদেশের কিছু দ্বীনদার শ্রেণি এটিকে তাদের স্বপক্ষে দলীল হিসেবে পেশ করার চেষ্টা করেছে। ঐ ফতোয়াটি হযরত মাওলানা মুফতী  মুহাম্মাদ তাকী উসমানী ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম-এর নামে বিজনাস ডটকম প্রচার করেছিল। তাদের দাবি ছিল, তিনি তাদের কারবারকে জায়েয বলেছেন। যেটি ছিল মাল্টি লেভেলভিত্তিক একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান।

যখন অন্যান্য দারুল ইফতার লোকেরা কাজ করছিল তখন আমরা তা যাচাইয়ের চেষ্টা করি। সাথে সাথে ভারত-পাকিস্তান ও আরব দেশের দারুল ইফতা থেকে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কারবার সম্পর্কে কী বলা হচ্ছে সেটিও দেখার চেষ্টা করি।

কারবারটি যেহেতু প্রায় একেবারে নতুন ছিল তাই অনেক দারুল ইফতা তখনও তাদের মতামত দিয়ে সারেনি।

দারুল উলূম করাচিতে যখন এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হল ততদিনে বিষয়টি তাদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়েছে এবং এজাতীয় কারবার যে বৈধ নয় সে বিষয়ে তারাও একমত হয়েছেন। শোনা গেছে, দারুল ইফতার কোনো এক সাথী তাড়াহুড়ো করে ঐ ফতোয়ায় মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম-এর দস্তখত নিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারাও অন্যান্য দারুল ইফতার মতো মাল্টিলেভেল মার্কেটিং নাজায়েয হওয়ার ফতোয়া দিয়েছেন।

তো নতুন বিষয়ে কাজ করতে গেলে কখনও কখনও এ ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। সেক্ষেত্রে পারস্পরিক যোগাযোগ, আলাপ-আলোচনা ও দারুল ইফতাগুলোর পরস্পর মতবিনিময়ের মাধ্যমে সঠিক উত্তর পর্যন্ত পৌঁছার চেষ্টা করতে হয়।

প্রশ্ন : এ ধরনের নতুন নতুন চটকদার কারবারগুলোর বিপরীতে কথা বলতে গিয়ে আপনাদেরকে কি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল?

উত্তর : খুব স্বাভাবিক। আপনি যখন জোরে চলা ঝড়ের বিপরীতে কথা বলবেন সেটি অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ হবে। যারা ঐ কৃত্রিম ঝড় চালু করে অর্থাৎ বিভিন্নভাবে ধোঁয়া তুলে গণ মানুষের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার রাস্তা তৈরি করে, আপনার কথায় যখন তার স্বার্থে আঘাত লাগবে তখন তো সে আপনার বিরুদ্ধে তার সব অস্ত্রই ব্যবহারের চেষ্টা করবে। আপনাকে অবোধ বানানো চেষ্টা করবে। পাগল বলার চেষ্টা করবে। আপনি অর্থনীতি বোঝেন না এমন অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করবে।

মনে রাখতে হবে, এভাবে বিভিন্ন অপকৌশলে বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের গণমানুষের টাকা যারা হাতিয়ে নেওয়ার পন্থা আবিষ্কার করে তারা আগে থেকেই বিভিন্ন স্তরে তাদেরকে সমর্থন দেওয়া ও তাদের পক্ষে বলার মতো লোকজন তৈরি করে নেয়। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর ও গণমাধ্যমে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তারা তাদের প্রভাব তৈরি করে ফেলে। আসলে এসব তো তাদের কষ্টের অর্জিত টাকা থাকে না; বরং বিভিন্ন অপকৌশলে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া টাকা; এজন্য তারা কোটি কোটি টাকা নিজেদের সমর্থনের জন্য বিনিয়োগ করে থাকে।

একটু চিন্তা করলেই আপনি দেখতে পারবেন, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন, ডেসটিনি ইত্যাদি (মুফতীগণের ফতোয়া দেওয়ারও অনেক অনেক পরে) যেসব অন্যায়ের কারণে ধর-পাকড়ের সম্মুখীন হয়েছে। তাদের নামে মামলা হয়েছে। সে অন্যায়গুলো কি তারা ঐ বছরই করেছিল, নাকি তা তারা শুরু থেকেই করে আসছিল? প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে তাদের আগে থেকেই করে আসা অন্যায়ের জন্য ধর-পাকড় করতে এত বছর বিলম্ব করা হয় কেন? এর পেছনে থাকে আসলে টাকার খেলা। ই-ভ্যালিসহ এখন যারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তাদের সাথেও যে বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষের ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছেÑ এগুলোর পিছনেও সম্ভবত সে টাকার খেলাই কাজ করছে।

আমাদেরকেও ফতোয়ার কাজ করতে গিয়ে ঐসব প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কোটি কোটি টাকা যখন বিভিন্ন জায়গায় ভাগ-বাটোয়ারা হতে থাকে তখন যতদিন সম্ভব আর্থিক সুবিধা পাওয়া লোকেরা তাদের রক্ষা করার সব চেষ্টাই করে যায় এবং তাদের সম্পর্কে কেউ পদক্ষেপ নিতে বললে অথবা তাদের বিষয়ে শরয়ী ফয়সালা এলে এই অবৈধ সুবিধাভোগীরাই শুরুর দিকে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে ভিন্ন সমস্যাও আছে। কোনো জিনিস যখন উত্থানে থাকে তখন সাধারণ স্রোতের বিপরীতে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের জন্যই এর প্রতি আস্থা তৈরি করা কষ্টকর হয়। এক্ষেত্রে বিদ্যমান ঝুঁকিগুলোকে সামনে নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ও বিশ্বস্ততার সাথে কোনো রকম পক্ষ-বিপক্ষ চিন্তা না করে ইসলামী শরীয়তের উসূল-যাওয়াবেতের আলোকে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানবিশেষকে টার্গেট না করে আপনাকে মৌলিক বিষয়গুলো বলে যেতে হবে। আপনি যদি আপনার বর্ণনায় সুদৃঢ় থাকেন, আপনার কথা বলায় বিশ্বস্ত ও সুদৃঢ় থাকেন, উসূল ও যাওয়াবেতের পাবন্দ থাকেন তাহলে অনেক বেশি সময় আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে না। যারা আজকে আপনাকে স্রোতের বিপরীতে কথা বলার জন্য এটা সেটা বলেছে ক’দিন পর তারা মুখ লুকানোরও জায়গা পাবে না। অতীতে এমনটি বারবার ঘটেছে।

প্রশ্ন : আবারও আসি ই-ভ্যালি প্রসঙ্গে। প্রথমেই আমরা ইসলামের দৃষ্টিতে ই-ভ্যালির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইব। অর্থাৎ এতে কী কী সমস্যা আছে? বিস্তারিত জানতে চাই।

উত্তর : গত বছরের আগস্ট মাসে আমরা দেশের একটি ওয়েব নিউজ পোর্টালে ই-ভ্যালি সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছি।

এর আগে বলে দিতে চাই যে, এই ধরনের অতি চালাক ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আপনি একদিনে মতামত দিয়েই শেষ করতে পারবেন না। কারণ তারা প্রতিনিয়ত তাদের কলাকৌশল এবং তথাকথিত প্রোডাক্ট (বিপণন পদ্ধতি) পরিবর্তন করতে থাকে। আজ আপনি তাদের কোনো একটি প্রোডাক্ট সম্পর্কে মতামত দিলেন তো কাল দেখা যাবে তারা সেটি পরিবর্তন করে নতুন আরেকটি চালু করে দিয়েছে।

আর ই-ভ্যালির ক্ষেত্রে তো আপনি অভিনব বহু কিছুই পাবেন। তাদের ওয়েবসাইটে একরকম দেখবেন, ফেসবুক পেইজে অন্যরকম দেখবেন। আবার হঠাৎ ভেসে আসা কোনো ফ্ল্যাশ বিজ্ঞাপনে পাবেন ভিন্ন কিছু। আসলে এ ধরনের ভিত্তিহীন প্রতিষ্ঠানের পুঁজিই হল এজাতীয় চালাকি। তাই এককথায় বা একদিনে এদের শাখাগত বিষয়ে মতামত দিয়ে দিলেই কথা শেষ হয়ে যাবে না।

যাহোক, তবুও মৌলিক কিছু বিষয় উল্লেখ করছি।

ই-ভ্যালি-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের শরয়ী সমস্যার কোনো অন্ত নেই। যাদের ভিত্তিই গলতের উপর তাদের কারবারে অনেকক্ষেত্রেই আসলে শরীয়ার কোনো বালাই থাকে না। একটি উদাহরণ আমি দিচ্ছি। সেটা হল, আপনি যদি ইসলামের দৃষ্টিতে যাচাই-বাছাই করেন তাহলে আপনাকে শুরুতেই দেখতে হবে, যার বিষয়ে আপনি শরয়ী মতামত দিচ্ছেন তার কারবারটির মৌলিক চরিত্র কী? ই-ভ্যালি নিজেদেরকে অনলাইন বিপণন প্রতিষ্ঠান বলে প্রচার করে থাকে। অর্থাৎ ই-ভ্যালি হচ্ছে বিক্রেতা। সে পণ্য বিক্রেতা। আর সাধারণ জনগণ হচ্ছে ক্রেতা। ইসলামের পরিভাষায় এটাকে বলা হয় বাইউন (بيع)। এই বাইউন বা বেচাকেনার জন্য ইসলামে মোটাদাগের কিছু নীতি রয়েছে এবং শাখাগত অসংখ্য নীতিমালা রয়েছে। ইসলামী ফিকহের মুআমালাত অধ্যায়গুলোর হাজার হাজার পৃষ্ঠায় এগুলো সন্নিবেশিত রয়েছে।

আপনি যদি শুধু বেচাকেনা সংক্রান্ত মোটাদাগের নীতিগুলো দেখেন তাহলে আপনার কাছেও স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, ই-ভ্যালি ও এজাতীয় প্রতিষ্ঠান যা করে যাচ্ছে তা ইসলামের বেচাকেনার নীতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন, ইসলাম যেখানে বেচাকেনাকে বৈধ বলেছে সেখানে এর সাথে কিছু মৌলিক ও মোটা নীতিও দিয়ে দিয়েছে। একটু ব্যাখ্যা করে বললে, বেচাকেনায় দুটি পক্ষ থাকে। ক্রেতা-বিক্রেতা। দুটি উপাদান থাকে। পণ্য ও মূল্য। ইসলাম ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা এবং বিক্রেতা দুজনের স্বার্থ রক্ষা হয়Ñ এমন ব্যবস্থা দিয়ে দিয়েছে। এবং বেচাকেনা সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার কোনো সুযোগ রাখেনি; বরং বিক্রেতা যেন মূল্যের উপর পূর্ণ অধিকার পায় আর ক্রেতা পণ্যের উপর পরিপূর্ণ অধিকার পায় তা নিশ্চিত করেছে। ই-ভ্যালি এবং তাদের মতো প্রতিষ্ঠানে আপনি দেখবেন, এসবের কোনোটিরই গ্যারান্টি নেই। তাদের চটকদার যে কারবারগুলো সেখানে হয়তো আপনার পণ্য ঝুলে থাকবে, না হয় ই-ওয়ালেট নামে তাদের কাছে আপনার টাকা আটকে থাকবে। আপনি নিজেও জানবেন না যে, তাদের কাছে আপনার টাকা কতদিন আটকে থাকবে। এবং একই কারণে আপনার খরিদকৃত পণ্যের মূল্য যে কত সেটাও সুনিশ্চিত হতে পারবেন না। শরীয়তে যেটা আবশ্যকীয়।

তার মানে হল, সে আপনার সাথে পণ্য বিক্রির চুক্তি করলেও এখন অতিরিক্ত টাকার জন্য মূলা ঝুলিয়ে দিচ্ছে। আপনি হয়তো তথাকথিত ডিসকাউন্ট প্রাইজে ৮০ হাজার টাকার পণ্য ৫০ হাজার টাকায় কিনেছেন এবং তাদেরকে টাকা পরিশোধও করে দিয়েছেন।

মাস দুয়েক পরে হয়তো তারা বলল, স্যার! আমরা তো আপনাকে পণ্যটি দিতে পারছি না। আপনি আমাদের কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকার চেক নিয়ে যান। সাধারণ চোখে তো মানুষ এটার প্রশংসাও করতে পারে যে, তারা তো আপনার থেকে টাকা নিয়ে পণ্য না দিতে পারলেও বেশি টাকা ফেরত দিচ্ছে। কিন্তু আমি এখানে বললাম, `মূলা ঝুলিয়ে দেওয়া। কারণ এটি আরেকটি ধাপ্পাবাজি। (ইসলামের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট সুদ ও হারাম। সে প্রসঙ্গে এখন না-ই গেলাম।)

আসলে এ ধরনের লোভ দেখিয়ে তারা গণমানুষকে আরো ধোঁকা ও বিভ্রান্তিতে ফেলে দ্রুত তাদের তহবিল বড় করার রাস্তায় মেতে রয়েছে। এমনি এমনিই তো আর তাদের হাতে মানুষের তিন-চার শত কোটি টাকা পাওনা দাঁড়ায়নি।

তো আমি যে কথা বলতে চাচ্ছি তা হল, এদের এখানে না আপনার পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে, আর না পুরো মূল্য পরিশোধ করে দেওয়ার পরও তাতে আপনার নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

আর মূল্যের বিষয়ে যদি যাই, তাহলে সেখানেও একজন ক্রেতা হিসেবে ই-ওয়ালেটের ঝামেলায় আপনি আটকে থাকবেন। একটি পণ্যের জন্য আপনি এখন যত টাকা পরিশোধ করেছেন তা দিয়ে আপনি পণ্যটি আদৌ পাবেন কি না? যদি পেয়েও যান তবে ভবিষ্যতে আর কী কী সুবিধা পাবেনÑ সেগুলোও তারা ঝুলিয়ে রাখবে। সেগুলো তারা নতুন নতুন প্রোডাক্ট (বিপণন পদ্ধতি)-এর বেড়াজালে আটকে রাখবে। তো এ ধরনের কারবারে গোড়া থেকেই ইসলামের ``বাইউন’’ তথা বেচাকেনার মৌলিক নীতি উপেক্ষিত থাকে। এগুলো থেকে সাধারণ মুসলমানদেরকে দূরে থাকতে বলার জন্য ছোটখাটো ত্রুটিগুলো দেখার প্রয়োজন হয় না।

এছাড়া ই-ভ্যালিতে তো বিভিন্ন ক্ষেত্রে রিবা (সুদ), আলগারার الغَرَر (অস্পষ্টতা) ও বাইয়ে সালাম-এর মৌলিক নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘনের বিষয়গুলো খুবই পরিষ্কার। যেগুলোর প্রায় প্রত্যেকটিই একটি কারবার ফাসেদ তথা নাজায়েয হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

প্রশ্ন : মনে হচ্ছে হুজুর তাদের সম্পর্কে বেশি বলতে চাচ্ছেন না।

উত্তর : হাঁ। আসলে এদের কারবার এতই স্পষ্ট। এ কারবারগুলো শরীয়া থেকে এত দূরে যে, এখানে সাধারণ মুসলমানদের জন্য লেখায় তাদের ত্রুটিগুলোকে লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে নিয়ে আসার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

আমরা আগেই বলেছি যে, কারবারগুলোর মূল ভিত্তিই গলতের উপর প্রতিষ্ঠিত। এখন যদি তাদের দু-একটি প্রোডাক্ট (বিপণন পদ্ধতি) জায়েযভাবেও করে তবুও হালাল-হারাম বেছে চলা মুসলমানদের জন্য তাদের থেকে পণ্য নেওয়া কিছুতেই সঙ্গত হবে না। কারণ এর দ্বারা শরীয়া নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান করা হবে। যা التعاون على الإثم والعدوان তথা গুনাহ ও অন্যায় কাজে সহযোগিতা’র আওতায় পড়ে।

আমি তো বলতে চাই যে, ই-ভ্যালি যখন ১০০%-১৫০% ক্যাশব্যাক, ৭০-৮০-৯০% পর্যন্ত ডিসকাউন্ট ও এজাতীয় বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করেছিল তখনই নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের তাতে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন ছিল। তখনই তাদেরকে থামিয়ে দেওয়া আবশ্যক ছিল। মূলত গণমানুষ যদি সচেতন হতো তাহলে তা-ও দরকার ছিল না। কারণ তখন কেউ তাদেরকে বিশ^াসই করত না। কিন্তু এদেশের জনগণের শিক্ষার হারের নি¤œমুখিতা এবং হুজুগ ও গুজবে কান দেওয়ার ব্যাপক প্রবণতার বিষয়গুলো যদি সরকারি কর্তৃপক্ষের জানা না থাকে তাহলে তারা এসব নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে? আজকে তাদের সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদন করছে এবং বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক তাদের বিষয়ে তদন্তের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু যদি সেই শুরুর দিকের ই-ভাউচার ও ধামাকা ক্যাশব্যাকের সময়ই ওদের টুঁটি চেপে ধরা হত তাহলে কি গণমানুষের শত শত কোটি টাকা এখন ঝুঁকিতে পড়ত?

প্রশ্ন : লস দেওয়ার জন্যই কি এটাকে নাজায়েয বলছেন? আমরা তো শুনেছি, আন্তর্জাতিক বিপণন প্রতিষ্ঠান আমাজনও শুরুতে মোটা অংকের ব্যবসায়িক লসের সম্মুখীন হয়েছিল। আর এখন তো তারা বিশে^র সেরা কোম্পানি।

উত্তর : আপনাকে কে বলল যে, ই-ভ্যালি লস দেওয়ার কারণে তাদের কারবারকে অবৈধ বা অস্বাভাবিক বলা হচ্ছে? এখানে আসলে লোকসানের প্রশ্ন না। সে লোকসান দিচ্ছে, না লাভ করছে এটা মূল কথা নয়। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবসায় কখনও লোকসানও হতে পারে। আপনি অনলাইন ব্যবসার কথা টেনে আনছেন কেন? সাধারণ ব্যবসায়ও লাভ-লস দুটোই হতে পারে। ই-ভ্যালির লোকসান হয়ে থাকলে বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটা কোনো দূষণীয় বিষয় নয়। বড় বড় কোম্পানিগুলোও লোকসান দিয়ে থাকে। এটা যদি ই-ভ্যালির সাফাইয়ের জন্য বলা হয়ে থাকে তাহলে এটি আরেকটি ধাপ্পাবাজি।

কারণ এখানে লোকসান মূলকথা নয়; বরং ব্যবসা পদ্ধতিটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেখানে আপনি গ্রাহকদের সাথে স্বচ্ছতা রাখছেন না। আপনাকে টাকা দিয়ে অসংখ্য গ্রাহক অপেক্ষায় বসে আছে। আপনি নিত্য-নতুন কলাকৌশল অবলম্বন করে মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন আর বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিকভাবে তা ব্যয় করছেন, যা পরবর্তীতে আর সমন্বয় করতে পারছেন না। আপনি নিজেই জানেন যে, এভাবে কখনও গ্রাহক ও ব্যবসার পার্টনারদের সাথে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব নয়। এটি হল সঠিক ব্যবসায়িক কৌশলের অভাব এবং গলত পদ্ধতিতে অর্থ উপার্জন ও রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার হীন লোভের ব্যর্থ ফল। লোকসানের বিষয়টি এখানে গৌণ।

আপনার পাওনাদার যখন আপনার কাছে তার পাওনা চায় তখন নিজে দশ কেজি ওজনকে শত কেজি ওজন প্রচার করছেন আর বলছেন, আমার কাছে টাকা না থাকলেও আমার মার্কেট ভ্যালু আছে। এগুলো প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল।

প্রশ্ন : সাধারণ মানুষের জন্য কিছু বলবেন?

উত্তর : বলার তো আছে। কিন্তু কেন জানি আমাদের দেশের লোকদের সাথে হুজুগ শব্দটি জড়িত হয়ে আছে অনেক আগে থেকেই। আমরা অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে বাস্তবতাকে মানতে চাই না; বরং শর্টকাটে বেশি সুবিধা পাওয়ার কথা শুনলে হুমড়ি খেয়ে পড়া আমাদের কিছু লোকের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি ভোক্তা ও ক্রেতাসাধারণ সচেতন ও সতর্ক থাকে তাহলে কিছুদিন পর পর এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠতে পারে না।

এজন্য কোনো অস্বাভাবিক কারবার দেখলে শুরু থেকেই আমরা সাধারণ মুসলমানদেরকে তা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানাব।

 [সাক্ষাৎকার গ্রহণে : মাওলানা আব্দুল্লাহ ফাহাদ ও মাওলানা তাহের]