জুমাদাল উলা-জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪২   ||   জানুয়ারি ২০২১

আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রাহ. : জীবন ও আদর্শ

মাওলানা খন্দকার মনসুর আহমদ

দেশবরেণ্য আলিমেদ্বীন, হাজার হাজার আলিমের পরম শ্রদ্ধেয় উস্তায আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী আখেরাতের জীবনে চলে গেলেন গত ২৭ রবিউস সানি ১৪৪২ হি., ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ রবিবার। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আল্লামা কাসেমী রাহ. তাঁর আলোকোজ্জ্বল  কর্ম ও  উত্তম গুণাবলির কারণে অগণিত মানুষের হৃদয়ের গভীরে স্থান করে নিয়েছেন। ইন্তেকালের পর তাঁর গড়া প্রতিষ্ঠান জামিয়া মাদানিয়া বারিধারায় আনা হলে শেষবারের মত তাঁকে একনজর দেখবার জন্য শোকাহত মানুষের ভিড় ও ব্যাকুলতা ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও করুণ। সুশৃঙ্খলভাবে লাইন ধরে হৃদয়ের মানুষটিকে শেষবারের মত একনজর দেখবার এই ধারা অব্যাহত থাকে সারারাত। জীবদ্দশায় যেমন তাঁর উজ্জ্বল চেহারায় নূর খেলা করতইন্তেকালের পরও তেমন নূরানী ছিল তাঁর চেহারা। পরের দিন শীতের সকালে বাইতুল মুকাররমে তাঁর জানাযায় ধর্মপ্রাণ জনতার ঢল নামে। দেশের অসংখ্য আলিম ও ধর্মপ্রাণ মানুষ তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর অগণিত ছাত্র কেঁদে কেঁদে অশ্রু ঝরাতে থাকেন। জানাযার পূর্বের রাতে, জানাযাপূর্ব আলোচনায় এবং দাফনের সময় অসংখ্য মানুষের বেদনাকাতর আহাজারিতে বার বার এক করুণ আবহ তৈরি হয়। বায়তুল মুকাররম মসজিদ এবং তার আশপাশ জুড়ে ছিল কাসেমীপ্রেমিক জনতার ঢল। এমন গভীর ভালবাসা আর বেদনা প্রকাশের এমন দৃশ্য সাধারণত দেখা যায় না।

অনেকের অভিব্যক্তি ছিল ‘পরিবারের আপনজনদের ইন্তেকালেও এমন বেদনা অনুভব করিনি।’ ইন্তেকালের পর বেফাকের সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল হাসান দামাত বারাকাতুহুম জামিয়া মাদানিয়ার মসজিদে রাতের বেলা ভক্তদের উদ্দেশে যে বয়ান করেন, তাতে তিনি বলেন- ‘দেশের প্রতিটি আলিম ও তালিবে ইলম তাঁকে ভালবাসত।’

সারা দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণসহ নানা স্তরের সুধী নেতৃবৃন্দ ও ধর্মপ্রাণ জনতা তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়া শীর্ষ আলিমগণও তাঁর জানাযায় শরীক হতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন। জানাযাপূর্ব আলোচনায় কয়েকজন শীর্ষ আলেম স্মৃতিচারণামূলক বক্তব্যে তাঁর উত্তম গুণাবলি ও নানাবিধ অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তাদের বক্তব্যে যে মূল অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে তা হল-আমরা এক মহান ব্যক্তিত্ব ও মনীষীকে হারিয়েছি। দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরার সদস্য মুফতী শফিকুল ইসলাম কাসেমী বলেন, ‘আমি দারুল উলূম দেওবন্দ ও গোটা হিন্দুস্তানের পক্ষ থেকে হযরতের মৃত্যুতে  তা‘যিয়াতে  মাসনূনাহ  (মাসনূন সমবেদনা) জ্ঞাপন করতে এসেছি, তিনি একটি আরবী কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, ‘বহুকাল পেরিয়ে গেলেও মায়েরা এমন সন্তান জন্ম দিতে পারে না।’

ইলম, তাকওয়া, হকের উপর অবিচলতা, ইখলাস, সত্যের পথে  আপোসহীনতা, হক ও হক্কানিয়াতের প্রতিষ্ঠা এবং আদর্শ মানব গঠন ইত্যাদি গুণাবলিতে যে অনন্য উচ্চতায় তিনি পৌঁছেছিলেন বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যে তা স্পষ্ট ব্যক্ত হয়। এমন মহান  আলিমে দ্বীনের মৃত্যু দেশ ও জাতির জন্য অনেক বড় শূন্যতা এবং অনেক বড় বেদনাদায়ক ব্যাপার। তাঁর বিচিত্র কর্মচাঞ্চল্য, হৃদয়ছোঁয়া আখলাক এবং আলোকোজ্জ্বল অবদান ও গুণাবলি  তাঁকে চির স্মরণীয় করে রাখবে-এমন অভিব্যক্তিও ফুটে ওঠে তাঁদের বক্তব্যে।

দুই।

তিনি ছিলেন দেশবরেণ্য আলিমেদ্বীন, শাইখুল হাদীস, প্রাজ্ঞ ইসলামী রাজনীতিবিদ ও অধ্যাত্ম্য-জগতের একজন শায়েখ। পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব, নানাবিধ দ্বীনী অবদান ও নীতিনিষ্ঠার কারণে দেশের আলিম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ তাঁকে আন্তরিকভাবে ভালবাসতেন। তিনি ছিলেন আখলাকে নববীর সাধক। হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সোহবতে যারা যাতায়াত করতেন তাদের প্রত্যেকেরই মনে হতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। আল্লামা কাসেমীর মাঝে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর  এই  স্বভাব দান করেছিলেন। ভক্তদের সবার কাছেই মনে হতো- ‘হযুর আমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন।’ তাঁর সান্নিধ্যে কেউ অল্প সময়ের জন্য এলেও তার ব্যক্তিত্ব ও উত্তম আখলাকের সম্মোহনে সে বিশেষভাবে প্রভাবিত হত এবং তাঁর ভালবাসা অন্তরে নিয়ে ফিরে যেত। আর তাঁর শিষ্যত্ব লাভকারী উলামা ও তালিবে ইলমগণ তো তাঁর জন্য নিবেদিতপ্রাণ। সে কারণে তাঁর অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার পরবর্তী দিনগুলোতে বহু তালিবে ইলম দিন-রাত এবং তাহাজ্জুদের সময়ে  আল্লাহর দরবারে একান্ত রোনাজারিতে মশগুল ছিলেন।

তিনি ছিলেন আকাবির-আসলাফের নমুনা। বরেণ্য মুহাদ্দিস ও ফকীহ হযরত মাওলানা আবদুল মালেক -হাফিযাহুল্লাহু তাআলা ওয়া রা‘আহু-তাঁকে  অভিহিত করেন  ‘নমুনায়ে আসলাফ’ বলে। মাসিক আলকাউসারে (যিলহজ্ব ১৪৪০ হি./আগস্ট ২০১৯) ‘তালিবে ইলমদের প্রতি জরুরি হেদায়াত’ শিরোনামে প্রকাশিত কাসেমী রাহ.-এর বয়ানের ভমিকা-বক্তব্যে তিনি বলেন- “এদেশের উপর, বিশেষ করে উলামা-তলাবার উপর হুযূরের বহুত ইহসান। চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর যাবৎ এদেশে ইলমী মাহোল টুটাফাটা যদ্দুরই আছে আমাদের হাওসেলা হিসেবে (মানে, হাসিল করার জন্যও তো যরফের দরকার। আমাদের যরফ হিসেবে যদ্দুর আছে), তার পিছনে যে দু-চারজন বুযুর্গের সবচে বড় অবদান, হুযূর তাঁদের সারে ফেহরেসত।”

আল্লামা কাসেমী রাহ. ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের মানস সন্তান। তাঁর হৃদয় ছিল  উদার। চিন্তা-চেতনা ছিল বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন। ধমনিতে প্রবাহিত ছিল হকের সুমহান চেতনা। মানবতাবোধ, সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও নীতিপরায়ণতা ছিল তাঁর চরিত্রের অলঙ্কার। সে কারণে দেশের আলিম সমাজের পাশাপাশি সচেতন ঈমানদার জনসাধারণও তাঁর প্রতি বিশেষ আস্থা ও ভালবাসা পোষণ করেন। মহান আল্লাহ তাঁকে সাধারণ-বিশিষ্ট সবার মাঝেই বেশ গ্রহণযোগ্যতা দান করেছেন। সেকারণে হযরতকে একইসাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে এবং বহুসংখ্যক দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকত্ব করতে হয়েছে। অন্তরের গভীরে সর্বদা লালন করতেন ইলমে ওহীর প্রতি গভীর আজমত ও ভালবাসা। তিনি বারবার বলতেন, ‘ইলমে ওহী ব্যতীত মানুষের মধ্যে প্রকৃত মানবতাবোধ আসতে পারে না।’ এই ইলমে ওহীর শ্রেষ্ঠত্বের কথা তিনি জোরালো কণ্ঠে আজীবন প্রচার করে গেছেন

তিন।

এই মহান মনীষী ১৯৪৮ সালের ২১ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ থানার ‘চড্ডা’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, মনযোগী ও পরিশ্রমী ছাত্র। নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করে এবং লেখাপড়ার  বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বাবার আন্তরিক ইচ্ছার ফলে তিনি বিশ্ব বিখ্যাত দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করেন। সে বছর দেওবন্দে ভর্তির সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় তিনি সাহারানপুর জেলার একটি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে জালালাইন জামাতের পড়া সমাপ্ত করে পরের বছর দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। মেধা ও অধ্যাবসায়ের ফলে তখনই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি সেকালের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা সায়্যিদ ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদীর কাছে বুখারী শরীফ পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। হযরতের স্নেহভাজন হিসাবেও তিনি সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। দাওরায়ে হাদীসের পর তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আরো তিন বছর তাখাস্সুস তথা বিশেষজ্ঞতা অর্জনে  মশগুল থাকেন। তাঁর শিক্ষকগণের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন-মাওলানা সায়্যিদ ফখরুদ্দীন আহমদ মুরাদাবাদী রাহ., কারী তায়্যিব রাহ., ওয়াহিদুয্যামান কিরানবী রাহ., শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহ., মুফতী মাহমূদ হাসান গাঙ্গূহী রাহ., মাওলানা শরিফুল হাসান রাহ., মাওলানা নাসির খান রাহ., মাওলানা আব্দুল আহাদ রাহ., মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মিরী রাহ., মাওলানা হুসাইন বিহারী রাহ., মাওলানা নাঈম ছাহেব রাহ., মাওলানা সালিম কাসেমী রাহ., মাওলানা সাঈদ আহমদ পালনপুরী রাহ.।

চার।

সুদীর্ঘ সাতাশ বছরের ছাত্র জীবন পার করে তিনি তাঁর উস্তায মাওলানা আব্দুল আহাদের পরামর্শে মুজাফ্ফর নগরে অবস্থিত মুরাদিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। এটি দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবী রাহ.-এর প্রতিষ্ঠিত একটি মাদরাসা। সেখানে এক বছর শিক্ষকতা করার পর তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে শরীয়তপুর জেলার নন্দনসার মুহিউস্ সুন্নাহ মাদরাসার শায়খুল হাদীস এবং মুহতামিম হিসেবে  দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ১৯৭৮ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ফরিদাবাদ জামিয়ায় চার বছর অত্যন্ত সুখ্যাতির সাথে শিক্ষকতা করেন। এসময়  তাঁর ছাত্র গড়ার বিষয়টি বিশেষভাবে মানুষের সামনে আসে। তারপর ১৯৮২ সালে  ঐতিহ্যবাহী জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা’য় মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন এবং তিরমিযী শরীফের অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন। এসময়ে তাঁর পাঠদানের খ্যাতি  চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মালিবাগ জামিয়ায় ৬ বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৮৮ সাল থেকে ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত  তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত দুটি জামিয়ার শায়খুল হাদীস ও মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। এর একটি হল, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা আর অপরটি হল, টঙ্গির ধউর এলাকায় অবস্থিত জামিয়া সুবহানিয়া মাহমুদনগর। ১৯৮৮ সাল থেকে তিনি বুখারীর দরসদান শুরু করেন এবং ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত এই খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যান।

পাঁচ।

 হযরতের যে গুণটি সমকালীন উলামায়ে কেরামের মাঝে  খুব প্রসিদ্ধ ও স্বীকৃত, তা হল, তিনি ছিলেন ছাত্র গড়ার কারিগর। আদর্শ ছাত্র গড়া এবং সুদক্ষ আলেম তৈরি করা ছিল তাঁর জীবনের বিশেষ মিশন। আদর্শ পাঠদানের পাশাপাশি তিনি অমনোযোগী ও হতাশাগ্রস্ত ছাত্রদেরকে আদর-স্নেহ ও ভালবাসা দিয়ে কৌশলে পড়াশোনায় মনোযোগী করে তুলতেন। আর মেধাবীদেরকে আরো উৎসাহ দিয়ে তাদের মেধা-মনন বিকশিত করার ব্যবস্থা করতেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মুরব্বী, সফল শিক্ষক ও পাকা মনোবিজ্ঞানী। আল্লামা কাসেমীর বিশিষ্ট শাগরেদ হযরত মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রাহ.-এর ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেযোগ্য। তিনি এক আলোচনায় নিজ ছাত্র-জীবনের কারগুযারী শোনান-তার দাওরায়ে হাদীসের বছরের কথা। বছরের শেষদিকে তিনি অনুভব করলেন-এ বছর যেহেতু তিনি যথাযথভাবে পাঠে মনোযোগ দিতে পারেননি, তাই এবার বেফাকের অধীনে দাওরায়ে হাদীসের কেন্দ্রীয়  পরীক্ষায়  অংশ নেবেন না। পরীক্ষার জন্য  তার অপ্রস্তুতির কথা তিনি সাথি-সঙ্গীদের জানিয়ে দিলেন। এ সংবাদ জানতে পেরে  আল্লামা  কাসেমী  প্রিয় শিষ্যকে ডেকে নিয়ে তার অভিব্যক্তি জানতে চাইলে তিনি অকপটে নিজ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন। আল্লামা কাসেমী তখন তাঁর প্রতিভাবান এ শিষ্যের ওপর প্রয়োগ করেন তাঁর ‘মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল’। তিনি শিষ্যের মতের সাথে ভাষার সঙ্গতি বজায় রেখে  বললেন, হাঁ, খোকা! তুমি তো পরীক্ষাটা আগামী বছরই দেবে, তবে এবার শুধু  বেফাকে এমনিতেই একটা পরীক্ষা দিয়ে ফেল। আসল পরীক্ষাটা না হয় তুমি আগামী বছরই দিলে।’ ‘উস্তায’ কাসেমীর স্নেহপূর্ণ এ মনোবৈজ্ঞানিক তীর লক্ষ্যভেদী হল। মাওলানা  আবুল ফাতাহ বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান লাভ করলেন।

ঘটনাটি বর্ণনা করে সেদিন  মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রাহ. বলেছিলেন- ‘আমার জীবনে  একশত সতেরজন শিক্ষকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী।’

আল্লামা কাসেমী বিশেষ যত্নদিয়ে ছাত্র গড়তেন বিধায় তাঁর গড়া ছাত্রদের পাঠদান-পদ্ধতিও খুব হৃদয়গ্রাহী। সারা দেশে তাঁর গড়া এমন হাজার হাজার  আলিম ইলমে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। এছাড়াও সমাজের নানা স্তরে তাঁর গড়া সুযোগ্য ব্যক্তিরা দ্বীনী খেদমতে নানাবিধ অবদান রেখে চলেছেন। তাঁর গড়া ছাত্রদের মাঝে কয়েকজন হলেন-মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রাহ., মাওলানা ইসহাক ফরীদী রাহ., মাওলানা হেমায়েতুদ্দীন আহমদ, মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ, মাওলানা আব্দুল মতীন, মাওলানা জাফর আহমদড. মাওলানা মুশতাক আহমদ, মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুল গাফফার, মুফতী আব্দুল হাকীম, মুফতী বোরহানুদ্দীন, মাওলানা নাজমুল হাসান, মুফতী আবু সাঈদ, মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ, মাওলানা শরীফুল ইসলাম, মাওলানা মকবুল হুসাইন, মাওলানা ইকবাল হুসাইন, মুফতী মুহিউদ্দীন মাসুম, মুফতি মুনীর হুসাইন, মাওলানা যাইনুল আবিদীন, মুফতী আব্দুস সালাম প্রমুখ হাফিযাহুমুল্লাহু তাআলা ওয়া রাআহুম।

বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর হাদীসের শিষ্যগণ ছড়িয়ে আছেন। সুদান, কাতার, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড ও থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর শিষ্যগণ বিভিন্ন দ্বীনী খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

ছয়।

হযরতের দরসের বহু বৈশিষ্ট্য ছিল। একটি বৈশিষ্ট্য ছিল ‘ইজমাল কবলাত্ তাফ্সীল’। মানে  তিনি কোনো কিতাবের পাঠদান করতে গিয়ে প্রথমে পঠিতব্য সবকের ‘ইজমাল’ অর্থাৎ সংক্ষেপে সবকের  বিষয়সূচি ও মূলকথা আলোচনা করতেন। যেমন  এ হাদীসের তাকরীরে মোট দশটি বিষয় রয়েছে। এরপর সূচিটি উল্লেখ করে সবাইকে পুরো বিষয়ের মৌলিক ধারণা দিতেন। এতে সবার মধ্যে পঠিতব্য সবকের প্রতি আগেভাগেই একটি ঔৎসুক্য তৈরি হয়ে যেত। এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে এক একটি বিষয়ের তফসীল বলতেন। ইলম শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে  হযরতের এ পদ্ধতি খুবই উপকারী বলে সাব্যস্ত হয়েছে। কিতাবের ইবারত বা মূল পাঠ বোঝানোর পূর্বে তিনি সবকের মূল বিষয়বস্তু ছাত্রদেরকে মুখেমুখে বোঝাতেন। এতে তালিবে ইলমগণের নিকট জটিল বিষয়ও সহজ হয়ে যেত। তিনি দরস দিতেন অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো কণ্ঠে। দরসে রীতিবদ্ধ পাঠের পাশাপাশি ইসলাহ ও তাযকিয়ার প্রতিও লক্ষ রাখতেন এবং মেযাজে শরীয়ত ও দ্বীনী মানস গঠনের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতেন। বিভিন্ন বাতিল ফেরকার মতাদর্শ খণ্ডন করতেন অত্যন্ত জোরালোভাবে। সেজন্য হযরতের দরস থেকে শুধু ইলমী যোগ্যতাই অর্জিত হত না, বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ চিন্তা-চেতনা গঠনেও হযরতের দরস গভীরভাবে প্রভাবসঞ্চারী হত। দরসে হযরতের রুচি ছিল, ভালো ও সমঝদার ছাত্রদেরকে সামনে বসানো। সমঝদার ছাত্রদের কেউ পেছনে বসা থাকলে তিনি তাঁকে ডেকে এনে সামনে বসাতে দ্বিধা করতেন না। এ প্রসঙ্গে  তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীসের অংশবিশেষ  উল্লেখ করতেন। তা হল-

لِيَلِيَنِي مِنْكُمْ أُولُو الأحْلاَمِ وَالنّهَى.

তোমাদের মধ্যে যারা বিবেকবান ও সমঝদার তারা যেন (নামাযে) আমার নিকটে  দাঁড়ায়। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২২৮

সাত।

আল্লামা নূর  হুসাইন কাসেমী রাহ. কৈশোর থেকেই ইলমের পাশাপাশি ইবাদতের প্রতিও মনোযোগী ছিলেন। ছাত্রজীবন পার করে তিনি ১৯৭৩ সালে ভারতের মুজাফ্ফর নগরস্থ মুরাদিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতাকালে শায়খুল হাদীস হযরত যাকারিয়া রাহ.-এর কাছে বায়আত হন এবং বিভিন্ন সময়ে রমযান মাসে তাঁর সঙ্গে ইতিকাফ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। এরপর মুফতী মাহমূদ হাসান গাঙ্গূহী রাহ.-এর কাছে বায়আত হন। ১৯৯৫ সালে মুফতী মাহমূদ হাসান গাঙ্গূহী রাহ. বাংলাদেশে আগমন করেন এবং মালিবাগ জামিয়ায় ই‘তিকাফ করেন। ঐ বছরই তিনি হযরত মাহমূদ হাসান গাঙ্গূহী রাহ.-এর  খেলাফত লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি খানকায়ে মাহমূদিয়ার আমির নিযুক্ত হন। প্রতি মাসে তার মুরীদগণ জামিয়া মাদানিয়া বারিধারায় এসে তার নিকট থেকে আত্মশুদ্ধির সবক গ্রহণ করতেন।

আট।

আল্লামা কাসেমী রাহ. দ্বীনী স্বার্থে ইসলামী রাজনীতিতেও অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাতে   বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের প্রতিটি সংকটকালে তিনি তাঁর সুচিন্তিত রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও মতামতের  মাধ্যমে ইসলামী রাজনীতি ও দ্বীনী আন্দোলনসমূহকে  সঠিক পথে পরিচালিত করার  প্রয়াস পান। তিনি ১৯৭৫ সাল থেকেই জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালে তার ওপর  জমিয়তের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব অর্পিত হয়। তারপর তিনি ২০১৫ঈ. সালে এই দলের মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কাদিয়ানীবিরোধী খতমে নবুওত আন্দোলনে তিনি জোরালো ভূমিকা পালন করেন। তিনি এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বর্তমান সময়ের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও ঢাকা মহানগরীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কিছুকাল পূর্বে আল্লামা আহমদ শফী রাহ.-এর ইন্তেকালের পর তিনি এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় মহাসচিবের পদে সমাসীন হন। তাঁর সুচিন্তিত রাজনৈতিক মতামত এবং পরিচ্ছন্ন চিন্তা-চেতনা ইসলামী রাজনীতিতে বিশেষ গতি ও সমৃদ্ধি আনয়ন করে। রাজনীতির ময়দানেও তিনি সর্বদা হক কথা বলেছেন নির্ভয়ে। হুমকি বা প্রলোভনের কারণে তিনি কখনও হক কথা বন্ধ করেননি।

নয়।

আল্লাহ তাআলার ফযল ও করমে  আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমীর মাঝে বহুবিধ উত্তম গুণ ও যোগ্যতার সমাবেশ ঘটেছিল। বর্তমান সময়ে তার দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

হযরাতুল উস্তায আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রাহ. আকাবিরে দেওবন্দের অনেকের সোহবত লাভ করেছিলেন এবং তাদের উত্তম গুণাবলির পরশে নিজেকে ধন্য করতে পেরেছিলেন। তাঁর মাঝে একইসঙ্গে বহু গুণের সমাবেশ  ঘটে। সে কারণে হযরতের জানাযাপূর্ব আলোচনায় প্রবীণ আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহ   আল্লামা কাসেমী রাহ.-কে ‘জামেউল কামালাত’ বা ‘বহু গুণের ধারক’ বলে আখ্যায়িত করেন।

দশ।

তাঁর একটি  বিশেষ গুণ ছিল ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত। যে কোনো কাজের পেছনে আমাদের জানামতে, তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য থাকত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ব্যক্তি-স্বার্থকে তিনি প্রশয় দিতেন না। তাঁর জানাযাপূর্ব আলোচনায় বক্তারা এ ব্যাপারে অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দেন। আত্ম-প্রচারের মন-মানসিকতা তাঁর ছিল না। সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সকল কর্মেও  মানুষ তার এই ইখলাস অনুভব করতে পারতো।

তিনি সর্বসত্তায় ছিলেন একজন মুখলিস আল্লাহ সন্ধানী সাধক পুরুষ। এর ছোট্ট একটি উদাহরণ দেই। একবার হযরতকে উৎসর্গ করে এই লেখক একটি দীর্ঘ কবিতা লিখি এবং কোনো উপলক্ষে আমাদের জামিয়ায় তাঁর শুভাগমন ঘটলে তাঁর সামনে কবিতাটি পাঠের অনুমতি চাই। তিনি কবিতার বিষয়বস্তু জানতে চান। কবিতাটি  তাঁকে নিয়ে লেখা-তা জানতে পেরে কবিতা পাঠ স্থগিত করে দেন।

এগার।

হযরতের জীবনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল, ত্যাগ ও মুজাহাদা। একদিকে দরসে বুখারীর মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন অপরদিকে নির্ধারিত আমল-ওযায়েফ ও ইবাদত-বন্দেগী ঠিক রেখেছেন। আবার সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দ্বীনী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য সফর করেছেন। নানা রকম বাতিল ফেরকার বিরুদ্ধে নানারূপ তৎপরতাও চালিয়েছেন। এভাবে অক্লান্ত ত্যাগ ও মুজাহাদার মধ্য দিয়ে তিনি জীবন পার করেছেন।

হযরত কাসেমী রাহ. নফসের বিরুদ্ধে মুজাহাদার প্রতিও খুব গুরুত্বারোপ করতেন। এ বিষয়ে  তিনি তার এক বয়ানে সুন্দর একটি উপমা পেশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন-শিশুর দুধ ছাড়ানোর সময় হলে মা বুকের  দুধ বন্ধ করে দেয়। শিশুর তখন খুব কষ্ট হয়, সে কান্নাকাটি করে। কিন্তু মা তাকে আর দুধ দেয় না, কারণ এই কষ্টের ভেতর দিয়ে শিশুটি খাদ্যের বিশাল জগতের সাথে পরিচিত হবে এবং সেসব খাদ্য খাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে। এভাবে একটি শিশু সাময়িক কষ্টের মাধ্যমে খাদ্যের বিশাল জগৎ পেয়ে যায়। মুজাহাদাকারীর অবস্থাও অনুরূপ। সাময়িক কষ্ট ও মুজাহাদার মাধ্যমে সে ব্যাপক শান্তি ও রাহাতের রাস্তা পেয়ে যায়। অনেকে মুজাহাদা করার হিম্মত হারিয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে হিম্মতের আশ্রয় নিতে হবে। এই বয়ানে তিনি আরো বলেন, ‘কসদুস সাবীল’ কিতাবে একটি ঘটনা  আছে-হযরত থানভী রাহ.-এর এক মুরিদ শেকায়েত করেছিল-নেক কাজের এরাদা হয় না। তিনি জবাবে বলেন ‘হিম্মত ছে কাম লো’। (হিম্মতের আশ্রয় নাও)। আর বারবার আল্লাহর তাওফীক কামনা করেও দুআ করতে হবে। নফসের বিরুদ্ধে রীতিমত কুস্তি লড়তে হবে এবং নফসকে পরাস্ত করতে হবে। কখনও নিজে  পরাস্ত হয়ে গেলে অবিলম্বে উঠে দাঁড়াতে হবে এবং তাওবা করে নিতে হবে। আর আল্লাহর যাতের কথা স্মরণ করতে হবে।

এক  শায়েখ একটি গোনাহ করার ইচ্ছা করেছিলেন। তিনি এজন্য একটি গোপন স্থান খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু তিনি যেখানেই যান লক্ষ করেন-সেখানেই আল্লাহ আছেন। এরপর তিনি আর সে গোনাহটি করতে পারলেন না। তাই গোনাহের ইচ্ছা হলে আল্লাহ পাকের যাতের কথা স্মরণ করতে হবে। যেই নফস একমসয় মন্দ কাজে মজা পেত সে নফসই মুজাহাদার পর নেকির কাজে আনন্দ লাভ করে। আর অধিক পরিমাণে কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত করতে হবে। এতে কলব নুরান্বিত হবে। 

[১৪৩৮ হিজরি (২০১৭ ঈ.) ১৩ই রমযান উমরা সফরের পূর্বের রাতে জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মসজিদে তারাবীর পর ইতিকাফরত উলামায়ে কেরামের উদ্দেশে হযরত কাসেমী  রাহ.-এর প্রদত্ত বয়ান থেকে]

বার।

হযরতের আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল, তিনি সমালোচনা পছন্দ করতেন না। কোনো অন্যায় সমালোচনাকে প্রশ্রয় দেওয়া তো দূরের কথা, ন্যায়সঙ্গত সমালোচনার পরিবর্তে তিনি গঠনমূলক কাজ করে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন এবং তার অনুসারীদেরকেও তিনি সে পরামর্শই দিতেন। একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বোঝাতেন, ‘ধরো কেউ অন্যায়ের সহযোগিতার জন্য একটি দেয়াল তুলে ফেলেছে সেটি  ভেঙে দেয়া  হয়ত সহজ নয়, কিন্তু তার পরিবর্তে তুমি ন্যায়ের পক্ষে তার চেয়ে উঁচু একটি দেয়াল তুলে দাও! তাহলে অন্যায়ের দেয়ালটি এমনিতেই আড়াল হয়ে যাবে। তার মানে সামাজিক ও জাতীয় জীবনে অনেক ক্ষেত্রে এমন হয় যে, অন্যায়কে সরাসরি শক্তি দিয়ে প্রতিহত করা যায় না। তাই সেখানে নিজের শক্তি ক্ষয় না করে গঠনমূলক কাজের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্যায় ঢাকা পড়ে যাবে। এভাবে  গভীর  প্রজ্ঞার  আলোকে তিনি কর্মের সঠিক ও সুন্দর পদ্ধতি বলে দিতেন।

তের।

হযরতের আদর্শের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, ই‘তিদাল বা  ভারসাম্য রক্ষা করা এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এক্ষেত্রে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দ ও আকাবিরে দেওবন্দের পথের পথিক ছিলেন। সর্বপ্রকার ইফরাত-তাফরীত তথা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িকে তিনি অপছন্দ করতেন। মূলত এটাই মেযাজে শরীয়ত। তিনি এই মেযাজে শরীয়তের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং সাথিদেরকেও এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। নিজের মতাদর্শে অনঢ় থাকতেন তবে ভিন্নমতের উলামায়ে কেরামের প্রতিও ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। নিজের ফিকহী মাযহাবকে প্রাধান্য দিতেন আর অন্য মাযহাবের ইমামগণের প্রতিও অগাধ শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। এ প্রসঙ্গে এই লেখকের সঙ্গে ঘটা হযরতের  একটি ঘটনা সংক্ষেপে  তুলে ধরছি। একবার আমি ‘দীপ্ত জীবন’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করি। তাতে ফিকহের তিন ইমামসহ ইতিহাসখ্যাত কয়েকজন মুহাদ্দিসের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরি। ঘটনাক্রমে তাতে ইমাম শাফিয়ী রাহ.-এর  জীবনীটা বাদ পড়ে যায়। বই প্রকাশের পর পাঠকসমাজের পক্ষ থেকে  অধম গ্রন্থকার  প্রশ্নের সম্মুখীন হই। সবচেয়ে গুরুতর জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হয়েছিলাম আমার পরমপ্রিয় উস্তায আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রাহ.-এর আদালতে। পাঠকসাধারণকে দু-এক কথা বলে বুঝিয়ে দিলেও ‘আদালতে কাসেমী’তে আমার কোনো কৈফিয়ত গৃহীত হয়নি। ফলে দণ্ডছিল শিরোধার্য। পরবর্তীতে অল্পকালের মধ্যেই আমি ইমাম শাফিয়ী রাহ.-এর জীবনী সুন্দরভাবে লিখে ‘দীপ্ত জীবন’-এর দ্বিতীয় সংস্করণে যুক্ত করে দিই। এভাবে তিনি আমাদেরকে  আকাবির-আসলাফের সকলের প্রতি আজমত ও শ্রদ্ধা পোষণের শিক্ষা দিয়ে গেছেন আজীবন। তিনি কোনো কোনো মতপার্থক্যের দরুন কোনো আকাবিরের প্রতি সামান্যতম অশ্রদ্ধাও মেনে নিতেন না। আল্লামা কাসেমী রাহ.-এর শায়েখ, শাইখুল হাদীস হযরত যাকারিয়া রাহ. তাঁর সমকালে বিশেষভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিজ ভক্তদের মন-মগজে বদ্ধমূল  করেছিলেন। এধরনের এক প্রশ্নের জবাবেই  শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহ. ‘আলই‘তিদাল ফী মারাতিবির রিজাল’ নামে একটি অতি মূল্যবান  রিসালাও  লিপিবদ্ধ করেছেন। শাইখুল হাদীস হযরত যাকারিয়া রাহ.-এর সোহবতপ্রাপ্ত আল্লামা কাসেমীও সে চিন্তা-চেতনারই ধারক ও প্রবক্তা ছিলেন। সমকালীন উলামায়ে কেরামের ক্ষেত্রেও সর্বদা এই সম্মানবোধ ও ভারসাম্য বজায় রাখার পুরোপুরি চেষ্টা করতেন আল্লামা কাসেমী রাহ.। ভিন্নমতের উলামায়ে কেরামের অবস্থানের  ব্যাপারে  কথা বলা প্রয়োজন হলে তা বলতেন অত্যন্ত সংযত ভাষায়। তাঁর এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও সংযত কথাবার্তা তাঁর প্রতি সর্বশ্রেণীর উলামায়ে কেরামের আস্থা ও ভালবাসার অন্যতম কারণ।

চৌদ্দ।

হযরতের চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল বিনয় ও আত্মতুচ্ছতাবোধ। তাঁর কথা ও কর্মে এই বিনয় ফুটে উঠত। তিনি বলতেন, অহঙ্কার মানুষকে একেবারে ‘নাপাক’ করে ফেলে। শিষ্যদেরকেও তিনি  সর্বদা এ বিষয়ে কঠিনভাবে সতর্ক করে দিতেন। অহঙ্কারকে তিনি বলতেন, ‘বেটাগিরি’। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের পূর্বে তাওয়াক্কুল ও ইনাবাত ইলাল্লাহর প্রতি গুরুত্বারোপ করে শাগরেদদেরকে তেজোদীপ্ত কণ্ঠে বলতেন, ‘বা-জি! [বাবাজি] ‘বেটাগিরি’ দেখায়ো না। বেটাগিরি দিয়ে কোনো কাজ হয় না।’ তার মানে দ্বীনী কাজ করতে নিজের যোগ্যতার উপর ভরসা করলে ব্যর্থতা অনিবার্য, সর্বাবস্থায় আল্লাহ পাকের উপর নির্ভর করতে হবে।

পনের।

আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমীর মত মহান পুরুষের ইন্তেকাল আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক বড় একটি ঘটনা। অনেক বড় একটি শূন্যতা। তাঁর জানাযায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতির ব্যাপারটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের সচেতন সব গণমাধ্যমে ও সংবাদপত্রে আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমীর ইন্তেকাল ও জানাযার সংবাদ প্রকাশিত হয়। বামপন্থী ইসলামবিদ্বেষী কিছু সংবাদপত্র লাখ লাখ মানুষের জানাযা আদায়ের  এত বড় সংবাদটি দায়সারাভাবে হলেও প্রকাশ করে। আর ইনকিলাব, ইত্তেফাক ও নয়া দিগন্ত অনেকটা দায়িত্বশীলতার সাথে সংবাদটি পরিবেশন করে। দৈনিক ইনকিলাবের সংবাদের একটি বড় অংশ নিম্নরূপ-

শীতের সকালে একজন দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীনকে শেষ বিদায় জানাতে রাজধানীর বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদ ও আশপাশ এলাকায় লাখো মুসল্লীর ঢল নেমেছিলো। অশ্রুসিক্ত শীর্ষ উলামায়ে কেরাম, মাদরাসার ছাত্র শিক্ষক, ইমাম খতিবসহ সর্বস্তরের মুসল্লীরা আলেমে রব্বানী আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমীর নামাযে জানাযায় অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বায়তুল মুকাররমে। উলামা মাশায়েখ ও সর্বস্তরের মুসল্লীদের উপচে পড়া ভিড়ে করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা সম্ভব হয়নিজাতীয় ঈদগাহ ময়দানে তার জানাযার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় গতকাল বায়তুল মুকাররমে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জায়গা না পেয়ে অনেকেই জানাযায় অংশ নিতে পারেননি। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব, বেফাকুল মাদারিসের সিনিয়র সহসভাপতি ও হাইয়াতুল উল্য়া বাংলাদেশের কো-চেয়ারম্যান আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমীর লাশ গতকাল সাড়ে ১১টায় টঙ্গীর তুরাগে ধউরস্থ তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এর আগে সকাল ৯টা দশ মিনিটে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমে আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমীর নামাযে জানাযায় লাখো মুসল্লী অংশ নেন। জানাযার নামাযে ইমামতি করেন মরহুমের ছোট সাহেবযাদা মুফতী জাবের কাসেমী। ফজরের নামায থেকে রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে আগত মুসল্লীরা বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে অবস্থান নিতে শুরু করেন। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে বায়তুল মুকাররম কানায় কানায় ভরে যায়। জাতীয় মসজিদে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে সকল রাস্তায় তিল ধরার ঠাঁই ছিলো না। এসময় গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, মতিঝিল শাপলা চত্বর, দৈনিক বংলার মোড়, হাইকোর্ট মোড়, কাকারাইল মোড়, ফকিরাপুল মোড়, প্রেসক্লাব, পল্টন মোড়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে নগরীতে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়।

জায়গার অভাবে মসজিদের উত্তর পাশে নির্মাণাধীন মেট্রো রেলের বাউন্ডারির ভেতরেও হাজার হাজার মুসল্লী নামাযে জানাযায় অংশ নেন। মসজিদের আশপাশে জায়গা না পেয়ে পূর্ব দিকে দৈনিক বাংলার মোড় ও হাউজ বিল্ডিং-এর পেছনে পুরানা পল্টনের অলিগলিতে আগত মুসল্লীরা জানাযার নামাযে দাঁড়িয়ে যান। পুরানা পল্টন মোড় থেকে বিজয় নগর পানির টেংকি পর্যন্ত মুসল্লীরা অবস্থান নেন। এসময় বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদ থেকে দফায় দফায় ঘোষণা দেওয়া হয়-জানাযার নামাযে ইমামের আগে দাঁড়ালে নামায হবে না এবং পূর্ব উত্তর দক্ষিণ দিকে দাঁড়িয়ে নামাযে অংশ নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। একপর্যায়ে মসজিদের অযুখানার পানি শেষ হয়ে যায়। মসজিদের মাইকে পানি সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়।

আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে গত রোববার দুপুর একটার দিকে রাজধানির ইউনাইটেড হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন।” (দৈনিক ইনকিলাব, ১৫-১২-২০২০ ঈ. মঙ্গলবার।)

ষোল।

অবশেষে মহান আল্লাহর নিকট হৃদয়ের একান্ত মিনতি জানাই-তিনি যেন আমাদের পরমপ্রিয় ও পরমশ্রদ্ধেয় হযরত আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রাহ.-কে পূর্ণ মাগফিরাত করেন, আপন রহমতের চাদরে ঢেকে নেন, তাঁর জীবনের যাবতীয় খিদমত উত্তম কবুলিয়তে ভূষিত করেন, তাঁকে  জান্নাতের অতি উচ্চ মাকাম দান করেন এবং আমাদেরকে আজীবন তাঁর দেখানো হকের পথে চলবার তাওফীক দান করেন-আমীন। হ

 

 

advertisement