সফর ১৪৪২   ||   অক্টোবর ২০২০

নবীগণের দাওয়াতের স্বরূপ ও বিষয়বস্তু

মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

এ পৃথিবীর ইতিহাসে বহু সাধু, গুরু, সন্যাসী ও গোত্রপ্রধানেরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষের ভক্তি-বিশ্বাসকে বলি দিয়েছে। যুগে যুগে বিবেক-বুদ্ধির পূজারী সমাজের কর্তাব্যক্তিরা মানুষের সরলতার সুযোগে কত যে মতবাদ আবিষ্কার করেছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

 

কেউ মানুষকে বলেছে, ভোগবাদেই শান্তি। কেউ বলেছে, বৈরাগ্যেই মুক্তি। কেউ পূর্বপুরুষদের সমাধি, প্রতিমা, ভাষ্কর্য আর কেউ আকাশের চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রকে খোদা সাব্যস্ত করেছে। কেউ তো নিজেই খোদা দাবি করেছে। কেউ বলেছে খোদা তিনজন। আর কারো হিসাব মতে খোদার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তেত্রিশ কোটি। কেউ প্রচার করেছে, খোদা বা পরকাল বলে কিছু নেই। এ দুনিয়াই সব। আসল হচ্ছে বুদ্ধির মুক্তি, আত্মার বিকাশ আর মানবকল্যাণ। কেউ মানুষের সীমাবদ্ধ বিবেককে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত বলে খোদার আসনে বসিয়ে দিয়েছে। আর কেউ বিবেকের দরজা-জানালা সব বন্ধ করে নিজেদের মনগড়া কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরেছে। কেউ ঘোষণা করেছে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আর কেউ বলেছে, সরকারই সর্বময় কর্তৃত্বের মালিক।

ইতিহাসের পরিক্রমায় দেখা যায়, স্বার্থান্বেষী লোকেরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পূর্বের আসমানী কিতাবে বারংবার হস্তক্ষেপ চালিয়েছে। ক্ষমতাসীনেরাও দফায় দফায় বৈঠক করে সেসব কিতাবে একাধিক সংশোধনী এনেছে। কেউ তো ঐক্য-সম্প্রীতির দোহাই দিয়ে এক খোদা ও বহু খোদার ধর্মের মিশেলে সম্পূর্ণ নতুন মত প্রবর্তন করতেও ছাড়েনি। আর একদল হতভাগ্য মানুষ সবকিছুতেই বিশ্বাস স্থাপন করেছে।

শিশু যেমন কাগজের টুকরো নিয়ে বিচিত্র খেলা করে। কখনো দুমড়ে মুচড়ে ফেলে। কখনো মেলে ধরে। কখনো খোলে আবার বন্ধ করে। আর যখন ইচ্ছে হয় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে আনন্দ লাভ করে। তেমনি এরাও মানবতার ভক্তি, বিশ্বাস ও আস্থার সঙ্গে যুগ যুগ ধরে এরূপ নির্মম ছিনিমিনি খেলেছে এবং নামে বেনামে আজো খেলে চলেছে।

 

নববী দাওয়াতের স্বরূপ

পৃথিবীর শুরু থেকেই মানুষ এক অভিন্ন দ্বীনের অনুসারী ছিল। মানুষকে আল্লাহ তাআলা সীরাতুল মুসতাকীমের প্রতি দাওয়াত দেয়ার জন্য প্রথম থেকেই নবী-রাসূল প্রেরণের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁদেরকে প্রেরণ করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানুষকে সকল দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা। আল্লাহপ্রদত্ত ঐশী শিক্ষার দাওয়াত দেয়া। মানুষের যাবতীয় দ্বেদ্বর অবসান ঘটানো এবং অসভ্যতার অন্ধকার থেকে তাদেরকে ঈমানের আলোকিত পথে বের করে আনা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

كَانَ النَّاسُ اُمَّةً وَّاحِدَةً  فَبَعَثَ اللهُ النَّبِیّٖنَ مُبَشِّرِیْنَ وَ مُنْذِرِیْنَ  وَ اَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ لِیَحْكُمَ بَیْنَ النَّاسِ فِیْمَا اخْتَلَفُوْا فِیْهِ .

(শুরুতে) সমস্ত মানুষ একই দ্বীনের অনুসারী ছিল। তারপর (যখন তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল, তখন) আল্লাহ নবী পাঠালেন। যারা (সত্যপন্থীদের) সুসংবাদ শোনাত এবং (মিথ্যাশ্রয়ীদেরকে) ভীতি প্রদর্শন করত। আর তাঁদের সঙ্গে সত্যসম্বলিত কিতাব নাযিল করলেন। যাতে তাঁরা মানুষের মধ্যকার মতভেদপূর্ণ বিষয়ে মীমাংসা করে দেয়। -সূরা বাকারা (২) : ২১৩.

কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলগণের ঘটনাবলী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো যুগেই তাঁদের দাওয়াতী কর্মের ফল একপর্যায়ের ছিল না। জগতের চিরন্তন নীতি অনুযায়ী কিছু মানুষ তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন আর অনেকে দেয়নি। বরং প্রত্যেক যুগেই সমাজের সম্পদশালী ও উচ্চশ্রেণীর লোকেরা নবীগণকে অবজ্ঞা-অপমান করেছে। [দ্র. সূরা ইয়াসীন (৩৬) : ৩০; সূরা নাহল (১৬) : ৩৬; সূরা যুখরুফ (৪৩) : ৭]

নবীগণের দায়িত্ব ছিল কেবল সুস্পষ্টরূপে পৌঁছে দেয়া। [দ্র. সূরা ইয়াসীন (৩৬) : ১৭; সূরা নাহল (১৬) : ৩৫; সূরা শুআরা (২৬) : ৪৮]

আর তাই জাহান্নামবাসীদের সম্পর্কে তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে না। [দ্র. সূরা বাকারা (২) : ১১৯.]

আল্লাহ তাআলা ইচ্ছে করলে সকল মানুষকে ঈমান আনতে বাধ্য করতে পারতেন। কিন্তু এটা আল্লাহর নীতি নয়। [সূরা হুদ (১১) : ১১৮-১১৯]

মানুষকে তিনি চোখ, কান, বিবেক, বুদ্ধি দিয়েছেন। হকের দাওয়াত তার কাছে পৌঁছিয়েছেন। সত্য-মিথ্যা গ্রহণ ও বর্জনের স্বাধীনতা তাকে দান করেছেন। [দ্র. সূরা বালাদ (৯০) : ৮-১০; কাহাফ (১৮) : ২৯]

এজন্য যুগে যুগে যারাই নবীগণের দাওয়াতে সাড়া দিয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে নাজাত দান করেছেন। আর যারা অস্বীকার করেছে, তাদেরকে শাস্তি দিয়েছেন। [দ্র. সূরা নাহল (১৬) : ৩৬; সূরা আনআম (৭) : ৪২-৪৪; সূরা ইউসুফ (১২) : ১০৯-১১০]

আল্লাহ তাআলা পূর্বের নবীগণকে নির্দিষ্ট জনপদ বা গোত্রের বাসিন্দাদের প্রতি প্রেরণ করেছেন। [দ্র. সূরা ফাতির (৩৫) : ২৪]

সকল উম্মতের মাঝেই কোনো না কোনো রাসূল বা তাঁর প্রতিনিধি প্রেরিত হয়েছেন। [দ্র. সূরা নাহল (১৬) : ৩৬] তবে শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছেন সমগ্র মানবজাতির প্রত্যেক সদস্যের জন্য। [দ্র. সূরা সাবা (৩৪) : ২৮; সূরা আরাফ (৭) : ১৫৮]

এজন্য দাওয়াতী কাজের এ মহান দায়িত্ব শেষনবীর উম্মতকেও প্রদান করা হয়েছে। যেন কিয়ামত পর্যন্ত হেদায়েতের হাওয়া চালু থাকে। আর এ কারণেই এ উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলা হয়েছে। [দ্র. সূরা আলে ইমরান (৩) : ১০৪, ১১০]

সকল রাসূলের প্রতি আল্লাহ তাআলা হেদায়েতের বাণীরূপে কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাঁদের সমর্থনে মুজেযা বা অলৌকিক নিদর্শনও দান করেছেন। যেন তাঁদের মাধ্যমে অফুরন্ত কল্যাণ ও হেদায়েতের বাণী মানুষের নিকট পৌঁছে যায় এবং যেন আলো-অন্ধকারের স্পষ্ট পার্থক্যরেখা তারা বুঝতে সক্ষম হয়। [দ্র. সূরা রূম (৩০) : ৪৭; সূরা বাকারা(২) : ২১৩; সূরা ইবরাহীম (১৪) : ১]

নবীগণের দাওয়াতের বিষয়বস্তু

নবী-রাসূলগণের দাওয়াতের বিষয়বস্তু মৌলিকভাবে দুটি। এক. ঈমান। দুই. আমল। অন্যভাবে বললে এক হচ্ছে আকীদা-বিশ্বাস। দুই. শরীয়তের পালনীয় বিধি-বিধান।

চলুন আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতের বিষয়স্তু সম্পর্কে আলোচনাকরা যাক।

এখানে সংক্ষেপে ছয়টি বিষয় সম্পর্কে কথা বলব।

 

এক. আকীদা-বিশ্বাস

নবী রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষ যা কিছু অর্জন করেছে, তন্মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান বিষয় হচ্ছে আকীদা-বিশ্বাস। এ আকীদা মানুষকে তার রবের সঙ্গে পরিচিত করে। রবের সাথে তার সম্পর্কের সঠিক পথ দেখায়। তাকে সৃষ্টির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত করে। আকীদার মাধ্যমে মানুষ তার ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সঠিক কর্মপন্থা জানতে সক্ষম হয়। এককথায় মানুষের সঠিক কর্মপন্থা, প্রকৃত কল্যাণ ও সাফল্য আকীদার উপর নির্ভরশীল।

নবীগণের দাওয়াতের বিষয়বস্তুর মধ্যে আমরা প্রধানত তিন ধরনের আকীদার উল্লেখ দেখতে পাই।

১. সকল নবী-রাসূল মানুষকে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাসের দাওয়াত দিয়েছেন। আল্লাহ এক। তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। তাওহীদের এ বাণী আল্লাহ তাঁর সকল রাসূলের প্রতি ওহীরূপে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَ مَاۤ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا نُوْحِیْۤ اِلَیْهِ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنَا فَاعْبُدُوْنِ.

আমি আপনার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাঁর প্রতি অবশ্যই এ ওহী পাঠিয়েছি যে, আমি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। অতএব, আমার ইবাদত কর। -সূরা আম্বিয়া (২১) : ২৫

২. নবী রাসূলগণ উম্মতকে স্বীয় রিসালাতের প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁরা আল্লাহর প্রেরিত, বিশ্বস্ত। তাঁরা জান্নাতের সুসংবাদবাহী। জাহান্নামের সতর্ককারী। একমাত্র তাঁদের অনুসরণের মাঝেই মানুষের কল্যাণ ও সফলতা নিহিত। এ মহান বিশ্বাসের প্রতি তাঁরা উম্মতকে দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন, আমাদের প্রিয়নবীকে আল্লাহ তাআলা একথা ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছেন যে, (তরজমা) আমি তোমাদের জন্য তাঁর (আল্লাহর) পক্ষ থেকে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।’  -সূরা হুদ (১১) ২

হযরত নূহ আ. নিজ সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, (তরজমা) হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট সতর্ককারী।-সূরা নূহ (৭১) : ২

হযরত মূসা ও হারূন আ.-কে আল্লাহ আদেশ করে বলেছেন, (তরজমা) অতএব, তোমরা ফেরাউনের নিকট যাও এবং বল, আমরা তো বিশ্বজগতের পালনকর্তার রাসূল।-সূরা শুআরা (২৬) : ১৬

এমনিভাবে হযরত হুদ, সালেহ, লূত ও শুআইব আ. নিজ নিজ উম্মতকে এ দাওয়াত দিয়েছিলেন যে-

اِنِّیْ لَكُمْ رَسُوْلٌ اَمِیْنٌ فَاتَّقُوا اللّٰهَ وَ اَطِیْعُوْنِ.

আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনগত্য কর। -সূরা শুআরা (২৬) : ১২৫-১২৬

৩. নবীগণ মানুষকে পরকালের বিশ্বাসের দাওয়াত দিয়েছেন। মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, ভালো-মন্দ কর্মের হিসাব, আমলনামা পরিমাপকরণ, বিভীষিকাময় কিয়ামত দিবস এবং আখেরাতের কঠিন আযাবের ব্যাপারে তাঁরা উম্মতকে সতর্ক করে গিয়েছেন। যেমন, হযরত হুদ আ. নিজ উম্মতকে বলেছেন, (তরজমা) আমি তো তোমাদের ব্যাপারে এক মহা দিবসের শাস্তির ভয় করি।-সূরা শুআরা (২৬) : ১৩৫

হযরত নূহ আ.-কে আল্লাহ তাআলা আদেশ করে বলেছেন, (তরজমা) তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সতর্ক করো, তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক আযাব আসার পূর্বে।-সূরা নূহ (৭১) : ১

আমাদের প্রিয় নবীজির প্রতি আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন, (তরজমা) আপনি বলুন, সেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হাড়গুলিতে তিনি জীবন দান করবেন, যিনি তাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি সর্বপ্রকার সৃজন জানেন।-সূরা ইয়াসীন (৩৬) : ৭৯.

এছাড়া আকীদার অন্যান্য শাখা যেমন, ফিরিশতা, আসমানী কিতাব ও ভালো-মন্দের তাকদীরে বিশ্বাসের প্রতিও নবীগণ মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন।

 

দুই. ইবাদত

আকীদার পর দ্বীনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ইবাদত। সকল নবী রাসূলের দাওয়াতে এ বিষয়ে অপরিসীম তাকিদ করা হয়েছে। মানবজাতির সৃষ্টির লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই হল আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করা। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَ الْاِنْسَ اِلَّا لِیَعْبُدُوْنِ.

আমি জিন ও মানুষকে এজন্যই সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার ইবাদত করে। -সূরা যারিয়াত (৫১) : ৫৬

ইবাদত অর্থ আল্লাহর উপাসনা। যেমন, নামায, রোযা, হজ¦, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত, তিকাফ, কুরবানী ইত্যাদি। সকল নবী-রাসূল নিজ উম্মতকে এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। [দ্র. সূরা আম্বিয়া (২১) : ২৫]

পবিত্র কুরআনে পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতের বিবরণীতে বিভিন্ন ইবাদতের উল্লেখ পাওয়া যায়। আল্লাহর নবী হযরত ইসমাঈল আ. নিজ পরিবার-পরিজনকে নামায ও যাকাতের আদেশ করতেন। [দ্র. সূরা মারইয়াম (১৯) : ৫৫] হযরত ঈসা আ. মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় কুদরতীভাবে যেসব কথা বলেছিলেন, তন্মধ্যে একটি বাক্য ছিল, (তরজমা) আর আমাকে আল্লাহ নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন আমি জীবিত থাকি।’ [সূরা মারইয়াম (১৯) : ৩১]

হযরত ইবরাহীম আ.-কে আল্লাহ তাআলা আদেশ দিয়ে বলেছেন, (তরজমা) আর মানুষের মধ্যে হজে¦র ঘোষণা করে দাও।’ [হজ¦ (২২) : ২৭] আর পশু কুরবানী আল্লাহ প্রত্যেক উম্মতের উপর নির্ধারণ করেছিলেন। [দ্র. সূরা হজ¦ (২২) : ৩৪] এমনিভাবে রোযা, জিহাদও পূর্বের নবীগণের যুগে ফরয ছিল। [দ্র. সূরা বাকারা (২) : ১৮৩, ২৪৬] হযরত দাউদ আ. সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর যিকিরে নিমগ্ন থাকতেন। [দ্র. সূরা ছ¦দ (৩৮) : ১৮]

 

তিন. মুআমালা বা লেনদেন

কিছু মুসলমান দ্বীন বলতে কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস আর ইবাদতকেই বোঝে। হাট-বাজারে, আয়-রোযগারে দ্বীনের যেন কোনো প্রয়োজনই নেই। মূলত দ্বীনী শিক্ষার অভাব আর দেশে দেশে প্রচলিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটই এ ধারণা সৃষ্টির কারণ। অথচ মুআমালা-লেনদেন হচ্ছে ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। ইসলামে এবং পূর্বের নবীগণের দাওয়াতেও এ বিষয়ে পরিষ্কার বিধি-নিষেধ রয়েছে।

স্বয়ং আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সচেতন ও আদর্শ ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যাপকভাবে সাহাবায়ে কেরামের পেশাও ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। পৃথিবীব্যাপী বিগত দেড় হাজার বছরের মুসলিম শাসনামলেও ইসলামী অর্থনীতি সফলভাবে কার্যকর ছিল।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৃথিবীর বহু অঞ্চলে ব্যবসায়ী মুসলমানদের মাধ্যমেই ইসলাম বিস্তার লাভ করেছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্য় লেনদেন বিষয়ক অসংখ্য নির্দেশনা বিদ্যমান।

আল্লাহর নবী হযরত মূসা আ.-এর যুগে কারূন নামে এক ধনকুবের ছিল। আল্লাহ তাআলা হযরত মূসার মাধ্যমে তাকে অর্থনীতি বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জানিয়েছিলেন। যা ইসলামী নীতিমালার অংশ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَ ابْتَغِ فِیْمَاۤ اٰتٰىكَ اللّٰهُ الدَّارَ الْاٰخِرَةَ.

আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তার মাঝে তুমি আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর।

অর্থাৎ এ অর্থ-সম্পদের তুমি একচ্ছত্র মালিক নও। এসব আল্লাহর দান। অতএব, সম্পদকে তুমি আখেরাতের কল্যাণ অর্জনের মাধ্যম বানাবে এবং আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহপ্রদত্ত যাবতীয় হালাল-হারামের নীতি মেনে চলবে।

وَ لَا تَنْسَ نَصِیْبَكَ مِنَ الدُّنْیَا.

কিন্তু তুমি তোমার দুনিয়ার অংশের কথা ভুলে যেও না।

অর্থাৎ, দুনিয়াতে তোমার যেটুকু প্রয়োজন, তার কথাও স্মরণে রেখো। হালাল পন্থায় আয় কর। আর নিজের বৈধ প্রয়োজনে প্রয়োজন অনুপাতে ব্যয় কর।

وَ اَحْسِنْ كَمَاۤ اَحْسَنَ اللهُ اِلَیْكَ.

আল্লাহ তোমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, তেমনি তুমিও অন্যদের প্রতি অনুগ্রহ কর।

অর্থাৎ তোমার সম্পদ যেহেতু আল্লাহর দান, সুতরাং তুমিও আল্লাহর পথে মানুষকে দান কর। যাকাত আদায় কর।

وَ لَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِی الْاَرْضِ.

পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িও না।’  -সূরা কাসাস (২৮) : ৭৭

অর্থাৎ, সম্পদের অহমিকায় পড়ে অন্যদের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ শুরু করে দিও না। মানুষের অধিকার কেড়ে নিও না।

কিন্তু কারূন হযরত মূসা আ.-এর এ দাওয়াতকে অহংকারের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে। পরিণামে আল্লাহ তাকে ও তার সম্পদকে ভূগর্ভে ধ্বসিয়ে দেন। [ দ্র. সূরা কাসাস (২৮) : ৭৮-৮১] এমনিভাবে হযরত শুআইব আ. যখন তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা মানুষের বিক্রয়ের পণ্যদ্রব্যে ওজনে কম দিও না। তখন তারাও নবীর দাওয়াতে সাড়া না দিয়ে বরং বিদ্রæপ করে বলেছিল- (তরজমা) হে শুআইব! তোমার নামায কি তোমাকে এ শিক্ষা দেয় যে, আমাদের বাপ-দাদারা যাদের উপাসনা করত, আমরা তাদের বর্জন করি অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদে আমাদের যা ইচ্ছা, তা করা ত্যাগ করি? তুমি তো বড়ই সহনশীল ভালো মানুষ! -সূরা হুদ (১১) : ৮৭

পরিণামে তাদের প্রতিও আল্লাহর আযাব অবধারিত হয়েছিল। [দ্র. সূরা হুদ (১১) : ৯৪-৯৫]

 

চার. মুআশারা তথা সামাজিক কর্তব্য ও অধিকার

কেবল লেনদেনই নয়, সমাজব্যবস্থার সর্বত্র মানুষের কর্তব্য ও অধিকার নিশ্চিত করে একটি সুন্দর সমাজ গঠনেও নববী দাওয়াতের কালজয়ী দিকনির্দেশনা রয়েছে। এখানে বিস্তারিত আলোচনা করার অবকাশ নেই। তবুও একটি ছোট্ট তালিকা লক্ষ্য করুন।

যে কোনো সমাজের প্রথম পরিসর হচ্ছে পরিবার। পরিবারে বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের আচরণ কীরূপ হবে, মা-বাবার সবল ও দুর্বল অবস্থায়, জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে কী কী হক রয়েছে সন্তানের উপর, তাঁদের খেদমত ও আনুগত্যের পর্যায়, ধরণ ও সীমারেখা কী,

তেমনি সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে মা-বাবার কর্তব্য কী, সন্তানের লালন-পালন, খাদ্য-পোষাক, আনন্দ-বিনোদন, পঠন-পাঠন এবং চরিত্র ও মানস গঠনের ক্ষেত্রে মাতা-পিতার কী কী করণীয় বর্জনীয় এবং লক্ষ্যণীয় বিষয় আছে, এসবই নববী দাওয়াতের বিষয়বস্তু।

সন্তান বড় হলে বিয়ে-শাদীর ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন, বিয়ের আয়োজন, বিয়ে পরবর্তী জীবনে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ, পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর হক, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত-অপরিচিত মুসলমান, মেহমান ও রাস্তায় চলাচলকারী ব্যক্তির হক, কর্তার উপর কর্মচারীর হক, কর্মচারীর উপর কর্তার হক, সরকারের উপর জনগণের হক, জনগণের উপর সরকারের হক, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের হক, মানুষকে ঈমান, আমল ও হেদায়াতের পথ প্রদর্শনকারী দ্বীনী ব্যক্তিবর্গের হক, ছোটদের উপর বড়দের হক, বড়দের উপর ছোটদের হক, গাছপালা, পশুপাখি, প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ ও আবহাওয়ার সুরক্ষা ও সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতিটি বিষয়ই নববী আদর্শ ও শিক্ষার অধীন।

মহান আল্লাহর কুরআন, প্রিয়নবীজীর সুন্নাহ এবং এতদুভয়ের আলোকে উম্মাহ্র বরেণ্য ইমামগণ কর্তৃক সংকলিত ইসলামী ফিকহ তথা আইনশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহে হাজার হাজার পৃষ্ঠাব্যাপী এসব নির্দেশনা, নীতিমালা ও কার্যবিধি যথাযথ সংরক্ষিত আছে। শুধু লিখিত আকারেই নয়, নবীযুগ থেকে আজ অবধি প্রতি যুগের দ্বীনদার মুসলমানগণ এর উপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমলও করে আসছেন।

অথচ দুঃখের বিষয়, বর্তমানে এক শ্রেণির মুসলমান এরূপ অস্পষ্ট ধারণার শিকার যে, শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা, নামায পড়া আর সত্য কথা বলাই যথেষ্ট। সমাজ-জীবনে ধর্মপালনের তেমন কিছু নেই।

 

পাঁচ. সিয়াসত তথা রাষ্ট্রব্যবস্থা

যে কোনো সভ্য সমাজেরই অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গন হচ্ছে তার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। সরকার, প্রশাসন, আইন, প্রতিরক্ষা, বিচার ও আদালতের অবস্থিতি ছাড়া কোনো সমাজব্যবস্থাই পূর্ণ অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। এ ক্ষেত্রটিও নবীগণের দাওয়াতের আওতাভুক্ত। রাষ্ট্রব্যবস্থাপনাতেও নববী দাওয়াতের তাত্তি¡ক ও ব্যবহারিক উভয় রকম নির্দেশনা বিদ্যমান।

আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন যেন মানুষ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। [দ্র. সূরা হাদীদ (৫৭) : ২৫] আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন-

اِنَّ اللهَ یَاْمُرُكُمْ اَنْ تُؤَدُّوا الْاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَهْلِهَا وَ اِذَا حَكَمْتُمْ بَیْنَ النَّاسِ اَنْ تَحْكُمُوْا بِالْعَدْلِ.

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেছেন, যেন তোমরা আমানতসমূহ তার পাওনাদারদের পৌঁছে দাও। আর যখন লোকদের মাঝে বিচার কর তখন ইনসাফের সাথে বিচার কর। -সূরা নিসা (৪) : ৫৮

আল্লাহ তাআলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ করেছেন যে, (তরজমা) (হে নবী!) আপনি বলুন,... আমাকে আদেশ করা হয়েছে তোমাদের মাঝে ন্যায় বিচার করতে। -সূরা শুরা (৪২) : ১৫

আজকাল যারা মুসলিম হওয়া সত্তে¡ও এ কথা বলে বেড়ায় যে, ‘ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনীতির মধ্যে ধর্মের কোনো স্থান নেই। ধর্ম হচ্ছে কিছু ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠান। অতএব, রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ধর্মীয় মহলের মাথা গলানো উচিত নয়।এরূপ লোকদের উচিত, সবার আগে নিজের ঈমানের খবর নেয়া।

কারণ, পবিত্র কুরআনে অন্তত চারজন বিশিষ্ট নবীর রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। তাঁরা হচ্ছেন, হযরত ইউসুফ আ., হযরত দাঊদ আ., হযরত সুলাইমান আ. এবং হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

হযরত ইউসুফ আ. ছিলেন মিসরের অর্থ-সম্পদের ব্যবস্থাপক। [দ্র. সূরা ইউসুফ (১২) : ৫৫, ৫৬, ১০১] গোটা রাজ্যের চরম দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর অর্থনৈতিক সুষম ব্যবস্থাপনার কথা সূরা ইউসুফে চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত দাউদ আ. ছিলেন এক শক্তিশালী রাজ্যের অধিপতি। জনসাধারণের মামলা-মোকাদ্দমা মীমাংসার অঙ্গনে তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বাগ্মিতার কথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন। [দ্র. সূরা ছ¦দ (৩৮) : ২০]

হযরত সুলাইমান আ. ছিলেন নবুওত ও রাজ্যক্ষমতায় তাঁর পিতা দাউদ আ.-এর উত্তরাধিকারী। [দ্র. সূরা নামল (২৭) : ১৬] তাঁকে আল্লাহ তাআলা এমন রাজত্ব দান করেছিলেন, যা ইতিহাসে আর কাউকে দেয়া হয়নি। [দ্র. সূরা ছ¦দ (৩৮) : ৩৫] মানুষ, জিন, পশুপাখি, বাতাস সবকিছুকেই তাঁর অধীন করে দেয়া হয়েছিল। [দ্র. সূরা ছ¦দ (৩৮) : ৩৬-৩৭; সূরা নামল (২৭) : ১৭]

আর আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাষ্ট্রব্যবস্থার সবকিছুই তো পবিত্র কুরআন কেন্দ্রিক। নবীজীর বদর, উহুদ, খন্দক ও হুদায়বিয়ার অভিযানগুলোর কথা কুরআনে কারীমে সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। কুরআনের অন্তত কয়েক শ আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার অবকাঠামো, মূলনীতি ও রূপরেখা বিশদাকারে বিবৃত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয়নবীকে আদেশ করে বলেছেন-

وَ اَنْزَلْنَاۤ اِلَیْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیْنَ یَدَیْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مُهَیْمِنًا عَلَیْهِ فَاحْكُمْ بَیْنَهُمْ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللهُ

আর আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সেগুলোর (বিষয়বস্তুর) সংরক্ষকরূপে। অতএব, আপনি তাদের মধ্যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুসারে ফায়সালা করুন। -সূরা মায়েদা (৫) : ৪৮

আমাদের সমাজের যেসব মানুষ এটা মনে করেন যে, নবীগণের দাওয়াতের সঙ্গে রাষ্ট্র, আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করা উচিত। তাদের এটা জানা উচিত যে, পূর্বের নবীগণ আসমানী কিতাবের আলোকে মানুষের মাঝে বিচারকার্য করতেন। [দেখুন, সূরা মায়েদা (৫) : ১৪৬] আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে শাসন করে না, তারা কাফির, যালিম ও ফাসিক। [দ্র. সূরা মায়েদা (৫) : ৪৪, ৪৫, ৪৭]

 

ছয়. উত্তম আখলাক

নববী দাওয়াতের আরেকটি বিষয়বস্তু হচ্ছে আখলাক। অর্থাৎ, সুন্দর স্বভাব ও আচরণ। নবী রাসূলগণ নিজেরা যেমন সর্বশ্রেষ্ঠ আখলাকের অধিকারী ছিলেন, তেমনি মানুষকেও তাঁরা সেদিকে আহŸান করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করে বলেছেন-

وَ اِنَّكَ لَعَلٰی خُلُقٍ عَظِیْمٍ.

আর নিঃসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। -সূরা কলম (৬৮) : ৪

এছাড়া অন্যান্য নবীগণের ব্যাপারেও সৎ, পুণ্যবান, অনুগত, ধৈর্যশীল, পবিত্র এবং অতি সত্যবাদীর মতো অসংখ্য চারিত্রিক গুণাবলির উল্লেখ হয়েছে। নবী রাসূলগণ মানুষকেও আল্লাহর নির্দেশমতো উত্তম আখলাকের তালীম দিয়েছেন। বরং নবীগণের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল এটি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

كَمَاۤ اَرْسَلْنَا فِیْكُمْ رَسُوْلًا مِّنْكُمْ یَتْلُوْا عَلَیْكُمْ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِّیْكُمْ وَ یُعَلِّمُكُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَةَ وَ یُعَلِّمُكُمْ مَّا لَمْ تَكُوْنُوْا تَعْلَمُوْنَ.

যেমন আমি তোমাদের মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য থেকে, যিনি তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তোমাদের পবিত্র করেন, তোমাদের কিতাব ও গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেন, যা তোমরা জানতে না। -সূরা বাকারা (২) : ১৫১

এ আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রেরিত রাসূলের চারটি দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। এক. আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা। দুই. মানুষকে পরিশুদ্ধ করা। তিন ও চার. কিতাব ও গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেয়া।

এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয় হল দ্বিতীয়টি। মানুষকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা। অর্থাৎ তাদেরকে এমন বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলা, যাতে তাদের স্বভাব-আচরণ এবং অভ্যন্তরীণ গুণাবলি অপবিত্র ভাবাবেগ ও অনুচিত চাহিদামুক্ত হয়ে উন্নত বৈশিষ্ট্যমÐিত হয়ে ওঠে।

বলাবাহুল্য, এটাই সেই উত্তম আখলাকের দাওয়াত, যা নবীগণের অন্যতম মহান দায়িত্ব। এ আয়াত থেকে উত্তম আখলাকের সীমাহীন গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। আর এও জানা গেছে যে, নববী দাওয়াতে উত্তম আখলাকের পরিধি অনেক বিস্তৃত। নিছক সৌজন্যের ব্যবহার আর কৃত্রিম ভদ্রতাকে নববী দাওয়াতে উত্তম আখলাকবলে না। এখানে উত্তম আখলাক শুরু হয় পরিচ্ছন্ন অন্তর থেকে। সমাপ্ত হয় বহিরাঙ্গের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে। এমনিভাবে নববী উত্তম আখলাক কেবল পুঁিথগত বিদ্যা পড়ে অর্জিত হয় না। কামেল ব্যক্তিগণের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তা পরিপূর্ণরূপে হাসিল হয়। হাদীস শরীফে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ حُسْنَ الأَخْلاَقِ.

আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে উত্তম চরিত্রের পূর্ণাঙ্গতা প্রদানের জন্য। -মুয়াত্তা মালেক, হাদীস ২৬৩৩, ১৮৮৫, ৬৫১; মুসনাদে বাযযার, হাদীস ৮৯৪৯; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ২০৭৮২

 

উপসংহার

আমরা এতক্ষণ নবী রাসূলগণের দাওয়াতের স্বরূপ ও বিষয়বস্তুসমূহের উপর একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা লাভের চেষ্টা করেছি। বস্তুত নবী রাসূলগণের দাওয়াতের বিষয়বস্তু এতই ব্যাপক আর বিস্তৃত যে, কোনো ছোট্ট প্রবন্ধ বা এক-দুটি গ্রন্থে তার যথাযথ আলোচনা সম্ভব নয়।

আকীদা, ইবাদত, মুআমালা-লেনদেন, মুআশারা-সামাজিক কর্তব্য ও অধিকার, সিয়াসাত-রাজনীতি, উত্তম আখলাক-শিষ্টাচার এ ছয় বিষয়ের প্রত্যেকটিই এমন, যার উপর উম্মাহ্র দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে শত-সহ¯্র গ্রন্থ লিখিত হয়েছে। সকল যুগের মুসলিম মনীষীগণ এ সবগুলো বিষয়ে মানুষের জন্য যুগোপযোগী কর্মপন্থা রেখে গিয়েছেন। সকল শাখা-প্রশাখাসহ এ বিষয়গুলোর সমষ্টিকেই বলে দ্বীন ও শরীয়ত।

এগুলোর কোনো একটি ছাড়াও দ্বীনের সংজ্ঞা পূর্ণতা লাভ করবে না। তবে ছয় বিষয়ের মধ্যে প্রধান ও মূল ভিত্তি হল আকীদা-বিশ্বাস। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, অবশিষ্ট পাঁচ বিষয়ের সকল নীতি ও বিধানের মধ্যে আকীদার রং ও ঝলক বিদ্যমান। কারো আকীদা-বিশ্বাস যদি ঈমানদারের আকিদা-বিশ্বাস না হয়, তবে আল্লাহর কাছে তার ইবাদত, মুআমালা, মুআশারা, সিয়াসত ও উত্তম আখলাকের কানাকড়ি মূল্যও নেই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

اَلَمْ تَرَ كَیْفَ ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَیِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَیِّبَةٍ اَصْلُهَا ثَابِتٌ وَّ فَرْعُهَا فِی السَّمَآءِ.

আপনি কি লক্ষ্য করেননি, আল্লাহ কেমন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন পবিত্র বাক্যের’? (অর্থাৎ কালেমা তাওহীদ ও ঈমান সম্পর্কিত কথার) (তার দৃষ্টান্ত এমন,) যেমন উৎকৃষ্ট বৃক্ষ, যার শিকড় (যমিনে) প্রোথিত, আর তার শাখাগুলি আসমানে (বিস্তৃত।) -সূরা ইবরাহীম (১৪) : ২৪

মূলত ঈমান হচ্ছে সেই শিকড়। আর বাকি সব তার ডালপালা। নবী-রাসূলগণ মানুষের অন্তরে সর্বপ্রথম ঈমান নামের এ আসমানী বৃক্ষ রোপনের মেহনত করেছেন। এরপর পর্যায়ক্রমে সেই গাছে অন্যান্য শাখা-প্রশাখা যুগিয়েছেন। তবেই তা কাক্সিক্ষত ফল দান করেছে।

সকল নবী-রাসূল অভিন্ন আকীদারই দাওয়াত দিয়েছিলেন। তাঁদের অনেক ইবাদতও এক ছিল। তবে শরীয়তের কিছু কিছু শাখাগত বিষয়ে যুগ, কাল ও অবস্থার প্রয়োজনে আল্লাহ তাআলা ভিন্ন বিধান দান করেছেন। [দ্র. সূরা মায়েদা (৫) : ৪৮]

 

 

advertisement