মুহাম্মাদ মুরশিদুল আলম - তারাগঞ্জ, রংপুর

প্রশ্ন

 

আমি প্রায় এক বছর ধরে একটি কিতাবের তালাশে থেকে ব্যর্থ হয়ে গেছি। পরিশেষে আপনাদের শরণাপন্ন হলাম। কিতাবটির নাম হচ্ছে কিতাবুল অসিয়ত আমি জামাতে কাফিয়ায়  পড়ার  সময়  উক্ত  কিতাবের নাম এবং গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত হয়েছি। অর্থাৎ দরসের কিতাব তালীমুল মুতাআল্লিম-এর মধ্যে পড়েছি। সেখানে বলা হয়েছে যে, হযরত ইমামে আযম আবু হানীফা রাহ.-এর একটি কিতাব আছে উপদেশমূলক কিছু বাণী সম্পর্কে। আবার সেখানে বলা হয়েছে, কিতাবটি যে খুজবে সে পাবে। এখন আপনাদের কাছে আছে কি না তা জানাবেন। যদি না থাকে তাহলে কোথায় পাওয়া যেতে পারে তা জানাবেন। আর যদি থাকে তাহলে তাঁর মূল্য কত তাও জানাবেন। পরবর্তীতে আমি আপনাদের কাছে ফোন করে ডাকযোগে নিব ইনশাআল্লাহ।


 

উত্তর

 

কিতাব তালাশের আগ্রহের জন্য আপনাকে  মোবারকবাদ। 

আলওয়াসিয়্যাহ নামে ইমাম আবু হানীফা রাহ. থেকে একাধিক রিসালা বর্ণিত রয়েছে। এসব ওয়াসিয়্যাতের মধ্যে একটি হলো, ইউসুফ ইবনু খালিদ আস-সামতী এর উদ্দেশ্যে আবু হানীফা রাহ. এর ওয়াসিয়্যাত। এটির কথাই তালীমুল মুতাআল্লিম কিতাবের উদ্ধৃত স্থানে বলা হয়েছে। এওয়াসিয়্যাতটির পূর্ণ পাঠ অনেক মুসান্নিফ তাঁদের কিতাবে নকল করেছেন। যেমন: মুয়াফ্ফাক ইবনু আহমদ আলমক্কী (মৃত্যু ৫৬৮হি:) তাঁর কিতাব মানাকিবুল ইমাম আজম -এ (২/১০৭-১০৭, ২৫তম অধ্যায়) এবং ইবনুল বাযযাযী আল কারদারী (মৃত্যু ৮২৭ হি.) তাঁর কিতাব মানাকিবুল ইমাম আজম-এ (২/৮৯-৯১ প্রথম অধ্যায়, সপ্তম পরিচ্ছেদ)। এ ওয়াসিয়্যাতটি এবং আবু হানিফা রাহ. থেকে বর্ণিত ভিন্ন আরো চারটি ওয়াসিয়্যাত একত্রে মাওলানা মুহাম্মাদ আশেক ইলাহী বুলন্দশহরী রাহ. এর উর্দূ তরজমা ও তারতীব সহকারে মাকতাবাতুন নূর হিন্দুস্তান থেকে ওয়াসায়া ইমাম আজম নামে ছেপেছে। আপনি এর একটি নুসখা সংগ্রহ করতে পারেন।  

 

শেয়ার লিংক

উসমান গণী - মধুপুর, টাঙ্গাইল

প্রশ্ন

(ক) হুযুর আলমাদখাল ইলা উলূমিল হাদীসিশ শারীফ কিতাবের ১৯০ নং পৃষ্ঠায় ইমাম ফকীহ মুহাম্মাদ যাহেদ বিন হাসান কাউসারী রাহ. এর মাকালার টীকায় আপনি লিখেছেন-

ويلاحظ هنا أن الكوثري رحمه الله تعالى أوصى بتدريس الأصول الستة ونحوها بطريق السرد على طبق الرواية، وهو أحد الطرق الثلاثة المتعارفة لتدريس الحديث ... 

এখানে বর্ণিত তিনটি তরিকার ব্যাখ্যা একটু বিস্তারিতভাবে জানতে চাই।

(খ) কিতাবসমূহের হাশিয়ায় দেখা যায় আলোচনা শেষ হলে ١٢ চিহ্ন দিতে। এ চিহ্নের অর্থ কী?


উত্তর

(ক) হাদীসের কিতাবসমূহ দরসদানের উপরোক্ত তিনটি পদ্ধতি সম্পর্কে ইতোপূর্বে প্রশ্নোত্তর বিভাগে লেখা হয়েছে। তালিবানে ইলম: পথ ও পাথেয় বইয়ের ৩৭৮ পৃষ্ঠার ৪২ নং প্রশ্নের উত্তর দ্রষ্টব্য। তারপরও কিছু কথা সংক্ষেপে এখানে পেশ করছি।

طريق السرد -এর মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটি যথা, কিতাবের বিশুদ্ধ পাঠ অর্জন করা এবং কিতাবের মুসান্নিফ পর্যন্ত মুত্তাসিল সনদ হাসিল করা। এজন্য কিতাবটি পড়া ও শোনা হবে এমন কোনো উস্তাযুল হাদীসের কাছে যিনি কিতাবের আমানত গ্রহণ করেছেন স্বীকৃত কোনো পদ্ধতিতে এবং মুসান্নিফ পর্যন্ত মুত্তাসিল সনদের মাধ্যমে। আর এই পড়া হতে হবে কিতাবের সহীহ কোনো নুসখা থেকে। উস্তায নুসখার ইখতেলাফ বর্ণনা করবেন, নাসিখ এবং মুদ্রণের ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে সতর্ক করবেন। এ পদ্ধতিতে হাদীসের সনদ সংক্রান্ত বিশদ আলোচনা, হাদীসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং ফিকহী আলোচনা ও পর্যালোচনা উদ্দেশ্য নয়। তবে কঠিন শব্দ ও বাক্যের অর্থ বলা যেতে পারে। প্রয়োজনে পুরো হাদীসের অর্থ বলা যায়। পাশাপাশি পঠিত হাদীসে উম্মতের প্রতি যে শিক্ষা ও নির্দেশনা রয়েছে তা আলোচনা করা যায়।

طريق البحث والحل -এ উপরোক্ত বিষয় দুটির পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় যোগ করতে হয় যথা : প্রয়োজনের সময় সনদ সম্পর্কে আলোচনা করা, মুশকীলুল হাদীসের শরাহ পেশ করা এবং মুখতালিফুল হাদীসের সমাধান পেশ করা। এই আলোচনাগুলো করতে হবে ফন্নী উসূল ও আদব অনুসারে প্রয়োজন পরিমাণ। সুদীর্ঘ ও লাগামহীন আলোচনা কাম্য নয়।

طريق التعمق والإمعان হলো হাদীসের সনদ ও মতন সম্পর্কে প্রয়োজনাতিরিক্ত দীর্ঘ ও অড়ম্বরপূর্ণ আলোচনা। যেমন, প্রয়োজন ছাড়াই সনদের প্রত্যেক রাবীর জীবনী আলোচনা। মতনের কোনো শব্দের দীর্ঘ লুগাবী তাহকীক ও ইশতেকাক বয়ান করা। সংশ্লিষ্ট ফিকহী মাসআলা আলোচনা করতে গিয়ে মাসআলার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার দীর্ঘ ফিরিস্তি পেশ করা। প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে বিভন্ন নুকতা, কিসসা-কাহীনি ও ঘটনা বর্ণনা করা। হাদীসের কিতাবকে সামনে রেখে অতি দূরবর্তী সম্পর্কের ভিত্তিতে এ ধরণের অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় তাকরীর সমীচীন নয়।

হাদীসের কিতাব রেওয়ায়াত ও দরস দানের ক্ষেত্রে তরীকুস সরদ হলো উত্তম পদ্ধতি। এই পদ্ধতিকে অনুসরণ করেছেন মাশায়েখে হাদীস ও মুহাদ্দিসীন। মুসনিদুল হিনদ হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ রাহ. এই পদ্ধতিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে আমাদের উপমহাদেশের নেসাব ও নেজামের কিছু দুর্বলতার কারণে পরবর্তী আকাবিরগণ অর্থাৎ আকাবিরে দেওবন্দ তরীকুল বাহছ-এর রীতিকে অনুসরণ করেছেন। কিন্তু তরীকুত তাআম্মুক আকাবিরদের অনুসৃত রীতি কখনো ছিলো না। যা হোক, হাদীসের দরসের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিই অবলম্বন করা হোক না কেন সবক্ষেত্রে যা বলা হবে তা ইতকানের সঙ্গে বলতে হবে এবং সঠিক কিনা তা নিশ্চিতভাবে জেনে বলতে হবে।

দরসে হাদীসের আলোচিত তিনটি পদ্ধতির ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন সম্পর্কে শাহওয়ালিউল্লাহ রাহ. তাঁর একাধিক কিতাবে আলোচনা করেছেন। যেমন-

১. ইনসানুল আইন ফী মাশায়িখিল হারামাইন পৃষ্ঠা ১৯৪-১৯৫

২. আনফাসুল আরিফীন পৃ. ১৮৬-১৮৭ ৩. ইতহাফুন নবীহ ফীমা ইয়াহতাজু ইলাইহিল মুহাদ্দিসু ওয়াল ফকীহ। এছাড়া দেখতে পারেন মাওলানা মানাযের আহসান গীলানীর : বররে সগীর পাক ও হিন্দ মে মোসলমানোকা নেযামে তালীম ওয়া তারবীয়ত (১/২৪০-২৪৬ অধ্যায় : দরসে হাদীস কী ইসলাহ)

(খ) কোনো কোনো উস্তাযের মুখে শুনেছি হাশিয়ার শেষে (١٢) সংখ্যাটি লেখা হয় হাশিয়ার শেষ সীমারেখা বুঝানোর জন্য। এটি حد শব্দের গাণিতিক মান। অর্থাৎ এটি হা এর গানিতিক মান :৮ এবং দাল এর গাণিতিক মান : ৪ এভাবে ৮+৪= ১২ হয়।

শেয়ার লিংক

মুহাম্মাদ কামরুল হাসান - জামিয়া রাহমানিয় আরাবিয়া মুহাম্মাদপুর, ঢাকা-১২০৭

প্রশ্ন

মুহতারাম আমীনুত তালীম সাহেব (হাফিযাহুল্লাহ) আমি উলূমুল হাদীস ২য় বর্ষের একজন তালিবে ইলম। উলূমুল হাদীসে ফন্নী ইসতিদাদ পয়দা হওয়ার জন্য একজন তালিবে ইলম কোন উসলূবে মেহনত করবে? এই ফনের ইসতিদাদ পয়দা হচ্ছে এর আলামাত-ই বা কি? এই বিষয়ে হযরতের মাশওয়ারা কামনা করছি।


 

উত্তর

যে কোনো বিষয়ে ফন্নী ইস্তেদাদ ও ইখতেসাস অর্জনের জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরী যথা : ১. ফনের মাহের কোনো উস্তাযের বিশেষ ও দীর্ঘ সোহবত। ২. সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুহাক্কিক ও মুতকিন আহলে ফনের তাসনিফ মুতালাআ অব্যাহত রাখা। বিশেষত মুতাকাদ্দিমীন আহলে ফনের তাসনীফ মুতালাআ করা (এই মুতালাআ হতে হবে তামযীয, নাবাহাত এবং বসীরতের সাথে) অন্যথায় কেবল মালুমাত বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু ফনের ফাকাহাত পয়দা হবে না। ৩. উপরোক্ত বিষয়দুটি ছিলো কাসবী তথা  চেষ্টা ও মেহনতের মাধ্যমে অর্জিতব্য বিষয়। এর সাথে যোগ হতে হবে ওহাবী ইলম। এর জন্য প্রয়োজন তাকওয়া-তাহারাত এবং রুজু ইলাল্লাহ।

মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া থেকে প্রকাশিত আল মাদখাল ইলা উলূমিল হাদীসিশ শরীফ-এ উলূমুল হাদীসের মুতালাআ ও তামরীন সংক্রান্ত উসূলী কথা আলোচান করা হয়েছে। আপনি তা মুতালাআ করে থাকলেও পুনঃবার দেখে নিতে পারেন।

স্মরণ রাখতে হবে, ফন্নী ইস্তেদাদ ও ইখতেসাসের বিভিন্ন মরতবা ও স্তর রয়েছে। এর একটি স্তর হচ্ছে আহলে ফনের আলোচনা-পর্যালোচনা শরহে সদরের সাথে বুঝতে পারা। ফন্নী ইখতেসাসের বড় একটি আলামত হচ্ছে, ফনের কোনো বিষয়ে শক, শুবাহ এবং ইশকাল দেখা দিলে তার কাবেলে ইতমিনান ও প্রশান্তিদায়ক জবাব দিতে পারা। এছাড়াও এ বিষয়ে আহলে ফন আলেমদের শাহাদাতও বড় প্রমাণ ও সনদ হিসেবে বিবেচ্য।

শেয়ার লিংক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক - সিলেট

প্রশ্ন

তালীমী মুরববী কি সকল ছাত্রের জন্য প্রয়োজন? আমাদের জামিআয় এ বিষয়ে তেমন আলোচনা হয় না। জামিআয় পাক্ষিক তালীমী নসীহত হয়, ছাত্রাবাসেও আমাদেরকে জমা করে তালীমী নসীহত করা হয়, কিন্তু এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু শুনি না। আসলেই কি বিষয়টি এ রকম? নাকি আমার বুঝার ভুল? জানিয়ে বাধিত করবেন। তালিবে ইলম হিসেবে বেআদবী হলে ক্ষমা করবেন।


উত্তর

আসাতিযায়ে কেরামের সঙ্গে স্থায়ী ও দৃঢ় সম্পর্ক রাখা এবং তাঁদের দীর্ঘ ও বিশেষ সোহবত গ্রহণ করা ইলমের গুরুত্বপূর্ণ আদব। উস্তাযের সঙ্গে কেবল দরসের সম্পর্ক বা সাময়িক ও নিয়মসর্বস্ব সম্পর্ক যথেষ্ট নয়। দৃঢ় সম্পর্ক অর্থ হল, সম্পর্কটি কেবল দরসগাহের সম্পর্ক না হওয়া, দরসের বাইরে এবং উস্তাযের নিকট থেকে চলে আসার পর কর্মজীবনেও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, নির্দেশনা গ্রহণ করা, ইলমী সমস্যাবলির সমাধানের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হওয়া এবং দুআ লাভ করা ইত্যাদি বিষয়ে একজন তালিবে ইলমকে সবসময়ই সজাগ-সচেতন থাকা উচিত।

তালীমী মুরববী গ্রহণ করা ভিন্ন কোনো বিষয় নয়; বরং এটি ইলমের উপরোক্ত আদবেরই অংশ। অর্থাৎ উস্তায ও মুরববীর সাথে পরামর্শ ও নির্দেশনা গ্রহণের সম্পর্ক রাখা। উস্তাযকে মুশীরে হায়াত হিসেবে গ্রহণ করা। নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে না করা; বরং নিজেকে উস্তাযের হাতে সোপর্দ করা। এটা হচ্ছে খোদরায়ী থেকে নিরাপদ থাকার সহজ উপায়। আমাদের পূর্বসূরী আকাবির এই রীতির উপর নিষ্ঠার সাথে যত্নবান ছিলেন। আদাবুল ইলম বিষয়ক কিতাবসমূহে এই আদবটির গুরুত্ব। প্রয়োজনীয়তা এবং উপকারিতা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।

যাহোক আপনার সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে সম্ভবত আপনার মাদরাসার তালীমী ও তারবিয়াতী মজলিসে তালীমী মুরববী শব্দটি ব্যবহার না হওয়ার কারণে। অন্যথায় উস্তাযদের সঙ্গে নিজেদেরকে যুক্ত রাখা, আসাতিযায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করে কাজ করা এবং তাঁদের ছায়া ত্যাগ না করার ব্যাপারে তো অবশ্যই বলা হয়ে থাকে। তাহলে তো এটা কেবল শব্দের পার্থক্য।

আর যদি আপনার সংশয়ের কারণ হয় সুনির্দিষ্টভাবে কোনো একজন উস্তায ও মুরববীকে মূল মুশীর ও তালীমী মুরববী হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে তাহলে বলব, এই নির্দিষ্টকরণ তো কেবল সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আমল করার সুবিধার্থে। অন্যথায় সকল উস্তায ও মুরববীর সাথে মুহাববত ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক রাখবে এবং সকল উস্তাযের থেকেই

ইস্তেফাদাহ অব্যাহত রাখবে। এ তো নির্দিষ্ট কোনো শায়খে কামেল ও পীরকে নিজের ইসলাহী মুরববী হিসেবে গ্রহণ করা বা নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মতো।

শেয়ার লিংক
advertisement
advertisement